📘 আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত যারা 📄 জ্ঞানী এক শিষ্যের গল্প

📄 জ্ঞানী এক শিষ্যের গল্প


হাজার বছর আগের বাগদাদ ছিল উজ্জ্বল, ঝকমকে, সম্পদশালী আর বিলাসিতার এক নগরী। যে সময়ের কথা বলছি, তখন বাগদাদ ছিল তৎকালীন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী।

আর খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন বিশ্বখ্যাত শাসক হারুনুর রশিদ। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ী আর বণিকেরা দলে দলে স্বর্ণালংকার, সুগন্ধীসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে বাগদাদ শহরে আসতেন। তারা বাগদাদে আসতেন ব্যবসা করার জন্য। আর বাগদাদের অধিবাসীরাও এতোটা স্বচ্ছল ছিল যে তারাও অবলীলায় মূল্যবান সেসব প্রসাধনী আর সুগন্ধী কিনে নিজেদের সুন্দর করে তোলার খায়েশ পূরণ করত।

এই সব দুনিয়াবি ভোগ বিলাস আর বৈভবের বাইরেও বাগদাদের আরেকটি চেহারা তখন দৃশ্যমান ছিল। পুরো পৃথিবীর মধ্যে বাগদাদই ছিল তখন সবচেয়ে বড় শিক্ষাকেন্দ্র। সব ধরনের শিক্ষাবিদ, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং দার্শনিকরা বাগদাদকে রীতিমতো তীর্থস্থান মনে করত। সে সময় প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার যাবতীয় রচনাবলি ও পুস্তক আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হয়।
অনুবাদকদের সম্মানও ছিল অনেক বেশি। জানা যায়, একটি বই আরবিতে অনুবাদ করার পর সেই বইটির যত ওজন হতো, সেই অনুপাতে অনুবাদককে পারিশ্রমিক হিসেবে স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করা হতো।

এতোসব জ্ঞানী আর পণ্ডিত লোকের মাঝে জুনায়েদ নামে একজন বড় মানের শিক্ষাবিদ ছিলেন। পেশায় ছিলেন তিনি একজন শিক্ষক, মানুষ হিসেবে ছিলেন ভীষণ মানবিক আর চরিত্রের দিক থেকে ছিলেন খুবই উন্নত।

জুনায়েদ পারস্য এলাকার নিহাভান্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন কাঁচের ব্যবসায়ী। তিনি তার চাচা সারি আল সাকাতির কাছেই মানুষ হন। সারি আল সাকাতি নিজ ভ্রাতুষ্পুত্রকে একজন উন্নত মানুষ বানানোর চেষ্টা করেন। জুনায়েদের বয়স যখন মাত্র ১১ বছর, তখন চাচা সারি আল সাকাতি তাকে নিয়ে হজ্জে গমন করেন। সেবার মসজিদুল হারামে তারা প্রায় চারশত জ্ঞানী আলেমের সান্নিধ্য লাভ করেন। এই আলেমরা সবাই মিলে কৃতজ্ঞতা তথা শুকরিয়া আদায় করার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করছিলেন। বালক জুনায়েদ আর তার চাচা নীরবে সেই আলোচনাগুলো শুনছিলেন।

প্রত্যেক আলেমই নিজের মতকে অন্যদের মতের তুলনায় বেশি সঠিক ও নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছিলেন। চাচা সারি আল সাকাতি এই আলোচনায় তার ভ্রাতুষ্পুত্র জুনায়েদকে নিয়ে গিয়েছিলেন কারণ তিনি জানতেন, জুনায়েদ তার বয়সের অন্য যে কারও তুলনায় অনেক বেশি মেধাবী ও জ্ঞানী। তাছাড়া, এতো সব আলোচনার মাঝখানে এই বিষয় নিয়ে জুনায়েদ কি ভাবছে, তা জানারও আগ্রহ ছিল চাচা সারি আল সাকাতির। তাই তিনি গলা একটু ঝেড়ে কাশি দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। সবাই তার দিকে তাকালে চাচা সারি আল সাকাতি বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আপনারা সবাই অনেক মূল্যবান মতামত দিয়েছেন। সবার মতামতই বেশ প্রশংসনীয়। তবে আমি খুব খুশি হব যদি আপনারা দয়া করে আমার ভাতিজার কথা একটু শুনেন। তার বয়স কম হলেও মাঝে মাঝে সে এমন মন্তব্য করে বসে যে আমি রীতিমতো বিস্মিত হয়ে যাই। তো বাবা জুনায়েদ, তুমি কি মনে কর? সত্যিকারের কৃতজ্ঞতাবোধ কি?”

