📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 মাহে রমজানের দাবি সৃষ্টি-উদ্দেশ্যের দিকে প্রত্যাবর্তন

📄 মাহে রমজানের দাবি সৃষ্টি-উদ্দেশ্যের দিকে প্রত্যাবর্তন


আল্লাহ ভালো করেই জানেন—এমন বৈধতা দানের ফলাফল এই দাঁড়াবে যে, ভালো-মন্দ উভয় ধরণের কর্মযোগ্যতার অধিকারী মানুষ যখন পার্থিব কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে, তখন ধীরে ধীরে আখিরাত ও আখিরাতের বিধি-বিধান ভুলে যাবে।

জায়েজ পদ্ধতিতে ব্যবসা করার অনুমতি আছে, চাকরি করার অনুমতি আছে। কিন্তু জায়েজ ব্যবসা বা চাকরি করতে গিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে তাতেই ডুবে যায়; অন্তরে গাফলতের মরিচা পড়ে, সম্পদপ্রীতির পর্দা পড়ে যায়।

এ ধরনের গাফলত ও সম্পদপ্রীতির মরিচা দূর করতে আল্লাহ পাক কিছু বিধি-বিধান রেখেছেন। মাহে রমজানের রোজা তারই একটি।

বছরের এগারো মাস পানাহারের অবাধ অনুমতি ছিল, মনমতো কথাবার্তা বলা এবং নির্দোষ রসিকতা ও হাসি-ঠাট্টা করার অনুমতি ছিল। মানুষ এগারো মাস এসব পার্থিব কাজেই ব্যস্ত ছিল। এখন এক মাস আল্লাহ পাক নির্ধারণ করেছেন সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যের দিকে প্রত্যাবর্তনের জন্য; ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকার জন্য।

আল্লাহ যেন আপন বান্দাদের সম্বোধন করে বলছেন, 'বান্দা! আপন সৃষ্টি-উদ্দেশ্যের দিকে ফিরে এসো, ইবাদতে নিমগ্ন হও; বিগত এগারো মাসে যেসব গুনাহ করে ফেলেছ, তা মাফ করিয়ে নাও; সৎকর্মের স্বভাবযোগ্যতার ওপর ময়লার যে আবরণ পড়েছে, তা ধুয়ে ফেলো; গাফলতের যে পর্দা অন্তরকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে, তা ছিঁড়ে ফেলো। এ মাস তোমার রাব্বে কারিমের দিকে প্রত্যাবর্তনের মাস, আপন সৃষ্টি-উদ্দেশ্যের দিকে ফিরে আসার মাস।'

আপনারা কি রমজান শব্দের অর্থ জানেন? উর্দু (ও বাংলা) ভাষায় 'রমজান' বলা হলেও আরবিতে এর সঠিক উচ্চারণ হচ্ছে মীম বর্ণে যবর যোগে 'রমাযান'। কুরআনে শব্দটি এ উচ্চারণেই এসেছে। আরবিতে 'রমাযান' শব্দের অর্থ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ভষ্মকারী। কতক ভাষাবিদের অভিমত হলো, সর্বপ্রথম এ মাস যেহেতু প্রচণ্ড গরমের মধ্যে এসেছিল, তাই গরমের আতিশয্য বোঝাতে এ মাসের নাম রাখা হয়েছে রমাযান। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমগণের মত হলো—আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেহেতু এ মাসে আপন ফজল ও করমে, দয়া ও অনুগ্রহে বান্দার গুনাহকে জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দেন, তাই এ মাসের নাম 'রমাযান' বা ভষ্মকারী মাস।

সুতরাং এ মাসের উদ্দেশ্য হচ্ছে এগারো মাস দুনিয়াবি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকায় অন্তরে যে গাফলত ছড়িয়ে পড়েছে, তা দূর করা; এগারো মাস যেসব গুনাহ হয়ে গেছে, আল্লাহর কাছ থেকে তা ক্ষমা করিয়ে নেওয়া।

এ কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
( يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ )
হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে; যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমাদের মধ্যে তাকওয়া সৃষ্টি হয়। [সুরা বাকারা: ১৮৩]

