📄 বরকতের রজনীগুলো কাটাতে হবে ভেবে-চিন্তে
সুতরাং এ রাতের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। প্রতিটি মুহূর্ত ভেবে-চিন্তে সঠিক কাজে ব্যয় করা উচিত। আমার মুহতারাম আব্বাজান মুফতিয়ে আজম হজরত মুফতি শফি সাহেব রহ. বলতেন, 'এসব বরকতময় রজনী দীর্ঘ বয়ান-আলোচনা বা জলসা করার রাত নয়। এসব রাত মূলত আপন পরওয়ারদিগারের সঙ্গে বান্দার নির্জনে সম্পর্ক তৈরি করার রাত। বান্দা আল্লাহর সঙ্গে এমনভাবে সম্পর্ক কায়েম করবে যে, শুধু সে থাকবে আর আল্লাহ থাকবেন। আল্লাহ পাকের সামনে অনুনয়-বিনয় করে দোয়া করবে, ইবাদত করবে, নামাজ পড়বে, কুরআন তিলাওয়াত করবে, জিকির-তাসবিহ করবে।
সুতরাং আমার এখন আলোচনা দীর্ঘ করার কোনো ইচ্ছা নেই। বরং আজকের রাতের বৈশিষ্ট্যকে সামনে রেখে সংক্ষিপ্ত কিছু নিবেদন পেশ করেই আলোচনা শেষ করব, ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ তাআলা আপন দয়া ও অনুগ্রহে আমাদের সবাইকে এসব কথার ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আলোচনা শেষে আমরা সকলে মিলে দোয়া করব, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহর তাআলার অসীম রহমতের প্রতি আশা এই যে, তিনি আমাদের অবস্থার প্রতি দয়া করে আমাদের দোয়া কবুল করে নেবেন।
📄 বিপদ-আপদ, দুর্যোগ-দুর্বিপাক আমাদেরই কর্মফল
প্রথম নিবেদন এই যে, মাহে রমজানের যে দৌলত আল্লাহ আমাদের দান করলেন, তা থেকে আমাদের আগামী জিন্দেগির জন্য কিছু শিক্ষা অর্জন করা প্রয়োজন।
দেখুন, পৃথিবীর প্রতিটি ভূখণ্ডে মুসলমানরা আজ নির্যাতিত-নিপীড়িত! দুর্যোগ-দুর্বিপাক যেন মুসলিম ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ! অগণিত মুসলিম ভাই-বোন এই মুহূর্তে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। মাথা গোঁজার এতটুকু ঠাঁইও তাদের নেই। কত মুসলমান ভাইয়ের দু-বেলা মুখে দেওয়ার খাবারের ব্যবস্থাও নেই! আল্লাহর কুদরতের কারিশমা দেখুন, কত মানুষ বন্যার পানিতে বন্দি, চারিদিকে অথই পানি; অথচ পান করার সুপেয় পানির জন্য হাহাকার! বিপদ ও কষ্ট পানি বৃদ্ধির কারণে, অথচ পিপাসা দূর করার পানি নেই!
এই যে নানামুখী বিপদে আমরা আক্রান্ত—এর কারণ আমরা যা কিছুই বলি না কেন, কুরআনের দৃষ্টিতে এর কার্যকারণ হচ্ছে—
( ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَ الْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ )
মানুষ নিজ হাতে যা উপার্জন করে, তার ফলে জলে-স্থলে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। [সুরা রূম: ৪১]
( وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُّصিবَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ )
যেসব বিপদ ও দুর্বিপাকের মুখোমুখি তোমরা হও, তা তোমাদের নিজ হাতের কৃতকর্মের কারণে। আর তিনি (আল্লাহ) তোমাদের অনেক অপরাধ তো ক্ষমাই করে দেন। [সুরা শূরা: ৩০]
কুরআনের এই ঘোষণা শতভাগ সত্য; এতে মিথ্যার কোনো অবকাশ নেই। সুতরাং পুরো মুসলিম উম্মাহর পরিস্থিতিকে সামনে রেখে আমরা নিজেদের আমলি হালতের পর্যালোচনা করি এবং রমজানের এই মোবারক মুহূর্তে আল্লাহ-অভিমুখী হওয়ার প্রতিজ্ঞা করি। পূর্বের তুলনায় রাব্বুল আলামিনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করি।
📄 কুরআন মুসলমানের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ
আজ আল্লাহ পাক আমাদের তারাবিতে কুরআন খতমের তাওফিক দান করলেন। কিন্তু দেখুন, সুরা নাস তিলাওয়াত করে খতম শেষ করার পর আজকের তারাবিতেই পুনরায় সুরা বাকারা শুরু করে প্রথম তিন আয়াত তিলাওয়াত করা হয়েছে। এটি একটি মুতাওয়ারিস ও যুগ পরম্পরায় চলে আসা আমল। এক হাদিসে কুরআন তিলাওয়াতকারীকে এই আদব শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। একবার জনৈক সাহাবি নবীজিকে প্রশ্ন করলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ পাকের নিকট সর্বোত্তম আমল কোনটি?' নবীজি উত্তর দিলেন—
«الْحَالُ الْمُرْتَحِلُ» প্রত্যাবর্তন করা ও পুনরায় রওনা করা।
সাহাবি এবার জিজ্ঞেস করলেন, প্রত্যাবর্তন করা ও পুনরায় রওনা করার অর্থ কী?
