📘 আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত যারা 📄 আল্লাহর সাথে থাকার বাসনা

📄 আল্লাহর সাথে থাকার বাসনা


রাসূল (সা) তখন মদিনায় থাকেন। মদিনার আশপাশে এবং গোটা আরব জুড়ে আরো বহু গোত্র ও বংশ আছে যারা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি। আল্লাহ তায়ালাকে এক ও অদ্বিতীয় রব এবং হযরত মুহাম্মাদকে (সা) শেষ নবি হিসেবে মেনে নেয়নি। বরং এসব গোত্রের মধ্যে অনেকেই ছিলেন যারা নবিজি (সা) এবং তাঁর সাহাবিদের উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। ভেতরে ভেতরে তারা রাসূলকে (সা) হিংসা করতেন। সবসময় তারা সুযোগ খুঁজতেন যাতে সুযোগ মতো তারা রাসূলকে (সা) তার সঙ্গী সাথীসহ নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারেন। রাসূলের (সা) উপর তাদের রাগ বেশি ছিল। তার কারণেই সবাই ইসলাম গ্রহণ করেছিল আর দেব-দেবতার পূজা করার বদলে আল্লাহর ইবাদত করতে শুরু করেছিল।

এসব গোত্রগুলো সবসময়ই নবি মুহাম্মাদ (সা) এবং তার সাথীদের হত্যা করার জন্য ভীষণ তৎপর থাকত। মদিনায় বসবাসরত মুসলমানদের পক্ষেও ইসলামের দাওয়াতি কাজ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। এমনকি তারা তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ঠিক মতো করতে পারত না। তারা খেজুর উৎপাদন করতে বা মৌসুম শেষে গাছ থেকে খেজুর সংগ্রহ করতে গিয়েও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছিল। ফলে মুসলমানরা ক্রমশ অভাব, দারিদ্রতা আর খাদ্যকষ্টে পড়ে যাচ্ছিল আর এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার মতো কোনো উপায়ও চোখে পড়ছিল না।

মদিনার মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি করছিল মুহারিব ও গাতফান গোত্র। নিতান্ত বাধ্য হয়েই রাসূলকে (সা) তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে এই দুই গোত্রকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু করতে হলো।

এই দুই গোত্রের প্রধান ব্যক্তিরা যখন জানতে পারল নবি মুহাম্মাদ (সা) তার সাহাবিদের নিয়ে তাদের আক্রমণ করার জন্য আসছে, সঙ্গে সঙ্গে তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল এবং লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেল। ময়দানে গিয়ে রাসূল (সা) আর তার সঙ্গীরা শত্রুদের কাউকেই দেখতে পেলেন না। তারা আবার মদিনায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ততক্ষণে রাত হয়ে গিয়েছিল। মুসলমানরা একটি সরু পাহাড়ি উপত্যকায় শিবির স্থাপন করল। রাসূল (সা) সাহাবিদের জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করার নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে তাবু তৈরি করতে এবং রাতের খাবারও প্রস্তুত করতে বললেন। উপত্যকার মুখ দিয়ে যাতে হুট করে শত্রুপক্ষের কেউ প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য রাসূল (সা) প্রবেশ মুখে পাহারা বসানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। মুহাজির সাহাবি আম্মার বিন ইয়াসির (রা) এবং আনসার সাহাবি আব্বাদ বিন বিসরকে (রা) তিনি পাহারা দেয়ার দায়িত্ব দিলেন।

আম্মার ও আব্বাদ (রা) মিলে প্রবেশ মুখের কাছেই একটি চমৎকার জায়গাকে বাছাই করলেন, যেখান থেকে একই সাথে মুসলমানদের বসতি শিবির দেখা যায়, আবার প্রবেশ মুখটাকেও ভালোভাবে লক্ষ্য করা যায়। আব্বাদ (রা) তার সাথে খুবই মূল্যবান জিনিস নিয়ে এসেছিলেন। তার কাছে হরিণের চামড়ার তৈরি একটি কাগজ ছিল, যেখানে তিনি তার প্রিয় সুরাটি লিখে এনেছিলেন। কাগজটি তার পকেটেই ছিল। যখন এই যুদ্ধের ঘোষণা এলো এবং তাকে মদিনা থেকে বেরিয়ে আসতে হলো, তখনও তিনি এই সূরাটি মুখস্থ করার চেষ্টা করছিলেন। তখন থেকে কাগজটা তার পকেটেই ছিল।

আব্বাদ (রা) তার সঙ্গী আম্মারকে (রা) বললেন, “প্রিয় ভাই, আসুন আমরা আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বটি দুই ভাগে ভাগ করে নিই। রাত্রের একটি অংশে একজন পাহারা দিব, আর অপর অংশে অন্যজন। আপনি কি রাজি?”

আম্মার (রা) বললেন, "জি, আমি রাজি।” আব্বাদ (রা) আবার তাকে প্রশ্ন করলেন, “আপনি রাতের কোন ভাগে দায়িত্ব পালন করতে চান, এখন নাকি পরের অংশে?” আম্মার (রা) বললেন, “আমার এখন বড্ড ঘুম পাচ্ছে। আমি এখন কাজটা ভালোভাবে করতে পারব না। আমি বরং রাতের প্রথম অংশে ঘুমিয়ে নিই। দ্বিতীয় অংশে আমি পাহারা দিব ইনশাআল্লাহ।” আব্বাদ (রা) বললেন, “কিন্তু দ্বিতীয় অংশে দায়িত্ব পালন কঠিন হবে বেশি। তখন আপনার জেগে থাকতে আরো বেশি কষ্ট হবে।” আম্মার (রা) বললেন, “অসুবিধা নেই। আমার নামাজ পড়ার নিয়ত আছে। নামাজ পড়লে আর সহজে ঘুম আসবে না ইনশাআল্লাহ।" এভাবেই দুই সাহাবি নিজেদের মধ্যে কাজটি বোঝাপড়া করে নিলেন।