মোটকথা, রমজান মাসের দাবি কেবল রোজা রাখা ও তারাবি পড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এ মাসের দাবি হলো মাসের সর্বোচ্চ থেকে সর্বোচ্চ সময়কে কর্ম-ব্যস্ততা মুক্ত করে আপন উদ্দেশ্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করা। পুরো মাস বা মাসের অধিকাংশ সময়কে পার্থিব ঝামেলামুক্ত রেখে ইবাদতে ব্যয় করার প্রস্তুতি গ্রহণ করা। বস্তুত এরই নাম হচ্ছে ‘ইসতিকবালে রমাযান’ বা রমজানকে স্বাগত জানানো।

বর্তমানে মিশর, সিরিয়াসহ আরববিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং সেখানকার অনুকরণে আমাদের দেশে ইসতিকবালে রমাযান নামে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কুরআন তিলাওয়াত, হামদ-নাত ও আলোচনা মাহফিলের মাধ্যমে রমজানকে স্বাগত জানানো হয়। এসব অনুষ্ঠান আয়োজনের পেছনের উদ্দেশ্য তো মহৎ, জযবা ও উদ্দীপনা তো নির্দোষ; কিন্তু কখনো কখনো এই নেক জযবা ও নির্দোষ উদ্দীপনাই বাড়তে বাড়তে ভবিষ্যতে বিদআতের রূপ ধারণ করে।

প্রকৃতপক্ষে রমজানের ইসতিকবাল ও অভ্যর্থনা হচ্ছে নিজের স্বাভাবিক দৈনন্দিন কর্মসূচিকে পরিবর্তন করে অধিকাংশ সময়কে ইবাদতের জন্য ফারেগ করা, ব্যস্ততা কমিয়ে ইবাদতে বেশি সময় দেওয়া।

এই মনোভাব সামনে রেখে রমজান মাস কাটালে এ মাসের রূহ ও রূহানিয়াত, প্রাণ ও প্রাণশক্তি, রহমত ও বরকত এবং দান ও কল্যাণ অর্জিত হবে, ইনশাআল্লাহ। আর যদি এই মনোভাব না থাকে, রমজানে ইবাদতে নিমগ্ন থাকার ফিকির ও মনোভাব, তৈয়ারি ও প্রস্তুতি না থাকে; তাহলে প্রথাগতভাবে রমজান আসবে, চলেও যাবে, গাফলতের পর্দাও দূর হবে না, গুনাহর খাতাও পরিষ্কার হবে না।

তো আজকের আলোচনার প্রথম বিষয় এই যে, প্রথমে আমি নিজে এবং আমরা সকলে রমজানের জন্য সঠিক সময়সূচি-কর্মসূচি তৈরি করে তা অনুযায়ী আমল করার প্রস্তুতি নেব। রমজানের পূর্বে আজই ঠিক করে নেবো—রমজানে ইবাদতে নিমগ্ন থাকার জন্য কোন কোন কাজ একেবারেই বাদ দেবো, কোন কোন কাজ স্থগিত বা বিলম্বিত করব। সর্বোচ্চ চেষ্টা করব এ মাসকে যাবতীয় কর্মমুক্ত রাখার।

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 মাহে রমজানে কী আমল করব?

📄 মাহে রমজানে কী আমল করব?


দ্বিতীয় আলোচ্য বিষয় এই যে, যখন এ মাসকে ইবাদতের জন্য ফারেগ করলাম তো এ মাসে কী ইবাদত করব? এ মাস কীভাবে অতিবাহিত করব?

এ মাসে রোজা রাখা, তারাবি পড়ার কথা তো আমরা সকলেই জানি। আলহামদুলিল্লাহ, ঈমানের অতি সামান্য আলোকচ্ছটাও যার অন্তরে বিদ্যমান আছে, তার মাঝে মাহে রমজানের আজমত ও বড়ত্বের অনুভূতি জাগ্রত থাকে এবং সে এ মাসে যথাসম্ভব নফল ইবাদত, জিকির-আজকার ও কুরআন তিলাওয়াতে নিমগ্ন থাকে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে আরও বেশি বেশি ইবাদতের তাওফিক দান করুন।

কিন্তু আমি আপনারকে ভিন্ন একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। নিঃসন্দেহে বেশি বেশি নফল নামাজ, জিকির ও তিলাওয়াত, এগুলো অত্যন্ত উত্তম আমল। কিন্তু এ সবই হচ্ছে নফল; এরচেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বের দাবিদার একটি ফরজ আমল, যার প্রতি আমাদের মোটেই ভ্রুক্ষেপ নেই। আর তা হচ্ছে এ মাস সব ধরনের গুনাহমুক্ত অবস্থায় অতিবাহিত করা। চোখকে অবৈধ দৃষ্টি ও অন্যায় বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত থেকে পবিত্র রাখা, কানকে অবৈধ শ্রবণ হতে হেফাজত করা, জবানকে অন্যায় ও অশ্লীল উচ্চারণ হতে মুক্ত রাখা; এককথায় সবধরনের গুনাহ থেকে পূর্ণ বিরত থাকা।

