📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান > 📄 রমজানের শেষ সময়ে করণীয়

📄 রমজানের শেষ সময়ে করণীয়


দ্বিতীয় বিষয় এই যে, রমজান প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। মাত্র দু-একদিন বাকি আছে। এ সময় দুটি কাজ করণীয়।

প্রথম কাজ হচ্ছে আল্লাহর শোকর আদায় করা। এর শোকর করা যে, আল্লাহ তাআলা আপন ফজল ও করমে আমাদের রমজান নসিব করেছেন, রমজানের রোজা রাখার, রাতে তারাবির নামাজ আদায়ের তাওফিক দান করেছেন। আমাদের রোজা রাখা ও তারাবি আদায় আল্লাহ তাআলার তাওফিকেই, তার ফজল ও করমেই সম্পন্ন হয়েছে। অন্যথায় আল্লাহ মাফ করুন, কত মুসলিম পরিবার এমন আছে, যাদের এই খবরও নেই যে, রমজান কবে এসেছে, কবে গেছে। গাফলতের মাঝেই কেটে গেছে তাদের রমজান। না রোজার তাওফিক হয়েছে, না তারাবির; না দোয়ার তাওফিক হয়েছে, না তিলাওয়াতের। আল্লাহ হেফাজত করুন। আল্লাহ আমাদেরকে এ শ্রেণির লোকদের অন্তর্ভুক্ত না করুন।

সুতরাং এ বিষয়ে আল্লাহর শোকর করা কর্তব্য যে, আল্লাহ আমাদের সেসব লোকদের অন্তর্ভুক্ত না করে এমন লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যাদের ঘরে বাস্তবেই রমজান এসেছে।

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান > 📄 কোনো ইবাদতকে তুচ্ছজ্ঞান করতে নেই

📄 কোনো ইবাদতকে তুচ্ছজ্ঞান করতে নেই


অনেকে নিজের ইবাদতকে তুচ্ছরূপে তুলে ধরতে বিভিন্ন কথা বলে থাকে। অনেক সময় এ ক্ষেত্রে সীমা ছাড়িয়ে ফেলে এবং পরিণামে এমন কথা বলে বসে, যা আল্লাহ-প্রদত্ত তাওফিকের সুস্পষ্ট না-কদরি ও না-শোকরি।

আরে ভাই, আমরা আর কী রোজা রাখব! এ তো রোজা না, কিছুক্ষণ উপবাস থাকা মাত্র। রোজাই হয়নি!

আমরা আর কী নামাজ পড়েছি! নামাজ তো নয়, কিছুক্ষণ ওঠা-বসা, ঠোকর মারা!

এগুলো শোকরের কথা নয়, কৃতজ্ঞতার ভাষা নয়। আল্লাহ তাআলা যে আপন দয়া ও অনুগ্রহে তার দরবারে হাজিরির ও কপাল স্পর্শ করার তাওফিক দান করেছেন, সেজন্য প্রথমে শোকর তো আদায় করুন।

আলহামদুলিল্লাহ! আপনার কপাল তো স্পর্শ করেছে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবার! তুচ্ছ কোনো দরবার নয়! ইকবাল মরহুমের ভাষায়—

ইয়ে এক সিজদা জিসে তু গারা সমঝতা হ্যায়
হাজারো সিজদা সে দেতা হ্যায় আদমি কো নাজাত

স্রষ্টার তরে এই একটি সিজদা, যাকে তুমি ভাবছ তুচ্ছ-অতি তুচ্ছ, এত মুক্তি দেয় ইনসান ও ইনসানিয়াতকে হাজারো প্রণামের দাসত্ব হতে।

কবুল হোক না হোক, তারপরও ইবাদত করতে পারা আল্লাহর একটি নিয়ামত। এ সিজদার সম্পর্ক তো আপনার স্রষ্টার সঙ্গে, এ বিনয় তো আপনার রবের শানে। সুতরাং ইবাদতের তাওফিক তুচ্ছ কোনো বিষয় নয়। আল্লাহর এই নিয়ামতের, দয়া ও অনুগ্রহের শোকর আদায় করুন। অকৃতজ্ঞতাপূর্ণ মন্তব্য-উক্তি পরিহার করুন। আল্লাহ রোজা রাখার, তারাবি পড়ার, কুরআন তিলাওয়াত ও তাসবিহ-জিকিরের তাওফিক দিয়েছেন বলে শোকর-বাক্য উচ্চারণ করুন।

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান > 📄 শোকরের পাশাপাশি চাই ইস্তগফার

