📘 আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত যারা 📄 সাহসী এক কিশোরের গল্প

📄 সাহসী এক কিশোরের গল্প


রাসূলের (সা) সাথে হযরত আলীর (রা) সম্পর্কের সূচনা
রাসূলের (সা) প্রিয় চাচা ছিলেন আবু তালিব। তিনি পরম স্নেহে নবি মুহাম্মাদ (সা) কে লালন পালন করেছিলেন। রাসূল (সা) তার জন্মের আগেই পিতা আব্দুল্লাহকে হারান। মাত্র ছয় বছর বয়সে তার মা আমিনাও ইন্তেকাল করেন। এরপর সেই ছয় বছর বয়স থেকেই নবি মুহাম্মাদ (সা) তার চাচা আবু তালিবের বাসায় বসবাস করতেন। ততদিন তিনি চাচা আবু তালিবের বাসায় ছিলেন ততদিন চাচা আবু তালিব তাকে নিজের ছেলের মতো পরম মমতায় লালন করতেন। একজন পিতা তার সন্তানকে যেভাবে ভালোবাসতে পারে, চাচা আবু তালিব ঠিক সেভাবেই নবি মুহাম্মাদকে (সা) ভালোবাসতেন। রাসূল (সা) নিজেও চাচা আবু তালিবকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন। বিবি খাদিজাকে বিয়ে করার আগ পর্যন্ত মুহাম্মাদ (সা) তার চাচা আবু তালিবের সাথেই থাকতেন।

চাচা আবু তালিবের বাসায় থাকা অবস্থায় যখন তার একজন সন্তান হলো তখন নবিজি খুব খুশি হয়েছিলেন। তাঁর উচ্ছ্বাস দেখে মনে হতো সন্তানটি চাচা আবু তালিবের নয় বরং তাঁর নিজেরই। আবু তালিবের কোল আলো করে যখন নতুন এই সন্তানটি আসে রাসূল (সা) তখন বাসার বাইরে ছিলেন। নতুন সন্তান আগমনের খবর পেয়েই তিনি দ্রুত চাচার বাসায় চলে গেলেন। গিয়ে দেখলেন ছোট্ট শিশুটি তার মায়ের কোলে আপন মনে শুয়ে আছে। একেবারে জন্মের পর থেকেই ছোট্ট এই শিশুর দৃষ্টি ছিল পরিষ্কার ও অন্তর্ভেদি। শিশুটি দেখতেও ছিল খুবই সুন্দর। রাসূল (সা) ছোট্ট শিশুকে তার কোলে তুলে নিলেন এবং কপালে আদর মাখা চুমু দিলেন। তিনি চাচাকে প্রশ্ন করলেন, "চাচা এই বাচ্চাটির নাম কী রাখবেন?"

চাচা বললেন, “ওর নাম রাখব আলী।” এরপর থেকে দিন যত যেতে লাগল, আলীর (রা) প্রতি নবি মুহাম্মাদের (সা) ভালোবাসাও ক্রমশ বাড়তে লাগল। এই ভালোবাসার মাত্রা এতোটাই প্রকট ছিল যে একদিন নবি মুহাম্মাদ (সা) চাচা আবু তালিবের কাছে গেলেন এবং বললেন, “চাচা, আমি জানি আপনি আমাকে সন্তানের মতো ভালোবাসেন। সেই ভালোবাসার দাবি থেকে আমি আপনার কাছে আজ একটা কিছু চাইব।”
চাচা আবু তালিব জানতে চাইলেন, “বল তুমি কি চাও?” নবিজি (সা) বললেন, “দয়া করে আলীকে আমার জিম্মায় দিয়ে দিন। আলী আজ থেকে আমার বাসায় থাকবে।"
চাচা আবু তালিব নবি মুহাম্মাদ (সা) কে এতোটাই ভালোবাসতেন যে তার অনুরোধ তিনি ফেলতে পারলেন না। আলী (রা) এরপর থেকে বাবা আবু তালিবের বাসা ছেড়ে তার চাচাতো ভাই, আমাদের শেষ নবি হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর বাসায় থাকতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে রাসূলের সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজেই আলী (রা) ছায়ার মতো তাকে সঙ্গ দিয়ে যান।

হযরত আলী (রা) যেভাবে মুসলমান হলেন
হযরত আলীর তখন মাত্র ১০ বছর বয়স। একদিন তিনি বাড়িতে ফিরে বেশ অদ্ভুত একটা দৃশ্য লক্ষ্য করলেন। তিনি দেখলেন, হযরত মুহাম্মাদ (সা) সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার দৃষ্টি মাটির দিকে অবনমিত। আর হাত দুটো তিনি বুকের উপরে বেঁধে রেখেছেন। তার স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা) একইভাবে নবি মুহাম্মাদের (সা) পাশে দাঁড়িয়ে একনিষ্ঠভাবে স্বামীকে অনুসরণ করছেন।
কিছু সময় পর, মুহাম্মাদ (সা) এবং খাদিজা (রা) হাঁটুর উপর হাত রেখে মাথা ঝুঁকে রুকুতে চলে গেলেন। তারা কিছুক্ষণ সে অবস্থানে থাকলেন তারপর আবার আগের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। দূর থেকে কিশোর আলী (রা) গভীর মনোযোগের সাথে এসব দৃশ্য দেখছিলেন। ভাই ও ভাবির কার্যক্রমে তিনি বেশ অবাকও হয়েছিলেন। একটু পর তিনি আরো লক্ষ্য করলেন যে, নবি মুহাম্মাদ (সা) ও বিবি খাদিজা (রা) হাঁটু গেড়ে বসলেন এবং তারপরে কপাল মাটিতে ছোঁয়ালেন যাকে আমরা এখন সিজদা বলি। এই কার্যক্রমগুলো তখনো পর্যন্ত আলীর (রা) কাছে অপরিচিত থাকায় তার বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটছিলই না। তিনি আরো ভাবলেন, "আমি এর আগে আমাদের মাটির তৈরি দেব-দেবীর মূর্তির সামনে কাউকে কাউকে মাথা নিচু করে উপাসনা করতে দেখেছি। কিন্তু মোহাম্মাদ (সা) বা খাদিজার (রা) সামনে তো সেরকম কোনো মূর্তি নেই। তার মানে তারা কোনো দেব দেবীর বা প্রতিমার পূজা করছে না বরং তারা অন্য কারো ইবাদত করছে।"

কিশোর আলী ছিলেন খুবই বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান। যদিও নিশ্চিতভাবে তিনি বুঝেননি নবি মুহাম্মাদ (সা) এবং তার স্ত্রী খাদিজা (রা) কি কাজ করছেন। তবে তিনি ধারণা করেছিলেন যে তারা হয়তো কারো ইবাদত করছেন। তিনি এও বুঝে ফেললেন যে, তার ভাই ও ডাবি এমন একজনের ইবাদত করছে যার কোনো প্রতিমা তাদের সামনে উপস্থিত নেই। অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সা) কোনো এক স্বত্ত্বাকে না দেখে তার ইবাদত করছে। এই ঘটনাগুলো দেখে হযরত আলীর (রা) মনে অদৃশ্য প্রভু সম্বন্ধে জানার বিপুল আগ্রহ তৈরি হলো।

যখন নবি মুহাম্মাদ (সা) তার ইবাদত শেষ করলেন, কিশোর আলী (রা) তার কাছে ছুটে গিয়ে জানতে চাইল, “আপনি এতোক্ষণ কি করছিলেন?"
হযরত আলীর (রা) এই কৌতূহল দেখে নবি মুহাম্মাদ (সা) ভীষণ সন্তুষ্ট হলেন। মৃদু হেসে তিনি বললেন, “প্রিয় ভাই, আমি আর খাদিজা উভয়ে মিলে আল্লাহর ইবাদত করছিলাম। আল্লাহ হলেন একমাত্র মাবুদ। আল্লাহ একক এবং তিনিই একমাত্র সত্যিকারের প্রভু। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নাই, আর কোনো ইলাহ নেই। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাকে তাঁর রাসূল হিসেবে বাছাই করেছেন। তিনি আমাকে তাঁর বার্তাগুলো অন্য সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন। এখন আমাকে সর্বস্তরের জনগণকে জানাতে হবে যে, তোমরা যাদের ইবাদত করছ তারা সব মিথ্যা এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি। এই সকল মিথ্যা দেব-দেবী আর প্রতিমা পূজা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ইবাদত করতে হবে একমাত্র আল্লাহর কেননা তিনিই প্রকৃত এবং সত্যিকারের প্রভু।”

