📄 রমজানে জাকাত আদায়ের বিধান
এই ফজিলতের প্রতি লক্ষ্য করেই সাধারণভাবে অনেকে রমজান মাসে জাকাত আদায় করে থাকে। আশা থাকে, রমজানে জাকাত আদায়ের কারণে প্রতিটি টাকার বিনিময়ে সত্তর টাকা জাকাত আদায়ের সাওয়াব পাওয়া যাবে। এক টাকায় সত্তর টাকার সাওয়াব, একশ টাকায় সাত হাজার টাকার সাওয়াব, এক হাজার টাকায় সত্তর হাজার টাকা দানের সাওয়াব পাওয়া যাবে। অধিক সাওয়াব অর্জনের এই দৃষ্টিভঙ্গি তো কাম্য ও প্রশংসনীয়। এ উদ্দেশ্যে জাকাত আদায় রমজান পর্যন্ত স্থগিত রাখা হলে এবং রমজান আগমনের প্রতীক্ষা করা হলে অনেক ভালো।
কিন্তু অনেকে এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন করে ফেলে। এক ভুল তো এই যে, অনেকে মনে করে যে, জাকাত ফরজই হয় রমজান মাসে। এটি ভুল ধারণা। প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির জাকাত ফরজ হওয়ার তারিখ ভিন্ন ভিন্ন। যে তারিখে কোনো ব্যক্তি প্রথমবার জাকাতের নেসাব-পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, সেটিই তার জাকাত ফরজ হওয়ার তারিখ। পরবর্তী সময়ে প্রতিবছর সেই তারিখেই (নেসাব-পরিমাণ সম্পদের মালিকানা বাকি থাকলে) তার ওপর জাকাত ফরজ হবে। সে তারিখ রমজান মাসেও হতে পারে, শাওয়াল-জিলকদসহ বছরের অন্য কোনো মাসেও হতে পারে। যদি কোনো ব্যক্তির প্রথম নেসাব-পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার তারিখ মনে না থাকে, তাহলে সে চিন্তা-ভাবনা করে সম্ভাব্য একটি তারিখ অনুমান করে নেবে যে, সম্ভবত অমুক মাসের অমুক তারিখে আমি নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয়েছিলাম। তখন অনুমিত সেই তারিখই তার জাকাত ফরজ হওয়ার তারিখ। রমজানেই জাকাত ফরজ হয়, এরূপ ধারণা সম্পূর্ণই ভুল।
দ্বিতীয় সীমালঙ্ঘন এই করা হয় যে, রমজানের পূর্বেই জাকাত ফরজ হয়েছে, অভাবী ব্যক্তি সামনে বিদ্যমানও আছে; তারপরও জাকাত আদায়ে বিলম্ব করা হয়। এটা মোটেই ঠিক নয়। জাকাতের উদ্দেশ্যই হলো অভাবী ও দরিদ্র মুসলমান ভাইয়ের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ; অথচ আলোচ্য ক্ষেত্রে তা লঙ্ঘিত হয়। জাকাত ফরজ হয়ে গেছে, হিসাবও করা হয়ে গেছে, অভাবী ব্যক্তিদের কষ্ট হচ্ছে, এরপরও জাকাত আদায়ে বিলম্ব করা উচিত নয়। উচিত হলো জাকাত ফরজ হওয়ার পর সামনে অভাবী কাউকে পেলে সঙ্গে সঙ্গে আদায় করে দেওয়া। এ সময় এ চিন্তা করা যে, এখন না দিয়ে রমজানে দিলে সত্তর গুণ সাওয়াব লাভ করব; থাক না বেচারা অভাবী ব্যক্তি মাস দুয়েক অনাহারে, এটা সঠিক চিন্তা নয়। বরং জাকাতের অর্থ দ্বারা গরীব-অভাবী ব্যক্তির প্রয়োজন যত বেশি পূর্ণ হবে, সাওয়াবও তত বেশি হবে, ইনশাআল্লাহ। যার অভাব ও প্রয়োজন পূরণ করলাম, তার প্রয়োজনের তারতম্যের ভিত্তিতেও সাওয়াব কম-বেশি হবে।
হ্যাঁ, জাকাত হিসেবে অনেক অর্থ ফরজ হয়েছে; কিছু এখন দিয়ে দিলাম, কিছু রমজানে আদায় করলাম, কোনো সমস্যা নেই। যাদের ওপর জাকাত ফরজ হয়ে আছে, কিন্তু এখনও আদায় করা হয়নি, তারা রমজানেই আদায় করে নিই। ইনশাআল্লাহ, সত্তর গুণ সাওয়াব পাওয়া যাবে।
আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ পাকের ফজল ও করমে আমাদের সমাজে জাকাত ফরজ হয়, এমন লোক যেমন অনেক আছে; জাকাত আদায়কারীর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, আদায় তো করা হয়; কিন্তু বড় গাফলত ও উদাসীনতার সঙ্গে। হিসাব করা হয় না যে, আমার মোট সম্পদ কত, জাকাত কত ফরজ হলো। অনেকে আমরা জানিও না, জাকাতের হিসাব কীভাবে করতে হয়, কোন কোন সম্পদ জাকাত-হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হয়, কোন কোন সম্পদ অন্তর্ভুক্ত হয় না। এর ফলে আমরা যারা জাকাত আদায় করি, হয়তো আদায়ে কম-বেশি হয়ে যায়। বেশি হলে তো কোনো কথা নেই; কিন্তু কম হলে তো ওই পরিমাণ জাকাত আদায় না করার গুনাহ বাকি থেকে যাবে। এ কারণেই জাকাতের সঠিক মাসায়িল জানা (নামাজের মাসআলা জানার মতোই) প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজে আইন।
📄 ইলম অর্জন স্বতন্ত্র এক ইবাদত
আলহামদুলিল্লাহ, জাকাতের জরুরি মাসায়িল সম্পর্কে ছোট-বড় বিভিন্ন পুস্তিকা, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ইত্যাদি ছাপা হয়েছে। সেগুলো সংগ্রহ করে নিলে আমরা বুনিয়াদি আহকাম ও মৌলিক মাসআলাগুলো জেনে নিতে পারব। জাকাতের হিসাব সহজে বের করার জন্য বিভিন্ন ইসলামি প্রতিষ্ঠান থেকে জাকাত-ফরম বের হয়েছে, যা সংগ্রহ করে নিলে আমরা সহজেই জাকাতের হিসাব বের করতে পারব। এ ছাড়াও নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের শরণাপন্ন হয়ে আমরা জাকাতের সঠিক মাসআলা শিখে নিতে পারি।
জাকাতের মাসায়িলের ইলম অর্জন করা ফরজে আইন। রমজানে অন্যান্য ইবাদতের পাশাপাশি কিছু সময় ইলম অর্জনের পেছনেও ব্যয় করা উচিত। কেননা, ইলম অর্জন করা শুধু ইবাদতের বিশুদ্ধতার পূর্বশর্তই নয়; বরং ইলম অর্জন নিজেই স্বতন্ত্র একটি ইবাদত। আর রমজান তো অধিক ইবাদতেরই মাস। সুতরাং রমজান মাসে তলবে ইলমের এই ফরজ ইবাদত আমরা জাকাতের মাসআলা শেখার মাধ্যমে আদায় করতে পারি।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আপন ফজল ও করমে আমাদের সবাইকে এ সমস্ত কথার ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।