📄 মাহে রমজানের স্বতন্ত্র কেবল রোজা ও তারাবি-ই নয়!
সাধারণভাবে আমরা মনে করে থাকি, অন্যান্য মাসের তুলনায় রমজানের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দিনে রোজা রাখা আর রাতে তারাবি পড়া। ব্যস! এতটুকুই মাহে রমজানের বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য; এতটুকুই রমজান মাসের দাবি ও তাৎপর্য। কিন্তু বাস্তবতা কি তা-ই?
নিঃসন্দেহে রোজা যেমন রমজান মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোকন, তেমনই রমজানের রাতের তারাবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি সুন্নাত; কিন্তু বাস্তবতা হলো রমজানের বৈশিষ্ট্য ও তাৎপর্য, হক ও দাবি এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়।
আমরা পূর্বেও বলে এসেছি যে, রমজানের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো—বান্দা এ মাসকে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের মাধ্যমরূপে গ্রহণ করবে, এ মাসকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃনবায়ন ও সুদৃঢ় করবে। আর এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য শুধু রোজা ও তারাবি যথেষ্ট নয়। প্রকৃতপক্ষে এ উদ্দেশ্য তখনই বাস্তবায়িত হবে যখন বান্দা রমজান মাসে নিজের অন্যান্য সকল ব্যস্ততা হ্রাস করে আল্লাহর ইবাদতে সর্বোচ্চ সময় ব্যয় করতে সচেষ্ট হবে।
📄 মাহে রমজানে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন বড় সহজ!
রমজান মাসে বান্দা যেন আল্লাহ পাকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট হয় এবং তার ইবাদতে পূর্ণ নিবিষ্ট হয়, এ জন্য এ মাসে আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি আপন দয়া ও অনুগ্রহের প্রকাশ অন্যান্য সময়ের চেয়ে বিস্তৃত ও ব্যাপকতর করে রেখেছেন।
মাহে রমজানের শুরু থেকেই দুনিয়াবাসীর ওপর আল্লাহ পাকের বিশেষ রহমতের বারিধারা বর্ষিত হতে থাকে। গুনাহগার বান্দাকে ক্ষমা করার নানা বাহানা তালাশ করা হয়। মুমিন বান্দার ওপর রহমত নাজিল করার উসিলা খোঁজা হয়। এ মাসে সামান্য আমলেও অসামান্য আজর ও সাওয়াব দান করা হয়।
হাদিস শরিফে এসেছে, এ মাসে কেউ যদি নফল ইবাদত করে, আল্লাহ পাক তার জন্য ফরজ ইবাদত পরিমাণ সাওয়াব রেখেছেন, আর এ মাসে কেউ যদি কোনো ফরজ আদায় করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য সত্তরটি ফরজ আদায়ের সাওয়াব রেখেছেন।²
অর্থাৎ দু-রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করলে একশ চল্লিশ রাকাত নামাজের সাওয়াব! সুবহানাল্লাহ! এভাবে প্রত্যেক নেক আমলের সাওয়াব আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ মাসে সত্তর গুণ করে দেন। এক টাকা দান করলে সত্তর টাকা দান করার সাওয়াব! দশ টাকা দান করলে সাতশ টাকা দান করার সাওয়াব! আর একশ টাকা দান করলে সাত হাজার টাকা দান করার সাওয়াব!
সুবহানাল্লাহ! কত মহান আমার দয়াময় আল্লাহ!
এ মাসে ছোট ছোট আমলের বদলায়ও আল্লাহ পাক মাগফিরাত ও ক্ষমার ওয়াদা করেছেন। বান্দা নিজে রোজা রেখেছে, পেয়ারে হাবিবের জবানে তার জন্য আল্লাহ তাআলার মাগফিরাত ও ক্ষমার ঘোষণা-
«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ»
যে ব্যক্তি ঈমানের দাবিতে, শুধু আল্লাহর কাছে আজর লাভের প্রত্যাশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার পূর্বে কৃত সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।³
বান্দা কোনো রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করিয়েছে, এর পরিবর্তেও মাগফিরাতের বার্তা-
«مَنْ فَطَرَ فِيْهِ صَائِمًا كَانَ لَهُ مَغْفِرَةً لِذُنُوبِهِ، وَعِتْقَ رَقَبَتِهِ مِنَ النَّارِ»
যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার এই আমল তার গুনাহ-মাফের এবং জাহান্নাম হতে মুক্তিলাভের কারণ হবে।⁴
বান্দা রমজানের রাতে তারাবিতে দণ্ডায়মান হয়েছে; নববি জবানে রাব্বে কারিমের খোশখবরি-
«مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّমَ مِنْ ذَنْبِهِ»
যে ব্যক্তি ঈমানের দাবিতে শুধু আল্লাহর কাছে আজর লাভের প্রত্যাশায় রমজানের রজনীতে ইবাদত করবে (তারাবি ইত্যাদি পড়বে), তার পূর্বে কৃত যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।⁵
মোটকথা, এ মাসে অতি অল্প আমলেও আল্লাহ পাক বিরাট আজর ও সাওয়াব দান করেন এবং বাহানা তালাশ করে করে এ মাসে মাগফিরাত ও ক্ষমা প্রদান করেন। আল্লাহ পাক তার নৈকট্য অর্জনের জন্য এ মাস যেমন নির্ধারণ করেছেন, নৈকট্য অর্জনের পথও সহজ করে দিয়েছেন।
টিকাঃ
২. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং-৪।
৩. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৯০১ ও ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭৫।
৪. ইবনে খুযাইমা, সহিহ ইবনে খুযাইমা, হাদিস নং ১৮৮৭ ও বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস নং ৩৩৩৬।
৫. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৭ ও ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৭৫৯।
📄 বিশ রাকাত তারাবি আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহাসুযোগ!