এতোটুকু বলে নবি মুহাম্মাদ তীক্ষ্ণভাবে আলীর (রা) চোখের দিকে চোখ রাখলেন। তিনি বললেন, "আলী তুমি জানো, আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি। আমি নিজের ছেলের মতোই তোমাকে মানুষ করছি। আমি তোমার সাথে কোনো দিন মিথ্যা কথা বলিনি। তোমার সাথে আমি কখনো প্রতারণা করিনি। তোমার এখন বিশ্বাস করা উচিত এইমাত্র আমি তোমাকে যা কিছুই বলেছি তার সবটাই সত্য। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নাই আর আল্লাহই আমাকে তাঁর রাসূল হিসেবে মনোনীত করেছেন।”

হযরত আলী (রা) নিজেও জানতেন, হযরত মুহাম্মাদের (সা) প্রতিটি কথাই সত্য। তিনি নবিজির (সা) প্রতিটি কথাকে গভীরভাবে বিশ্বাস করলেন। তিনি রাসূলের (সা) কথায় ঈমান আনলেন। ইসলামকে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করায় নবি করীম (সা) হযরত আলীর (রা) উপর খুব খুশি হলেন। তিনি কিশোর আলীকে (রা) সত্যনিষ্ঠ ধর্মের পতাকাতলে স্বাগত জানালেন এবং বললেন, “তোমাকে অভিনন্দন আলী। তুমি জানো, তোমার অন্তর জানে যে, আমি যা বলেছি তা সত্য ও সঠিক। আর তুমি হলে প্রথম কিশোর যে ইসলামকে কবুল করে নিয়েছে।"

আলীকে নিয়ে উদ্বিগ্ন বাবা আবু তালিব
এক দিনের কথা। হযরত আলী (রা) তাঁর প্রিয় রাসূলের (সা) সাথে মক্কার একটি পাহাড়ের পাদদেশে গোপনে নামাজ পড়ছিলেন। এ সময় তাদের সাথে আরো বেশ কয়েকজন নওমুসলিম সাহাবি উপস্থিত ছিলেন। তারা একই সাথে জামাতে নামাজ পড়ছিলেন। ঠিক তখনই হযরত আলীর (রা) বাবা আবু তালিব সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি মূলত তার ছেলে আলীকে (রা) খুঁজতে সেখানে হাজির হয়েছিলেন। আবু তালিবের তখন বেশ বয়স হয়ে গেছে। তিনি কিশোর ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। পাহাড়ের পাদদেশে উপস্থিত হয়ে যখন তিনি দেখলেন তার ভাতিজা নবি মুহাম্মাদ (সা) এবং ছেলে আলী (রা) আরো অনেকের সাথে মিলে ইবাদত করছে তখন তিনি বেশ হতবাক হয়ে গেলেন। এর আগে আর কাউকে তিনি এভাবে ইবাদত করতে দেখেননি। ফলে গোটা দৃশ্যপট তাকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল।

আবু তালিব বেশ খানিকটা সময় অপেক্ষা করলেন। নামাজ শেষ হওয়ার পর তিনি তাদের কাছে গেলেন। ভাতিজা নবি মুহাম্মাদের (সা) সাথে তার কিছু কথোপকথনও হলো- যা নিম্নরূপ:
আবু তালিব : মুহাম্মাদ, তুমি এগুলো কি করছ?
নবিজি (সা): চাচা, আমরা নামাজ পড়ছি।
আবু তালিব : তোমরা কার সামনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছ? কার সামনে ইবাদত করছ? আমি তো তোমাদের সামনে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না।
রাসূল (সা) : আমরা যখন নামাজ পড়ি, তখন আমাদের সামনে আল্লাহর কোনো পাথরে বানানো মূর্তি থাকার প্রয়োজন হয় না।
আবু তালিব : তাহলে তোমরা কার ইবাদত কর?
নবিজি (সা) : আমরা এই বিশ্ব জাহানের একমাত্র অধিপতি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইবাদত করি।
আবু তালিব : কেন তোমরা তার ইবাদত কর? কোথা থেকে তোমরা এই বার্তা পেয়েছো?
নবিজি (সা) : কারণ আল্লাহ তায়ালা আমাকে রাসূল হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন। তিনি আমাকে জানিয়েছেন, শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে হবে। আসুন চাচা আপনি আমাদের সাথে এসে দাঁড়ান, নামাজে শামিল হউন।
আবু তালিব : কিভাবে আমি তোমাদের সাথে নামাজ পড়ব? আমি একজন বৃদ্ধ মানুষ। আমি এই বয়সে এসে তোমাদের সাথে যোগ দিতে পারি না। আমি আমার গোত্রের মানুষদের এতো দিনের পালন করে আসা ধর্মকে, আমাদের পূর্বসূরীদের ধর্মকে এভাবে ত্যাগ করতে পারব না।
রাসূল (সা) পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু চাচা আপনি কি এটা বুঝতে পারছেন না যে এটাই আমাদের আদিপুরুষ হযরত ইবরাহিমের (আ) সুপারিশকৃত সত্য ধর্ম।”

এই প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে আবু তালিব তার ছেলে আলীর (রা) কাছে চলে গেলেন। হযরত আলী তখন অন্যান্য মুসলিম সাহাবিদের সাথে একটি কোনায় দাঁড়িয়েছিলেন। আবু তালিব তার ছেলেকে প্রশ্ন করলেন, “বাবা তুমি এখানে কি করছ? তুমিও কি মুহাম্মাদের মতো আমাদের পূর্বসূরীদের ধর্মকে ত্যাগ করেছ?”
হযরত আলী ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান। তিনি উত্তর দিলেন, “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাকে মুসলমান হিসেবে বাছাই করেছেন। আমি এক আল্লাহর ইবাদত করি আর আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হযরত মুহাম্মাদের (সা) অনুসরণ করি।"

হযরত আলীর (রা) উত্তর শুনে পিতা আবু তালিব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। তার মনে হলো তার এই ছেলেটি বোধহয় উচ্ছন্নে চলে যাবে। পাশাপাশি, তার ছেলে পূর্বসূরীদের ধর্মকে ত্যাগ করেছে এই বিষয়টিও আবু তালিবকে অনেক ব্যথিত করল। তিনি হযরত আলীকে (রা) ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে একটি প্রস্তাব করলেন। তিনি কিশোর সন্তান আলীকে (রা) বললেন, “তোমার আর মুহাম্মাদের (সা) সাথে থাকার দরকার নেই। আজ থেকে তুমি আমার সাথে আমার বাসায় থাকবে।"

হযরত আলী (রা) তার বাবা আবু তালিবকে অত্যন্ত পছন্দ করলেও বাবার এই আদেশটি মানতে রাজি হলেন না। আবু তালিব আবারও অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। তখন নবি মুহাম্মাদ (সা) হযরত আলীর (রা) কাছে গেলেন এবং তাকে বললেন, “আমার দিক থেকে কোনো চাপ নেই। তুমি তোমার মতো করে স্বাধীনভাবে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারো। যদি তুমি তোমার বাবার সাথে থাকতে চাও তাহলে আমার দিক থেকে কোনো আপত্তি নেই।”

কিন্তু হযরত আলী (রা) স্পষ্ট ভাষায় উত্তর দিলেন, “আমি আল্লাহর রাসূলের (সা) সাথে থাকতে চাই। আমি তার কাছে থেকেই আল্লাহর ইবাদত করতে চাই।” তাই বাধ্য হয়েই আবু তালিব তার কিশোর সন্তান আলীকে (রা) নবি মুহাম্মাদের (সা) কাছে রেখে চলে গেলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না যে তিনি কি করবেন। একদিকে তিনি বেশ অসন্তুষ্ট ছিলেন কেননা আলী তার বাপ-দাদার ধর্ম পরিত্যাগ করেছে কিন্তু তিনি এও জানতেন যে নবি মুহাম্মাদ (সা) একজন ভালো, সৎ, বিশ্বস্ত এবং আমানতদার মানুষ। বিদায় বেলায় চাচা আবু তালিব নবি মুহাম্মাদকে (সা) বলে গেলেন, “যদিও আমি তোমার ধর্ম সম্পর্কে কিছুই জানি না। এ সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণাও নেই। তারপরও আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। আমি জানি, তুমি কখনোই আলীকে খারাপ কোনো কাজে লাগাবে না, খারাপ কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে না। তোমার উপরে অন্তত এতোটুকু বিশ্বাস আমার আছে।”

