📄 মাহে রমজানে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন বড় সহজ!
রমজান মাসে বান্দা যেন আল্লাহ পাকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট হয় এবং তার ইবাদতে পূর্ণ নিবিষ্ট হয়, এ জন্য এ মাসে আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি আপন দয়া ও অনুগ্রহের প্রকাশ অন্যান্য সময়ের চেয়ে বিস্তৃত ও ব্যাপকতর করে রেখেছেন।
মাহে রমজানের শুরু থেকেই দুনিয়াবাসীর ওপর আল্লাহ পাকের বিশেষ রহমতের বারিধারা বর্ষিত হতে থাকে। গুনাহগার বান্দাকে ক্ষমা করার নানা বাহানা তালাশ করা হয়। মুমিন বান্দার ওপর রহমত নাজিল করার উসিলা খোঁজা হয়। এ মাসে সামান্য আমলেও অসামান্য আজর ও সাওয়াব দান করা হয়।
হাদিস শরিফে এসেছে, এ মাসে কেউ যদি নফল ইবাদত করে, আল্লাহ পাক তার জন্য ফরজ ইবাদত পরিমাণ সাওয়াব রেখেছেন, আর এ মাসে কেউ যদি কোনো ফরজ আদায় করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য সত্তরটি ফরজ আদায়ের সাওয়াব রেখেছেন।²
অর্থাৎ দু-রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করলে একশ চল্লিশ রাকাত নামাজের সাওয়াব! সুবহানাল্লাহ! এভাবে প্রত্যেক নেক আমলের সাওয়াব আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ মাসে সত্তর গুণ করে দেন। এক টাকা দান করলে সত্তর টাকা দান করার সাওয়াব! দশ টাকা দান করলে সাতশ টাকা দান করার সাওয়াব! আর একশ টাকা দান করলে সাত হাজার টাকা দান করার সাওয়াব!
সুবহানাল্লাহ! কত মহান আমার দয়াময় আল্লাহ!
এ মাসে ছোট ছোট আমলের বদলায়ও আল্লাহ পাক মাগফিরাত ও ক্ষমার ওয়াদা করেছেন। বান্দা নিজে রোজা রেখেছে, পেয়ারে হাবিবের জবানে তার জন্য আল্লাহ তাআলার মাগফিরাত ও ক্ষমার ঘোষণা-
«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ»
যে ব্যক্তি ঈমানের দাবিতে, শুধু আল্লাহর কাছে আজর লাভের প্রত্যাশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার পূর্বে কৃত সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।³
বান্দা কোনো রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করিয়েছে, এর পরিবর্তেও মাগফিরাতের বার্তা-
«مَنْ فَطَرَ فِيْهِ صَائِمًا كَانَ لَهُ مَغْفِرَةً لِذُنُوبِهِ، وَعِتْقَ رَقَبَتِهِ مِنَ النَّارِ»
যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার এই আমল তার গুনাহ-মাফের এবং জাহান্নাম হতে মুক্তিলাভের কারণ হবে।⁴
বান্দা রমজানের রাতে তারাবিতে দণ্ডায়মান হয়েছে; নববি জবানে রাব্বে কারিমের খোশখবরি-
«مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّমَ مِنْ ذَنْبِهِ»
যে ব্যক্তি ঈমানের দাবিতে শুধু আল্লাহর কাছে আজর লাভের প্রত্যাশায় রমজানের রজনীতে ইবাদত করবে (তারাবি ইত্যাদি পড়বে), তার পূর্বে কৃত যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।⁵
মোটকথা, এ মাসে অতি অল্প আমলেও আল্লাহ পাক বিরাট আজর ও সাওয়াব দান করেন এবং বাহানা তালাশ করে করে এ মাসে মাগফিরাত ও ক্ষমা প্রদান করেন। আল্লাহ পাক তার নৈকট্য অর্জনের জন্য এ মাস যেমন নির্ধারণ করেছেন, নৈকট্য অর্জনের পথও সহজ করে দিয়েছেন।
টিকাঃ
২. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং-৪।
৩. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৯০১ ও ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭৫।
৪. ইবনে খুযাইমা, সহিহ ইবনে খুযাইমা, হাদিস নং ১৮৮৭ ও বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস নং ৩৩৩৬।
৫. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৭ ও ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৭৫৯।
📄 বিশ রাকাত তারাবি আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহাসুযোগ!
