📘 আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত যারা 📄 আল্লাহ ও রাসূলই (সাঃ) আমার জন্য যথেষ্ট

📄 আল্লাহ ও রাসূলই (সাঃ) আমার জন্য যথেষ্ট


বাইজান্টাইন সেনাবাহিনী মুসলমানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
এমন একটি খবর দ্রুত বেগে মদিনাসহ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল। বাইজান্টাইনরা এবার সিদ্ধান্ত নিয়েই মাঠে নেমেছে। তারা মুসলমানদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করেই ফিরবে। কিন্তু রাসূল (সা) এসব কোনো সংবাদেই ঘাবড়াননি। তিনি জানতেন ও বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ তায়ালা যদি সাহায্য করেন তাহলে বিশাল সংখ্যার বাইজান্টাইন বাহিনীকে মুসলমানরা সহজেই হারিয়ে দিতে পারবে।

বাইজান্টাইন বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য রাসূল (সা) জিহাদের ডাক দিলেন। তিনি সকল মুসলমানকে আল্লাহর পথে নিজেদের সর্বোচ্চ কুরবানি দেয়ার আহ্বান করলেন। বাইজান্টাইনরা এবার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী বাহিনী তৈরি করেছে। তাদেরকে প্রতিরোধের জন্য মুসলমানদেরও ব্যাপক পরিমাণে তলোয়ার, ঢাল ও অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জামাদির প্রয়োজন হবে। তাছাড়া তখন গ্রীষ্মকাল, প্রচণ্ড রোদ। এরকম প্রতিকুল সময়ে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে অভিযানে যেতে হলে মুসলমানদের অনেক বেশি পানিরও প্রয়োজন পড়বে।

এখন প্রশ্ন হলো কারা নবিজির (সা) ডাকে সাড়া দেবে? আর কয়েকদিন পরই ফসল কাটার মৌসুম। এই সময়ে কে আবার যুদ্ধে যেতে চাইবে? কে-ই বা নিজের বাসায় পরিবারের সাথে একান্তে সময় কাটানোর সুযোগ ছেড়ে এরকম একটি বিশাল শত্রুবাহিনীকে মোকাবেলা করতে চাইবে? কিংবা কে-ই বা নিজেদের অর্থ ও সম্পদ দান করে ত্যাগ স্বীকার করতে চাইবে?

মুসলমানদের মধ্যে যারা ততটা আন্তরিক নন, ততটা সাহসী নন তারা এই যুদ্ধে যেতে সাহস পেলেন না। কিন্তু সত্যিকার অর্থে যাদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) উপর পূর্ণ বিশ্বাস আছে তারা যে কোনো কিছু করতে এমনকি বড় আকারের ঝুঁকি নিতেও আগ্রহী ছিলেন।

হযরত উমর (রা) ছিলেন এরকমই উন্নত মানসিকতা আর দৃঢ় ঈমানের অধিকারী একজন সাহাবি। রাসূলের (সা) জিহাদের ডাক শুনে তিনি ভাবলেন, “এটাই তো আমার জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ। আমি আল্লাহকে কতটা ভালোবাসি, আল্লাহ তায়ালার প্রতি আমার বিশ্বাস কতটা মজুত, রাসূলের (সা) প্রতি আমি কতটা আন্তরিক, এবার আমি তা-ই প্রমাণ করব।” জিহাদের ডাক শুনে তিনি তাড়াতাড়ি নিজের বাসায় চলে গেলেন। পরিবারের সদস্যদের বললেন, "বাসায় যা আছে সবকিছুকে একত্রিত কর।" একত্রিত করার পর তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "শোন, তোমাদের যার যা কিছু আছে তার অর্ধেক রেখে বাকি অর্ধেক আমাকে দিয়ে দাও। আমি সেই সম্পদগুলো রাসূলের (সা) জিহাদ তহবিলে দান করে দিব।"

এই কথা বলে হযরত উমর (রা) নিজেই সবার আগে তার তলোয়ার আর ঢালগুলো নিয়ে আসলেন। তিনি অর্ধেক নিজের জন্য রেখে বাকি সবটুকু জিহাদের তহবিলের জন্য বরাদ্দ রাখলেন। একইভাবে, তার স্ত্রীও নিজের গয়না আর অন্যান্য সম্পত্তির অর্ধেক জমা দিলেন। এই গয়নাগুলো তার খুব কষ্টের। যখন তারা মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করে আসেন, তখন তিনি কোনো মতে এই সামান্য গয়নাটুকুই সাথে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। স্বামীর অনুরোধে তিনি তার কানের দুলের জোড়াটিও খুলে দিয়ে দিলেন।

হযরত উমর (রা) তাকে বললেন, “তুমি কি শোননি, আমি কি বলেছি? আমি অর্ধেকটা দিতে বলেছি। তুমি কানের দুলের একটা রেখে অপরটা জমা দাও।”
হযরত উমরের (রা) স্ত্রী হাসতে হাসতে বললেন, “প্রিয়তম স্বামী, তুমি জানো না, আমি যদি তোমাকে একটি কানের দুল দেই, তাহলে বাকি দুলটা কেউ কিনবে না। কারণ এগুলো জোড়া হিসেবেই পরতে হয়। আবার আমি যদি একটা দিয়ে অপরটি নিজের কাছে রেখে দিই, তাহলে আমি নিজেও আর দুলটি পরতে পারব না। তাই আমি তোমাকে দুটাই দিয়ে দিলাম।”