আমি তো বলব যে, এক রাকাত নফলও না পড়ুন, অধিক তিলাওয়াত না করুন, জিকির-তাসবিহ পাঠ না করুন; কিন্তু এ মাস গুনাহমুক্ত অতিবাহিত করুন।

এই সিদ্ধান্ত করে নিন যে, এ মাস আল্লাহর মাস। অন্ততপক্ষে এ মাসে আল্লাহর অবাধ্যতা করব না। গুনাহে লিপ্ত হব না। গিবত ও পরনিন্দা করব না, মিথ্যা বলব না, কানের অবৈধ ব্যবহার করব না, ঘুষের লেনদেন করব না। অন্তত এই একটি মাস নিজেকে অন্যায় থেকে বিরত রাখব।

'রোজা' অর্থ কী? রোজা অর্থ আহার থেকে বিরত থাকা, পান করা থেকে বিরত থাকা, নিজের জৈবিক চাহিদা পূরণ করা থেকে বিরত থাকা। অথচ এ তিনটি বিষয়ই সাধারণ অবস্থায় হালাল ও বৈধ। রোজা রাখা অবস্থায় হালাল বিষয় পরিহার করছি, অথচ যেসব বিষয় সর্বাবস্থায় হারাম, তাতে নিশ্চিন্তে লিপ্ত হচ্ছি!

রোজা রেখে মিথ্যা বলছি!
রোজা রেখে পরনিন্দা করছি!
রোজা রেখে সময় কাটাতে টিভি-সিনেমার অশ্লীল দৃশ্য উপভোগ করছি!
রোজা রেখে দৃষ্টিশক্তির অন্যায় ব্যবহার করছি!

এ কারণেই হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে-
مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّوْرِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةُ أَنْ يَدَعَ طَعَامَه وَشَرَابَه
(রোজা রেখে) যে ব্যক্তি মিথ্যাচার ও অন্যায় কর্ম পরিহার করল না, তার পানাহার ত্যাগ ও ক্ষুধার্ত থাকার আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।¹⁸

সুতরাং সার্বক্ষণিক হারাম মিথ্যাকে ছাড়তে না পারলে পানাহার পরিত্যাগে কী হবে? যদিও ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে তার এ রোজার কাজা ওয়াজিব নয়, কিন্তু এ ধরনের রোজার দ্বারা কোনো আজরই সে পাবে না, রোজার রূহ ও প্রাণশক্তি, বরকত ও কল্যাণ কিছুই সে লাভ করবে না।

টিকাঃ
১৮. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৯০৩। অর্থাৎ তার পানাহার বর্জনকে আল্লাহ পাক কবুল করবেন না।

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 রোজা তাকওয়া অর্জনের স্বতন্ত্র সোপান

📄 রোজা তাকওয়া অর্জনের স্বতন্ত্র সোপান


কিছুক্ষণ পূর্বে আমি আপনাদের সামনে যে আয়াত তিলাওয়াত করেছি তাতে রমজানের রোজা ফরজ করার হিকমত ও গূঢ় রহস্য এই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এর মাধ্যমে যেন আমাদের অন্তরে তাকওয়া ও খোদাভীতি সৃষ্টি হয়। রোজার মাধ্যমে কীভাবে তাকওয়া সৃষ্টি হবে?

কোনো কোনো আলিম এ প্রশ্নের উত্তর এভাবে দিয়েছেন যে, রোজা মানুষের মাঝে বিদ্যমান পাশবিক শক্তিকে দমিত করে। ক্ষুধার্ত থাকার কারণে তার পাশবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তি স্তিমিত হয়ে যায়। ফলে অন্যায় কাজ ও গুনাহর কাজের প্রতি আগ্রহ-আকর্ষণও কমে যায় এবং এভাবেই তাকওয়া সৃষ্টি হয়।