বছরের অন্যান্য দিনগুলোতে আমরা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি। কিন্তু রমজান মাসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিশ রাকাত তারাবিও আদায় করা হয়। কী বৈশিষ্ট্য এই তারাবির? কী তাৎপর্য এই অতিরিক্ত বিশ রাকাতের? আল্লাহু আকবার! ভেবে দেখেছেন কখনো? নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'বান্দা আপন পরওয়ারদিগার আল্লাহ পাকের সবচেয়ে নিকট-সান্নিধ্য লাভ করে সিজদার হালতে।⁶ সিজদা হলো মুমিন বান্দার মিরাজ ও আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎপর্ব। বান্দা যখন সিজদার হালতে আল্লাহ পাকের দরবারে ললাট স্পর্শ করে, বারবার 'সুবহানা রাব্বিয়াল আলা' পাঠ করে রাব্বে কারিমের ছানা ও প্রশংসা করে, তখন সে আল্লাহ পাকের যে নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভ করে, অন্য কোনো সময় তা লাভ করে না। সুতরাং আল্লাহ পাক যেন বিশ রাকাত তারাবির এই বিধান দান করে বান্দাকে সম্বোধন করে বলছেন, বান্দা! প্রতিদিন তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আমার সান্নিধ্য লাভে ধন্য হতে। এখন আমার সান্নিধ্য অর্জন ও সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ তোমার জন্য আরও উন্মুক্ত ও অবারিত করে দিলাম। রমজান মাসে আরও বেশি আমার সান্নিধ্য অর্জন করো। বিশ রাকাত তারাবি পড়বে, তো চল্লিশটি অতিরিক্ত সিজদার মাধ্যমে আরও চল্লিশ বার আমার একান্ত সান্নিধ্য লাভে ধন্য হবে।
টিকাঃ
৬. হাদিসটির মূল পাঠ হলো- «أَقْرَبُ مَا يَكُوْنُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ، وَهُوَ سَاجِدٌ، فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ» সিজদা অবস্থায়ই বান্দা তার রবের অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। অতএব, তোমরা (সিজদায়) অধিক পরিমাণে দোয়া করবে। [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৪৮২]
📄 নৈকট্য অর্জনের পূর্বশর্ত অধিক ইবাদত
আল্লাহ পাক রমজান মাস নির্ধারণ করেছেন তার নৈকট্য আরও বেশি অর্জনের জন্য আর আল্লাহর একান্ত নৈকট্য অর্জিত হবে অধিক ইবাদতের মাধ্যমে।⁷ সুতরাং এ মাসে আমরা রোজা তো রাখবই, ইনশাআল্লাহ তারাবিও ইহতেমামের সঙ্গে আদায় করব; পাশাপাশি যেসব নফল ইবাদত অন্যান্য মাসে ঠিকমতো আদায় করা হয় না, সেগুলোও এ মাসে গুরুত্ব সহকারে আদায় করতে চেষ্টা করব। বছরের বাকি এগারো মাস তাহাজ্জুদের তাওফিক কখনো হয়, কখনো হয় না; রমজান মাসে আল্লাহ তাআলা এমন ব্যবস্থা করে দিয়েছেন যে, সাহরির উসিলায় তাহাজ্জুদের ওয়াক্তে উঠতেই হয়, সুতরাং পুরো রমজান মাসে ইহতেমাম ও গুরুত্বের সঙ্গে তাহাজ্জুদ আদায় করব।⁸ সাহরি গ্রহণেও যেহেতু অনেক সাওয়াব রয়েছে, তাই সাহরির জন্য একটু আগে শয্যাত্যাগ করব, চার রাকাত নামাজ তাহাজ্জুদের নিয়তে পড়ে নেব, এরপর সাহরির সুন্নাত আদায় করব। সারা বছর হয়তো মাগরিবের পর আউয়াবিনের ছয় রাকাত নফল নামাজ¹⁰ পড়ার সুযোগ হয় না, রমজানে পড়ার চেষ্টা করব। ইশরাক¹¹ ও চাশতের¹² নামাজ সারা বছর পড়া হয় না, রমজানে পড়ার হিম্মত করব।
টিকাঃ
৭. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- «إِنَّ اللَّهَ قَالَ : مَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ» আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা নফলের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। একপর্যায়ে সে আমার মাহবুব ও ভালোবাসার পাত্র হয়ে যায়। [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬৫০২]
৮. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- «أَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّইْلِ» ফরজ নামাজের পর শ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের নামাজ (তাহাজ্জুদ)। [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৬৩]
*. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং ৩২-৩৫।
