📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 রমজানকে স্বাগত জানাতে হবে নবীজির হিদায়াত অনুসারে

📄 রমজানকে স্বাগত জানাতে হবে নবীজির হিদায়াত অনুসারে


আমাদের দেশে এবং কিছু আরব দেশেও রমজানের পূর্বে ইসতেকবালে মাহে রমজান বা স্বাগত মাহে রমজান নামে কিছু জলসা, মাহফিল ও আলোচনা-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এটি একটি রুসম ও প্রথা মাত্র। সাহাবায়ে কেরামের বরকতময় ও প্রামাণ্য যুগে রমজানকে স্বাগত জানানোর এ জাতীয় কোনো আয়োজনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না।

কেউ যদি মাহে রমজানকে স্বাগত জানাতেই চায়, তাহলে প্রকৃত অর্থে ইসতেকবালে রমজান হলো রমজান আগমনের পূর্বেই রমজানের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা এবং ইবাদত ও আমলের জন্য নিজেকে পূর্ণ অবসর করা।

নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান আগমনের একদিন পূর্বে শাবানের শেষ দিন সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশে একটি খুতবা প্রদান করেছিলেন এবং উক্ত খুতবায় রমজানুল মোবারকের ফজিলত ও মর্যাদা, গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য এবং রমজান মাস সঠিকভাবে অতিবাহিত করার পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। আজ ইনশাআল্লাহ সে খুতবাটিই জুমার খুতবা হিসেবে পাঠ করা হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মোবারক মাসের এক দিন পূর্বে খুতবার মধ্যে এ মাসের যে গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, তা-ই আজ আপনাদের সামনে আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।

হজরত সালমান ফারসি রাযি. বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসের শেষ দিন আমাদের উদ্দেশে খুতবা প্রদান করেন।²² খুতবায় নবীজি ইরশাদ করেন-
«يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ أَظَلَّكُمْ شَهْرٌ عَظِيمٌ، شَهْرٌ مُبَارَكٌ، شَهْرٌ فِيهِ لَيْلَةً خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ»
উপস্থিত লোকসকল, তোমাদের ওপর ছায়া বিস্তার করতে যাচ্ছে মর্যাদাসম্পন্ন একটি মাস, অত্যন্ত বরকতময় একটি মাস। এ মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাস হতেও উত্তম।
«جَعَلَ اللهُ صِيَامَه فَرِيْضَةً، وَقِيَامَ لَيْلِهِ تَطَوُّعًا»
আল্লাহ তাআলা এ রমজান মাসের দিনে রোজা রাখা ফরজ করেছেন এবং রাতে দণ্ডায়মান হয়ে নামাজ পড়া নফল (অর্থাৎ ফরজের স্তরের আবশ্যকীয় নয়) করেছেন।
«مَنْ تَقَرَّبَ فِيْهِ بِخَصْلَةٍ مِنَ الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَى فَرِيضَةً فِيْمَا সِوَاهُ»
যে ব্যক্তি এ মাসে কোনো সৎ-কর্ম করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট হবে, সাওয়াব অর্জনের ক্ষেত্রে সে ওই ব্যক্তির ন্যায় হবে, যে রমজান ছাড়া অন্য মাসে কোনো ফরজ আদায় করেছে।
অর্থাৎ রমজান মাসে নফল পর্যায়ের কোনো নেক আমল করলে বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা অন্যান্য মাসের ফরজ আমলের সমপর্যায়ের সাওয়াব দান করবেন।

ফরজ ইবাদতের সাওয়াব নফলের ইবাদতের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের সাওয়াব অন্য যেকোনো নফল নামাজের চেয়ে বেশি। কিন্তু নবীজি ইরশাদ করলেন যে, কোনো ব্যক্তি রমজান মাসে যদি নফল কোনো ইবাদতও করে, তাহলে এ নফলের পরিবর্তেই আল্লাহ পাক তাকে ওই পরিমাণ সাওয়াব দান করবেন, যা তিনি অন্য মাসে ফরজের পরিবর্তে দান করে থাকেন।
«وَمَنْ أَدَى فَرِيضَةً فِيْهِ كَانَ كَمَنْ أَدَى سَبْعِينَ فَرِيضَةً فِيْمَا سِوَاهُ»
আর যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো ফরজ ইবাদত আদায় করবে, অর্থাৎ ফরজ নামাজ পড়বে কিংবা ফরজ রোজা রাখবে অথবা ফরজ জাকাত আদায় করবে; আল্লাহ তাআলা তাকে ওই ব্যক্তির সমপরিমাণ সাওয়াব দান করবেন, যে রমজান ছাড়া অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আদায় করেছে।
অর্থাৎ এক রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করলে সত্তর রাকাত ফরজ আদায়ের সাওয়াব! ফজরের দুই রাকাত ফরজ আদায় করলে একশ চল্লিশ রাকাত ফরজ আদায়ের সাওয়াব! জোহরের চার রাকাত ফরজ আদায় করলে দুইশ আশি রাকাত ফরজ আদায়ের সাওয়াব!