এদিকে শত্রুপক্ষের (গাতফান গোত্রের) একজন সদস্য দূর থেকে রাসূল (সা) আর তার সাহাবিদের তাবুগুলোর উপর নজর রাখছিল। যে জায়গা থেকে সে চোখ রাখছিল, তা দুই পাহারারত সাহাবি আম্মার (রা) আর আব্বাদের (রা) অবস্থান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। শত্রুপক্ষের এই লোকটি মুসলমানদের উপর বেজায় ক্ষিপ্ত ছিল। তার স্ত্রীও মুসলমানদের ক্ষতি করার জন্য একটা সময় প্রাণপণ চেষ্টা করত। এরকমই এক চেষ্টা করতে গিয়ে একটি খণ্ড যুদ্ধে লোকটির স্ত্রী নিহত হয়। তারপর থেকে এই ব্যক্তি প্রতিজ্ঞা করেছে কমপক্ষে একজন সাহাবিকে হত্যা করে হলেও সে তার স্ত্রী হত্যার প্রতিশোধ নেবে।

সে যখন উপত্যকার প্রবেশ মুখের দিকে এগিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই আব্বাদ (রা) নামাজে দাঁড়াচ্ছিলেন। তিনি বসতি শিবিরের সামান্য আলোতেই তার নতুন শেখা সূরাটি দিয়ে নামাজ শুরু করলেন। এভাবে পড়তে পড়তেই তিনি কেমন যেন ঘোরে চলে গেলেন। সেই সূরার আয়াতগুলো তাকে এতোটাই মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলল, তার ঈমান এতোটাই বেড়ে গেল এবং তিনি ইবাদতে এতোটাই নিবিষ্ট হয়ে পড়লেন যে, তিনি তার চারপাশের বাস্তবতা এক রকম ভুলেই গেলেন। তিনি তখন সূরা আর রাহমানের আয়াতগুলো পড়ছিলেন,

“তিনি দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের মালিক। অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন অবদানকে অস্বীকার করবে?” (সূরা আর রাহমান: ১৮-১৯)

সাহাবিকে এভাবে তন্ময় হয়ে ইবাদত করতে দেখে অপেক্ষমান শত্রুর চোখ যেন জ্বলে উঠল। সে তার ধনুকে শক্ত করে তীর গেঁথে আব্বাদকে (রা) টার্গেট করে তীরটা ছুড়ে দিল। তীরটা সোজা গিয়ে আব্বাদের (রা) শরীরের এক পাশে বিঁধল। আব্বাদ (রা) তীরটি হাত দিয়ে টান দিয়ে বের করে পাশে রেখে দিলেন এবং তার তেলাওয়াত অব্যাহত রাখলেন।

“নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলের সব কিছুই তাঁর উপর নির্ভরশীল। তিনি সর্বদাই কোনো না কোনো কাজে রত আছেন। অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন অবদানকে অস্বীকার করবে?" (সূরা আর রাহমান : আয়াত ২৯-৩০)

গাতফান গোত্রের সেই ব্যক্তি নিজের মনেই ঐ সাহাবিকে গালি দিল। আবার সে একটি তীর ধনুকে স্থাপন করল এবং আব্বাদকে (রা) লক্ষ্য করে ছুড়ে দিল। এবার তীরটা গিয়ে লাগল আব্বাদের (রা) পায়ে। আব্বাদ (রা) নিচু হয়ে পা থেকে তীরটি বের করে তেলাওয়াত করতে থাকলেন।

এরপর তৃতীয় তীরটি যখন গিয়ে তার শরীরে লাগল এবং ক্ষতস্থানগুলো থেকে বেশি রক্ত বের হতে শুরু করল তখন আব্বাদ (রা) তার তেলাওয়াত শেষ করলেন। তিনি রুকুতে গেলেন, সিজদা করলেন এবং সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করলেন। তারপর তিনি তার সঙ্গী হযরত আম্মারকে (রা) ডেকে তুললেন।

আব্বাদ (রা) একটু নিচু হয়ে তার সহকর্মীকে ডাকছিলেন বলে গাতফান গোত্রের লোকটি মনে করল বোধ হয় তৃতীয় তীরটিতে কাজ হয়েছে এবং তিনি মারা গেছেন। সে আনন্দে মাথা উঁচু করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু যখন সে দেখতে পেল পাহারায় একজন নয় বরং দুজন আছেন এবং দুজনেই জীবিত আছেন, তখন সে ঘাবড়ে গেল। তার মনে ভয় জাগল সে ধরা পড়ে যেতে পারে। তাই সে আর এক মুহূর্তও সেখানে না থেকে দৌঁড়ে পালিয়ে গেল।

হযরত আব্বাদের (রা) ডাক শুনে আম্মার (রা) ঘুম থেকে উঠলেন। যখনি তার চোখ প্রিয়তম সঙ্গী আব্বাদের (রা) উপর পড়ল, তিনি রীতিমতো চমকে উঠলেন। প্রশ্ন করলেন, “প্রথম যখন আপনার শরীরে তীর এসে লাগল, আপনি কেন তখনি আমাকে ডেকে তোলেননি?” আম্মার (রা) খুবই অপরাধবোধে ভুগছিলেন। তার বন্ধু এতো আঘাত পেল, অথচ তিনি কিছুই টের পেলেন না, উল্টো দিব্যি ঘুমিয়ে কাটালেন। এই বিষয়টা তাকে খুবই ব্যথা দিয়েছিল। যাহোক, তিনি তাড়াতাড়ি আব্বাদের (রা) ক্ষতস্থানগুলোতে ব্যান্ডেজ লাগানোর চেষ্টা করলেন।

