📄 তারাবি আল্লাহ তাআলার একান্ত সান্নিধ্য লাভের বিশেষ সুযোগ
তো আলোচনা করছিলাম, রমজানের দ্বিতীয় বিশেষ ইবাদত তারাবি। আমার শায়খ হজরত আরিফি রহ. বলতেন, এটি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনেক বড় ফজল ও করম, দয়া ও মেহেরবানি যে, তিনি রমজানের প্রতিটি রাতে প্রত্যেক মুমিন বান্দার জন্য অতিরিক্ত চল্লিশটি একান্ত সান্নিধ্য দান করেছেন। প্রতি রাতে বিশ রাকাত তারাবিতে চল্লিশটি সিজদা; একেকটি সিজদা আল্লাহ নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভের একেকটি পরম মুহূর্ত। সিজদা আল্লাহ পাকের একান্ত সান্নিধ্য লাভের সর্বোচ্চ স্তর। বান্দা সিজদার হালতে আপন রবের যতটা নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভ করে, তা অন্য কখনো করে না।
এ কারণেই পবিত্র কুরআন মাজিদের এক স্থানে ইরশাদ হয়েছে—
﴿وَاسْجُدْ وَاقْتَرِبْ﴾ সিজদা করো ও নিকটবর্তী হও। [সুরা আলাক: ১৯]
মাত্র দুই শব্দের কী গভীর মর্মসমৃদ্ধ বাণী! কী চমৎকার ব্যঞ্জনা! সিজদা করো আর আমার একান্ত সান্নিধ্যে এসে যাও।
এমনিতে তো আল্লাহ তাআলা বান্দার নিকটেই থাকেন। ইরশাদ হয়েছে-
﴿وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ﴾ আমি তার (বান্দার) গলদেশের ধমনি অপেক্ষাও তার বেশি নিকটবর্তী। [সুরা কাফ: ১৬]
অর্থাৎ যে শিরা দিয়ে পুরো শরীরে রক্ত সঞ্চালন হয়, গ্রীবাস্থিত সেই শিরা হতেও আল্লাহ তাআলা বান্দার অধিক নিকটে! আল্লাহ তো বান্দার এত কাছে; কিন্তু বান্দা?! বান্দা বহু দূরে! বান্দার দিল-দেমাগ, চিন্তা-চেতনা এবং হৃদয় ও আত্মাজুড়ে কেবল গাইরুল্লাহর চিন্তা-ভাবনা, প্রীতি ও আকর্ষণ। অন্তরে গাইরুল্লাহর এই আকর্ষণের কারণে বান্দার অন্তরে আল্লাহর নৈকট্যের অনুভব ও অনুভূতিই থাকে না। ফলাফল এই দাঁড়ায় যে, আল্লাহ গলদেশ হতে নিকটে থাকা সত্ত্বেও বান্দা উদাসীন থাকে, আল্লাহ হতে দূরে থাকার অনুভূতিতে আচ্ছন্ন থাকে।
তাই তো ফার্সি ভাষার জনৈক কবি বলেছেন-
تو که از طرف خویش بمن نزدیکی من که از طرف خویش بغایت دورم
হে আল্লাহ, আপনি তো আপনার দিক থেকে আমার অনেক কাছে! গ্রীবাদেশ থেকেও কাছে! কিন্তু আমি তো আমার দিক থেকে আপনার থেকে দূরে, বহু দূরে!
প্রবৃত্তির ধোঁকা ও চাহিদা, লোভ ও লিপ্সার ফাঁদে পড়ে আমরা আল্লাহর কাছ থেকে অনেক দূরে সরে পড়েছি। সকাল-সন্ধ্যা, দিবস-রজনী পার্থিব নানা চিন্তায় ডুবে আছি। এ বিষয়েই আমার রচিত একটি পঙ্ক্তি হলো—
বড় দূর হ্যায় অভী তক রগে জানে কী মুসাফত
জো দিয়া হ্যায় কুব তো নে তো শউব ভী আতা কর
হে আল্লাহ, এখনও (এত কাছের) গ্রীবাদেশের ধমনী আমার অনুভূতিতে দূর-বহুদূর! তুমি নৈকট্য দানে যখন ধন্য করেছ, নৈকট্যের অনুভূতিও দান করে চির ধন্য করো।
এ কারনেই আল্লাহ পাক আমাদের ডেকে বলছেন, সিজদা করো আর আমার কাছে এসে যাও। আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোচ্চ মাকাম হচ্ছে সিজদা।
সিজদা করার সময় এ চিন্তা করতে হবে যে, আমি কার সামনে মস্তক অবনত করছি? কার দরবারে ললাট স্পর্শ করছি? যদি এ চিন্তা করে আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি হৃদয়ে জাগ্রত করে সিজদা করা হয়, তাহলে কী হবে?
আমাদের বুজুর্গ হজরত খাজা আজিজুল হাসান মজযুব রহ. বলতেন, আল্লাহকে তখন এত সহজে পাওয়া যাবে যে, স্বগত কণ্ঠে উচ্চারিত হবে-
উও ইতনে থে করীব কে দিল হী মে মিল গয়ে
মে জা রাহা থা দূর কে সামান কিয়ে হুয়ে
তিনি ছিলেন এত কাছে! পেয়ে গেলাম হৃদয়-মাঝে! আমি তো বের হচ্ছিলাম দূর সফরের প্রস্তুতি নিয়ে!
তো আরজ করছিলাম প্রতিটি সিজদা একটি বড় নিয়ামত, প্রতিটি সিজদার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে, সান্নিধ্য আরও গভীর ও নিবিড় হতে থাকে। রমজানের ত্রিশ দিনে তারাবির উসিলায় অতিরিক্ত আরও বারশ বার আল্লাহর নিবিড় সান্নিধ্য নসিব হয়। এটি সাধারণ কোনো বিষয় নয়; আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনেক বড় অনুগ্রহ-দান।
সুতরাং রমজানকে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে অতিবাহিত করার একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে-রমজানের বিশেষ ইবাদতসমূহ তথা রোজা ও তারাবি যথাযথভাবে আদায় করা। যদি এভাবে রমজানকে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে অতিবাহিত করা হয়, তাহলে নবীজির ঘোষণা অনুযায়ী আমাদের পুরো বছর শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে অতিবাহিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে আগত রমজান শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে কাটানোর তাওফিক দান করুন। রমজানের বিশেষ ইবাদত রোজা ও তারাবি যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন এবং রমজানের উসিলায় পুরো বছরের শান্তি ও নিরাপত্তা নসিব করুন। আমিন।