টিকাঃ
২২. পুরো হাদিসটির মূল পাঠ একসঙ্গে দেখুন: পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং ৪।

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 রমজানে করতে হবে সবরের অনুশীলন

📄 রমজানে করতে হবে সবরের অনুশীলন


এরপর নবীজি ইরশাদ করেন-
«وَهُوَ شَهْرُ الصَّبْرِ» এ মাস সবরের মাস।

নবীজির এ উক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। আমরা সাধারণত বুঝি বিপদ-আপদ ও মুসিবতে, দুঃখ-কষ্টে কিংবা কোনো শোকসংবাদে হা-হুতাশ না করে ধৈর্যধারণ করাকে সবর বলে। কিন্তু কুরআন-হাদিসের পরিভাষায় সবরের মর্ম ও উদ্দেশ্য আরও ব্যাপক। সবর অর্থ নফস ও প্রবৃত্তি পছন্দ করছে না, এমন কোনো কাজে নিজেকে জোরপূর্বক বাধ্য করা।

কোনো একটি নেক কাজ করতে মন চাচ্ছে না; কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মনের চাহিদার বিপরীতে কাজটি করলাম, এর নামও সবর। উদাহরণস্বরূপ নামাজের ওয়াক্ত হওয়া সত্ত্বেও নামাজ পড়তে মন চাচ্ছে না; অলসতা বা ক্লান্তি লাগছে, ঘুম পাচ্ছে, তারপরও নিজের মনের এই চাহিদাকে প্রত্যাখ্যান করে নামাজের উদ্দেশে রওনা করলাম, তো এর নামও সবর।

কিংবা মনে গুনাহর কোনো কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। নফস না-মাহরাম মহিলার দিকে তাকিয়ে আনন্দ অনুভব করতে চাচ্ছে, অবৈধ দৃষ্টি বা শ্রবণের মাধ্যমে প্রবৃত্তির চাহিদা চরিতার্থ করতে চাচ্ছে; কিন্তু আমি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বিধান স্মরণ করলাম; মনে মনে এই চিন্তা করলাম যে, আল্লাহ আমাকে দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির মতো অমূল্য নিয়ামত দান করেছেন, আমি এ নিয়ামতকে আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে ব্যবহার করব না; এই চিন্তা করার পর আমি আমার চোখ ও কানকে নফসের অন্যায় চাহিদা হতে বিরত রাখলাম, তাহলে এর নামও সবর।

কোনো বিপদে আক্রান্ত হলাম, কষ্ট-মুসিবতের সম্মুখীন হলাম; মন বিদ্রোহী হয়ে উঠল, তাকদির ও ভাগ্যের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে আল্লাহর প্রতি অভিযোগ করতে ইচ্ছা করল, আল্লাহ শুধু আমাকে দেখলেন, বিপদে ফেলার জন্য আর কাউকে পেলেন না; কিন্তু মনের এই অন্যায় চিন্তাকে দমন করলাম। চিন্তা করলাম যে, এই বিপদ-আপদ, দুর্যোগ-দুর্বিপাক আল্লাহরই ইচ্ছা; আল্লাহরই ফয়সালা। আল্লাহ তাআলা একদিকে যেমন হাকিম ও বিধানদাতা, আরেকদিকে হাকিম ও মহা প্রজ্ঞাবান; তিনি কোনো কারণ ব্যতিরেকে একচ্ছত্র ফয়সালার ক্ষমতা যদিও রাখেন, কিন্তু তার প্রতিটি ফয়সালা হিকমত ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ। আমার স্থূল দৃষ্টিতে যদিও এটি বিপদ; কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রজ্ঞাপূর্ণ এই ফয়সালায় অবশ্যই আমার জন্য কোনো কল্যাণ নিহিত আছে। এই চিন্তা করে আমি আল্লাহর ফয়সালা অবনত মস্তকে মেনে নিলাম। তাহলে এটিও সবর।

