📄 আবু তালহা এবং তাঁর স্ত্রী
উম্মে সালামা আবু তালহাকে বিয়ে করেন। আল্লাহ তাদের একজন পুত্রসন্তান দান করেন। তার নাম ছিল আবু উমাইর। আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু পুত্রকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও আবু উমাইরকে ভালোবাসতেন।
একদিনের ঘটনা। শিশুরা খেলা করছিল। তাদের সাথে আবু উমাইরও ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের পাশ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। হঠাৎ নবিজি আবু উমাইরকে দেখলেন। তিনি দেখলেন, আবু উমাইর তার সঙ্গে থাকা একটি পাখি নিয়ে খেলছে। পাখিটির নাম ছিল নুগাইর। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে কৌতুক করে বললেন- يَا أَبَا عُمَيْر مَا فَعَلَ النُّغَيْرِ। হে আবু উমাইর, কী করছে নুগাইর?
কিছুদিন পরের ঘটনা। আবু উমাইর খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। এতে আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত বিচলিত হয়ে যান। অসুখ একসময় তীব্র আকার ধারণ করে। এ দিকে আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু কোনো প্রয়োজনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়েছেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ সময় ছিলেন। একপর্যায়ে আবু উমাইরের অসুস্থতা আরও বৃদ্ধি পায় এবং তার মায়ের সামনেই সে মারা যায়।
পরিবারের সদস্যরা কান্নাকাটি করছিল। উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাদের বললেন, 'আমি কথা বলার আগে আবু উমাইর সম্পর্কে আবু তালহার সাথে কেউ কিছু বলবেন না।' উম্মে সালামা মৃত সন্তানকে ঘরের এককোণে ঢেকে রাখলেন এবং স্বামীর জন্য খাবার তৈরি করলেন।
আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'বাবুর কী অবস্থা? কেমন আছে ও?' স্ত্রী জবাব দিলেন, 'তার শ্বাস-প্রশ্বাস শান্ত। আশা করছি, আরামেই আছে।'
আবু তালহা ছেলেকে দেখার জন্য তার দিকে যেতে চাইলেন। স্ত্রী নিষেধ করলেন এবং বললেন, 'বাবু চুপ করে আছে, তাই নড়াবেন না।' উম্মে সালামা তাঁর সামনে রাতের খাবার পরিবেশন করলেন। আবু তালহা আহারপর্ব শেষ করে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হলেন। স্বামী-স্ত্রী যা করে তারা তাই করলেন।
উম্মে সালামা যখন বুঝতে পারলেন, স্বামী পরিতৃপ্ত ও প্রশান্ত হয়েছেন, তখন বললেন, 'হে আবু তালহা, কেউ যদি কিছু সময়ের জন্য কাউকে কোনো জিনিস ব্যবহার করতে দেয় এবং পরবর্তী সময়ে তা ফেরত চায়, তাহলে ওই ব্যক্তির কি উচিত নয়, মূল মালিককে তা ফিরিয়ে দেওয়া?'
আবু তালহা বললেন, 'অবশ্যই মূল মালিককে দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।' স্ত্রী বললেন, 'আপনি আমাদের প্রতিবেশীর ব্যাপারে আশ্চর্য হবেন!' আবু তালহা বললেন, 'কী হয়েছে তাদের?'
স্ত্রী বললেন, 'কেউ তাদের কোনো বস্তু ব্যবহার করার জন্য দিয়েছিল। জিনিসটি অনেক দিন তাদের কাছে ছিল। এখন তারা মনে করছে যে, জিনিসটির মালিক তারাই। মূল মালিক জিনিসটি ফেরত চাইলে তারা তা দিতে অস্বীকার করছে।'
আবু তালহা বললেন, 'তাদের আচরণ কতই-না নিকৃষ্ট!'
এরপর উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা মৃত সন্তানকে বের করে আনলেন এবং আবু তালহার সামনে রেখে বললেন, 'এই আপনার পুত্রসন্তান, আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু সময়ের জন্য আপনাকে দেওয়া হয়েছিল। কিছুক্ষণ পূর্বে তিনি তাঁর জিনিসটি নিয়ে গেছেন। সুতরাং আপনার ছেলে আল্লাহর কাছে (জীবনের বরাদ্দ সময়টুকু বুঝে নিয়ে) পৌঁছে গেছে।'
এ কথা শুনে আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু আঁতকে উঠলেন। বললেন, 'আল্লাহর কসম, এই রাতের ধৈর্যে তুমি আমার চেয়ে মর্যাদাবান হয়েছ।' তারপর তিনি উঠে গিয়ে সন্তানকে গোসল করিয়ে কাফন-দাফন সম্পন্ন করলেন। সকালবেলা বিষয়টি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানালে তিনি তাদের উভয়ের জন্য বরকতের দুআ করেন। সে রাতের মিলনে আল্লাহ তাআলা তাদের এমন বরকত দান করেন যে, উম্মে সালামার গর্ভে আবু তালহার আরেকজন পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নাম রাখলেন 'আবদুল্লাহ'। এই আবদুল্লাহর ঔরসে নয় জন সন্তান জন্মগ্রহণ করেন, তাদের প্রত্যেকেই কুরআন কারিমের হাফিজ হয়েছিলেন।
উম্মে সালামা আবু তালহাকে বিয়ে করেন। আল্লাহ তাদের একজন পুত্রসন্তান দান করেন। তার নাম ছিল আবু উমাইর। আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু পুত্রকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও আবু উমাইরকে ভালোবাসতেন।
একদিনের ঘটনা। শিশুরা খেলা করছিল। তাদের সাথে আবু উমাইরও ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের পাশ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। হঠাৎ নবিজি আবু উমাইরকে দেখলেন। তিনি দেখলেন, আবু উমাইর তার সঙ্গে থাকা একটি পাখি নিয়ে খেলছে। পাখিটির নাম ছিল নুগাইর। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে কৌতুক করে বললেন- يَا أَبَا عُمَيْر مَا فَعَلَ النُّغَيْرِ. হে আবু উমাইর, কী করছে নুগাইর?
কিছুদিন পরের ঘটনা। আবু উমাইর খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। এতে আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত বিচলিত হয়ে যান। অসুখ একসময় তীব্র আকার ধারণ করে। এ দিকে আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু কোনো প্রয়োজনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়েছেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ সময় ছিলেন। একপর্যায়ে আবু উমাইরের অসুস্থতা আরও বৃদ্ধি পায় এবং তার মায়ের সামনেই সে মারা যায়।
পরিবারের সদস্যরা কান্নাকাটি করছিল। উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাদের বললেন, 'আমি কথা বলার আগে আবু উমাইর সম্পর্কে আবু তালহার সাথে কেউ কিছু বলবেন না।' উম্মে সালামা মৃত সন্তানকে ঘরের এককোণে ঢেকে রাখলেন এবং স্বামীর জন্য খাবার তৈরি করলেন।
আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'বাবুর কী অবস্থা? কেমন আছে ও?' স্ত্রী জবাব দিলেন, 'তার শ্বাস-প্রশ্বাস শান্ত। আশা করছি, আরামেই আছে।'
আবু তালহা ছেলেকে দেখার জন্য তার দিকে যেতে চাইলেন। স্ত্রী নিষেধ করলেন এবং বললেন, 'বাবু চুপ করে আছে, তাই নড়াবেন না।' উম্মে সালামা তাঁর সামনে রাতের খাবার পরিবেশন করলেন। আবু তালহা আহারপর্ব শেষ করে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হলেন। স্বামী-স্ত্রী যা করে তারা তাই করলেন।
উম্মে সালামা যখন বুঝতে পারলেন, স্বামী পরিতৃপ্ত ও প্রশান্ত হয়েছেন, তখন বললেন, 'হে আবু তালহা, কেউ যদি কিছু সময়ের জন্য কাউকে কোনো জিনিস ব্যবহার করতে দেয় এবং পরবর্তী সময়ে তা ফেরত চায়, তাহলে ওই ব্যক্তির কি উচিত নয়, মূল মালিককে তা ফিরিয়ে দেওয়া?'