পরিণত বয়সে হযরত আলী (রা)
কিশোর হিসেবে হযরত আলী (রা) খুবই ভালো ছিলেন। তিনি ছিলেন দয়ালু এবং সুবিবেচক। তিনি কঠোর পরিশ্রম করতে পারতেন। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। তখন হযরত আলীর (রা) বয়স ১১ বছর। রাসূল (সা) আলীকে (রা) ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, “আলী, আমি আমার পরিবারের মুরব্বিদের একদিন দাওয়াত করে খাওয়াতে চাই। আমি চাই তুমি গোটা আয়োজনের সার্বিক দায়িত্ব নাও। তুমি সকল অতিথিকে আমন্ত্রণ জানাবে এবং পরবর্তী বিষয়গুলো তত্ত্বাবধান করবে।”
হযরত আলী (রা) এই দায়িত্ব পেয়ে খুবই সন্তুষ্ট হলেন। তার এই ভেবে ভালো লাগল যে, গোটা নিমন্ত্রণ অনুষ্ঠানের দায়িত্বভার রাসূল (সা) তার উপর ন্যস্ত করেছেন। দায়িত্বের অংশ হিসেবে হযরত আলী (রা) পরিবারের সকল মুরব্বির কাছে দাওয়াত পৌঁছে দিলেন এবং খাবার প্রস্তুতি ও রান্নাবান্নার যাবতীয় কাজ তদারকি করলেন।

পরিবারের নিমন্ত্রিত সকল সদস্যগণ দাওয়াতে আসলেন। এর মধ্যে একজন ছিলেন আবু লাহাব যিনি সম্পর্কে রাসূলের (সা) চাচা হন। মানুষ হিসেবে আবু লাহাব ছিলো নিতান্তই বাজে স্বভাবের। গোটা জীবন জুড়ে সে শুধু অর্থ-সম্পদের পেছনেই ছুটেছে। সে সম্পদ বাড়ানোর জন্য যে কোনো কিছু করতে দ্বিধা করত না। আবু লাহাব অহরহ মিথ্যা বলতো। সে অভাবী ও দরিদ্রদের সাথে প্রতারণা করত এবং অসহায় মানুষের উপর নির্যাতন চালাত। আবু লাহাব পৃথিবীতে শুধু একটি জিনিসই পছন্দ করত আর তাহলো সম্পদ আর বিত্ত-বৈভব। অন্য সকল মুরব্বির মতো আবু লাহাবও পাথরের তৈরি মূর্তির উপাসনা করত। সে কখনোই আল্লাহকে প্রভু হিসেবে মানতে চায় নি। সে ভেবেছিল, "যদি আমি মুসলমান হই তাহলে আমার সম্পদের একটা অংশ অভাবী ও দরিদ্র ব্যক্তিদের দিয়ে দিতে হবে। কেননা আল্লাহ এরকমই আদেশ করেছেন। তাছাড়া আমি যদি মুসলমান হই তাহলে তো আমাকে সৎ হয়ে যেতে হবে। আর সৎ হয়ে গেলে আমি তো আর মিথ্যা কথা বলে কিংবা প্রতারণা করে অর্থ-সম্পদ বানাতে পারব না।"

আগত সকল মুরুব্বির খাবার গ্রহণ শেষ হওয়ার পর রাসূল (সা) আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে কথা বলতে শুরু করলেন। নবিজির (সা) ইচ্ছে ছিল তিনি উপস্থিত সকলকে জানিয়ে দিবেন যে, একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হলেন সত্যিকারের প্রভু এবং তিনি আল্লাহর রাসূল। নবিজি (সা) আরো চেয়েছিলেন যে, তিনি তার সকল মুরুব্বিকে অনুরোধ করবেন যাতে তারা মাটি আর পাথরে তৈরি দেব-দেবীর উপাসনা না করে বরং এক আল্লাহর ইবাদত শুরু করেন। কিন্তু যখনই মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে কথা বলতে শুরু করলেন তখনই আবু লাহাব তাকে থামিয়ে দিলেন। যদিও সম্পর্কে মুহাম্মাদ (সা) তার ভাতিজা হন তবুও আবু লাহাব তাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। আবু লাহাব এও চাননি যে, দাওয়াতে উপস্থিত অন্য কেউ মুহাম্মাদের কথা শুনুক। আয়োজন ভণ্ডুল করার উদ্দেশ্যে আবু লাহাব এতো জোরে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করল যে নবিজিকে (সা) বাধ্য হয়ে থেমে যেতে হলো। রাসূল (সা) যে কথাগুলো বলতে চেয়েছিলেন সেগুলো আর বলা হলো না এবং অতিথিরাও সেই কথাগুলো না শুনেই সেদিনের মতো চলে গেল।
এভাবে সব মেহমান চলে যাওয়ায় হযরত আলী (রা) বেশ কষ্ট পেলেন। বিশেষ করে, আবু লাহাবের উপর তিনি বেশ অসন্তুষ্ট হলেন। আলী (রা) ভাবতেও পারেননি যে তার পরিবারের মুরুব্বিরা এই ধরনের বাজে ব্যবহার করতে পারে। হযরত আলীর (রা) মলিন চেহারা দেখে রাসূল (সা) তার কাছে গেলেন আর বললেন, “আলী, এতো সহজেই হাল ছেড়ে দিও না। তুমি দেখো নিকট ভবিষ্যতে আমরাই জয়ী হবো কেননা আল্লাহ তায়ালা আমাদের সাহায্য করবেন। আমি তোমাকে অনুরোধ করব যাতে তুমি একই ধরনের আরেকটি দাওয়াতের ব্যবস্থা কর। আজকে যা হলো পরবর্তী অনুষ্ঠানে যেন তার পুনরাবৃত্তি না হয় আমি তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করব।”

হযরত আলী (রা) এবারও রাসূলের (সা) কথামতো যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। পরিবারের সকল মুরুব্বিরা আবারও দাওয়াত খেতে উপস্থিত হলেন। খাবার-দাবার গ্রহণের পর হযরত মুহাম্মাদ (সা) তাঁর পরিকল্পনামাফিক আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে কথা বলতে শুরু করলেন। তবে এবার আবু লাহাব তাকে আর বাঁধা দিল না। রাসূল (সা) বললেন, “আমার প্রিয় বন্ধুগণ। আমি এখানে আমাদের সকলের প্রভুর পক্ষ থেকে কিছু বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছি। একমাত্র আল্লাহই হলেন এ বিশ্ব জগতের প্রতিপালক, একমাত্র মালিক। তিনি আমাকে তাঁর রাসূল হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি আমাকে আপনাদের মাঝে পাঠিয়েছেন যাতে আমি আপনাদের কিছু কথা জানাতে পারি। যাতে আমি আপনাদের হেদায়াতের সন্ধান দিতে পারি যার মাধ্যমে আপনারা দুনিয়া এবং আখেরাতে সফলতা লাভ করবেন। এবার দয়া করে, পবিত্র কালামে পাক থেকে আল্লাহ তায়ালার কিছু ঘোষণা শুনুন।
আল্লাহ বলেন, “আমি একমাত্র প্রতিপালক, ইলাহ। এই বিশ্বজাহানের অধিপতি। তোমরা আমাকে সবসময় স্মরণ করবে। আমাকে ভালোবাসবে, আমার ইবাদত করবে। আমার হক আদায় করবে, আমার আনুগত্য করবে। আমার সামনেই শুধু সিজদা করবে। যদি তোমরা এই কাজগুলো করতে পার, তাহলেই আমি তোমাদের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হব।
আর আমিও তোমাদের সাথে প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হব কেননা আমি তোমাদের ভালোবাসি, তোমাদের নিয়ে আমিও সচেতন থাকি। যদি তোমরা আমার কথামতো চলো, আমি তোমাদের উদারভাবে পুরস্কৃত করব। তোমাদেরকে অপয়া থেকে হেফাজত করে জান্নাতে প্রবেশ করাব- যেখানে কোনো ভয় নেই, কোনো কিছু নিয়েই যেখানে তোমাদের কোনো আফসোস বা অনুশোচনারও স্থান নেই।”
এটুকু বলেই রাসূল (সা) থামলেন এবং বললেন, “আল্লাহ তায়ালা আমাকে এ কথাগুলো জানানোর দায়িত্ব দিয়েছেন। আমার প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ, দয়া করে বলুন, আপনাদের মধ্যে কারা কারা আমার সাথে থাকবেন এবং আল্লাহর হক আদায় করার ক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করবেন? কে কে আছেন যারা আমাকে অনুসরণ করবেন? এই মহৎ কাজে কারা কারা আমার সঙ্গী হবেন?"