কিন্তু হাকিমুল উম্মত হজরত আশরাফ আলী থানবি রহ. (আল্লাহ হজরতের মর্যাদা বুলন্দ করুন) বলেছেন, প্রকৃত কথা এই যে, কোনো ব্যক্তি যদি সঠিক পদ্ধতিতে রোজা রাখে, তাহলে এ রোজা নিজেই তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম হবে। কেননা, তাকওয়ার অর্থ হচ্ছে মহান আল্লাহর বড়ত্ব ও প্রতাপের অনুভূতি অন্তরে ধারণ করে গুনাহ থেকে বিরত থাকা। এই অনুভূতি অন্তরে থাকা যে, আমি তো আমার রবের সামনে আছি। আমার প্রতিটি আচরণ ও উচ্চারণ তিনি অবলোকন করছেন। এই অনুভূতিকে লালন করে গুনাহ হতে বিরত থাকার নামই হলো তাকওয়া।

পবিত্র কুরআনে যেমন বর্ণিত হয়েছে—
﴿وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى
আর যে ব্যক্তি নিজ প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোর ভয় পোষণ করে এবং নিজেকে মন্দ চাহিদা হতে বিরত রাখে। [সুরা নাযিআত: ৪০]

রোজা হচ্ছে এই তাকওয়া অর্জনের সর্বোত্তম প্রশিক্ষণ। একজন মুসলমান যখন রোজা রাখে, সে যত বড় গুনাহগার হোক না কেন, যদি প্রচণ্ড গরমের দিনও হয়, পিপাসায় কাতরও হয়, দরজা-জানালা বন্ধ কামরায় একাকীও হয়, হাতের নাগালে ফ্রিজে বরফ-শীতল পানিও থাকে, আর তার নফস তাকে প্ররোচিত করতে থাকে যে, যাও! উঠে পানি পান করে নাও, কেউ দেখবে না; তারপরও সে পানি পান করবে না। অথচ পান করলে দেখার কেউ নেই, জানার কেউ নেই, তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করার কেউ নেই, পাকড়াও করার কেউ নেই। এরপরও কেন পান করবে না. কারণ একটাই, হৃদয়ে সুপ্ত এই অনুভূতি যে, আল্লাহ তো দেখছেন!

আর এর নামই তো তাকওয়া।
রোজার মাঝে বিদ্যমান এই তাকওয়ার কারণেই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
«الصَّوْمُ لِي، وَأَنَا أَجْزِي بِهِ، يَدَعُ شَهْوَتَهُ وَطَعَامَهُ مِنْ أَجْلِي»
রোজা তো একমাত্র আমারই জন্য আর আমিই তার প্রতিদান দিয়ে থাকি। রোজাদার আমার জন্যই প্রবৃত্তি-চাহিদা ও পানাহার থেকে বিরত থাকে।¹⁹

অন্যান্য আমলের ক্ষেত্রে দশ গুণ, বিশ গুণ, সত্তর গুণ, সাতশ গুণ সাওয়াব আমি আল্লাহ দিয়ে থাকি; কিন্তু রোজা? রোজার প্রতিদান আমি নিজে দেবো। প্রচণ্ড পিপাসায়ও বান্দা আমাকে ভোলেনি, হাতের নাগালে বরফ-শীতল পানি পেয়েও বান্দা আমাকে বিস্মৃত হয়নি, কেবল আমার ভয়ে সে আমার হুকুম অমান্য করেনি। সুতরাং তার আমল ও সৎকর্মের আজর ও প্রতিদান আমি নিজে তাকে প্রদান করব।

তো বলছিলাম, রোজাদার বান্দার এই অনুভূতির নামই তাকওয়া আর রোজা তাকওয়া অর্জনের স্বতন্ত্র মাধ্যম। যখন রোজা ফরজ করা হয়েছে তাকওয়া অর্জনের জন্য, তাই আল্লাহ যেন বান্দাকে সম্বোর্ডন করে বলছেন, 'বান্দা, আরেকটু অগ্রসর হও। আমার ভয়ে পানাহার থেকে যেমন বিরত থেকেছ, তদ্রূপ কর্মজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যখন অন্যায় ও গুনাহর নানা রকম আকর্ষণ তোমার নফস ও মনকে প্ররোচিত করবে, তখনও আমার ভয়ে তা থেকে বিরত থেকো।'

রোজার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের এই প্রশিক্ষণ তখনই পরিপূর্ণ হবে, যখন জীবনের সকল ক্ষেত্রে 'আল্লাহ দেখছেন'-এই ভয়ে গুনাহর কাজ থেকে বিরত থাকা হবে। শুধু পানাহার থেকে উদরকে নিবৃত্ত রাখলাম; কিন্তু হাত, চোখ, কান ও জবানকে গুনাহে নিমগ্ন রাখলাম, তাহলে তো তারবিয়াত ও সংশোধনের প্রশিক্ষণ পূর্ণ হলো না।

