📄 জুমাতুল বিদার হাকিকত
প্রথম কথা এই যে, এই জুমাকে অর্থাৎ রমজানের শেষ জুমাকে পাক- ভারত উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে জুমাতুল বিদা বা বিদায়ী জুমা বলা হয়। জনসমাজে জুমাতুল বিদা সম্পর্কে বিভিন্ন ফাজায়িলের কথাও প্রচলিত আছে।
প্রথমেই এ বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, এই নাম অর্থাৎ ‘জুমাতুল বিদা’ আমি উপমহাদেশের বাইরে অন্য কোথাও শুনিনি। আরব দেশসমূহ বা অন্য কোথাও এভাবে এ দিনকে কোনো নামকরণ করা হয় না। দ্বিতীয়ত এ দিন সম্পর্কে লোকমুখে যেসব বর্ণনা প্রচলিত আছে, যেমন এ দিনকে বিশেষ ইবাদতের দিন হিসেবে গণ্য করা, বিশেষ পদ্ধতিতে ইবাদত করা, কোনো দোয়াকে এ দিনের স্বতন্ত্র দোয়া মনে করা—এসব একটিও সঠিক নয়।
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না কোথাও ‘জুমাতুল বিদা’ শব্দ ব্যবহার করেছেন, না এ দিনের জন্য বিশেষ কোনো ইবাদত নির্ধারণ করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম রাযি.-ও এ দিনের জন্য বিশেষ কোনো ইবাদত নির্ধারণ করেননি। তারা পরবর্তী উম্মতের উদ্দেশে এ বার্তা পৌঁছিয়ে দেননি যে, ভাই, এ দিন এই ইবাদত করতে হবে, এই পদ্ধতিতে জুমাতুল বিদার নামাজ পড়তে হবে, অমুক দোয়া করতে হবে, অমুক সুরা পড়তে হবে; যেমনটি লোকমুখে প্রচলিত আছে। অর্থাৎ এসব বিষয় কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।
অবশ্য এই দৃষ্টিতে এ দিনের গুরুত্ব অবশ্যই অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি যে, এটি মহিমান্বিত মাস রমজানের একটি দিন; রমজানের দিনগুলোর মধ্যেও জুমার দিন, আবার এমন জুমার দিন যে, এরপর এ বছরের রমজানে আর কোনো জুমা আসবে না। এরপর আর এ বছর এ ধরনের বরকতপূর্ণ রমজানের বরকতপূর্ণ জুমার দিন নসিব হবে না। এসব বিবেচনায় অবশ্যই এটি বরকতপূর্ণ একটি দিন। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো ব্যক্তি যদি এ দিনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে; কৃত গুনাহের জন্য ইসতেগফার ও ক্ষমাপ্রার্থনা করে, ভবিষ্যতের কল্যাণকর জীবনের জন্য দোয়া করে, তাহলে তা বৈধ। কিন্তু বিশেষ কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করবে না।
📄 রমজানের শেষ সময়ে করণীয়
দ্বিতীয় বিষয় এই যে, রমজান প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। মাত্র দু-একদিন বাকি আছে। এ সময় দুটি কাজ করণীয়।
প্রথম কাজ হচ্ছে আল্লাহর শোকর আদায় করা। এর শোকর করা যে, আল্লাহ তাআলা আপন ফজল ও করমে আমাদের রমজান নসিব করেছেন, রমজানের রোজা রাখার, রাতে তারাবির নামাজ আদায়ের তাওফিক দান করেছেন। আমাদের রোজা রাখা ও তারাবি আদায় আল্লাহ তাআলার তাওফিকেই, তার ফজল ও করমেই সম্পন্ন হয়েছে। অন্যথায় আল্লাহ মাফ করুন, কত মুসলিম পরিবার এমন আছে, যাদের এই খবরও নেই যে, রমজান কবে এসেছে, কবে গেছে। গাফলতের মাঝেই কেটে গেছে তাদের রমজান। না রোজার তাওফিক হয়েছে, না তারাবির; না দোয়ার তাওফিক হয়েছে, না তিলাওয়াতের। আল্লাহ হেফাজত করুন। আল্লাহ আমাদেরকে এ শ্রেণির লোকদের অন্তর্ভুক্ত না করুন।
সুতরাং এ বিষয়ে আল্লাহর শোকর করা কর্তব্য যে, আল্লাহ আমাদের সেসব লোকদের অন্তর্ভুক্ত না করে এমন লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যাদের ঘরে বাস্তবেই রমজান এসেছে।
📄 কোনো ইবাদতকে তুচ্ছজ্ঞান করতে নেই
অনেকে নিজের ইবাদতকে তুচ্ছরূপে তুলে ধরতে বিভিন্ন কথা বলে থাকে। অনেক সময় এ ক্ষেত্রে সীমা ছাড়িয়ে ফেলে এবং পরিণামে এমন কথা বলে বসে, যা আল্লাহ-প্রদত্ত তাওফিকের সুস্পষ্ট না-কদরি ও না-শোকরি।
আরে ভাই, আমরা আর কী রোজা রাখব! এ তো রোজা না, কিছুক্ষণ উপবাস থাকা মাত্র। রোজাই হয়নি!