কেউ কোনো কথা বলল না। যদিও মুরুব্বিরা সবাই পরিষ্কারভাবে নবি মুহাম্মাদের (সা) এর সকল কথা শুনেছেন তবুও কেউ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসলো না। বরং রাসূল (সা) যখন তাদের মুখের দিকে তাকালেন তারা মুখ ফিরিয়ে নিলেন। নিজের চোখে এই দৃশ্য দেখেও হযরত আলী (রা) বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। হযরত আলী (রা) ভালোমতো জানতেন এবং আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন যে, রাসূল (সা) যা বলেছেন তার প্রতিটি কথাই সত্য। তারপরও তিনি বুঝতে পারছিলেন না যে কেন মুরুব্বিরা নবিজির (সা) কথায় বিশ্বাস আনতে পারলেন না। হযরত আলী (রা) ভাবলেন, এই লোকগুলো আসলে বিপথগামী এবং আল্লাহ হেদায়েত না করলে তারা কেউ সঠিক পথে ফিরে আসতে পারবে না।

এরপর হযরত আলী (রা) রাসূলের মুখপানে তাকালেন। তিনি তখনও পর্যন্ত অপেক্ষা করে আছেন কেউ হয়তো তার ডাকে সাড়া দেবেন। হযরত আলী (রা) এই পিন পতন নীরবতাকে আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি এতোক্ষণ বসে ছিলেন। হঠাৎ করে তিনি উঠে দাড়াঁলেন এবং দ্রুতবেগে মুরব্বিদের মাঝখানে হেটে গিয়ে একেবারে রাসূলের (সা) পাশে গিয়ে থামলেন। হযরত আলী (রা) নবি মুহাম্মাদের (সা) চোখ মুবারকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনাকে অনুসরণ করব, আমি আপনার সঙ্গী হব এবং আমি আপনাকে সাহায্য করব। যদিও আমি বয়সে তরুণ এবং খুব একটা শক্তিশালীও নই। তবুও আমি আপনার পক্ষে লড়াই করে যাব। আজ থেকে আপনার যারা বিরোধিতা করবে আমিও তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেব।"

মুরুব্বিরা হযরত আলীর (রাঃ) ভূমিকায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। তারা কি করবেন বা বলবেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কিভাবে আলীর মতো সামান্য একজন কিশোর নবি মুহাম্মাদের (সা) পক্ষে অবস্থান নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবে। কিন্তু হযরত আলী (রা) ছিলেন খুব সাহসী। আল্লাহর উপর তার ছিল পূর্ণ ঈমান ও আস্থা। তিনি ভালোভাবে জানতেন যে, আল্লাহ তাকে এবং তাঁর প্রিয় রাসূলকে (সা) সাহায্য করবেন। তিনি এও বিশ্বাস করতেন খুব শীঘ্রই তারা বিজয় লাভ করবেন।
হযরত আলীর (রা) তড়িৎকর্মা প্রতিক্রিয়ায় এবং উপস্থিত বুদ্ধিতে নবি মুহাম্মাদ (সা) খুবই সন্তুষ্ট হলেন। তিনি বললেন, “এখানে এতোগুলো বয়স্ক মানুষেরা যা করতে সাহস পায়নি, এই কিশোর ছেলেটি তাই করে দেখালো। আমি আলীকে আমার অনুসরণকারী এবং সঙ্গী হিসেবে স্বাগত জানাই। আপনাদের উচিত আলীর মতো করে বিষয়টিকে নিয়ে ইতিবাচকভাবে চিন্তা করা এবং আলীর (রা) মতোই সঠিক পথে চলে আসা।"

নবিজি (সা) এটুকু বলে হযরত আলীর (রা) মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। আবু লাহাব এই দৃশ্য সহ্য করতে পারল না। সে এতোক্ষণ নীরবে চুপচাপ বসেছিল। কিন্তু যখন অন্য সব মুরুব্বির কাপুরুষোচিত আচরণের মুখে হযরত আলী (রা) সাহস ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিলেন, তখন আবু লাহাব আর সহ্য করতে পারল না। সে আবার আগের দিনের মতো চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করল এবং একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করল। আবু লাহাব উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ও আমার ভাইয়েরা, কিভাবে একজন পরিণত মানুষ আর একটা কিশোর ছেলে মিলে গোটা পৃথিবীকে পাল্টে দেবে? কিভাবে তারা হাজার হাজার অনুসারী তৈরি করবে? এটা কোনো দিনই সম্ভব নয়।"

কিন্তু আবু লাহাবের কথা ঠিক হয়নি। বরং অল্প কয়েক বছরের মাঝেই শুধু মক্কা বা মদিনা নয়, আশপাশের সকল দেশ এবং অঞ্চলের মানুষ আল্লাহর রাসূলের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করতে শুরু করে। ইসলামের পতাকাবাহী সেনারা আবু লাহাবের নিয়ন্ত্রণাধীন মক্কা শহরকে জয় করে নেয় আর আবু লাহাবের স্থান হয় ইতিহাসের আস্তাকুড়ে।

সাহসী পদক্ষেপ
রাসূল (সা) নবুওয়াত প্রাপ্তির পর বেশ বড় একটা সময় ধরে নিরন্তরভাবে চেষ্টা করে গেছেন যাতে মক্কার বাসিন্দাদের এক আল্লাহর ইবাদত করতে উদ্বুদ্ধ করা যায়। প্রতিদিন সকালে তিনি ঘর ছেড়ে বের হয়ে যেতেন। বিভিন্ন জনাকীর্ণ স্থানে, পাবলিক প্লেসে কিংবা নানা জনের সাথে সাক্ষাৎ করে তিনি তাদের বুঝাতে চেষ্টা করতেন যে, একমাত্র আল্লাহই বিশ্বজগতের অধিপতি, মানুষের একমাত্র প্রভু। কেউ কেউ নবি মুহাম্মাদের (সা) কথা বিশ্বাস করত এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করত। তারা আল্লাহর ইবাদত করত এবং রাসূলকে (সা) অনেক বেশি বিশ্বাস করত। কিন্তু দীর্ঘ এই সময় ধরে মক্কায় দাওয়াতি কাজ চালানোর পরও হাতে গোনা খুব কম সংখ্যক লোকই ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়েছিল।

মক্কার অধিকাংশ লোকই রাসূলের (সা) উপর ঈমান আনতে অস্বীকার করেছিল। তারা তাদের নিজেদের লোভ-লালসায় মত্ত ছিল। নিজস্ব হিসেবেই তারা জীবন যাপন করত। এদের অধিকাংশই আগের মতোই পাথরের আর মাটির তৈরি দেব-দেবীর উপাসনা করা অব্যাহত রাখে। তারা ধারণা করত এই দেব-দেবীরা তাদেরকে সুখী করবে, সম্পদশালী করবে। অন্যদিকে, মক্কায় যেসব ধর্মগুরু ছিলেন, বিভিন্ন গোত্র প্রধান ছিলেন তারাও ওইসব দেব-দেবীর মূর্তিপূজায় জনগণকে উৎসাহ প্রদান করত। মক্কার অধিকাংশ ধর্মগুরু এবং গোত্রপ্রধানরাই আল্লাহকে একমাত্র প্রভু এবং মুহাম্মাদকে (সা) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকার করেছিল।
রাসূলের (সা) সাহাবি এবং অনুসারীর সংখ্যা ছিল অত্যন্ত নগণ্য কিন্তু তাদের ঈমান ছিল মজবুত। মক্কার কিছু কিছু ব্যক্তি অবশ্য ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমানের কার্যক্রম গভীর মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করত এবং তাদের নিয়ে আলোচনা করত। এই মানুষগুলো অনুভব করত যে, ইসলাম গ্রহণকারী মানুষগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রমধর্মী কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। মক্কার অধিবাসীদের কেউ কেউ মুহাম্মাদকে (সা) সত্যনিষ্ঠ এবং সঠিক পথের অনুসারীও মনে করত এবং কখনো কখনো তারা দেব-দেবীর উপাসনা চর্চা ছেড়ে এক আল্লাহর ইবাদত করারও আগ্রহ পোষণ করত।

