📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 দোয়া কেবল প্রয়োজন পূরণে সহায়ক নয়, স্বতন্ত্র ইবাদত

📄 দোয়া কেবল প্রয়োজন পূরণে সহায়ক নয়, স্বতন্ত্র ইবাদত


আর সমস্ত ইবাদতের সারনির্যাস হচ্ছে দোয়া। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, দোয়া সকল ইবাদতের সার।³³ সুতরাং এ রাতগুলোতে নিজের প্রয়োজনের কথা আল্লাহর দরবারে পেশ করুন। দোয়া করলে আল্লাহ বড় খুশি হন। আল্লাহ তাআলা কত মহান! বান্দা নিজের প্রয়োজনে দোয়া করে, সে দোয়াকেও তিনি ইবাদতের মধ্যে গণ্য করেন। আমরা দোয়া করি নিজেদের পার্থিব প্রয়োজনে, জীবিকা ও সুস্থতা, শান্তি ও নিরাপত্তা, পরীক্ষায় সফলতা, ঘরে বা ক্ষেত-খামারে বরকত ইত্যাদি দরকারে; কিন্তু প্রতিটি দোয়াকে আমাদের আমলনামায় ইবাদত হিসেবে লেখা হয় এবং বিনিময়ে সাওয়াব দান করা হয়!

টিকাঃ
৩৩. ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৩৩৭১।

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 মুমিনের কোনো দোয়াই নিষ্ফল নয়!

📄 মুমিনের কোনো দোয়াই নিষ্ফল নয়!


সুতরাং মুমিনের কোনো দোয়াই নিষ্ফল বা বেকার যায় না। অনেক সময় বাহ্যিকভাবে মনে হয়, দোয়া তো কবুল হলো না; কিন্তু বাস্তবতা হলো, দোয়ার প্রতিদানে আল্লাহ তাআলা বান্দার কাম্য বস্তু হতেও উত্তম কোনো বস্তু তাকে দান করেন। মুমিন বান্দা হয়তো চেয়েছে তার জন্য ক্ষতিকর কোনো জিনিস কিংবা তুচ্ছ কোনো বস্তু; কিন্তু আল্লাহ তাআলা সেই ক্ষতিকর বা তুচ্ছ জিনিসের পরিবর্তে তার জন্য কল্যাণকর বস্তু দান করে দেন। অবুঝ বান্দা মনে করে, তার দোয়া কবুল হয়নি; শুরু হয় অভিযোগ- অনুযোগ! সে বোঝেই না, আল্লাহ কত দয়া ও অনুগ্রহ করে তার দোয়া উত্তম পন্থায় কবুল করেছেন।

অনেক সময় অবুঝ শিশু ছুরি, ধারালো বস্তু বা এ জাতীয় ক্ষতিকারক বস্তু সুন্দর মনে করে ধরতে চায়, কিনে দেওয়ার জন্য বায়না ধরে; কিন্তু স্নেহশীল পিতা জানেন, এ জিনিস বাচ্চার হাতে দিলে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তখন তিনি বাচ্চার কাঙ্ক্ষিত বস্তু কিনে না দিয়ে ভালো কিছু কিনে দেন। তদ্রূপ আমরা অনেক সময় দোয়ার মধ্যে এমন বিষয় কামনা করি, যা পরিণামগত দিক থেকে আমাদের জন্য কল্যাণকর নয়। তখন দয়াময় আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আমাদের কাম্য বিষয় দান না করে তার পরিবর্তে আমাদের জন্য কল্যাণকর কোনো বিষয় দান করেন। আমরা ভাবতে থাকি, আমাদের দোয়া কবুল হয়নি। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আমাদের প্রতিটি দোয়াই কবুল হয়।

কবুল হওয়ার একটি দিক তো এও যে, প্রতিটি দোয়াকেই আমলনামায় ইবাদত হিসেবে লেখা হয় এবং দোয়া করার সঙ্গে সঙ্গে তার সাওয়াব আমলনামায় যুক্ত হয়। কত দয়াময় সত্তা আল্লাহ তাআলা! চাইলে তিনি খুশি হন! দোয়া করলেও তিনি সাওয়াব দান করেন! প্রার্থনা করলেও তিনি ইবাদত গণ্য করেন! কী কারিমানা শান! অফুরান তার দান!

