📄 শবে কদর উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য রাব্বে কারিমের বিশেষ দান
কোনো কোনো রেওয়ায়েতে এর কারণ এই বর্ণিত হয়েছে যে, একবার জনৈক সাহাবি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, কুরআনুল কারিমে পূর্ববর্তী জাতিবর্গ সম্পর্কে এসেছে যে, তারা দীর্ঘ হায়াত লাভ করত।
যেমন হজরত নুহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে—
(وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِهِ فَلَبِثَ فِيهِمْ أَلْفَ سَنَةٍ إِلَّا خَمْسِينَ عَامًا)
আমি নুহকে তার সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছিলাম। তিনি তাদের মাঝে পঞ্চাশ-কম-একহাজার বছর অবস্থান করেছিলেন। [সুরা আনকাবুত: ১৪]
উক্ত সাহাবি প্রশ্ন করলেন, তারা তো অনেক দীর্ঘ জীবন লাভ করত। ফলে তাদের ইবাদতের পরিমাণও অনেক বেশি হতো। আমাদের হায়াত তো তাদের তুলনায় অনেক কম। আমরা কীভাবে ইবাদতের ক্ষেত্রে তাদের পর্যায়ে পৌঁছতে পারব?
সাহাবির এই প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতেই সুরা কদর অবতীর্ণ হয়। এ সুরার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মাদিকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তোমাদের হায়াত ও জীবনকাল যদিও তাদের ন্যায় দীর্ঘ নয়; কিন্তু আমি তোমাদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করে এমন একটি রাত দান করেছি, যে রাতের ইবাদত হাজার রাতের ইবাদত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আর সে রজনী হলো লাইলাতুল কদর।
📄 শবে কদরের শিক্ষা কলহ-বিবাদ পরিহার
শুরুতে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ওহির মাধ্যমে নির্দিষ্ট করেই জানানো হয়েছিল যে, রমজানের অমুক রাত লাইলাতুল কদর। কিন্তু হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বিষয়টি সাহাবিদের জানানোর উদ্দেশ্যে বের হলেন, পথিমধ্যে দুজন ব্যক্তিকে বাদানুবাদে লিপ্ত দেখতে পেলেন। তাদের এই বিবাদের বে-বরকতির কারণে নবীজি সেই নির্দিষ্ট তারিখের কথা ভুলে গেলেন।
প্রকৃতপক্ষে তো আল্লাহর ইলমে পূর্ব থেকেই এরূপ নির্ধারিত ছিল যে, শবে কদর অনির্ধারিত রাখা হবে, যেন বান্দা একে অন্বেষণ করতে গিয়ে কিছু চেষ্টা ও সাধনা করে, কিছু বেশি ইবাদত করে। কিন্তু প্রথমে রাসুলকে অবগত করা, এরপর ভুলিয়ে দেওয়ার পেছনে এক গুরুত্বপূর্ণ হিকমত ও রহস্য নিহিত আছে। এর উদ্দেশ্য, মুসলমানগণ যেন উপলব্ধি করতে পারে যে, পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ, কলহ-বাদানুবাদ অত্যন্ত গর্হিত বিষয়। বিবাদ-বিসংবাদ এত মন্দ যে, এর বে-বরকতির কারণে নবীজিকে শবে কদরের নির্দিষ্ট তারিখ ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং মুসলমানদের কর্তব্য হলো ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কারও সঙ্গে যদি কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হয়, যুক্তিতে-মননে সামঞ্জস্য না হয়, তার সঙ্গে মেলা-মেশা, ওঠা-বসা করা তো জরুরি কিছু নয়। দেখা হলে সালাম দেবেন, সালাম দিলে উত্তর দেবেন, অসুস্থ হলে ইসলামি শিষ্টাচারের দাবি অনুযায়ী শুশ্রূষার জন্য যাবেন। এতটুকু হক যদি আদায় করেন, এরপর তার সঙ্গে অতিরিক্ত সম্পর্ক না রাখেন, কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু এর পরিবর্তে ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি-হানাহানি, তর্ক-বিতর্ক করা মোটেই সমীচীন নয়; বরং এগুলো মানুষের মনকে বিরাগ ও বিমুখ করে দেয়। সুতরাং আগত শবে কদর হতে এই শিক্ষাও গ্রহণ করুন যে, আমরা ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি-হানাহানি, তর্ক-বিতর্ক যথাসম্ভব পরিহার করব এবং এগুলোর মন্দ পরিণতি থেকে বেঁচে থাকব।
📄 অনির্দিষ্ট শবে কদরেও আছে বান্দার প্রতি করুণা-দান!