ঐ বৈঠকে যতজন আলেম ছিলেন, তারা সবাই চাচার কর্মকাণ্ডে বেশ অবাক হলেন। তারপরও তারা সেই ছোট্ট জুনায়েদের দিকে তাকালেন এবং তাকে তার মতামত প্রকাশ করার জন্য উৎসাহ দিলেন। জুনায়েদ অবশ্য এই পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে না গিয়ে বেশ ভালোভাবেই সামাল দিয়েছিল। সে খুব পরিষ্কার কণ্ঠে বলল, "কৃতজ্ঞতাবোধ বলতে আমি যা বুঝি তাহলো, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে যে নেয়ামত দান করেছেন, আমরা তার অপব্যবহার করব না। এই নেয়ামত পাওয়ার পর আমরা আবার নাফরমানিতে ডুবে যাব না। আল্লাহর প্রতি অবাধ্য হবো না। সব সময় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।"

উপস্থিত সকল বিজ্ঞ আলেম এই অল্পবয়স্ক ছেলেটির পরিণত উত্তরে অবাক হয়ে গেলেন। চাচা সারি আল সাকাতি বেশ প্রশান্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন আর বললেন, “জুনায়েদ, আমার মনে হয় তোমাকে আল্লাহ তায়ালা যে নেয়ামত বেশি দিয়েছেন তাহলো তোমার জিহবা, তোমার কথা বলার ক্ষমতা আর অদ্ভুত সুন্দর বাচনভঙ্গি।”

এই ঘটনার অনেক বছর পরের কথা। জুনায়েদ তখন বাগদাদে বসবাস করেন। জুনায়েদের তখন অনেক শিষ্যও হয়ে গেছে। তারা সবাই তার কাছ থেকে নতুন কিছু শিখতে এসেছে। জুনায়েদ ততদিনে নিজের সততা, অনুধাবন ক্ষমতা এবং একনিষ্ঠতার জন্য বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে গেছেন। অনেকে আগে থেকেই শুধুমাত্র জুনায়েদের বক্তব্য শোনার জন্য, আবার যারা তার প্রতি একান্তই অনুগত, তারা তার আবাসস্থলে নিয়মিত থাকতে শুরু করেন। আগত সবার প্রতিই জুনায়েদ ছিলেন সমান দরদি এবং তাদের সবাইকে তিনি একইভাবে শিক্ষা দিতেন। তবে একজন শিষ্য ছিল, যাকে তিনি অন্য সবার চেয়ে একটু আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতেন। কিন্তু অন্যরা বুঝত না কেন তিনি ঐ শিষ্যটাকে এতোটা ভালোবাসতেন। তাদের অনেকেই এই শিষ্যকে হিংসা করতে শুরু করেছিল।

একদিন তারা সিদ্ধান্ত নিল ওস্তাদ জুনায়েদকেই তারা সরাসরি প্রশ্ন করবে কেন তিনি ঐ শিষ্যকে একটু বেশিই ভালোবাসেন। তারা জুনায়েদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ও তো আমাদের সবার মতোই। আমরা ওর মধ্যে আলাদা কিছু দেখতে পাই না। তাহলে আপনি কেন অন্য সবার চেয়ে ওকে একটু বেশি গুরুত্ব দেন?”

জুনায়েদ বললেন, “সে তোমাদের চেয়ে বেশি গুছানো, তোমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানীও বটে। তার ব্যবহারও বেশ উত্তম। সে আল্লাহর প্রতি অনুগত এবং সর্বোপরি সে সমঝদার একটি ছেলে। তোমরা নিজেরাই একদিন বিষয়টা বুঝতে পারবে।”
জুনায়েদ উত্তর দিলেন ঠিকই, তবে তার উত্তরে কেউই সন্তুষ্ট হতে পারল না। জুনায়েদ যে মন্তব্যগুলো করেছে তার কোনোটারই সত্যতা তারা খুঁজে পেল না। যেহেতু তারা ওস্তাদ জুনায়েদকে খুব সম্মান করে তাই তারা বিষয়টা নিয়ে আর উচ্চবাচ্য না করে বরং নীরব হয়ে গেল। জুনায়েদও বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারলেন প্রশ্নকারীরা তার উত্তরে সন্তুষ্ট হয়নি। তিনি তাদের সামনে সত্যটাকে প্রমাণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

পরের দিন সকালে জুনায়েদ তার সকল শিষ্যকে ডেকে পাঠালেন। তারা এসে উপস্থিত হলো। তারা ছিল বিশ জন। এবার জুনায়েদ তাদেরকে বললেন, “তোমরা সবাই পাখির বাজারে যাও এবং প্রত্যেকে ১টি করে ২০টি পাখি নিয়ে এসো।” শিষ্যরা ওস্তাদের কথামতো বাজার থেকে ২০টি পাখি কিনে নিয়ে এলো।

এবার জুনায়েদ তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "আমি চাই প্রথমে তোমরা এমন একটি স্থানে যাও যেখানে কেউ তোমাদের দেখতে পাবে না। তারপর ছুরি নিয়ে যার যার হাতে থাকা পাখি কুরবানী করবে। এরপর সেই পাখি নিয়ে আবার এখানে আসবে। কিন্তু মনে রাখবে, এই ঘটনা যেন কেউ দেখতে বা জানতে না পারে।"

ওস্তাদের কথা অনুযায়ী, প্রত্যেক শিষ্যই একটি করে পাখি নিয়ে চলে গেল এবং অল্প কিছু সময় পরই তারা ফিরে এলো এবং নিজেদের কুরবানী করা পাখি প্রদর্শন করল। ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ ঘরের পেছন থেকে একটি পাখির চিৎকার আর ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ ভেসে আসলো। দেখা গেল, ওস্তাদ জুনায়েদের সেই প্রিয় শিষ্য একটি জীবন্ত পাখি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার জন্য বরাদ্দকৃত পাখি কুরবানী দিতে পারেনি। উল্টো তার চোখে মুখে বিস্ময়, কেন সবাই তাকে নিয়ে এতো হাসাহাসি করছে!!