আব্বাদ (রা) হযরত আম্মারের (রা) অস্বস্তি ও অনুশোচনাবোধ দেখে হেসে ফেললেন আর বললেন, “আম্মার (রা) আপনার কোনো দোষ নেই। প্রকৃতপক্ষে আমি এতো বেশি আনন্দে ছিলাম, এতো বেশি প্রশান্তি পাচ্ছিলাম যে, তীরের আঘাত টেরই পাইনি। আমি শুধু কোনো রকমে তীরগুলো বের করে সূরাটি পড়ে যাচ্ছিলাম। তৃতীয় তীরটি যখন এসে বিঁধল ততক্ষণে আমার সূরাটাও শেষ হয়ে গেছে। তাই নামাজ শেষ করেই আমি আপনাকে একবারে ডেকে তুললাম। আমি আরো কিছুক্ষণ এভাবেই সূরা পড়ে যেতে পারতাম। কিন্তু এরপর যদি আমি মারা যেতাম, আর আপনি টের না পেয়ে ঘুমাতে থাকতেন, তাহলে তো শিবিরে থাকা আমাদের সব সঙ্গীরাই বিপদে পড়ে যেত। আমি তো কোনোভাবেই আমার সাথীদের, বিশেষ করে প্রিয়নবিকে (সা) ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারি না।"

হযরত আম্মার (রা) আব্বাদের (রা) কথা শুনে কেঁদে ফেললেন। সূরা আর রাহমানের প্রতি তার এতোটা দরদ আর রাসূল (সা) ও সাহাবিদের জন্য আব্বাদের (রা) অনুভূতি দেখে হযরত আম্মার (রা) নির্বাক হয়ে পড়লেন। তিনি পরম মমতায় আব্বাদকে (রা) জড়িয়ে ধরে রাখলেন। কুরআনের প্রতি রাসূলের (সা) সাহাবিদের দরদ ছিল এমনই। আল্লাহ আমাদেরকেও একইভাবে কুরআনকে ভালোবাসার তাওফিক দিন। আমিন।

📘 আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত যারা 📄 আল্লাহ ও রাসূলই (সাঃ) আমার জন্য যথেষ্ট

📄 আল্লাহ ও রাসূলই (সাঃ) আমার জন্য যথেষ্ট


বাইজান্টাইন সেনাবাহিনী মুসলমানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
এমন একটি খবর দ্রুত বেগে মদিনাসহ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল। বাইজান্টাইনরা এবার সিদ্ধান্ত নিয়েই মাঠে নেমেছে। তারা মুসলমানদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করেই ফিরবে। কিন্তু রাসূল (সা) এসব কোনো সংবাদেই ঘাবড়াননি। তিনি জানতেন ও বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ তায়ালা যদি সাহায্য করেন তাহলে বিশাল সংখ্যার বাইজান্টাইন বাহিনীকে মুসলমানরা সহজেই হারিয়ে দিতে পারবে।

বাইজান্টাইন বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য রাসূল (সা) জিহাদের ডাক দিলেন। তিনি সকল মুসলমানকে আল্লাহর পথে নিজেদের সর্বোচ্চ কুরবানি দেয়ার আহ্বান করলেন। বাইজান্টাইনরা এবার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী বাহিনী তৈরি করেছে। তাদেরকে প্রতিরোধের জন্য মুসলমানদেরও ব্যাপক পরিমাণে তলোয়ার, ঢাল ও অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জামাদির প্রয়োজন হবে। তাছাড়া তখন গ্রীষ্মকাল, প্রচণ্ড রোদ। এরকম প্রতিকুল সময়ে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে অভিযানে যেতে হলে মুসলমানদের অনেক বেশি পানিরও প্রয়োজন পড়বে।

এখন প্রশ্ন হলো কারা নবিজির (সা) ডাকে সাড়া দেবে? আর কয়েকদিন পরই ফসল কাটার মৌসুম। এই সময়ে কে আবার যুদ্ধে যেতে চাইবে? কে-ই বা নিজের বাসায় পরিবারের সাথে একান্তে সময় কাটানোর সুযোগ ছেড়ে এরকম একটি বিশাল শত্রুবাহিনীকে মোকাবেলা করতে চাইবে? কিংবা কে-ই বা নিজেদের অর্থ ও সম্পদ দান করে ত্যাগ স্বীকার করতে চাইবে?

মুসলমানদের মধ্যে যারা ততটা আন্তরিক নন, ততটা সাহসী নন তারা এই যুদ্ধে যেতে সাহস পেলেন না। কিন্তু সত্যিকার অর্থে যাদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) উপর পূর্ণ বিশ্বাস আছে তারা যে কোনো কিছু করতে এমনকি বড় আকারের ঝুঁকি নিতেও আগ্রহী ছিলেন।

হযরত উমর (রা) ছিলেন এরকমই উন্নত মানসিকতা আর দৃঢ় ঈমানের অধিকারী একজন সাহাবি। রাসূলের (সা) জিহাদের ডাক শুনে তিনি ভাবলেন, “এটাই তো আমার জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ। আমি আল্লাহকে কতটা ভালোবাসি, আল্লাহ তায়ালার প্রতি আমার বিশ্বাস কতটা মজুত, রাসূলের (সা) প্রতি আমি কতটা আন্তরিক, এবার আমি তা-ই প্রমাণ করব।” জিহাদের ডাক শুনে তিনি তাড়াতাড়ি নিজের বাসায় চলে গেলেন। পরিবারের সদস্যদের বললেন, "বাসায় যা আছে সবকিছুকে একত্রিত কর।" একত্রিত করার পর তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "শোন, তোমাদের যার যা কিছু আছে তার অর্ধেক রেখে বাকি অর্ধেক আমাকে দিয়ে দাও। আমি সেই সম্পদগুলো রাসূলের (সা) জিহাদ তহবিলে দান করে দিব।"

