📄 চলমান সংঘাত-পরিস্থিতি আমাদের বদ আমলেরই পরিণতি
আজ আমাদের অবস্থা দেখুন। পরস্পর মারামারি-হানাহানি, একে অপরের ক্ষতি করার চেষ্টা; পুরো মুসলিম উম্মাহ আজ গৃহযুদ্ধ ও আত্মঘাতী হানাহানিতে লিপ্ত। মুসলমানের হাত রঞ্জিত হচ্ছে তার মুসলিম ভাইয়ের রক্তে! মুসলমানদের লাশের স্তুপ তৈরি হচ্ছে মুসলমানের অস্ত্রের আঘাতে! মিশর, লিবিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তান-সকল মুসলিম রাষ্ট্রের একই অবস্থা! কেন? কেন এই পতন ও স্থবিরতা?!
আল্লাহ পাকের আজাব ও শাস্তির বিভিন্ন রূপ ও প্রকৃতি আছে। তেমনই একটি দিক হলো কুরআনের ভাষায়-
( وَيُذِيقَ بَعْضَكُمْ بَأْسَ بَعْضٍ)
এবং তিনি (আল্লাহ) এক দলকে অপর দলের শক্তির স্বাদ গ্রহণ করাবেন। [সুরা আনআম: ৬৫]
সুতরাং মুসলমানদের পারস্পরিক লড়াইও এক ধরনের আজাবে ইলাহি। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। মনে হচ্ছে, আজ পুরো উম্মত এই আজাবেরই শিকার!
অনেকে বলে থাকে, এসবের পেছনে তো মূল কারণ হচ্ছে ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুদের ষড়যন্ত্র। হ্যাঁ, ষড়যন্ত্র তো অবশ্যই আছে। এটি একেবারে সুস্পষ্ট বিষয়। আমেরিকা ও তার সহযোগী পশ্চিমা শক্তি কখনোই মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি দেখতে চায় না। মুসলমানদের দুরবস্থা ও পারস্পরিক হানাহানিতেই তারা উল্লসিত হয়।
কিন্তু ভাই, কথা হচ্ছে শত্রুপক্ষ তো ষড়যন্ত্র করবেই। শত্রুর কাজই তো ক্ষতির চেষ্টা করা। এ বিষয়ে অভিযোগ করে কী লাভ? শত্রুর কাছে হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ লাভের আশা করাই তো নির্বুদ্ধিতা!
📄 ঈমানের শক্তির সামনে সব শক্তিই অসহায়!
প্রকৃত কথা হলো, যতক্ষণ আমরা নিজেরা সঠিক পথে থাকব, আল্লাহর দ্বীনের ওপর অটল-অবিচল থাকব, অন্যায় আচরণ হতে বিরত থাকব, ততক্ষণ তাদের সকল চেষ্টা ও প্রচেষ্টা, ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল মোটেও সফলকাম হবে না। যদি আমরা প্রকৃত অর্থে মুসলমান হতে পারি, আল্লাহর মুহাব্বত ও ভালোবাসার দাবিতে মুখলিস ও নিষ্ঠাবান হতে পারি; তাহলে কাফির ও অবিশ্বাসীরা যতই ষড়যন্ত্র করুক, তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে।
আজ আমাদের মাঝে আছে ইসলামের দাবির প্রতিফলন? আছে আল্লাহর মুহাব্বতের কোনো নিদর্শন? আমাদের মাঝে তো নেই আল্লাহর প্রতি রুজু ও প্রত্যাবর্তন, আছে কেবল অন্যায় ও অসৎকর্মের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘুষের রমরমা বাজার; অথচ ঘুষদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের ব্যাপারে জাহান্নামে নিক্ষেপের সতর্কবাণী এসেছে।³⁰ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ সুদের অবাধ প্রচলন; অথচ সুদগ্রহীতা সম্পর্কে কুরআনের ঘোষণা হলো—
(فَإِنْ لَّমْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ )
অতঃপর যদি তোমরা (সুদ) পরিত্যাগ না করো, তবে আল্লাহ ও তার রাসুলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও। [সুরা বাকারা: ২৭৯]
মিথ্যা, আমানতের খেয়ানত, ধোঁকাবাজি-সব অন্যায় আমাদের মাঝে আছে। কেউ চাইলেই দুই পয়সা দিয়ে আমাদের ঈমান-আমল, মেধা-মস্তিষ্ক, ভূখণ্ড-সবই ক্রয় করতে পারে। যতক্ষণ আমরা এসব অন্যায় হতে তাওবা ও ইসতেগফার না করব, কাফেররা আমাদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করে সফলকাম হতেই থাকবে।
টিকাঃ