অন্য সব সহপাঠীরা তখন টিটকারী মারা শুরু করে দিয়েছে। উপহাস করে তারা বলছে, “উনি জ্ঞানী শিষ্য তো, তাই তার কাজ কর্ম একটু আলাদা। এতোটাই আলাদা যে সে এখন ওস্তাদের হুকুমও অমান্য করা শুরু করে দিয়েছে।"

জুনায়েদ নিজেও বিষয়টার সূরাহা করতে চাইলেন। তিনি সেই জ্ঞানী শিষ্যকে কাছে ডাকলেন এবং প্রশ্ন করলেন, “তুমি কেন পাখিটাকে আমার আদেশ মতো কুরবানী করনি?”

এবার সেই শিষ্য উত্তর দিল, "আপনি আমাকে এমন একটি স্থানে পাখি কুরবানী করতে বলেছিলেন, যেখানে কেউ দেখতে পাবে না। কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব? আল্লাহ তো সবই দেখতে পান। আমি কিভাবে তার কাছ কাছ থেকে লুকিয়ে বা আড়াল করে কিছু করব? তাই আমি পাখি কুরবানী করতে পারিনি।”

জুনায়েদ তার উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন এবং অন্যদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “এখন বুঝলে তো, কেন এই শিষ্যকে আমি তোমাদের সবার চেয়ে আলাদা করে দেখি, কেন আমি তাকে জ্ঞানী বলি। তোমরা নিজেদের কার্যক্রমের সাথে ওর আচরণকে মিলিয়ে দেখলেই পার্থক্যটা বুঝে যাবে।”

সব শিষ্যরা এবার নিজেদের ভুল বুঝতে পারল। তারা ওস্তাদ জুনায়েদের কাছে ক্ষমা চাইল এবং অহেতুক জ্ঞানী ঐ শিষ্যকে হিংসা করার জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল।

📘 আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত যারা 📄 আবু হুরায়রা (রাঃ) আর জনৈক বন্দীর গল্প

📄 আবু হুরায়রা (রাঃ) আর জনৈক বন্দীর গল্প


রাসূল (সা:) এর প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা (রা) নিজেই এই গল্পটা এভাবে বর্ণনা করেন:

“একবার রাসূল (সা) আমাকে যাকাতের মজুদ পাহারা দেয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। একদিন নীরবে একজন ব্যক্তি এসে চুপিসারে যাকাতের মজুদ থেকে কিছু খাদ্যদ্রব্য চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি লোকটিকে ধরে ফেলি। আমি এই ঘটনায় খুব মন খারাপও করেছিলাম। কে সেই মানুষ যে কি না যাকাতের তহবিল থেকেও চুরি করে। যাকাতের সবকিছু তো অভাবী আর মজলুমদের জন্যই। সেখান থেকে আবার চুরি কেন করতে হবে?

আমি লোকটাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করতে চাইলাম। তাকে বললাম, “তুমি যাকাতের মজুদ থেকে চুরি করেছ। তোমাকে আমি রাসূলের (সা) কাছে নিয়ে যাব। তিনি যা করার করবেন।”

সে কাচুমাচু হয়ে উত্তর দিল, “না, দয়া করে তেমনটা করবেন না। আমি খুব অভাবী একজন মানুষ। আমাকে অনেক বড় পরিবার টানতে হয়। তাই বাধ্য হয়েই আমি চুরি করতে এসেছি। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন।”

আমি লোকটাকে নিয়ে কিছুটা সময় ভাবলাম। আমার কেমন যেন মায়া হলো। আমি তাকে ছেড়ে দিলাম।

পরের দিন সকালে নবিজির (সা) সাথে যখন আমার দেখা হলো, তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, “হে আবু হুরায়রা, তোমার বন্দি কাল রাতে শেষ পর্যন্ত কি করল?"

আমি তো অবাক হয়ে গেলাম। রাসূল (সা) কিভাবে ঘটনাটা জানলেন? তাকে তো আমি কিছু জানাইনি। তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা কোনো বার্তা দিয়েছেন। যাহোক, এসব ভাবতে ভাবতেই আমি তাকে সব জানালাম। বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, চোরটি আমাকে বলল, তার অনেক বড় পরিবার, অভাবের কারণে সে বাধ্য হয়ে চুরি করেছে। তাই আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছিলাম।"

রাসূল (সা) বললেন, "আবু হুরায়রা, ও তোমাকে মিথ্যা বলেছে। ও আবার চুরি করতে আসবে।”

আমি সাথে সাথেই বুঝলাম সেই চোরের সাথে আমার আবার দেখা হবে। কেননা রাসূল (সা) কখনো ভুল বা মিথ্যা কিছু বলেন না। তাই পরের দিন রাতে আমি আরো বেশি সতর্ক হয়ে সেই চোরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমি এবার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আরেকবার দেখতে পেলে লোকটাকে আমি আটক করবই। সে অভাবীদের জন্য বরাদ্দ খাবার থেকে বারবার চুরি করবে- এটা মেনে নেয়া যায় না।