সুতরাং কুরআন-সুন্নাহর পরিভাষায় সবরের প্রকৃত ও সুসমৃদ্ধ অর্থ হচ্ছে— আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের প্রবৃত্তি ও মনকে মনের অপছন্দনীয় বিষয়ে বাধ্য করা। আর রমজান মাস হচ্ছে এই ব্যাপক ও সুসমৃদ্ধ অর্থবিশিষ্ট সবরের মাস। রমজান মাসে এই পারিভাষিক সবরের প্রশিক্ষণ নিতে হবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নফস ও প্রবৃত্তির সকল অন্যায় চাহিদাকে প্রত্যাখ্যান করার অনুশীলন করতে হবে।

রমজান মাসে যখন আমরা রোজা রাখি এবং নিজের জন্য পুরো দিন পানাহারকে হারাম করে নিই, তখন যতই ক্ষুধা লাগে, প্রচণ্ড গরমের দিনও হয়, পিপাসায় কাতরও হয়, সামনে মজাদার খাবার কিংবা বরফ-শীতল পানীয় বিদ্যমান থাকে, যতই আহার করতে কিংবা পান করতে মন চায়; আমরা পানাহার থেকে বিরত থাকি। মনের চাহিদা সত্ত্বেও এই যে পানাহার থেকে বিরত থাকা, আল্লাহর হুকুমকে স্মরণ করে নফসের তাকাজা প্রত্যাখ্যান করা, এরই নাম সবর। পুরো রমজানে এভাবেই সবরের প্রশিক্ষণ নেওয়া হয়।

এই এক ধরনের সবরের বিধানের মাধ্যমে আল্লাহ পাক বান্দাকে সব ধরনের সবরের চর্চা করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আল্লাহ যেন বান্দাকে লক্ষ্য করে বলছেন, 'বান্দা, রমজান মাসের দিবসে তুমি যেমন পানাহার হতে বিরত থেকে সবরের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছ, ক্ষুধা ও পিপাসা লাগা সত্ত্বেও আমার আনুগত্যের উদ্দেশ্যে নফসের চাহিদাকে প্রত্যাখ্যান করেছ; ঠিক তেমনই জীবনের সকল অঙ্গনে, আচরণ-উচ্চারণ ও চিন্তার প্রতিটি ক্ষেত্রে যখনই নফস ও প্রবৃত্তি আমার হুকুমের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করতে প্ররোচিত করবে; তখনও নফসের চাহিদাকে প্রত্যাখ্যান করে সবরের পরিচয় দেবে। তুমি পানাহারের ক্ষেত্রে সবরের চর্চা করার মাধ্যমে জীবনের সকল ক্ষেত্রে সবরে অভ্যস্ত হবে।'

তো এই কারনেই নবীজি ইরশাদ করেছেন, এ মাস সবরের মাস। এরপর নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন— «وَالصَّبْرُ ثَوَابُهُ الْجَنَّةُ»
সবরের প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত।
আখিরাতে সাওয়াব লাভ ও জান্নাত লাভ সবরের কারনেই হবে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
وَجَزْهُمْ بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَحَرِيرًا
এবং তারা যে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিল তার প্রতিদানে (আল্লাহ) তাদেরকে জান্নাত ও রেশমি পোশাক দান করবেন। [সুরা দাহর: ১২]

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 রমজানে করতে হবে সহমর্মিতার চর্চা

📄 রমজানে করতে হবে সহমর্মিতার চর্চা


এরপর নবীজি ইরশাদ করেন— «وَشَهْرُ الْمُوَاسَاةِ»
এ মাস সহমর্মিতার মাস।

এ মাসে মুসলমানদের সহমর্মিতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। রমজানে আমাদের কর্তব্য-পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী বরং পুরো মুসলিম উম্মাহর প্রতি কল্যাণকামী হয়ে হামদর্দি ও সহমর্মিতা প্রকাশে সচেষ্ট হওয়া।
«وَشَهْرُ يُزَادُ فِي رِزْقِ الْمُؤْمِنِ» আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বছরের অন্যান্য দিনের তুলনায় রমজান মাসে মুমিনদের প্রতি দান ও অনুগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়।