নিজের বাড়ি থেকে যতটুকু স্বর্ণ সংগ্রহ হলো তার পরিমাণ বেশ ভালো হওয়ায় হযরত উমর (রা) খুশিই হলেন। তার দুই হাত ভরেই তিনি মূল্যবান সব জিনিসপত্র নিয়ে এবার রাসূলের (সা) কাছে রওনা দিলেন। যতটুকু তিনি হাতে বহন করতে পারলেন না, ততটুকু নিয়ে তার সন্তানরা পেছনে পেছনে আসতে লাগল।

যাত্রাপথে তিনি হযরত আবু বকরকে (রা) দেখতে পেলেন। হযরত উমরের (রা) মতো তিনিও নিজের বাসা থেকে সহায়-সম্পত্তি নিয়ে রাসূলের (সা) কাছে যাচ্ছিলেন। তবে পরিমাণে আবু বকর (রা) খুব বেশি আনতে পেরেছেন বলে হযরত উমরের (রা) কাছে মনে হলো না। অন্তত বাইরে থেকে দেখে তার তেমন ধারণাই হলো।

মনে মনে হযরত উমর (রা) ভাবলেন, “যাক অন্তত একবার আমি আবু বকরকে (রা) ছাড়িয়ে যেতে পেরেছি। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার ক্ষেত্রে অন্তত একবার আমি তাকে পেছনে ফেলতে পেরেছি।” এসব ভাবতে ভাবতে মোটামুটি আনন্দ নিয়েই হযরত উমর (রা) রাসূলের (সা) দরবারে প্রবেশ করলেন।

হযরত উমর (রা) নিজের ও সন্তানদের বহন করা যাবতীয় মালামাল রাসূলের (সা) সামনে রাখলেন আর বললেন, "আপনার আহবানের প্রতিক্রিয়ায় এই হলো আমার সামান্য অবদান। আপনি আল্লাহর রাস্তায় যে কোনো ভাবে আমার এই সম্পদগুলো ব্যবহার করতে পারেন।"

রাসূল (সা) হযরত উমরের (রা) ভূমিকায় খুবই সন্তুষ্ট হলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, “হে উমর, আপনি আপনার নিজের ও পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছেন?" রাসূলের (সা) মনে এরকম প্রশ্ন এলো, কেননা হযরত উমর (রা) এতো বেশি মালামাল নিয়ে এসেছিলেন যে, রাসূল (সা) আশঙ্কা করছিলেন হযরত উমর (রা) তাঁর পরিবারকে না আবার ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেন। তারা না আবার অভাবে পড়ে যায়।

হযরত উমর (রা) নবিজিকে (সা) আশ্বস্ত করে বললেন, “আপনি উদ্বিগ্ন হবেন না। তাদের কাছেও যথেষ্ট আছে।”

রাসূল (সা) আবার প্রশ্ন করলেন, “যথেষ্ট আছে বুঝলাম, কিন্তু কতটুকু?"

হযরত উমর (রা) উত্তর দিলেন, "আমি আপনার সামনে যতটুকু হাজির করেছি ততটুকুই। আমি আমার যাবতীয় সম্পদকে দুইভাগে ভাগ করেছি। একভাগ নিজেদের কাছে রেখেছি আর অপর ভাগ আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেয়ার জন্য নিয়ে এসেছি।" রাসূল (সা) এবার সন্তুষ্ট হলেন।

এবার হযরত আবু বকর (রা) সামনে এগিয়ে এলেন। তিনি তার ছোট ব্যাগটি রাসূলের (সা) সামনে রাখলেন। রাসূল (সা) যে প্রশ্নটি হযরত উমরকে (রা) করেছিলেন সেই একই প্রশ্ন হযরত আবু বকরকেও (রা) করলেন। বললেন, “হে আবু বকর, আপনি আপনার নিজের ও পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছেন?"

আবু বকর (রা) এদিক ওদিক তাকাতে থাকলেন। তিনি প্রশ্নের উত্তরটি সরাসরি না দিয়ে বরং এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। আবার তিনি রাসূলের (সা) কাছে কিছু গোপনও করতে চাইছিলেন না। তিনি অনেক ভেবে উত্তর দিলেন, “তাদের আছে, তাদের নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। আমি তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকেই (সা) রেখে এসেছি। আমাদের পরিবারের কাছে সব মিলিয়ে যা ছিল, আমি পুরোটাই আপনার সামনে হাজির করেছি।”