বছরের অন্যান্য দিনগুলোতে আমরা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি। কিন্তু রমজান মাসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিশ রাকাত তারাবিও আদায় করা হয়। কী বৈশিষ্ট্য এই তারাবির? কী তাৎপর্য এই অতিরিক্ত বিশ রাকাতের? আল্লাহু আকবার! ভেবে দেখেছেন কখনো? নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'বান্দা আপন পরওয়ারদিগার আল্লাহ পাকের সবচেয়ে নিকট-সান্নিধ্য লাভ করে সিজদার হালতে।⁶ সিজদা হলো মুমিন বান্দার মিরাজ ও আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎপর্ব। বান্দা যখন সিজদার হালতে আল্লাহ পাকের দরবারে ললাট স্পর্শ করে, বারবার 'সুবহানা রাব্বিয়াল আলা' পাঠ করে রাব্বে কারিমের ছানা ও প্রশংসা করে, তখন সে আল্লাহ পাকের যে নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভ করে, অন্য কোনো সময় তা লাভ করে না। সুতরাং আল্লাহ পাক যেন বিশ রাকাত তারাবির এই বিধান দান করে বান্দাকে সম্বোধন করে বলছেন, বান্দা! প্রতিদিন তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আমার সান্নিধ্য লাভে ধন্য হতে। এখন আমার সান্নিধ্য অর্জন ও সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ তোমার জন্য আরও উন্মুক্ত ও অবারিত করে দিলাম। রমজান মাসে আরও বেশি আমার সান্নিধ্য অর্জন করো। বিশ রাকাত তারাবি পড়বে, তো চল্লিশটি অতিরিক্ত সিজদার মাধ্যমে আরও চল্লিশ বার আমার একান্ত সান্নিধ্য লাভে ধন্য হবে।
টিকাঃ
৬. হাদিসটির মূল পাঠ হলো- «أَقْرَبُ مَا يَكُوْنُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ، وَهُوَ سَاجِدٌ، فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ» সিজদা অবস্থায়ই বান্দা তার রবের অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। অতএব, তোমরা (সিজদায়) অধিক পরিমাণে দোয়া করবে। [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৪৮২]
📄 নৈকট্য অর্জনের পূর্বশর্ত অধিক ইবাদত
আল্লাহ পাক রমজান মাস নির্ধারণ করেছেন তার নৈকট্য আরও বেশি অর্জনের জন্য আর আল্লাহর একান্ত নৈকট্য অর্জিত হবে অধিক ইবাদতের মাধ্যমে।⁷ সুতরাং এ মাসে আমরা রোজা তো রাখবই, ইনশাআল্লাহ তারাবিও ইহতেমামের সঙ্গে আদায় করব; পাশাপাশি যেসব নফল ইবাদত অন্যান্য মাসে ঠিকমতো আদায় করা হয় না, সেগুলোও এ মাসে গুরুত্ব সহকারে আদায় করতে চেষ্টা করব। বছরের বাকি এগারো মাস তাহাজ্জুদের তাওফিক কখনো হয়, কখনো হয় না; রমজান মাসে আল্লাহ তাআলা এমন ব্যবস্থা করে দিয়েছেন যে, সাহরির উসিলায় তাহাজ্জুদের ওয়াক্তে উঠতেই হয়, সুতরাং পুরো রমজান মাসে ইহতেমাম ও গুরুত্বের সঙ্গে তাহাজ্জুদ আদায় করব।⁸ সাহরি গ্রহণেও যেহেতু অনেক সাওয়াব রয়েছে, তাই সাহরির জন্য একটু আগে শয্যাত্যাগ করব, চার রাকাত নামাজ তাহাজ্জুদের নিয়তে পড়ে নেব, এরপর সাহরির সুন্নাত আদায় করব। সারা বছর হয়তো মাগরিবের পর আউয়াবিনের ছয় রাকাত নফল নামাজ¹⁰ পড়ার সুযোগ হয় না, রমজানে পড়ার চেষ্টা করব। ইশরাক¹¹ ও চাশতের¹² নামাজ সারা বছর পড়া হয় না, রমজানে পড়ার হিম্মত করব।
টিকাঃ
৭. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- «إِنَّ اللَّهَ قَالَ : مَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ» আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা নফলের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। একপর্যায়ে সে আমার মাহবুব ও ভালোবাসার পাত্র হয়ে যায়। [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬৫০২]