আবু তালহা বললেন, 'অবশ্যই মূল মালিককে দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।' স্ত্রী বললেন, 'আপনি আমাদের প্রতিবেশীর ব্যাপারে আশ্চর্য হবেন!' আবু তালহা বললেন, 'কী হয়েছে তাদের?'
স্ত্রী বললেন, 'কেউ তাদের কোনো বস্তু ব্যবহার করার জন্য দিয়েছিল। জিনিসটি অনেক দিন তাদের কাছে ছিল। এখন তারা মনে করছে যে, জিনিসটির মালিক তারাই। মূল মালিক জিনিসটি ফেরত চাইলে তারা তা দিতে অস্বীকার করছে।' আবু তালহা বললেন, 'তাদের আচরণ কতই-না নিকৃষ্ট!'
এরপর উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা মৃত সন্তানকে বের করে আনলেন এবং আবু তালহার সামনে রেখে বললেন, 'এই আপনার পুত্রসন্তান, আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু সময়ের জন্য আপনাকে দেওয়া হয়েছিল। কিছুক্ষণ পূর্বে তিনি তাঁর জিনিসটি নিয়ে গেছেন। সুতরাং আপনার ছেলে আল্লাহর কাছে (জীবনের বরাদ্দ সময়টুকু বুঝে নিয়ে) পৌঁছে গেছে।'
এ কথা শুনে আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু আঁতকে উঠলেন। বললেন, 'আল্লাহর কসম, এই রাতের ধৈর্যে তুমি আমার চেয়ে মর্যাদাবান হয়েছ।' তারপর তিনি উঠে গিয়ে সন্তানকে গোসল করিয়ে কাফন-দাফন সম্পন্ন করলেন। সকালবেলা বিষয়টি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানালে তিনি তাদের উভয়ের জন্য বরকতের দুআ করেন। সে রাতের মিলনে আল্লাহ তাআলা তাদের এমন বরকত দান করেন যে, উম্মে সালামার গর্ভে আবু তালহার আরেকজন পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নাম রাখলেন 'আবদুল্লাহ'। এই আবদুল্লাহর ঔরসে নয় জন সন্তান জন্মগ্রহণ করেন, তাদের প্রত্যেকেই কুরআন কারিমের হাফিজ হয়েছিলেন।
📄 দাওস গোত্র
তুফাইল বিন আমর। দাওস গোত্রের সম্মানিত নেতা। দাওস গোত্রের সবাই ছিল তাঁর অনুগত। বিশেষ প্রয়োজনে একদিন তিনি মক্কায় গেলেন। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ তাঁকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, 'কে তুমি?' তিনি বললেন, 'আমি দাওস গোত্রের নেতা তুফাইল বিন আমর।'
তারা বলল, 'এখানে একজন লোক আছে, সে নিজেকে নবি দাবি করে। আপনি তার সাথে বসা এবং তার কথা শোনা থেকে দূরে থাকবেন। কেননা, সে জাদুকর। যদি তার কথা শুনেন, তাহলে আপনি নির্বুদ্ধি হয়ে যাবেন।
ইসলামগ্রহণের পর এ ঘটনা সম্পর্কে তুফাইল বিন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর কসম, তারা আমাকে লোকটি সম্পর্কে ভয় দেখাতেই থাকল। ফলে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, তার কথা শুনব না, তার সাথে কথা বলব না। তার কথা যেন আমার কানে না আসে, সে জন্য আমি কানে তুলার ঢিপি দিয়েছিলাম। এভাবেই কিছুদিন গেল। একদিন আমি কাবার দিকে গেলাম। দেখলাম, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবার পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছেন। আমি তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আল্লাহ তাআলা তাঁর কিছু কথা আমাকে শুনিয়ে দিলেন। সেই কথাগুলো এতটাই সুন্দর ও হৃদয়কাড়া ছিল যে, আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমি মনে মনে বললাম, 'এটা কেমন ব্যাপার! আল্লাহর কসম, আমি তো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন একজন মানুষ। সুন্দরের উপর কোনো অসুন্দর লুকিয়ে থাকে না। সুতরাং লোকটি কী বলে, তা শুনতে আমাকে কেউ বাধা দিতে পারবে না। যদি তাঁর মাঝে কোনো কল্যাণ থাকে, তা হলে সেগুলো গ্রহণ করব। আর যদি অকল্যাণ থাকে, তা হলে সেগুলো পরিহার করব।'
তারপর আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। ইতোমধ্যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ শেষ করলেন। তিনি বাড়ির দিকে ফিরে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে অনুসরণ করে চললাম। যখন তিনি বাড়িতে প্রবেশ করলেন, আমিও তাঁর সাথে প্রবেশ করলাম এবং বললেন, 'হে মুহাম্মদ, আপনার কওম আমাকে এই ধরনের কথাবার্তা বলেছে। আল্লাহর কসম, তারা আমাকে আপনার ব্যাপারে এমনভাবে ভয় দেখিয়েছে যে, আমি তুলা দিয়ে কান বন্ধ করে রেখেছি, যাতে আপনার কথা না শুনতে পাই। কিন্তু যেভাবেই হোক, আমি আপনার সুন্দর কিছু কথা শুনেছি। এবার আপনি আপনার ব্যাপারটা খুলে বলুন।'
তাঁর কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব খুশি হলেন। নবিজি তাঁর সামনে ইসলাম উপস্থাপন করলেন। তারপর পবিত্র কুরআন থেকে তিলাওয়াত করে শোনালেন। ফলে তুফাইল নিজের অবস্থা সম্পর্কে ভাবতে লাগলেন। প্রতিদিন তো এমনভাবে দিন অতিবাহিত হচ্ছে, যা আল্লাহ থেকে তাকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। সে তো পাথরের পূজা করছে, যাকে আহ্বান করলে সে শোনে না, ডাকলে সাড়া দেয় না; একপর্যায়ে তাঁর নিকট সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল।
তুফাইল ইসলামগ্রহণের পরিণাম নিয়ে ভাবতে লাগলেন। কীভাবে তিনি নিজের দ্বীন পরিবর্তন করবেন! পূর্বপুরুষদের দ্বীন কীভাবে ছেড়ে দেবেন! লোকজন তাঁকে কী বলবে! তাঁর অতীতজীবন, অর্জিত সম্পদ, পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব সবকিছু তছনছ হয়ে যাবে। তুফাইল চুপচাপ ভাবতে লাগলেন। তুলনা করতে থাকলেন তাঁর ইহকাল ও পরকালের মাঝে। একপর্যায়ে পার্থিব মোহ ছুড়ে ফেলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন, আমি শিগগিরই সত্য দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত হব; যার খুশি হওয়ার সে খুশি হবে, যার নাখোশ হওয়ার সে নাখোশ হবে। যদি সৃষ্টিকর্তা সন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে পৃথিবীবাসীর নাখোশি দিয়ে কীইবা হবে! বেশকিছু সময় চিন্তাভাবনার পর তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু সেখানেই ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং সত্য দ্বীনের পক্ষে সাক্ষ্য দিলেন। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমি আমার গোত্রের সম্মানী ও অনুসরণীয় ব্যক্তি। আমি নিজ গোত্রে ফিরে যাব এবং তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করব।'
তুফাইল বিন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মক্কা থেকে বের হলেন এবং ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে খুব দ্রুত গোত্রের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। গোত্রের নিকট পৌঁছালে তার বৃদ্ধ পিতা এগিয়ে এলেন। তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'বাবা, এখন থেকে আমি আপনার সাথে নেই, আপনি আমার সাথে নেই।' পিতা বললেন, 'কেন বাবা?' তিনি বললেন, 'আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বীনের অনুসারী হয়ে গেছি।'
পিতা বললেন, 'বেটা, আমার দ্বীন তো সেটিই যা তোমার দ্বীন।' তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু পিতার এমন অপ্রত্যাশিত বক্তব্যে খুবই আপ্লুত হলেন, যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। তিনি বললেন, 'তা হলে যান, গোসল করে পবিত্র কাপড় পরিধান করে আমার কাছে আসুন। আমি যা শিখেছি তা আপনাকে শিখাব।'
