📄 আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন
ঘুটঘুটে অন্ধকার এক রাত। মাঝরাতও পার হয়ে গেছে। অল্প কিছু সময় পরেই ভোরের আলো ফুটে উঠবে। কুরাইশরা হয়তো তখন বুঝতে পারবে, তারা যে নবি মুহাম্মাদকে (সা) আটক করতে এসেছিল, তিনি তাদের চোখের সামনে দিয়েই বের হয়ে গেছেন, তারা তা বুঝতেও পারেনি। হয়তো তারা আবার নবিজিকে (সা) খুঁজতে শুরু করবে। শহরের কোনো রাস্তা কিংবা অলি গলি কোনো কিছুই তারা বাদ দেবে না। তন্নতন্ন করে খুঁজবে। প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মাদ (সা) আগেই জানতে পারেন, তাঁর প্রতিপক্ষ কুরাইশরা তাকে হত্যা করতে আসছে। তাই তিনি আগেভাগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। তাঁর বিছানায় তখন শুয়েছিল চাচাতো ভাই আলী (রা)। হযরত আলী (রা) তখন একেবারেই কিশোর। সারারাত কুরাইশের বারো জন তরতাজা ও শক্তিশালী যুবক নবিজির বাসা ঘিরে রেখেছিল, যাতে তিনি কোনোভাবেই বাইরে কোথাও চলে যেতে না পারেন। তাদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল, রাত শেষ হলেই তারা বাসার ভেতর প্রবেশ করবে এবং নবিজিকে (সা) হত্যা করবে।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বন্ধুকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, কুরাইশরা তাঁকে হত্যার জন্য পাগলপারা, যে কোন সময় হত্যা করতে পারে। এখনই নবিজির (সা) নিজ শহর মক্কা থেকে হিজরত করা অর্থাৎ মক্কা ছেড়ে চলে যাওয়ার উপযুক্ত সময়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছ থেকে এই বার্তা পেয়েই নবিজি (সা) হিজরত করার যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তিনি নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে যান মিসফালায়। যেখানে তাঁর প্রিয় বন্ধু ও বিশ্বস্ত সাহাবি হযরত আবু বকরের (রা) বাসা। তাদের দুই বন্ধুর যাওয়ার কথা মদিনায়। মদিনা ছিল মক্কা নগরীর উত্তরে। কুরাইশদের একটু ভুল বার্তা দেয়ার জন্য তাঁরা ইচ্ছে করেই চলে যান দক্ষিণে। তাঁরা জানতেন যে, কুরাইশরা যখন টের পাবে নবি মুহাম্মাদ (সা) মক্কা ছেড়ে চলে গেছেন, তখন তারা প্রথমেই আবু বকরের (রা) বাসায় তল্লাশি করবে আর তারপর গোটা মদিনার পথ চষে বেড়াবে। এ কারণেই প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মাদ (সা) বন্ধু আবু বকরকে (রা) নিয়ে মক্কার দক্ষিণে অগ্রসর হলেন।
হযরত আবু বকর (রা) পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন নবি মুহাম্মাদকে (সা)। হযরত মুহাম্মাদ (সা) নবুওয়াত পাওয়ার পর প্রথমদিকে যে অল্প কয়েকজন মানুষ তাঁর উপর ঈমান আনেন, হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। তিনি তাঁর জমানো অর্থ- সম্পদের সবটুকুই ইসলামের জন্য বিলিয়ে দেন। রাসূল (সা) মদিনায় যাওয়ার এই সফরে তাকেই সঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেন। মদিনার পথে এই যাত্রা ইসলামের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মদিনায় হিজরত আর তার পরবর্তী ঘটনা মানব ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন এক স্বর্ণযুগের সূচনা করে।
