📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 মাহে রমজানের বিশেষ তাৎপর্য

📄 মাহে রমজানের বিশেষ তাৎপর্য


আমাদের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, এই যে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কর্তৃক বছরের নির্দিষ্ট কিছু দিন, দশক ও মাসকে আপন বান্দাদের ওপর বিশেষ রহমত ও বরকত নাজিল করার জন্য নির্বাচন, এর হিকমত ও তাৎপর্য কী?

প্রকৃতপক্ষে এই নির্বাচনের মাঝে পরম করুণাময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দয়া ও মহত্ত্বের, বান্দার প্রতি করুণা ও অনুগ্রহের অনন্য এক রহস্য নিহিত রয়েছে।

রমজান ছাড়া বছরের বাকি এগারো মাস আমরা পার্থিব জীবনের হাজারো ব্যস্ততায় ডুবে থাকি, ঘুরপাক খেতে থাকি জীবন-জীবিকার সন্ধানে। সময় কাটিয়ে দিই হাসি-তামাশা, আরাম-আয়েশের মাঝে। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হয়তো আদায় করি, দিনে পাঁচবার হয়তো হাজিরা দিই দরবারে ইলাহিতে; কখনো প্রশান্ত হৃদয়ে, কখনো অস্থির চিত্তে; কিন্তু দিনের অধিকাংশ সময়ই আমরা অতিবাহিত করি পার্থিব নানা চিন্তা-ভাবনায়, সম্পদ ও জীবিকার অন্বেষণে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বছরের একটি মাস 'রমজান'কে এ উদ্দেশ্যে নির্ধারণ করেছেন যে, বান্দা পার্থিব ব্যস্ততায় এগারো মাসে আল্লাহর কাছ থেকে যতটুকু দূরে সরে গেছে, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল করে ফেলেছে, এই এক মাসে যেন সেই দূরত্বকে জয় করে পুনরায় আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে; দুর্বল হয়ে যাওয়া সম্পর্ক পুনরায় মজবুত ও সুদৃঢ় করতে পারে। অর্থাৎ আমাদের মতো গাফেল ও উদাসীন বান্দাদের গাফলতের ঘুম থেকে জাগ্রত করে আপন নৈকট্য ও সান্নিধ্য-দানের জন্য রমজান মাস হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একটি বাহানা!

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 মাহে রমজানের স্বতন্ত্র কেবল রোজা ও তারাবি-ই নয়!

📄 মাহে রমজানের স্বতন্ত্র কেবল রোজা ও তারাবি-ই নয়!


সাধারণভাবে আমরা মনে করে থাকি, অন্যান্য মাসের তুলনায় রমজানের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দিনে রোজা রাখা আর রাতে তারাবি পড়া। ব্যস! এতটুকুই মাহে রমজানের বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য; এতটুকুই রমজান মাসের দাবি ও তাৎপর্য। কিন্তু বাস্তবতা কি তা-ই?

নিঃসন্দেহে রোজা যেমন রমজান মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোকন, তেমনই রমজানের রাতের তারাবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি সুন্নাত; কিন্তু বাস্তবতা হলো রমজানের বৈশিষ্ট্য ও তাৎপর্য, হক ও দাবি এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়।

আমরা পূর্বেও বলে এসেছি যে, রমজানের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো—বান্দা এ মাসকে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের মাধ্যমরূপে গ্রহণ করবে, এ মাসকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃনবায়ন ও সুদৃঢ় করবে। আর এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য শুধু রোজা ও তারাবি যথেষ্ট নয়। প্রকৃতপক্ষে এ উদ্দেশ্য তখনই বাস্তবায়িত হবে যখন বান্দা রমজান মাসে নিজের অন্যান্য সকল ব্যস্ততা হ্রাস করে আল্লাহর ইবাদতে সর্বোচ্চ সময় ব্যয় করতে সচেষ্ট হবে।

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 মাহে রমজানে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন বড় সহজ!

📄 মাহে রমজানে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন বড় সহজ!


রমজান মাসে বান্দা যেন আল্লাহ পাকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার নৈকট্য অর্জনে সচেষ্ট হয় এবং তার ইবাদতে পূর্ণ নিবিষ্ট হয়, এ জন্য এ মাসে আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি আপন দয়া ও অনুগ্রহের প্রকাশ অন্যান্য সময়ের চেয়ে বিস্তৃত ও ব্যাপকতর করে রেখেছেন।

মাহে রমজানের শুরু থেকেই দুনিয়াবাসীর ওপর আল্লাহ পাকের বিশেষ রহমতের বারিধারা বর্ষিত হতে থাকে। গুনাহগার বান্দাকে ক্ষমা করার নানা বাহানা তালাশ করা হয়। মুমিন বান্দার ওপর রহমত নাজিল করার উসিলা খোঁজা হয়। এ মাসে সামান্য আমলেও অসামান্য আজর ও সাওয়াব দান করা হয়।

হাদিস শরিফে এসেছে, এ মাসে কেউ যদি নফল ইবাদত করে, আল্লাহ পাক তার জন্য ফরজ ইবাদত পরিমাণ সাওয়াব রেখেছেন, আর এ মাসে কেউ যদি কোনো ফরজ আদায় করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য সত্তরটি ফরজ আদায়ের সাওয়াব রেখেছেন।²

অর্থাৎ দু-রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করলে একশ চল্লিশ রাকাত নামাজের সাওয়াব! সুবহানাল্লাহ! এভাবে প্রত্যেক নেক আমলের সাওয়াব আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ মাসে সত্তর গুণ করে দেন। এক টাকা দান করলে সত্তর টাকা দান করার সাওয়াব! দশ টাকা দান করলে সাতশ টাকা দান করার সাওয়াব! আর একশ টাকা দান করলে সাত হাজার টাকা দান করার সাওয়াব!