আমরা আর কী নামাজ পড়েছি! নামাজ তো নয়, কিছুক্ষণ ওঠা-বসা, ঠোকর মারা!
এগুলো শোকরের কথা নয়, কৃতজ্ঞতার ভাষা নয়। আল্লাহ তাআলা যে আপন দয়া ও অনুগ্রহে তার দরবারে হাজিরির ও কপাল স্পর্শ করার তাওফিক দান করেছেন, সেজন্য প্রথমে শোকর তো আদায় করুন।
আলহামদুলিল্লাহ! আপনার কপাল তো স্পর্শ করেছে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবার! তুচ্ছ কোনো দরবার নয়! ইকবাল মরহুমের ভাষায়—
ইয়ে এক সিজদা জিসে তু গারা সমঝতা হ্যায়
হাজারো সিজদা সে দেতা হ্যায় আদমি কো নাজাত
স্রষ্টার তরে এই একটি সিজদা, যাকে তুমি ভাবছ তুচ্ছ-অতি তুচ্ছ, এত মুক্তি দেয় ইনসান ও ইনসানিয়াতকে হাজারো প্রণামের দাসত্ব হতে।
কবুল হোক না হোক, তারপরও ইবাদত করতে পারা আল্লাহর একটি নিয়ামত। এ সিজদার সম্পর্ক তো আপনার স্রষ্টার সঙ্গে, এ বিনয় তো আপনার রবের শানে। সুতরাং ইবাদতের তাওফিক তুচ্ছ কোনো বিষয় নয়। আল্লাহর এই নিয়ামতের, দয়া ও অনুগ্রহের শোকর আদায় করুন। অকৃতজ্ঞতাপূর্ণ মন্তব্য-উক্তি পরিহার করুন। আল্লাহ রোজা রাখার, তারাবি পড়ার, কুরআন তিলাওয়াত ও তাসবিহ-জিকিরের তাওফিক দিয়েছেন বলে শোকর-বাক্য উচ্চারণ করুন।
📄 শোকরের পাশাপাশি চাই ইস্তগফার
হ্যাঁ, এটি পূর্ণ বাস্তবতা যে, আমাদের কোনো ইবাদতই এমন নয়, যা পূর্ণ আদবের সঙ্গে, ভাব-গাম্ভীর্যের সঙ্গে, খুশু-খুজু ও বিনয়-নম্রতার সঙ্গে যেভাবে আদায় করা উচিত ছিল, সেভাবে আদায় হয়েছে। আল্লাহ তাআলার তাওফিক শামিলে হাল ছিল বলে ইবাদতের তাওফিক হয়েছে। কিন্তু আমাদের ত্রুটি ও ভুলও ছিল। সুতরাং প্রথম কর্তব্য শোকরের পর দ্বিতীয় কর্তব্য হচ্ছে ইসতেগফার।
একদিকে আল্লাহ পাকের তাওফিক দানের ওপর শোকর, অপরদিকে নিজের অলসতা, ত্রুটি ও ভুলের জন্য ইসতেগফার। আল্লাহর দরবারে দু- হাত প্রসারিত করে করজোরে নিবেদন করুন—
“হে আল্লাহ, আপন দয়া ও অনুগ্রহে আপনিই মাহে রমজান দান করেছেন, রোজা রাখার তাওফিক আপনিই দিয়েছেন, নামাজ পড়ার তাওফিক আপনিই দিয়েছেন, তিলাওয়াতের তাওফিকও আপনারই দান। হে আল্লাহ, এই সব নিয়ামতের জন্য আপনার শোকর আদায় করছি। কিন্তু এসব ইবাদতের কোনটিই আমরা হক আদায় করে করতে পারিনি। নামাজ যেরূপ খুশু-খুজুর সঙ্গে আদায় করা উচিত ছিল, আদায় করতে পারিনি। রোজার আদব বজায় রাখতে পারিনি। কুরআন তিলাওয়াতের হক আদায় করতে পারিনি। হে আল্লাহ, আমাদের এসব ত্রুটির কারণে আমরা আপনার দরবারে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি, ইসতেগফার করছি; আমাদের ভুল-ত্রুটি মার্জনা করুন।”
