📄 রমজানের আলোকেই গড়ে তুলি আগামীর জীবন
দ্বিতীয় নিবেদন এই যে, আসুন প্রতিজ্ঞা করি আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বিধি-বিধানের আলোকে গড়ে তুলব। আল্লাহ তাআলার দয়া ও অনুগ্রহে রমজান মাসে প্রত্যেকেরই কিছু ইবাদত করার তাওফিক হয়, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক হয়। এখন আরেকটু অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করি। আল্লাহ মাফ করুন, এমন যেন না হয় যে, রমজানও শেষ হলো, ঈমানও বিদায় নিল। এমন যেন না হয় যে, রমজানও শেষ হলো, নেক আমলের জজবা ও স্পৃহাও বিদায় নিল। রমজানের পরও যেন নেক আমলের এই স্পৃহা, গুনাহ পরিত্যাগের এই জজবা বাকি থাকে এই প্রতিজ্ঞা করে আমরা এ মজলিস ত্যাগ করব।
📄 আমার দৃষ্টিতে এই অধঃপতনের কারণ
আজ আমরা মুসলমানরা যে বিপদ ও দুর্যোগে আক্রান্ত, আমার দৃষ্টিতে তার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে হারাম সম্পদ ভক্ষণ। ঘুষ, সুদ, অন্যায় পন্থায় অর্জিত সম্পদ, ধোঁকার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ। যে যেভাবে পারছে, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করছে। এই হারাম ভক্ষণের শাস্তি আল্লাহ আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। আজ শবে কদরের এই মোবারক ক্ষণে আসুন সকলে প্রতিজ্ঞা করি, কখনো কোনো হারাম লোকমা মুখে দেবো না। সততার সঙ্গে হালাল পন্থায় যা অর্জিত হয়, তাতেই তুষ্ট ও সন্তুষ্ট থাকব। হারামের পথ যতই আকর্ষণীয় হোক, সম্পদ যত অধিকই হোক, নির্দ্বিধায় তা প্রত্যাখ্যান করব। আজ রাতে আল্লাহর কাছে তাওফিকও চাইব, তিনি যেন আমাদেরকে হারাম থেকে বেঁচে থাকার এবং হালালে তুষ্ট থাকার শক্তি দান করেন।
যদি আমরা এ কাজগুলো করতে পারি, তাহলে আমরা রমজানের ফায়েদা ও কল্যাণ, বরকত ও ফয়জান এবং নুর ও আলোকচ্ছটা লাভ করতে পারব, ইনশাআল্লাহ। আর যদি এভাবেই রমজান কেটে যায়, সাতাশ রমজান চলে গেল, কুরআন খতম হলো, দোয়া হলো, এরপর জীবনের সেই পূর্বের গতিধারা, আগের মতো হারাম কামাই, আগের মতো দ্বীনি বিষয়ে গাফলত, তাহলে তা হবে আল্লাহর সঙ্গে প্রতারণা। আল্লাহ মাফ করুন, এমন ভুল করবেন না। আসুন, আল্লাহর দরবারে হাজির হয়ে নিষ্ঠাপূর্ণ অন্তরে তাওবা করি এবং ভবিষ্যৎ জীবনকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার প্রতিজ্ঞা করে এ মজলিস থেকে উঠি। তাহলে ইনশাআল্লাহ, বাস্তবে এ রাত কল্যাণ, রহমত ও বরকতের রাতে পরিণত হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।
📄 দোয়া করার আদবও দোয়া করে চাইতে হবে!
এখন আমরা দোয়া করব। দোয়ার আদব হচ্ছে আল্লাহ অবশ্যই কবুল করবেন—এই বিশ্বাস নিয়ে দোয়া করা। দোয়া কবুল হওয়ার অনেকগুলো কার্যকারণ আজকের রাতে একত্র হয়েছে। তাই আমরা বড় আশাবাদী যে, আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করবেন।
বাস্তবতা তো এই যে, আমাদের দোয়া করার যোগ্যতাও নেই। আল্লাহ আপন দয়া ও রহমতে তাওফিক দিলেই কেবল দোয়া সম্ভব। দোয়া কীভাবে করব, আল্লাহর কাছে কী প্রার্থনা করব— তাও আমরা জানি না। স্বয়ং নবীয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কাছে এই দোয়া করেছেন—
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَ الْمَسْأَلَةِ، وَخَيْرَ الدُّعَاءِ، وَخَيْرَ النَّجَاحِ، وَخَيْرَ الْعَمَلِ، وَخَيْرَ الثَّوَابِ، وَخَيْرَ الْحَيَاةِ، وَخَيْرَ الْمَمَاتِ ....»
হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে সর্বোত্তম প্রার্থনা, সর্বোত্তম দোয়া, সর্বোত্তম সফলতা, সর্বোত্তম আমল, সর্বোত্তম সাওয়াব, সর্বোত্তম জীবন ও সর্বোত্তম মরণের (তাওফিক) চাচ্ছি।³⁶
হাকিমুল উম্মত হজরত থানবি রহ.-এর বিশিষ্ট খলিফা হজরত খাজা আজিজুল হাসান মজযুব রহ.-এর ঘটনা। তিনি বলেন, একদিন হজরত থানবি রহ. বয়ানে বললেন, আল্লাহর মুহাব্বত ও ভালোবাসা সকল সৎ- কর্মের ভিত্তি। সুতরাং সবকিছু তার কাছেই চাও। আল্লাহ তাআলার দিতে কোনো কার্পণ্য নেই; কিন্তু চাইতে তো হবে। আল্লাহর দরবারে ঝুলি তো পাততে হবে।
খাজা আজিজুল হাসান মজযুব রহ. বলেন, এ কথা শোনার পর আমি হাকিমুল উম্মত রহ.-কে প্রশ্ন করলাম, ‘হজরত, কোনো ব্যক্তির কাছে যদি পাতার ঝুলিই না থাকে, তাহলে সে কী করবে?!’ অর্থাৎ কীভাবে চাইতে হবে, তাই যদি জানা না থাকে, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার ভাবই যদি সৃষ্টি না হয়, তাহলে কী করবে? উত্তরে হজরত থানবি রহ. বললেন,
'ঝুলিও তার কাছ থেকেই চাইতে হবে। আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে, হে আল্লাহ, আমি অভাগা কীভাবে আপনার কাছে চাইতে হয়, কীভাবে দোয়া করতে হয়, তাও জানি না। আপনি দয়া করে আপনার রহমত দ্বারা আমাকে দোয়া করার তাওফিক দিয়ে দিন।' সুতরাং দোয়ার শুরুতেই আমরা নবীজির শিক্ষা দেওয়া এই দোয়া করব-
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَ الْمَسْأَلَةِ، وَخَيْرَ الدُّعَاءِ ....
এরপর প্রথমে আমরা মাছুর (কুরআন-হাদিসে বর্ণিত) দোয়াসমূহ করব। তারপর নিজের প্রয়োজনের জন্য দোয়া করব। সবশেষে পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করব। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
৩৬. হাকিম, আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, ১/৫২০, তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস নং ৭১৭ ও আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস নং ৬২১৮।