এই কথা বলে হযরত উমর (রা) নিজেই সবার আগে তার তলোয়ার আর ঢালগুলো নিয়ে আসলেন। তিনি অর্ধেক নিজের জন্য রেখে বাকি সবটুকু জিহাদের তহবিলের জন্য বরাদ্দ রাখলেন। একইভাবে, তার স্ত্রীও নিজের গয়না আর অন্যান্য সম্পত্তির অর্ধেক জমা দিলেন। এই গয়নাগুলো তার খুব কষ্টের। যখন তারা মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করে আসেন, তখন তিনি কোনো মতে এই সামান্য গয়নাটুকুই সাথে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। স্বামীর অনুরোধে তিনি তার কানের দুলের জোড়াটিও খুলে দিয়ে দিলেন।

হযরত উমর (রা) তাকে বললেন, “তুমি কি শোননি, আমি কি বলেছি? আমি অর্ধেকটা দিতে বলেছি। তুমি কানের দুলের একটা রেখে অপরটা জমা দাও।”
হযরত উমরের (রা) স্ত্রী হাসতে হাসতে বললেন, “প্রিয়তম স্বামী, তুমি জানো না, আমি যদি তোমাকে একটি কানের দুল দেই, তাহলে বাকি দুলটা কেউ কিনবে না। কারণ এগুলো জোড়া হিসেবেই পরতে হয়। আবার আমি যদি একটা দিয়ে অপরটি নিজের কাছে রেখে দিই, তাহলে আমি নিজেও আর দুলটি পরতে পারব না। তাই আমি তোমাকে দুটাই দিয়ে দিলাম।”

নিজের বাড়ি থেকে যতটুকু স্বর্ণ সংগ্রহ হলো তার পরিমাণ বেশ ভালো হওয়ায় হযরত উমর (রা) খুশিই হলেন। তার দুই হাত ভরেই তিনি মূল্যবান সব জিনিসপত্র নিয়ে এবার রাসূলের (সা) কাছে রওনা দিলেন। যতটুকু তিনি হাতে বহন করতে পারলেন না, ততটুকু নিয়ে তার সন্তানরা পেছনে পেছনে আসতে লাগল।

যাত্রাপথে তিনি হযরত আবু বকরকে (রা) দেখতে পেলেন। হযরত উমরের (রা) মতো তিনিও নিজের বাসা থেকে সহায়-সম্পত্তি নিয়ে রাসূলের (সা) কাছে যাচ্ছিলেন। তবে পরিমাণে আবু বকর (রা) খুব বেশি আনতে পেরেছেন বলে হযরত উমরের (রা) কাছে মনে হলো না। অন্তত বাইরে থেকে দেখে তার তেমন ধারণাই হলো।

মনে মনে হযরত উমর (রা) ভাবলেন, “যাক অন্তত একবার আমি আবু বকরকে (রা) ছাড়িয়ে যেতে পেরেছি। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার ক্ষেত্রে অন্তত একবার আমি তাকে পেছনে ফেলতে পেরেছি।” এসব ভাবতে ভাবতে মোটামুটি আনন্দ নিয়েই হযরত উমর (রা) রাসূলের (সা) দরবারে প্রবেশ করলেন।

হযরত উমর (রা) নিজের ও সন্তানদের বহন করা যাবতীয় মালামাল রাসূলের (সা) সামনে রাখলেন আর বললেন, "আপনার আহবানের প্রতিক্রিয়ায় এই হলো আমার সামান্য অবদান। আপনি আল্লাহর রাস্তায় যে কোনো ভাবে আমার এই সম্পদগুলো ব্যবহার করতে পারেন।"

রাসূল (সা) হযরত উমরের (রা) ভূমিকায় খুবই সন্তুষ্ট হলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, “হে উমর, আপনি আপনার নিজের ও পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছেন?" রাসূলের (সা) মনে এরকম প্রশ্ন এলো, কেননা হযরত উমর (রা) এতো বেশি মালামাল নিয়ে এসেছিলেন যে, রাসূল (সা) আশঙ্কা করছিলেন হযরত উমর (রা) তাঁর পরিবারকে না আবার ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেন। তারা না আবার অভাবে পড়ে যায়।

হযরত উমর (রা) নবিজিকে (সা) আশ্বস্ত করে বললেন, “আপনি উদ্বিগ্ন হবেন না। তাদের কাছেও যথেষ্ট আছে।”

রাসূল (সা) আবার প্রশ্ন করলেন, “যথেষ্ট আছে বুঝলাম, কিন্তু কতটুকু?"

হযরত উমর (রা) উত্তর দিলেন, "আমি আপনার সামনে যতটুকু হাজির করেছি ততটুকুই। আমি আমার যাবতীয় সম্পদকে দুইভাগে ভাগ করেছি। একভাগ নিজেদের কাছে রেখেছি আর অপর ভাগ আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেয়ার জন্য নিয়ে এসেছি।" রাসূল (সা) এবার সন্তুষ্ট হলেন।

এবার হযরত আবু বকর (রা) সামনে এগিয়ে এলেন। তিনি তার ছোট ব্যাগটি রাসূলের (সা) সামনে রাখলেন। রাসূল (সা) যে প্রশ্নটি হযরত উমরকে (রা) করেছিলেন সেই একই প্রশ্ন হযরত আবু বকরকেও (রা) করলেন। বললেন, “হে আবু বকর, আপনি আপনার নিজের ও পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছেন?"