রাসূল (সা) মৃদু হেসে তার ঘনিষ্ঠ সাহাবি ও বন্ধু আবু বকরের (রা) দিকে তাকালেন। এভাবেই আবু বকর (রা) আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনে এবং নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে থাকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। ইসলাম গ্রহণের পর একেবারে প্রথম দিন থেকেই হযরত আবু বকর (রা) সবসময়ই নিজের সবটুকু রাসূলের (সা) জন্য বিলিয়ে দিতে শুরু করেন। তিনি হলেন সেই সৌভাগ্যবান মানুষ, যিনি রাসূলের (সা) মদিনায় হিজরতের সময় তার সফরসঙ্গী হিসেবে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। হযরত উমর (রা) এই ঘটনার পর অনেকটা লজ্জিত হয়েই বাসায় ফিরে আসলেন। তিনি স্বীকার করলেন, “আবু বকর (রা) আরো একবার প্রমাণ করলেন যে, তিনি আমার চেয়ে কত ভালো মানুষ, কত ভালো মানের মুসলমান। আল্লাহ ও রাসূলের (সা) প্রতি আবু বকরের (রা) যে আনুগত্য, ভালোবাসা ও ত্যাগ- তা সীমাহীন। তার তুলনা শুধু তিনি নিজেই।"

📘 আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত যারা 📄 আবু তালহা (রাঃ) ও এক সুন্দর পাখি

📄 আবু তালহা (রাঃ) ও এক সুন্দর পাখি


রাসূল (সা) তখন মদিনায় বসবাস করেন। সেখানে আবু তালহা (রা) নামে একজন সাহাবি ছিলেন। আবু তালহা (রা) নিজেকে মদিনার সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি মনে করতেন, কারণ তার একটি চমৎকার বাগান ছিল। এতো সুন্দর ও মনোহর বাগান মদিনায় আর কারো ছিল না। বাগানে স্বচ্ছ ও শীতল পানির একটি ঝরণাধারা ছিল। চলমান এই পানির স্রোতধারার কারণেই বাগানটি সবসময় সবুজ, সজীব ও প্রাণবন্ত থাকত।

আবু তালহার (রা) কাছে দিনের সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্ত ছিল বিকেল বেলা। যখন তিনি তার প্রিয় বাগানে আসরের নামাজ আদায় করতেন। মাথার উপর দিয়ে হালকা মৃদু বাতাসে দোল খাওয়া খেজুর গাছের পাতা আর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির শব্দ, সব মিলিয়ে এক অসাধারণ পরিবেশ ছিল সেখানে। বাগানের এই চমৎকার পরিবেশের জন্যেই আবু তালহা (রা) বাগানের ভেতরেই নামাজ পড়তে পছন্দ করতেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে যে অফুরন্ত নিয়ামত দান করেছেন, আবু তালহা (রা) একবারের জন্যেও তা ভুলে যেতেন না। তাই সব অবস্থাতেই তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন।

অন্যসব দিনের মতোই একদিন বিকেলে আবু তালহা (রা) আসরের নামাজ আদায় করার জন্য তার জায়নামাজ নিয়ে বাগানের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞ একটি মন নিয়ে বিনয়ের সাথে তিনি নামাজে দাঁড়ালেন। তিনি যখনই তেলাওয়াত শুরু করলেন, তখনই গাছের পাতার নড়াচড়া আর পানি প্রবাহের চিরচেনা শব্দের পাশাপাশি আরেকটি শব্দ তার কানে প্রবেশ করল। তার মাথার উপর দিয়ে মনকাড়া কিচিরমিচির শব্দ তাকে রীতিমতো বিমোহিত করে ফেলেছিল। মনের অজান্তেই তার চোখ খুলে গেল। সামনে থাকা খেজুর গাছের ডালের উপর তিনি একটি পাখি দেখতে পেলেন। তার মনে হলো পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর পাখি আর নেই। পাখির ডানা ছিল পান্নার মতো সবুজ। আর এর পালক আর লেজটা ছিল ডালিমদানার মতো লাল টকটকে। মাথা ছিল সোনালি বর্ণের। ঠোঁটটাও ছিল অনেক বেশি আকর্ষণীয়। আর ঠোঁটের ভেতর থেকেই অপূর্ব ধ্বনির সেই কলতান ভেসে আসছিল।

আবু তালহা (রা) মুগ্ধতায় ডুবেছিলেন। তিনি পাখিটির দিকে এমনভাবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন যে, তিনি একরকম ভুলেই গিয়েছিলেন যে তিনি কোথায় আছেন বা তিনি কোন কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছেন। যখন তার মনে পড়ল, তিনি ভীষণ লজ্জিত হলেন এবং আবার নামাজে মনোনিবেশ করলেন। যেখানে তিনি তেলাওয়াত থামিয়ে দিয়েছিলেন, আবার সেখান থেকেই তিনি তেলাওয়াত শুরু করলেন। এরপর তিনি স্বাভাবিকভাবেই নামাজ শেষ করলেন। কিন্তু ততক্ষণে পাখিটি উড়ে চলে গেছে।