লক্ষ করলে দেখবেন, যত দরিদ্র ব্যক্তিই হোক না কেন, রমজান মাসে ইফতারের সময় তার দস্তরখানে বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় উৎকৃষ্ট মানের খাবারের ইনতেজাম হয়। এটি মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিন বান্দাদের প্রতি বড় দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি রমজান মাসে তাদের রিজিক বৃদ্ধি করে দেন।

এরপর নবীজি ইরশাদ করেন- «مَنْ فَطَّرَ فِيْهِ صَائِمًا كَانَ لَهُ মَغْفِرَةً لِذُنُوْبِهِ، وَعِتْقَ رَقَبَتِهِ مِنَ النَّارِ، وَكَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يُنْقَصَ مِنْ أَجْرِهِ شَيْءٌ» যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, এই ইফতার করানোর উসিলায় তার গুনাহ মাফ করা হবে এবং সে জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি লাভ করবে। শুধু তাই নয়, বরং কোনো রোজাদারকে ইফতার করালে উক্ত রোজাদার রোজা রেখে যে সাওয়াব লাভ করেছে, ইফতারের ব্যবস্থাকারীও সমপরিমাণ সাওয়াব লাভ করবে।

কেউ মনে করতে পারে যে, ইফতারের ব্যবস্থাকারীকে যখন সাওয়াব প্রদান করা হবে, তাহলে নিশ্চয়ই তা রোজাদারের সাওয়াব থেকে হ্রাস করা হবে। নবীজি এই সন্দেহকে দূর করার জন্য এরপর ইরশাদ করেছেন যে, না, রোজাদারের সাওয়াব থেকে কিছুই হ্রাস করা হবে না; বরং ইফতারের ব্যবস্থাকারীকে ভিন্নভাবে সমপরিমাণ সাওয়াব প্রদান করা হবে।

এ কথা শোনার পর উপস্থিত সাহাবিদের মধ্য হতে কেউ আরজ করল- «لَيْسَ كُلُّنَا يَجِدُ مَا يُفْطِرُ الصَّائِمَ» আমাদের প্রত্যেকের তো এই সামর্থ্য নেই যে, কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে।

এটা নবীযুগের কথা, যখন মুসলমানদের আর্থিক সঙ্গতি ভালো ছিল না, আয়-উপার্জনও কম ছিল। তাই তারা এ প্রশ্ন করেছিলেন।
সাহাবিদের প্রশ্নের উত্তরে নবীজি বললেন-
«يُعْطِي اللهُ هذَا الثَّوَابَ مَنْ فَطَرَ صَائِمًا عَلَى مَذْقَةِ لَبَنٍ أَوْ تَمْرَةٍ أَوْ شَرْبَةٍ مِنْ مَاءٍ» যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে এক ঢোক দুধ পান করাবে কিংবা একটি খেজুর; তাও সামর্থ্য না হলে সামান্য পানি পান করাবে, আল্লাহ পাক তাকেও উল্লিখিত সাওয়াব দান করবেন।

আল্লাহু আকবার! আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কত মহান! কী অসীম তার দান!

এরপর নবীজি বলেন-
«وَمَنْ أَشْبَعَ صَائِمًا سَقَاهُ اللَّهُ مِنْ حَوْضِيْ شَرْبَةً لَا يَظْمَأُ حَتَّى يَدْخُلَ الْجَنَّةَ» আর যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে তৃপ্তি সহকারে খাওয়াবে, আল্লাহ পাক তাকে আমার হাউজ থেকে অর্থাৎ হাউজে কাওসার থেকে পানি পান করাবেন। এর ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত আর পিপাসার্ত হবে না।

এরপর নবীজি ইরশাদ করেন-
«وَهُوَ شَهْرُ أَوَّلُه رَحْمَةٌ، وَأَوْسَطُهُ مَغْفِرَةٌ، وَآخِرُه عِتْقُ مِنَ النَّارِ» এ রমজান মাসের প্রথম অংশ রহমতের, মধ্যম অংশ মাগফিরাত ও ক্ষমার এবং শেষ অংশ জাহান্নাম হতে পরিপূর্ণ নিষ্কৃতি প্রদানের জন্য নির্ধারিত।

