📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 অনির্দিষ্ট শবে কদরেও আছে বান্দার প্রতি করুণা-দান!

📄 অনির্দিষ্ট শবে কদরেও আছে বান্দার প্রতি করুণা-দান!


যাই হোক, এ কথা আরজ করছিলাম যে, বিশেষ হিকমতের কারণে আল্লাহ পাক শবে কদরের তারিখ নির্দিষ্ট রাখেননি। প্রথমে নবীজিকে জানানোর পর তা আবার বিস্মৃত করে দিয়েছেন। এখন রমজানের শেষ দশকের যেকোনো বেজোড়³² রাতে শবে কদর হতে পারে। কোনো রাত তা নিশ্চিত করে বলে দেওয়া হয়নি। হতে পারে একুশতম রাতে, হতে পারে তেইশতম রাতে, হতে পারে পঁচিশ, সাতাশ কিংবা উনত্রিশতম রাতে। এ পাঁচ রজনীর যেকোনো একটিতেই শবে কদর হতে পারে। এভাবে অনির্ধারিত রাখার একটি হিকমত হলো বান্দা যেন শবে কদর প্রাপ্তির আশায় বেজোড় পাঁচ রাতেই কিছু কিছু ইবাদত করে এবং পাঁচ রাতেই শবে কদর তালাশ করে।

এমনকি আজ একুশ তারিখের রাতও শবে কদর হতে পারে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একবার জানিয়ে দেওয়া হলো, যে রাত শবে কদর হবে, সে রাতে আপনি কাদা-পানিতে সিজদা করবেন। অর্থাৎ বৃষ্টির পানি জমে যাবে।

দেখা গেল, বিশ তারিখ দিনে খুব বৃষ্টি হলো। মসজিদে নববির ভেতর কাদা হয়ে গেল, পানি জমে গেল। ফলে নবীজি সে রাতে কাদাপানির মাঝেই সিজদা করলেন। আলামত দ্বারা বোঝা গেল, সে রাতই শবে কদর ছিল।

সুতরাং শবে কদর অনির্ধারিতভাবে শেষ দশকের যেকোনো বেজোড় রাতেই হতে পারে। শবে কদরের দাবি হলো বেজোড় রাতগুলোতে বেশি বেশি ইবাদত করা; ইবাদতের প্রতি যত্নবান হওয়া।

টিকাঃ
৩২. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং ৫১-৫২।

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 শবে কদর রসমের রাত নয়

📄 শবে কদর রসমের রাত নয়


কিন্তু এর পরিবর্তে এ রাতে জলসার আয়োজন?! ডেকচি ভরে খাবার রান্না?! মিষ্টি-জিলাপি বিতরণ?! বয়ান ও বক্তৃতার দীর্ঘ আসর জমানো?! না, এ রাত এসব কাজের জন্য নয়। এ রাতে তো অবস্থা এই হবে যে, বান্দা আছে আর তার সঙ্গে কেবল তার রব আছেন। এ রাত রাব্বে কারিমের সঙ্গে নির্জনে-একান্তে কাটানোর রাত। এ রাত আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ার রাত। আমরা এ রাতে লম্বা বয়ান, খানা-পিনা আর মিষ্টি-জিলাপি বিলানোর যে আয়োজনে মেতে থাকি, তা মোটেই ঠিক নয়।

আমাদের সমাজের বড় নিন্দনীয় এক রীতি হলো প্রত্যেক ভালো কাজের মাঝেই এমন কিছু রুসম-রেওয়াজের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়, যা উক্ত কাজের মূল রূহানিয়াত ও প্রাণশক্তিকেই নিঃশেষ করে দেয়।

ফজিলতপূর্ণ এ রাত আমাদের কেটে যায় জলসা ও বয়ানের মাহফিল আয়োজনে, ডেকচি-দস্তর, মিষ্টি-জিলাপির ব্যবস্থাপনায়। শবে কদরের ইবাদতের তাওফিক আর হয় না। এটা শবে কদরের বে-কদরি, এ মহিমান্বিত রজনীর অবমূল্যায়ন। এ রাতে কর্তব্য হলো আল্লাহর দরবারে হাজির হয়ে যত বেশি সম্ভব ইবাদত করা।

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 শবে কদরে করণীয় আমল

📄 শবে কদরে করণীয় আমল


কী ইবাদত করব? কিছু নফল নামাজ পড়ি। যেকোনো নফল নামাজেই উত্তম হলো একটু দীর্ঘ কেরাত পড়া, দীর্ঘ কিয়াম, দীর্ঘ রুকু ও দীর্ঘ সিজদা করা। কিয়াম অবস্থায় দীর্ঘ কেরাত পড়ুন, কিয়াম দীর্ঘ হয়ে যাবে। রুকু-সিজদায় হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত (মাসূর) দোয়াসমূহ পাঠ করুন। এ হাদিস তো আপনারা পূর্বেও শুনেছেন যে, বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিবিড় সান্নিধ্য লাভ করে সিজদার হালতে। সুতরাং সিজদার হালতে খুব দোয়া করুন। আর কী দোয়া করবেন, তাও নবীজি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, কুরআন আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে। কুরআনের যে সমস্ত দোয়া মুখস্থ আছে, সিজদার মধ্যে সেগুলো আল্লাহর দরবারে পেশ করুন।

(رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ)

হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আপন সত্তার ওপর জুলুম করে ফেলেছি। আপনি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি রহম না করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই অকৃতকার্যদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। [সুরা আ'রাফ: ২৩]

رَبَّنَا آتِنَا فِي ডুনিয়া হাসানা ওয়া ফিল আখিরাতে হাসানা ওয়া কিনা আজাবান নার

হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে দান করুন দুনিয়ায় কল্যাণ এবং আখিরাতেও কল্যাণ এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। [সুরা বাকারা: ২০১]

কুরআন মাজিদের যত দোয়া মুখস্থ আছে, হাদিস শরিফের যত দোয়া মুখস্থ আছে, সিজদার মধ্যে সব করুন।

এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রুকু অবস্থায় বান্দা আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবিহ বেশি করবে। রুকুর নির্ধারিত তাসবিহ 'সুবহানা রাব্বিয়াল আযিম' তিনবার, পাঁচবার, সাতবার যতবার ইচ্ছা পড়ুন। এরপর আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের হামদ ও প্রশংসাবাক্য যা জানা আছে, তা পড়ুন। যেমন:

سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ»

سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ»

سُبُّوْحٌ قُدُّوسٌ رَبُّنَا وَرَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوْحِ

سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلهَ إِلَّا أَنْتَ وَحْدَكَ لَا شَرِيكَ لَكَ»

সুতরাং রুকু অবস্থায় উত্তম হলো আল্লাহর হামদ ও ছানা বেশি বেশি করা। আর সিজদার হালতে সর্বোত্তম আমল হলো আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা। সিজদার মাসনুন জিকির 'সুবহানা রাব্বিয়াল আলা' তিনবার, পাঁচবার, সাতবার যতবার মনে চায় করে নিন; এরপর খুব দোয়া করুন।

নবীজি সাধারণত আট রাকাত তাহাজ্জুদ পড়তেন। কখনো কম পড়তেন, কখনো বেশিও পড়তেন; কিন্তু সাধারণত নবীজি আট রাকাত তাহাজ্জুদই পড়তেন। তাই এ রাতগুলোতে তাহাজ্জুদের নিয়তে আট রাকাত নফল পড়তে পারেন। আট রাকাতে যত দীর্ঘ কেরাত পড়তে পারেন, পড়ুন। রুকু-সিজদা দীর্ঘ করুন।

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী কুরআন তিলাওয়াত সর্বোত্তম জিকির। আট রাকাত নামাজ পড়ার আগে-পরে কিছু কুরআন তিলাওয়াত করুন।

তৃতীয় আমল হলো জিকির। চলতে-ফিরতে, উঠতে-বসতে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ-বেশি বেশি পড়ুন। সবসময় জিকির দ্বারা জবান তাজা রাখুন। এক মুহূর্ত সময়ও যেন নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকুন।

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 দোয়া কেবল প্রয়োজন পূরণে সহায়ক নয়, স্বতন্ত্র ইবাদত

📄 দোয়া কেবল প্রয়োজন পূরণে সহায়ক নয়, স্বতন্ত্র ইবাদত


আর সমস্ত ইবাদতের সারনির্যাস হচ্ছে দোয়া। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, দোয়া সকল ইবাদতের সার।³³ সুতরাং এ রাতগুলোতে নিজের প্রয়োজনের কথা আল্লাহর দরবারে পেশ করুন। দোয়া করলে আল্লাহ বড় খুশি হন। আল্লাহ তাআলা কত মহান! বান্দা নিজের প্রয়োজনে দোয়া করে, সে দোয়াকেও তিনি ইবাদতের মধ্যে গণ্য করেন। আমরা দোয়া করি নিজেদের পার্থিব প্রয়োজনে, জীবিকা ও সুস্থতা, শান্তি ও নিরাপত্তা, পরীক্ষায় সফলতা, ঘরে বা ক্ষেত-খামারে বরকত ইত্যাদি দরকারে; কিন্তু প্রতিটি দোয়াকে আমাদের আমলনামায় ইবাদত হিসেবে লেখা হয় এবং বিনিময়ে সাওয়াব দান করা হয়!

টিকাঃ
৩৩. ইমাম তিরমিজি, সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৩৩৭১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px