কিন্তু উড়ে গেলেই বা কি! পাখিটিরও এই বাগানটা ভীষণ পছন্দ হয়েছিল। এতো সুন্দর বাগান, যেখানে চাইলেই বীজদানা খাবার হিসেবে পাওয়া যায়, আবার ঝরণাধারাও আছে। পাখির বাসা বানানোর জন্য এর চেয়ে উত্তম জায়গা আর হতেই পারে না।

পরের দিন আবার আবু তালহা (রা) জায়নামাজ নিয়ে বাগানে তার প্রিয় খেজুর গাছের নিচে এসে দাঁড়ালেন এবং নামাজ শুরু করলেন। কিন্তু আজ তিনি খেয়াল করেননি যে তাঁরই মাথার উপর গাছের ডালে পাখিটি নিজের বাসা তৈরি করে নিচ্ছে। একটু পরই পাখিটি আবারও মিষ্টি সুরে গান গাইতে শুরু করল। আবারও আবু তালহা (রা) নামাজে তাঁর মনোযোগ হারিয়ে ফেললেন। তিনি আবার চোখ খুলে সেই অদ্ভুত সুন্দর পাখিকে দেখতে পেলেন। পাখিটি এক ডাল থেকে অন্য ডাল লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে আর কিচিরমিচির সুরে গান গাইছে।

কিন্তু এবার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আবু তালহা (রা) ঘোর থেকে বাস্তবে চলে এলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, “আমি এটা কি করছি? আমি কোন রাকাতে ছিলাম, দ্বিতীয় রাকাতে নাকি তৃতীয় রাকাতে?” কিছুতেই তিনি নিশ্চিতভাবে তা মনে করতে পারলেন না। তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। কোনো মতে নামাজ শেষ করলেন। নীরবে জায়নামাজ গুটিয়ে নিয়ে বাগান থেকে বেরিয়ে গেলেন।

আবু তালহা (রা) এরপর অনেকক্ষণ শুধু ভেবেই গেলেন। তিনি চিন্তা করলেন, কিভাবে তাঁর নামাজ আল্লাহর কাছে পৌঁছবে যেখানে তিনি নিজেই ভুলে যান যে তিনি কোন রাকাতে ছিলেন? তাঁর মন যদি বাগান, বাগানের সৌন্দর্য, পাখির গান আর ঝরণাধারার প্রতি এতোটাই মোহবিষ্ট হয়ে থাকে তাহলে তিনি কিভাবে আল্লাহকে স্মরণ করবেন?

আবু তালহা (রা) ছিলেন খুবই উন্নতমানের একজন মুসলমান। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে, একজন মুসলমানের জন্য নামাজ কতটা জরুরি। তিনি নিশ্চিতভাবেই জানতেন যে, নামাজে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো বিষয়ের প্রতি মনোযোগ রাখা যায় না। কিন্তু এই সমস্যা থেকে কিভাবে বাঁচবেন তাও তিনি বুঝতে পারছিলেন না।

সেই রাতেই তিনি নবিজির (সা) কাছে চলে গেলেন। নবিজিকে (সা) তিনি তাঁর বাগান, বাগানের সৌন্দর্য, পাখির গান আর ঝরণাধারার বিষয়ে বিস্তারিত সব জানালেন। তিনি বললেন, “হে রাসূলুল্লাহ (সা), আমি আমার নামাজ, আমার ইবাদতের সময় অন্য কিছুকে বাঁধা হিসেবে মেনে নিতে পারব না। যেগুলো আমার নামাজের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, সেগুলো বরং না থাকলেই ভালো। আপনি দয়া করে আমার বাগানটির দায়িত্ব গ্রহণ করুন। আমি আজ এই মুহূর্ত থেকে আমার বাগানটি আপনাকে দিয়ে দিলাম। মদিনার মুসলমানরা এখন থেকে এই বাগান ব্যবহার করতে পারবে। এর যে কোনো ফল, ফলাদি ও অন্যান্য সামগ্রী নিজেদের প্রয়োজনে বিক্রিও করতে পারবে।”

রাসূল (সা) খুব সন্তুষ্ট মনে আবু তালহার (রা) এই উপহার গ্রহণ করলেন। তারপর থেকে আর কখনোই নামাজ আদায় করতে গিয়ে আবু তালহার (রা) মনোযোগ ছুটে যায়নি। আর তখন থেকেই তাঁর নামাজও আল্লাহ তায়ালা আরও খুশি মনে কবুল করে নিলেন। সুবহানআল্লাহ।

📘 আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত যারা 📄 জ্ঞানী এক শিষ্যের গল্প

📄 জ্ঞানী এক শিষ্যের গল্প


হাজার বছর আগের বাগদাদ ছিল উজ্জ্বল, ঝকমকে, সম্পদশালী আর বিলাসিতার এক নগরী। যে সময়ের কথা বলছি, তখন বাগদাদ ছিল তৎকালীন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী।

আর খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন বিশ্বখ্যাত শাসক হারুনুর রশিদ। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ী আর বণিকেরা দলে দলে স্বর্ণালংকার, সুগন্ধীসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে বাগদাদ শহরে আসতেন। তারা বাগদাদে আসতেন ব্যবসা করার জন্য। আর বাগদাদের অধিবাসীরাও এতোটা স্বচ্ছল ছিল যে তারাও অবলীলায় মূল্যবান সেসব প্রসাধনী আর সুগন্ধী কিনে নিজেদের সুন্দর করে তোলার খায়েশ পূরণ করত।