নবীজি উত্তর দিলেন—
«الَّذِي يَضْرِبُ مِنْ أَوَّلِ الْقُرْآنِ إِلَى آخِرِهِ كُلَّمَا حَلَّ ارْتَحَلَ» যে ব্যক্তি কুরআনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করে। যখনই শেষ করে, পুনরায় শুরু করে।³⁵
অর্থাৎ এমনভাবে কুরআন তিলাওয়াত করো যেমন কোনো ব্যক্তি সফর থেকে প্রত্যাবর্তন ঘোড়া থেকে অবতরণ করল; এরপর সঙ্গে সঙ্গেই অন্য সফরের জন্য প্রস্তুত হয়ে রওনা হয়ে গেল।
কুরআন শরিফ খতম করে রেখে দেওয়ার বস্তু নয়। কুরআন তো সেই মহাগ্রন্থ, যার পেছনে জিন্দেগি শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু তিলাওয়াত শেষ হবে না।
সুতরাং আজকের এই মজলিস থেকে আমরা এই শিক্ষা অর্জন করব যে, আমাদের কুরআন তিলাওয়াত দ্বিতীয়বার শুরু হয়ে গেছে। এখন তা জারি রাখতে হবে। প্রত্যেক মুসলমানের প্রতি পবিত্র কুরআনের এই হক রয়েছে যে, সে প্রতিদিন ভোরে কুরআনের কিছু অংশ তিলাওয়াত না করে অন্য কোনো কাজ শুরু করবে না। একসময় তো মুসলিম উম্মাহর অবস্থা এমন ছিল যে, কোনো মুসলিম বসতি অতিক্রম করলে প্রতিটি ঘর হতে কুরআন তিলাওয়াতের ধ্বনি ভেসে আসত। আফসোস! আজ তেমন পরিবেশ কোথাও দৃষ্টিগোচর হয় না। আল্লাহর ওয়াস্তে সেই পরিবেশ জিন্দা করতে চেষ্টা করুন।
টিকাঃ
৩৫. ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৯৪৮। ইবনুল জাযারি রহ., ইমাম নববি রহ. ও ইমাম সুয়ুতি রহ.-সহ অনেকেই আমলটিকে মুতাওয়ারিস ও মুসতাহাব আমল বলেছেন।
📄 শাইখুল হিন্দের দৃষ্টিতে মুসলিম উম্মাহর দুর্গতির কারণ
আজ মুসলিম উম্মাহর এই যে দুর্গতি ও অবনতি, দুর্যোগ ও দুর্বিপাক এর বুনিয়াদি ও মৌলিক কারণ কী? আব্বাজান রহ.-এর মুখে শুনেছি, হজরত শাইখুল হিন্দ রহ.-এর মতে এর মৌলিক কারণ দুটি। এক. মুসলমানদের কুরআন হতে দূরে সরে যাওয়া। দুই. নিজেদের পারস্পরিক বিবাদ-বিসংবাদ, বিভেদ ও বিভক্তি।
এ দুটি মুসলমানদের পতন ও অধঃপতনের মূল কার্যকারণ। শাইখুল হিন্দ রহ. জীবনসায়াহ্নে যখন বন্দি ছিলেন মাল্টার জিন্দানখানায়, তখন নির্জনে দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন।
আশি বছরের বয়োবৃদ্ধ এক মনীষী তার অভিজ্ঞতার নির্যাস আমাদের সামনে পেশ করেছেন যে, মুসলমানদের দুরবস্থার মৌলিক কারণ দুটি। মুসলমানদের কুরআন ছেড়ে দেওয়া এবং পারস্পরিক বিবাদ-বিসংবাদ, বিভেদ ও বিভক্তি, একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, জাতিগত-গোষ্ঠীগত বিদ্বেষ। এসবের কারণেই আমাদের ওপর বিভিন্ন দুর্যোগ আপতিত হয়েছে।
সুতরাং আপনাদের উদ্দেশে প্রথম নিবেদন এই যে, আসুন, আজকের এই মজলিস থেকেই সকলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, পবিত্র কুরআনকে আমরা আমাদের দৈনন্দিন সূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে নেব।