কিন্তু মক্কার ধর্মগুরু আর গোত্রপ্রধানরা এই ধরনের আড্ডা ও আলোচনাকে কখনোই বরদাশত করত না। বরং এ ধরনের কথাবার্তা শুনলেই তারা রাগে ক্রুদ্ধ হয়ে যেত। তারা সাধারণ মানুষকে হুমকি দিয়ে বলত, “যদি তোমরা মুহাম্মদের দাবি অনুযায়ী নতুন ধর্ম গ্রহণ কর, তাহলে তোমাদের সব মালিকানা, সম্পদ এবং ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাবে।” মুখে যত কথাই বলুক না কেন, এসব স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এও বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছিল যে, মুহাম্মাদের নতুন ধর্মের প্রভাব থেকে মানুষকে মুক্ত রাখার একটাই উপায় আছে আর তা হলো তাকে হত্যা করা।

সেই চিন্তার আলোকে কাজ শুরু হয়ে গেল। মক্কার সব ধর্মগুরু এবং গোত্রপ্রধানরা মিলে গোপনে নবি মুহাম্মাদকে (সা) হত্যা করার জন্য একটি পরিকল্পনা করল। মক্কার প্রতিটি গোত্র থেকে তারা একজন করে বলিষ্ঠ এবং সাহসী সদস্য বাছাই করল এবং তাদের নিয়ে একটি দল গঠন করল। দলের প্রতিটি সদস্যের হাতে ধারালো অস্ত্র তুলে দিল। তারা সেই খুনী দলের সদস্যদের রাতের বেলায় নবি মুহাম্মাদের (সা) ঘরের চারপাশে চক্কর দেওয়ার আদেশ দিল এবং বলল ভোরে যখন মুহাম্মাদ (সা) ঘর থেকে বের হবে তখনই যেন তাকে হত্যা করা হয়। সেই সাথে তারা দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল যুবকদের চোখ-কান খোলা রাখতে বলল যাতে রাতের বেলায় কোনো ভাবেই মুহাম্মাদ (সা) পালিয়ে যেতে না পারেন। শুধু তাই নয়, নবি মুহাম্মাদ (সা) যাতে তার বাড়ির বাইরে যেতে না পারেন- এটা নিশ্চিত করার জন্য তাদেরকে পালাক্রমে রাত জেগে পাহারা দিতেও বলা হলো।

কিন্তু নবি মুহাম্মাদ (সা) হলেন আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল। শত্রুপক্ষের এতো সব চেষ্টার পরও আল্লাহ তাকে অত্যন্ত সুকৌশলে হেফাজত করলেন এবং তার জীবন রক্ষা করলেন। আল্লাহ তায়ালা কুরাইশ নেতাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে নবি মুহাম্মাদকে (সা) আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তাৎক্ষণিকভাবে তাকে মক্কা ছেড়ে যাওয়ার এবং তৎকালীন ইয়াসরিব তথা আজকের মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ দেন। যেখানে আগে থেকেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলমান হিজরত করে চলে গিয়েছিলেন। তারা অধীর আগ্রহে নবিজির (সা) জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
আল্লাহ রাসূল (সা) কে এই হত্যা পরিকল্পনার বিষয়টি জানিয়ে দেয়ার সাথে সাথেই নবি মুহাম্মাদ (সা) তার চাচাতো ভাই হযরত আলীকে (রা) ডেকে পাঠালেন।

হযরত আলী (রা) আসার পর তাকে রাসূল (সা) বললেন, “আল্লাহ তায়ালা আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন যে কিছুক্ষণের মধ্যেই শত্রু পক্ষের লোকেরা এসে আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে ফেলবে। তাদের হাতে তরবারি থাকবে তবে তারা সকাল পর্যন্ত বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করবে কারণ তারা দিনের আলোতে আমাকে হত্যা করতে চায়। তাদের পরিকল্পনা আজ রাতে যখন আমি ঘুমাতে যাব তখন থেকে তারা আমাদের বাড়ির উপর নজর রাখবে। বিশেষ করে, আমার বিছানার উপর তারা নজর রাখবে। ওরা চলে আসার আগে, এই মুহূর্তেই যদি আমি বেরিয়ে যাই তাহলে তারা আমাকে ধরতে পারবে না। কিন্তু যদি তারা দেখে আমার বিছানাটা খালি পড়ে আছে তাহলে তারা বুঝে ফেলবে যে আমি আগেই বের হয়ে গিয়েছি।”
এটুকু বলে রাসূল (সা) হযরত আলীকে (রা) বললেন, “তুমি কি আমার বিছানায় আজ একটু ঘুমাতে পারবে? যদি তুমি তোমার মুখ ঢেকে রাখ তাহলে তারা তোমাকে দেখতে পাবে না। তারা মনে করবে যে আমি দিব্যি বাসায় ঘুমাচ্ছি। সকালবেলা যখন তারা সত্যটি জানতে পারবে ততক্ষণে আমি ইয়াসরিবের পথে অনেকটুকু এগিয়ে যাব।”
হযরত আলী (রা) রাসূলের (সা) পরিকল্পনায় পুরোপুরি সম্মত হলেন এবং আন্তরিকভাবে সাহায্য করতে চাইলেন। তিনি নবি মুহাম্মাদকে (সা) অনেক বেশি ভালোবাসতেন এবং যে কোনো উপায়ে রাসূলের উপকার করতে পারলেই হযরত আলীর (রা) অনেক বেশি ভালো লাগতো। এভাবে দুই ভাই নিজেদের চিন্তায় ও কৌশলে একমত হওয়ার পর হযরত মুহাম্মাদ (সা) গোপনে তার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। অর্থাৎ শত্রুরা তার বাসার উপর নজর রাখার আগেই তিনি তার বাসা ছেড়ে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হলেন।

রাসূল (সা) চলে যাওয়ার পর বাসায় হযরত আলী (রা) একাই রয়ে গেলেন। তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন এবং চাদর দিয়ে নিজের মুখ ও শরীর ঢেকে ফেললেন। তিনি জানতেন ততক্ষণে শত্রুরা গোটা বাড়ি ঘেরাও করে ফেলেছে। কিন্তু তিনি একদমই ভয় পাননি বরং তিনি তার মতো করে ঘুমিয়ে গেলেন। সেই রাতে বরং হযরত আলীর (রা) ঘুম অনেক ভালো হলো। কিশোর সাহাবি হযরত আলী (রা) জানতেন তিনি যা করছেন তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এমনকি কাজটি করতে গিয়ে তার জীবনও চলে যেতে পারে। সকালবেলা শত্রুরা ঘরের ভিতরে এসে চাদর সরিয়ে যদি দেখে যে রাসূল (সা) নেই এবং তার বদলে আলী শুয়ে আছে তাহলে তারা প্রচণ্ড রাগে ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে হত্যাও করে বসতে পারে। এগুলো জানা সত্ত্বেও হযরত আলীর (রা) মনে বিন্দুমাত্র ভয় ছিল না কারণ তিনি আল্লাহকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন আর আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পেতেন না।
হযরত আলী (রা) যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, শত্রুপক্ষের লোকেরা ততক্ষণে বাড়ি ঘেরাও করে তার চারপাশে পাহারা বসিয়ে ফেলেছিল। বাইরে থেকে ঘরের ভেতরের বিছানা দেখা যেত। বিছানার উপর কেউ একজন শুয়ে থাকায় শত্রুরা ধরেই নিয়েছিল যে নবি মুহাম্মাদ (সা) ঘরেই আছেন এবং বিছানায় ঘুমাচ্ছেন। তারপরও মক্কার ঊর্ধবতন নেতৃবৃন্দের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা ভোর হওয়ার অপেক্ষা করছিল। ভোর হলেই তারা মুহাম্মাদের (সা) ঘরের ভিতরে প্রবেশ করবে এবং তাকে হত্যা করবে।