৮. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- «أَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّইْلِ» ফরজ নামাজের পর শ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের নামাজ (তাহাজ্জুদ)। [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৬৩]
*. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং ৩২-৩৫।
১০. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- «مَنْ صَلَّى بَعْدَ الْمَغْرِبِ سِتَّ رَكَعَاتٍ لَمْ يَتَكَلَّمْ فِيْمَا بَيْنَهُনَّ بِসُوْءٍ عُدِلْنَ لَهُ بِعِبَادَةِ ثِنْتَيْ عَشْرَةَ سَنَةً» যে ব্যক্তি মাগরিবের পর ছয় রাকাত নামাজ পড়ে এবং এর মাঝে কোনো অন্যায় কথা না বলে, এর বিনিময়ে তাকে বারো বছর (নফল) ইবাদত করার সাওয়াব প্রদান করা হয়। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৪৩৫]
১১. ইশরাকের নামাজ দুই বা চার রাকাত। সূর্যোদয়ের দশ/বারো মিনিট পর থেকে দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত ইশরাকের ওয়াক্ত। তবে ওয়াক্তের শুরুতেই পড়ে নেওয়া উত্তম। ফজর নামাজ আদায় করার করার পর (পার্থিব কথা-কাজে লিপ্ত না হয়ে) নামাজের স্থানে বসে থেকে তাসবিহ-তাহলিলে ব্যস্ত থেকে ইশরাকের ওয়াক্তে হলে ইশরাক আদায় করলে সাওয়াব বেশি হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- «مَنْ صَلَّى الْغَدَاةَ فِي جَمَاعَةٍ، ثُمَّ قَعَدَ يَذْكُرُ اللهَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّমْسُ ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ كَانَتْ لَهُ كَأَজْرِ حَجَّةٍ وَعُمْرَةٍ» যে ব্যক্তি জামাতের সঙ্গে ফজর নামাজ পড়ে, এরপর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে থেকে আল্লাহর জিকির করতে থাকে, এরপর দু-রাকাত (নফল) নামাজ পড়ে, তার জন্য একটি হজ ও একটি উমরার সাওয়াব রয়েছে। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৫৮৬] আরেক হাদিসে আছে- «قَالَ الله تَبَارَكَ وَتَعَالَى : ابْنَ آدَمَ! اِرْكَعْ لِي أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ مِنْ أَوَّلِ النَّهَارِ أَكْفِكَ آخِرَه» আল্লাহ তাআলা বলেন, হে আদম-সন্তান! দিনের প্রারম্ভে আমার জন্য চার রাকাত (নফল) নামাজ পড়ো; দিনের সমাপ্তি পর্যন্ত আমি তোমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাব। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৪৭৫]
১২. চাশতের নামাজ দুই/চার/ছয়/আট বা বারো রাকাত পড়া যায়। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ দিন চার রাকাত আদায় করতেন। ইশরাক আদায়ের পর থেকে দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত চাশতের ওয়াক্ত। তবে দিনের এক-চতুর্থাংশ অতিবাহিত হওয়ার পর (সকাল নয়টা-দশটার দিকে) পড়ে নেওয়া উত্তম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- «مَنْ حَافَظَ عَلَى شَفْعَةِ الضُّحَى غُفِرَتْ لَهُ ذُنُوبُهُ وَإِنْ كَانَتْ مِثْلَ زَبَدِ الْبَحْرِ» যে ব্যক্তি চাশতের দুই রাকাত নামাজ নিয়মিত আদায় করবে, তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে; যদিও তা সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয়। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৪৭৬] আরেক হাদিসে আছে- «مَنْ صَلَّى الضُّحَى ثِنْتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً بَنَى اللَّهُ لَهُ قَصْرًا مِنْ ذَهَبٍ فِي الْجَنَّةِ» যে ব্যক্তি বারো রাকাত চাশতের নামাজ আদায় করবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে একটি স্বর্ণের প্রাসাদ নির্মাণ করবেন। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৪৭৩]