দোয়া কবুল হওয়ার এই প্রথম দিকটি তো অবশ্যম্ভাবী, অবশ্যই হবে। দোয়া কবুলের দ্বিতীয় দিক হলো প্রার্থিত বিষয়টি যদি প্রকৃত অর্থেই প্রার্থীর জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে আল্লাহ পাক সঙ্গে সঙ্গে তা দান করেন; আর কল্যাণকর না হলে আল্লাহ পাক তাকে এর পরিবর্তে কল্যাণকর কোনো বিষয় দান করেন। এই যে প্রার্থিত বিষয়ের পরিবর্তে কল্যাণকর বিষয় প্রদান, বিষয়টি আমরা কখনো সুস্পষ্টভাবে অনুভব করি, কখনো করি না।

সুতরাং খুব বেশি দোয়ার ইহতেমাম করুন। দয়াময় আল্লাহ তো দোয়ার এমন দরজা খুলে দিয়েছেন যে, দোয়া করার জন্য বাধা-ধরা কোনো শর্ত আরোপ করেননি।

সুন্দরভাবে দোয়া করার কিছু আদব আছে। যেমন কেবলামুখী হয়ে বসা, হৃদয় ও মনকে সম্পূর্ণ ফারিগ ও মুক্ত করে বসা, হাত উঠিয়ে দোয়া করা। কিন্তু মাওলায়ে কারিম দোয়া কবুল হওয়ার জন্য বিশেষ কোনো পদ্ধতিকে আবশ্যক করেননি। বরং আল্লাহ পাকের নির্দেশ হলো, বান্দা! যেকোনো সময়, যেকোনো অবস্থায় আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো। দাঁড়িয়ে ডাকো কিংবা বসে, বিছানায় আরাম করে আমার কাছে দোয়া করো কিংবা ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে, চলার পথে আমাকে স্মরণ করো কিংবা একান্তে বসে; আমি সবসময় তোমার ডাকে সাড়া দেবো, তোমার দোয়া কবুল করব, তোমাকে স্মরণ করব। সুতরাং যে অবস্থাতেই থাকো, সর্বদা আমাকে ডাকো, আমার কাছে প্রার্থনা করো, আমাকে স্মরণ করো। কুরআনের ভাষায়—

(الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ) (বুদ্ধিমান তো তারা,) যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে (সর্বাবস্থায়) আল্লাহকে স্মরণ করে। [সুরা আলে-ইমরান: ১৯১]

দুনিয়ার রীতি দেখুন। বড় কারও কাছে কিছু চাইতে হলে কিছু নিয়ম-কানুন, শর্ত-মূলনীতি মেনে চলতে হয়। মধ্যরাতে বারোটা এক মিনিটে আপনি কারও দরজায় করাঘাত করে যদি সাহায্যপ্রার্থনা করেন, সে আপনাকে গলাধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেবে; বিরক্তির স্বরে বলবে, তোমার কি সময়জ্ঞান, বিবেচনাবোধ কিছুই নেই?! কিন্তু আল্লাহ পাক কত দয়ালু! কত মহান দাতা! আমাদের সম্বোধন করে বলছেন, বান্দা! আমার দরবারে কোনো সময়সূচি নেই, কোনো নিয়ম-কানুন, শর্ত-মূলনীতি নেই। দিনে-রাতে, সকাল-সন্ধ্যায় যখন ইচ্ছা এসে যাও; শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে যে অবস্থায় থাক, আমার কাছে চাইতে থাক, আমার দরজা কখনোই তোমার জন্য বন্ধ নয়, উন্মুক্ত সবসময়। আমার দুয়ার হতে কেউ ফেরে না শূন্য হাতে! রমজানের রাতে তো আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করতে থাকে—

ইয়া বাঘিয়াল খাইরি আকবিল, ইয়া বাঘিয়াল শাররি আকসির
ওহে কল্যাণ অন্বেষণকারী! অগ্রসর হও।
ওহে অকল্যাণ কামনাকারী! নিবৃত্ত হও।
আছ কোনো ক্ষমার ভিখারি? আমি ক্ষমা করে দেবো।
আছ কোনো রিজিক ও জীবিকার ভিখারি? আমি রিজিক দান করব।

কী আজব গাফলত আমাদের! কী আশ্চর্য উদাসীন আমরা! দাতা করুণাভরে ডাকছেন, ‘এসো, নিয়ে যাও’; আর আমরা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলছি, ‘না, প্রয়োজন নেই’। দয়াময় আল্লাহ বলছেন, বরকতময় এ রজনীগুলোতে আমার কাছে চাও, আমি তোমার আঁজলা উপচে দেবো আর আমরা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ব্যস্ত জলসা-মজমার অনুষ্ঠানে, মিষ্টি-জিলাপি বিতরণে আর ডেকচি-দস্তরখানের আয়োজনে! আল্লাহ ডেকে ডেকে বলছেন, 'আমার কাছ থেকে দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ চেয়ে নাও'; আর আমরা বলে দিচ্ছি, 'সময় কোথায়! কত ব্যস্ততা ঈদ মার্কেটিংয়ে'!

ফন্ট সাইজ
15px
17px