যথারীতি সে এলো এবং আমি আবারও তাকে হাতেনাতে ধরে ফেললাম। আমি বললাম, "আজ তো আমি তোমাকে অবশ্যই রাসূলের (সা) কাছে নিয়ে যাব। সে ভয়ে কেঁদে ফেলল আর বলল, "আমাকে ছেড়ে দিন, দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আমি খুব হতদরিদ্র একজন মানুষ। আমার পরিবারও বড়। বাধ্য হয়ে আমাকে চুরি করতে হয়। আমি কথা দিচ্ছি, আমাকে ছেড়ে দিলে আমি আর চুরি করব না।"

তার চোখে এতো পানি ছিল যে আমার আবার কেমন যেন মায়া হলো লোকটার উপর। আমি আবারও তাকে ছেড়ে দিলাম।

ভোর বেলায় নবিজির (সা) সাথে আবার আমার দেখা হলো। তিনি প্রশ্ন করলেন, “হে আবু হুরায়রা, তোমার বন্দি কাল রাতে কি করেছে?”

আমি উত্তর দিলাম, “হে রাসূলুল্লাহ (সা), সে আবারও তার অভাব-অনটন এবং পরিবারের বোঝার ইস্যুটিকে সামনে এনেছে। আমার তার প্রতি খুব মায়া হয়েছিল তাই আবারও তাকে ছেড়ে দিয়েছি।” রাসূল (সা) বললেন, “সে আবারও তোমাকে মিথ্যা বলেছে। ও আবারও আসবে।”

রাসূল (সা) এ কথা বলায় তৃতীয় দিন আমি সর্বোচ্চ সতর্ক হয়ে চোরটির জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। এবার আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আবার আসলে তাকে আমি গ্রেফতার করবই। কারণ সে বার বার আমাকে মিথ্যা বলছে। যা হোক, তৃতীয় বারের মতো সে এলো এবং গোপনে খাবার চুরি করতে শুরু করল। আমি এবারও তাকে ধরে ফেললাম আর বললাম, “এবার তোমাকে রাসূলের (সা) কাছে নিতেই হবে। এটাই তোমার শেষ সুযোগ। তুমি ওয়াদা দিয়েছিলে যে আর আসবে না কিন্তু আবার এসেছো। এবার তুমি যা-ই বল, আমি আর তোমাকে ছাড়বো না।” সেই চোরটি উত্তর দিল, “দয়া করে আমাকে যেতে দিন। আমাকে ছেড়ে দিন। আমাকে যদি আপনি এবার ছেড়ে দেন, তাহলে আমি আপনাকে এমন একটা দোয়ার কথা বলব, যা পাঠ করলে আল্লাহ আপনাকে অনেক সওয়াব দেবেন।"

চোরটির এই কথা শুনে আমি বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। আগা গোড়াই নতুন কিছু জানার বিষয়ে আমার আগ্রহ আছে। তাই আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সেই দোয়াটি কি?

সে উত্তর দিল, "আপনি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আয়াতুল কুরসী পাঠ করবেন (পবিত্র কুরআনের সূরা আল বাকারার ২৫৫ নং আয়াত)। যে বান্দা ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসী পাঠ করে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য একজন পাহারাদার নিযুক্ত করেন ফলে শয়তান সকাল অবধি আর সেই বান্দার কাছে আসতে পারে না।”

এটা শুনে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। পরের দিন সকালে রাসূল (সা) আবার আমাকে প্রশ্ন করলেন, “হে আবু হুরায়রা, তোমার বন্দি কাল রাতে তোমার সাথে কি করেছে?”

আমি নবিজিকে (সা) রাতের পুরো ঘটনাটা বর্ণনা করলাম। আমি জানালাম, চোরটি আমাকে নতুন একটি দোয়া শেখানোর কথা বলায় আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি।

রাসূল (সা) আবার প্রশ্ন করলেন, “সে তোমাকে কি বলেছে?” আমি উত্তর দিলাম, লোকটি আমাকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আয়াতুল কুরসী পাঠ করার জন্য বলেছে। এই আয়াতটি পাঠ করলে আল্লাহ নিজে একজন পাহারাদার নিয়োগ দিয়ে গোটা রাতটি জুড়ে আমাকে হেফাজত করবেন। সকাল পর্যন্ত শয়তান আমার কাছে ভিড়তে পারবে না।

রাসূল (সা) বললেন, “এবার সে তোমাকে সত্য কথা বলেছে। শোন আবু হুরায়রা, যদিও সে বরাবরই মিথ্যাবাদী, তবে এবার এই কথাটি সে সত্য বলেছে।”

রাসূল (সা) আরো বললেন, “হে আবু হুরায়রা, তুমি কি জানো, গত তিন রাত কার সাথে তোমার দেখা হয়েছে?” আমি বললাম, “না, আমি জানি না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সা) ভালো জানেন।”

রাসূল (সা) বললেন, “সে ছিল ইবলিশ শয়তান।”

(তথ্যসূত্র: এই বর্ণনাটি সহীহ আল বুখারীতে পাওয়া যায়। এখানে পাঠকের বোঝার সুবিধার জন্য গোটা ঘটনাটিকে গল্পের আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে।)

📘 আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত যারা 📄 একমাত্র আল্লাহর জন্য

📄 একমাত্র আল্লাহর জন্য


হযরত মুসার (আ) সময়ে একজন ধার্মিক মানুষ ছিলেন। তিনি সারা দিন-রাত ইবাদত করতেন। একদিন স্থানীয় কিছু মানুষ এসে তাকে জানাল, পাশের বাগানের একটি গাছকে লোকজন পূজা করতে শুরু করেছে। একথা শুনে ধার্মিক মানুষটি খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। সাথে সাথেই তিনি একটি কুড়াল নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। তার ইচ্ছা কুড়াল দিয়ে গাছটি কেটে ফেলবেন।

ঠিক সেই সময় বয়স্ক এক ব্যক্তির চেহারা নিয়ে ইবলিশ শয়তান ধার্মিক মানুষটির সামনে এলো। শয়তান তাকে বলল, “আপনি কি করতে চান?”