কামরা শীতল করার জন্য এয়ার-কন্ডিশনার লাগানো হলো। কিন্তু দরজা-জানালা খোলা রেখে এসির সুইচ চালু করলে কামরা কী শীতল হবে? একদিকে ঠান্ডা বাতাস তৈরি হবে, আরেকদিক দিয়ে বেরিয়ে যাবে; কামরা আর শীতল হবে না। তদ্রূপ হাত-পা, চোখ-কান ও জবানের দরজা খোলা রেখে রোজার এসি চালু করলেও তাকওয়ার নুর ও শীতলতা অর্জিত হবে না, গুনাহর দরজা দিয়ে সব বেরিয়ে যাবে।

টিকাঃ
১৯. ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৫১।

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 সাহরি-ইফতারে কৃচ্ছ্রসাধন আবশ্যক নয়

📄 সাহরি-ইফতারে কৃচ্ছ্রসাধন আবশ্যক নয়


সুতরাং মাহে রমজানে প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হচ্ছে গুনাহ থেকে বাঁচা। নফল ইবাদত, জিকির ও তাসবিহ আদায়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গুনাহমুক্ত রমজান অতিবাহিত করা।

অনেকে মনে করেন, রোজার প্রকৃত বরকত ও কল্যাণ অর্জন করতে হলে সাহরি ও ইফতারে খুব অল্প পরিমাণে আহার করতে হবে। সাহরি-ইফতারে যদি পেট পুরেই আহার করলাম, তাহলে নফস আর দমিত হলো কোথায়! কিন্তু হাকিমুল উম্মত থানবি রহ. এ ধরনের চিন্তাধারাও প্রত্যাখান করেছেন। তিনি বলেছেন, না ভাই, এসব ভিত্তিহীন কথা। সাহরি-ইফতারে কম আহারের কোনো প্রয়োজন নেই। সাহরি-ইফতারেও অন্য সময়ের মতো পরিমিত পানাহার করো। হ্যাঁ, মাত্রাতিরিক্ত পানাহার তো রমজান ব্যতীত অন্য মাসেও অপছন্দনীয়। কিন্তু বিশেষ করে রমজানের রাতে পানাহারে কৃচ্ছসাধনের প্রতি যত্নবান হওয়ার কোনো দরকার নেই। কেননা, স্বয়ং আল্লাহ পাক বলেছেন—
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ
আর যতক্ষণ না ভোরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে পৃথক হয়ে যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা খাও, পান করো। [সুরা বাকারা: ১৮৭]

স্বয়ং আল্লাহ যখন সুবহে সাদিক পর্যন্ত নিশ্চিন্তে পানাহার করতে বলেছেন, তখন স্বল্প পানাহারের পাবন্দি করা বন্দেগি ও আনুগত্যের দাবি নয়। পাশবিক শক্তি ও চাহিদা দমন করা মূল কথা নয়; পুরো দ্বীনের মূল মর্ম হলো সমস্ত ইবাদতের মধ্যে আল্লাহর হুকুমের অনুসরণ।

দেখুন, আল্লাহ তাআলা রমজান-দিবসে উপোস থাকার আদেশ করেছেন। তো উপোস থাকাই আল্লাহর কাম্য। এমনকি বান্দার মুখের উপবাসজনিত দুর্গন্ধও আল্লাহর পছন্দ। কিন্তু যেই মাত্র সূর্য ডুবে গেল, সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর হুকুম-বিলম্ব না করে এখনই ইফতার করো। সুতরাং দ্রুত ইফতার করাই আল্লাহর কাম্য। এ কারণেই ইফতারে বিলম্ব না করাকে মুসতাহাব গণ্য করা হয়েছে এবং বিনা কারণে বিলম্ব করাকে মাকরূহ বলা হয়েছে।

কেন? এ কারণেই যে, সূর্যাস্তের পর হুকুম হচ্ছে পানাহারের। তাই পানাহার হতে বিরত থাকাই বরং এ সময় অপছন্দনীয়। বোঝা গেল, বান্দার কাজ নিঃশর্ত আনুগত্য করা; বিবেক ও যুক্তির দেওয়াল দাঁড় করানো নয়।

