📄 ফেরেশতাদের ইবাদত ও মানবজাতির ইবাদত অভিন্ন শ্রেণিভুক্ত নয়
প্রথমে তাদের এই আপত্তির উত্তর শুনুন। নিঃসন্দেহে ফিরেশতাগণ মানবসৃষ্টির বহু পূর্ব থেকেই আল্লাহর ইবাদত করত। কিন্তু তাদের ইবাদতের বৈশিষ্ট্য ছিল মানবজাতির ইবাদত হতে সম্পূর্ণই ভিন্ন। ফিরেশতাদের ফিতরত ও স্বভাব-প্রকৃতিই এমন যে, তাদের পক্ষে ইবাদত ও আনুগত্য-বিরোধী কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। তাদের গুনাহ করার যোগ্যতাই নেই। আল্লাহ পাক তাদের স্বভাবে এ বিষয়টি রাখেনই-নি। তাদের না ক্ষুধা বা পিপাসা লাগে, না জৈবিক চাহিদা সৃষ্টি হয়, না গুনাহর কামনা-স্পৃহা জাগ্রত হয়। আল্লাহ পাক তাদের প্রকৃতির মাঝে এ বিষয়গুলো রাখেননি। বরং সৃষ্টিগতভাবেই তারা ইতাআত ও আনুগত্যে অভ্যস্ত।
অধিকন্তু আল্লাহ পাক তাদের জন্য ইবাদতের কোনো বিনিময় রাখেননি। ফিরেশতাদের জন্য তিনি ইবাদতের পরিবর্তে আজর ও সাওয়াব, দান ও প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেননি। গুনাহ যেমন নেই, জান্নাত লাভের আজর ও সাওয়াবও নেই।
বিষয়টি একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বুঝুন। মনে করুন, একজন ব্যক্তি দৃষ্টিশক্তি-বঞ্চিত; কোনো কিছু দেখতে পায় না। দৃষ্টিশক্তি না থাকায় টেলিভিশন দেখে না, ফিল্ম-সিনেমা দেখে না, অপরিচিত মহিলার প্রতি দৃষ্টিপাত করে না। বলুন, তার সারা জীবনের এই দৃষ্টি-সংযমে কী কোনো কামাল ও কৃতিত্ব আছে? তার তো দেখার শক্তিই নেই।
হ্যাঁ, যিনি দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন, চোখে দেখেন; তিনি যদি দৃষ্টির হেফাজত করেন, বেগানা মহিলার সামনে দৃষ্টি অবনত ও সংযত রাখেন, তাহলে তা হবে কৃতিত্বের বিষয়। মনে গুনাহর প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছে, পরিবেশ-পরিস্থিতিও অনুকূলে, তারপরও আল্লাহর ভয়ে ও খওফে ইলাহির তাড়নায় দৃষ্টিকে অবনত রাখা হলে তা-ই হবে কামাল ও শ্রেষ্ঠত্ব।
গুনাহ হতে উভয়ই বিরত থেকেছে, দৃষ্টিের হেফাজত উভয়েই করেছে, তারপরও কামাল ও শ্রেষ্ঠত্ব একজনের, অপরজনের নয়।
তদ্রূপ কোনো ফিরেশতা সকাল হতে সন্ধ্যা পানাহার থেকে বিরত থাকলে তার কোনো আজর ও সাওয়াব নেই। কারণ ফিরেশতাদের ক্ষুৎপিপাসা নেই, পানাহারের প্রয়োজনই নেই। সুতরাং পানাহার থেকে বিরত থাকায় তার কোনো কৃতিত্বও নেই।
বিপরীতে একজন মানুষ? মানুষের জন্মই হয়েছে পানাহারের প্রয়োজন ও চাহিদাকে সঙ্গী করে। একজন মানুষ যত উঁচু স্তরের মানবিক গুণের অধিকারীই হোন না কেন, তার পানাহারের প্রয়োজন হবেই। মানবজাতির মাঝে সর্বোচ্চ মর্যাদা হচ্ছে নবীগণের, সেই নবীগণও সৃষ্টিগতভাবেই পানাহারের মুখাপেক্ষী। এ কারণেই কাফিররা বলেছিল, ইনি আবার কেমন রাসুল! পানাহার করেন! ক্ষুধা লাগে! পিপাসা লাগে!
