📄 আমাদের আমলের দৃষ্টান্ত
আমাদের আল্লাহ তাআলার দরবারে যে সমস্ত আমল পেশ করি, প্রকৃতপক্ষে তার দৃষ্টান্ত ইতিহাসের সেই বেদুইনের কলসভরা পানি!
দূর মরুভূমিতে বসবাসকারী জনৈক বেদুইনের বহুদিনের শখ বাগদাদ যাবে খলিফার জিয়ারতে। অর্ধ জাহানের খলিফা! কী তোহফা নেওয়া যায় তার জন্য? আচ্ছা, মরূদ্যানের ওই মিঠা পানির কূপখানা, যার পানি নিয়ে প্রায়ই লেগে যায় হাতাহাতি-মারামারি, এক মশক পানি পাওয়া মানে বিশ্বজয়! সেখান থেকে এক কলস পানি নিয়ে গেলে কেমন হয়? বাগদাদের খলিফা কোথায় পাবেন এই মিঠা পানি?!
খলিফার দরবারে হাজির হয়ে সালাম পেশ করে বেদুইন। তারপর কৃত্রিম বিনয়ের সুরেই যেন বলে, 'বাদশাহ নামদার, আমাদের গাঁয়ের কূপ থেকে আপনার জন্য নিয়ে এসেছি তোহফা! পান করে দেখুন, দিল ঠান্ডা হয়ে যাবে; যেমন শীতল, তেমন মিঠা! এমন মিষ্টি পানি আপনি জীবনেও পান করেননি। কোথায় পাবেন এ পানি, আমাদের গাঁও ছাড়া!'
অর্ধ পৃথিবীর প্রতাপশালী শাসক পানির কলসের দিকে তাকান। এত দূরের পথ! ধূলোবালি পড়ে পড়ে ততদিনে পানি দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে! বিচক্ষণ খলিফা বুঝতে পারেন, গ্রাম্য এই প্রজার কাছে এই গাদলা-গান্দা পানিই অমূল্য সম্পদ। ঘোলা পানির মাঝেই প্রাজ্ঞ খলিফা খুঁজে পান এক নির্বোধ প্রজার নিখাদ ভালোবাসা!
খলিফা কৃত্রিম উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। তোহফা কবুল করে উজিরকে নির্দেশ দেন, এই 'অমূল্য' পানিটুকু সযত্নে রেখে দাও আর এই কলসভরে একে দিয়ে দাও সোনা-চাঁদি!
খুশিতে বেদুইন তখন আটখানা! তার অমূল্য তোহফা খলিফাকে মুগ্ধ করেছে। যাক, সোনা-চাঁদি নিয়ে এবার ফেরা যাক দূর মরুভূমির গ্রামের পথে। বাদশাহর অনুচররা বেদুইনকে কিছুদূর এগিয়ে দেয়। কিছুটা ঘুর পথে নিয়ে যায় প্রবহমান দজলার পাশ দিয়ে। দজলা নদীর প্রবাহ দেখে বেদুইন তো হয়রান-পেরেশান! হায়! কলসভরা সোনা-চাঁদি কি কুয়ার পানির বদলা! এ যে কেবল মহান খলিফার মেহেরবানি!
দুনিয়ার এক মামুলি বাদশাহ যদি কদর করেন বেদুইনের ইখলাস ও মুহাব্বতের, নিষ্ঠা ও ভালোবাসার; সকল বাদশাহর বাদশাহ যিনি, করুণার আধার যিনি, তিনি কি কবুল করবেন না আমাদের টুটাফাটা ইবাদত ও কান্নাভরা ফরিয়াদের তোহফা?!
আমরা তো ওই বেদুইনের চেয়েও নির্বোধ! আমাদের আমল তো ওই গান্দা পানির চেয়েও দুর্গন্ধভরা! কী তোহফা আমরা পেশ করছি রাজাধিরাজের দরবারে?! আমাদের আমলের বদলা তো হওয়ার কথা কঠিন আজাব ও শাস্তি। কিন্তু দেখুন দয়াময়ের দয়া! আল্লাহ বলছেন, বান্দা যদ্দুর পেরেছে পচা-গান্দা আমল করেছে, কিন্তু ইখলাস ও মুহাব্বতের সঙ্গে করেছে; বিনয় ও নিষ্ঠার সঙ্গে করেছে। তাই আমি পচা-গান্দা ইবাদতের এই মটকাই কবুল করে নিচ্ছি আর এর প্রতিদান আমি নিজে দিচ্ছি!²⁹
«الصَّوْمِ لِي، وَأَنَا أَجْزِي بِه»
রোজা তো একমাত্র আমারই জন্য আর আমিই তার প্রতিদান দিয়ে থাকি।
টিকাঃ
২৯. ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৫১।
📄 নিজ আমলের মুহাসাবাও করা চাই
রমজানের এই শেষ দশকে শোকর ও ইসতেগফারের পর আমাদের তৃতীয় করণীয় হচ্ছে মুহাসাবা। রমজান তো আল্লাহ তাআলা দান করেছিলেন তাকওয়ার দৌলত অর্জন করার জন্য। রমজান তো আগমন করেছিল রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে। রমজানের গত হয়ে যাওয়া এই বিশ-বাইশ দিনে আমাদের হৃদয়-জগৎ কি তাকওয়ার নুরে নুরান্বিত হয়েছে? রমজানের পূর্বে দিল ও কলবের যে হালত ও কাইফিয়াত ছিল, তাতে কি কোনো ইনকিলাব এসেছে? আল্লাহ পাকের প্রতিটি বিধান নত শিরে মেনে নেওয়ার এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার স্পৃহা ও চেতনা কি আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে? আমাদের প্রত্যেকেরই কর্তব্য নিজেকে এ প্রশ্নগুলো করা এবং আপন আপন অবস্থার হিসাব নেওয়া।
এই তিনটি বিষয় আমলের পাশাপাশি চতুর্থ ও সর্বশেষ করণীয় বিষয় হচ্ছে রমজানের বাকি মুহূর্তগুলোর পূর্ণ ইহতেমাম। বাকি থাকা প্রতিটি মুহূর্তকে অমূল্য সম্পদ মনে করে ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাতে হবে এবং বিশেষ করে তাওবার ইহতেমাম করতে হবে।
📄 চলমান সংঘাত-পরিস্থিতি আমাদের বদ আমলেরই পরিণতি
আজ আমাদের অবস্থা দেখুন। পরস্পর মারামারি-হানাহানি, একে অপরের ক্ষতি করার চেষ্টা; পুরো মুসলিম উম্মাহ আজ গৃহযুদ্ধ ও আত্মঘাতী হানাহানিতে লিপ্ত। মুসলমানের হাত রঞ্জিত হচ্ছে তার মুসলিম ভাইয়ের রক্তে! মুসলমানদের লাশের স্তুপ তৈরি হচ্ছে মুসলমানের অস্ত্রের আঘাতে! মিশর, লিবিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তান-সকল মুসলিম রাষ্ট্রের একই অবস্থা! কেন? কেন এই পতন ও স্থবিরতা?!