সুবহানাল্লাহ! কত মহান আমার দয়াময় আল্লাহ!

এ মাসে ছোট ছোট আমলের বদলায়ও আল্লাহ পাক মাগফিরাত ও ক্ষমার ওয়াদা করেছেন। বান্দা নিজে রোজা রেখেছে, পেয়ারে হাবিবের জবানে তার জন্য আল্লাহ তাআলার মাগফিরাত ও ক্ষমার ঘোষণা-
«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ»
যে ব্যক্তি ঈমানের দাবিতে, শুধু আল্লাহর কাছে আজর লাভের প্রত্যাশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার পূর্বে কৃত সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।³

বান্দা কোনো রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করিয়েছে, এর পরিবর্তেও মাগফিরাতের বার্তা-
«مَنْ فَطَرَ فِيْهِ صَائِمًا كَانَ لَهُ مَغْفِرَةً لِذُنُوبِهِ، وَعِتْقَ رَقَبَتِهِ مِنَ النَّارِ»
যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার এই আমল তার গুনাহ-মাফের এবং জাহান্নাম হতে মুক্তিলাভের কারণ হবে।⁴

বান্দা রমজানের রাতে তারাবিতে দণ্ডায়মান হয়েছে; নববি জবানে রাব্বে কারিমের খোশখবরি-
«مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّমَ مِنْ ذَنْبِهِ»
যে ব্যক্তি ঈমানের দাবিতে শুধু আল্লাহর কাছে আজর লাভের প্রত্যাশায় রমজানের রজনীতে ইবাদত করবে (তারাবি ইত্যাদি পড়বে), তার পূর্বে কৃত যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।⁵

মোটকথা, এ মাসে অতি অল্প আমলেও আল্লাহ পাক বিরাট আজর ও সাওয়াব দান করেন এবং বাহানা তালাশ করে করে এ মাসে মাগফিরাত ও ক্ষমা প্রদান করেন। আল্লাহ পাক তার নৈকট্য অর্জনের জন্য এ মাস যেমন নির্ধারণ করেছেন, নৈকট্য অর্জনের পথও সহজ করে দিয়েছেন।

টিকাঃ
২. দেখুন পরিশিষ্টে উল্লেখিত হাদিস নং-৪।
৩. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৯০১ ও ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭৫।
৪. ইবনে খুযাইমা, সহিহ ইবনে খুযাইমা, হাদিস নং ১৮৮৭ ও বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস নং ৩৩৩৬।
৫. ইমাম বুখারি, সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৭ ও ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৭৫৯।

📘 আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান 📄 বিশ রাকাত তারাবি আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহাসুযোগ!

📄 বিশ রাকাত তারাবি আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহাসুযোগ!


বছরের অন্যান্য দিনগুলোতে আমরা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি। কিন্তু রমজান মাসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিশ রাকাত তারাবিও আদায় করা হয়। কী বৈশিষ্ট্য এই তারাবির? কী তাৎপর্য এই অতিরিক্ত বিশ রাকাতের? আল্লাহু আকবার! ভেবে দেখেছেন কখনো? নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'বান্দা আপন পরওয়ারদিগার আল্লাহ পাকের সবচেয়ে নিকট-সান্নিধ্য লাভ করে সিজদার হালতে।⁶ সিজদা হলো মুমিন বান্দার মিরাজ ও আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎপর্ব। বান্দা যখন সিজদার হালতে আল্লাহ পাকের দরবারে ললাট স্পর্শ করে, বারবার 'সুবহানা রাব্বিয়াল আলা' পাঠ করে রাব্বে কারিমের ছানা ও প্রশংসা করে, তখন সে আল্লাহ পাকের যে নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভ করে, অন্য কোনো সময় তা লাভ করে না। সুতরাং আল্লাহ পাক যেন বিশ রাকাত তারাবির এই বিধান দান করে বান্দাকে সম্বোধন করে বলছেন, বান্দা! প্রতিদিন তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আমার সান্নিধ্য লাভে ধন্য হতে। এখন আমার সান্নিধ্য অর্জন ও সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ তোমার জন্য আরও উন্মুক্ত ও অবারিত করে দিলাম। রমজান মাসে আরও বেশি আমার সান্নিধ্য অর্জন করো। বিশ রাকাত তারাবি পড়বে, তো চল্লিশটি অতিরিক্ত সিজদার মাধ্যমে আরও চল্লিশ বার আমার একান্ত সান্নিধ্য লাভে ধন্য হবে।

টিকাঃ
৬. হাদিসটির মূল পাঠ হলো- «أَقْرَبُ مَا يَكُوْنُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ، وَهُوَ سَاجِدٌ، فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ» সিজদা অবস্থায়ই বান্দা তার রবের অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। অতএব, তোমরা (সিজদায়) অধিক পরিমাণে দোয়া করবে। [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৪৮২]

ফন্ট সাইজ
15px
17px