( مَالِ هَذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ )
এ কেমন রাসুল, যে খাবার খায়! [সুরা ফুরকান: ০৭]
সুতরাং সৃষ্টিগতভাবেই পানাহারের চাহিদাকে সঙ্গে নিয়ে বড় হওয়া মানুষ যখন ক্ষুধা লাগা সত্ত্বেও আল্লাহর আদেশে আহার না করে, প্রচণ্ড পিপাসা লাগার পরও আল্লাহর আনুগত্য পালনে পানি পানে বিরত থাকে; তাহলে এটাই তার শ্রেষ্ঠত্ব, এটাই তার কৃতিত্ব।
মোটকথা, যে ইবাদতের উদ্দেশ্যে ফিরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, তা এমন কোনো গুণ নয়, যা জান্নাত লাভের কারণ হবে। বিপরীতে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে পানাহারের চাহিদা দিয়ে, নফস ও প্রবৃত্তির তাড়না দিয়ে এবং গুনাহর আকর্ষণ দিয়ে; তারপরও মানুষ যখন আল্লাহর ভয়ে গুনাহর চাহিদা দমন করে, আল্লাহকে স্মরণ করে রমজানদিবসে পানাহার হতে বিরত থাকে, তখন তার এই ইবাদতের প্রতিদানরূপে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে দান করেন সেই জান্নাত, যার সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে—
وَ سَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوتُ وَ الْأَرْضُ
এবং নিজ প্রতিপালকের পক্ষ হতে মাগফিরাত ও সেই জান্নাত লাভের জন্য একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হও, যার প্রশস্ততা আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতুল্য। [সুরা আলে-ইমরান: ১৩৩]
📄 গুনাহর চিন্তা অন্তরে জাগা দূষণীয় নয়!
হজরত ইউসুফ আ.-এর ঘটনা স্মরণ করুন। ইউসুফ-জুলায়খার ঘটনা তো সকলেই জানেন। ইউসুফ আ. কীভাবে জুলায়খার প্ররোচনা মোকাবিলা করেছিলেন, তাও সকলে জানেন। উক্ত ঘটনায় হজরত ইউসুফ আ.-এর কামাল ও কৃতিত্ব তো তা-ই ছিল, যা কুরআনের ভাষায় এভাবে এসেছে—
وَ لَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَ هَمَّ بِهَا
স্ত্রীলোকটি তো স্পষ্টভাবেই ইউসুফের সঙ্গে (অসৎ কর্ম) কামনা করেছিল আর ইউসুফের মনেও স্ত্রীলোকটির প্রতি ইচ্ছা জাগ্রত হয়েই যাচ্ছিল...। [সুরা ইউসুফ: ২৪]
জুলায়খা যখন হজরত ইউসুফ আ.-কে আহ্বান করেছিলেন, তখন জুলায়খার অন্তরে যেমন গুনাহর বাসনা জাগ্রত হয়েছিল, আয়াতের ভাষ্য অনুসারে হজরত ইউসুফ আ.-এর মধ্যেও মনোবাসনা তৈরি হয়েছিল।
অনেকে বলে থাকে, 'ইন্নালিল্লাহ! নবীর অন্তরে এ ধরনের চিন্তা?!' আরে! এটাই তো নবীর কামাল ও শ্রেষ্ঠত্ব যে, মাটির তৈরি মানুষ হয়েও মনে কুমন্ত্রণা জাগ্রত হওয়ার পরও আল্লাহর ভয়ে, আল্লাহর বড়ত্বের কল্পনা করে নিজের মনোবাসনা দমন করেছেন এবং রাব্বে কারিমের সামনে শির অবনত করে দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন—
إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ
