📄 আবু হুরায়রা (রাঃ) আর জনৈক বন্দীর গল্প
রাসূল (সা:) এর প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা (রা) নিজেই এই গল্পটা এভাবে বর্ণনা করেন:
“একবার রাসূল (সা) আমাকে যাকাতের মজুদ পাহারা দেয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। একদিন নীরবে একজন ব্যক্তি এসে চুপিসারে যাকাতের মজুদ থেকে কিছু খাদ্যদ্রব্য চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি লোকটিকে ধরে ফেলি। আমি এই ঘটনায় খুব মন খারাপও করেছিলাম। কে সেই মানুষ যে কি না যাকাতের তহবিল থেকেও চুরি করে। যাকাতের সবকিছু তো অভাবী আর মজলুমদের জন্যই। সেখান থেকে আবার চুরি কেন করতে হবে?
আমি লোকটাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করতে চাইলাম। তাকে বললাম, “তুমি যাকাতের মজুদ থেকে চুরি করেছ। তোমাকে আমি রাসূলের (সা) কাছে নিয়ে যাব। তিনি যা করার করবেন।”
সে কাচুমাচু হয়ে উত্তর দিল, “না, দয়া করে তেমনটা করবেন না। আমি খুব অভাবী একজন মানুষ। আমাকে অনেক বড় পরিবার টানতে হয়। তাই বাধ্য হয়েই আমি চুরি করতে এসেছি। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন।”
আমি লোকটাকে নিয়ে কিছুটা সময় ভাবলাম। আমার কেমন যেন মায়া হলো। আমি তাকে ছেড়ে দিলাম।
পরের দিন সকালে নবিজির (সা) সাথে যখন আমার দেখা হলো, তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, “হে আবু হুরায়রা, তোমার বন্দি কাল রাতে শেষ পর্যন্ত কি করল?"
আমি তো অবাক হয়ে গেলাম। রাসূল (সা) কিভাবে ঘটনাটা জানলেন? তাকে তো আমি কিছু জানাইনি। তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা কোনো বার্তা দিয়েছেন। যাহোক, এসব ভাবতে ভাবতেই আমি তাকে সব জানালাম। বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, চোরটি আমাকে বলল, তার অনেক বড় পরিবার, অভাবের কারণে সে বাধ্য হয়ে চুরি করেছে। তাই আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছিলাম।"
রাসূল (সা) বললেন, "আবু হুরায়রা, ও তোমাকে মিথ্যা বলেছে। ও আবার চুরি করতে আসবে।”
আমি সাথে সাথেই বুঝলাম সেই চোরের সাথে আমার আবার দেখা হবে। কেননা রাসূল (সা) কখনো ভুল বা মিথ্যা কিছু বলেন না। তাই পরের দিন রাতে আমি আরো বেশি সতর্ক হয়ে সেই চোরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমি এবার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আরেকবার দেখতে পেলে লোকটাকে আমি আটক করবই। সে অভাবীদের জন্য বরাদ্দ খাবার থেকে বারবার চুরি করবে- এটা মেনে নেয়া যায় না।
যথারীতি সে এলো এবং আমি আবারও তাকে হাতেনাতে ধরে ফেললাম। আমি বললাম, "আজ তো আমি তোমাকে অবশ্যই রাসূলের (সা) কাছে নিয়ে যাব। সে ভয়ে কেঁদে ফেলল আর বলল, "আমাকে ছেড়ে দিন, দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আমি খুব হতদরিদ্র একজন মানুষ। আমার পরিবারও বড়। বাধ্য হয়ে আমাকে চুরি করতে হয়। আমি কথা দিচ্ছি, আমাকে ছেড়ে দিলে আমি আর চুরি করব না।"
তার চোখে এতো পানি ছিল যে আমার আবার কেমন যেন মায়া হলো লোকটার উপর। আমি আবারও তাকে ছেড়ে দিলাম।
ভোর বেলায় নবিজির (সা) সাথে আবার আমার দেখা হলো। তিনি প্রশ্ন করলেন, “হে আবু হুরায়রা, তোমার বন্দি কাল রাতে কি করেছে?”
আমি উত্তর দিলাম, “হে রাসূলুল্লাহ (সা), সে আবারও তার অভাব-অনটন এবং পরিবারের বোঝার ইস্যুটিকে সামনে এনেছে। আমার তার প্রতি খুব মায়া হয়েছিল তাই আবারও তাকে ছেড়ে দিয়েছি।” রাসূল (সা) বললেন, “সে আবারও তোমাকে মিথ্যা বলেছে। ও আবারও আসবে।”
রাসূল (সা) এ কথা বলায় তৃতীয় দিন আমি সর্বোচ্চ সতর্ক হয়ে চোরটির জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। এবার আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আবার আসলে তাকে আমি গ্রেফতার করবই। কারণ সে বার বার আমাকে মিথ্যা বলছে। যা হোক, তৃতীয় বারের মতো সে এলো এবং গোপনে খাবার চুরি করতে শুরু করল। আমি এবারও তাকে ধরে ফেললাম আর বললাম, “এবার তোমাকে রাসূলের (সা) কাছে নিতেই হবে। এটাই তোমার শেষ সুযোগ। তুমি ওয়াদা দিয়েছিলে যে আর আসবে না কিন্তু আবার এসেছো। এবার তুমি যা-ই বল, আমি আর তোমাকে ছাড়বো না।” সেই চোরটি উত্তর দিল, “দয়া করে আমাকে যেতে দিন। আমাকে ছেড়ে দিন। আমাকে যদি আপনি এবার ছেড়ে দেন, তাহলে আমি আপনাকে এমন একটা দোয়ার কথা বলব, যা পাঠ করলে আল্লাহ আপনাকে অনেক সওয়াব দেবেন।"
চোরটির এই কথা শুনে আমি বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। আগা গোড়াই নতুন কিছু জানার বিষয়ে আমার আগ্রহ আছে। তাই আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সেই দোয়াটি কি?
সে উত্তর দিল, "আপনি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আয়াতুল কুরসী পাঠ করবেন (পবিত্র কুরআনের সূরা আল বাকারার ২৫৫ নং আয়াত)। যে বান্দা ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসী পাঠ করে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য একজন পাহারাদার নিযুক্ত করেন ফলে শয়তান সকাল অবধি আর সেই বান্দার কাছে আসতে পারে না।”
এটা শুনে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। পরের দিন সকালে রাসূল (সা) আবার আমাকে প্রশ্ন করলেন, “হে আবু হুরায়রা, তোমার বন্দি কাল রাতে তোমার সাথে কি করেছে?”
আমি নবিজিকে (সা) রাতের পুরো ঘটনাটা বর্ণনা করলাম। আমি জানালাম, চোরটি আমাকে নতুন একটি দোয়া শেখানোর কথা বলায় আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি।
রাসূল (সা) আবার প্রশ্ন করলেন, “সে তোমাকে কি বলেছে?” আমি উত্তর দিলাম, লোকটি আমাকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আয়াতুল কুরসী পাঠ করার জন্য বলেছে। এই আয়াতটি পাঠ করলে আল্লাহ নিজে একজন পাহারাদার নিয়োগ দিয়ে গোটা রাতটি জুড়ে আমাকে হেফাজত করবেন। সকাল পর্যন্ত শয়তান আমার কাছে ভিড়তে পারবে না।
রাসূল (সা) বললেন, “এবার সে তোমাকে সত্য কথা বলেছে। শোন আবু হুরায়রা, যদিও সে বরাবরই মিথ্যাবাদী, তবে এবার এই কথাটি সে সত্য বলেছে।”
রাসূল (সা) আরো বললেন, “হে আবু হুরায়রা, তুমি কি জানো, গত তিন রাত কার সাথে তোমার দেখা হয়েছে?” আমি বললাম, “না, আমি জানি না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সা) ভালো জানেন।”
রাসূল (সা) বললেন, “সে ছিল ইবলিশ শয়তান।”
(তথ্যসূত্র: এই বর্ণনাটি সহীহ আল বুখারীতে পাওয়া যায়। এখানে পাঠকের বোঝার সুবিধার জন্য গোটা ঘটনাটিকে গল্পের আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে।)
📄 একমাত্র আল্লাহর জন্য
হযরত মুসার (আ) সময়ে একজন ধার্মিক মানুষ ছিলেন। তিনি সারা দিন-রাত ইবাদত করতেন। একদিন স্থানীয় কিছু মানুষ এসে তাকে জানাল, পাশের বাগানের একটি গাছকে লোকজন পূজা করতে শুরু করেছে। একথা শুনে ধার্মিক মানুষটি খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। সাথে সাথেই তিনি একটি কুড়াল নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। তার ইচ্ছা কুড়াল দিয়ে গাছটি কেটে ফেলবেন।
ঠিক সেই সময় বয়স্ক এক ব্যক্তির চেহারা নিয়ে ইবলিশ শয়তান ধার্মিক মানুষটির সামনে এলো। শয়তান তাকে বলল, “আপনি কি করতে চান?”
