📄 নবী-জবানের বদদোয়া থেকে বাঁচুন
এই চিন্তা ও হিসাব এ জন্য করা দরকার যে, হাদিস শরিফে ওই ব্যক্তিকে বড় হতভাগা বলা হয়েছে, যে রমজান মাস লাভ করা সত্ত্বেও আপন গুনাহ মাফ করাতে পারল না। হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম এ ধরনের ব্যক্তির জন্য বদদোয়ার বাক্য উচ্চারণ করেছেন এবং হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন 'আমিন' বলেছেন। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ জন্য বদদোয়া করেছেন যে, মাহে রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান, রহমত ও বরকতের আধার। যে ব্যক্তি পুরো রমজান মাস পেয়েও রহমত ও বরকতের এমন অমূল্য সব মুহূর্ত লাভ করেও নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারল না, সে তো বড় দুর্ভাগা! এ মাসে তো আল্লাহ পাক মাগফিরাত ও গুনাহ মাফ অনেক সহজ করে রেখেছেন। গুনাহ মাফ করানোর সহজ থেকে সহজতর সুযোগ পেয়েও যে আপন গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারল না, সে তো বড় হতভাগাই বটে!
রমজান মাসে আল্লাহ পাক ছোট ছোট আমলের বিনিময়ে ক্ষমার ওয়াদা করেছেন। রোজা রাখলে মাগফিরাতের ওয়াদা, তারাবির নামাজ পড়লে ক্ষমার প্রতিশ্রুতি, কোনো রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করালেও মার্জনার আশ্বাস। মোটকথা, যৎসামান্য আমলের জন্যও আল্লাহ তাআলা অসামান্য পুরস্কার তথা মাগফিরাত ও ক্ষমার ওয়াদা করেছেন। মাগফিরাতের দরজার সব পাল্লাই যেন এ মাসে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। অধিকন্তু এ মাসে শয়তান ও তার সহযোগীদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে, অন্তর- জগৎকে আল্লাহর দিকে ধাবিত করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং মাগফিরাত বড় সস্তা, ক্ষমা অর্জন বড় সহজ। এরপরও যে ব্যক্তি এ মাস হতে উপকৃত হতে পারলো না, আল্লাহ মাফ করুন, তার সম্পর্কেই নবীজি ইরশাদ করেছেন, সে বড় হতভাগা! আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ বদদোয়া হতে সকল মুসলমানকে হেফাজত করুন।
আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য, এ মাসের মধ্যেই চেষ্টা ও সাধনার মাধ্যমে, আমল ও রোনাজারির মাধ্যমে, আল্লাহ পাকের দয়া ও রহমত ভিক্ষা চাওয়ার মাধ্যমে আপন আপন গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা এবং আল্লাহর সেসব বান্দার কাতারে শামিল হতে সচেষ্ট হওয়া, যাদেরকে জাহান্নাম হতে মুক্তির পয়গাম প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে এই রমজানেই মুক্তির পয়গামপ্রাপ্ত বান্দাদের কাতারে শামিল হওয়ার তাওফিক দান করুন।
ভাই, ইসতেগফার ও তাওবা খুব বেশি করা উচিত। অতীতে যত গুনাহ হয়ে গেছে, তার জন্য একবার খালিস দিলে আল্লাহর দরবারে মাফ চেয়ে তাওবা করে নিই। এরপর বেশি বেশি ইসতেগফার করতে থাকি। তাহলে আমরা গুনাহ হতে পবিত্র অবস্থায়ই রমজান অতিক্রম করতে পারব ইনশাআল্লাহ।
📄 সবরের মর্মার্থ অনেক বিস্তৃত