ধার্মিক লোকটি বৃদ্ধলোকরূপী শয়তানকে সম্পূর্ণ পরিস্থিতি জানালেন এবং বললেন, "আমি ঐ গাছটা কেটে ফেলতে চাই।”

এ কথা শুনে শয়তান বলল, "আপনি কেন শুধু শুধু গাছটা কাটবেন? আল্লাহ তো আপনাকে এই দায়িত্ব দেননি। আল্লাহ যদি গাছটা কাটাতেই চাইতেন, তাহলে তো তিনি একজন নবিকে এই দায়িত্ব দিয়ে পাঠাতেন।"

ধার্মিক লোকটা শয়তানকে চিনে ফেললেন। তিনি শয়তানের কথায় কোনোভাবেই থামতে চাননি। তারা দুজন আরো কিছুক্ষণ ঝগড়া করল। একপর্যায়ে তাদের মাঝে রীতিমতো হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল। ধার্মিক মানুষটি শয়তানকে মাটির উপর ফেলে দিতে সক্ষম হলেন। এবার তিনি হাতের কুড়াল দিয়ে শয়তানকে আঘাত করতে উদ্যত হলেন। কিন্তু তখনই শয়তান ধার্মিক মানুষটির কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইল আর বলল, "আপনি আমাকে ছেড়ে দিন। তাহলে আমি আপনাকে এমন একটি বুদ্ধি দিব যা দুনিয়া ও আখেরাত- উভয় জায়গাতেই আপনার কল্যাণ বয়ে আনবে। আমি আপনাকে প্রতিদিন দুই দিনার করে দিব। আপনি সেখান থেকে এক দিনার গরিবদের মধ্যে বিতরণ করে দিতে পারেন আর বাকি এক দিনার নিজের প্রয়োজন মতো খরচ করবেন। আপাতত এই গাছটি না কেটে আমরা বরং আল্লাহর ফায়সালার জন্য অপেক্ষা করি।"

শয়তানের এই প্রস্তাবে ধার্মিক লোকটি বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। তিনি পরামর্শটাকে ভালোই মনে করলেন এবং নীরবে বাড়ি ফিরে গেলেন। দ্বিতীয় দিন ঘুম থেকে উঠে তিনি তার বালিশের নিচে দুই দিনার পেলেন। এই অর্থ পেয়ে তিনি খুব খুশি হলেন এবং ভাবলেন আগের দিনের প্রস্তাব সঠিক ছিল। তার সাথে কেউ প্রতারণা করেনি। তিনি প্রতিশ্রুতি মোতাবেক দুই দিনার পেয়ে গেছেন। তিনি এক দিনার গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিলেন আর এক দিনার নিজের কাছে রাখলেন। কিন্তু পরের দিন তিনি ঘুম থেকে উঠে বালিশের নিচে আর ঐ দুই দিনার পেলেন না। তাই তিনি আবারও গাছটি কাটার জন্য কুড়াল নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

আবারও বৃদ্ধ মানুষরূপী শয়তানের সাথে তার দেখা হলো। শয়তান তাকে প্রশ্ন করল, "আপনি কি করতে যাচ্ছেন?” ধার্মিক মানুষটি উত্তর দিলেন, "আজ আমি গাছ কাটবই।” শয়তান আগের বারের মতো এবারও তাকে বলল, "আল্লাহ আপনাকে এই গাছটি কাটার দায়িত্ব দেননি। আপনি বরং বাসাতে চলে যান।" ধার্মিক লোকটি একমত হলো না। তিনি আবারও শয়তানের সাথে মারামারিতে লিপ্ত হলেন। কিন্তু এবার শয়তান তাকে পরাস্ত করে ফেলল।

শয়তানের কাছে এভাবে হেরে যাওয়ায় ধার্মিক লোকটি বেশ অবাক হলেন। তিনি শয়তানকেই প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা ঐদিন আমি তোমাকে হারাতে পারলাম, আজ কেন পারলাম না?” শয়তান উত্তরে বলল, “কেউ যদি নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো ভালো কাজ করে তাহলে তাকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারে না। কিন্তু যদি কেউ দুনিয়াবি কোনো স্বার্থে বা পার্থিব কোনো ফায়দা হাসিলের জন্য কোনো ভালো কাজ করে তাহলে তার শক্তি কমে যায় এবং সে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।”

কেন এই ধার্মিক মানুষটি প্রথম দিন শয়তানের সাথে লড়াইয়ে বিজয়ী হলো কিন্তু দ্বিতীয় দিন এভাবে হেরে গেল? এর কারণ হলো প্রথম দিন এই ধার্মিক লোকটির উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য গাছটি কেটে ফেলা, আর কিছু নয়। কিন্তু দ্বিতীয় দিন তার নিয়ত পাল্টে যায়। সেদিন তিনি বের হয়েছিলেন বাড়তি কিছু দিনার পাওয়ার লোভে। তাই নিজের ভেতর তিনি প্রথম দিন যে আধ্যাত্মিক শক্তিটুকু অনুভব করেছিলেন, দ্বিতীয় দিন গিয়ে তিনি আর তা পাননি।