📄 শোকরের পাশাপাশি চাই ইস্তগফার


হ্যাঁ, এটি পূর্ণ বাস্তবতা যে, আমাদের কোনো ইবাদতই এমন নয়, যা পূর্ণ আদবের সঙ্গে, ভাব-গাম্ভীর্যের সঙ্গে, খুশু-খুজু ও বিনয়-নম্রতার সঙ্গে যেভাবে আদায় করা উচিত ছিল, সেভাবে আদায় হয়েছে। আল্লাহ তাআলার তাওফিক শামিলে হাল ছিল বলে ইবাদতের তাওফিক হয়েছে। কিন্তু আমাদের ত্রুটি ও ভুলও ছিল। সুতরাং প্রথম কর্তব্য শোকরের পর দ্বিতীয় কর্তব্য হচ্ছে ইসতেগফার।

একদিকে আল্লাহ পাকের তাওফিক দানের ওপর শোকর, অপরদিকে নিজের অলসতা, ত্রুটি ও ভুলের জন্য ইসতেগফার। আল্লাহর দরবারে দু- হাত প্রসারিত করে করজোরে নিবেদন করুন—

“হে আল্লাহ, আপন দয়া ও অনুগ্রহে আপনিই মাহে রমজান দান করেছেন, রোজা রাখার তাওফিক আপনিই দিয়েছেন, নামাজ পড়ার তাওফিক আপনিই দিয়েছেন, তিলাওয়াতের তাওফিকও আপনারই দান। হে আল্লাহ, এই সব নিয়ামতের জন্য আপনার শোকর আদায় করছি। কিন্তু এসব ইবাদতের কোনটিই আমরা হক আদায় করে করতে পারিনি। নামাজ যেরূপ খুশু-খুজুর সঙ্গে আদায় করা উচিত ছিল, আদায় করতে পারিনি। রোজার আদব বজায় রাখতে পারিনি। কুরআন তিলাওয়াতের হক আদায় করতে পারিনি। হে আল্লাহ, আমাদের এসব ত্রুটির কারণে আমরা আপনার দরবারে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি, ইসতেগফার করছি; আমাদের ভুল-ত্রুটি মার্জনা করুন।”

আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সুন্নাত হলো, বান্দা যখন কোনো নেক আমল করার পর ইসতেগফার করে, কায়মনোবাক্যে উচ্চারণ করে—হে আল্লাহ, আমি আবদিয়াত ও দাসত্বের দাবি আদায় করতে পারিনি; তখন আল্লাহ তার সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি মার্জনা করেন এবং আপন দয়া ও অনুগ্রহে তার সকল ইবাদত কবুল করে নেন।

দেখুন, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিন বান্দাদের গুণ-বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন—

﴿كَانُوا قَلِيلًا مِنَ الَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ ﴾

তারা রাতের অল্প সময়ই ঘুমাত। [সুরা যারিয়াত: ১৭]

তারা রাতে কম ঘুমায়। রাতের অধিকাংশ সময় আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান থাকে, আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহর জিকির করে। তাদের পার্শ্বদেশ পৃথক থাকে শয্যা হতে, রাতের সিংহভাগ কাটে স্রষ্টার সকাশে; জায়নামাজে সিজদার চিহ্ন এঁকে।

এর পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

(وَبِالْأَسْحَارِ হُمْ يَسْتَغْفِرُونَ )

এবং তারা সাহরির সময় ইসতেগফার করত। [সুরা যারিয়াত: ১৮]

সারা রাত আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান থাকার পর, ইবাদতে নিমগ্ন থাকার পর যখন সুবহে সাদিকের সময় ঘনিয়ে আসে, তখন তারা আল্লাহর দরবারে ইসতেগফার করে।

হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাযি. নবীজিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'আল্লাহর রাসুল, সে তো সারা রাত ইবাদত করেছে, সে কেন ইসতেগফার করবে?!'

ইসতেগফার তো করা হয় কোনো গুনাহ করা হলে। এই ইবাদতগুজার বান্দা কোন গুনাহ হতে তাওবা-ইসতেগফার করবে?

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন, 'রাতভর সে যে ইবাদত করেছে, তাতে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে গেছে, তার জন্য ইসতেগফার করবে।'

কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে এভাবেই আমাদেরকে মৌলিক একটি আদব শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আর এতে কল্যাণও আমাদের। আদবটি হলো, যখনই আল্লাহ পাক কোনো ইবাদত করার তাওফিক দান করেন, তারপরই দুটি কাজ করো। এক. ইবাদতের তাওফিক হওয়ায় আল্লাহর শোকর করো। দুই. নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য ইসতেগফার করো।

এভাবে প্রতিটি ইবাদতের পর শোকর ও ইসতেগফার করে নিলে আশা করা যায়, আল্লাহ আপন দয়া ও অনুগ্রহে আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দিয়ে ইবাদতসমূহ কবুল করে নেবেন।

