📄 রমজানে করতে হবে সহমর্মিতার চর্চা
এরপর নবীজি ইরশাদ করেন— «وَشَهْرُ الْمُوَاسَاةِ»
এ মাস সহমর্মিতার মাস।
এ মাসে মুসলমানদের সহমর্মিতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। রমজানে আমাদের কর্তব্য-পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী বরং পুরো মুসলিম উম্মাহর প্রতি কল্যাণকামী হয়ে হামদর্দি ও সহমর্মিতা প্রকাশে সচেষ্ট হওয়া।
«وَشَهْرُ يُزَادُ فِي رِزْقِ الْمُؤْمِنِ» আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বছরের অন্যান্য দিনের তুলনায় রমজান মাসে মুমিনদের প্রতি দান ও অনুগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়।
লক্ষ করলে দেখবেন, যত দরিদ্র ব্যক্তিই হোক না কেন, রমজান মাসে ইফতারের সময় তার দস্তরখানে বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় উৎকৃষ্ট মানের খাবারের ইনতেজাম হয়। এটি মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিন বান্দাদের প্রতি বড় দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি রমজান মাসে তাদের রিজিক বৃদ্ধি করে দেন।
এরপর নবীজি ইরশাদ করেন- «مَنْ فَطَّرَ فِيْهِ صَائِمًا كَانَ لَهُ মَغْفِرَةً لِذُنُوْبِهِ، وَعِتْقَ رَقَبَتِهِ مِنَ النَّارِ، وَكَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يُنْقَصَ مِنْ أَجْرِهِ شَيْءٌ» যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, এই ইফতার করানোর উসিলায় তার গুনাহ মাফ করা হবে এবং সে জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি লাভ করবে। শুধু তাই নয়, বরং কোনো রোজাদারকে ইফতার করালে উক্ত রোজাদার রোজা রেখে যে সাওয়াব লাভ করেছে, ইফতারের ব্যবস্থাকারীও সমপরিমাণ সাওয়াব লাভ করবে।
কেউ মনে করতে পারে যে, ইফতারের ব্যবস্থাকারীকে যখন সাওয়াব প্রদান করা হবে, তাহলে নিশ্চয়ই তা রোজাদারের সাওয়াব থেকে হ্রাস করা হবে। নবীজি এই সন্দেহকে দূর করার জন্য এরপর ইরশাদ করেছেন যে, না, রোজাদারের সাওয়াব থেকে কিছুই হ্রাস করা হবে না; বরং ইফতারের ব্যবস্থাকারীকে ভিন্নভাবে সমপরিমাণ সাওয়াব প্রদান করা হবে।
এ কথা শোনার পর উপস্থিত সাহাবিদের মধ্য হতে কেউ আরজ করল- «لَيْسَ كُلُّنَا يَجِدُ مَا يُفْطِرُ الصَّائِمَ» আমাদের প্রত্যেকের তো এই সামর্থ্য নেই যে, কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে।
এটা নবীযুগের কথা, যখন মুসলমানদের আর্থিক সঙ্গতি ভালো ছিল না, আয়-উপার্জনও কম ছিল। তাই তারা এ প্রশ্ন করেছিলেন।
সাহাবিদের প্রশ্নের উত্তরে নবীজি বললেন-
«يُعْطِي اللهُ هذَا الثَّوَابَ مَنْ فَطَرَ صَائِمًا عَلَى مَذْقَةِ لَبَنٍ أَوْ تَمْرَةٍ أَوْ شَرْبَةٍ مِنْ مَاءٍ» যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে এক ঢোক দুধ পান করাবে কিংবা একটি খেজুর; তাও সামর্থ্য না হলে সামান্য পানি পান করাবে, আল্লাহ পাক তাকেও উল্লিখিত সাওয়াব দান করবেন।
আল্লাহু আকবার! আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কত মহান! কী অসীম তার দান!