তিনি তো আমার মনিব। তিনি আমাকে ভালোভাবে রেখেছেন। [সুরা ইউসুফ: ২৩]
মনে যদি কুমন্ত্রণা জাগ্রত না হয়, গুনাহর আগ্রহ সৃষ্টিই যদি না হয়, তাহলে শ্রেষ্ঠত্ব ও কৃতিত্ব কীসের? শ্রেষ্ঠত্ব তো তখনই, যখন গুনাহর পরিবেশও থাকে, পারিপার্শ্বিকতাও পক্ষে থাকে, মনে গুনাহর প্রতি আকর্ষণও থাকে, এরপরও গুনাহ থেকে বিরত থাকা হয়।
কথা বেশ দীর্ঘ হয়ে গেল। বলছিলাম, মানবজাতির সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে 'ইবাদত' আর সে ইবাদত ফিরেশতাদের ইবাদত হতে ভিন্ন শ্রেণির ইবাদত।
মানবসৃষ্টির যে উদ্দেশ্যের কথা এতক্ষণ বলা হলো তার দাবি তো এই যে, মানুষ সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহরই ইবাদত করবে, দিবস-রজনীর একটি মুহূর্তও ইবাদত ছাড়া কাটাবে না। কারণ, সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হলো ইবাদত। অন্য কোনো কাজের অনুমতিই তো নেই।
অধিকন্তু অন্য এক আয়াতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَ أَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ
বস্তুত আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও তাদের সম্পদ খরিদ করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে—এর বিনিময়ে। [সুরা তাওবা: ১১১]
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জান-মাল, জীবন ও সম্পদ কিনে নিয়েছেন, আর বিনিময়ে দিয়েছেন পরকালে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি।
সুতরাং আমাদের জান-প্রাণ জান্নাতের বিনিময়ে বিক্রিত পণ্য। এ প্রাণের মালিকানা আমাদের নয়। এর দাবি এই ছিল যে, আমরা আপন প্রাণ ও অস্তিত্বকে, শরীর ও প্রতিটি শক্তিবিন্দুকে আল্লাহর ইবাদত ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যয় করব না।
সুতরাং আল্লাহ যদি বলতেন, 'বান্দা, তোমাকে সৃষ্টিই করা হয়েছে ইবাদতের জন্য, আর তোমার জান আমি কিনে নিয়েছি জান্নাতের বিনিময়ে; কাজেই সকাল-সন্ধ্যা আমার ইবাদতেই নিমগ্ন থাকো, দিবস-রজনী সিজদাতেই কাটিয়ে দাও; অন্য কিছু করার অনুমতি তোমার নেই, পানাহার-নিদ্রা-বিশ্রাম কোনো কিছুর সুযোগ তোমার নেই', তাহলে আল্লাহর এই আদেশ মোটেও অযৌক্তিক হতো না।
কিন্তু আল্লাহ যে বড় আশ্চর্য ক্রেতা! মূল্যের প্রতিশ্রুতি তো পুরোপুরি, প্রতিশ্রুতি পূরণও করবেন পুরোপুরি, কিন্তু ক্রয় করা পণ্য বিক্রেতাকেই ফিরিয়ে দিয়ে বলছেন, 'বান্দা, তোমার জান তোমার কাছেই রাখো!' আরও বলছেন, 'তোমাকে পানাহারের বৈধতাও দেওয়া হলো, শরিয়তের বৈধ সীমারেখার ভেতর থেকে হাসি-ঠাট্টা, কথাবার্তার অনুমতি দেওয়া হলো; শুধু সময়মতো নামাজ আদায় করো, আর এই এই আচরণ ও উচ্চারণ থেকে বিরত থেকো।' কত দয়া আল্লাহ পাক আপন বান্দার প্রতি করেছেন!