তাঁর পিতা গোসল করে পবিত্র কাপড় পরিধান করে এলেন। তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাধ্যমে তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। অতঃপর বাড়ির দিকে গেলে তার স্ত্রী তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বরণ করে নিলেন। তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এখন আমার কাছ থেকে দূরে থাকো। আমার সাথে তোমার এবং তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।' স্ত্রী বলল, 'আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি উৎসর্গ হোক! কেন? কী হয়েছে?' তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ইসলাম আমার ও তোমার মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। কেননা, আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বীনের অনুসারী হয়ে গেছি।' স্ত্রী বলল, 'তবে তো আমার দ্বীন সেটিই যা আপনার দ্বীন।'
তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তা হলে যাও, পবিত্র হয়ে আমার কাছে ফিরে এসো।' স্ত্রী চলে গেলেন, কিন্তু তার অন্তরে ভয় চেপে বসল; প্রতিমা-পূজা ত্যাগ করলে দেবদেবি সন্তানদের কোনো ক্ষতি করে বসে কিনা! তিনি স্বামীর কাছে ফিরে এসে বললেন, 'আপনার প্রতি আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক! আপনি কি সন্তানদের ব্যাপারে প্রতিমা “জুশ-শিরা”কে ভয় করছেন?' তারা এই জুশ-শিরা প্রতিমার পূজা করত। তারা বিশ্বাস করত, জুশ-শিরার পূজা ছেড়ে দিলে নিজে বা সন্তান-সন্ততি বিপদে আক্রান্ত হবে।
তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি এই দায়িত্ব নিচ্ছি, জুশ-শিরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।' সুতরাং সে চলে গেল এবং গোসল করে ফিরে এল। এরপর স্বামীর হাতে তিনিও ইসলাম গ্রহণ করলেন। এরপর তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর গোত্রে ঘুরে ঘুরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকলেন। তাদের বৈঠকখানাগুলোতে যেতেন, রাস্তায় দাঁড়াতেন। কিন্তু তারা প্রতিমাপূজা ত্যাগ করতে অস্বীকার করল। ফলে তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু ক্রোধান্বিত হয়ে আবারও মক্কায় গেলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, দাওস গোত্র অবাধ্যতা করেছে, অস্বীকার করেছে। হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আল্লাহর কাছে তাদের বিরুদ্ধে বদদুআ করুন।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি তাঁর দু-হাত আকাশের দিকে উঠালেন। তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু মনে মনে ভাবলেন, দাওস গোত্র ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মায়া ভরা জবানে উচ্চারিত হলো- اللَّهُمَّ اهْدِ دَوْسًا اللَّهُمَّ اهْدِ دَوْসًا। হে আল্লাহ, দাওস গোত্রকে হেদায়াত দাও। হে আল্লাহ, দাওস গোত্রকে হেদায়াত দাও।
তারপর তুফাইল বিন আমরের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমার জাতির কাছে ফিরে যাও। তাদের ইসলামের দিকে ডাকো, তাদের সাথে নম্র আচরণ করো।' তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু ফিরে গেলেন। তারপর খুব অল্পদিনেই দাওস গোত্রের প্রায় সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন।
তুফাইল বিন আমর। দাওস গোত্রের সম্মানিত নেতা। দাওস গোত্রের সবাই ছিল তাঁর অনুগত। বিশেষ প্রয়োজনে একদিন তিনি মক্কায় গেলেন। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ তাঁকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, 'কে তুমি?'
তিনি বললেন, 'আমি দাওস গোত্রের নেতা তুফাইল বিন আমর।'
তারা বলল, 'এখানে একজন লোক আছে, সে নিজেকে নবি দাবি করে। আপনি তার সাথে বসা এবং তার কথা শোনা থেকে দূরে থাকবেন। কেননা, সে জাদুকর। যদি তার কথা শুনেন, তাহলে আপনি নির্বুদ্ধি হয়ে যাবেন।
ইসলামগ্রহণের পর এ ঘটনা সম্পর্কে তুফাইল বিন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর কসম, তারা আমাকে লোকটি সম্পর্কে ভয় দেখাতেই থাকল। ফলে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, তার কথা শুনব না, তার সাথে কথা বলব না। তার কথা যেন আমার কানে না আসে, সে জন্য আমি কানে তুলার ঢিপি দিয়েছিলাম। এভাবেই কিছুদিন গেল। একদিন আমি কাবার দিকে গেলাম। দেখলাম, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবার পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছেন। আমি তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আল্লাহ তাআলা তাঁর কিছু কথা আমাকে শুনিয়ে দিলেন। সেই কথাগুলো এতটাই সুন্দর ও হৃদয়কাড়া ছিল যে, আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমি মনে মনে বললাম, 'এটা কেমন ব্যাপার! আল্লাহর কসম, আমি তো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন একজন মানুষ। সুন্দরের উপর কোনো অসুন্দর লুকিয়ে থাকে না। সুতরাং লোকটি কী বলে, তা শুনতে আমাকে কেউ বাধা দিতে পারবে না। যদি তাঁর মাঝে কোনো কল্যাণ থাকে, তা হলে সেগুলো গ্রহণ করব। আর যদি অকল্যাণ থাকে, তা হলে সেগুলো পরিহার করব।'
তারপর আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। ইতোমধ্যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ শেষ করলেন। তিনি বাড়ির দিকে ফিরে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে অনুসরণ করে চললাম। যখন তিনি বাড়িতে প্রবেশ করলেন, আমিও তাঁর সাথে প্রবেশ করলাম এবং বললেন, 'হে মুহাম্মদ, আপনার কওম আমাকে এই ধরনের কথাবার্তা বলেছে। আল্লাহর কসম, তারা আমাকে আপনার ব্যাপারে এমনভাবে ভয় দেখিয়েছে যে, আমি তুলা দিয়ে কান বন্ধ করে রেখেছি, যাতে আপনার কথা না শুনতে পাই। কিন্তু যেভাবেই হোক, আমি আপনার সুন্দর কিছু কথা শুনেছি। এবার আপনি আপনার ব্যাপারটা খুলে বলুন।'
তাঁর কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব খুশি হলেন। নবিজি তাঁর সামনে ইসলাম উপস্থাপন করলেন। তারপর পবিত্র কুরআন থেকে তিলাওয়াত করে শোনালেন। ফলে তুফাইল নিজের অবস্থা সম্পর্কে ভাবতে লাগলেন। প্রতিদিন তো এমনভাবে দিন অতিবাহিত হচ্ছে, যা আল্লাহ থেকে তাকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। সে তো পাথরের পূজা করছে, যাকে আহ্বান করলে সে শোনে না, ডাকলে সাড়া দেয় না; একপর্যায়ে তাঁর নিকট সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল।
তুফাইল ইসলামগ্রহণের পরিণাম নিয়ে ভাবতে লাগলেন। কীভাবে তিনি নিজের দ্বীন পরিবর্তন করবেন! পূর্বপুরুষদের দ্বীন কীভাবে ছেড়ে দেবেন! লোকজন তাঁকে কী বলবে! তাঁর অতীতজীবন, অর্জিত সম্পদ, পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব সবকিছু তছতছ হয়ে যাবে। তুফাইল চুপচাপ ভাবতে লাগলেন। তুলনা করতে থাকলেন তাঁর ইহকাল ও পরকালের মাঝে। একপর্যায়ে পার্থিব মোহ ছুড়ে ফেলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন, আমি শিগগিরই সত্য দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত হব; যার খুশি হওয়ার সে খুশি হবে, যার নাখোশ হওয়ার সে নাখোশ হবে। যদি সৃষ্টিকর্তা সন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে পৃথিবীবাসীর নাখোশি দিয়ে কীইবা হবে!