আল্লাহ পাকের আজাব ও শাস্তির বিভিন্ন রূপ ও প্রকৃতি আছে। তেমনই একটি দিক হলো কুরআনের ভাষায়-
( وَيُذِيقَ بَعْضَكُمْ بَأْسَ بَعْضٍ)
এবং তিনি (আল্লাহ) এক দলকে অপর দলের শক্তির স্বাদ গ্রহণ করাবেন। [সুরা আনআম: ৬৫]
সুতরাং মুসলমানদের পারস্পরিক লড়াইও এক ধরনের আজাবে ইলাহি। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। মনে হচ্ছে, আজ পুরো উম্মত এই আজাবেরই শিকার!
অনেকে বলে থাকে, এসবের পেছনে তো মূল কারণ হচ্ছে ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুদের ষড়যন্ত্র। হ্যাঁ, ষড়যন্ত্র তো অবশ্যই আছে। এটি একেবারে সুস্পষ্ট বিষয়। আমেরিকা ও তার সহযোগী পশ্চিমা শক্তি কখনোই মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি দেখতে চায় না। মুসলমানদের দুরবস্থা ও পারস্পরিক হানাহানিতেই তারা উল্লসিত হয়।
কিন্তু ভাই, কথা হচ্ছে শত্রুপক্ষ তো ষড়যন্ত্র করবেই। শত্রুর কাজই তো ক্ষতির চেষ্টা করা। এ বিষয়ে অভিযোগ করে কী লাভ? শত্রুর কাছে হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ লাভের আশা করাই তো নির্বুদ্ধিতা!
📄 ঈমানের শক্তির সামনে সব শক্তিই অসহায়!
প্রকৃত কথা হলো, যতক্ষণ আমরা নিজেরা সঠিক পথে থাকব, আল্লাহর দ্বীনের ওপর অটল-অবিচল থাকব, অন্যায় আচরণ হতে বিরত থাকব, ততক্ষণ তাদের সকল চেষ্টা ও প্রচেষ্টা, ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল মোটেও সফলকাম হবে না। যদি আমরা প্রকৃত অর্থে মুসলমান হতে পারি, আল্লাহর মুহাব্বত ও ভালোবাসার দাবিতে মুখলিস ও নিষ্ঠাবান হতে পারি; তাহলে কাফির ও অবিশ্বাসীরা যতই ষড়যন্ত্র করুক, তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে।
আজ আমাদের মাঝে আছে ইসলামের দাবির প্রতিফলন? আছে আল্লাহর মুহাব্বতের কোনো নিদর্শন? আমাদের মাঝে তো নেই আল্লাহর প্রতি রুজু ও প্রত্যাবর্তন, আছে কেবল অন্যায় ও অসৎকর্মের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘুষের রমরমা বাজার; অথচ ঘুষদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের ব্যাপারে জাহান্নামে নিক্ষেপের সতর্কবাণী এসেছে।³⁰ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ সুদের অবাধ প্রচলন; অথচ সুদগ্রহীতা সম্পর্কে কুরআনের ঘোষণা হলো—
(فَإِنْ لَّমْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ )
অতঃপর যদি তোমরা (সুদ) পরিত্যাগ না করো, তবে আল্লাহ ও তার রাসুলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও। [সুরা বাকারা: ২৭৯]
মিথ্যা, আমানতের খেয়ানত, ধোঁকাবাজি-সব অন্যায় আমাদের মাঝে আছে। কেউ চাইলেই দুই পয়সা দিয়ে আমাদের ঈমান-আমল, মেধা-মস্তিষ্ক, ভূখণ্ড-সবই ক্রয় করতে পারে। যতক্ষণ আমরা এসব অন্যায় হতে তাওবা ও ইসতেগফার না করব, কাফেররা আমাদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করে সফলকাম হতেই থাকবে।
টিকাঃ
৩০. হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর রাযি. বলেন, নবীজি ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার ওপর অভিসম্পাত করেছেন। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ১৩৪০]