কিছু পথ এগিয়ে তাঁরা দুজন মক্কার দক্ষিণে পাহাড়ি এলাকার কাছাকাছি পৌঁছলেন। তাঁরা তখন এমন এক জায়গা খুঁজছিলেন, যেখানে তাঁরা কিছু সময়ের জন্য আশ্রয় নিতে পারেন। কুরাইশরা যতগুলো ছোট ছোট গর্ত ছিল, যেগুলো দিয়ে সাপ বা অন্য কোনো বিষাক্ত পোকা মাকড় বের হতে পারে, সবগুলো তিনি টুকরো কাপড়গুলো দিয়ে ঢেকে দিলেন। এভাবে পুরো গুহা নিরাপদ করে তিনি বাইরে এলেন এবং নবিজিকে (সা) নিয়ে একসাথে গুহার ভেতরে প্রবেশ করলেন।
প্রিয় নবি (সা) আর হযরত আবু বকর (রা) যখন গুহার ভেতরে ভালোমতো প্রবেশ করলেন, ততক্ষণে প্রায় ভোর হয়ে গিয়েছে। মক্কায় রাসূলের (সা) বাড়ি যে বারো জন যুবক ঘেরাও করে রেখেছিল, তারাও একই সময়ে তাঁর ঘরে প্রবেশ করল। কিন্তু একি! বিছানায় তো মুহাম্মাদ (সা) নেই, আছেন তাঁর কিশোর চাচাতো ভাই আলী (রা)। এই দৃশ্য দেখে তারা খুবই রেগে গেল। হতাশও হয়ে পড়ল। রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা তখনই মক্কার আশেপাশে নবিজির (সা) সন্ধানে তল্লাশি অভিযান শুরু করে দিল। তারা ঘোড়া চালিয়ে টগবগিয়ে ছুটে গেল মদিনার পথে। কিন্তু সেই পথ দিয়ে নবিজি (সা) গেছেন এমন কোনো চিহ্নই তারা দেখতে পেল না। তাই তারা সেদিক থেকে ফিরে আসলো। এরপর তারা পূর্ব দিকে, পশ্চিম দিকে, দক্ষিণ দিকে-সবদিকে একইভাবে খোঁজাখুঁজি শুরু করল। এভাবে খুঁজতে খুঁজতেই তারা একটা সময়ে নবিজির পায়ের চিহ্ন দেখতে পেল। সেই পায়ের চিহ্নটা চলে গেছে মক্কার দক্ষিণে থাকা পর্বতমালার দিকে। তাই তারা দলবেঁধে সেদিকেই ছুটল।
হযরত আবু বকর (রা) নবিজিকে (সা) নিয়ে গুহার ভেতরে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু খুবই পেরেশান ছিলেন। যদিও তাঁরা কুরাইশদের বিভ্রান্ত করার জন্য মক্কা থেকে মদিনার যাত্রাপথের বিপরীত দিকে গেছেন। কিংবা যদিও তাঁরা এতোটাই দুর্গম একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন যেখানে কুরাইশদের আসার কথা নয়, তা স্বত্ত্বেও আবু বকরের (রা) অস্থিরতা কোনো ভাবেই কমছিল না। তিনি বার বার এপাশ ওপাশ দেখছিলেন আর পেরেশান হচ্ছিলেন।
যেই ভয় হযরত আবু বকর (রা) পেয়েছিলেন, শেষমেষ তাই হলো। তাঁরা গুহার বাইরে মানুষের আওয়াজ ও পায়ের শব্দ শুনতে পেলেন। বেশ কয়েকজন লোক হযরত আবু বকর (রা) আর তার প্রিয় রাসূলের (সা) পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করতে করতে সেখানে পৌঁছে গেলেন। কিন্তু তাঁরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, গুহার মুখে একটি মাকড়সা বাসা বেঁধেছে। মাকড়সার বাসা দেখে তাদের মনে হলো যে, এটা বেশ পুরনো। এর ভেতরে খুব সাম্প্রতিককালে কেউ প্রবেশ করেছে- এমনটা তাদের মনে হলো না। তৎকালীন সময়ে মানুষের পায়ের চিহ্ন দেখে তাকে খুঁজে বের করার বিদ্যা অনেকেই চর্চা করত। মক্কায় এই কাজটি সবচেয়ে ভালো যারা পারত, তার মধ্যে একজন ছিল কুর্জ বিন আলকামা। সে মূলত সাওর গুহায় নবিজির (সা) পায়ের চিহ্ন দেখে দেখে পৌঁছেও গিয়েছিল। কিন্তু গুহার মুখে মাকড়সার জাল দেখে সেও বেশ সংশয়ে পড়ে গেল। সে তার সঙ্গীদের বলল, "পায়ের ছাপ এ পর্যন্ত এসেছিল ঠিকই কিন্তু তারপর কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে। তারা এখান থেকে কোথায় চলে গেল?"