যাই হোক, এ কথা আরজ করছিলাম যে, বিশেষ হিকমতের কারণে আল্লাহ পাক শবে কদরের তারিখ নির্দিষ্ট রাখেননি। প্রথমে নবীজিকে জানানোর পর তা আবার বিস্মৃত করে দিয়েছেন। এখন রমজানের শেষ দশকের যেকোনো বেজোড়³² রাতে শবে কদর হতে পারে। কোনো রাত তা নিশ্চিত করে বলে দেওয়া হয়নি। হতে পারে একুশতম রাতে, হতে পারে তেইশতম রাতে, হতে পারে পঁচিশ, সাতাশ কিংবা উনত্রিশতম রাতে। এ পাঁচ রজনীর যেকোনো একটিতেই শবে কদর হতে পারে। এভাবে অনির্ধারিত রাখার একটি হিকমত হলো বান্দা যেন শবে কদর প্রাপ্তির আশায় বেজোড় পাঁচ রাতেই কিছু কিছু ইবাদত করে এবং পাঁচ রাতেই শবে কদর তালাশ করে।
এমনকি আজ একুশ তারিখের রাতও শবে কদর হতে পারে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একবার জানিয়ে দেওয়া হলো, যে রাত শবে কদর হবে, সে রাতে আপনি কাদা-পানিতে সিজদা করবেন। অর্থাৎ বৃষ্টির পানি জমে যাবে।
দেখা গেল, বিশ তারিখ দিনে খুব বৃষ্টি হলো। মসজিদে নববির ভেতর কাদা হয়ে গেল, পানি জমে গেল। ফলে নবীজি সে রাতে কাদাপানির মাঝেই সিজদা করলেন। আলামত দ্বারা বোঝা গেল, সে রাতই শবে কদর ছিল।
সুতরাং শবে কদর অনির্ধারিতভাবে শেষ দশকের যেকোনো বেজোড় রাতেই হতে পারে। শবে কদরের দাবি হলো বেজোড় রাতগুলোতে বেশি বেশি ইবাদত করা; ইবাদতের প্রতি যত্নবান হওয়া।
টিকাঃ
৩২. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং ৫১-৫২।
📄 শবে কদর রসমের রাত নয়
কিন্তু এর পরিবর্তে এ রাতে জলসার আয়োজন?! ডেকচি ভরে খাবার রান্না?! মিষ্টি-জিলাপি বিতরণ?! বয়ান ও বক্তৃতার দীর্ঘ আসর জমানো?! না, এ রাত এসব কাজের জন্য নয়। এ রাতে তো অবস্থা এই হবে যে, বান্দা আছে আর তার সঙ্গে কেবল তার রব আছেন। এ রাত রাব্বে কারিমের সঙ্গে নির্জনে-একান্তে কাটানোর রাত। এ রাত আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ার রাত। আমরা এ রাতে লম্বা বয়ান, খানা-পিনা আর মিষ্টি-জিলাপি বিলানোর যে আয়োজনে মেতে থাকি, তা মোটেই ঠিক নয়।
আমাদের সমাজের বড় নিন্দনীয় এক রীতি হলো প্রত্যেক ভালো কাজের মাঝেই এমন কিছু রুসম-রেওয়াজের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়, যা উক্ত কাজের মূল রূহানিয়াত ও প্রাণশক্তিকেই নিঃশেষ করে দেয়।
ফজিলতপূর্ণ এ রাত আমাদের কেটে যায় জলসা ও বয়ানের মাহফিল আয়োজনে, ডেকচি-দস্তর, মিষ্টি-জিলাপির ব্যবস্থাপনায়। শবে কদরের ইবাদতের তাওফিক আর হয় না। এটা শবে কদরের বে-কদরি, এ মহিমান্বিত রজনীর অবমূল্যায়ন। এ রাতে কর্তব্য হলো আল্লাহর দরবারে হাজির হয়ে যত বেশি সম্ভব ইবাদত করা।