ধার্মিক লোকটি বৃদ্ধলোকরূপী শয়তানকে সম্পূর্ণ পরিস্থিতি জানালেন এবং বললেন, "আমি ঐ গাছটা কেটে ফেলতে চাই।”
এ কথা শুনে শয়তান বলল, "আপনি কেন শুধু শুধু গাছটা কাটবেন? আল্লাহ তো আপনাকে এই দায়িত্ব দেননি। আল্লাহ যদি গাছটা কাটাতেই চাইতেন, তাহলে তো তিনি একজন নবিকে এই দায়িত্ব দিয়ে পাঠাতেন।"
ধার্মিক লোকটা শয়তানকে চিনে ফেললেন। তিনি শয়তানের কথায় কোনোভাবেই থামতে চাননি। তারা দুজন আরো কিছুক্ষণ ঝগড়া করল। একপর্যায়ে তাদের মাঝে রীতিমতো হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল। ধার্মিক মানুষটি শয়তানকে মাটির উপর ফেলে দিতে সক্ষম হলেন। এবার তিনি হাতের কুড়াল দিয়ে শয়তানকে আঘাত করতে উদ্যত হলেন। কিন্তু তখনই শয়তান ধার্মিক মানুষটির কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইল আর বলল, "আপনি আমাকে ছেড়ে দিন। তাহলে আমি আপনাকে এমন একটি বুদ্ধি দিব যা দুনিয়া ও আখেরাত- উভয় জায়গাতেই আপনার কল্যাণ বয়ে আনবে। আমি আপনাকে প্রতিদিন দুই দিনার করে দিব। আপনি সেখান থেকে এক দিনার গরিবদের মধ্যে বিতরণ করে দিতে পারেন আর বাকি এক দিনার নিজের প্রয়োজন মতো খরচ করবেন। আপাতত এই গাছটি না কেটে আমরা বরং আল্লাহর ফায়সালার জন্য অপেক্ষা করি।"
শয়তানের এই প্রস্তাবে ধার্মিক লোকটি বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। তিনি পরামর্শটাকে ভালোই মনে করলেন এবং নীরবে বাড়ি ফিরে গেলেন। দ্বিতীয় দিন ঘুম থেকে উঠে তিনি তার বালিশের নিচে দুই দিনার পেলেন। এই অর্থ পেয়ে তিনি খুব খুশি হলেন এবং ভাবলেন আগের দিনের প্রস্তাব সঠিক ছিল। তার সাথে কেউ প্রতারণা করেনি। তিনি প্রতিশ্রুতি মোতাবেক দুই দিনার পেয়ে গেছেন। তিনি এক দিনার গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিলেন আর এক দিনার নিজের কাছে রাখলেন। কিন্তু পরের দিন তিনি ঘুম থেকে উঠে বালিশের নিচে আর ঐ দুই দিনার পেলেন না। তাই তিনি আবারও গাছটি কাটার জন্য কুড়াল নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
আবারও বৃদ্ধ মানুষরূপী শয়তানের সাথে তার দেখা হলো। শয়তান তাকে প্রশ্ন করল, "আপনি কি করতে যাচ্ছেন?” ধার্মিক মানুষটি উত্তর দিলেন, "আজ আমি গাছ কাটবই।” শয়তান আগের বারের মতো এবারও তাকে বলল, "আল্লাহ আপনাকে এই গাছটি কাটার দায়িত্ব দেননি। আপনি বরং বাসাতে চলে যান।" ধার্মিক লোকটি একমত হলো না। তিনি আবারও শয়তানের সাথে মারামারিতে লিপ্ত হলেন। কিন্তু এবার শয়তান তাকে পরাস্ত করে ফেলল।
শয়তানের কাছে এভাবে হেরে যাওয়ায় ধার্মিক লোকটি বেশ অবাক হলেন। তিনি শয়তানকেই প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা ঐদিন আমি তোমাকে হারাতে পারলাম, আজ কেন পারলাম না?” শয়তান উত্তরে বলল, “কেউ যদি নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো ভালো কাজ করে তাহলে তাকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারে না। কিন্তু যদি কেউ দুনিয়াবি কোনো স্বার্থে বা পার্থিব কোনো ফায়দা হাসিলের জন্য কোনো ভালো কাজ করে তাহলে তার শক্তি কমে যায় এবং সে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।”
কেন এই ধার্মিক মানুষটি প্রথম দিন শয়তানের সাথে লড়াইয়ে বিজয়ী হলো কিন্তু দ্বিতীয় দিন এভাবে হেরে গেল? এর কারণ হলো প্রথম দিন এই ধার্মিক লোকটির উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য গাছটি কেটে ফেলা, আর কিছু নয়। কিন্তু দ্বিতীয় দিন তার নিয়ত পাল্টে যায়। সেদিন তিনি বের হয়েছিলেন বাড়তি কিছু দিনার পাওয়ার লোভে। তাই নিজের ভেতর তিনি প্রথম দিন যে আধ্যাত্মিক শক্তিটুকু অনুভব করেছিলেন, দ্বিতীয় দিন গিয়ে তিনি আর তা পাননি।
নিয়তের শুদ্ধতা এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কাজ করা খুব জরুরি। যদিও আমাদের মধ্যে অনেকেই এখন এতোটা আন্তরিকতা ও সততার সাথে কাজ করতে পারেনা। প্রদর্শন করার ইচ্ছা এবং দুনিয়াবি সুযোগ সুবিধাই আমাদের অনেকের মূল উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে। তবে এখনো যদি খুলুসিয়াতের সাথে, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় তাঁর নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করা যায় তাহলে বরকত যেমন পাওয়া যাবে, তেমনি সফলতাও অনেকখানি নিশ্চিত হয়ে যাবে।
📄 আফ্রিকা জয়ী জাফর আত তাইয়্যার (রাঃ)
রাসূল (সা) যখন মক্কায় ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন, তখন মক্কার তৎকালীন নেতারা তার বিরুদ্ধে ভীষণভাবে উঠে পড়ে লাগলো। তারা তাঁর সম্পর্কে নানা ধরনের আজেবাজে প্রচারণা চালাল। তারা বলে বেড়ালো, "মুহাম্মাদ একজন পাগল, সে একজন ভালো জাদুকর। জাদুটোনা দিয়েই সে মানুষকে ইসলামের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।”
পাশাপাশি মক্কার নেতারা নবি মুহাম্মাদ (সা) কে ঘুষ বা লোভনীয় নানা সুযোগ সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে ইসলামের দাওয়াতি কাজ থেকে বিরত রাখারও চেষ্টা করল।
কিন্তু কোনো কিছু করেই যখন তাকে থামানো গেল না, তখন নিজেদের এতো দিনের তৈরি করা সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো না ভেঙ্গে পড়ে- এই আশঙ্কায় মক্কার জালেম কর্তৃপক্ষ নবিজির (সা) উপর নানাভাবে অত্যাচার, নির্যাতন শুরু করল। বিশেষ করে যারা সে সময় রাসূলের (সা) আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করত, তাদের উপর জুলুমের মাত্রা ছিল অবর্ণনীয়।
কঠিন এই সময়গুলোতে রাসূল (সা) তাঁর শ্রদ্ধেয় চাচা আবু তালিবের কাছ থেকে যথেষ্ট নিরাপত্তা, আশ্রয় ও সমর্থন পেয়েছিলেন। আবু তালিব সবসময় চেষ্টা করতেন তার ভাতিজার পাশে দাঁড়ানোর জন্য। সব ধরনের বিপদ ও আশঙ্কা থেকে তিনি নবি মুহাম্মাদ (সা) কে রক্ষা করার চেষ্টা করতেন। আবু তালিবের সব সন্তানই একে একে ইসলাম গ্রহণ করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আগে ইসলাম গ্রহণ করেন হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা)। এরপর আবু তালিবের বড় ছেলে জাফর ইবনে আবু তালিব (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। এর কিছুদিন পর আরেক ছেলে আকিল ইবনে আবু তালিবও (রা) ইসলামকে জীবন বিধান হিসেবে কবুল করে নেন।
কাফেরদের অত্যাচার খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে সীমা ছাড়িয়ে গেল। পরিস্থিতি এতোটাই দূর্বিষহ হয়ে উঠল যে, মক্কায় বসবাস করাই যেন অসম্ভব হয়ে পড়ল। তখন বাস্তবতার প্রয়োজনে রাসূল (সা) এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি কিছু সংখ্যক সাহাবিকে লোহিত সাগরের অপর পারের দেশ আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়ায়) হিজরত করার নির্দেশ দিলেন। তার এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কিছু সাহাবির জীবন যেমন রক্ষা পেল ঠিক তেমনি ভিন্ন আরেকটি দেশে ইসলামের সুমহান বার্তা পৌঁছে যাওয়ার একটি সুযোগও তৈরি হলো।