সে সময়ে তাদের সাথে কুরাইশদের অন্যতম এক গোত্র প্রধান উমাইয়া বিন খালাফও ছিল। সে বলল, “মাকড়সার এই জাল ছিন্ন করে গর্তের ভেতরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। গর্তটা দেখে তো বোঝাই যাচ্ছে, এখানে সহসা কেউ ঢুকেনি। মাকড়সার জাল এতোটাই পুরনো, মনে হচ্ছে এটা মুহাম্মাদের জন্মের আগেই তৈরি হয়েছে। আমার মনে হয়, এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।”
আরেকজন কুরাইশ সদস্য গর্তের মুখের এতোটাই কাছে চলে এলো যে, গর্তের ভেতর থেকে রাসূল (সা) ও আবু বকর (রা) তার পা দুটো বেশ পরিষ্কারভাবেই দেখতে পেলেন। আবু বকর (রা) লোকটাকে এতো কাছে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি নিজের জীবন নিয়ে মোটেও শঙ্কিত ছিলেন না, তিনি বার বার বরং ভাবছিলেন রাসূলের (সা) না কোনো বিপদ হয়ে যায়। তিনি প্রতিটি মুহূর্ত গুহার মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন। কিন্তু নবিজি (সা) ছিলেন একেবারেই শান্ত। তিনি নিজের মতো আপনমনে নামাজ পড়ে যাচ্ছিলেন, দোয়া করছিলেন।
নামাজ শেষ করে নবিজি (সা) হযরত আবু বকরের (রা) চোখের দিকে তাকিয়ে দেখেন আবু বকর (রা) কাঁদছেন। তিনি ফিসফিস শব্দে নবিজিকে জানালেন, “কুরাইশরা ঠিক আমাদের মাথার উপরে। তারা একটু ভেতরে ঢুকলেই আমাদের দেখে ফেলবে।”
নবিজি (সা) আবু বকরের (রা) কথা শুনে হাসলেন। মায়াভরা চোখে হযরত আবু বকরকে (রা) বললেন, “আপনি এতো ভয় পাচ্ছেন কেন। আমরা তো এখানে দুজন নই, তিনজন। আমাদের দুজনের সাথে আল্লাহ তায়ালাও আছেন।"
আবু বকর (রা) উত্তর দিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমি আমাকে নিয়ে ভীত নই। কিন্তু আমার চোখের সামনে যদি ওরা আপনার কোনো ক্ষতি করে তাহলে আমি কী করব?”
রাসূল (সা) বললেন, “ঘাবড়াবেন না। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সাথে আছেন।”
বিস্ময়কর ব্যাপার। রাসূলুল্লাহর (সা) মুখে একফোটা উদ্বেগ, উত্তেজনা বা উৎকণ্ঠার কোনো ছাপ ছিল না। তিনি অত্যন্ত নিশ্চিন্ত ছিলেন। কেননা আল্লাহর প্রতি তাঁর পূর্ণ আস্থা ছিল সবসময়। তিনি ছিলেন দৃঢ় ঈমানের এক অবিচল প্রতিচ্ছবি। রাসূল (সা) সবসময়ই অনুভব করতেন যে, যদিও আল্লাহর কোনো দৃশ্যমান সাহায্য তাদের সামনে নেই, তারপরও আল্লাহ তায়ালা প্রকৃতপক্ষেই তাদের সাথে আছেন এবং তিনি তাদের রক্ষা করবেন।
“আল্লাহ তাঁর নবিকে সাহায্য করেছিলেন, যখন তাঁকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দু'জনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর রাসূলের প্রতি স্বীয় সান্তনা নাজিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখনি। বস্তুতঃ আল্লাহ কাফেরদের মাথা নিচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত থাকে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আত তাওবাহ: আয়াত ৪০)
📄 কে তোমাকে বাঁচাবে?