বান্দার সম্পদ ও রিজিক, সুস্থতা ও অসুস্থতা, পদপদবি ও মানমর্যাদা, এমনকি জীবন-মরণও উপরওয়ালার হাতে। তাই উপরওয়ালা খুশি থাকলে পার্থিব ক্ষতির কোনো পরোয়া নেই। আল্লাহ তাআলা যাকে ভালোবাসেন, তার উপর কেউ ক্রোধান্বিত হোক, তার থেকে দূরে সরে থাকুক অথবা তাকে নিয়ে কেউ উপহাস করুক, তাতে কোনো কিছু যায়-আসে না।
বেশকিছু সময় চিন্তাভাবনার পর তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু সেখানেই ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং সত্য দ্বীনের পক্ষে সাক্ষ্য দিলেন। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমি আমার গোত্রের সম্মানী ও অনুসরণীয় ব্যক্তি। আমি নিজ গোত্রে ফিরে যাব এবং তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করব।'
তুফাইল বিন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মক্কা থেকে বের হলেন এবং ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে খুব দ্রুত গোত্রের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। গোত্রের নিকট পৌঁছালে তার বৃদ্ধ পিতা এগিয়ে এলেন।
তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'বাবা, এখন থেকে আমি আপনার সাথে নেই, আপনি আমার সাথে নেই।'
পিতা বললেন, 'কেন বাবা?'
তিনি বললেন, 'আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বীনের অনুসারী হয়ে গেছি।'
পিতা বললেন, 'বেটা, আমার দ্বীন তো সেটিই যা তোমার দ্বীন।'
তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু পিতার এমন অপ্রত্যাশিত বক্তব্যে খুবই আপ্লুত হলেন, যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। তিনি বললেন, 'তা হলে যান, গোসল করে পবিত্র কাপড় পরিধান করে আমার কাছে আসুন। আমি যা শিখেছি তা আপনাকে শিখাব।'
তাঁর পিতা গোসল করে পবিত্র কাপড় পরিধান করে এলেন। তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাধ্যমে তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। অতঃপর বাড়ির দিকে গেলে তার স্ত্রী তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বরণ করে নিলেন।
তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এখন আমার কাছ থেকে দূরে থাকো। আমার সাথে তোমার এবং তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।'
স্ত্রী বলল, 'আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি উৎসর্গ হোক! কেন? কী হয়েছে?'
তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ইসলাম আমার ও তোমার মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। কেননা, আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বীনের অনুসারী হয়ে গেছি।'
স্ত্রী বলল, 'তবে তো আমার দ্বীন সেটিই যা আপনার দ্বীন।'
তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তা হলে যাও, পবিত্র হয়ে আমার কাছে ফিরে এসো।'
স্ত্রী চলে গেলেন, কিন্তু তার অন্তরে ভয় চেপে বসল; প্রতিমা-পূজা ত্যাগ করলে দেবদেবি সন্তানদের কোনো ক্ষতি করে বসে কিনা! তিনি স্বামীর কাছে ফিরে এসে বললেন, 'আপনার প্রতি আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক! আপনি কি সন্তানদের ব্যাপারে প্রতিমা “জুশ-শিরা”কে ভয় করছেন?' তারা এই জুশ-শিরা প্রতিমার পূজা করত। তারা বিশ্বাস করত, জুশ-শিরার পূজা ছেড়ে দিলে নিজে বা সন্তান-সন্ততি বিপদে আক্রান্ত হবে।
তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি এই দায়িত্ব নিচ্ছি, জুশ-শিরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।' সুতরাং সে চলে গেল এবং গোসল করে ফিরে এল। এরপর স্বামীর হাতে তিনিও ইসলাম গ্রহণ করলেন।
এরপর তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর গোত্রে ঘুরে ঘুরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকলেন। তাদের বৈঠকখানাগুলোতে যেতেন, রাস্তায় দাঁড়াতেন। কিন্তু তারা প্রতিমাপূজা ত্যাগ করতে অস্বীকার করল। ফলে তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু ক্রোধান্বিত হয়ে আবারও মক্কায় গেলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, দাওস গোত্র অবাধ্যতা করেছে, অস্বীকার করেছে। হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আল্লাহর কাছে তাদের বিরুদ্ধে বদদুআ করুন।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি তাঁর দু-হাত আকাশের দিকে উঠালেন। তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু মনে মনে ভাবলেন, দাওস গোত্র ধ্বংস হয়েছে।
কিন্তু মেঘ না চাইতে বৃষ্টিপাতের মতো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মায়া ভরা জবানে উচ্চারিত হলো- اللَّهُمَّ اهْدِ دَوْسًا اللَّهُمَّ اهْدِ دَوْسًا . হে আল্লাহ, দাওস গোত্রকে হেদায়াত দাও। হে আল্লাহ, দাওস গোত্রকে হেদায়াত দাও। তারপর তুফাইল বিন আমরের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমার জাতির কাছে ফিরে যাও। তাদের ইসলামের দিকে ডাকো, তাদের সাথে নম্র আচরণ করো।' তুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু ফিরে গেলেন। তারপর খুব অল্পদিনেই দাওস গোত্রের প্রায় সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন।
📄 শাতিমে রাসুলের করুণ পরিণতি
দিন দিন ইসলামের প্রচার বেড়েই চলেছে। দলে দলে মানুষ ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের নিয়ে নিজ মজলিসে বসে বিশ্ব- জগতের প্রতিপালকের একত্মবাদ বর্ণনা করছেন। বিভিন্ন গোত্রের নেতারাও ইসলাম গ্রহণ করে অবনত মস্তকে রাসুলের সামনে বসে আছেন।
একদিন আরবের একনেতা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এলেন। সাধারণ মানুষের কাছে তার প্রবল প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। লোকটির নাম আমের বিন তুফাইল। ইসলামের প্রচার-প্রসার দেখে সমাজের লোকেরা তাকে বলল, 'হে আমের, লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তুমিও ইসলাম গ্রহণ করো।'
সে ছিল আমিত্বে আক্রান্ত অহংকারী মানুষ। সে বলত, 'আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি ততক্ষণ মারা যাব না, যতক্ষণ না আরবরা আমাকে তাদের রাজা বানাবে, যত দিন না তারা আমার পিছে পিছে চলবে। সুতরাং যেখানে আমার অবস্থান এমন, সেখানে আমি কীভাবে কুরাইশের ওই যুবকের অনুসরণ করতে পারি!'