রমজান মাস সবরের মাস—এ কথার কী অর্থ? এর অর্থ হচ্ছে বান্দা এ মাসে আপন নফস ও আত্মাকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত করবে যে, যত নাজায়েজ কাজ করতে মন চায়, আল্লাহর ওয়াস্তে তা থেকে বিরত থাকব। রোজা মূলত এ প্রশিক্ষণেরই অংশ। নফস খেতে চায়, খাব না; পানি পান করতে চায়, পান করব না; মনে স্ত্রী-গমনের কামনা জাগ্রত হয়, স্ত্রী-গমন করব না। চাহিদা ও আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কেন আহার করব না, কেন পান করব না, কেন স্ত্রী-গমনের করব না; একমাত্র আমার আল্লাহ নিষেধ করেছেন বলে। অর্থাৎ রোজা রাখার মাধ্যমে আমি আল্লাহ পাকের হুকুমের সামনে নফসের তাড়না ও প্রবৃত্তির চাহিদাকে দমন ও পদদলিত করার চর্চা করছি, প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। এ জন্য এ মাসকে বলা হয়েছে 'সবরের মাস'।
পবিত্র কুরআনে অনেক স্থানে সবর শব্দ ও সবরের প্রসঙ্গ এসেছে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে সবর ও সবরকারীর জন্য বড় ফজিলত ও মর্যাদার কথা ঘোষণা করেছেন। আমরা আমাদের মাতৃভাষায় সবর বলতে বুঝি কোনো বিপদ ও মুসিবতে, দুঃখ ও কষ্টে বা কারও মৃত্যুশোকে ধৈর্যধারণ করা এবং হা-হুতাশ না করাকে। কিন্তু শরিয়তের পরিভাষায় সবর শব্দের অর্থ ও ব্যবহারক্ষেত্র আরও বিস্তৃত ও ব্যাপক।
আরবি 'সবর' শব্দের অর্থ নফস ও আত্মাকে নিবৃত্ত রাখা, বন্দি করে রাখা।
আত্মাকে নিবৃত্ত ও বন্দি রাখার অর্থ হলো নফস বিভিন্ন কাজ থেকে ছুটে পালাতে চায়। নামাজের সময় হলে নফস মসজিদের আশপাশ থেকে পালাতে চায়। রাত শেষ হয়ে ফজরের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার উপক্রম হয়; নফস প্ররোচিত করে, আরেকটু ঘুমাও। সবর অর্থ এ সময় নফসকে বেঁধে ফেলা, নফসকে বলে দেওয়া যে, না, আমি এখন মসজিদে যাব, আমি এখন শুয়ে থাকব না। সুতরাং আল্লাহর হুকুমের বিপরীতে নফসের তাকাজা ও চাহিদাকে প্রত্যাখ্যান করার নাম সবর। এটি সবরের একটি প্রকার, যাকে الصبر على الطاعة বা কল্যাণ-কর্মে-সবর বলে। কোনো নেক কাজ করার ক্ষেত্রে প্রবৃত্তির প্ররোচনা যদি বাধা সৃষ্টি করে, তখন প্রবৃত্তির প্ররোচনাকে প্রত্যাখ্যান করে উক্ত কল্যাণকাজে অগ্রসর হওয়ার নামই 'কল্যাণ-কর্মে-সবর'।
নফস অনেক সময় গুনাহর বিষয়ের উদ্দেশে ছুটে পালাতে চায়। নফস ব্যক্তিকে প্ররোচিত করে, এই গুনাহ করো, ওই গুনাহর স্বাদ আস্বাদন করো, অবৈধ পাত্রে দৃষ্টি দাও, জবানের অন্যায় ব্যবহার করো; পরনিন্দা করো, মিথ্যা বলো, ঘুষ নাও, সুদি কারবার করো। এভাবে নফস গুনাহর কাজের দিকে ছুটে পালাতে চায়। তখন নফসকে বেঁধে ফেলা; নফসকে বলে দেওয়া যে, না, আমি গুনাহর কাজ করব না। এখানেও আল্লাহর হুকুমের বিপরীতে নফসের তাকাজা ও চাহিদাকে প্রত্যাখান করার নাম সবর। এটি সবরের দ্বিতীয় প্রকার, যাকে الصبر عن المعصية বা অন্যায়-কর্মে-সবর বলে। কোনো গুনাহর কাজের প্রতি প্রবৃত্তি যখন প্ররোচিত করে, তখন প্রবৃত্তির প্ররোচনাকে গ্রহণ না করে উক্ত অন্যায় কাজ হতে বিরত থাকার নামই 'অন্যায়-কর্মে-সবর'।
আর বিপদ-আপদ ও মুসিবতে, দুঃখ-কষ্টে বা কারও মৃত্যুশোকে ধৈর্যধারণ করা এবং হা-হুতাশ না করা; আল্লাহ পাকের ফয়সালা ও তাকদিরের ওপর সন্তুষ্ট থাকা, যাকে আমরা সবর বলে থাকি, তাও সবরের একটি প্রকার, যাকে الصبر على البلاء বা 'বিপদে-সবর' বলে।
নফসকে নিবৃত্ত রাখার এই তিন ধরনের অনুশীলনই রমজান মাসে করতে হবে। রমজান মাস হলো আল্লাহর হুকুমকে অবনত-অনুগতচিত্তে মেনে নেওয়ায় অভ্যস্ত হওয়ার মাস; প্রবৃত্তির সব ধরনের চাহিদাকে আল্লাহর বিধানের বিপরীত বলে প্রত্যাখ্যান করতে শেখার মাস। এ কারনেই নবীজি এ মাসকে ‘সবরের মাস’ বলেছেন।