ভোর হওয়ার পর তারা দ্রুত বেগে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করল যেখানে তাদের জন্য গভীর এক বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। তারা দেখল, বিছানায় নবি মুহাম্মাদ (সা) নেই বরং কিশোর আলী (রা) সেখানে শুয়ে আছেন। তারা নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সারাটা রাত তারা বাড়ির উপর নজর রেখেছিল। সেই নজর ফাঁকি দিয়ে মুহাম্মাদ (সা) কিভাবে বের হয়ে গেল এটা তারা বুঝতে পারছিলো না। তারা সারা ঘর তন্নতন্ন করে তল্লাশি করল কিন্তু কোথাও নবি মুহাম্মাদকে (সা) খুঁজে পেল না। নিজেদের ব্যর্থতা উপলব্ধি করে তারা রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ছিল।
আশপাশের বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করে নবি মুহাম্মাদকে (সা) না পেয়ে তারা আবার রাসূলের ঘরে ফিরে এলো এবং হযরত আলীকে (রা) আটকে ফেলল। তারা চিৎকার করে আলীকে (রা) প্রশ্ন করল, "বল, কোথায় সে কথা লুকিয়ে আছে?" হযরত আলী (রা) অত্যন্ত শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা) ইতোমধ্যেই মক্কা ত্যাগ করেছেন। তিনি আর এখানে নেই। তোমরা সারাদিন খুঁজলেও তাকে আর পাবে না।”

ক্রুদ্ধ কুরাইশ সদস্যরা হযরত আলীকে (রা) আবার প্রশ্ন করল, "তাহলে বল সে কোথায় গেছে? আমরা তার পিছনে তাড়া করব এবং তাকে ধরে ফেলবো। যদি তুমি সত্যটা না বল তোমাকে আমরা নির্মমভাবে প্রহার করব।"
তাদের এতো হুমকি ধামকি সত্ত্বেও হযরত আলী (রা) বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালেন না। তিনি উত্তর দিলেন, “নবি মুহাম্মাদ (সা) মক্কা ছেড়ে চলে গেছেন আর এই মুহূর্তে আমি এর বেশি আর একটা কথাও তোমাদের বলব না।"
হযরত আলী (রা) কোনো ভাবেই আর কিছু না বলায় কুরাইশ সদস্যরা হতাশ হয়ে তাকে ফেলে চলে যায়। এই ঘটনার অল্প কয়েকদিন পর রাসূল (সা) নিরাপদে ইয়াসরিবে পৌঁছে যান। পরবর্তীতে এই ইয়াসরিব শহরটির নাম করা হয় মদিনাতুন্নবী অর্থাৎ নবির শহর।
বেশ কিছুদিন পর হযরত আলী (রা) ইয়াসরিবে যান এবং নবি মুহাম্মাদের (সা) সাথে তার দেখা হয়। রাসূল (সা) প্রথমেই তাকে প্রশ্ন করলেন, “যখন ইসলামের শত্রুরা তোমাকে আঘাত করার হুমকি দিল তখন কি তুমি ভয় পেয়েছিলে?"
হযরত আলী (রা) বয়সে কিশোর হলেও অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে উত্তর দিলেন, "না, আমি ভয় পাইনি। আমি আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেই ভয় পাই না।"

একটি অসম লড়াই
রাসূল (সা) এর মদিনায় হিজরতের পর পাঁচটি বছর কেটে গেছে। এরই মধ্যে মক্কা থেকে কাফের সেনারা দুবার মদিনার মুসলমানদের আক্রমণ করেছিল যার ফলশ্রুতিতে বদর ও ওহুদের মতো দুটি বড় যুদ্ধও সংঘটিত হয়েছে। খবর পাওয়া গেল, কুরাইশ সদস্যরা আবার বিরাট একটি সেনাবাহিনী নিয়ে মদিনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এবার ইসলামের শত্রুরা শুধু মক্কা থেকেই আসছে না বরং গোটা আরবের বিভিন্ন গোত্রের ও বিভিন্ন স্থানের ইসলাম বিরোধী লোকদের সমন্বয়ে একটি বিশাল বাহিনী গঠন করে মদিনা আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসছে। আরো জানা গেল কাফের সেনাবাহিনীতে এবার চব্বিশ হাজার সেনা রয়েছে। বলাই বাহুল্য মুসলমানদের সংখ্যা সে তুলনায় ছিল যৎসামান্য। কিন্তু তারপরও মুসলমানরা এক মুহূর্তের জন্যেও ভয় পায়নি।
যদিও মুসলমানেরা সংখ্যায় কম ছিল, তাদের ঘোড়ার সংখ্যা কম ছিল, উন্নত মানের অস্ত্রশস্ত্রও ছিল না; কিন্তু আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমান এবং রাসূলের (সা) প্রতি ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। তারা জানতেন, যদি এই যুদ্ধ করতে গিয়ে তারা শহীদ হন তাহলে আল্লাহ তাদেরকে পুরস্কার হিসেবে জান্নাত দান করবেন।

যা হোক মক্কীসেনা, বনু কিনানা এবং তিহামা অঞ্চলের লোকদের সম্মিলিত বাহিনী যখন মদিনার কাছাকাছি এসে পৌঁছলো তখন তারা এমন একটি দৃশ্য দেখল যা দেখে তারা হতাশায় ডুবে গেল। তাদের সামনে রীতিমতো বিস্ময়কর একটি প্রতিবন্ধকতা এলো যা মোকাবেলা করার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা তাদের ছিল না। কাফের সেনারা দেখল গোটা মদিনার চারপাশে গভীর পরিখা খনন করা হয়েছে। মূলত কাফেরদের প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে রাসূলের (সা) নির্দেশনা অনুযায়ী সাহাবিরা বিগত কয়েক দিন মাটি খুঁড়ে মদিনা শহরের চারপাশে এই পরিখা খনন করেছেন।
প্রাথমিকভাবে পরিখা দেখে কুরাইশরা থামতে চায়নি। তারা বীরদর্পে ঘোড়া ছুটিয়ে পরিখা অতিক্রম করে মদিনায় ঢুকতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের ঘোড়াগুলো পরিখার সামনে গিয়ে হঠাৎ করেই থেমে গেল। গভীর পরিখা দেখে ঘোড়াগুলো কোনো ভাবেই লাফ দিতে চাইছিল না। ঘোড়ার উপরে বসা কুরাইশ নেতারা চাবুক মেরে, ধমক দিয়েও ঘোড়াগুলোকে এক পাও নড়াতে পারছিল না।

কাফেররা মাঝে কিছুটা বিরতি দিয়ে আবার চেষ্টা করল। কিন্তু ঘোড়াগুলো কোনো ভাবেই তাদের কথা শুনছিল না। শেষমেষ তারা তাদের বিশাল বাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে চৌকস এবং পারদর্শী অশ্বারোহী আমরের দ্বারস্থ হলো। কুরাইশ নেতা আমর লোহার তৈরি বর্ম এবং শক্তিশালী হেলমেট পরিধান করে তার ঘোড়ার উপর বসে ছিল। সবাই যখন ঘোড়া নিয়ে লাফ দেয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত ছিল, আমর তখন গোটা পরিস্থিতি তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। সে তার নিজের মতো করে গোটা পরিখা ঘুরে ঘুরে দেখছিল। তার চিন্তা ছিল যে জায়গায় পরিখা অগভী্র এবং সরু সেই স্থান দিয়েই সে লাফ দিয়ে পার হয়ে যাবে।
সুযোগ সন্ধানী আমর খুঁজতে খুঁজতে ঠিকই একটি সরু স্থান বের করে ফেলল এবং সেখান দিয়ে লাফ দিয়ে তার ঘোড়াসহ পরিখার অপর প্রান্তে পৌঁছে গেল। মুসলমানরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য অবলোকন করল। যদিও মুসলমানরা কিছুটা রক্ষণাত্মক কৌশলের অংশ হিসেবে নিজেদের রক্ষা করার জন্য এই পরিখা খনন করেছিল তারপরও যুদ্ধ করার মতো পূর্ণ প্রস্তুতি মুসলমানদের ছিল। যে স্থানটির উপর দিয়ে আমর লাফ দিয়েছিল, পরিখার ঐ জায়গাটি পাহারা দেয়ার দায়িত্ব ছিল মুসলিম বাহিনীর একটি ছোট দলের যার নেতৃত্বে ছিলেন হযরত আলী (রা)। লাফ দিয়ে আমরের পরিখা পার হওয়ার সেই দৃশ্য হযরত আলীর (রা) চোখ এড়ালো না। এর আগে বদরের যুদ্ধেও আমরকে হযরত আলী (রা) লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি জানতেন আমর তার শরীরে লোহার তৈরি বর্ম পরিধান করে এবং ব্যক্তিগতভাবে আমর খুবই সাহসী, শক্তিশালী এবং চৌকস একজন যোদ্ধা।