১০. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- «مَنْ صَلَّى بَعْدَ الْمَغْرِبِ سِتَّ رَكَعَاتٍ لَمْ يَتَكَلَّمْ فِيْمَا بَيْنَهُনَّ بِসُوْءٍ عُدِلْنَ لَهُ بِعِبَادَةِ ثِنْتَيْ عَشْرَةَ سَنَةً» যে ব্যক্তি মাগরিবের পর ছয় রাকাত নামাজ পড়ে এবং এর মাঝে কোনো অন্যায় কথা না বলে, এর বিনিময়ে তাকে বারো বছর (নফল) ইবাদত করার সাওয়াব প্রদান করা হয়। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৪৩৫]
১১. ইশরাকের নামাজ দুই বা চার রাকাত। সূর্যোদয়ের দশ/বারো মিনিট পর থেকে দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত ইশরাকের ওয়াক্ত। তবে ওয়াক্তের শুরুতেই পড়ে নেওয়া উত্তম। ফজর নামাজ আদায় করার করার পর (পার্থিব কথা-কাজে লিপ্ত না হয়ে) নামাজের স্থানে বসে থেকে তাসবিহ-তাহলিলে ব্যস্ত থেকে ইশরাকের ওয়াক্তে হলে ইশরাক আদায় করলে সাওয়াব বেশি হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- «مَنْ صَلَّى الْغَدَاةَ فِي جَمَاعَةٍ، ثُمَّ قَعَدَ يَذْكُرُ اللهَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّমْسُ ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ كَانَتْ لَهُ كَأَজْرِ حَجَّةٍ وَعُمْرَةٍ» যে ব্যক্তি জামাতের সঙ্গে ফজর নামাজ পড়ে, এরপর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে থেকে আল্লাহর জিকির করতে থাকে, এরপর দু-রাকাত (নফল) নামাজ পড়ে, তার জন্য একটি হজ ও একটি উমরার সাওয়াব রয়েছে। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৫৮৬] আরেক হাদিসে আছে- «قَالَ الله تَبَارَكَ وَتَعَالَى : ابْنَ آدَمَ! اِرْكَعْ لِي أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ مِنْ أَوَّلِ النَّهَارِ أَكْفِكَ آخِرَه» আল্লাহ তাআলা বলেন, হে আদম-সন্তান! দিনের প্রারম্ভে আমার জন্য চার রাকাত (নফল) নামাজ পড়ো; দিনের সমাপ্তি পর্যন্ত আমি তোমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাব। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৪৭৫]
১২. চাশতের নামাজ দুই/চার/ছয়/আট বা বারো রাকাত পড়া যায়। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ দিন চার রাকাত আদায় করতেন। ইশরাক আদায়ের পর থেকে দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত চাশতের ওয়াক্ত। তবে দিনের এক-চতুর্থাংশ অতিবাহিত হওয়ার পর (সকাল নয়টা-দশটার দিকে) পড়ে নেওয়া উত্তম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- «مَنْ حَافَظَ عَلَى شَفْعَةِ الضُّحَى غُفِرَتْ لَهُ ذُنُوبُهُ وَإِنْ كَانَتْ مِثْلَ زَبَدِ الْبَحْرِ» যে ব্যক্তি চাশতের দুই রাকাত নামাজ নিয়মিত আদায় করবে, তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে; যদিও তা সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয়। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৪৭৬] আরেক হাদিসে আছে- «مَنْ صَلَّى الضُّحَى ثِنْتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً بَنَى اللَّهُ لَهُ قَصْرًا مِنْ ذَهَبٍ فِي الْجَنَّةِ» যে ব্যক্তি বারো রাকাত চাশতের নামাজ আদায় করবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে একটি স্বর্ণের প্রাসাদ নির্মাণ করবেন। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৪৭৩]
📄 রমজান মাস কুরআনের মাস!
রমজান মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় কুরআন তিলাওয়াত বেশি করব। মাহে রমজানের সঙ্গে তো কুরআনের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। রমজান মাসকেই আল্লাহ তাআলা কুরআন নাজিল করার জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-
﴿شَهْرُ রَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَ بَيِّنَتٍ مِّنَ الْهُدَى وَ الْفُرْقَانِ﴾
রমজান মাস-যে মাসে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য (আদ্যোপান্ত) হিদায়াত এবং এমন সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি সম্বলিত, যা সঠিক পথ দেখায় এবং (সত্য ও মিথ্যার মধ্যে) চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেয়। [সুরা বাকারা: ১৮৫]
হাদিস শরিফে এসেছে, আল্লাহর নবী রমজান মাসে হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালামের সঙ্গে কুরআন দাওর করতেন।¹³ কী চমৎকার দৃশ্য! কল্পনাতেও দেহ-মন শিহরিত হয়ে ওঠে! একবার হজরত জিবরাইল তিলাওয়াত করছেন, নবীজি শুনছেন; আবার নবীজি তিলাওয়াত করছেন, জিবরাইল শুনছেন।