এই কঠিন কাজটি সম্পাদন করার জন্য হযরত মুহাম্মাদ (সা) ভরসা রাখলেন তার চাচাতো ভাই এবং আবু তালিবের সন্তান হযরত জাফর বিন আবু তালিবের (রা) উপর। হযরত জাফর (রা) রাসূলের (সা) হুকুমের আনুগত্য করলেন শতভাগ নিষ্ঠার সাথে। তিনি বেশ কিছু সংখ্যক পুরুষ ও নারী সাহাবিকে নিয়ে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে আবিসিনিয়ায় পৌঁছলেন। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরতের ঘটনা এটাই। রাসূলের (সা) নবুওয়াত প্রাপ্তির ৫ বছরের মাথায় আবিসিনিয়ায় হিজরতের ঘটনা ঘটে। সাহাবিদের এই দলে ৮২ জন পুরুষ ও ৮০ জন নারী সাহাবি শামিল ছিলেন।
আবিসিনিয়ায় পৌঁছে হযরত জাফর (রা) ও তার সঙ্গীরা আবিসিনিয়ার রাজা নাজ্জাশীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। নাজ্জাশী হযরত জাফরের (রা) জ্ঞান, আচার-আচরণ, ব্যবহার ও বিনয়ে ভীষণভাবে বিমোহিত হন। ফলশ্রুতিতে হযরত জাফর (রা) এবং তার নেতৃত্বে থাকা মুহাজির সাহাবিদের আবিসিনিয়ায় সম্মানের সাথেই বরণ করে নেয়।
কিন্তু কাফেররা তো মুসলমানদের এতো সহজে ছেড়ে দিতে পারে না। মুসলমানরা আবিসিনয়ায় ভালো সম্বর্ধনা পেয়েছে এই সংবাদটি পেয়ে তারাও মুসলমানদের পিছু পিছু আবিসিনিয়ায় চলে গেল। কুরাইশদের প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ বিন রাবিহ এবং আমর বিন আসের নেতৃত্বে বেশ কিছু কুরাইশ সদস্য দামি দামি সব উপহার নিয়ে নাজ্জাশীর দরবারে গিয়ে হাজির হলো। দরবারে প্রবেশ করেই কুরাইশরা নাজ্জাশীর সামনে সিজদায় অবনত হলো এবং রাজার জন্য নিয়ে আসা সব উপহার তার সামনে উপস্থাপন করল।
কুরাইশরা বলল, "আমাদের দেশে হঠাৎ করেই একজন মানুষ নতুন একটি ধর্মের প্রচার শুরু করেছে। তার ডাকে কিছু মানুষ সাড়াও দিয়েছে। আমরা তাদেরকে বিরত রাখার এবং প্রতিহত করার সব চেষ্টাই করেছি। এরই মধ্যে, নতুন ধর্মগ্রহণকারীদের কয়েকজন আবার এসে আপনার দেশে আশ্রয় নিয়েছে। আমরা আপনাকে অনুরোধ করছি, আপনি তাদের বের করে দিন নতুবা আমাদের হাতে তাদেরকে ছেড়ে দিন।"
রাজা নাজ্জাশী উত্তরে বললেন, “আমি ইতোমধ্যে তাদের নিরাপত্তা ও আশ্রয় দিয়েছি। তাই এখনি তাদেরকে বের করে দেয়া সম্ভব নয়।” এরপর তিনি তার দরবারে আগত মুসলমান সাহাবিদের ডেকে পাঠালেন।
হযরত জাফর (রা) বেশ কয়েকজন সাহাবি নিয়ে রাজা নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হলেন। তিনি একবারের জন্যও নাজ্জাশীর সামনে সিজদা দিলেন না। দরবারে উপস্থিত অন্য সবাই তখন হযরত জাফর (রা) ও অন্যান্য মুসলমানদেরকে ভর্ৎসনা করল। তারা জানালেন রাজাকে সিজদা না করে তাঁরা অন্যায় করেছেন। কিন্তু হযরত জাফর (রা) তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে সাহাসিকতার সাথে বললেন, “আমরা মুসলমান, আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারও সামনে মাথা নত করি না। আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সিজদা করি না।”
রাজা নাজ্জাশী ছিলেন একজন ধার্মিক খ্রিষ্টান। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে, ঐশ্বরিক কোনো ধর্মেই মানুষকে সিজদা দেয়ার বিধান নেই। তিনি অন্যদের মতো রেগে না গিয়ে বরং হযরত জাফরকে (রা) তার পাশের আসনে বসতে বললেন। তিনি কুরাইশদের দেখিয়ে হযরত জাফরকে (রা) উদ্দেশ্য করে বললেন, “এই মানুষগুলো আপনাদের নিজেদের দেশ থেকেই এসেছে। তারা আপনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে যে, আপনারা নাকি বাপ-দাদার পুরনো ধর্ম ছেড়ে, সব ধরনের মূর্তিপূজা ছেড়ে দিয়ে নতুন এক স্রষ্টার ইবাদত শুরু করেছেন?"
হযরত জাফর বিন আবু তালিব (রা) খুব বলিষ্ঠভাবে উত্তর দিতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, “হে বাদশাহ নাজ্জাশী, আমরা এতোদিন গভীর অন্ধকার আর অজ্ঞতার চোরাবালিতে ডুবে ছিলাম। আমরা মূর্তিপূজা করতাম, বেহায়াপনা ছিল আমাদের নিত্যসঙ্গী। আমরা মৃত প্রাণীর গোশত খেতাম। আমরা আমাদের প্রতিবেশির হক নষ্ট করতাম। ঠিক এমনই এক সময়ে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের মাঝে একজন মানুষকে পাঠালেন যিনি বিশুদ্ধ, সৎ এবং বিশ্বস্ত চরিত্রের অধিকারী। তিনি আমাদের এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানালেন। বললেন, আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করা যাবে না। তিনি আমাদের মূর্তিপূজা করতে নিষেধ করলেন। সবসময় সত্য কথা বলার আদেশ দিলেন, অন্য সবার আমানত ও বিশ্বাস হেফাজত করার শিক্ষা দিলেন। তিনি আমাদেরকে প্রতিবেশি ও আত্মীয়দের প্রতি দরদী হওয়ার আহ্বান জানালেন। তিনি নারীদের নিয়ে কটু ও অশ্লীল কথা বলা নিষিদ্ধ করলেন। সব ধরনের পাপ থেকে দূরে থাকার অনুরোধ করলেন, নিয়মিত ইবাদত করার তাগিদ দিলেন। দান-সাদকা বাড়ানোর পরামর্শ দিলেন এবং রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।”
এসব কথা শোনোর পর রাজা নাজ্জাশী হযরত জাফরকে (রা) পবিত্র কুরআন থেকে কিছু অংশ তেলাওয়াত করতে বললেন। জাফর (রা) বিসমিল্লাহ বলে সূরা মারিয়ামের বেশ কয়েকটি আয়াত পড়ে শোনালেন। তার সুমিষ্ট কণ্ঠের তেলাওয়াত নাজ্জাশীর কর্ণকুহরে প্রবেশ করা মাত্রই তিনি মোহিত হয়ে গেলেন। তার দুচোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি ঝরতে লাগল। সূরা মারিয়ামের ঐ আয়াতগুলোতে যখন হযরত ঈসাকে (আ) নিয়ে কিছু কথা বলা হলো, তখন খ্রিষ্টান ধর্মে বিশ্বাসী নাজ্জাশী বুঝতে পারলেন যে, হযরত জাফর (রা) যে ধর্মের কথা বলছেন তা ই আসলে সত্য ধর্ম। কারণ কুরআনে যা বলা হয়েছে, তার সাথে পূর্বে নাজিল হওয়া আসমানি কিতাব তাওরাত ও ইনজিলের (বাইবেল) ব্যাপক মিল রয়েছে। নাজ্জাশী একজন ধার্মিক খ্রিষ্টান হওয়ায় আগে থেকেই বিষয়গুলো জানতেন। তিনি সঠিক বিষয়টি যথার্থই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।
তিনি কুরাইশদের আবেদন খারিজ করে দেন এবং আমর বিন আসকে বলেন যাতে তারা তাদের উপহারগুলো ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আমর বিন আস দরবার ত্যাগ করলেন ঠিকই তবে তার মনে তখনো দুষ্টু বুদ্ধি খেলা করছিল। তিনি খুব ভালোভাবে জানতেন যে, খ্রিষ্টানরা হযরত ঈসাকে (যিশু) আল্লাহর ছেলে মনে করলেও মুসলমানরা তা করে না। তাই এই বিষয়টি যদি নাজ্জাশীর সামনে প্রমাণ করা যায় তাহলে হয়তো তিনি মুসলমানদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তাদেরকে দেশ থেকে বের করে দিবেন।
সেই ভাবনা থেকেই আমর বিন আস পরের দিন আবার নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হলেন। তিনি নাজ্জাশীকে অনুরোধ করলেন, যাতে তিনি মুসলমানদের প্রশ্ন করেন তারা হযরত ঈসাকে (আ) কিভাবে বিবেচনা করে।
নাজ্জাশী আবারও মুসলমানদের ডেকে পাঠালেন। হযরত জাফরের (রা) নেতৃত্বে মুসলমানরা এসে পৌঁছলে তাদেরকে আবারও দরবারে রাজকীয় সম্বর্ধনা জানানো হয়। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে নাজ্জাশী এবার হযরত জাফরকে (রা) প্রশ্ন করলেন, "হযরত ঈসাকে (আ) নিয়ে আপনাদের নবি মুহাম্মাদ (সা) কি মন্তব্য করেছেন? তার ব্যাপারে আপনাদের মূল্যায়নই বা কী?"