এই সব দুনিয়াবি ভোগ বিলাস আর বৈভবের বাইরেও বাগদাদের আরেকটি চেহারা তখন দৃশ্যমান ছিল। পুরো পৃথিবীর মধ্যে বাগদাদই ছিল তখন সবচেয়ে বড় শিক্ষাকেন্দ্র। সব ধরনের শিক্ষাবিদ, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং দার্শনিকরা বাগদাদকে রীতিমতো তীর্থস্থান মনে করত। সে সময় প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার যাবতীয় রচনাবলি ও পুস্তক আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হয়।
অনুবাদকদের সম্মানও ছিল অনেক বেশি। জানা যায়, একটি বই আরবিতে অনুবাদ করার পর সেই বইটির যত ওজন হতো, সেই অনুপাতে অনুবাদককে পারিশ্রমিক হিসেবে স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করা হতো।

এতোসব জ্ঞানী আর পণ্ডিত লোকের মাঝে জুনায়েদ নামে একজন বড় মানের শিক্ষাবিদ ছিলেন। পেশায় ছিলেন তিনি একজন শিক্ষক, মানুষ হিসেবে ছিলেন ভীষণ মানবিক আর চরিত্রের দিক থেকে ছিলেন খুবই উন্নত।

জুনায়েদ পারস্য এলাকার নিহাভান্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন কাঁচের ব্যবসায়ী। তিনি তার চাচা সারি আল সাকাতির কাছেই মানুষ হন। সারি আল সাকাতি নিজ ভ্রাতুষ্পুত্রকে একজন উন্নত মানুষ বানানোর চেষ্টা করেন। জুনায়েদের বয়স যখন মাত্র ১১ বছর, তখন চাচা সারি আল সাকাতি তাকে নিয়ে হজ্জে গমন করেন। সেবার মসজিদুল হারামে তারা প্রায় চারশত জ্ঞানী আলেমের সান্নিধ্য লাভ করেন। এই আলেমরা সবাই মিলে কৃতজ্ঞতা তথা শুকরিয়া আদায় করার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করছিলেন। বালক জুনায়েদ আর তার চাচা নীরবে সেই আলোচনাগুলো শুনছিলেন।

প্রত্যেক আলেমই নিজের মতকে অন্যদের মতের তুলনায় বেশি সঠিক ও নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছিলেন। চাচা সারি আল সাকাতি এই আলোচনায় তার ভ্রাতুষ্পুত্র জুনায়েদকে নিয়ে গিয়েছিলেন কারণ তিনি জানতেন, জুনায়েদ তার বয়সের অন্য যে কারও তুলনায় অনেক বেশি মেধাবী ও জ্ঞানী। তাছাড়া, এতো সব আলোচনার মাঝখানে এই বিষয় নিয়ে জুনায়েদ কি ভাবছে, তা জানারও আগ্রহ ছিল চাচা সারি আল সাকাতির। তাই তিনি গলা একটু ঝেড়ে কাশি দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। সবাই তার দিকে তাকালে চাচা সারি আল সাকাতি বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আপনারা সবাই অনেক মূল্যবান মতামত দিয়েছেন। সবার মতামতই বেশ প্রশংসনীয়। তবে আমি খুব খুশি হব যদি আপনারা দয়া করে আমার ভাতিজার কথা একটু শুনেন। তার বয়স কম হলেও মাঝে মাঝে সে এমন মন্তব্য করে বসে যে আমি রীতিমতো বিস্মিত হয়ে যাই। তো বাবা জুনায়েদ, তুমি কি মনে কর? সত্যিকারের কৃতজ্ঞতাবোধ কি?”

ঐ বৈঠকে যতজন আলেম ছিলেন, তারা সবাই চাচার কর্মকাণ্ডে বেশ অবাক হলেন। তারপরও তারা সেই ছোট্ট জুনায়েদের দিকে তাকালেন এবং তাকে তার মতামত প্রকাশ করার জন্য উৎসাহ দিলেন। জুনায়েদ অবশ্য এই পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে না গিয়ে বেশ ভালোভাবেই সামাল দিয়েছিল। সে খুব পরিষ্কার কণ্ঠে বলল, "কৃতজ্ঞতাবোধ বলতে আমি যা বুঝি তাহলো, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে যে নেয়ামত দান করেছেন, আমরা তার অপব্যবহার করব না। এই নেয়ামত পাওয়ার পর আমরা আবার নাফরমানিতে ডুবে যাব না। আল্লাহর প্রতি অবাধ্য হবো না। সব সময় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।"

উপস্থিত সকল বিজ্ঞ আলেম এই অল্পবয়স্ক ছেলেটির পরিণত উত্তরে অবাক হয়ে গেলেন। চাচা সারি আল সাকাতি বেশ প্রশান্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন আর বললেন, “জুনায়েদ, আমার মনে হয় তোমাকে আল্লাহ তায়ালা যে নেয়ামত বেশি দিয়েছেন তাহলো তোমার জিহবা, তোমার কথা বলার ক্ষমতা আর অদ্ভুত সুন্দর বাচনভঙ্গি।”