ভাই, রোজা রেখে যদি পানাহার হতে বিরত থাকি আর গুনাহ ছাড়তে না পারি; মিথ্যা বলা ও পরনিন্দা করা, ঘুষ খাওয়া ও অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা পরিত্যাগ করতে না পারি, তাহলে কী লাভ বলুন? সবরের মাস হতে আমরা কতটুকু সবর অর্জন করতে পারলাম, বলুন? রমজান এলো বলে পানাহার ছেড়ে দিলাম; অথচ পূর্ব হতেই যা হারাম ছিল, সর্বাবস্থায় যা হারামড়তা মোটেই পরিহার করলাম না। আল্লাহ মাফ করুন, এ ধরনের রোজা দ্বারা কোনো ফায়দাই হাসিল হবে না। এ রোজা দ্বারা সেই কল্যাণ অর্জিত হবে না, যার কথা কুরআন মাজিদে এভাবে বর্ণিত হয়েছে—
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ
হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে; যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমাদের মধ্যে তাকওয়া সৃষ্টি হয়। [সুরা বাকারা: ১৮৩]
সুতরাং রোজা ফরজ হওয়ার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন করতে হলে এবং রমজান মাসকে নববি ঘোষণা অনুযায়ী সবরের মাসে পরিণত করতে হলে নফস যে গুনাহর কাজের প্রতিই আহ্বান করুক, তাকে প্রত্যাখ্যান ও পদদলিত করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের হুকুমকে অবনত মস্তকে মেনে নিতে হবে। এটাই সবরের মাস হিসেবে মাহে রমজানকে নামকরণের দাবি।
📄 অপরের দুঃখে ব্যথিত হওয়াও মাহে রমজানের শিক্ষা
এ মাস সম্পর্কে নবীজি দ্বিতীয় যে শব্দটি বলেছেন, তা হলো- شهر المواساة (শহরুল মুওয়াসাত)। অর্থাৎ এ মাস সহমর্মিতার মাস, অন্যের ব্যথায় সমব্যথী হওয়ার মাস। ইসলাম তো মুসলমানকে সবসময়ই অপর মুসলমান ভাইয়ের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের, অন্যের ব্যথায় সমব্যথী হওয়ার, অন্যের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করার, অন্যের প্রয়োজন উপলব্ধি করার এবং অন্যের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার আদেশ করেছে। পুরো ইসলামি শরিয়ত এ জাতীয় বিধি- বিধানে ভরপুর। কিন্তু তারপরও রমজান সম্পর্কে বিশেষ করে বলা হয়েছে, এ মাস সহমর্মিতার মাস। উদ্দেশ্য হলো অন্যের সেবা করা, দুঃখ-কষ্টে অংশীদার হওয়া, হামদর্দি ও সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ করার বিধান যদিও সারা বছরের জন্য; কিন্তু রমজান মাস হলো সহমর্মিতার চর্চা ও অনুশীলনের মাস। এ মাসের দাবি হলো অন্যের সঙ্গে বেশি বেশি সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ করা; মারামারি-হানাহানি, ঝগড়া-বিবাদ ও তর্ক- বিতর্ক হতে দূরে থাকা। রমজান মাসে সহমর্মিতার চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতেই হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে-
وَإِنْ جَهِلَ عَلَى أَحَدِكُمْ جَاهِلٌ وَهُوَ صَائِمٌ، فَلْيَقُلْ : إِنِّي صَائِمٌ
কোনো রোজাদারের সঙ্গে কেউ কোনো মূর্খতাপূর্ণ আচরণ করলে সে যেন তাকে বলে দেয়, (ভাই,) আমি তো রোজা রেখেছি।²³
কেউ যদি আপনার সঙ্গে ঝগড়া করতে উদ্যত হয়, ভালো-মন্দ বলতে শুরু করে, স্বর উঁচু করে, আক্রমণ করতে তেড়ে আসে, তখন স্বভাবতই আপনার নফস আপনাকে এ বিষয়ে প্ররোচিত করে যে, যাও, যত জোরে সে তোমাকে আক্রমণ করছে, তারচেয়েও উঁচু স্বরে তুমি তার জবাব দাও। ইটের জবাব পাথর দিয়ে দাও। কিন্তু আমাদের তারবিয়াত ও দীক্ষাদানের উদ্দেশ্যে নবীজি বলে দিলেন যে, না, এটাই তো তোমার পরীক্ষার মুহূর্ত। তোমার সঙ্গে কেউ মূর্খতাপূর্ণ আচরণ করলে তুমি নিজের উত্তেজনা দমন করো আর শান্ত স্বরে তাকে বলে দাও, 'আমি রোজাদার; আমি তোমার সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করতে পারব না'।