সঙ্গে থাকা মুসলমানরা রাজার এই প্রশ্নে বেশ ঘাবড়ে গেলেন। তারা ভাবলেন জাফর (রা) যদি সন্তোষজনক উত্তর না দিতে পারেন তাহলে হয়তো নাজ্জাশী তাদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাদেরকে আবার কাফেরদের হাতে তুলে দেবে। কিন্তু হযরত জাফর (রা) ছিলেন খুবই ধৈর্য্যশীল ও ঠাণ্ডা মস্তিষ্কের মানুষ। তিনি নাজ্জাশীর সামনে পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ১৭১ নং আয়াত তেলাওয়াত করে শোনালেন। এই আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর বাণী যা তিনি প্রেরণ করেছেন মরিয়মের নিকট এবং তাঁরই কাছ থেকে আগত রূহ। অতএব, তোমরা আল্লাহকে এবং তার রাসূলগণকে মান্য কর।"
এ আয়াত পাঠ করায় নাজ্জাশী খুব খুশি হলেন। সন্তুষ্টচিত্তে তিনি বললেন, “আমাদের মূল যে ধর্মগ্রন্থ ইনজিল, তাতেও ঠিক এরকমই বলা আছে।” এরপর তিনি আমর বিন আস ও তার কুরাইশ সঙ্গীদের আবিসিনিয়া থেকে বহিষ্কার করেন। শুধু তাই নয়, তখন থেকেই ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি নাজ্জাশীর আস্থা ও ভালোবাসা বহুগুণে বেড়ে যায়।
এভাবেই হযরত জাফর বিন আবু তালিব (রা) ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকলেন। রাসূল (সা) মদিনায় হিজরতের পর তিনি মদিনায় চলে আসেন। তবে মদিনায় আসার পূর্বে দীর্ঘ ১৫ বছর তিনি গোটা আবিসিনিয়ায় ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দেন।
📄 প্রশান্ত আত্মার অধিকারী একজন মানুষ
আবু জার ছিলেন গিফার গোত্রের একজন সদস্য। তিনি প্রায়শই ওয়াদ্দান উপত্যকার উপর দাঁড়িয়ে মক্কা থেকে আসা বণিক দল ও মুসাফিরদের প্রতি নজর রাখতেন। এভাবে বণিক আর মুসাফিরদের যাওয়া-আসা দেখাটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে উত্তেজনাকর মুহূর্ত। গিফার গোত্রের বসবাস ছিল ওয়াদ্দান উপত্যকায়। সেখানে পানির সরবরাহ ব্যবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। উট বা ঘোড়া চরানোর মতো অবকাঠামোগত সুবিধাও তেমন একটা ছিল না। তারপরও মক্কার ভ্রমণকারী মরুযাত্রীদলকে তাদের মূল্যবান সব সম্পদসহ এই এলাকা দিয়েই পার হতে হতো।
আবু জার তার গোত্রের আরো কিছু যুবকদের নিয়ে মক্কাগামী এসব বণিকদলের যাওয়া-আসার সময় টাকা আদায় করতেন। অনেকটা আজকের সময়ের চাঁদাবাজির মতো। মক্কায় যাওয়া-আসার পথে প্রতিটি বণিকদলকেই এই ওয়াদ্দান উপত্যকার যুবকদের কিছু না কিছু অর্থ দিয়ে আসতে হতো। আর সেই অর্থ দিয়েই গোটা গিফার গোত্রের মানুষগুলো জীবনযাপন করত। যদি বণিকেরা সেই অর্থ স্বেচ্ছায় না প্রদান করত, তাহলে জোর করেই তা আদায় করা হতো। আর যেসব বণিকেরা গিফারদের চাহিদামতো অর্থ দিত, তাদেরকে আবু জার নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করতেন। আবু জার ও তার দলের অন্যান্য সদস্যরা সারারাত জেগে সেই বণিক দলকে পাহারা দিতেন। এই নিরাপত্তা সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় এমন হতো যে, এই সব বণিক ও মুসাফিরদের সাথে আবু জার ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করেই পার করে দিতেন। তাদের সাথে বসে একই খাবার খেতেন। পাশাপাশি, এসব বণিকেরা দূরবর্তী রোমান ও সাসানিদ সাম্রাজ্যের যেসব জায়গায় নিয়মিত গমন করতো, সেই এলাকাগুলোর সমাজ-সংস্কৃতি সম্বন্ধেও আবু জার নিয়মিতভাবে জানার চেষ্টা করতেন।
এরকমই এক যাত্রীদলকে আবু জার ও তার সঙ্গীরা ওয়াদ্দান উপত্যকায় নিরাপত্তা সেবা প্রদান করছিলেন। নানা বিষয়ে তাদের সাথে কথাও হচ্ছিল। আবু জার বরাবরের মতই তাদের কাছ থেকে রোমান বা সাসানিদ সাম্রাজ্যের তথ্য জানতে চাইছিলেন। কিন্তু বণিক দলের সাথে কথা বলে জানা গেল, রোমান বা সাসানিদে নয়, বরং বড় আকারের ঘটনা ঘটে গেছে মক্কায়। মক্কা ছিল তৎকালীন সময়ের সকল বণিকদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় তীর্থস্থান। আরবের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের কাছেও মক্কা ছিল ধর্মীয় আচারাদি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পাদনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। মক্কায় নতুন কিছু হয়েছে বা হচ্ছে- এই বিষয়টি নিয়ে সকলেরই আগ্রহ অনেক বেশি ছিল।
বণিকদলের কাছ থেকে মক্কা সম্পর্কে নতুন কিছু তথ্য জানার পর আবু জার নিজেও মক্কার সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে জানার জন্য অনেক বেশি কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। বণিক দলের লোকেরা বলাবলি করছিল, “মক্কার উপর শনির দৃষ্টি পড়েছে। এই শহরের সামনে কি হাল হয় কে জানে!! কোথা থেকে হঠাৎ করে একজন বিদ্রোহী যুবকের আবির্ভাব ঘটেছে যে কিনা কাবার সব মূর্তিকে ধ্বংস করতে চায়। সে বলছে, এসব মূর্তিপূজা করা যাবে না। ইবাদত করতে হবে এক আল্লাহর। তার এই নতুন ধর্মে অনেকেই দিক্ষিত হয়েছে। ফলে মক্কার অনেক পরিবারেই বাবা সন্তানের বিরুদ্ধে না হলে সন্তান বাবার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। গোটা শহরে অশান্তি ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।”
সেদিন এতোটুকু কথাবার্তা হওয়ার পরই ঐ বণিকদলটি ওয়াদ্দান উপত্যকা ছেড়ে চলে যায়। সন্ধ্যার পর আরেকটি বণিকদল এসে পৌঁছায়। তারা সবেমাত্র মক্কা ছেড়ে এসেছে। আবু জার তাদের কাছে মক্কার ঘটনাবলি সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা ফিসফিস করে তাকে জানায়, “নতুন যে মানুষটিকে নিয়ে এতো কথা হচ্ছে সে কোনো সাধারণ মানুষ নয়। সে মক্কার সবচেয়ে কর্তৃত্বশালী কুরাইশ বংশের হাশিম গোত্রে জন্ম নিয়েছে। তার নাম মুহাম্মাদ (সা)। তিনি দাবি করছেন যে, আল্লাহ নিজেই নাকি ফেরেশতার মাধ্যমে তার কাছে ওহি প্রেরণ করেন। তিনি সব ধরনের মূর্তিপূজার পথ ত্যাগ করে মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত করার আহ্বান জানিয়েছেন। আমাদের কাছে অবশ্য লোকটাকে খারাপ মনে হয়নি। যদিও বিভিন্ন গোত্রের প্রধান ব্যক্তিরা এবং মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ মুহাম্মাদকে (সা) পাগল মনে করছেন। কিন্তু প্রতিদিনই নতুন করে অসংখ্য মানুষ নতুন এই ধর্ম গ্রহণ করছে। আর এদের অধিকাংশ যুবক ও দরিদ্র। যারা নতুন ধর্ম গ্রহণ করছে, তারা এতোটাই আন্তরিক ও বিশ্বস্ত আর হযরত মুহাম্মাদকে (সা) তারা এতোটাই ভালোবাসেন যে তারা কোনো অত্যাচার বা সংকটকেই ভয় পাচ্ছে না।"
আবু জার এই বর্ণনাগুলো শুনে খুবই অবাক হলেন। একজন মানুষ এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখার জন্য যে কোনো ঝুঁকি নিতে পরোয়া করছে না- এই বিষয়টায় তিনি রীতিমতো বিস্মিত হয়ে পড়লেন। তিনি তারপর প্রতিটি সময় শুধু এই শোনা কথাগুলো নিয়েই ভাবতে শুরু করলেন। এমনকি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এগুলোই ভাবতেন। রাতে অনেক সময় তার ঘুম নানা কারণে ভেঙ্গে গেলে তিনি আবার এগুলো নিয়ে চিন্তা করতেন। এক আল্লাহর ইবাদত করা কিংবা এতোদিন ধরে তারা যে মূর্তি ও দেবতাদের পূজা করছিলেন তাদেরকে বর্জন করার বিষয়টাও তাকে বেশ ভাবাচ্ছিল। আবু জার বার বার ভাবছিলেন যে, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও শক্তি কোন পর্যায়ে গেলে একজন মানুষ তার গোটা গোত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে?