পরিখা পার হয়ে এসেই হযরত আলীর (রা) নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে দেখে আমর ব্যক্তিগত মল্লযুদ্ধের চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসলো। সে চিৎকার করে বলল, “তোমাদের মধ্যে কার সাহস আছে সে এগিয়ে আসতে পার। আমি তার সাথে সরাসরি মল্লযুদ্ধ করতে চাই।”
মুসলমানরা তার চ্যালেঞ্জ শুনে একে অপরের দিকে তাকালো। তারা নবিজির (সা) চেহারা মোবারকের দিকে তাকিয়ে তার অনুমতির অপেক্ষা করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে হযরত আলী (রা) মল্লযুদ্ধের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সামনে দুপা এগিয়ে গেলেন। নবিজি (সা) তাকে থামালেন। স্নেহের আলী (রা) জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই মল্লযুদ্ধে যাবে বিষয়টি ভেবে তিনি কিছুটা সময় নিচ্ছিলেন। হযরত আলীকে (রা) নবিজি (সা) বললেন, “আলী, তুমি কি দেখছো না, ওটা আমর। সে খুব সাহসী যোদ্ধা।”
এরকম পরিস্থিতিতে আমর আবারো গগণবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠল। “এই মুসলমানেরা, তোমাদের মধ্যে কি আজ কোনো সাহসী ব্যক্তি নেই? আমার সাথে যুদ্ধে হেরে কেউ কি আজ বেহেশতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছ না?"

হযরত আলী আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি তার তরবারি বের করলেন। শেষ মুহূর্তে আবারো তিনি রাসূলের (সা) অনুমতির জন্য তার মুখপানে তাকালেন। কিন্তু এবারও রাসূল (সা) কিছু বললেন না। তৎকালীন আরবের সংস্কৃতি ছিল কেউ যদি তার প্রতিপক্ষকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান জানায় তাহলে তাকে উস্কানি দেওয়ার জন্য আক্রমণকারী ছন্দাকারে ব্যাঙ্গাত্মক কথাবার্তা বলে। আমরও ঠিক সেভাবেই হযরত আলীকে (রা) নিয়ে ঠাট্টা করছিল।
“আমি হলাম আমর; আমার বুক ভরা অহংকার তাই আমি নীরব নই, করি গগনবিদারী চিৎকার ও হে মুসলমানরা, তোমরা আমার ডাকে সাড়া দাও আমায় মুকাবেলা কর আর নিজের কবর খুঁড়ে নাও।"

এবার আর প্রিয় নবি (সা) আর চুপ থাকতে পারলেন না। তিনি উপলব্ধি করলেন এই ধরনের উস্কানিমূলক আহ্বানের পর আলীকে (রা) আর ধরে রাখা সম্ভব হবে না। তিনি হযরত আলীকে (রা) মল্লযুদ্ধে যাওয়ার সম্মতি দিলেন। হযরত আলী (রা) তখন সাহসী এক তরুণ। তিনি তার তরবারি বের করে আমরের দিকে এগিয়ে গেলেন। আমরের চ্যালেঞ্জের উত্তরে তিনিও ছন্দাকারে বলতে থাকলেন, “আমার অন্তর জানে কতটা দৃঢ় আমার বিশ্বাস সত্যই জয়ী হবে এটাই আমার রবের আশ্বাস ও হে আমর, আমি তোমার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম আজ এখানেই হবে তোমার জীবনাবসান।"

হযরত আলীর (রা) মতো অল্প বয়সি একজন তরুণকে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সামনে এগিয়ে আসতে দেখে বিশালাকৃতির আমর খুব বিস্মিত হলো। সে অট্টহাসি দিয়ে ফেটে পড়ল। তারপর সে হযরত আলীকে (রা) মায়া করতে শুরু করল। আর বলল, কি লজ্জা, তুমি তোমার এই বয়সে জীবন দিতে এগিয়ে এলে। বরং ভালো হয়, তুমি ফিরে যাও আর তোমার বাবা-চাচার বয়সি কাউকে পাঠিয়ে দাও।”
আলী (রা) তার খোঁচায় বিন্দুমাত্র ভয় পেলেন না। বরং দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “আমি তোমার সাথে যুদ্ধ করতে চাই। এবং আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, আমি তোমায় হত্যা করব।”
হযরত আলীর (রা) মতো একজন তরুণের এ ধরনের বেপরোয়া কথা শুনে আমর নিজের রাগকে আর ধরে রাখতে পারল না। সে তরবারি উঁচু করে ঘোড়া ছুটিয়ে তীব্র বেগে এগিয়ে গেল। আমর তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে হযরত আলীর (রা) উপর আঘাত হানলো কিন্তু হযরত আলী (রা) নিজের বর্ম দিয়ে সেই আঘাত প্রতিহত করলেন।

এরপর তারা দুজনই নিজেদের তলোয়ার বের করে মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে গেলেন। কঠিন এক যুদ্ধের পর অবশেষে হযরত আলী (রা) বিজয়ী হলেন। আমর মাটিতে পড়ে গেল এবং হযরত আলী (রা) তার বুকের উপর আসীন হলেন। যখনই হযরত আলী (রা) তার উপর চূড়ান্ত আঘাত হানতে যাবেন, তখনই আমর হযরত আলীর (রা) মুখে থুথু নিক্ষেপ করল। এমনিতেও আমরের কপালে মৃত্যু ছিল। তার উপর সে এভাবে হযরত আলীর (রা) মুখে থুথু মারায় আশপাশের সবাই নিশ্চিত হয়ে গেল যে এবার আর আমরের কোনো নিস্তার নেই। কিন্তু আশ্চর্য! লোকটিকে হত্যা না করে বরং হযরত আলী (রা) উঠে দাঁড়ালেন এবং কিছু না বলে হেঁটে একটু দূরে সরে গেলেন। যারা পাশ থেকে দাঁড়িয়ে ঘটনাবলি দেখছিল, তারা সবাই হযরত আলীর (রা) এই আচরণে খুবই অবাক হলো। তারা বুঝতে পারল না, কেন ইসলামের এমন একটি সাক্ষাৎ শত্রুকে হত্যা করার সহজ সুযোগ পেয়েও হযরত আলী (রা) তাকে এভাবে ছেড়ে দিলেন।

যাহোক, সুযোগ পেয়েই আমর আবার উঠে দাঁড়ালো এবং দ্বিগুণ বেগে হযরত আলীর (রা) উপর আক্রমণ চালালো। কিছুক্ষণ পর আবারও হযরত আলী (রা) তাকে পরাজিত করলেন এবং এবার তিনি এই কাফের সদস্যকে হত্যা করলেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর লোকজন হযরত আলীকে (রা) প্রশ্ন করল, প্রথমবার বাগে পেয়েও কেন তিনি আমরকে হত্যা করেননি।
হযরত আলী (রা) উত্তর দিলেন, “আমি তাকে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই হত্যা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে আমাকে থুথু মারায় তার প্রতি আমার ভীষণ রাগ হলো। তখন যদি আমি তাকে হত্যা করতাম তাহলে তা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য হত্যা করা হতো না। বরং আমার রাগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও সেই হত্যাটি গণ্য হতো। তাই আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। এরপর যখন আমি আমার রাগটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলাম, তখন আমি তাকে হত্যা করলাম। কেননা তখন আমি শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই কাজটি করতে পেরেছি।”

এই ছিল আমাদের পূর্বসুরী মুসলিম দায়িত্বশীলদের মানসিকতা। তারা নিয়তকে অনেক বেশি গুরুত্ব প্রদান করতেন। আমাদেরও উচিত তাদের অনুসরণ করা। যখনই আমরা কোনো কাজ করব, তা যেন হয় শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই। এর পেছনে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য যেন না থাকে। নিজেদের কাজকে বাজে ও দূষিত নিয়ত থেকে মুক্ত রাখা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। আমরা যদি নিজেদের জীবনের গতিপথ নিয়ে নিরন্তর চিন্তা করি, জীবনের লক্ষ্যের বিষয়ে সচেতন হই, তাহলে অবশ্যই আমরা নিয়তকে পরিশুদ্ধ রাখতে পারব। আমাদের সবসময় ভাবতে হবে কিভাবে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারব? আল্লাহ আমাদের কাছে কি চান আর কিভাবে আমরা তা করতে পারব- এমনটাই আমাদের সবসময় চিন্তা করা প্রয়োজন।