এভাবেই রোজার মাসে বান্দাকে সহনশীলতার চর্চা করানো হয়। পবিত্র কুরআনে মুত্তাকিদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে ইরশাদ হয়েছে—
﴿وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ﴾
এবং যারা নিজের ক্রোধ সংবরণ করতে ও মানুষের সঙ্গে ক্ষমার আচরণ করতে অভ্যস্ত। [সুরা আলে-ইমরান: ১৩৪]
রমজান মাসে সহমর্মিতার প্রশিক্ষণদানের মাধ্যমে বান্দাকে তাকওয়া ও মুত্তাকিদের এই অত্যুচ্চ স্তরে উন্নীত করাই উদ্দেশ্য। হাদিস শরিফে এসেছে, মানুষ যত কিছু পান করে, তন্মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয় হলো বান্দার ক্রোধের ঢোক। অর্থাৎ কোনো পরিস্থিতিতে মনে ক্রোধ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হলে আল্লাহর ওয়াস্তে তা হজম করে নেওয়া এবং ক্রোধ সংবরণ করা। অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, একবার আল্লাহর নবী সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলো তো, প্রকৃত বীর কে?’ সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, যে ব্যক্তি মল্লযুদ্ধে তার প্রতিপক্ষকে ভূপাতিত করতে পারে, সে-ই তো প্রকৃত বীর।’ নবীজি বললেন, ‘না, বরং ক্রোধ সৃষ্টি হওয়ার পর যে ব্যক্তি নিজেকে সংবরণ করতে পারে, সে-ই প্রকৃত বীর।’
এই হলো সহমর্মিতার মাসের মর্মার্থ। রমজানের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য বান্দাকে এই দীক্ষায় গড়ে তোলা যে, তুমি অন্যের শান্তি ও নিরাপত্তার কারণ হও; অশান্তি ও পেরেশানির কারণ হয়ো না।
রমজান মাসে সহমর্মিতার চর্চার উদ্দেশ্যেই হাদিস শরিফে অপর মুসলমান ভাইকে ইফতার করানোর প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ সারাদিন পানাহার হতে বিরত থেকে রোজা রাখার পর তুমি যখন ক্ষুৎপিপাসার কষ্ট অনুভব করতে পেরেছ, এবার অন্যের কষ্টে সমব্যথী হয়ে কোনো রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করিয়ে দাও।
দেখুন, এই সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণের বিনিময়ে কী বিরাট ফজিলতের সুসংবাদ হাদিস শরিফে এসেছে—
«مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ غَيْرَ أَنَّهُ لَا يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْئًا»
যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ওই রোজাদারের সমান আজর লাভ করবে। তবে (এর কারণে) রোজাদারের আজর বিন্দুমাত্রও হ্রাস পাবে না।²⁴
হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে—
«يُعْطِي اللهُ هَذَا الثَّوَابَ مَنْ فَطَرَ صَائِمًا عَلَى مَذْقَةِ لَبَنٍ أَوْ تَمْرَةٍ أَوْ شَرْبَةٍ مِنْ مَاء»
যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে এক ঢোক দুধ পান করাবে কিংবা একটি খেজুর; তাও সামর্থ্য না হলে সামান্য পানি পান করাবে, আল্লাহ পাক তাকেও একই সাওয়াব দান করবেন।
আর পেটপুরে ইফতার করালে তো আরেক ফজিলতের ঘোষণা—
«وَمَنْ أَشْبَعَ صَائِمًا سَقَاهُ اللهُ مِنْ حَوْضِيْ شَرْبَةً لَا يَظْمَأُ حَتَّى يَدْخُلَ الْجَنَّةَ»
আর যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে তৃপ্তি সহকারে আহার করাবে, আল্লাহ পাক তাকে আমার হাউজ থেকে অর্থাৎ হাউজে কাওসার থেকে পানি পান করাবেন। এর ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত আর পিপাসার্ত হবে না।²⁵