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সুন্নাত হলো, বান্দা যখন কোনো নেক আমল করার পর ইসতেগফার করে, কায়মনোবাক্যে উচ্চারণ করে—হে আল্লাহ, আমি আবদিয়াত ও দাসত্বের দাবি আদায় করতে পারিনি; তখন আল্লাহ তার সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি মার্জনা করেন এবং আপন দয়া ও অনুগ্রহে তার সকল ইবাদত কবুল করে নেন।
দেখুন, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিন বান্দাদের গুণ-বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন—
﴿كَانُوا قَلِيلًا مِنَ الَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ ﴾
তারা রাতের অল্প সময়ই ঘুমাত। [সুরা যারিয়াত: ১৭]
তারা রাতে কম ঘুমায়। রাতের অধিকাংশ সময় আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান থাকে, আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহর জিকির করে। তাদের পার্শ্বদেশ পৃথক থাকে শয্যা হতে, রাতের সিংহভাগ কাটে স্রষ্টার সকাশে; জায়নামাজে সিজদার চিহ্ন এঁকে।
এর পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
(وَبِالْأَسْحَارِ হُمْ يَسْتَغْفِرُونَ )
এবং তারা সাহরির সময় ইসতেগফার করত। [সুরা যারিয়াত: ১৮]
সারা রাত আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান থাকার পর, ইবাদতে নিমগ্ন থাকার পর যখন সুবহে সাদিকের সময় ঘনিয়ে আসে, তখন তারা আল্লাহর দরবারে ইসতেগফার করে।
হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাযি. নবীজিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'আল্লাহর রাসুল, সে তো সারা রাত ইবাদত করেছে, সে কেন ইসতেগফার করবে?!'
ইসতেগফার তো করা হয় কোনো গুনাহ করা হলে। এই ইবাদতগুজার বান্দা কোন গুনাহ হতে তাওবা-ইসতেগফার করবে?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন, 'রাতভর সে যে ইবাদত করেছে, তাতে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে গেছে, তার জন্য ইসতেগফার করবে।'
কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে এভাবেই আমাদেরকে মৌলিক একটি আদব শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আর এতে কল্যাণও আমাদের। আদবটি হলো, যখনই আল্লাহ পাক কোনো ইবাদত করার তাওফিক দান করেন, তারপরই দুটি কাজ করো। এক. ইবাদতের তাওফিক হওয়ায় আল্লাহর শোকর করো। দুই. নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য ইসতেগফার করো।
এভাবে প্রতিটি ইবাদতের পর শোকর ও ইসতেগফার করে নিলে আশা করা যায়, আল্লাহ আপন দয়া ও অনুগ্রহে আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দিয়ে ইবাদতসমূহ কবুল করে নেবেন।