আবু বকর (রা) এদিক ওদিক তাকাতে থাকলেন। তিনি প্রশ্নের উত্তরটি সরাসরি না দিয়ে বরং এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। আবার তিনি রাসূলের (সা) কাছে কিছু গোপনও করতে চাইছিলেন না। তিনি অনেক ভেবে উত্তর দিলেন, “তাদের আছে, তাদের নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। আমি তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকেই (সা) রেখে এসেছি। আমাদের পরিবারের কাছে সব মিলিয়ে যা ছিল, আমি পুরোটাই আপনার সামনে হাজির করেছি।”

রাসূল (সা) মৃদু হেসে তার ঘনিষ্ঠ সাহাবি ও বন্ধু আবু বকরের (রা) দিকে তাকালেন। এভাবেই আবু বকর (রা) আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনে এবং নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে থাকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। ইসলাম গ্রহণের পর একেবারে প্রথম দিন থেকেই হযরত আবু বকর (রা) সবসময়ই নিজের সবটুকু রাসূলের (সা) জন্য বিলিয়ে দিতে শুরু করেন। তিনি হলেন সেই সৌভাগ্যবান মানুষ, যিনি রাসূলের (সা) মদিনায় হিজরতের সময় তার সফরসঙ্গী হিসেবে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। হযরত উমর (রা) এই ঘটনার পর অনেকটা লজ্জিত হয়েই বাসায় ফিরে আসলেন। তিনি স্বীকার করলেন, “আবু বকর (রা) আরো একবার প্রমাণ করলেন যে, তিনি আমার চেয়ে কত ভালো মানুষ, কত ভালো মানের মুসলমান। আল্লাহ ও রাসূলের (সা) প্রতি আবু বকরের (রা) যে আনুগত্য, ভালোবাসা ও ত্যাগ- তা সীমাহীন। তার তুলনা শুধু তিনি নিজেই।"

📘 আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত যারা 📄 আবু তালহা (রাঃ) ও এক সুন্দর পাখি

📄 আবু তালহা (রাঃ) ও এক সুন্দর পাখি


রাসূল (সা) তখন মদিনায় বসবাস করেন। সেখানে আবু তালহা (রা) নামে একজন সাহাবি ছিলেন। আবু তালহা (রা) নিজেকে মদিনার সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি মনে করতেন, কারণ তার একটি চমৎকার বাগান ছিল। এতো সুন্দর ও মনোহর বাগান মদিনায় আর কারো ছিল না। বাগানে স্বচ্ছ ও শীতল পানির একটি ঝরণাধারা ছিল। চলমান এই পানির স্রোতধারার কারণেই বাগানটি সবসময় সবুজ, সজীব ও প্রাণবন্ত থাকত।

আবু তালহার (রা) কাছে দিনের সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্ত ছিল বিকেল বেলা। যখন তিনি তার প্রিয় বাগানে আসরের নামাজ আদায় করতেন। মাথার উপর দিয়ে হালকা মৃদু বাতাসে দোল খাওয়া খেজুর গাছের পাতা আর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির শব্দ, সব মিলিয়ে এক অসাধারণ পরিবেশ ছিল সেখানে। বাগানের এই চমৎকার পরিবেশের জন্যেই আবু তালহা (রা) বাগানের ভেতরেই নামাজ পড়তে পছন্দ করতেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে যে অফুরন্ত নিয়ামত দান করেছেন, আবু তালহা (রা) একবারের জন্যেও তা ভুলে যেতেন না। তাই সব অবস্থাতেই তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন।

অন্যসব দিনের মতোই একদিন বিকেলে আবু তালহা (রা) আসরের নামাজ আদায় করার জন্য তার জায়নামাজ নিয়ে বাগানের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞ একটি মন নিয়ে বিনয়ের সাথে তিনি নামাজে দাঁড়ালেন। তিনি যখনই তেলাওয়াত শুরু করলেন, তখনই গাছের পাতার নড়াচড়া আর পানি প্রবাহের চিরচেনা শব্দের পাশাপাশি আরেকটি শব্দ তার কানে প্রবেশ করল। তার মাথার উপর দিয়ে মনকাড়া কিচিরমিচির শব্দ তাকে রীতিমতো বিমোহিত করে ফেলেছিল। মনের অজান্তেই তার চোখ খুলে গেল। সামনে থাকা খেজুর গাছের ডালের উপর তিনি একটি পাখি দেখতে পেলেন। তার মনে হলো পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর পাখি আর নেই। পাখির ডানা ছিল পান্নার মতো সবুজ। আর এর পালক আর লেজটা ছিল ডালিমদানার মতো লাল টকটকে। মাথা ছিল সোনালি বর্ণের। ঠোঁটটাও ছিল অনেক বেশি আকর্ষণীয়। আর ঠোঁটের ভেতর থেকেই অপূর্ব ধ্বনির সেই কলতান ভেসে আসছিল।

আবু তালহা (রা) মুগ্ধতায় ডুবেছিলেন। তিনি পাখিটির দিকে এমনভাবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন যে, তিনি একরকম ভুলেই গিয়েছিলেন যে তিনি কোথায় আছেন বা তিনি কোন কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছেন। যখন তার মনে পড়ল, তিনি ভীষণ লজ্জিত হলেন এবং আবার নামাজে মনোনিবেশ করলেন। যেখানে তিনি তেলাওয়াত থামিয়ে দিয়েছিলেন, আবার সেখান থেকেই তিনি তেলাওয়াত শুরু করলেন। এরপর তিনি স্বাভাবিকভাবেই নামাজ শেষ করলেন। কিন্তু ততক্ষণে পাখিটি উড়ে চলে গেছে।