ভেবে দেখুন, কত বড় ফজিলত বর্ণিত হয়েছে অন্যকে ইফতার করানোর। উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য হলো, তুমি অনেক ইফতারের আয়োজন করেছ, দস্তরখানে হরেক পদের খাবারের সমাবেশ ঘটিয়েছ; এখনই ইফতার করতে বসে যেয়ো না। একটু খোঁজ নিয়ে দেখো, তোমার প্রতিবেশী কী অবস্থায় আছে। তার কি ইফতার জোগাড় হয়েছে? সে কি তার পরিবারের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করতে পেরেছে? জোগাড় না হলে, ব্যবস্থা করতে না পারলে তাকেও তোমার দস্তরখানে শরিক করে নাও; তার পরিবারকেও তোমার পরিবারের ইফতারে শরিক করে নাও। তুমি যদি খালিস নিয়তে এই সহমর্মিতাটুকু প্রকাশ করতে পারো, নিজের পেয়ালার কিছু অংশ তোমার ভাইয়ের উদ্দেশে এগিয়ে দিতে পারো, তাহলে এর ফজিলত শোনো, আমি আল্লাহ তোমাকে কেয়ামতের কঠিন দিবসে হাউজে কাওসার হতে এক পেয়ালা পানি পান করাব; যে পানি দুধের চেয়েও শুভ্র, মধুর চেয়েও মিষ্ট; যে হাউজের পানি একবার পান করলে আর কখনো পিপাসা লাগবে না।
এত বড় ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে অন্যকে ইফতার করানোর। উদ্দেশ্য সহমর্মিতার গুণে গুণান্বিত হতে উদ্বুদ্ধ করা।
সহমর্মিতার চর্চা করার জন্যই মাহে রমজানে অধিক দান-সদকা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। হাদিস শরিফে হজরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি.-এর ভাষ্যে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে-
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ، وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ ، فَلَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدُ بِالْخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ الْمُرْسَلَةِ»
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। কিন্তু রমজান মাসে যখন হজরত জিবরাইল নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, তখন নবীজির দানশীলতা আরও বৃদ্ধি পেত। রমজান মাসে নবীজির উদারতা ও বদান্যতা এত বৃদ্ধি পেত, যেন প্রবহমান বাতাসের চেয়েও সবেগে প্রবাহিত হচ্ছে!²⁶
এভাবে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন বাণী ও কর্মধারার মাধ্যমে মাহে রমজানকে সহমর্মিতার মাসে রূপান্তরিত করার দীক্ষা উম্মতকে প্রদান করেছেন। নিজ আমলের মাধ্যমে নবীজি উম্মতকে রমজানে অধিক দান-খয়রাত করার, অন্যের প্রতি সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন।
টিকাঃ
২৩. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং ১৫।
২৪. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং ৪৬।
২৫. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং ৪।
২৬. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং ৬।
📄 রমজানে জাকাত আদায়ের বিধান
এই ফজিলতের প্রতি লক্ষ্য করেই সাধারণভাবে অনেকে রমজান মাসে জাকাত আদায় করে থাকে। আশা থাকে, রমজানে জাকাত আদায়ের কারণে প্রতিটি টাকার বিনিময়ে সত্তর টাকা জাকাত আদায়ের সাওয়াব পাওয়া যাবে। এক টাকায় সত্তর টাকার সাওয়াব, একশ টাকায় সাত হাজার টাকার সাওয়াব, এক হাজার টাকায় সত্তর হাজার টাকা দানের সাওয়াব পাওয়া যাবে। অধিক সাওয়াব অর্জনের এই দৃষ্টিভঙ্গি তো কাম্য ও প্রশংসনীয়। এ উদ্দেশ্যে জাকাত আদায় রমজান পর্যন্ত স্থগিত রাখা হলে এবং রমজান আগমনের প্রতীক্ষা করা হলে অনেক ভালো।