এই গল্পটা রাসূলের (সা) জীবনের এমন একটি সময়ের যখন তিনি নাজদে যাচ্ছিলেন। তিনি মূলত নাজদে যাচ্ছিলেন সেখানকার স্থানীয় দুই গোত্র মুহারিব ও গাতফানকে সর্তক করার জন্য, যাতে তারা আর কোনো ঝামেলা বা সংঘাতে না জড়ায়। রাসূল (সা) এবং তার সঙ্গীরা যাত্রাপথে নাখলা নামক একটি স্থানে বিরতির জন্য থামেন। খবর যা পাওয়া যাচ্ছিল, তাতে গাতফান গোত্র খুবই উত্তেজিত অবস্থায় ছিল এবং তারা প্রকাশ্যে যে কোনো স্থানে রাসূলের (সা) উপর আক্রমণ চালাতে পারে এমন তথ্য ছিল। গাতফানদের অধিকাংশ সদস্যই মরুভূমি বা পাহাড়ে ছিল। কিন্তু অল্প কিছু সদস্য এর বাইরেও ছিল, যারা রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবিদের তাবুর আশপাশেই লুকিয়ে ছিল। রাসূল (সা) খুব ভালো করেই জানতেন যে, লুকিয়ে থাকা এই গাতফান সদস্যরা সুযোগ বুঝে তাদের উপর হামলা চালাতে পারে। সে কারণে নবিজি ও তার সঙ্গীরা খুবই সতর্ক অবস্থায় ছিলেন। এ রকম পরিস্থিতিতে সঙ্গী সাহাবিদের ভয় তাড়ানোর জন্য রাসূল (সা) বেশ ভালো একটি বুদ্ধি বের করলেন। এতে একদিকে যেমন তাদের ভয় কমবে, ঠিক একইভাবে তারা শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য তৈরিও থাকতে পারবে।
রাসূল (সা) তার সঙ্গী সাথীদের দুটি দলে ভাগ করলেন। প্রথম দলকে ক্যাম্প পাহারা দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হলো। আর দ্বিতীয় দলটি রাসূলের (সা) সাথে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। যখনই দ্বিতীয় দলটির নামাজ শেষ হলো, তারা আবার গিয়ে ক্যাম্প পাহারা দেয়ার দায়িত্ব নিল আর প্রথম দলটি পাহারার দায়িত্ব থেকে বিরতি নিয়ে নামাজে শরিক হলো। দূর থেকে যে গাতফান সদস্যরা লুকিয়ে লুকিয়ে ক্যাম্পের উপর নজর রাখছিল তারা গোটা দৃশ্যটা দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল। তারা দেখছিল, কিছু লোক নীরবে পাহারা দিয়ে যাচ্ছিল, আবার কিছু লোক নবি মুহাম্মাদের (সা) পেছনে নামাজও পড়ছিল। মুহাম্মাদ (সা) একটু পর পর আল্লাহু আকবার বলছিলেন আর পেছনে থাকা সঙ্গীরাও তাতে সাড়া দিচ্ছিলেন। তারা সবাই একত্রে রুকুতে যায়, একত্রে সিজদা দেয় আবার সিজদা শেষে একই সাথে দাঁড়ায় এবং সালাম দিয়ে নামাজ শেষ করে। তারা এর আগে কোনো বাহিনীকে এমন দেখেনি যারা একই সাথে পাহারা দেয়ার কাজও করে আবার ইবাদতও পালন করে, তাও আবার পালাক্রমে।
নামাজ শেষে মদিনা থেকে নাজদ যাত্রার দীর্ঘ পথের ক্লান্তির প্রভাব সাহাবিদের উপর এসে ভর করল। বেশ কিছু সাহাবি পাহারা দেয়ার কাজটি অব্যাহত রাখলেন আর অন্যরা একটু বিশ্রামে নিতে চলে গেলেন। তারা কেউ গাছের নিচে, কেউ বা ঝোপের নিচে শুয়ে পড়লেন। রাসূল (সা) নিজেও একটি গাছের নিচে অন্ধকার একটি জায়গা পেয়ে সেখানে একটু বিশ্রাম নেয়ার চেষ্টা করলেন।
ঠিক এমন একটি সময়ের জন্যই গাওরাস অপেক্ষা করছিল। গাওরাস হলো গাতফান গোত্রের সাহসী এক যুবক। ঠিক একদিন আগে যখন তারা নবিজিকে হত্যা করার পরিকল্পনা করছিল তখন এই গাওরাস গর্ব করে তার গোত্রের অন্যান্য লোকদের বলছিল, "আমি তোমাদের মতো ভীতু নই। তোমরা কেন মুহাম্মাদকে এতোটা ভয় পাচ্ছ? তাকে হত্যা কর, দেখবে কিছুই হবে না। তোমরা যদি সাহস না পাও, তাহলে আমিই যাব এবং তাকে হত্যা করব। একজন মানুষকে হত্যা করা তেমন কোনো আহামরি কাজ নয়।”
তার সাহসী বক্তব্য শুনে গোত্রের সবাই উজ্জীবিত হলো। তারাও এসে গাওরাসকে উৎসাহ দিল আর বলল, “ঠিকই বলেছ, ওকে হত্যা করাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। তুমি এগিয়ে যাও, আমরা তোমার সাথে আছি। কিন্তু আমাদের বল যে, তুমি কিভাবে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছ?"