কিন্তু এর কিছুদিন পর সে দেখল, ইসলাম আধিপত্য কায়েম করেছে, জনগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমর্থন করেছে, তখন তার কয়েকজন সাথিসহ উষ্ট্রিতে আরোহণ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারের উদ্দেশে যাত্রা করল। সে মসজিদে প্রবেশ করল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সাহাবিদের মাঝে বসা ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে সে বলল, 'হে মুহাম্মদ, আমি তোমার সাথে একান্তে কথা বলতে চাই।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একান্তে কথা বলতে চাচ্ছিলেন না। তিনি বললেন, 'না, আল্লাহর শপথ, যতক্ষণ না তুমি এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনবে, ততক্ষণ তোমার সাথে একান্তে মিলিত হব না।' আমের বিন তুফাইল আবার বলল, 'হে মুহাম্মদ, আমি তোমার সাথে একান্তে কথা বলতে চাই।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবারও তার প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানালেন।'
এবার সে অবিরত বলতে লাগল, 'হে মুহাম্মদ, দাঁড়াও, আমি তোমার সাথে কথা বলব। হে মুহাম্মদ, দাঁড়াও, আমি তোমার সাথে কথা বলব।' শেষপর্যন্ত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে কথা বলার জন্য দাঁড়ালেন। তখন আমের বিন তুফাইল ইরবিদ নামের তার একসঙ্গীকে ডেকে কানে কানে বলল, 'আমি মুহাম্মদের সঙ্গে কথা বলব। তার মুখ তোমার থেকে অন্য দিকে ফিরিয়ে রাখব, আর তখন তুমি তলোয়ার দ্বারা তাকে আঘাত করবে।' ইরবিদ তলোয়ার হাতে প্রস্তুতি গ্রহণ করল।
তারপর দুজনে একটি দেয়ালের কাছে গেল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমেরের সাথে কথা বলার জন্য উভয়ের মাঝে গিয়ে দাঁড়ালেন। ইরবিদ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আঘাত করার ইচ্ছায় তলোয়ার হাতে নিল, কিন্তু যখনই সে তলোয়ার কোষমুক্ত করতে চায়, তার হাত অবশ হয়ে যায়। শেষপর্যন্ত তলোয়ার কোষমুক্ত করতেই পারল না।
অপর দিকে আমের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এটা-ওটা বলে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছিল, আর ঘুরে ঘুরে এদিক-সেদিক করে ইরবিদের দিকে তাকাচ্ছিল। ইরবিদ জড়পদার্থের ন্যায় জমাট বেঁধে স্থির দাঁড়িয়ে আছে, নড়াচড়াও করতে পারছে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরবিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হে আমের বিন তুফাইল, ইসলাম গ্রহণ করো।'
আমের বলল, 'হে মুহাম্মদ, ইসলাম গ্রহণ করলে তুমি আমাকে কী দেবে?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'মুসলিমরা যা পাবে, তুমিও তাই পাবে। মুসলিমদের যেই সমস্যা হবে, সেই সমস্যা তোমারও হবে।' আমের বলল, 'আমি যদি ইসলাম গ্রহণ করি, তা হলে তোমার মৃত্যুর পর কি রাজত্ব আমাকে দেবে?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমার এবং তোমার কওমের জন্য এমন কিছু নেই।' আমের বলল, 'তা হলে আমি এই শর্তে ইসলাম গ্রহণ করতে পারি যে, আমি গ্রামের রাজা হব আর তুমি হবে শহরের রাজা।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'না।' তখন আমের রেগে গেল এবং তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। সে চিৎকার করে বলতে লাগল, 'হে মুহাম্মদ, আমি তোমার বিরুদ্ধে দ্রুতগামী ঘোড়া এবং শক্তিশালী মানুষের সমাবেশ ঘটাব। প্রতিটি খেজুরবাগানের সঙ্গে ঘোড়ার সংযোগ স্থাপন করব। তোমার বিরুদ্ধে গাতফান গোত্রের ১ হাজার স্বর্ণকেশী পুরুষ ও ১ হাজার স্বর্ণকেশী নারী নিয়ে যুদ্ধ করব।' তারপর তর্জনগর্জন করতে করতে সে বের হয়ে গেল।
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ, আমেরের ব্যাপারে তুমি আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাও এবং তার কওমকে হেদায়াত দান করো।' আমের তার সাথিদের নিয়ে মদিনা থেকে বেরিয়ে গেল। দীর্ঘ সফরে সে ছিল ক্লান্ত। মদিনার বাইরে তার গোত্রের সালুলিয়া নামের একমহিলা থাকত। ঘোড়া থেকে নেমে মহিলার তাঁবুতে সে অবস্থান করল। রাতে সেখানেই ঘুমাল। ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ তার গলায় বড় এক ফোঁড়া উঠল। গলার ভেতর দিক থেকে তা ফুলে উঠল, যেমন উটের ঘাড়ের উপর ফোঁড়া উঠে উটকে মেরে ফেলে। সে আতঙ্কিত হয়ে ছটফট করতে লাগল। ঘোড়াকে বেদম প্রহার করে ঘোড়ার লাগাম ধরে সামনের দিকে চলতে লাগল। মারাত্মক ব্যথা তাকে অস্থির করে তুলেছিল। চিৎকার করে করে ঘাড় হাত দিয়ে মলতে মলতে বলল, 'হায়! এ তো উটের মতো বড় ফোঁড়া!' এই অবস্থাতেই ঘোড়া তাকে নিয়ে ঘুরছিল। ঘোড়ার উপরই মারা গিয়ে ঘোড়া থেকে সে মাটিতে পড়ল।
তার সাথিরা তাকে এভাবেই ফেলে রাখে। তারা নিজ গোত্রে ফিরে যায়। বাড়িতে প্রবেশ করার সময় ইরবিদকে লোকজন প্রশ্ন করল, 'হে ইরবিদ, তোমার পেছনে কী?' ইরবিদ বলল, 'কিছুই নেই তো! আল্লাহর শপথ, মুহাম্মদ আমাদের একটি বস্তুর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছে। এখন আমার আকাঙ্ক্ষা হলো, যদি এখন সে আমার সামনে থাকত, তা হলে আমি তাকে হত্যা করা পর্যন্ত তির নিক্ষেপ করতেই থাকতাম।'
তার এই উক্তির দু-এক দিন পর একটি উট বিক্রির জন্য সে কোথাও যাচ্ছিল। আল্লাহ তাআলা তার উপর এবং উটের উপর অগ্নিবায়ু প্রেরণ করলেন। আগুন তাদের উভয়কে জ্বালিয়ে দিলো। আল্লাহ তাআলা আমের ও ইরবিদের অবস্থা সম্পর্কে অবতীর্ণ করলেন— 'তোমাদের মধ্যে কেউ গোপনে কথা বলুক বা তা সশব্দে প্রকাশ করুক, রাতের অন্ধকারে সে আত্মগোপন করুক বা প্রকাশ্য দিবালোকে বিচরণ করুক, সবই তাঁর নিকট সমান। তাঁর পক্ষ থেকে অনুসরণকারী রয়েছে তাদের অগ্রে এবং পশ্চাতে। আল্লাহর নির্দেশে তারা ওদের হেফাজত করে। আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ যখন কোনো জাতির উপর বিপদ দিতে চান, তখন তা ফিরে যাবার নয় এবং তিনি ব্যতীত তাদের কোনো সাহায্যকারীও নেই। তিনিই তোমাদের বিদ্যুৎ দেখান ভয় ও আশার জন্য এবং উত্থিত করেন ঘন মেঘমালা। তাঁর প্রশংসা পাঠ করে বজ্র এবং সব ফেরেশতা, সভয়ে। তিনি বজ্রপাত করেন, অতঃপর যাকে ইচ্ছা তাকে তা দ্বারা আঘাত করেন। তথাপি তারা আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে, অথচ তিনি মহাশক্তিশালী।' [সুরা রাদ : ১০-১৩]
দিন দিন ইসলামের প্রচার বেড়েই চলেছে। দলে দলে মানুষ ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের নিয়ে নিজ মজলিসে বসে বিশ্ব-জগতের প্রতিপালকের একত্মবাদ বর্ণনা করছেন। বিভিন্ন গোত্রের নেতারাও ইসলাম গ্রহণ করে অবনত মস্তকে রাসুলের সামনে বসে আছেন।
একদিন আরবের একনেতা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এলেন। সাধারণ মানুষের কাছে তার প্রবল প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। লোকটির নাম আমের বিন তুফাইল। ইসলামের প্রচার-প্রসার দেখে সমাজের লোকেরা তাকে বলল, 'হে আমের, লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তুমিও ইসলাম গ্রহণ করো।'
সে ছিল আমিত্বে আক্রান্ত অহংকারী মানুষ। সে বলত, 'আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি ততক্ষণ মারা যাব না, যতক্ষণ না আরবরা আমাকে তাদের রাজা বানাবে, যত দিন না তারা আমার পিছে পিছে চলবে। সুতরাং যেখানে আমার অবস্থান এমন, সেখানে আমি কীভাবে কুরাইশের ওই যুবকের অনুসরণ করতে পারি!'