জনৈক অন্তজ্ঞানী কত চমৎকার কথা বলেছেন! তিনি বলেছেন, লোভ-লালসা মানবচরিত্রের অত্যন্ত নিন্দনীয় একটি দিক। পার্থিব কোনো বস্তুর লোভ করা শরিয়তে পছন্দনীয় নয়। কিন্তু আমার মাবুদ যদি বলেন, 'লোভ করো', তাহলে আমি লোভই করব, লালসার মাঝেই স্বাদ পাব। আরিফে রুমির ভাষায়—
چوں طمع خواهد ز من سلطان دین خاک بر فرق قناعت بعد ازین
দ্বীনের অধিপতি আমার আল্লাহ যদি আমার কাছে দাবি করেন 'লোভ করো', তখন তো অল্পেতুষ্টির মাথায় ধুলি ছুড়ে মারাই কর্তব্য!²⁰

সূর্যাস্তের এক মিনিট পূর্বে যদি কেউ সামান্য বুট পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য এমনকি অসতর্কতাবশতও খেয়ে ফেলে, তবুও তার রোজা ভেঙে যাবে। আর ইচ্ছাকৃত খেলে তো কাফফারাও ওয়াজিব হবে। সন্ধ্যা ছয়টায় ইফতারির সময়, ছয়টার পর এক মিনিট দেরি করাও মাকরূহ ও অপছন্দনীয়; অথচ পাঁচটা ঊনষাট মিনিটে মাত্র একটি বুটের দানা খেলে কাফফারা হিসেবে ষাটটি রোজা রাখা আবশ্যক! আশ্চর্যের কিছুই নেই; কারণ, বিষয় এক মিনিটের নয়, একটি বুটের দানার নয়, বিষয় আল্লাহর হুকুম মানা-না মানার। ছয়টার পর আমার হুকুম ছিল—খাও; তুমি খেলে না কেন? ছয়টার এক মিনিট পূর্বেও আমার হুকুম ছিল—পানাহার থেকে বিরত থাকো, তুমি খেলে কেন?

ওদিকে সাহরির সময় আল্লাহর হুকুম বিলম্ব করে শেষ সময়ে আহার করা। বেশি আগে সাহরি খাওয়া সুন্নাহ-বিরোধী। সাহাবায়ে কেরাম শেষ সময়েই সাহরি গ্রহণ করতেন। অনেকে মধ্য রাত বা তারও পূর্বে সাহরি খেয়ে নেয়; এটা সুন্নাতের খেলাফ। কেননা, পূর্বে যেমন বলেছি, সুবহে সাদিকের পূর্বের সময়ে তো পানাহারের অনুমতি আছে; বরং হুকুমও আছে। তো যতক্ষণ সময় বাকি আছে, পানাহার করাতেই আনুগত্য; যখন সময় শেষ, বিরত থাকাতেই আনুগত্য।

হজরত থানবি রহ. বলেন, যখন আল্লাহ বলেছেন, খাও; তো না খাওয়া বা কম খাওয়া আনুগত্য নয় আর সাহরি-ইফতারে স্বল্পাহারের পাবন্দিও কাম্য নয়। মূল পাবন্দির বিষয় হলো গুনাহ থেকে বিরত থাকা; চোখ-কান, হাত ও জবানকে গুনাহ থেকে বিরত রাখা।

আমাদের হজরত (ডা. আবদুল হাই আরিফি রহ.) এক রমজানে বয়ানের মাঝে বলেছিলেন, ভাই, আমি তো এ কথা বলব যে, প্রয়োজনে নফসকে এই বলে প্রবোধ দাও যে, শুধু এই এক মাস গুনাহ থেকে বিরত থাকব। রমজান অতিবাহিত হওয়ার পর যা ইচ্ছা তাই করব! আরে! এক মাসই তো, এরপর তো ইচ্ছেমতো মনের চাহিদা পূরণ করতে পারব!

হজরত বলেছিলেন, কোনো ব্যক্তি যদি এভাবেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে যায়, আমি আল্লাহর রহমতের প্রতি এ আশা রাখি যে, এক মাস পর আল্লাহ তাআলা তার নফস ও অন্তরের মধ্যে চির জীবন গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার আগ্রহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে দেবেন।

বর্তমানের বড় ফিতনা রেডিও, টেলিভিশন। এক মাসের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে যাই যে, আপন চোখ-কানকে এক মাস এসব অশ্লীল বস্তু থেকে দূরে রাখব।

টিকাঃ
২০. আল্লামা রুমি, মসনবি, পঙ্ক্তি নং ২৬৯৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px