তিনি আরো অনেক কিছু নিয়েই চিন্তা করতে থাকলেন। যদি আসলেই শুধুমাত্র যুবক আর গরীব লোকেরা মুহাম্মাদের (সা) সাথে থাকে, তাহলে এদের দিয়ে তো তিনি কিছুই করতে পারবেন না। যারা নেতৃত্বস্থানীয় তারা যদি নতুন এই ধর্ম না মানে তাহলে তো ইচ্ছা করলে যে কোনো মুহূর্তে নতুন ধর্ম গ্রহণকারীদের বর্জন করে নির্বাসনেও পাঠাতে পারেন। এই মুহাম্মাদের (সা) মধ্যে কি এমন আছে যে দলে দলে মানুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে? একা একজন মানুষ কিভাবে গোটা একটা সম্প্রদায়ের ঘুম হারাম করে দিতে পারেন? কিন্তু এতো বিস্ময়কর ক্ষমতা ও প্রভাব যার- তার ব্যাপারে তিনি কিভাবে আরো বেশি জানতে পারেন, এসব কিছু নিয়েই আবু জার ভেবে যাচ্ছিলেন।
এসব কথা ভেবে ভেবেই তিনি কোনোমতে রাতটা পার করলেন। ভোর হতেই তিনি তার ভাই আনিসের ঘরে গিয়ে উঁকি মারলেন। তাকে বললেন, “আনিস, শোন, বাস্তবতার কারণে আমি এই মুহূর্তে মক্কা যেতে পারছি না। এখানে আমার অনেক কাজ, অনেক দায়িত্বও আছে। আমি চাই, আমার হয়ে তুমি মক্কায় যাও। আমাকে জানাও যে, এই মুহাম্মাদ (সা) লোকটি কেমন, তার মূল কথাগুলো কি? তিনি আসলে কি করতে চান? আমি তোমার উপর ভরসা রাখি। তুমি বুদ্ধিমান, চৌকষ এবং কবি। যদি মুহাম্মাদের (সা) কথাগুলো কোনো কবিতা হয়, তাহলে আর কেউ না হলেও তুমি ঠিকই তা বুঝতে পারবে। আর উনি যা তেলাওয়াত করে তা যদি তোমার কাছে ভালো লাগে তাহলে তুমি আমার জন্য এর কিছু অংশ মুখস্থ করে রেখ। তুমি ফিরে আসার পর আমি না হয় তা শুনে নিব।"
আনিস উত্তর দিলেন, "সত্যি বলতে কি, আমি নিজেও এই ব্যক্তি সমন্ধে জেনে বেশ অবাক হয়েছি। কিভাবে সামান্য একজন মানুষ এতোগুলো গোত্রের এতো বছরের শক্তিশালী ভিতকে এভাবে নাড়িয়ে দিলেন তা আমাকেও বিস্মিত করেছে। আমি তার কাছে যাব, তুমি যেভাবে বললে, সেভাবেই তথ্য নেয়ার চেষ্টা করব। কয়েক দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় সব তথ্য জেনে এবং মক্কার সার্বিক পরিস্থিতি দেখে আমি ফিরে আসব।”
এই বলে অল্প কিছু খেজুর, কিছু শুকনো খাবার আর একটি পাত্রে সামান্য কিছু পানি নিয়ে আনিস মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। এভাবে কয়েক দিন চলে গেল। কিন্তু আবু জারের জন্য এই অল্প কয়েকটি দিন যেন একেকটা বছরের মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। তৃতীয় দিন থেকে আবু জার প্রতিদিন উপত্যকার উপর থেকে পথে চোখ রাখতে শুরু করলেন, এই আশায় যে তার ভাইয়ের ফিরে আসার কোনো দৃশ্য দেখা যায় কি না। পরের দুই রাতে উত্তেজনা আর আগ্রহের কারণে তিনি ভালোমতো ঘুমাতেও পারলেন না। শুধু এপাশ ওপাশ করলেন। তার শুধু মনে হচ্ছিল, এই বুঝি তার ভাইয়ের উটের পায়ের আওয়াজ শোনা যাবে, এই বুঝি তার ভাই ফিরে এলো।
একটা পর্যায়ে আবু জারের আফসোস হলো। তিনি ভাবলেন, “আমার যখন এতো অস্থিরতা, তখন ওকে না পাঠিয়ে বরং সরাসরি আমি গেলেই ভালো হতো। কারণ আমি এতোটাই অস্থির হয়ে আছি যে নিজের কাজগুলোও যথাযথভাবে করতে পারছি না।”
এভাবে এক সপ্তাহ পার হওয়ার পর আনিস মক্কা থেকে ফিরে এলেন। আবু জার ছুটে গিয়ে তার ভাইকে জড়িয়ে ধরলেন। সাথে সাথে তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করলেন, “আনিস, তুমি কি লোকটিকে দেখেছ? তুমি কি তার কোনো কথা শুনেছ? ঐশ্বরিক কোনো আয়াত শুনতে পেয়েছ? তিনি কি বলেন? একক সৃষ্টিকর্তা প্রসঙ্গে তার মূল কথা কি ইত্যাদি।"
আনিস শুধু মৃদু একটা হাসি দিল আর বলল, “ভাই, তোমার অনুরোধে আমি মক্কা গিয়েছিলাম এবং অনেক বড় একটি যাত্রা শেষ করে মাত্র ফিরলাম। আমাকে অন্তত একটু ফ্রেশ হতে দাও। যদি আরেকটু ধৈর্য্য ধরো, তাহলে আমি একটু খেয়েও নিব, কারণ আমার অনেক ক্ষুধা পেয়েছে। তারপর সব বলছি।”
গোসল করে, খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করে আনিস বলল, "আমি মুহাম্মাদকে (সা) দেখার সুযোগ পাইনি। তবে তার কিছু কথা (আয়াত) শুনেছি। যেগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকেই নাজিল হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) এই সব আয়াত নিয়ে আসেন। তিনি মূলত ওহির বাহকের কাজ করেন। মুহাম্মাদের (সা) মূল কথা হলো, আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করা যাবে না। তিনি একমাত্র প্রতিপালক, শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত করতে হবে। আমরা যেখানেই থাকি না কেন, আল্লাহ তায়ালা আমাদের সাথেই আছেন, তিনি আমাদের সব অবস্থায় দেখতে পান। আল্লাহর ইবাদত করার জন্য আমাদের আগে পবিত্র হয়ে নিতে হবে। মুহাম্মাদ (সা) সব সময় মানুষকে ভালো কাজ করার পরামর্শ দেন, অভাবীদের সাহায্য করতে বলেন। তিনি মেয়ে শিশুদের জীবন্ত কবর দিতে নিষেধ করেন। সেই সাথে আমাদের সমাজে থাকা বিধবা আর এতিমদের প্রতি তিনি যত্নবান হওয়ার তাগিদ দেন। তিনি এ ধরনের যেসব কথা বলেন, সবই আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আয়াত হিসেবে তার উপর নাজিল হয়। এরকম কিছু আয়াত আমি সংগ্রহ করেছি এবং লিখেও এনেছি।
আমরা যাকে কবিতা বলি, এই আয়াতগুলো মোটেও তেমন নয়। তবে আমার মতে, আমি আমার জীবনে সবচেয়ে সুন্দর যে কবিতাগুলো পড়েছি, এই আয়াতগুলো তার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর।”
আবু জার বললেন, “আসলেই কি তাই!! আচ্ছা, মক্কার মানুষেরা এ বিষয়ে কি বলে?”
আনিস উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ। প্রকৃতপক্ষেই আয়াতগুলো কবিতার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর। আর মক্কার মানুষের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। কেউ কেউ তাকে কবি মনে করে। কেউ বা মনে করে জাদুকর। কুরাইশ নেতারা তো সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার জন্য তাকে রীতিমতো ঘৃণা করে। তবে আমি তোমাকে বলছি, তিনি যা বলেন, তা সাধারণ কোনো কবিতা নয়। তিনি কোনো জাদুকরও নন। তার বক্তব্যে এমন কিছু বিষয় আছে যা আমরা কেউ আগে শুনিনি।"
আবু জার চোখ বড় বড় করে যেন তার ভাইয়ের কথা গিলছিলেন। তিনি বললেন, “তুমি যা বলছো, তা আমাকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারছে না। বরং লোকটার প্রতি আমার আকর্ষণ আরো বেড়ে গেল। তার সাথে দেখা না হওয়া পর্যন্ত আমি মনে হয় স্বস্তি পাব না। আমি বরং মক্কায় চলে যাই। তোমার প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ, আমি যে কয়দিন থাকব না, তুমি আমার পরিবার আর আমার কাজগুলোকে একটু দেখে রেখো।”
আনিস বলল, "তুমি যেহেতু যেতেই চাচ্ছ, তার মানে আমি এই সপ্তাহখানেক সফর করেও তোমাকে সন্তুষ্ট করতে পারিনি। যাও তুমি। আমি জানি, তোমার মনের এই অস্থিরতা মক্কায় যাওয়া ছাড়া কমবে না। তোমার ভাগ্য ভালোও হতে পারে। আমি মুহাম্মাদের (সা) মুখ থেকে কুরআনের আয়াত সরাসরি শুনতে পারিনি। তুমি হয়তো পারবে। মক্কায় সাবধানে থেক। মুহাম্মাদের (সা) কাছে কেউ গেলে মক্কার কুরাইশরা তা মোটেও ভালোভাবে নেয় না।"
আবু জার মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন। অবশেষে যখন তিনি মক্কায় প্রবেশ করলেন, তিনি অনুভব করলেন, মক্কার সর্বত্রই কেমন যেন অস্থিরতা আর উত্তেজনা বিরাজমান। সবাই সবাইকে অবিশ্বাস করতে শুরু করেছে, সন্দেহের চোখে দেখছে। নতুন করে কে মুহাম্মাদের (সা) প্রচারিত ধর্ম গ্রহণ করল কিংবা কুরাইশরা সর্বশেষ কাকে নির্যাতন করেছে- এগুলোই আলোচনার বিষয়। একটু একটু পর জটলা করে একদল মানুষ এগুলো নিয়ে ফিসফিস করে কথা বলছিল। এতো কিছুর পরও কিছু মানুষ প্রকাশ্যে উচ্চস্বরে কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করছিল। সাহস করে ইসলাম গ্রহণ করার ঘোষণা প্রদান করছিল।