এই ঘটনার অনেক বছর পরের কথা। জুনায়েদ তখন বাগদাদে বসবাস করেন। জুনায়েদের তখন অনেক শিষ্যও হয়ে গেছে। তারা সবাই তার কাছ থেকে নতুন কিছু শিখতে এসেছে। জুনায়েদ ততদিনে নিজের সততা, অনুধাবন ক্ষমতা এবং একনিষ্ঠতার জন্য বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে গেছেন। অনেকে আগে থেকেই শুধুমাত্র জুনায়েদের বক্তব্য শোনার জন্য, আবার যারা তার প্রতি একান্তই অনুগত, তারা তার আবাসস্থলে নিয়মিত থাকতে শুরু করেন। আগত সবার প্রতিই জুনায়েদ ছিলেন সমান দরদি এবং তাদের সবাইকে তিনি একইভাবে শিক্ষা দিতেন। তবে একজন শিষ্য ছিল, যাকে তিনি অন্য সবার চেয়ে একটু আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতেন। কিন্তু অন্যরা বুঝত না কেন তিনি ঐ শিষ্যটাকে এতোটা ভালোবাসতেন। তাদের অনেকেই এই শিষ্যকে হিংসা করতে শুরু করেছিল।

একদিন তারা সিদ্ধান্ত নিল ওস্তাদ জুনায়েদকেই তারা সরাসরি প্রশ্ন করবে কেন তিনি ঐ শিষ্যকে একটু বেশিই ভালোবাসেন। তারা জুনায়েদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ও তো আমাদের সবার মতোই। আমরা ওর মধ্যে আলাদা কিছু দেখতে পাই না। তাহলে আপনি কেন অন্য সবার চেয়ে ওকে একটু বেশি গুরুত্ব দেন?”

জুনায়েদ বললেন, “সে তোমাদের চেয়ে বেশি গুছানো, তোমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানীও বটে। তার ব্যবহারও বেশ উত্তম। সে আল্লাহর প্রতি অনুগত এবং সর্বোপরি সে সমঝদার একটি ছেলে। তোমরা নিজেরাই একদিন বিষয়টা বুঝতে পারবে।”
জুনায়েদ উত্তর দিলেন ঠিকই, তবে তার উত্তরে কেউই সন্তুষ্ট হতে পারল না। জুনায়েদ যে মন্তব্যগুলো করেছে তার কোনোটারই সত্যতা তারা খুঁজে পেল না। যেহেতু তারা ওস্তাদ জুনায়েদকে খুব সম্মান করে তাই তারা বিষয়টা নিয়ে আর উচ্চবাচ্য না করে বরং নীরব হয়ে গেল। জুনায়েদও বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারলেন প্রশ্নকারীরা তার উত্তরে সন্তুষ্ট হয়নি। তিনি তাদের সামনে সত্যটাকে প্রমাণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

পরের দিন সকালে জুনায়েদ তার সকল শিষ্যকে ডেকে পাঠালেন। তারা এসে উপস্থিত হলো। তারা ছিল বিশ জন। এবার জুনায়েদ তাদেরকে বললেন, “তোমরা সবাই পাখির বাজারে যাও এবং প্রত্যেকে ১টি করে ২০টি পাখি নিয়ে এসো।” শিষ্যরা ওস্তাদের কথামতো বাজার থেকে ২০টি পাখি কিনে নিয়ে এলো।

এবার জুনায়েদ তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "আমি চাই প্রথমে তোমরা এমন একটি স্থানে যাও যেখানে কেউ তোমাদের দেখতে পাবে না। তারপর ছুরি নিয়ে যার যার হাতে থাকা পাখি কুরবানী করবে। এরপর সেই পাখি নিয়ে আবার এখানে আসবে। কিন্তু মনে রাখবে, এই ঘটনা যেন কেউ দেখতে বা জানতে না পারে।"

ওস্তাদের কথা অনুযায়ী, প্রত্যেক শিষ্যই একটি করে পাখি নিয়ে চলে গেল এবং অল্প কিছু সময় পরই তারা ফিরে এলো এবং নিজেদের কুরবানী করা পাখি প্রদর্শন করল। ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ ঘরের পেছন থেকে একটি পাখির চিৎকার আর ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ ভেসে আসলো। দেখা গেল, ওস্তাদ জুনায়েদের সেই প্রিয় শিষ্য একটি জীবন্ত পাখি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার জন্য বরাদ্দকৃত পাখি কুরবানী দিতে পারেনি। উল্টো তার চোখে মুখে বিস্ময়, কেন সবাই তাকে নিয়ে এতো হাসাহাসি করছে!!