নবীজি এরপর ইরশাদ করেন-
«مَنْ خَفَّفَ عَنْ مَمْلُوكِهِ فِيْهِ غَفَرَ اللَّهُ لَهُ وَأَعْتَقَهُ مِنَ النَّارِ» আর যে ব্যক্তি এ মাসে তার অধীনস্থ ব্যক্তির বোঝা হালকা করবে, অর্থাৎ সে চিন্তা করবে, বেচারার রোজা রেখে এত কাজ করতে কষ্ট হবে এবং এ চিন্তা করে সে তার অধীনস্থ ব্যক্তির কাজের ভার লাঘব করতে সচেষ্ট হবে; আল্লাহ পাক তাকে মাগফিরাত ও ক্ষমার পুরস্কারে ভূষিত করবেন এবং জাহান্নাম হতে নিষ্কৃতি দান করবেন।

এই যে রমজান মাসে অন্যকে ইফতার করানোর, অধীনস্থদের কাজের ভার লাঘব করার এত ফজিলত ও এত পুরস্কার, এর একটাই উদ্দেশ্য— বান্দাকে রমজান মাসে সহমর্মিতার অনুশীলন করানো।

এই হলো মাহে রমজানের সেসব ফাজায়িল ও বৈশিষ্ট্য, যা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের একদিন পূর্বে সাহাবিদের সামনে বর্ণনা করেছিলেন।

রমজানের একদিন পূর্বেই আলোচনা করার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব থেকেই যেন সবাই প্রস্তুতি নিতে পারে।

রমজান মাসে আল্লাহ পাক মাগফিরাত ও ক্ষমার দরজা উন্মুক্ত করে দেন।

এ মাসে রহমতের বারিধারা মুষলধারে বর্ষিত হতে থাকে। এ মাসে ছোট ছোট আমলের জন্যও বড় বড় আজর ও সাওয়াব প্রদানের ওয়াদা করা রয়েছে। এজন্য মুসলমান ভাইদের প্রতি নিবেদন এই যে, এ মাসের সময়সূচি আমরা এমনভাবে বিন্যস্ত করব, যাতে অধিকাংশ সময়কে ইবাদতের জন্য ফারিগ করতে পারি। এ মাসে আমরা নফল নামাজ, তাসবিহ-তিলাওয়াত ইত্যাদি কাজে অধিকাংশ সময় ব্যয় করব। বছরের অন্যান্য সময়ে কুরআন তিলাওয়াতের তাওফিক হয় না, রমজান তো কুরআনেরই মাস, এ মাসের সঙ্গে কুরআনের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে, তাই এ মাসে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করব। চলতে-ফিরতে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ, আল্লাহু আকবার ইত্যাদি তাসবিহ বেশি বেশি পাঠ করব। অন্যান্য কাজ যতটা পারি, এ মাসের রুটিন হতে বাদ দেবো; একান্ত সম্ভব না হলে যথাসম্ভব সংক্ষেপে করতে সচেষ্ট হব।

এগারো মাস আমরা পার্থিব ব্যস্ততায় নিমগ্ন ছিলাম। যদিও পার্থিব ব্যবস্থায় নিমগ্নতার অনুমতি আছে; কিন্তু এর ফলে আমরা আমাদের রবকেই ভুলে গেছি। আল্লাহ পাক এই এক মাস দান করেছেন এগারো মাসের গাফলতকে ইবাদত দ্বারা দূর করতে, উদাসীনতার মরিচা দূর করে হৃদয়ে ঈমানের নুর বৃদ্ধি করতে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের মাঝে যে দুর্বলতা এসে গেছে, তা সবল ও মজবুত করতে।

সঙ্গে সঙ্গে আমরা এ বিষয়েও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হব যে, পানাহারের মতো হালাল বিষয় আমরা এ মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যখন ছাড়তে পেরেছি; সুতরাং যেসব কাজ সর্বাবস্থায় হারাম, তা আমরা এ মাসে কিছুতেই করব না। চোখের হেফাজত করব, জবানের হেফাজত করব, কানের হেফাজত করব, হালাল খাবার দ্বারা ইফতার করব। সুদ-ঘুষ-জুয়ার অর্থসহ সবধরনের অবৈধ অর্থ উপার্জন থেকে বিরত থাকব। এটা কত বড় লজ্জার বিষয় হবে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখছি আর ইফতার করছি হারাম মাল দিয়ে!

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আপন দয়া ও অনুগ্রহে আমাকে-আপনাদেরকে, আমাদের সবাইকে এ সমস্ত কথার ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

টিকাঃ
২৪. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং ৪৬।
২৫. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং ৪।

ফন্ট সাইজ
15px
17px