কিন্তু উড়ে গেলেই বা কি! পাখিটিরও এই বাগানটা ভীষণ পছন্দ হয়েছিল। এতো সুন্দর বাগান, যেখানে চাইলেই বীজদানা খাবার হিসেবে পাওয়া যায়, আবার ঝরণাধারাও আছে। পাখির বাসা বানানোর জন্য এর চেয়ে উত্তম জায়গা আর হতেই পারে না।

পরের দিন আবার আবু তালহা (রা) জায়নামাজ নিয়ে বাগানে তার প্রিয় খেজুর গাছের নিচে এসে দাঁড়ালেন এবং নামাজ শুরু করলেন। কিন্তু আজ তিনি খেয়াল করেননি যে তাঁরই মাথার উপর গাছের ডালে পাখিটি নিজের বাসা তৈরি করে নিচ্ছে। একটু পরই পাখিটি আবারও মিষ্টি সুরে গান গাইতে শুরু করল। আবারও আবু তালহা (রা) নামাজে তাঁর মনোযোগ হারিয়ে ফেললেন। তিনি আবার চোখ খুলে সেই অদ্ভুত সুন্দর পাখিকে দেখতে পেলেন। পাখিটি এক ডাল থেকে অন্য ডাল লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে আর কিচিরমিচির সুরে গান গাইছে।

কিন্তু এবার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আবু তালহা (রা) ঘোর থেকে বাস্তবে চলে এলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, “আমি এটা কি করছি? আমি কোন রাকাতে ছিলাম, দ্বিতীয় রাকাতে নাকি তৃতীয় রাকাতে?” কিছুতেই তিনি নিশ্চিতভাবে তা মনে করতে পারলেন না। তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। কোনো মতে নামাজ শেষ করলেন। নীরবে জায়নামাজ গুটিয়ে নিয়ে বাগান থেকে বেরিয়ে গেলেন।

আবু তালহা (রা) এরপর অনেকক্ষণ শুধু ভেবেই গেলেন। তিনি চিন্তা করলেন, কিভাবে তাঁর নামাজ আল্লাহর কাছে পৌঁছবে যেখানে তিনি নিজেই ভুলে যান যে তিনি কোন রাকাতে ছিলেন? তাঁর মন যদি বাগান, বাগানের সৌন্দর্য, পাখির গান আর ঝরণাধারার প্রতি এতোটাই মোহবিষ্ট হয়ে থাকে তাহলে তিনি কিভাবে আল্লাহকে স্মরণ করবেন?

আবু তালহা (রা) ছিলেন খুবই উন্নতমানের একজন মুসলমান। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে, একজন মুসলমানের জন্য নামাজ কতটা জরুরি। তিনি নিশ্চিতভাবেই জানতেন যে, নামাজে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো বিষয়ের প্রতি মনোযোগ রাখা যায় না। কিন্তু এই সমস্যা থেকে কিভাবে বাঁচবেন তাও তিনি বুঝতে পারছিলেন না।

সেই রাতেই তিনি নবিজির (সা) কাছে চলে গেলেন। নবিজিকে (সা) তিনি তাঁর বাগান, বাগানের সৌন্দর্য, পাখির গান আর ঝরণাধারার বিষয়ে বিস্তারিত সব জানালেন। তিনি বললেন, “হে রাসূলুল্লাহ (সা), আমি আমার নামাজ, আমার ইবাদতের সময় অন্য কিছুকে বাঁধা হিসেবে মেনে নিতে পারব না। যেগুলো আমার নামাজের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, সেগুলো বরং না থাকলেই ভালো। আপনি দয়া করে আমার বাগানটির দায়িত্ব গ্রহণ করুন। আমি আজ এই মুহূর্ত থেকে আমার বাগানটি আপনাকে দিয়ে দিলাম। মদিনার মুসলমানরা এখন থেকে এই বাগান ব্যবহার করতে পারবে। এর যে কোনো ফল, ফলাদি ও অন্যান্য সামগ্রী নিজেদের প্রয়োজনে বিক্রিও করতে পারবে।”

রাসূল (সা) খুব সন্তুষ্ট মনে আবু তালহার (রা) এই উপহার গ্রহণ করলেন। তারপর থেকে আর কখনোই নামাজ আদায় করতে গিয়ে আবু তালহার (রা) মনোযোগ ছুটে যায়নি। আর তখন থেকেই তাঁর নামাজও আল্লাহ তায়ালা আরও খুশি মনে কবুল করে নিলেন। সুবহানআল্লাহ।

📘 আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত যারা 📄 জ্ঞানী এক শিষ্যের গল্প

📄 জ্ঞানী এক শিষ্যের গল্প


হাজার বছর আগের বাগদাদ ছিল উজ্জ্বল, ঝকমকে, সম্পদশালী আর বিলাসিতার এক নগরী। যে সময়ের কথা বলছি, তখন বাগদাদ ছিল তৎকালীন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী।

আর খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন বিশ্বখ্যাত শাসক হারুনুর রশিদ। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ী আর বণিকেরা দলে দলে স্বর্ণালংকার, সুগন্ধীসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে বাগদাদ শহরে আসতেন। তারা বাগদাদে আসতেন ব্যবসা করার জন্য। আর বাগদাদের অধিবাসীরাও এতোটা স্বচ্ছল ছিল যে তারাও অবলীলায় মূল্যবান সেসব প্রসাধনী আর সুগন্ধী কিনে নিজেদের সুন্দর করে তোলার খায়েশ পূরণ করত।