গাওরাস উত্তর দিলেন, “তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই। শুধু সুযোগ বুঝে সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হবে। আমি এমনভাবে তাকে আক্রমণ করব যে সে নিজেও বিস্মিত হয়ে যাবে।” এ কথা বলেই গাওরাস আগের দিন সভা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।
সেদিন খুব গরম পড়ছিল। গাওরাস আস্তে আস্তে মুসলমানদের তাবুর কাছে চলে গেল। তার বেশ কাছেই তখন দুজন পাহারারত সাহাবি। আর অল্প দূরেই আরো চারজন বিশ্রাম নিচ্ছিল। তবে তারা বেশ জোরে নাক ডাকছিল, মনে হচ্ছিল গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। অন্য যারা ছিল, তারা একটু বিচ্ছিন্ন হয়ে একেকজন একেক স্থানে যে যার মতো ছিল।
কিন্তু গাওরাসের কি ভাগ্য। তার ডানেই শুয়েছিলেন নবি মুহাম্মাদ (সা)। গাওরাস তাকে দেখে ঠিকই চিনেছিল। নবি (সা) গাছের নিচে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তাঁর তলোয়ারও খুব কাছাকাছি দেখা যাচ্ছিল না। গাওরাসের কাছে তার তলোয়ার ছিল। সে শুধু ভাবছিল, যদি সে সত্যিই তার তলোয়ার দিয়ে নবি মুহাম্মাদকে (সা) হত্যা করতে পারে তাহলে সে পুরোপুরি বিখ্যাত হয়ে যাবে।
গাওরাস হামাগুড়ি দিয়ে সেই গাছের কাছে চলে গেল যার নিচে নবিজি (সা) শুয়ে ছিলেন। তারপর সে আস্তে করে মাথা তুলল। নিজের কোমরে বাঁধা তরবারির খোলস থেকে তলোয়ারটা বের করল এবং নবিজির মুখের উপরে তলোয়ারটা তাক করল। ঠিক তখনই নবি মুহাম্মাদ (সা) চোখ মেললেন। তার চোখ সরাসরি গিয়ে পড়ল গাওরাসের চোখে। গাওরাস তলোয়ারটি তখনই নবিজির (সা) উপর চালাতে চাইছিল, কিন্তু নবিজির (সা) শান্ত চাহনি তাকে কেমন যেন সংশয়ে ফেলে দিল।
গাওরাস নবিজিকে (সা) প্রশ্ন করলেন, “হে মুহাম্মাদ, আপনি কি আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছেন না?"
রাসূল (সা) একেবারে শান্ত ধীর স্থির ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন, “না, মোটেই না। কেন আমি তোমাকে ভয় পাব?”
গাওরাস বলল, “কিন্তু আমার তলোয়ার আপনার দিকে তাক করা, যে কোনো মুহূর্তে তা নেমে আসবে। কেন তাহলে আপনি আমাকে ভয় পাবেন না? আমার হাত থেকে কে আপনাকে বাঁচাবে?”