নিয়তের শুদ্ধতা এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কাজ করা খুব জরুরি। যদিও আমাদের মধ্যে অনেকেই এখন এতোটা আন্তরিকতা ও সততার সাথে কাজ করতে পারেনা। প্রদর্শন করার ইচ্ছা এবং দুনিয়াবি সুযোগ সুবিধাই আমাদের অনেকের মূল উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে। তবে এখনো যদি খুলুসিয়াতের সাথে, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় তাঁর নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করা যায় তাহলে বরকত যেমন পাওয়া যাবে, তেমনি সফলতাও অনেকখানি নিশ্চিত হয়ে যাবে।

📘 আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত যারা 📄 আফ্রিকা জয়ী জাফর আত তাইয়্যার (রাঃ)

📄 আফ্রিকা জয়ী জাফর আত তাইয়্যার (রাঃ)


রাসূল (সা) যখন মক্কায় ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন, তখন মক্কার তৎকালীন নেতারা তার বিরুদ্ধে ভীষণভাবে উঠে পড়ে লাগলো। তারা তাঁর সম্পর্কে নানা ধরনের আজেবাজে প্রচারণা চালাল। তারা বলে বেড়ালো, "মুহাম্মাদ একজন পাগল, সে একজন ভালো জাদুকর। জাদুটোনা দিয়েই সে মানুষকে ইসলামের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।”

পাশাপাশি মক্কার নেতারা নবি মুহাম্মাদ (সা) কে ঘুষ বা লোভনীয় নানা সুযোগ সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে ইসলামের দাওয়াতি কাজ থেকে বিরত রাখারও চেষ্টা করল।

কিন্তু কোনো কিছু করেই যখন তাকে থামানো গেল না, তখন নিজেদের এতো দিনের তৈরি করা সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো না ভেঙ্গে পড়ে- এই আশঙ্কায় মক্কার জালেম কর্তৃপক্ষ নবিজির (সা) উপর নানাভাবে অত্যাচার, নির্যাতন শুরু করল। বিশেষ করে যারা সে সময় রাসূলের (সা) আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করত, তাদের উপর জুলুমের মাত্রা ছিল অবর্ণনীয়।

কঠিন এই সময়গুলোতে রাসূল (সা) তাঁর শ্রদ্ধেয় চাচা আবু তালিবের কাছ থেকে যথেষ্ট নিরাপত্তা, আশ্রয় ও সমর্থন পেয়েছিলেন। আবু তালিব সবসময় চেষ্টা করতেন তার ভাতিজার পাশে দাঁড়ানোর জন্য। সব ধরনের বিপদ ও আশঙ্কা থেকে তিনি নবি মুহাম্মাদ (সা) কে রক্ষা করার চেষ্টা করতেন। আবু তালিবের সব সন্তানই একে একে ইসলাম গ্রহণ করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আগে ইসলাম গ্রহণ করেন হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা)। এরপর আবু তালিবের বড় ছেলে জাফর ইবনে আবু তালিব (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। এর কিছুদিন পর আরেক ছেলে আকিল ইবনে আবু তালিবও (রা) ইসলামকে জীবন বিধান হিসেবে কবুল করে নেন।

কাফেরদের অত্যাচার খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে সীমা ছাড়িয়ে গেল। পরিস্থিতি এতোটাই দূর্বিষহ হয়ে উঠল যে, মক্কায় বসবাস করাই যেন অসম্ভব হয়ে পড়ল। তখন বাস্তবতার প্রয়োজনে রাসূল (সা) এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি কিছু সংখ্যক সাহাবিকে লোহিত সাগরের অপর পারের দেশ আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়ায়) হিজরত করার নির্দেশ দিলেন। তার এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কিছু সাহাবির জীবন যেমন রক্ষা পেল ঠিক তেমনি ভিন্ন আরেকটি দেশে ইসলামের সুমহান বার্তা পৌঁছে যাওয়ার একটি সুযোগও তৈরি হলো।

এই কঠিন কাজটি সম্পাদন করার জন্য হযরত মুহাম্মাদ (সা) ভরসা রাখলেন তার চাচাতো ভাই এবং আবু তালিবের সন্তান হযরত জাফর বিন আবু তালিবের (রা) উপর। হযরত জাফর (রা) রাসূলের (সা) হুকুমের আনুগত্য করলেন শতভাগ নিষ্ঠার সাথে। তিনি বেশ কিছু সংখ্যক পুরুষ ও নারী সাহাবিকে নিয়ে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে আবিসিনিয়ায় পৌঁছলেন। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরতের ঘটনা এটাই। রাসূলের (সা) নবুওয়াত প্রাপ্তির ৫ বছরের মাথায় আবিসিনিয়ায় হিজরতের ঘটনা ঘটে। সাহাবিদের এই দলে ৮২ জন পুরুষ ও ৮০ জন নারী সাহাবি শামিল ছিলেন।