ইসলাম গ্রহণ করার জন্য কিভাবে একজন সন্তান তার পিতামাতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছিল কিংবা কিভাবে কোনো একজন ক্রীতদাস প্রকাশ্যে তার মনিবের সামনে দাঁড়িয়ে এক আল্লাহর আনুগত্য করার ঘোষণা দিয়েছিল- এই সব গল্প তখন মানুষের মুখে মুখে। আবু জারও বিভিন্ন স্থানে বসে সেই গল্পগুলোই শুনছিলেন। এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনায় হযরত মুহাম্মাদ (সা) এবং তার অনুসারীদের যে ভয়াবহ নির্যাতনের ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছিল তিনি সেগুলোর বিষয়েও অবগত হচ্ছিলেন।
আবু জার অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝে গেলেন যে, মুহাম্মাদের (সা) বিষয়ে কাউকে সরাসরি প্রশ্ন করাটা তার জন্য নিরাপদ নয়। তাহলে তাঁকেও মুহাম্মাদের (সা) অনুসারী হিসেবে কুরাইশরা ধরে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করতে পারে। আর নতুন ধর্ম গ্রহণ করবেন কি না, তা যেহেতু নিশ্চিত নয়, তাই শুধু শুধু আবু জার কোনো বিড়ম্বনা বা অত্যাচার সহ্য করতে চাননি।
মক্কার একেবারে কেন্দ্রস্থলেই ছিল কাবা। আল্লাহর ঘর। যারা হজ্বে বা তীর্থযাত্রায় মক্কায় আসতো, তাদের মক্কা নগরীতে আশ্রয় দেয়া হতো। আতিথেয়তা প্রদান করা হতো। তাই মক্কায় কয়েক রাত থাকার মতো জায়গার কোনো অভাব ছিল না। তেমনই কোনো একটি জায়গায় আবু জার আশ্রয় নেয়ার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু সমস্যা হলো, পরিবেশটা এতোটাই গুমট ছিল যে, স্বাভাবিকভাবে কোনো ব্যক্তিই যেমন তার সাথে কথা বলতে আসেনি ঠিক তেমনি তিনিও কারও সাথে স্বেচ্ছায় গিয়ে কথা বলার মতো সুযোগ পাননি।
কিছু সময় পর একজন কিশোর তার কাছে এলো। তার গায়ের পোশাকটি ছিল ততটা মানের নয় কিন্তু তার মুখের হাসি ও ব্যবহার এতোটাই আন্তরিক যে মুহূর্তেই আবু জার তাকে ভালোবেসে ফেললেন। কিশোরটি বলল, “হে মুসাফির, আপনাকে স্বাগতম। আপনি নিশ্চয়ই দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করে এসেছেন। দয়া করে আমার সাথে এক বেলা খাওয়ার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করুন। আমি আপনার রাতে ঘুমানোর জন্য নিরাপদ আশ্রয়েরও ব্যবস্থা করব।"
এই কিশোরের প্রস্তাব শুনে আবু জার নিশ্চিন্ত হলেন। তিনি মক্কায় সরাসরি কাউকে চিনতেন না। আর তিনি এমন এক গোত্রের মানুষ আর এমন সব কাজ করেন যে, মক্কায় তার কোনো বন্ধু থাকারও কথা নয়। তাই তিনি সেই কিশোরটির পিছু পিছুই তার বাসায় চলে গেলেন। যাত্রাপথে তিনি কিশোরটিকে প্রশ্ন করলেন, “তোমার নাম কি?” ছেলেটি বলল, "আমার নাম আলী।” আবু জার নিজেও তার পরিচয় দিলেন এবং জানালেন তিনি ওয়াদ্দান উপত্যকার গিফার গোত্রের সদস্য।
আলী আবু জারকে তার বাসায় নিয়ে গেলেন। তিনি মুসাফির আবু জারের জন্য সামান্য কিছু খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা করলেন। ঘুমের জন্য সুন্দর আয়োজনও করলেন। এই পুরোটা সময়ে আলী একবারও আবু জারকে তার মক্কায় আসার কারণ সমন্ধে কোনো প্রশ্ন করলেন না।
এভাবে আরো একটি দিন চলে যায়। আবু জার আলীর বাসায় এক রাত থেকে আবার শহরের এক সাধারণ মেহমানখানায় উঠে গেলেন। তখনো আবু জার নবি মুহাম্মাদের (সা) নাম কারো মুখে শুনেনি, তার কোনো অনুসারীরও দেখা পাননি। যখন সন্ধ্যা নেমে এলো, তখন আবার কিশোর আলী আবু জারের কাছে এলো। আবারও আলী তার বাসায় যাওয়ার জন্য আবু জারকে দাওয়াত দিলেন।
আবু জারও যথারীতি আগের দিনের মতোই আলীর সাথে তার বাসায় গেলেন এবং টানা দ্বিতীয় রাতও সেই বাড়িতে পার করলেন। তখনো তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না যে, মুহাম্মাদ (সা) সম্পর্কে এই কিশোর ছেলেটিকে কোনো প্রশ্ন করা ঠিক হবে কি না।
পরের দিন, আবু জার এখানে ওখানে কান পাতলেন। মানুষের কথাবার্তা ও আলোচনা শোনার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোনোভাবেই তিনি মুহাম্মাদের (সা) কাছাকাছি যাওয়ার মতো কোনো রাস্তা বের করতে পারছিলেন না। বিমর্ষ মন নিয়ে তিনি উদ্দেশ্যহীনভাবে তাই কাবার দিকে হাটতে শুরু করলেন। ঠিক সেই সময় আলী এসে আবারও তার বাসায় যাওয়ার দাওয়াত দিল আর আবু জার তৃতীয় বার তার বাসায় চলে গেলেন।
সেই রাতে আলী ও আবু জার একই সাথে রাতের খাবার খেলেন। কিন্তু তারা কেউ তেমন কোনো বাড়তি কথা বললেন না। খাবার খাওয়া শেষে কিশোর আলী মেহমান আবু জারের দিকে হেসে বলল, “আপনি তিনদিন এই বাসায় থেকে তো বুঝেছেন যে, এখানে ভয়ের কিছু নেই। আপনি আমাকে ভরসা করতে পারেন। আপনি কেন এসেছেন বা আপনার কি প্রয়োজন তা যদি এবার আমাকে একটু বলেন, তাহলে আমি আপনাকে সাহায্য করার চেষ্টা করব।”
আবু জার তখনো বেশ অস্বস্তিতে ছিলেন। তিনি উত্তেজনায় অনেকগুলো পানি ঢক ঢক করে গিলে ফেললেন। তারপর প্রচণ্ড জড়তা নিয়ে আলীর কাছে গিয়ে বসলেন। আরো বেশ কিছুটা সময় আবু জার চুপচাপ ভাবলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন যে, এভাবে চুপ থেকে আসলে কোনো লাভ নেই। যেহেতু তিনি কোথাও থেকেই কোনো কিছু জানতে পারছেন না। তাই এই কিশোরকে তিনি সামান্য কিছু প্রশ্ন করতেই পারেন। আর বিগত তিনদিনে যেহেতু কিশোরটি তার কোনো ক্ষতি করেনি তাই তাকে বোধ হয় বিশ্বাস করা যায়। এসব ভেবে আবু জার কথা বলার জন্য মনস্থির করলেন।
আবু জার বললেন, “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমাকে বলব আমি কেন মক্কায় এসেছি। কথা দাও যে বিষয়টা গোপন তুমি রাখবে। আর সম্ভব হলে আমি যে মানুষটির খোঁজে এসেছি তুমি তার কাছে আমাকে নিয়ে যাবে।”
আলী বললেন, “ঠিক আছে, আমি কথা দিলাম।”
আবু জার এবার বললেন, “আসলে আমি নতুন নবিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। যেই মানুষটি এক আল্লাহর ইবাদতের কথা বলছে, তাকে আমার প্রয়োজন।"
আলীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি আবু জারকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আমি এমন কিছুই ভেবেছিলাম। আপনার চালচলন দেখে আমার শুরু থেকেই মনে হয়েছিল যে, আপনি সাদামাটা কোনো কারণে আসেননি। অবশ্যই আমি আপনাকে নবির কাছে নিয়ে যাব। আর তিনি নবুওয়াতের দাবি করছেন, বিষয়টা তেমন নয়। তিনি প্রকৃত পক্ষেই আল্লাহর প্রেরিত একজন রাসূল। এই বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।"
হযরত আলীর মুখে ইতিবাচক কথা শুনে আবু জার অনেকখানি স্বস্তি পেলেন।
আলী আরো বললেন, "সকাল বেলা আপনি আমার সাথে যাবেন। তবে আমি যেভাবে বলব, ঠিক সেভাবে আপনি চলবেন। তা না হলে আপনি আমি দুজনেই বিপদে পড়তে পারি। একটু দূর থেকে আপনি আমাকে অনুসরণ করবেন। আমি যখন হাঁটবো, আপনিও পিছু পিছু হাঁটবেন। আমি থেমে গেলে, আপনিও থেমে যাবেন। বিপদ কেটে গেলে আবার আমরা হাঁটবো। আমি যেদিক দিয়ে বা যে দরজা দিয়ে ঢুকবো, আপনিও আমার পেছনে পেছনে সেই দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবেন।"
আবু জার পুরো নির্দেশনাগুলো ভালোমতো শুনলেন ও নিজের ভেতর গেঁথে নিলেন। তারপর তারা দুজনেই ঘুমাতে চলে গেলেন। কিন্তু আবু জারের কিছুতেই ঘুম আসছিল না। তার সাথে যা ঘটছে, কিছুই যেন তার বিশ্বাস হচ্ছে না। তিনি এতোদিন ধরে যে মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন, সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এখন তার সামনে উপস্থিত। মক্কা খুব বড় কোনো শহর নয়। এখানে অল্প কয়েক হাজার মানুষ বসবাস করে। অথচ এখানেও নবির কাছে পৌঁছাবার জন্য তাকে কত চড়াই উতরাই পার হতে হলো। নবিজি (সা) শুধু যে নিজ শহরেই নির্বাসনে রাখা হয়েছে তাই নয়, বরং তার চারপাশেও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। তার সম্বন্ধে নানা ধরনের ঘৃণা, বিদ্বেষ প্রসূত মন্তব্য এবং কুসংস্কার ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যাদের সাহস নেই তারা হয়তো নবি পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারবেন না। আবু জার এতো দূর আসতে পেরেছেন কেননা শুরু থেকেই তিনি জানতেন, তিনি কি করতে চান এবং কোথায় গিয়ে তিনি থামবেন।
