📄 কুরআন মুসলমানের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ
আজ আল্লাহ পাক আমাদের তারাবিতে কুরআন খতমের তাওফিক দান করলেন। কিন্তু দেখুন, সুরা নাস তিলাওয়াত করে খতম শেষ করার পর আজকের তারাবিতেই পুনরায় সুরা বাকারা শুরু করে প্রথম তিন আয়াত তিলাওয়াত করা হয়েছে। এটি একটি মুতাওয়ারিস ও যুগ পরম্পরায় চলে আসা আমল। এক হাদিসে কুরআন তিলাওয়াতকারীকে এই আদব শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। একবার জনৈক সাহাবি নবীজিকে প্রশ্ন করলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ পাকের নিকট সর্বোত্তম আমল কোনটি?' নবীজি উত্তর দিলেন—
«الْحَالُ الْمُرْتَحِلُ» প্রত্যাবর্তন করা ও পুনরায় রওনা করা।
সাহাবি এবার জিজ্ঞেস করলেন, প্রত্যাবর্তন করা ও পুনরায় রওনা করার অর্থ কী?
নবীজি উত্তর দিলেন—
«الَّذِي يَضْرِبُ مِنْ أَوَّلِ الْقُرْآنِ إِلَى آخِرِهِ كُلَّمَا حَلَّ ارْتَحَلَ» যে ব্যক্তি কুরআনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করে। যখনই শেষ করে, পুনরায় শুরু করে।³⁵
অর্থাৎ এমনভাবে কুরআন তিলাওয়াত করো যেমন কোনো ব্যক্তি সফর থেকে প্রত্যাবর্তন ঘোড়া থেকে অবতরণ করল; এরপর সঙ্গে সঙ্গেই অন্য সফরের জন্য প্রস্তুত হয়ে রওনা হয়ে গেল।
কুরআন শরিফ খতম করে রেখে দেওয়ার বস্তু নয়। কুরআন তো সেই মহাগ্রন্থ, যার পেছনে জিন্দেগি শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু তিলাওয়াত শেষ হবে না।
সুতরাং আজকের এই মজলিস থেকে আমরা এই শিক্ষা অর্জন করব যে, আমাদের কুরআন তিলাওয়াত দ্বিতীয়বার শুরু হয়ে গেছে। এখন তা জারি রাখতে হবে। প্রত্যেক মুসলমানের প্রতি পবিত্র কুরআনের এই হক রয়েছে যে, সে প্রতিদিন ভোরে কুরআনের কিছু অংশ তিলাওয়াত না করে অন্য কোনো কাজ শুরু করবে না। একসময় তো মুসলিম উম্মাহর অবস্থা এমন ছিল যে, কোনো মুসলিম বসতি অতিক্রম করলে প্রতিটি ঘর হতে কুরআন তিলাওয়াতের ধ্বনি ভেসে আসত। আফসোস! আজ তেমন পরিবেশ কোথাও দৃষ্টিগোচর হয় না। আল্লাহর ওয়াস্তে সেই পরিবেশ জিন্দা করতে চেষ্টা করুন।
টিকাঃ
৩৫. ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৯৪৮। ইবনুল জাযারি রহ., ইমাম নববি রহ. ও ইমাম সুয়ুতি রহ.-সহ অনেকেই আমলটিকে মুতাওয়ারিস ও মুসতাহাব আমল বলেছেন।
📄 শাইখুল হিন্দের দৃষ্টিতে মুসলিম উম্মাহর দুর্গতির কারণ
আজ মুসলিম উম্মাহর এই যে দুর্গতি ও অবনতি, দুর্যোগ ও দুর্বিপাক এর বুনিয়াদি ও মৌলিক কারণ কী? আব্বাজান রহ.-এর মুখে শুনেছি, হজরত শাইখুল হিন্দ রহ.-এর মতে এর মৌলিক কারণ দুটি। এক. মুসলমানদের কুরআন হতে দূরে সরে যাওয়া। দুই. নিজেদের পারস্পরিক বিবাদ-বিসংবাদ, বিভেদ ও বিভক্তি।
এ দুটি মুসলমানদের পতন ও অধঃপতনের মূল কার্যকারণ। শাইখুল হিন্দ রহ. জীবনসায়াহ্নে যখন বন্দি ছিলেন মাল্টার জিন্দানখানায়, তখন নির্জনে দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন।
আশি বছরের বয়োবৃদ্ধ এক মনীষী তার অভিজ্ঞতার নির্যাস আমাদের সামনে পেশ করেছেন যে, মুসলমানদের দুরবস্থার মৌলিক কারণ দুটি। মুসলমানদের কুরআন ছেড়ে দেওয়া এবং পারস্পরিক বিবাদ-বিসংবাদ, বিভেদ ও বিভক্তি, একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, জাতিগত-গোষ্ঠীগত বিদ্বেষ। এসবের কারণেই আমাদের ওপর বিভিন্ন দুর্যোগ আপতিত হয়েছে।
সুতরাং আপনাদের উদ্দেশে প্রথম নিবেদন এই যে, আসুন, আজকের এই মজলিস থেকেই সকলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, পবিত্র কুরআনকে আমরা আমাদের দৈনন্দিন সূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে নেব।