আবিসিনিয়ায় পৌঁছে হযরত জাফর (রা) ও তার সঙ্গীরা আবিসিনিয়ার রাজা নাজ্জাশীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। নাজ্জাশী হযরত জাফরের (রা) জ্ঞান, আচার-আচরণ, ব্যবহার ও বিনয়ে ভীষণভাবে বিমোহিত হন। ফলশ্রুতিতে হযরত জাফর (রা) এবং তার নেতৃত্বে থাকা মুহাজির সাহাবিদের আবিসিনিয়ায় সম্মানের সাথেই বরণ করে নেয়।

কিন্তু কাফেররা তো মুসলমানদের এতো সহজে ছেড়ে দিতে পারে না। মুসলমানরা আবিসিনয়ায় ভালো সম্বর্ধনা পেয়েছে এই সংবাদটি পেয়ে তারাও মুসলমানদের পিছু পিছু আবিসিনিয়ায় চলে গেল। কুরাইশদের প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ বিন রাবিহ এবং আমর বিন আসের নেতৃত্বে বেশ কিছু কুরাইশ সদস্য দামি দামি সব উপহার নিয়ে নাজ্জাশীর দরবারে গিয়ে হাজির হলো। দরবারে প্রবেশ করেই কুরাইশরা নাজ্জাশীর সামনে সিজদায় অবনত হলো এবং রাজার জন্য নিয়ে আসা সব উপহার তার সামনে উপস্থাপন করল।

কুরাইশরা বলল, "আমাদের দেশে হঠাৎ করেই একজন মানুষ নতুন একটি ধর্মের প্রচার শুরু করেছে। তার ডাকে কিছু মানুষ সাড়াও দিয়েছে। আমরা তাদেরকে বিরত রাখার এবং প্রতিহত করার সব চেষ্টাই করেছি। এরই মধ্যে, নতুন ধর্মগ্রহণকারীদের কয়েকজন আবার এসে আপনার দেশে আশ্রয় নিয়েছে। আমরা আপনাকে অনুরোধ করছি, আপনি তাদের বের করে দিন নতুবা আমাদের হাতে তাদেরকে ছেড়ে দিন।"

রাজা নাজ্জাশী উত্তরে বললেন, “আমি ইতোমধ্যে তাদের নিরাপত্তা ও আশ্রয় দিয়েছি। তাই এখনি তাদেরকে বের করে দেয়া সম্ভব নয়।” এরপর তিনি তার দরবারে আগত মুসলমান সাহাবিদের ডেকে পাঠালেন।

হযরত জাফর (রা) বেশ কয়েকজন সাহাবি নিয়ে রাজা নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হলেন। তিনি একবারের জন্যও নাজ্জাশীর সামনে সিজদা দিলেন না। দরবারে উপস্থিত অন্য সবাই তখন হযরত জাফর (রা) ও অন্যান্য মুসলমানদেরকে ভর্ৎসনা করল। তারা জানালেন রাজাকে সিজদা না করে তাঁরা অন্যায় করেছেন। কিন্তু হযরত জাফর (রা) তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে সাহাসিকতার সাথে বললেন, “আমরা মুসলমান, আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারও সামনে মাথা নত করি না। আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সিজদা করি না।”

রাজা নাজ্জাশী ছিলেন একজন ধার্মিক খ্রিষ্টান। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে, ঐশ্বরিক কোনো ধর্মেই মানুষকে সিজদা দেয়ার বিধান নেই। তিনি অন্যদের মতো রেগে না গিয়ে বরং হযরত জাফরকে (রা) তার পাশের আসনে বসতে বললেন। তিনি কুরাইশদের দেখিয়ে হযরত জাফরকে (রা) উদ্দেশ্য করে বললেন, “এই মানুষগুলো আপনাদের নিজেদের দেশ থেকেই এসেছে। তারা আপনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে যে, আপনারা নাকি বাপ-দাদার পুরনো ধর্ম ছেড়ে, সব ধরনের মূর্তিপূজা ছেড়ে দিয়ে নতুন এক স্রষ্টার ইবাদত শুরু করেছেন?"

হযরত জাফর বিন আবু তালিব (রা) খুব বলিষ্ঠভাবে উত্তর দিতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, “হে বাদশাহ নাজ্জাশী, আমরা এতোদিন গভীর অন্ধকার আর অজ্ঞতার চোরাবালিতে ডুবে ছিলাম। আমরা মূর্তিপূজা করতাম, বেহায়াপনা ছিল আমাদের নিত্যসঙ্গী। আমরা মৃত প্রাণীর গোশত খেতাম। আমরা আমাদের প্রতিবেশির হক নষ্ট করতাম। ঠিক এমনই এক সময়ে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের মাঝে একজন মানুষকে পাঠালেন যিনি বিশুদ্ধ, সৎ এবং বিশ্বস্ত চরিত্রের অধিকারী। তিনি আমাদের এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানালেন। বললেন, আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করা যাবে না। তিনি আমাদের মূর্তিপূজা করতে নিষেধ করলেন। সবসময় সত্য কথা বলার আদেশ দিলেন, অন্য সবার আমানত ও বিশ্বাস হেফাজত করার শিক্ষা দিলেন। তিনি আমাদেরকে প্রতিবেশি ও আত্মীয়দের প্রতি দরদী হওয়ার আহ্বান জানালেন। তিনি নারীদের নিয়ে কটু ও অশ্লীল কথা বলা নিষিদ্ধ করলেন। সব ধরনের পাপ থেকে দূরে থাকার অনুরোধ করলেন, নিয়মিত ইবাদত করার তাগিদ দিলেন। দান-সাদকা বাড়ানোর পরামর্শ দিলেন এবং রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।”