মাহে রমজানের সঙ্গে যেহেতু কুরআনের বিশেষ সম্পর্ক আছে, তাই রমজানে অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি তিলাওয়াত করব। তিলাওয়াত তো প্রত্যেক মুসলমানের প্রতিদিনই করা উচিত। অল্প হোক বা বেশি, প্রতিদিনই কুরআনের কিছু অংশ তিলাওয়াত করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর কুরআনের হক ও দাবি। আর বিশেষ করে রমজান মাসে তো তিলাওয়াতের পরিমাণ বৃদ্ধি করা উচিত।
আমাদের আকাবিরে দ্বীন মাহে রমজানে তিলাওয়াতের অত্যন্ত ইহতেমাম করতেন। আমরা যার তাকলিদ করি এবং যার ফিকহি বর্ণনার মাধ্যমে ইসলামি শরিয়তের বিধি-বিধান সুস্পষ্ট, নিখুঁত ও সুচারুরূপে জানতে পারি, সেই ইমামে আজম আবু হানিফা রহ.-এর আদত ও অভ্যাস ছিল রমজানে তিনি একষট্টিবার কুরআন খতম করতেন! প্রতি রোজ দিনে এক খতম, রাতে এক খতম, আর তারাবিতে পুরো রমজানে এক খতম।
ইমামে আজম আবু হানিফা রহ. হয়তো দূর-অতীতের মনীষী; কিন্তু আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি রহ. তো নিকট-অতীতের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। দেড়-দুইশ বছর পূর্বে গত হয়েছেন। ১২৫২ হিজরি মোতাবেক ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে তার ইন্তেকাল। তার সংকলিত ফিকহগ্রন্থ 'ফতোয়ায়ে শামি' পড়ে আলিমগণ মুফতি হন, ফতোয়া প্রদান করেন। তিনি রমজান মাসে প্রতিদিন একবার কুরআন খতম করতেন।
আর আকাবিরে উম্মাহর মাঝে এমন ব্যক্তিত্বের সংখ্যা তো অগণিত যারা দৈনিক দশ পারা করে তিন দিনে কুরআন খতম করতেন। তেমনই পুরো কুরআনে আমরা যে সাতটি মনজিল দেখি, দৈনিক এক মনজিল করে তিলাওয়াত করে প্রতি সপ্তাহে কুরআন খতমকারীদের সংখ্যাও অনেক।
কুরআন তিলাওয়াত এত ফজিলতপূর্ণ আমল যে, এর প্রতিটি হরফের পরিবর্তে আছে দশটি করে নেকি!¹⁴ আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'কেউ যদি আলিফ-লাম-মীম পড়ে, তাহলে সে ত্রিশটি নেকি লাভ করবে। কেননা, আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ.¹⁵ আজকাল টাকা-পয়সার কদর করা হয়; নেকির কদর করা হয় না। তিন হরফের বিনিময়ে ত্রিশ নেকির ঘোষণা আমাদের হৃদয়ে কোনো স্পন্দন সৃষ্টি করে না; অথচ ত্রিশ টাকার ঘোষণা আমাদের আন্দোলিত করে। আমাদের সবার জীবনে এমন একদিন আসবে, যেদিন টাকা-পয়সা কিছুই থাকবে না, সেদিন একমাত্র নেকিই কাজে লাগবে। মাত্র একটি নেকির অভাবে কাউকে জাহান্নামে যেতে হবে। একটি নেকির জন্য হয়রান ও পেরেশান হয়ে সে ছোটাছুটি করবে প্রিয়জন- আপনজন ও আত্মীয়স্বজনের কাছে। মাত্র একটি নেকি, তাহলেই জাহান্নামের আজাব থেকে মুক্তি এবং চিরস্থায়ী জান্নাত প্রাপ্তি। কিন্তু...!
সুতরাং কুরআন মাজিদ তিলাওয়াতের এই ফজিলতপূর্ণ আমল আমরা রমজানে অধিক পরিমাণে করতে সচেষ্ট হব। আর যাদের কুরআন পাঠ শুদ্ধ নয়, তাদের কর্তব্য রমজানে বিশুদ্ধ তিলাওয়াতকারী কারও কাছে মশক করে কুরআন শুদ্ধ করে নেওয়া। কুরআন শুদ্ধ করা কঠিন কোনো কাজ নয়। উনত্রিশটি হরফের সঠিক উচ্চারণ মশক করে শিখে নিই; তিলাওয়াত অনেকটা শুদ্ধ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
১৩. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং ৬।
১৪. আর রমজানে তো প্রত্যেক আমলের সাওয়াব অন্য সময়ের চেয়ে সত্তর গুণ। সুতরাং এক হরফ তিলাওয়াতের পরিবর্তে সাতশ নেকি!
১৫. হাদিসটির মূলপাঠ নিম্নরূপ- «مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَه بِه حَسَنَةٌ ، وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا، لَا أَقُولُ الم حَرْফٌ، وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلَامٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ» যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব হতে একটি হরফ পড়বে, তার জন্য আছে একটি নেকি আর নেকিটিকে দশগুণ করে দেওয়া হবে। আমি এ কথা বলি না যে, 'আলিফ-লাম-মীম' একটি হরফ। বরং 'আলিফ' একটি হরফ, 'লাম' একটি হরফ এবং 'মীম' একটি হরফ। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৯১০]