এই সব দুনিয়াবি ভোগ বিলাস আর বৈভবের বাইরেও বাগদাদের আরেকটি চেহারা তখন দৃশ্যমান ছিল। পুরো পৃথিবীর মধ্যে বাগদাদই ছিল তখন সবচেয়ে বড় শিক্ষাকেন্দ্র। সব ধরনের শিক্ষাবিদ, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং দার্শনিকরা বাগদাদকে রীতিমতো তীর্থস্থান মনে করত। সে সময় প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার যাবতীয় রচনাবলি ও পুস্তক আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হয়।
অনুবাদকদের সম্মানও ছিল অনেক বেশি। জানা যায়, একটি বই আরবিতে অনুবাদ করার পর সেই বইটির যত ওজন হতো, সেই অনুপাতে অনুবাদককে পারিশ্রমিক হিসেবে স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করা হতো।

এতোসব জ্ঞানী আর পণ্ডিত লোকের মাঝে জুনায়েদ নামে একজন বড় মানের শিক্ষাবিদ ছিলেন। পেশায় ছিলেন তিনি একজন শিক্ষক, মানুষ হিসেবে ছিলেন ভীষণ মানবিক আর চরিত্রের দিক থেকে ছিলেন খুবই উন্নত।

জুনায়েদ পারস্য এলাকার নিহাভান্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন কাঁচের ব্যবসায়ী। তিনি তার চাচা সারি আল সাকাতির কাছেই মানুষ হন। সারি আল সাকাতি নিজ ভ্রাতুষ্পুত্রকে একজন উন্নত মানুষ বানানোর চেষ্টা করেন। জুনায়েদের বয়স যখন মাত্র ১১ বছর, তখন চাচা সারি আল সাকাতি তাকে নিয়ে হজ্জে গমন করেন। সেবার মসজিদুল হারামে তারা প্রায় চারশত জ্ঞানী আলেমের সান্নিধ্য লাভ করেন। এই আলেমরা সবাই মিলে কৃতজ্ঞতা তথা শুকরিয়া আদায় করার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করছিলেন। বালক জুনায়েদ আর তার চাচা নীরবে সেই আলোচনাগুলো শুনছিলেন।

প্রত্যেক আলেমই নিজের মতকে অন্যদের মতের তুলনায় বেশি সঠিক ও নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছিলেন। চাচা সারি আল সাকাতি এই আলোচনায় তার ভ্রাতুষ্পুত্র জুনায়েদকে নিয়ে গিয়েছিলেন কারণ তিনি জানতেন, জুনায়েদ তার বয়সের অন্য যে কারও তুলনায় অনেক বেশি মেধাবী ও জ্ঞানী। তাছাড়া, এতো সব আলোচনার মাঝখানে এই বিষয় নিয়ে জুনায়েদ কি ভাবছে, তা জানারও আগ্রহ ছিল চাচা সারি আল সাকাতির। তাই তিনি গলা একটু ঝেড়ে কাশি দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। সবাই তার দিকে তাকালে চাচা সারি আল সাকাতি বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আপনারা সবাই অনেক মূল্যবান মতামত দিয়েছেন। সবার মতামতই বেশ প্রশংসনীয়। তবে আমি খুব খুশি হব যদি আপনারা দয়া করে আমার ভাতিজার কথা একটু শুনেন। তার বয়স কম হলেও মাঝে মাঝে সে এমন মন্তব্য করে বসে যে আমি রীতিমতো বিস্মিত হয়ে যাই। তো বাবা জুনায়েদ, তুমি কি মনে কর? সত্যিকারের কৃতজ্ঞতাবোধ কি?”

ঐ বৈঠকে যতজন আলেম ছিলেন, তারা সবাই চাচার কর্মকাণ্ডে বেশ অবাক হলেন। তারপরও তারা সেই ছোট্ট জুনায়েদের দিকে তাকালেন এবং তাকে তার মতামত প্রকাশ করার জন্য উৎসাহ দিলেন। জুনায়েদ অবশ্য এই পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে না গিয়ে বেশ ভালোভাবেই সামাল দিয়েছিল। সে খুব পরিষ্কার কণ্ঠে বলল, "কৃতজ্ঞতাবোধ বলতে আমি যা বুঝি তাহলো, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে যে নেয়ামত দান করেছেন, আমরা তার অপব্যবহার করব না। এই নেয়ামত পাওয়ার পর আমরা আবার নাফরমানিতে ডুবে যাব না। আল্লাহর প্রতি অবাধ্য হবো না। সব সময় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।"

উপস্থিত সকল বিজ্ঞ আলেম এই অল্পবয়স্ক ছেলেটির পরিণত উত্তরে অবাক হয়ে গেলেন। চাচা সারি আল সাকাতি বেশ প্রশান্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন আর বললেন, “জুনায়েদ, আমার মনে হয় তোমাকে আল্লাহ তায়ালা যে নেয়ামত বেশি দিয়েছেন তাহলো তোমার জিহবা, তোমার কথা বলার ক্ষমতা আর অদ্ভুত সুন্দর বাচনভঙ্গি।”

এই ঘটনার অনেক বছর পরের কথা। জুনায়েদ তখন বাগদাদে বসবাস করেন। জুনায়েদের তখন অনেক শিষ্যও হয়ে গেছে। তারা সবাই তার কাছ থেকে নতুন কিছু শিখতে এসেছে। জুনায়েদ ততদিনে নিজের সততা, অনুধাবন ক্ষমতা এবং একনিষ্ঠতার জন্য বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে গেছেন। অনেকে আগে থেকেই শুধুমাত্র জুনায়েদের বক্তব্য শোনার জন্য, আবার যারা তার প্রতি একান্তই অনুগত, তারা তার আবাসস্থলে নিয়মিত থাকতে শুরু করেন। আগত সবার প্রতিই জুনায়েদ ছিলেন সমান দরদি এবং তাদের সবাইকে তিনি একইভাবে শিক্ষা দিতেন। তবে একজন শিষ্য ছিল, যাকে তিনি অন্য সবার চেয়ে একটু আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতেন। কিন্তু অন্যরা বুঝত না কেন তিনি ঐ শিষ্যটাকে এতোটা ভালোবাসতেন। তাদের অনেকেই এই শিষ্যকে হিংসা করতে শুরু করেছিল।