কিন্তু অনেকে এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন করে ফেলে। এক ভুল তো এই যে, অনেকে মনে করে যে, জাকাত ফরজই হয় রমজান মাসে। এটি ভুল ধারণা। প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির জাকাত ফরজ হওয়ার তারিখ ভিন্ন ভিন্ন। যে তারিখে কোনো ব্যক্তি প্রথমবার জাকাতের নেসাব-পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, সেটিই তার জাকাত ফরজ হওয়ার তারিখ। পরবর্তী সময়ে প্রতিবছর সেই তারিখেই (নেসাব-পরিমাণ সম্পদের মালিকানা বাকি থাকলে) তার ওপর জাকাত ফরজ হবে। সে তারিখ রমজান মাসেও হতে পারে, শাওয়াল-জিলকদসহ বছরের অন্য কোনো মাসেও হতে পারে। যদি কোনো ব্যক্তির প্রথম নেসাব-পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার তারিখ মনে না থাকে, তাহলে সে চিন্তা-ভাবনা করে সম্ভাব্য একটি তারিখ অনুমান করে নেবে যে, সম্ভবত অমুক মাসের অমুক তারিখে আমি নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয়েছিলাম। তখন অনুমিত সেই তারিখই তার জাকাত ফরজ হওয়ার তারিখ। রমজানেই জাকাত ফরজ হয়, এরূপ ধারণা সম্পূর্ণই ভুল।
দ্বিতীয় সীমালঙ্ঘন এই করা হয় যে, রমজানের পূর্বেই জাকাত ফরজ হয়েছে, অভাবী ব্যক্তি সামনে বিদ্যমানও আছে; তারপরও জাকাত আদায়ে বিলম্ব করা হয়। এটা মোটেই ঠিক নয়। জাকাতের উদ্দেশ্যই হলো অভাবী ও দরিদ্র মুসলমান ভাইয়ের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ; অথচ আলোচ্য ক্ষেত্রে তা লঙ্ঘিত হয়। জাকাত ফরজ হয়ে গেছে, হিসাবও করা হয়ে গেছে, অভাবী ব্যক্তিদের কষ্ট হচ্ছে, এরপরও জাকাত আদায়ে বিলম্ব করা উচিত নয়। উচিত হলো জাকাত ফরজ হওয়ার পর সামনে অভাবী কাউকে পেলে সঙ্গে সঙ্গে আদায় করে দেওয়া। এ সময় এ চিন্তা করা যে, এখন না দিয়ে রমজানে দিলে সত্তর গুণ সাওয়াব লাভ করব; থাক না বেচারা অভাবী ব্যক্তি মাস দুয়েক অনাহারে, এটা সঠিক চিন্তা নয়। বরং জাকাতের অর্থ দ্বারা গরীব-অভাবী ব্যক্তির প্রয়োজন যত বেশি পূর্ণ হবে, সাওয়াবও তত বেশি হবে, ইনশাআল্লাহ। যার অভাব ও প্রয়োজন পূরণ করলাম, তার প্রয়োজনের তারতম্যের ভিত্তিতেও সাওয়াব কম-বেশি হবে।
হ্যাঁ, জাকাত হিসেবে অনেক অর্থ ফরজ হয়েছে; কিছু এখন দিয়ে দিলাম, কিছু রমজানে আদায় করলাম, কোনো সমস্যা নেই। যাদের ওপর জাকাত ফরজ হয়ে আছে, কিন্তু এখনও আদায় করা হয়নি, তারা রমজানেই আদায় করে নিই। ইনশাআল্লাহ, সত্তর গুণ সাওয়াব পাওয়া যাবে।
আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ পাকের ফজল ও করমে আমাদের সমাজে জাকাত ফরজ হয়, এমন লোক যেমন অনেক আছে; জাকাত আদায়কারীর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, আদায় তো করা হয়; কিন্তু বড় গাফলত ও উদাসীনতার সঙ্গে। হিসাব করা হয় না যে, আমার মোট সম্পদ কত, জাকাত কত ফরজ হলো। অনেকে আমরা জানিও না, জাকাতের হিসাব কীভাবে করতে হয়, কোন কোন সম্পদ জাকাত-হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হয়, কোন কোন সম্পদ অন্তর্ভুক্ত হয় না। এর ফলে আমরা যারা জাকাত আদায় করি, হয়তো আদায়ে কম-বেশি হয়ে যায়। বেশি হলে তো কোনো কথা নেই; কিন্তু কম হলে তো ওই পরিমাণ জাকাত আদায় না করার গুনাহ বাকি থেকে যাবে। এ কারণেই জাকাতের সঠিক মাসায়িল জানা (নামাজের মাসআলা জানার মতোই) প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজে আইন।