যে আল্লাহকে এবং তাঁর রাসূলকে (সা) ভালোবাসে
খাইবার অঞ্চলটির অবস্থান মদিনা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে। মদিনার ইহুদি গোত্রগুলো খাইবার অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণ করত। কুরাইশরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যতগুলো যুদ্ধ পরিচালনা করেছে, প্রতিবারই তাদেরকে খাইবার অঞ্চল পার হয়ে আসতে হতো। আহযাবের যুদ্ধের সময় যখন মক্কার কুরাইশসহ সকল গোত্র এবং গোটা আরবের ইসলামবিরোধী সমস্ত শক্তি এক হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এগিয়ে আসলো এবং আমর ও হযরত আলীর (রা) মধ্যে ঐতিহাসিক মল্লযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হলো। আহযাবের যুদ্ধে সম্মিলিত বাহিনী গড়ার ব্যাপারে এই খাইবার অঞ্চলের ইহুদিরা মদিনার আশপাশের অন্যান্য গোত্রকেও প্ররোচিত করেছিল যাতে তারা সকলে মিলে মদিনার উপর আক্রমণ পরিচালনা করতে পারে। মুসলমানরা সবসময় জানতো খাইবারকে সম্পূর্ণভাবে পরাভূত করতে না পারলে মদিনার মুসলমানরা কখনোই সার্বিকভাবে নিরাপদ হতে পারবে না।

ষষ্ঠ হিজরিতে রাসূল (সা) মক্কাবাসীর সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। এর পরপরই তিনি খাইবার জয় করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। খাইবার অঞ্চলে অনেকগুলো দুর্গ ছিল। রাসূলের (সা) নেতৃত্বে মুসলমানরা একের পর এক দুর্গ জয় করছিল। প্রথম যে দুর্গটি মুসলমানরা জয় করে তার নাম ছিল নাঈম। তারপরে আল কামুস দুর্গের পতন ঘটে। এরপরে যে দুর্গটি জয় করার চেষ্টা করা হয় তার নাম আল সাব। সবশেষে যে দুটি দুর্গ জয় করা বাকি ছিল তার একটির নাম আল ওয়াতিহ আর অপরটির নাম আল সুলালিম। এই দুর্গগুলো অবরোধ করে জয় করতে বেশ সময় লাগছিল। কারণ প্রতিটি দুর্গই ছিল মজবুত এবং এগুলোর সামরিক মজুদও ছিল অনেক বেশি। এর মধ্যে একটি দুর্গ অনেক দিন অবরোধ করে রাখার পরও তা জয় করা যাচ্ছিল না। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছিল, এই দুর্গটি জয় করা রীতিমতো অসম্ভব। যতবারই দুর্গে আক্রমণ করা হচ্ছিল ততোবারই মুসলমানরা ইহুদিদের পক্ষ থেকে পাল্টা আক্রমণ মোকাবেলা করছিল। কোনোভাবেই মুসলমানরা দুর্গটি জয় করতে পারছিল না।

অবশেষে রাসূল (সা) সকল সাহাবিকে ডেকে পাঠালেন এবং ঘোষণা দিলেন, “আগামীকাল আমি ইসলামের পতাকা আমার এমন একজন সঙ্গীর হাতে দেব যে আল্লাহকে এবং তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালোবাসেন। তার হাত দিয়েই আমাদের কাঙ্খিত দুর্গটি জয় করা সম্ভব হবে।”
এই ঘোষণার পর গোটা দিন জুড়েই প্রত্যেক সাহাবি প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন আল্লাহর রাসূল (সা) কার হাতে ইসলামের ঝান্ডা তুলে দেন। প্রত্যেকেই আশা করেছিলেন হয়তো তাকেই রাসূল (সা) এই গুরুদায়িত্ব প্রদানের জন্য বাছাই করবেন। সকাল হলো। রাসূল (সা) হযরত আলীকে (রা) ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, “এই পতাকাটি নাও এবং সম্মুখপানে এগিয়ে যাও যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তোমাকে বিজয় দান না করেন ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি তোমার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে।"

রাসূল (সা) যখন হযরত আলীকে (রা) দুর্গ জয়ের দায়িত্ব দিলেন তখন তার চোখে এক ধরনের সংক্রামক ব্যাধি হয়েছিল। দায়িত্বটি পেয়ে হযরত আলী (রা) রীতিমতো বিস্মিত হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, যেখানে তিনি ভালোমতো দেখতেই পাচ্ছেন না সেখানে তিনি কিভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই মিশনটি সফলতার সাথে শেষ করবেন। যা হোক রাসূল (সা) নিজেই হযরত আলীর (রা) মাথায় পাগড়ী বেঁধে দিলেন এবং নিজ মুখের লালা থেকে হযরত আলীর (রা) চোখে মলমের মতো লাগিয়ে দিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, তারপরই হযরত আলীর (রা) চোখ ভালো হয়ে গেল এবং তিনি পরিষ্কারভাবে দেখতে পারছিলেন।

হযরত আলী (রা) এই পর্যায়ে রাসূলকে (সা) প্রশ্ন করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমি কি ইসলাম গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাদের সাথে লড়াই অব্যাহত রাখবো?"
নবিজি (সা) উত্তর দিলেন, "তুমি যখন দুর্গের কাছে পৌঁছাবে তখন সবার আগে তাদের কাছে একজন বার্তাবাহক পাঠাবে। তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করার আহ্বান জানাবে এবং তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেবে তারা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না। যদি আল্লাহর নামে তাদের মধ্যে একজন ব্যক্তিও সঠিক পথে চলে আসে তাহলে তার বিনিময়ে তুমি অনেক বেশি সওয়াব পাবে।”
রাসূলের (সা) নির্দেশনা মোতাবেক ছোট্ট একটি দল নিয়ে হযরত আলী (রা) দুর্গ অভিমুখে অভিযান শুরু করলেন। দুর্গের কাছে পৌঁছে তিনি পাথরের একটি স্তূপের উপর ইসলামী শক্তির নিদর্শন স্বরূপ পতাকা লাগালেন। ঠিক তখন দুর্গের উপর থেকে একজন ইহুদি চিৎকার করে তাকে প্রশ্ন করল, "তুমি কে?"
হযরত আলী (রা) উত্তর দিলেন, “আমি আলী, আবু তালিবের সন্তান, নবি মুহাম্মাদের (সা) চাচাতো ভাই।”
পরিচয় শোনা মাত্রই দুর্গের ভেতরে থাকা সকল সৈন্য একসাথে হযরত আলীর (রা) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বেরিয়ে এলো। এর মধ্যে একজন সৈন্য দ্রুত গতিতে এসে হযরত আলীকে (রা) তরবারি দিয়ে এতো জোরে আঘাত করল যে, হযরত আলীর (রা) হাত থেকে তার বর্মটি মাটিতে পড়ে গেল। তখন আল্লাহর রহমতে হযরত আলীর (রা) উপর এমন কুদরতি শক্তি ভর করল যে তিনি দুর্গের একটি দরজাকে খুলে সেটাকে উঁচু করতে সক্ষম হলেন এবং সেই দরজাকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করলেন। এতো বিশাল দরজাকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করায় তিনি সাহাসিকতার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ করে যেতে পারলেন এবং এক পর্যায়ে আল্লাহ তাকে কাঙ্খিত বিজয় দান করলেন।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হযরত আলী ক্লান্ত হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লেন। এই সমরযাত্রায় আবু রাফি (রা) নামক একজন সাহাবি হযরত আলীর (রা) সঙ্গে ছিলেন। তিনি সাক্ষ্য দেন যে, এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী কোনো এক সময়ে তিনি তার সাতজন সঙ্গীসহ উক্ত দুর্গের দরজাটি উঠানোর অনেক চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু তারা দরজাটিকে উঁচু করা তো দূরের কথা, সামান্য নড়াতেও পারেননি। কিন্তু হযরত আলী (রা) সেদিন এসে যুদ্ধের সময় একাই সে দরজাটি শুধু নাড়াতে নয় বরং মাথার উপর তুলতে এবং দরজাটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে লড়াই করতেও সক্ষম হয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালার উপর হযরত আলীর (রা) আস্থা অনেক বেশি ছিল। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও সে কারণে তাকে এমন কুদরতি শক্তি দান করেছিলেন যা দিয়ে তিনি সেই অসাধ্য কাজটি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px