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান > 📄 বাকি মুহূর্তগুলোও কাজে লাগান

📄 বাকি মুহূর্তগুলোও কাজে লাগান


আপনাদের উদ্দেশে দ্বিতীয় নিবেদন এই যে, রমজানুল মোবারকের বরকতপূর্ণ সময় শেষ হওয়ার পথে। দেড়-দুইদিন মাত্র বাকি আছে। এই বাকি সময়টুকুর গুরুত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি করা উচিত। এ মহামূল্যবান সময়কে গনিমত মনে করা উচিত। পেছনের সাতাশ-আটাশ দিন যেভাবেই কাটিয়ে থাকি, কিছু ইবাদতের তাওফিক হয়তো হয়েছে, হয়তো গাফলতিও হয়েছে, কিন্তু আল্লাহ পাকের মাগফিরাত ও ক্ষমার দরজা এখনও খোলা আছে। আল্লাহ তাআলা তাওফিক দিলে সামান্য সময়েও মানুষের জীবনের গতিপথ বদলে যেতে পারে। তাই পেছনের গাফলতির কথা ভুলে যান, সামনের এই মহামূল্যবান মুহূর্তগুলো কাজে লাগান। আল্লাহর দরজা এখনও খোলা। আল্লাহ তো কুরআনে বলেছেন—

﴿يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا

হে মুমিনগণ, আল্লাহর কাছে আন্তরিক তাওবা করো। [সুরা তাহরীম: ৮]

আল্লাহু আকবার! অনুগ্রহের কী চমৎকার প্রকাশভঙ্গি! আল্লাহ যেন বলছেন, তাওবার দরজা সর্বদা খোলা। চব্বিশ ঘণ্টা খোলা। তোমার জীবনে অন্তিম মুহূর্ত আসার পূর্ব পর্যন্ত খোলা। সুতরাং যখনই কোনো সতর্কবাণী শোনো, ফিরে এসো আমার দিকে।

বাজ আ বাজ আ চে হাস্তি বাজ আ
গর কাফরো বুত পরস্তি বাজ আ
ইন দরগাহ মা দরগাহ না উমিদ নিস্ত
সদ বার তওবা শিকস্তি বাজ আ

এ পয়গাম আল্লাহর পক্ষ থেকে! ফিরে এসো, বান্দা! ফিরে এসো। যা কিছু হোক, যত কিছু হোক, ফিরে এসো আমার কাছে। যদি কাফিরও হও, করে থাক কুফরি, কিংবা হও পৌত্তলিক, করে থাক মূর্তিপূজা; তারপরও ফিরে এসো আমার কাছে। তাওবা করে নাও। আমার এই দরবার নিরাশ হয়ে ফিরে যাওয়ার দরবার নয়। শতবার তাওবা করেছ, শতবারই ভেঙেছ, তবুও ফিরে এসো!

এ তো এক হাদিসের মর্মকথা, যাতে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

«مَا أَصَرَّ مَنِ اسْتَغْفَرَ، وَإِنْ عَادَ فِي الْيَوْمِ سَبْعِينَ مَرَّةٍ»

যে ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে তাওবা করতে থাকে, নিজের গুনাহর জন্য ক্ষমা চাইতে থাকে, আল্লাহ তাকে গুনাহর কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না; যদিও সে দিনে সত্তরবার তাওবা থেকে ফিরে আসে।³⁷

বান্দা যদি কায়মনোবাক্যে হাত তুলে বলে, হে আল্লাহ! আমি কমজোর, আমি দুর্বল; শয়তান ও নফসের প্ররোচনায় গুনাহ করে ফেলেছি। হে আল্লাহ, আপনি দয়া করে মায়া করে ক্ষমা করে দিন। আমি ভবিষ্যতের জন্য ওয়াদা করছি, আর গুনাহর পথে ফিরে যাব না।

এভাবে তাওবা করতে পারলে আল্লাহ তার দোয়া প্রত্যাখ্যান করবেন না; বরং তাকে ক্ষমা করে দেবেন।

'শতবার তাওবা ভঙ্গ করেছ; তবুও ফিরে এসো'- এমন করুণাপূর্ণ আহ্বান আর কোনো দরবারে আছে?! এ তো কেবল রহমানের দরবারেরই আহ্বান!

আল্লাহর দরবার হতে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। দয়াময় আল্লাহ তো গুনাহগার বান্দাদের ডেকে বলছেন-

قُلْ يُعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ )

বলে দাও, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজ সত্তার ওপর সীমালঙ্ঘন করেছে, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সুরা যুমার: ৫৩]

টিকাঃ
৩৭. ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৩৫৫৯ ও ইমাম আবু দাউদ, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ১৫১৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00