📄 মাহে রমজানের দাবি সৃষ্টি-উদ্দেশ্যের দিকে প্রত্যাবর্তন
আল্লাহ ভালো করেই জানেন—এমন বৈধতা দানের ফলাফল এই দাঁড়াবে যে, ভালো-মন্দ উভয় ধরণের কর্মযোগ্যতার অধিকারী মানুষ যখন পার্থিব কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে, তখন ধীরে ধীরে আখিরাত ও আখিরাতের বিধি-বিধান ভুলে যাবে।
জায়েজ পদ্ধতিতে ব্যবসা করার অনুমতি আছে, চাকরি করার অনুমতি আছে। কিন্তু জায়েজ ব্যবসা বা চাকরি করতে গিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে তাতেই ডুবে যায়; অন্তরে গাফলতের মরিচা পড়ে, সম্পদপ্রীতির পর্দা পড়ে যায়।
এ ধরনের গাফলত ও সম্পদপ্রীতির মরিচা দূর করতে আল্লাহ পাক কিছু বিধি-বিধান রেখেছেন। মাহে রমজানের রোজা তারই একটি।
বছরের এগারো মাস পানাহারের অবাধ অনুমতি ছিল, মনমতো কথাবার্তা বলা এবং নির্দোষ রসিকতা ও হাসি-ঠাট্টা করার অনুমতি ছিল। মানুষ এগারো মাস এসব পার্থিব কাজেই ব্যস্ত ছিল। এখন এক মাস আল্লাহ পাক নির্ধারণ করেছেন সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যের দিকে প্রত্যাবর্তনের জন্য; ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকার জন্য।
আল্লাহ যেন আপন বান্দাদের সম্বোধন করে বলছেন, 'বান্দা! আপন সৃষ্টি-উদ্দেশ্যের দিকে ফিরে এসো, ইবাদতে নিমগ্ন হও; বিগত এগারো মাসে যেসব গুনাহ করে ফেলেছ, তা মাফ করিয়ে নাও; সৎকর্মের স্বভাবযোগ্যতার ওপর ময়লার যে আবরণ পড়েছে, তা ধুয়ে ফেলো; গাফলতের যে পর্দা অন্তরকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে, তা ছিঁড়ে ফেলো। এ মাস তোমার রাব্বে কারিমের দিকে প্রত্যাবর্তনের মাস, আপন সৃষ্টি-উদ্দেশ্যের দিকে ফিরে আসার মাস।'
আপনারা কি রমজান শব্দের অর্থ জানেন? উর্দু (ও বাংলা) ভাষায় 'রমজান' বলা হলেও আরবিতে এর সঠিক উচ্চারণ হচ্ছে মীম বর্ণে যবর যোগে 'রমাযান'। কুরআনে শব্দটি এ উচ্চারণেই এসেছে। আরবিতে 'রমাযান' শব্দের অর্থ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ভষ্মকারী। কতক ভাষাবিদের অভিমত হলো, সর্বপ্রথম এ মাস যেহেতু প্রচণ্ড গরমের মধ্যে এসেছিল, তাই গরমের আতিশয্য বোঝাতে এ মাসের নাম রাখা হয়েছে রমাযান। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমগণের মত হলো—আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেহেতু এ মাসে আপন ফজল ও করমে, দয়া ও অনুগ্রহে বান্দার গুনাহকে জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দেন, তাই এ মাসের নাম 'রমাযান' বা ভষ্মকারী মাস।
সুতরাং এ মাসের উদ্দেশ্য হচ্ছে এগারো মাস দুনিয়াবি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকায় অন্তরে যে গাফলত ছড়িয়ে পড়েছে, তা দূর করা; এগারো মাস যেসব গুনাহ হয়ে গেছে, আল্লাহর কাছ থেকে তা ক্ষমা করিয়ে নেওয়া।