এরপর নবীজি বলেন-
«وَمَنْ أَشْبَعَ صَائِمًا سَقَاهُ اللَّهُ مِنْ حَوْضِيْ شَرْبَةً لَا يَظْمَأُ حَتَّى يَدْخُلَ الْجَنَّةَ» আর যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে তৃপ্তি সহকারে খাওয়াবে, আল্লাহ পাক তাকে আমার হাউজ থেকে অর্থাৎ হাউজে কাওসার থেকে পানি পান করাবেন। এর ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত আর পিপাসার্ত হবে না।
এরপর নবীজি ইরশাদ করেন-
«وَهُوَ شَهْرُ أَوَّلُه رَحْمَةٌ، وَأَوْسَطُهُ مَغْفِرَةٌ، وَآخِرُه عِتْقُ مِنَ النَّارِ» এ রমজান মাসের প্রথম অংশ রহমতের, মধ্যম অংশ মাগফিরাত ও ক্ষমার এবং শেষ অংশ জাহান্নাম হতে পরিপূর্ণ নিষ্কৃতি প্রদানের জন্য নির্ধারিত।
নবীজি এরপর ইরশাদ করেন-
«مَنْ خَفَّفَ عَنْ مَمْلُوكِهِ فِيْهِ غَفَرَ اللَّهُ لَهُ وَأَعْتَقَهُ مِنَ النَّارِ» আর যে ব্যক্তি এ মাসে তার অধীনস্থ ব্যক্তির বোঝা হালকা করবে, অর্থাৎ সে চিন্তা করবে, বেচারার রোজা রেখে এত কাজ করতে কষ্ট হবে এবং এ চিন্তা করে সে তার অধীনস্থ ব্যক্তির কাজের ভার লাঘব করতে সচেষ্ট হবে; আল্লাহ পাক তাকে মাগফিরাত ও ক্ষমার পুরস্কারে ভূষিত করবেন এবং জাহান্নাম হতে নিষ্কৃতি দান করবেন।
এই যে রমজান মাসে অন্যকে ইফতার করানোর, অধীনস্থদের কাজের ভার লাঘব করার এত ফজিলত ও এত পুরস্কার, এর একটাই উদ্দেশ্য— বান্দাকে রমজান মাসে সহমর্মিতার অনুশীলন করানো।
এই হলো মাহে রমজানের সেসব ফাজায়িল ও বৈশিষ্ট্য, যা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের একদিন পূর্বে সাহাবিদের সামনে বর্ণনা করেছিলেন।
রমজানের একদিন পূর্বেই আলোচনা করার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব থেকেই যেন সবাই প্রস্তুতি নিতে পারে।
রমজান মাসে আল্লাহ পাক মাগফিরাত ও ক্ষমার দরজা উন্মুক্ত করে দেন।
এ মাসে রহমতের বারিধারা মুষলধারে বর্ষিত হতে থাকে। এ মাসে ছোট ছোট আমলের জন্যও বড় বড় আজর ও সাওয়াব প্রদানের ওয়াদা করা রয়েছে। এজন্য মুসলমান ভাইদের প্রতি নিবেদন এই যে, এ মাসের সময়সূচি আমরা এমনভাবে বিন্যস্ত করব, যাতে অধিকাংশ সময়কে ইবাদতের জন্য ফারিগ করতে পারি। এ মাসে আমরা নফল নামাজ, তাসবিহ-তিলাওয়াত ইত্যাদি কাজে অধিকাংশ সময় ব্যয় করব। বছরের অন্যান্য সময়ে কুরআন তিলাওয়াতের তাওফিক হয় না, রমজান তো কুরআনেরই মাস, এ মাসের সঙ্গে কুরআনের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে, তাই এ মাসে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করব। চলতে-ফিরতে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ, আল্লাহু আকবার ইত্যাদি তাসবিহ বেশি বেশি পাঠ করব। অন্যান্য কাজ যতটা পারি, এ মাসের রুটিন হতে বাদ দেবো; একান্ত সম্ভব না হলে যথাসম্ভব সংক্ষেপে করতে সচেষ্ট হব।
এগারো মাস আমরা পার্থিব ব্যস্ততায় নিমগ্ন ছিলাম। যদিও পার্থিব ব্যবস্থায় নিমগ্নতার অনুমতি আছে; কিন্তু এর ফলে আমরা আমাদের রবকেই ভুলে গেছি। আল্লাহ পাক এই এক মাস দান করেছেন এগারো মাসের গাফলতকে ইবাদত দ্বারা দূর করতে, উদাসীনতার মরিচা দূর করে হৃদয়ে ঈমানের নুর বৃদ্ধি করতে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের মাঝে যে দুর্বলতা এসে গেছে, তা সবল ও মজবুত করতে।
সঙ্গে সঙ্গে আমরা এ বিষয়েও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হব যে, পানাহারের মতো হালাল বিষয় আমরা এ মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যখন ছাড়তে পেরেছি; সুতরাং যেসব কাজ সর্বাবস্থায় হারাম, তা আমরা এ মাসে কিছুতেই করব না। চোখের হেফাজত করব, জবানের হেফাজত করব, কানের হেফাজত করব, হালাল খাবার দ্বারা ইফতার করব। সুদ-ঘুষ-জুয়ার অর্থসহ সবধরনের অবৈধ অর্থ উপার্জন থেকে বিরত থাকব। এটা কত বড় লজ্জার বিষয় হবে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখছি আর ইফতার করছি হারাম মাল দিয়ে!
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আপন দয়া ও অনুগ্রহে আমাকে-আপনাদেরকে, আমাদের সবাইকে এ সমস্ত কথার ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
২৪. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং ৪৬।
২৫. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং ৪।