অন্য সব সহপাঠীরা তখন টিটকারী মারা শুরু করে দিয়েছে। উপহাস করে তারা বলছে, “উনি জ্ঞানী শিষ্য তো, তাই তার কাজ কর্ম একটু আলাদা। এতোটাই আলাদা যে সে এখন ওস্তাদের হুকুমও অমান্য করা শুরু করে দিয়েছে।"

জুনায়েদ নিজেও বিষয়টার সূরাহা করতে চাইলেন। তিনি সেই জ্ঞানী শিষ্যকে কাছে ডাকলেন এবং প্রশ্ন করলেন, “তুমি কেন পাখিটাকে আমার আদেশ মতো কুরবানী করনি?”

এবার সেই শিষ্য উত্তর দিল, "আপনি আমাকে এমন একটি স্থানে পাখি কুরবানী করতে বলেছিলেন, যেখানে কেউ দেখতে পাবে না। কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব? আল্লাহ তো সবই দেখতে পান। আমি কিভাবে তার কাছ কাছ থেকে লুকিয়ে বা আড়াল করে কিছু করব? তাই আমি পাখি কুরবানী করতে পারিনি।”

জুনায়েদ তার উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন এবং অন্যদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “এখন বুঝলে তো, কেন এই শিষ্যকে আমি তোমাদের সবার চেয়ে আলাদা করে দেখি, কেন আমি তাকে জ্ঞানী বলি। তোমরা নিজেদের কার্যক্রমের সাথে ওর আচরণকে মিলিয়ে দেখলেই পার্থক্যটা বুঝে যাবে।”

সব শিষ্যরা এবার নিজেদের ভুল বুঝতে পারল। তারা ওস্তাদ জুনায়েদের কাছে ক্ষমা চাইল এবং অহেতুক জ্ঞানী ঐ শিষ্যকে হিংসা করার জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল।

📘 আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত যারা 📄 আবু হুরায়রা (রাঃ) আর জনৈক বন্দীর গল্প

📄 আবু হুরায়রা (রাঃ) আর জনৈক বন্দীর গল্প


রাসূল (সা:) এর প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা (রা) নিজেই এই গল্পটা এভাবে বর্ণনা করেন:

“একবার রাসূল (সা) আমাকে যাকাতের মজুদ পাহারা দেয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। একদিন নীরবে একজন ব্যক্তি এসে চুপিসারে যাকাতের মজুদ থেকে কিছু খাদ্যদ্রব্য চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি লোকটিকে ধরে ফেলি। আমি এই ঘটনায় খুব মন খারাপও করেছিলাম। কে সেই মানুষ যে কি না যাকাতের তহবিল থেকেও চুরি করে। যাকাতের সবকিছু তো অভাবী আর মজলুমদের জন্যই। সেখান থেকে আবার চুরি কেন করতে হবে?

আমি লোকটাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করতে চাইলাম। তাকে বললাম, “তুমি যাকাতের মজুদ থেকে চুরি করেছ। তোমাকে আমি রাসূলের (সা) কাছে নিয়ে যাব। তিনি যা করার করবেন।”

সে কাচুমাচু হয়ে উত্তর দিল, “না, দয়া করে তেমনটা করবেন না। আমি খুব অভাবী একজন মানুষ। আমাকে অনেক বড় পরিবার টানতে হয়। তাই বাধ্য হয়েই আমি চুরি করতে এসেছি। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন।”

আমি লোকটাকে নিয়ে কিছুটা সময় ভাবলাম। আমার কেমন যেন মায়া হলো। আমি তাকে ছেড়ে দিলাম।

পরের দিন সকালে নবিজির (সা) সাথে যখন আমার দেখা হলো, তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, “হে আবু হুরায়রা, তোমার বন্দি কাল রাতে শেষ পর্যন্ত কি করল?"

আমি তো অবাক হয়ে গেলাম। রাসূল (সা) কিভাবে ঘটনাটা জানলেন? তাকে তো আমি কিছু জানাইনি। তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা কোনো বার্তা দিয়েছেন। যাহোক, এসব ভাবতে ভাবতেই আমি তাকে সব জানালাম। বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, চোরটি আমাকে বলল, তার অনেক বড় পরিবার, অভাবের কারণে সে বাধ্য হয়ে চুরি করেছে। তাই আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছিলাম।"

রাসূল (সা) বললেন, "আবু হুরায়রা, ও তোমাকে মিথ্যা বলেছে। ও আবার চুরি করতে আসবে।”

আমি সাথে সাথেই বুঝলাম সেই চোরের সাথে আমার আবার দেখা হবে। কেননা রাসূল (সা) কখনো ভুল বা মিথ্যা কিছু বলেন না। তাই পরের দিন রাতে আমি আরো বেশি সতর্ক হয়ে সেই চোরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমি এবার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আরেকবার দেখতে পেলে লোকটাকে আমি আটক করবই। সে অভাবীদের জন্য বরাদ্দ খাবার থেকে বারবার চুরি করবে- এটা মেনে নেয়া যায় না।