কিন্তু এর কিছুদিন পর সে দেখল, ইসলাম আধিপত্য কায়েম করেছে, জনগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমর্থন করেছে, তখন তার কয়েকজন সাথিসহ উষ্ট্রিতে আরোহণ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারের উদ্দেশে যাত্রা করল। সে মসজিদে প্রবেশ করল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সাহাবিদের মাঝে বসা ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে সে বলল, 'হে মুহাম্মদ, আমি তোমার সাথে একান্তে কথা বলতে চাই।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একান্তে কথা বলতে চাচ্ছিলেন না। তিনি বললেন, 'না, আল্লাহর শপথ, যতক্ষণ না তুমি এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনবে, ততক্ষণ তোমার সাথে একান্তে মিলিত হব না।'
আমের বিন তুফাইল আবার বলল, 'হে মুহাম্মদ, আমি তোমার সাথে একান্তে কথা বলতে চাই।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবারও তার প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানালেন।'
এবার সে অবিরত বলতে লাগল, 'হে মুহাম্মদ, দাঁড়াও, আমি তোমার সাথে কথা বলব। হে মুহাম্মদ, দাঁড়াও, আমি তোমার সাথে কথা বলব।' শেষপর্যন্ত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে কথা বলার জন্য দাঁড়ালেন। তখন আমের বিন তুফাইল ইরবিদ নামের তার একসঙ্গীকে ডেকে কানে কানে বলল, 'আমি মুহাম্মদের সঙ্গে কথা বলব। তার মুখ তোমার থেকে অন্য দিকে ফিরিয়ে রাখব, আর তখন তুমি তলোয়ার দ্বারা তাকে আঘাত করবে।' ইরবিদ তলোয়ার হাতে প্রস্তুতি গ্রহণ করল।
তারপর দুজনে একটি দেয়ালের কাছে গেল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমেরের সাথে কথা বলার জন্য উভয়ের মাঝে গিয়ে দাঁড়ালেন। ইরবিদ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আঘাত করার ইচ্ছায় তলোয়ার হাতে নিল, কিন্তু যখনই সে তলোয়ার কোষমুক্ত করতে চায়, তার হাত অবশ হয়ে যায়। শেষপর্যন্ত তলোয়ার কোষমুক্ত করতেই পারল না।
অপর দিকে আমের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এটা-ওটা বলে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছিল, আর ঘুরে ঘুরে এদিক-সেদিক করে ইরবিদের দিকে তাকাচ্ছিল। ইরবিদ জড়পদার্থের ন্যায় জমাট বেঁধে স্থির দাঁড়িয়ে আছে, নড়াচড়াও করতে পারছে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরবিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হে আমের বিন তুফাইল, ইসলাম গ্রহণ করো।'
আমের বলল, 'হে মুহাম্মদ, ইসলাম গ্রহণ করলে তুমি আমাকে কী দেবে?'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'মুসলিমরা যা পাবে, তুমিও তাই পাবে। মুসলিমদের যেই সমস্যা হবে, সেই সমস্যা তোমারও হবে।'
আমের বলল, 'আমি যদি ইসলাম গ্রহণ করি, তা হলে তোমার মৃত্যুর পর কি রাজত্ব আমাকে দেবে?'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমার এবং তোমার কওমের জন্য এমন কিছু নেই।'
আমের বলল, 'তা হলে আমি এই শর্তে ইসলাম গ্রহণ করতে পারি যে, আমি গ্রামের রাজা হব আর তুমি হবে শহরের রাজা।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'না।'
তখন আমের রেগে গেল এবং তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। সে চিৎকার করে বলতে লাগল, 'হে মুহাম্মদ, আমি তোমার বিরুদ্ধে দ্রুতগামী ঘোড়া এবং শক্তিশালী মানুষের সমাবেশ ঘটাব। প্রতিটি খেজুরবাগানের সঙ্গে ঘোড়ার সংযোগ স্থাপন করব। তোমার বিরুদ্ধে গাতফান গোত্রের ১ হাজার স্বর্ণকেশী পুরুষ ও ১ হাজার স্বর্ণকেশী নারী নিয়ে যুদ্ধ করব।' তারপর তর্জনগর্জন করতে করতে সে বের হয়ে গেল।
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ, আমেরের ব্যাপারে তুমি আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাও এবং তার কওমকে হেদায়াত দান করো।'
আমের তার সাথিদের নিয়ে মদিনা থেকে বেরিয়ে গেল। দীর্ঘ সফরে সে ছিল ক্লান্ত। মদিনার বাইরে তার গোত্রের সালুলিয়া নামের একমহিলা থাকত। ঘোড়া থেকে নেমে মহিলার তাঁবুতে সে অবস্থান করল। রাতে সেখানেই ঘুমাল। ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ তার গলায় বড় এক ফোঁড়া উঠল। গলার ভেতর দিক থেকে তা ফুলে উঠল, যেমন উটের ঘাড়ের উপর ফোঁড়া উঠে উটকে মেরে ফেলে। সে আতঙ্কিত হয়ে ছটফট করতে লাগল। ঘোড়াকে বেদম প্রহার করে ঘোড়ার লাগাম ধরে সামনের দিকে চলতে লাগল। মারাত্মক ব্যথা তাকে অস্থির করে তুলেছিল। চিৎকার করে করে ঘাড় হাত দিয়ে মলতে মলতে বলল, 'হায়! এ তো উটের মতো বড় ফোঁড়া!' এই অবস্থাতেই ঘোড়া তাকে নিয়ে ঘুরছিল। ঘোড়ার উপরই মারা গিয়ে ঘোড়া থেকে সে মাটিতে পড়ল।
তার সাথিরা তাকে এভাবেই ফেলে রাখে। তারা নিজ গোত্রে ফিরে যায়। বাড়িতে প্রবেশ করার সময় ইরবিদকে লোকজন প্রশ্ন করল, 'হে ইরবিদ, তোমার পেছনে কী?'