৩০. হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর রাযি. বলেন, নবীজি ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার ওপর অভিসম্পাত করেছেন। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ১৩৪০]
📄 তাওবা আজাবকে অপসারণ করে
সুতরাং আমাদের কর্তব্য খালিস দিলে তাওবা করা। দরবারে ইলাহিতে হাজির হয়ে অনুতপ্ত চিত্তে বলা,
“হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা নিজ সত্তার ওপর জুলুম করে ফেলেছি। আপনি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি রহম না করেন, তবে আমরা অবশ্যই অকৃতকার্যদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।³¹
হে আল্লাহ, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আপন নফস ও আত্মার ওপর জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন, আমাদের প্রতি দয়ার আচরণ না করেন, তাহলে তো নিঃসন্দেহে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাব। আমরা অতীতে কৃত সকল গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ইসতেগফার করছি, আপনার দরবারে ক্ষমা ভিক্ষা চাইছি। আমরা প্রতিজ্ঞা করছি-ভবিষ্যতে আর কখনো আপনার অবাধ্য হব না, ভবিষ্যতে আর কখনো গুনাহ করব না। আপনি দয়া করে আমাদের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ, আমাদের 'টুটাফাটা' রোজার বিনিময়েই আপনি আমাদের আপনার প্রতিশ্রুত 'তাকওয়া' দান করুন। হে আল্লাহ, আপনি তাওফিক দিন তাওবার ওপর অটল থাকার এবং তাকওয়ার জীবন গড়ার।”
এভাবে নিজের জন্য ও পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য তাওবা-ইসতেগফার করতে হবে। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সুন্নাত হলো, যদি সকলে মিলে অনুতপ্ত হয়ে সমবেতভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা হয়, তাহলে তিনি আসন্ন আজাব ও শাস্তি প্রত্যাহার করে নেন। ইজতেমায়ি তাওবা ও রোনাজারির কারণে আজাব-গজব ফিরিয়ে নেওয়া সুন্নাতে ইলাহি ও রাব্বে কারিমের শাশ্বত নীতি। পবিত্র কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
﴿ فَلَوْلَا إِذْ جَاءَهُمْ بَأْسُنَا تَضَرَّعُوا )
অতঃপর যখন তাদের কাছে আমার (পক্ষ হতে) আজাব এলো, তখন তারা কেন অনুনয়-বিনয় করল না? [সুরা আনআম: ৪৩]
অন্য এক আয়াতে হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামের কওমের বিবরণে এসেছে,
﴿ فَلَوْلَا كَانَتْ قَرْيَةٌ آمَنَتْ فَنَفَعَهَا إِيْمَانُهَا إِلَّا قَوْمَ يُونُسَ لَمَّا آمَنُوا كَشَفْنَا عَنْهُمْ عَذَابَ الْخِزْيِ فِي الْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَمَتَّعْنَهُمْ إِلَى حِينٍ )
তবে কোনো জনপদ কেন এমন হলো না যে, তারা এমন এক সময় ঈমান আনত, যখন ঈমান তাদের উপকার করতে পারত? অবশ্য ইউনুসের কওম এ রকম ছিল। তারা যখন ঈমান আনল, তখন আমি পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনাকর শাস্তি তাদের থেকে তুলে নিলাম এবং তাদেরকে কিছুকাল পর্যন্ত জীবন ভোগ করতে দিলাম। [সুরা ইউনুস: ৯৮]
তো ভাই, মাহে রমজানের আরও কয়েকটি দিন বাকি আছে, রহমত ও বরকতের অমূল্য কিছু মুহূর্ত এখনও কাজে লাগানোর সুযোগ আছে, কদরের রাত এখনও বাকি আছে। সামনের যেকোনো রাতই শবে কদর হতে পারে। এজন্য প্রতিটি মুহূর্তের সর্বোচ্চ কদর করা উচিত। শবে কদরের তালাশ করা উচিত। আর শবে কদর না পেলাম তো কী হয়েছে! জনৈক অন্তজ্ঞানীর ভাষায়-
হর শব শবে কদর অস্ত অগর কদর বেদানি
মুমিনের জন্য প্রতিটি রজনী-ই শবে কদর, যদি কদর ও গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে।
টিকাঃ
৩১. সুরা আ'রাফ: ২৩।