যথারীতি সে এলো এবং আমি আবারও তাকে হাতেনাতে ধরে ফেললাম। আমি বললাম, "আজ তো আমি তোমাকে অবশ্যই রাসূলের (সা) কাছে নিয়ে যাব। সে ভয়ে কেঁদে ফেলল আর বলল, "আমাকে ছেড়ে দিন, দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আমি খুব হতদরিদ্র একজন মানুষ। আমার পরিবারও বড়। বাধ্য হয়ে আমাকে চুরি করতে হয়। আমি কথা দিচ্ছি, আমাকে ছেড়ে দিলে আমি আর চুরি করব না।"

তার চোখে এতো পানি ছিল যে আমার আবার কেমন যেন মায়া হলো লোকটার উপর। আমি আবারও তাকে ছেড়ে দিলাম।

ভোর বেলায় নবিজির (সা) সাথে আবার আমার দেখা হলো। তিনি প্রশ্ন করলেন, “হে আবু হুরায়রা, তোমার বন্দি কাল রাতে কি করেছে?”

আমি উত্তর দিলাম, “হে রাসূলুল্লাহ (সা), সে আবারও তার অভাব-অনটন এবং পরিবারের বোঝার ইস্যুটিকে সামনে এনেছে। আমার তার প্রতি খুব মায়া হয়েছিল তাই আবারও তাকে ছেড়ে দিয়েছি।” রাসূল (সা) বললেন, “সে আবারও তোমাকে মিথ্যা বলেছে। ও আবারও আসবে।”

রাসূল (সা) এ কথা বলায় তৃতীয় দিন আমি সর্বোচ্চ সতর্ক হয়ে চোরটির জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। এবার আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আবার আসলে তাকে আমি গ্রেফতার করবই। কারণ সে বার বার আমাকে মিথ্যা বলছে। যা হোক, তৃতীয় বারের মতো সে এলো এবং গোপনে খাবার চুরি করতে শুরু করল। আমি এবারও তাকে ধরে ফেললাম আর বললাম, “এবার তোমাকে রাসূলের (সা) কাছে নিতেই হবে। এটাই তোমার শেষ সুযোগ। তুমি ওয়াদা দিয়েছিলে যে আর আসবে না কিন্তু আবার এসেছো। এবার তুমি যা-ই বল, আমি আর তোমাকে ছাড়বো না।” সেই চোরটি উত্তর দিল, “দয়া করে আমাকে যেতে দিন। আমাকে ছেড়ে দিন। আমাকে যদি আপনি এবার ছেড়ে দেন, তাহলে আমি আপনাকে এমন একটা দোয়ার কথা বলব, যা পাঠ করলে আল্লাহ আপনাকে অনেক সওয়াব দেবেন।"

চোরটির এই কথা শুনে আমি বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। আগা গোড়াই নতুন কিছু জানার বিষয়ে আমার আগ্রহ আছে। তাই আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সেই দোয়াটি কি?

সে উত্তর দিল, "আপনি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আয়াতুল কুরসী পাঠ করবেন (পবিত্র কুরআনের সূরা আল বাকারার ২৫৫ নং আয়াত)। যে বান্দা ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসী পাঠ করে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য একজন পাহারাদার নিযুক্ত করেন ফলে শয়তান সকাল অবধি আর সেই বান্দার কাছে আসতে পারে না।”

এটা শুনে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। পরের দিন সকালে রাসূল (সা) আবার আমাকে প্রশ্ন করলেন, “হে আবু হুরায়রা, তোমার বন্দি কাল রাতে তোমার সাথে কি করেছে?”

আমি নবিজিকে (সা) রাতের পুরো ঘটনাটা বর্ণনা করলাম। আমি জানালাম, চোরটি আমাকে নতুন একটি দোয়া শেখানোর কথা বলায় আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি।

রাসূল (সা) আবার প্রশ্ন করলেন, “সে তোমাকে কি বলেছে?” আমি উত্তর দিলাম, লোকটি আমাকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আয়াতুল কুরসী পাঠ করার জন্য বলেছে। এই আয়াতটি পাঠ করলে আল্লাহ নিজে একজন পাহারাদার নিয়োগ দিয়ে গোটা রাতটি জুড়ে আমাকে হেফাজত করবেন। সকাল পর্যন্ত শয়তান আমার কাছে ভিড়তে পারবে না।

রাসূল (সা) বললেন, “এবার সে তোমাকে সত্য কথা বলেছে। শোন আবু হুরায়রা, যদিও সে বরাবরই মিথ্যাবাদী, তবে এবার এই কথাটি সে সত্য বলেছে।”

রাসূল (সা) আরো বললেন, “হে আবু হুরায়রা, তুমি কি জানো, গত তিন রাত কার সাথে তোমার দেখা হয়েছে?” আমি বললাম, “না, আমি জানি না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সা) ভালো জানেন।”

রাসূল (সা) বললেন, “সে ছিল ইবলিশ শয়তান।”

(তথ্যসূত্র: এই বর্ণনাটি সহীহ আল বুখারীতে পাওয়া যায়। এখানে পাঠকের বোঝার সুবিধার জন্য গোটা ঘটনাটিকে গল্পের আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে।)

ফন্ট সাইজ
15px
17px