ইরবিদ বলল, 'কিছুই নেই তো! আল্লাহর শপথ, মুহাম্মদ আমাদের একটি বস্তুর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছে। এখন আমার আকাঙ্ক্ষা হলো, যদি এখন সে আমার সামনে থাকত, তা হলে আমি তাকে হত্যা করা পর্যন্ত তির নিক্ষেপ করতেই থাকতাম।'
তার এই উক্তির দু-এক দিন পর একটি উট বিক্রির জন্য সে কোথাও যাচ্ছিল। আল্লাহ তাআলা তার উপর এবং উটের উপর অগ্নিবায়ু প্রেরণ করলেন। আগুন তাদের উভয়কে জ্বালিয়ে দিলো।
আল্লাহ তাআলা আমের ও ইরবিদের অবস্থা সম্পর্কে অবতীর্ণ করলেন- ‘তোমাদের মধ্যে কেউ গোপনে কথা বলুক বা তা সশব্দে প্রকাশ করুক, রাতের অন্ধকারে সে আত্মগোপন করুক বা প্রকাশ্য দিবালোকে বিচরণ করুক, সবই তাঁর নিকট সমান। তাঁর পক্ষ থেকে অনুসরণকারী রয়েছে তাদের অগ্রে এবং পশ্চাতে। আল্লাহর নির্দেশে তারা ওদের হেফাজত করে। আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ যখন কোনো জাতির উপর বিপদ দিতে চান, তখন তা ফিরে হবার নয় এবং তিনি ব্যতীত তাদের কোনো সাহায্যকারীও নেই। তিনিই তোমাদের বিদ্যুৎ দেখান ভয় ও আশার জন্য এবং উত্থিত করেন ঘন মেঘমালা। তাঁর প্রশংসা পাঠ করে বজ্র এবং সব ফেরেশতা, সভয়ে। তিনি বজ্রপাত করেন, অতঃপর যাকে ইচ্ছা তাকে তা দ্বারা আঘাত করেন। তথাপি তারা আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে, অথচ তিনি মহাশক্তিশালী।' [সুরা রাদ : ১০-১৩]
📄 মুশরিকদের সাক্ষ্য
মক্কা বিজয়ের পূর্বের ঘটনা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমরা পালন করার উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে যাত্রা করলেন। যখন তিনি হারাম শরিফে পৌঁছুলেন, তখন কুরাইশরা তাঁকে মসজিদে হারাম থেকে ফিরিয়ে দিতে দূত হিসেবে উরওয়া ইবনে মাসউদকে পাঠাল। সে এসে দেখল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসে আছেন। আর সাহাবিগণ তাঁর চারপাশে জড়ো হয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছেন। কথার মাঝে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই থুথু ফেলছিলেন, তখন তা কোনো সাহাবির হাতে পড়ছিল। সাহাবিগণ সে পবিত্র থুথু-মোবারক সুগন্ধি হিসেবে নিজেদের শরীর ও চেহারায় মেখে নিচ্ছিলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে যখন কোনো নির্দেশ দিতেন, তা পালনে সাহাবিগণ প্রতিযোগিতা শুরু করতেন। যখন তিনি অজু করতেন, অজুর পানি আনার জন্য সাহাবিদের মাঝে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যেত। যখন তিনি কথা বলতেন, সম্মানের আতিশয্যে নবিজির দিকে চোখ তুলে তাঁরা তাকাতেন না। উরওয়া যখন বিষয়টি প্রত্যক্ষ করল, তখন সে সাথিদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, 'হে আমার কওম, আল্লাহর শপথ, আমি অনেক প্রতাপশালী বাদশাহর দরবারে গিয়েছি, কিসরা, কায়সার এবং নাজাশির দরবারে গিয়েছি, কিন্তু কোনো বাদশাহকে তার সঙ্গীগণ এত বেশি সম্মান করতে দেখিনি; যতটা সম্মান মুহাম্মদকে তাঁর সাথি ও অনুসারীরা করে থাকে। তারা মুহাম্মদকে এতটা ভালোবাসে যে, তাদের প্রতিটি কাজেকর্মে তা স্পষ্ট ফুটে ওঠে।
একদিন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমার কাছে শুধু আমার সম্পদ ও সন্তানের চেয়ে অধিক প্রিয় নন; আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণকারী আল্লাহর শপথ, বরং আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়।'
একলোক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, কিয়ামত কখন হবে?' নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি কিয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ?' লোকটি বলল, 'আমি কিয়ামতের প্রস্তুতি হিসেবে খুব বেশি নামাজ, রোজা এবং প্রচুর পরিমাণ দান-সদকা করিনি ঠিক, তবে আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলকে অনেক ভালোবাসি।' তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ। তুমি যাকে ভালোবাসো তার সাথেই থাকবে।
সাহাবিগণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথা, 'তুমি যাকে ভালোবাসো তার সাথেই থাকবে' শুনে এতটাই খুশি হয়েছেন যে, এমন খুশি আর কখনো হননি। তাঁরা যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে চলতেন, সূর্যের তাপ থেকে ছায়া দিয়ে চলতেন; যেন রাসুলের গায়ে সূর্যের তাপ না লাগে। যখন তাঁর সাথে সফর করতেন, নবিজিকে ছায়াদার বৃক্ষের ছায়ায় বসাতেন, যেন তিনি আরাম করতে পারেন। তাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কতই-না ভালোবেসেছেন!