আবু জারের অস্থিরতা বেড়েই চলল। তার কান দুটো কুরআনের তেলাওয়াত শোনার জন্য প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। তিনি নিজেও নবিকে (সা) এক নজর দেখার জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিলেন। নবির কথা আর কুরআনের বার্তাকে ভালোভাবে অনুধাবন করার জন্য আবু জারের আগ্রহের কোনো কমতি ছিল না। সারা রাত তিনি ঘুমাতে পারলেন না। উত্তেজনায় শুধু ছটফট করে গেলেন। এভাবেই রাত পার হয়ে একসময় ভোর নেমে এলো।
সূর্যের আলো ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই আলী দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। আবু জারও তার পেছনে বেরিয়ে গেলেন এবং একটু দূর থেকে তাকে অনুসরণ করতে লাগলেন। তিনি খুব সতর্ক ছিলেন যাতে অন্য কেউ তাদের এই যাতায়াতটি না দেখে ফেলে কেননা তাতে তাদের দুজনেরই বড় আকারের বিপদ হতে পারে। আবার একই সঙ্গে তিনি আলীকেও চোখে চোখে রাখছিলেন। যাতে কোনোভাবেই আলী চোখের আড়ালে চলে না যায়। তাহলে তার বহুদিনের আকাঙ্খিত মানুষের কাছে যাওয়ার যে সুযোগটি তিনি এতো কষ্ট করে পেয়েছেন সেটাও হয়তো হেলায় হারিয়ে যাবে।
আবু জার কিশোর আলী থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেই চলছিলেন। যাতে অন্য কেউ বুঝতে না পারে যে তিনি কাউকে অনুসরণ করছেন। অবশেষে তারা সেই কাঙ্খিত স্থানে পৌঁছে গেলেন। এটা একটি সাদামাটা বাড়ি ছিল যেখানে নবি মুহাম্মাদ (সা) অবস্থান করছিলেন। প্রথমে আলী বাড়িটাতে প্রবেশ করলেন। কিছু সময় পর আবু জারও ভেতরে ঢুকলেন।
ঘরে ঢুকেই একজন মানুষের অপরূপ ছবি আবু জারের চোখে ধরা পড়ল। এর আগে কখনোই এরকম সুশ্রী কোনো মুখ তিনি দেখেননি। সেই মুখে অন্তরের আলো এবং জ্ঞানের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছিল তীব্রভাবে। তাঁর মুখ দেখলেই মনে হতো মানুষটির মন যেন দয়া, মায়া, মমতা আর দৃঢ়তায় ভরে আছে। মানুষটির চোখ দুটো দিয়ে যেন আলো বেরিয়ে আসছিল। আবু জার এর আগে কখনোই কোনো মানুষের সংস্পর্শে এসে এরকম উষ্ণতা অনুভব করেননি।
আবু জার কয়েক মুহূর্ত একটু ইতস্তত করলেন। কিভাবে তিনি নবিকে (সা) সম্ভাষণ করবেন, কিভাবেই বা কথাবার্তা শুরু করবেন। কয়েক মিনিট চলে গেল। আবু জার সামনে গিয়ে নবিজি (সা) কে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আসসালামু আলাইকুম। আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।”
রাসূল (সা) উত্তরে বললেন, “আপনার উপরও শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ তায়ালা আপনার উপর রহম করুন।" তারপর নবিজি (সা) আবু জারকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন,
“এটা সত্য যে, আমি আল্লাহর রাসূল। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি যে বার্তা নিয়ে এসেছি তাহলো, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, মাবুদ নেই। তিনিই আপনার, আমার ও আমাদের সবার সৃষ্টিকর্তা। আমাদের তাঁর কাছেই আত্মসমর্পণ করতে হবে। আল্লাহ ছাড়া মানুষ আর যাদের উপাসনা করে সেগুলো মানুষের কোনো উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না। সেগুলো মানুষকে সঠিকভাবে জীবন যাপন করার জন্য প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনাও দিতে পারে না। আল্লাহ তায়ালার কাছে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করার মাধ্যমে এধরনের সব অকার্যকর দেবতার প্রভাব ও দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া যায়।” এই পর্যন্ত বলেই নবিজি (সা) আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হওয়া বেশ কিছু আয়াত তেলাওয়াত করে শুনালেন।
সত্যি কথা বলতে, ঘরে প্রবেশ করার সময় যখন আবু জারের চোখ প্রথমবারের মতো নবিজির (সা) চোখে পড়েছিল তখনই তিনি তার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে নবিজির সাথে কথা বলে তিনি ভালোভাবেই অনুধাবন করলেন যে, মক্কায় মাটি ও পাথরের তৈরি যেসব মূর্তিকে পূজা করা হয়, সেগুলোর আসলে কোনো ক্ষমতা নেই। মানুষই তাদেরকে সম্পদ দিয়ে সাজিয়ে রাখে। মানুষকে কিছু দেয়ার কিংবা মানুষের কাছ থেকে কোনো কিছুকে কেড়ে নেয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। আবু জার তার নিজের কাজের জন্যও অনুতপ্ত হলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে, তিনি ও তার দল যেভাবে মানুষকে জিম্মি করে ধন সম্পদ বা অর্থ কেড়ে নেন, তাও বড় আকারের অন্যায়। এই অনুভূতির কারণেই আবু জার তাৎক্ষণিকভাবে আল্লাহর উপর ঈমান আনলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন। সেই থেকে আবু জার (রা) রাসূলের (সা) বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠতম সাহাবিতে পরিণত হলেন।
এরপর আরো যে কয়দিন আবু জার (রা) মক্কায় ছিলেন, তিনি প্রতিদিনই রাসূলের (সা) কাছে আসতেন। রাসূলের (সা) কাছ থেকে সরাসরি অযু করার ও নামাজ আদায় করার নিয়ম শিখলেন। ইসলামের মৌলিক দাবি সম্বন্ধে অবগত হলেন। যেমন, সবসময় সত্য কথা বলা, লেনদেনে সৎ থাকা, ওয়াদা পালন করা, জুলুম ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, দরিদ্র, এতিম ও বিধবাদের সাহায্য করা, আল্লাহর রাস্তায় অর্থ ও সম্পদ ব্যয় করা এবং সকলের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করা।
আরো বেশ কয়েকদিন পর আবু জার (রা) তার নিজের এলাকা ওয়াদ্দান উপত্যকায় ফিরে গেলেন। তার রাত হয়ে গেল পৌঁছতে। সেই রাতেই তিনি প্রথমে গেলেন তার ভাইয়ের বাসায় এবং তাকে এ পর্যন্ত হওয়া ঘটনাবলির প্রথম থেকে শেষ অবধি বর্ণনা করলেন। গোটা রাত জুড়েই তিনি কিভাবে আলীর (রা) সাথে দেখা হলো এবং কিভাবে তার মাধ্যমে নবিজির (সা) সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ হলো- সেই আলোচনা করে গেলেন। আনিসেরও বিষয়গুলো জানার বিশেষ করে রাসূলের (সা) মুখ নিঃসৃত বাণীগুলো শোনার ব্যাপক আগ্রহ ছিল। সবশেষে আবু জার (রা) তার ভাই আনিসকে নিজের ইসলাম গ্রহণের খবরটিও জানালেন।
আবু জার (রা) বললেন, আমি ইসলাম গ্রহণের পর দয়ালু নবি (সা) আমাকে বলেছেন, “তুমি যে মুসলমান হয়েছ, নিরাপত্তার খাতিরে এটা এখনই কাউকে না জানানোই ভালো। মক্কার মানুষেরা এখন নও মুসলিমদের উপর ভীষণ খেপে আছে। আমার আশঙ্কা, তোমার ইসলাম গ্রহণের কথা জানলে তারা তোমার তোমার ক্ষতি করতে পারে, এমনকি তোমাকে হত্যাও করতে পারে।”
আমি রাসূলের (সা) সেই পরামর্শকে সম্মানের সাথে বিবেচনা করেছি। তবে আমার মধ্যে তখন প্রচণ্ড উচ্ছ্বাস। আমার ইচ্ছে হচ্ছিল, আমি চিৎকার করে গোটা পৃথিবীকে জানিয়ে দেই যে, আমি সত্য পথের সন্ধান পেয়েছি এবং নিজেকে সেই রাস্তায় শামিল করেছি।