📄 প্রতিটি মুসলমানের প্রতি আল-কুরআনের তিনটি দাবি
প্রতিটি মুসলমানের প্রতি কুরআন মাজিদের তিনটি হক ও দাবি রয়েছে।
এক. কুরআন তিলাওয়াত। তিলাওয়াত একটি স্বতন্ত্র ইবাদত, স্বতন্ত্র নেকি ও সাওয়াবের মাধ্যম এবং স্বতন্ত্র বরকতের উসিলা। প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য, প্রতিদিন সকালে কিছুক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত করে এরপর দৈনন্দিন কাজ শুরু করা। প্রতিদিন সামান্য হলেও তিলাওয়াত করা—এক পারা, আধা পারা, সোয়া পারা যতটুকু তাওফিক হয় তিলাওয়াতের মামুল ও নিয়ম বানিয়ে নিন।
কুরআনুল কারিমের দ্বিতীয় হক হচ্ছে কুরআন বোঝার চেষ্টা করা। আলহামদুলিল্লাহ, নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে কুরআনের বিভিন্ন তরজমা ও তাফসির-গ্রন্থ ইতিমধ্যে ছেপে প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভব হলে কোনো নির্ভরযোগ্য আলিমের কাছে পড়ুন। সম্ভব না হলে নির্ভরযোগ্য কোনো তাফসিরগ্রন্থ ঘরে রেখে প্রতিদিন কিছু কিছু অধ্যয়ন করুন। আল্লাহ শোকর, আমার মুহতারাম আব্বাজানের হাতে আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনের অত্যন্ত সহজবোধ্য তাফসির 'তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন' সংকলন করিয়েছেন। বেশ দীর্ঘ কলেবরের তাফসিরগ্রন্থ। অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামেরও বিভিন্ন কিতাব প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিদিন এসব তাফসিরগ্রন্থ হতে কিছু কিছু অধ্যয়ন করুন।
এমন যেন না হয় যে, একটি কুরআন তরজমা কিনে বইয়ের তাকে রেখে দিলাম কিংবা মাঝে মধ্যে বিশেষ কোনো বিষয় জানার জন্য তা খুলে দেখলাম। বরং আমরা প্রতিদিন কিছু অংশ অধ্যয়নের অভ্যাস গড়ে তুলব, ইনশাআল্লাহ।
কুরআনুল কারিমের তৃতীয় হক হলো কুরআনের বিধান অনুযায়ী আমল করা। নিজে আমল সংশোধনের জন্য চেষ্টা করা, আল্লাহর কাছে তাওফিকও প্রার্থনা করা।
এই হলো মুসলমানের প্রতি কুরআনের তিনটি হক।
📄 প্রতিটি বিপদ এক একটি গায়বি সতর্কবাণী
ভাই, প্রতিটি দুর্যোগ ও বিপদ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে গায়বি সতর্কবাণী। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
﴿ وَهُمْ يَصْطَرِخُونَ فِيهَا رَبَّنَا أَخْرِجْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ أَوَ لَمْ نُعَمِّرُكُمْ مَّا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَنْ تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ نَّصِيرٍ ﴾
তারা তাতে (কেয়ামতের দিন) আর্তনাদ করে বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে মুক্তি দান করুন, আমরা পূর্বে যে কাজ করতাম তা ছেড়ে ভালো কাজ করব। (উত্তরে তাদেরকে বলা হবে) আমি কী তোমাদেরকে এমন দীর্ঘ আয়ু দান করিনি যে, তখন কেউ সতর্ক হতে চাইলে সতর্ক হতে পারতে? এবং তোমাদের কাছে সতর্ককারীও এসেছিল। সুতরাং এখন মজা ভোগ করো! কেননা, জালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই। [সুরা ফাতির: ৩৭]
নবীগণ আগমন করেছিলেন, নবীদের ওয়ারিসগণ এসেছিলেন। বুজুর্গানে দ্বীন ও দ্বীনের প্রচারকগণ তোমাদের কাছে এসে তোমাদের বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু তোমরা সতর্ক হওনি। গাফলতের মাঝেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছ। এখন সতর্ক হওয়ার সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এখন ভোগ করো জাহান্নামের মর্মন্তুদ শাস্তি।