এসব কথা শোনোর পর রাজা নাজ্জাশী হযরত জাফরকে (রা) পবিত্র কুরআন থেকে কিছু অংশ তেলাওয়াত করতে বললেন। জাফর (রা) বিসমিল্লাহ বলে সূরা মারিয়ামের বেশ কয়েকটি আয়াত পড়ে শোনালেন। তার সুমিষ্ট কণ্ঠের তেলাওয়াত নাজ্জাশীর কর্ণকুহরে প্রবেশ করা মাত্রই তিনি মোহিত হয়ে গেলেন। তার দুচোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি ঝরতে লাগল। সূরা মারিয়ামের ঐ আয়াতগুলোতে যখন হযরত ঈসাকে (আ) নিয়ে কিছু কথা বলা হলো, তখন খ্রিষ্টান ধর্মে বিশ্বাসী নাজ্জাশী বুঝতে পারলেন যে, হযরত জাফর (রা) যে ধর্মের কথা বলছেন তা ই আসলে সত্য ধর্ম। কারণ কুরআনে যা বলা হয়েছে, তার সাথে পূর্বে নাজিল হওয়া আসমানি কিতাব তাওরাত ও ইনজিলের (বাইবেল) ব্যাপক মিল রয়েছে। নাজ্জাশী একজন ধার্মিক খ্রিষ্টান হওয়ায় আগে থেকেই বিষয়গুলো জানতেন। তিনি সঠিক বিষয়টি যথার্থই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।

তিনি কুরাইশদের আবেদন খারিজ করে দেন এবং আমর বিন আসকে বলেন যাতে তারা তাদের উপহারগুলো ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আমর বিন আস দরবার ত্যাগ করলেন ঠিকই তবে তার মনে তখনো দুষ্টু বুদ্ধি খেলা করছিল। তিনি খুব ভালোভাবে জানতেন যে, খ্রিষ্টানরা হযরত ঈসাকে (যিশু) আল্লাহর ছেলে মনে করলেও মুসলমানরা তা করে না। তাই এই বিষয়টি যদি নাজ্জাশীর সামনে প্রমাণ করা যায় তাহলে হয়তো তিনি মুসলমানদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তাদেরকে দেশ থেকে বের করে দিবেন।

সেই ভাবনা থেকেই আমর বিন আস পরের দিন আবার নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হলেন। তিনি নাজ্জাশীকে অনুরোধ করলেন, যাতে তিনি মুসলমানদের প্রশ্ন করেন তারা হযরত ঈসাকে (আ) কিভাবে বিবেচনা করে।

নাজ্জাশী আবারও মুসলমানদের ডেকে পাঠালেন। হযরত জাফরের (রা) নেতৃত্বে মুসলমানরা এসে পৌঁছলে তাদেরকে আবারও দরবারে রাজকীয় সম্বর্ধনা জানানো হয়। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে নাজ্জাশী এবার হযরত জাফরকে (রা) প্রশ্ন করলেন, "হযরত ঈসাকে (আ) নিয়ে আপনাদের নবি মুহাম্মাদ (সা) কি মন্তব্য করেছেন? তার ব্যাপারে আপনাদের মূল্যায়নই বা কী?"

সঙ্গে থাকা মুসলমানরা রাজার এই প্রশ্নে বেশ ঘাবড়ে গেলেন। তারা ভাবলেন জাফর (রা) যদি সন্তোষজনক উত্তর না দিতে পারেন তাহলে হয়তো নাজ্জাশী তাদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাদেরকে আবার কাফেরদের হাতে তুলে দেবে। কিন্তু হযরত জাফর (রা) ছিলেন খুবই ধৈর্য্যশীল ও ঠাণ্ডা মস্তিষ্কের মানুষ। তিনি নাজ্জাশীর সামনে পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ১৭১ নং আয়াত তেলাওয়াত করে শোনালেন। এই আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর বাণী যা তিনি প্রেরণ করেছেন মরিয়মের নিকট এবং তাঁরই কাছ থেকে আগত রূহ। অতএব, তোমরা আল্লাহকে এবং তার রাসূলগণকে মান্য কর।"

এ আয়াত পাঠ করায় নাজ্জাশী খুব খুশি হলেন। সন্তুষ্টচিত্তে তিনি বললেন, “আমাদের মূল যে ধর্মগ্রন্থ ইনজিল, তাতেও ঠিক এরকমই বলা আছে।” এরপর তিনি আমর বিন আস ও তার কুরাইশ সঙ্গীদের আবিসিনিয়া থেকে বহিষ্কার করেন। শুধু তাই নয়, তখন থেকেই ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি নাজ্জাশীর আস্থা ও ভালোবাসা বহুগুণে বেড়ে যায়।

এভাবেই হযরত জাফর বিন আবু তালিব (রা) ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকলেন। রাসূল (সা) মদিনায় হিজরতের পর তিনি মদিনায় চলে আসেন। তবে মদিনায় আসার পূর্বে দীর্ঘ ১৫ বছর তিনি গোটা আবিসিনিয়ায় ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px