একদিন তারা সিদ্ধান্ত নিল ওস্তাদ জুনায়েদকেই তারা সরাসরি প্রশ্ন করবে কেন তিনি ঐ শিষ্যকে একটু বেশিই ভালোবাসেন। তারা জুনায়েদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ও তো আমাদের সবার মতোই। আমরা ওর মধ্যে আলাদা কিছু দেখতে পাই না। তাহলে আপনি কেন অন্য সবার চেয়ে ওকে একটু বেশি গুরুত্ব দেন?”

জুনায়েদ বললেন, “সে তোমাদের চেয়ে বেশি গুছানো, তোমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানীও বটে। তার ব্যবহারও বেশ উত্তম। সে আল্লাহর প্রতি অনুগত এবং সর্বোপরি সে সমঝদার একটি ছেলে। তোমরা নিজেরাই একদিন বিষয়টা বুঝতে পারবে।”
জুনায়েদ উত্তর দিলেন ঠিকই, তবে তার উত্তরে কেউই সন্তুষ্ট হতে পারল না। জুনায়েদ যে মন্তব্যগুলো করেছে তার কোনোটারই সত্যতা তারা খুঁজে পেল না। যেহেতু তারা ওস্তাদ জুনায়েদকে খুব সম্মান করে তাই তারা বিষয়টা নিয়ে আর উচ্চবাচ্য না করে বরং নীরব হয়ে গেল। জুনায়েদও বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারলেন প্রশ্নকারীরা তার উত্তরে সন্তুষ্ট হয়নি। তিনি তাদের সামনে সত্যটাকে প্রমাণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

পরের দিন সকালে জুনায়েদ তার সকল শিষ্যকে ডেকে পাঠালেন। তারা এসে উপস্থিত হলো। তারা ছিল বিশ জন। এবার জুনায়েদ তাদেরকে বললেন, “তোমরা সবাই পাখির বাজারে যাও এবং প্রত্যেকে ১টি করে ২০টি পাখি নিয়ে এসো।” শিষ্যরা ওস্তাদের কথামতো বাজার থেকে ২০টি পাখি কিনে নিয়ে এলো।

এবার জুনায়েদ তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "আমি চাই প্রথমে তোমরা এমন একটি স্থানে যাও যেখানে কেউ তোমাদের দেখতে পাবে না। তারপর ছুরি নিয়ে যার যার হাতে থাকা পাখি কুরবানী করবে। এরপর সেই পাখি নিয়ে আবার এখানে আসবে। কিন্তু মনে রাখবে, এই ঘটনা যেন কেউ দেখতে বা জানতে না পারে।"

ওস্তাদের কথা অনুযায়ী, প্রত্যেক শিষ্যই একটি করে পাখি নিয়ে চলে গেল এবং অল্প কিছু সময় পরই তারা ফিরে এলো এবং নিজেদের কুরবানী করা পাখি প্রদর্শন করল। ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ ঘরের পেছন থেকে একটি পাখির চিৎকার আর ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ ভেসে আসলো। দেখা গেল, ওস্তাদ জুনায়েদের সেই প্রিয় শিষ্য একটি জীবন্ত পাখি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার জন্য বরাদ্দকৃত পাখি কুরবানী দিতে পারেনি। উল্টো তার চোখে মুখে বিস্ময়, কেন সবাই তাকে নিয়ে এতো হাসাহাসি করছে!!

অন্য সব সহপাঠীরা তখন টিটকারী মারা শুরু করে দিয়েছে। উপহাস করে তারা বলছে, “উনি জ্ঞানী শিষ্য তো, তাই তার কাজ কর্ম একটু আলাদা। এতোটাই আলাদা যে সে এখন ওস্তাদের হুকুমও অমান্য করা শুরু করে দিয়েছে।"

জুনায়েদ নিজেও বিষয়টার সূরাহা করতে চাইলেন। তিনি সেই জ্ঞানী শিষ্যকে কাছে ডাকলেন এবং প্রশ্ন করলেন, “তুমি কেন পাখিটাকে আমার আদেশ মতো কুরবানী করনি?”

এবার সেই শিষ্য উত্তর দিল, "আপনি আমাকে এমন একটি স্থানে পাখি কুরবানী করতে বলেছিলেন, যেখানে কেউ দেখতে পাবে না। কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব? আল্লাহ তো সবই দেখতে পান। আমি কিভাবে তার কাছ কাছ থেকে লুকিয়ে বা আড়াল করে কিছু করব? তাই আমি পাখি কুরবানী করতে পারিনি।”

জুনায়েদ তার উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন এবং অন্যদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “এখন বুঝলে তো, কেন এই শিষ্যকে আমি তোমাদের সবার চেয়ে আলাদা করে দেখি, কেন আমি তাকে জ্ঞানী বলি। তোমরা নিজেদের কার্যক্রমের সাথে ওর আচরণকে মিলিয়ে দেখলেই পার্থক্যটা বুঝে যাবে।”

সব শিষ্যরা এবার নিজেদের ভুল বুঝতে পারল। তারা ওস্তাদ জুনায়েদের কাছে ক্ষমা চাইল এবং অহেতুক জ্ঞানী ঐ শিষ্যকে হিংসা করার জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px