কিন্তু ভাবার বিষয় হলো, সাহাবিগণের হৃদয়ে নবিজির প্রতি এত ভালোবাসা, সম্মান-মর্যাদা, অনুসরণ-অনুকরণ, সীমাহীন ভক্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে উপরে উঠাননি, অথবা মানবীয় গুণের ঊর্ধ্বে মনে করেননি। তাঁরা বিশ্বাস করতেন ও বলতেন, 'মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ—তিনি আল্লাহর নবি ও রাসুল এবং তাঁরই বান্দা।' তবে হ্যাঁ, তিনি আদমসন্তানের সর্দার। হাশরের মাঠে সুপারিশকারী; কিন্তু তিনি তেমনই, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন— 'বলুন, আমি কেবল তোমাদের মতো একজন মানুষ। আমার কাছে অহি পাঠানো হয় যে, তোমাদের উপাস্য কেবল একক উপাস্য। অতএব, তোমরা তাঁর পথে দৃঢ়ভাবে অটল থাকো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, আর মুশরিকদের জন্য রয়েছে ধ্বংস।' [সুরা ফুসসিলাত : ৬]
সুতরাং তাঁর মানব হওয়াটা তাঁর সম্মানকে হ্রাস করবে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রতিপালকের রিসালাত পূর্ণরূপে পৌঁছে দিয়েছেন। সীমাহীন কষ্ট সহ্য করেছেন। এমনকি আল্লাহ তাআলা তাঁকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর দ্বীন পূর্ণ করেছেন।
অতএব, উম্মতের উপর রাসুলের হক কী? সেটা কি তার প্রশংসায় অতিরঞ্জন করা? না, কখনো না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন গর্হিত কাজ থেকে বারণ করেছেন। যেমন: সহিহ বুখারি ও মুসলিম-এ বর্ণিত আছে— 'আমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না; যেমন খ্রিষ্টানরা মরিয়ম-তনয় (ঈসা আ.)-কে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। আমি তো কেবল আল্লাহর বান্দা। অতএব, তোমরা বলো, মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।' [১]
উম্মতের উপর নবিজির হক কি তাঁকে নিয়ে মিলাদ মাহফিল করা? নাকি ইসরা-মিরাজ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর হক রয়েছে? না, কখনো না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কাজ থেকেও বারণ করেছেন। যেমন: সহিহ বুখারি ও মুসলিম-এ বর্ণিত আছে— 'যে ব্যক্তি (শরিয়তের নামে) এমন কোনো কাজ করল, যা আমার বিধিসম্মত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। [২]
উম্মতের উপর নবিজির হক কি বিপদে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সাহায্য চাওয়া? নাকি গাইরুল্লাহকে ডাকার মাঝে রাসুলের অধিকার নিহিত আছে? নাকি তাঁর কবর তাওয়াফ করার মাঝে এবং গাইরুল্লাহর নামে শপথ করার মাঝে? না, না, না, কখনো না; এর সবই আল্লাহর সঙ্গে শিরক।
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: ১১/২৬২।
২. সহিহ বুখারি: ২২/৩৩২; সহিহ মুসলিম: ৯/১১৯।
মক্কা বিজয়ের পূর্বের ঘটনা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমরা পালন করার উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে যাত্রা করলেন। যখন তিনি হারাম শরিফে পৌঁছুলেন, তখন কুরাইশরা তাঁকে মসজিদে হারাম থেকে ফিরিয়ে দিতে দূত হিসেবে উরওয়া ইবনে মাসউদকে পাঠাল। সে এসে দেখল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসে আছেন। আর সাহাবিগণ তাঁর চারপাশে জড়ো হয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছেন। কথার মাঝে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই থুথু ফেলছিলেন, তখন তা কোনো সাহাবির হাতে পড়ছিল। সাহাবিগণ সে পবিত্র থুথু-মোবারক সুগন্ধি হিসেবে নিজেদের শরীর ও চেহারায় মেখে নিচ্ছিলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে যখন কোনো নির্দেশ দিতেন, তা পালনে সাহাবিগণ প্রতিযোগিতা শুরু করতেন। যখন তিনি অজু করতেন, অজুর পানি আনার জন্য সাহাবিদের মাঝে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যেত। যখন তিনি কথা বলতেন, সম্মানের আতিশয্যে নবিজির দিকে চোখ তুলে তাঁরা তাকাতেন না।
উরওয়া যখন বিষয়টি প্রত্যক্ষ করল, তখন সে সাথিদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, 'হে আমার কওম, আল্লাহর শপথ, আমি অনেক প্রতাপশালী বাদশাহর দরবারে গিয়েছি, কিসরা, কায়সার এবং নাজাশির দরবারে গিয়েছি, কিন্তু কোনো বাদশাহকে তার সঙ্গীগণ এত বেশি সম্মান করতে দেখিনি; যতটা সম্মান মুহাম্মদকে তাঁর সাথি ও অনুসারীরা করে থাকে। তারা মুহাম্মদকে এতটা ভালোবাসে যে, তাদের প্রতিটি কাজেকর্মে তা স্পষ্ট ফুটে ওঠে।
একদিন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমার কাছে শুধু আমার সম্পদ ও সন্তানের চেয়ে অধিক প্রিয় নন; আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণকারী আল্লাহর শপথ, বরং আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়।'
একলোক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, কিয়ামত কখন হবে?'
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি কিয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ?'
লোকটি বলল, 'আমি কিয়ামতের প্রস্তুতি হিসেবে খুব বেশি নামাজ, রোজা এবং প্রচুর পরিমাণ দান-সদকা করিনি ঠিক, তবে আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলকে অনেক ভালোবাসি।'
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ. তুমি যাকে ভালোবাসো তার সাথেই থাকবে।
সাহাবিগণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথা, 'তুমি যাকে ভালোবাসো তার সাথেই থাকবে' শুনে এতটাই খুশি হয়েছেন যে, এমন খুশি আর কখনো হননি। তাঁরা যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে চলতেন, সূর্যের তাপ থেকে ছায়া দিয়ে চলতেন; যেন রাসুলের গায়ে সূর্যের তাপ না লাগে। যখন তাঁর সাথে সফর করতেন, নবিজিকে ছায়াদার বৃক্ষের ছায়ায় বসাতেন, যেন তিনি আরাম করতে পারেন। তাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কতই-না ভালোবেসেছেন!
কিন্তু ভাবার বিষয় হলো, সাহাবিগণের হৃদয়ে নবিজির প্রতি এত ভালোবাসা, সম্মান-মর্যাদা, অনুসরণ-অনুকরণ, সীমাহীন ভক্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে উপরে উঠাননি, অথবা মানবীয় গুণের ঊর্ধ্বে মনে করেননি। তাঁরা বিশ্বাস করতেন ও বলতেন, 'মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ—তিনি আল্লাহর নবি ও রাসুল এবং তাঁরই বান্দা।'
তবে হ্যাঁ, তিনি আদমসন্তানের সর্দার। হাশরের মাঠে সুপারিশকারী; কিন্তু তিনি তেমনই, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন— ‘বলুন, আমি কেবল তোমাদের মতো একজন মানুষ। আমার কাছে অহি পাঠানো হয় যে, তোমাদের উপাস্য কেবল একক উপাস্য। অতএব, তোমরা তাঁর পথে দৃঢ়ভাবে অটল থাকো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, আর মুশরিকদের জন্য রয়েছে ধ্বংস।’ [সুরা ফুসসিলাত : ৬]
সুতরাং তাঁর মানব হওয়াটা তাঁর সম্মানকে হ্রাস করবে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রতিপালকের রিসালাত পূর্ণরূপে পৌঁছে দিয়েছেন। সীমাহীন কষ্ট সহ্য করেছেন। এমনকি আল্লাহ তাআলা তাঁকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর দ্বীন পূর্ণ করেছেন।
অতএব, উম্মতের উপর রাসুলের হক কী? সেটা কি তার প্রশংসায় অতিরঞ্জন করা? না, কখনো না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন গর্হিত কাজ থেকে বারণ করেছেন। যেমন: সহিহ বুখারি ও মুসলিম-এ বর্ণিত আছে- لا تُظْرُونِي كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ . আমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না; যেমন খ্রিষ্টানরা মরিয়ম-তনয় (ঈসা আ.)-কে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। আমি তো কেবল আল্লাহর বান্দা। অতএব, তোমরা বলো, মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।
উম্মতের উপর নবিজির হক কি তাঁকে নিয়ে মিলাদ মাহফিল করা? নাকি ইসরা-মিরাজ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর হক রয়েছে? না, কখনো না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কাজ থেকেও বারণ করেছেন। যেমন: সহিহ বুখারি ও মুসলিম-এ বর্ণিত আছে- مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْসَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ . 'যে ব্যক্তি (শরিয়তের নামে) এমন কোনো কাজ করল, যা আমার বিধিসম্মত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।
উম্মতের উপর নবিজির হক কি বিপদে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সাহায্য চাওয়া? নাকি গাইরুল্লাহকে ডাকার মাঝে রাসুলের অধিকার নিহিত আছে? নাকি তাঁর কবর তাওয়াফ করার মাঝে এবং গাইরুল্লাহর নামে শপথ করার মাঝে? না, না, না, কখনো না; এর সবই আল্লাহর সঙ্গে শিরক।
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: ১১/২৬২।
২. সহিহ বুখারি: ২২/৩৩২; সহিহ মুসলিম: ৯/১১৯।