এ কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
( يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ )
হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে; যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমাদের মধ্যে তাকওয়া সৃষ্টি হয়। [সুরা বাকারা: ১৮৩]
মোটকথা, রমজান মাসের দাবি কেবল রোজা রাখা ও তারাবি পড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এ মাসের দাবি হলো মাসের সর্বোচ্চ থেকে সর্বোচ্চ সময়কে কর্ম-ব্যস্ততা মুক্ত করে আপন উদ্দেশ্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করা। পুরো মাস বা মাসের অধিকাংশ সময়কে পার্থিব ঝামেলামুক্ত রেখে ইবাদতে ব্যয় করার প্রস্তুতি গ্রহণ করা। বস্তুত এরই নাম হচ্ছে ‘ইসতিকবালে রমাযান’ বা রমজানকে স্বাগত জানানো।
বর্তমানে মিশর, সিরিয়াসহ আরববিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং সেখানকার অনুকরণে আমাদের দেশে ইসতিকবালে রমাযান নামে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কুরআন তিলাওয়াত, হামদ-নাত ও আলোচনা মাহফিলের মাধ্যমে রমজানকে স্বাগত জানানো হয়। এসব অনুষ্ঠান আয়োজনের পেছনের উদ্দেশ্য তো মহৎ, জযবা ও উদ্দীপনা তো নির্দোষ; কিন্তু কখনো কখনো এই নেক জযবা ও নির্দোষ উদ্দীপনাই বাড়তে বাড়তে ভবিষ্যতে বিদআতের রূপ ধারণ করে।
প্রকৃতপক্ষে রমজানের ইসতিকবাল ও অভ্যর্থনা হচ্ছে নিজের স্বাভাবিক দৈনন্দিন কর্মসূচিকে পরিবর্তন করে অধিকাংশ সময়কে ইবাদতের জন্য ফারেগ করা, ব্যস্ততা কমিয়ে ইবাদতে বেশি সময় দেওয়া।
এই মনোভাব সামনে রেখে রমজান মাস কাটালে এ মাসের রূহ ও রূহানিয়াত, প্রাণ ও প্রাণশক্তি, রহমত ও বরকত এবং দান ও কল্যাণ অর্জিত হবে, ইনশাআল্লাহ। আর যদি এই মনোভাব না থাকে, রমজানে ইবাদতে নিমগ্ন থাকার ফিকির ও মনোভাব, তৈয়ারি ও প্রস্তুতি না থাকে; তাহলে প্রথাগতভাবে রমজান আসবে, চলেও যাবে, গাফলতের পর্দাও দূর হবে না, গুনাহর খাতাও পরিষ্কার হবে না।
তো আজকের আলোচনার প্রথম বিষয় এই যে, প্রথমে আমি নিজে এবং আমরা সকলে রমজানের জন্য সঠিক সময়সূচি-কর্মসূচি তৈরি করে তা অনুযায়ী আমল করার প্রস্তুতি নেব। রমজানের পূর্বে আজই ঠিক করে নেবো—রমজানে ইবাদতে নিমগ্ন থাকার জন্য কোন কোন কাজ একেবারেই বাদ দেবো, কোন কোন কাজ স্থগিত বা বিলম্বিত করব। সর্বোচ্চ চেষ্টা করব এ মাসকে যাবতীয় কর্মমুক্ত রাখার।
📄 মাহে রমজানে কী আমল করব?
দ্বিতীয় আলোচ্য বিষয় এই যে, যখন এ মাসকে ইবাদতের জন্য ফারেগ করলাম তো এ মাসে কী ইবাদত করব? এ মাস কীভাবে অতিবাহিত করব?