আমি রাসূলকে (সা) তাই বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কসম করে বলছি, তিনিই জীবন দেয়া ও নেয়ার মালিক। আমি আমার ইসলাম গ্রহণের কথা সবাইকে জানাতে চাই। মক্কায় থাকা অবস্থাতেই আমি কুরাইশ ও স্থানীয় সবাইকে আমার ইসলাম গ্রহণের কথা জানাতে চাই। রাসূল (সা) আমার আবেগ অনুধাবন করে মৃদু হাসলেন। তিনি চুপ থাকলেন। হ্যাঁ বা না কিছুই পরিষ্কারভাবে বললেন না। আমি বুক ভরা সাহস নিয়ে হারামে ছুটে গেলাম। কুরাইশের নীতি নির্ধারকরা তখন তাদের নির্ধারিত স্থানেই বসেছিল। তারা তখন বোধ হয় কোনো বৈঠকে ব্যস্ত ছিল। আমি যখন সেই স্থানে উপস্থিত হলাম, তারা প্রথমে আমাকে খেয়াল করেনি। আমি যখন চিৎকার করে আমার ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা দিলাম, তখনি তারা আমার দিকে তাকালো এবং বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ল। আমি বললাম, “শোন হে কুরাইশ বংশের লোকেরা, আমি কিছু কথা বলছি। তোমাদের মধ্যে যারা ন্যূনতম জ্ঞান রাখ, তারা দয়া করে আমার কথাগুলো শোন। যদি তোমরা জাহান্নামের আগুনকে একটু হলেও ভয় পাও, তাহলে আমার পথ অনুসরণ কর। আমি আজ ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি পূর্ণ ঈমান এনেছি। শুধুমাত্র আল্লাহই সব জানেন। তিনিই একমাত্র কার্যকর সৃষ্টিকর্তা। তোমরা যাদের উপাসনা করে যাচ্ছ, তারা সব মিথ্যা ও ক্ষমতাহীন। এগুলো তোমাদের নিশ্চিত বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাবে। তোমরা মুহাম্মাদের (সা) দেখানো পথে চলে এসো, এখনো সময় আছে।”
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই কুরাইশ লোকজন এসে আমাকে জাপটে ধরে ফেলে। একজন আমার হাত দুটোকে পেছন থেকে বেঁধে ফেলে আর অন্য কেউ একজন এসে আমার মুখে ঘুষি মারে। তারা আমার মুখ বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল।
একজন বলল, “তোমার এতো সাহস! তুমি আমাদের মাঝে এসে এসব কথা বলে যাও।” অপর একজন এসে আমাকে যাচ্ছেতাই আঘাত করতে লাগল। আমাকে তারা এতো জোরে মারছিল যে, আমার মনে হলো আমার শরীরে বোধহয় একটি হাড়ও আর আস্ত নেই। আরও মনে হলো, আমি বোধ হয় ওখান থেকে আর বেঁচে ফিরতে পারব না।
ঠিক সেই সময় সেখানে আব্বাস এসে উপস্থিত হলেন। আব্বাস হলো রাসূলের (সা) চাচা। তাকে আমি নবি মুহাম্মাদের (সা) সেই বাসায় দেখেছিলাম। পরে আমি জানতে পারি যে, তিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি তবে তার ভাতিজা মুহাম্মাদ (সা) ও তার অনুসারীদের প্রতি তিনি খুবই সহানুভূতিশীল। আমি দেখতে পেলাম যে, ভীড়ের মধ্যে ঢুকেই আব্বাস আমাকে ধরে ফেললেন এবং ওদের আঘাত থেকে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেন।
কুরাইশদেরকে থামাতে আব্বাসের বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। একটা পর্যায়ে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “তোমরা যাকে মারছো, জানো সে কে? তোমরা কি জানো, ওকে মারলে তোমাদের কি পরিণতি ভোগ করতে হবে?” আব্বাসের চিৎকার শুনে তারা মারা বন্ধ করল ঠিকই, তবে দুজন কুরাইশ সদস্য তখনও আমাকে জাপটে ধরে রাখলো।
আব্বাস বললেন, “এই মানুষটি গিফার গোত্রের লোক। আমাদের বণিক দলগুলো যে পথ দিয়ে যায়, সেই ওয়াদ্দান উপত্যকাতেই এদের বসবাস। যদি তোমরা এখন নিজেদের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পার আর একে মেরে ফেল, তাহলে ওর গোত্রও বসে থাকবে না। তারাও তোমাদের বিরুদ্ধে একইভাবে প্রতিশোধ নেবে। তারা ওয়াদ্দান দিয়ে মক্কার কোনো ব্যক্তিকেই আর যাতায়াত করতে দেবে না। বরং মক্কার কাউকে পেলেই তারা মেরে হাড়গোড় সব ভেঙ্গে দেবে।”
আব্বাসের কথা শুনে কুরাইশরা একটু সংযত হলো। যে দুজন আমাকে ধরে রেখেছিল তারা আমাকে দরজার কাছে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে বাইরে ফেলে দিল। আমি আব্বাসের দিকে তাকিয়ে চোখের ভাষায় ধন্যবাদ জানালাম। আব্বাসও সেই ভাষা বুঝতে পেরে মৃদু হেসে তার উত্তর দিলেন।
“সেখান থেকে বেরিয়ে এসে আমি আবার নবিজির (সা) বাসার দিকে গেলাম। তখন আমি আমার বৃথা সাহসের অপ্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে অনুতপ্ত ছিলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম যে এমনটা করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। যাহোক, আমি যখন নবিজির কাছে গেলাম, সব খুলে বললাম এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন দেখালাম। তখন তিনি বললেন, “আমি কি তোমাকে বলিনি যে, এখনই ইসলাম গ্রহণের প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়ার দরকার নেই?” আমি নিজের নির্বুদ্ধিতা বুঝতে পারলাম এবং সম্মতি সূচক মাথা নাড়ালাম। আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, আমি মনে করেছিলাম, তারা আমার কথাকে গুরুত্বের সাথে নিবে। কিন্তু আমার ধারণা ভুল।”
নবিজি (সা) বললেন, “শোন আবু জার, অহেতুক মার খাওয়ার চেয়ে এখন তোমার হাতে আরো অনেক জরুরি কাজ রয়েছে। তুমি তোমার এলাকায় ফিরে যাও আর গত কয়েকদিন যা শিখলে তা তোমার এলাকার বাসিন্দাদের জানাও। তাদেরকে এক আল্লাহর পথে আসার আহ্বান কর। যদি আল্লাহ সাহায্য করেন, নিশ্চয়ই তারা তোমার ডাকে সাড়া দেবে, আল্লাহর উপর ঈমান আনবে। আর তুমিও তোমার চেষ্টার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তম পুরস্কার লাভ করবে। ইনশাআল্লাহ, এমন সময় আসবে, যখন আর কাউকে অত্যাচারের ভয়ে গোপনে গোপনে কাজ করার প্রয়োজন পড়বে না। তখন আল্লাহ তায়ালাই আমাদের প্রকাশ্যে কাজ করার নির্দেশ দিবেন। যদি কখনো খবর পাও যে, সেই সময় এসে গেছে, তাহলে তুমি তখন আমার কাছে এসো। আমরা তখন একসাথে সবাই মিলে প্রকাশ্যে দীনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ব।”
আবু জার (রা) তার ভাইকে লম্বা সময় নিয়ে এই কথাগুলো বললেন। আর জানালেন, "রাসূলের (সা) সাথে ওটাই ছিল তার সর্বশেষ কথোপকথন। রাসূলের (সা) নির্দেশনা পাওয়ার পর আমি তার দোয়া নিয়ে বেরিয়ে আসি আর আলী (রা) আমাকে মক্কার শেষ সীমানা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যায়।”
আনিস এতোক্ষণ গভীর মনোযোগ দিয়ে তার ভাইয়ের কথাগুলো শুনছিল। তন্ময় হয়েই তার আরো কিছু মুহূর্ত কেটে গেল। একটা সময় পর আনিস বলল, "ভাই, আমি জানি তুমি সঠিক পথেরই সন্ধান পেয়েছ। আমিও তোমার মতো সঠিক পথেই চলতে চাই। চল, সবার আগে আমরা আমাদের মায়ের কাছে গিয়ে তাকে খবরটা দিই। তারপর আমাদের গিফার গোত্রের সবার কাছে দুই ভাই মিলে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেই। যদি আল্লাহ সাহায্য করেন, তাহলে নিশ্চয়ই তাদের মন আমাদের ডাকে সাড়া দেবে এবং তারা সত্য ও সুন্দরের পথে শামিল হবে।"
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, আনিসের কথা সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল। আনিস ও আবু জার (রা) দুই ভাই মিলে প্রথমে মাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। মা জননীও সাথে সাথে ইসলামের দাওয়াত কবুল করেন। তারপর মা তার দুই সন্তানকে নিয়ে গিফার গোত্রের প্রতিটি তাবুতে, প্রতিটি বাড়িতে ইসলামের দাওয়াত পৌছে দিতে শুরু করেন। তারা বিভিন্ন বাজার এবং জনসমাগম হয় এমন স্থানে ইসলামের পক্ষে কথা বলেন। পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে যোগ দিয়েও মানুষকে ইসলামের পথে আহ্বান করেন। ধীরে ধীরে কিছু মানুষ তাদের ডাকে সাড়া দেয়। ক্রমান্বয়ে এই সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং একটা সময়ে আবু জারের (রা) সত্যসন্ধানী প্রচেষ্টার বদৌলতে গোটা গিফার গোত্রই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসে সমবেত হয়। আজও অবধি, প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমান রাসূলের (সা) এই সাহাবিকে স্মরণ করে- যিনি একেবারেই নিজ উদ্যোগে সত্যের সন্ধান করতে করতে রাসূলের (সা) সান্নিধ্য লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রচণ্ড প্রতিকুল পরিস্থিতিতে ইসলামকে চিনতে এবং ইসলাম কবুল করতে সাহস দেখিয়েছিলেন। ইতিহাসে রাসূলের (সা) ঘনিষ্ঠতম এই সাহাবি হযরত আবু জার গিফারি (রা) নামেই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।