এ মাসে রোজা রাখা, তারাবি পড়ার কথা তো আমরা সকলেই জানি। আলহামদুলিল্লাহ, ঈমানের অতি সামান্য আলোকচ্ছটাও যার অন্তরে বিদ্যমান আছে, তার মাঝে মাহে রমজানের আজমত ও বড়ত্বের অনুভূতি জাগ্রত থাকে এবং সে এ মাসে যথাসম্ভব নফল ইবাদত, জিকির-আজকার ও কুরআন তিলাওয়াতে নিমগ্ন থাকে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে আরও বেশি বেশি ইবাদতের তাওফিক দান করুন।
কিন্তু আমি আপনারকে ভিন্ন একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। নিঃসন্দেহে বেশি বেশি নফল নামাজ, জিকির ও তিলাওয়াত, এগুলো অত্যন্ত উত্তম আমল। কিন্তু এ সবই হচ্ছে নফল; এরচেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বের দাবিদার একটি ফরজ আমল, যার প্রতি আমাদের মোটেই ভ্রুক্ষেপ নেই। আর তা হচ্ছে এ মাস সব ধরনের গুনাহমুক্ত অবস্থায় অতিবাহিত করা। চোখকে অবৈধ দৃষ্টি ও অন্যায় বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত থেকে পবিত্র রাখা, কানকে অবৈধ শ্রবণ হতে হেফাজত করা, জবানকে অন্যায় ও অশ্লীল উচ্চারণ হতে মুক্ত রাখা; এককথায় সবধরনের গুনাহ থেকে পূর্ণ বিরত থাকা।
আমি তো বলব যে, এক রাকাত নফলও না পড়ুন, অধিক তিলাওয়াত না করুন, জিকির-তাসবিহ পাঠ না করুন; কিন্তু এ মাস গুনাহমুক্ত অতিবাহিত করুন।
এই সিদ্ধান্ত করে নিন যে, এ মাস আল্লাহর মাস। অন্ততপক্ষে এ মাসে আল্লাহর অবাধ্যতা করব না। গুনাহে লিপ্ত হব না। গিবত ও পরনিন্দা করব না, মিথ্যা বলব না, কানের অবৈধ ব্যবহার করব না, ঘুষের লেনদেন করব না। অন্তত এই একটি মাস নিজেকে অন্যায় থেকে বিরত রাখব।
'রোজা' অর্থ কী? রোজা অর্থ আহার থেকে বিরত থাকা, পান করা থেকে বিরত থাকা, নিজের জৈবিক চাহিদা পূরণ করা থেকে বিরত থাকা। অথচ এ তিনটি বিষয়ই সাধারণ অবস্থায় হালাল ও বৈধ। রোজা রাখা অবস্থায় হালাল বিষয় পরিহার করছি, অথচ যেসব বিষয় সর্বাবস্থায় হারাম, তাতে নিশ্চিন্তে লিপ্ত হচ্ছি!
রোজা রেখে মিথ্যা বলছি!
রোজা রেখে পরনিন্দা করছি!
রোজা রেখে সময় কাটাতে টিভি-সিনেমার অশ্লীল দৃশ্য উপভোগ করছি!
রোজা রেখে দৃষ্টিশক্তির অন্যায় ব্যবহার করছি!
এ কারণেই হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে-
مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّوْرِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةُ أَنْ يَدَعَ طَعَامَه وَشَرَابَه
(রোজা রেখে) যে ব্যক্তি মিথ্যাচার ও অন্যায় কর্ম পরিহার করল না, তার পানাহার ত্যাগ ও ক্ষুধার্ত থাকার আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।¹⁸
সুতরাং সার্বক্ষণিক হারাম মিথ্যাকে ছাড়তে না পারলে পানাহার পরিত্যাগে কী হবে? যদিও ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে তার এ রোজার কাজা ওয়াজিব নয়, কিন্তু এ ধরনের রোজার দ্বারা কোনো আজরই সে পাবে না, রোজার রূহ ও প্রাণশক্তি, বরকত ও কল্যাণ কিছুই সে লাভ করবে না।
টিকাঃ
১৮. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৯০৩। অর্থাৎ তার পানাহার বর্জনকে আল্লাহ পাক কবুল করবেন না।