প্রিয় নবি (সা) একেবারেই শান্ত রইলেন। তাঁর চেহারায় ভয় বা আতঙ্কের ছিটেফোটাও দেখা যাচ্ছিল না। তিনি আবারও ঠাণ্ডা মাথায় উত্তর দিলেন, “আল্লাহই আমাকে তোমার আর তোমার তলোয়ারের হাত থেকে রক্ষা করবেন।"
গাওরাস নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে প্রশ্ন করল, "আপনি কার কথা বললেন মুহাম্মাদ? কে আপনাকে রক্ষা করবে?"
রাসূল (সা) আবার বললেন, “আমার রব আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাকে রক্ষা করবেন।"
গাওরাসের যেন কি হয়ে গেল। সে কোনোভাবেই তলোয়ার নাড়াতে পারছিল না। তার সারা শরীর যেন আড়ষ্ট হয়ে পড়ছিল। একটা সময় তার হাত থেকে তলোয়ার পড়ে গেল।
এবার রাসূল (সা) নিজেই পড়ে থাকা সেই তলোয়ারটি হাতে তুলে নিলেন আর গাওরাসকে প্রশ্ন করলেন, “এবার তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে?"
গাওরাসের বলার মতো কোনো উত্তর ছিল না। মনে হচ্ছিল তার আর কেউ নেই। কিছু সময় পর নবিজি (সা) নিজেই কথা বললেন। তিনি গাওরাসকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তলোয়ারটি নাও। আশা করি, ভবিষ্যতে তুমি এই তলোয়ারটি ভালো কাজে ব্যবহার করবে।”
রাসূলের (সা) সাহাবিরা ততক্ষণে ঘটনা টের পেয়ে গেছেন। তারা হুড়মুড় করে সবাই দৌড়ে এলেন। কেউ কেউ গাওরাসকে শক্ত করে জাপটে ধরলেন- যেন এখনই তারা তাকে হত্যা করবেন। কিন্তু নবিজি (সা) তাদের aggression হতে নিষেধ করলেন। বরং শান্ত থাকতে বললেন। তিনি গাওরাসকে ক্ষমা করে দিলেন এবং সাহাবিদেরও নির্দেশ দিলেন যাতে কোনো ধরনের শাস্তি না দিয়েই ওকে তাৎক্ষণিকভাবে ছেড়ে দেয়া হয়।
নবিজি (সা) গাওরাসের দিকে ফিরে তাকে প্রশ্ন করলেন, “তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আল্লাহই একমাত্র প্রভু এবং তিনি ছাড়া আর কারও ইবাদত করা যাবে না?”
গাওরাস মাথা নাড়ল। বলল, “না, আমি যদি এখন এমনটা বলি, তাহলে সবাই ভাববে আমি বোধ হয় ভয়ে বলেছি। আমি বরং অন্য একটি ওয়াদা করি। আজকের পর থেকে আমি আর কখনো আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না। এমনকি যারা আপনার বিরুদ্ধে লড়াই করবে, তাদেরকেও আমি সমর্থন করব না।”
এই ওয়াদার পরিপ্রেক্ষিতে গাওরাসকে ছেড়ে দেয়া হলো। গাওরাস তার গোত্রের কাছে ফিরে গেল। তার প্রতিবেশিরা সবাই তখন ছুটে এসে তাকে প্রশ্ন করল, “কি হয়েছে? কেন তাকে হত্যা করতে পারলে না?"
গাওরাস উত্তর দিল, “আমি এমন একজন মানুষের কাছ থেকে এসেছি, যিনি পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম মানুষ।” সুবহানআল্লাহ। এভাবেই পরশ পাথর নবিজির (সা) সংস্পর্শে এসে হত্যা করতে আসা গাওরাস উল্টো তার ভক্ত হয়ে ফিরে গেল।
📄 আল্লাহর সাথে থাকার বাসনা
রাসূল (সা) তখন মদিনায় থাকেন। মদিনার আশপাশে এবং গোটা আরব জুড়ে আরো বহু গোত্র ও বংশ আছে যারা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি। আল্লাহ তায়ালাকে এক ও অদ্বিতীয় রব এবং হযরত মুহাম্মাদকে (সা) শেষ নবি হিসেবে মেনে নেয়নি। বরং এসব গোত্রের মধ্যে অনেকেই ছিলেন যারা নবিজি (সা) এবং তাঁর সাহাবিদের উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। ভেতরে ভেতরে তারা রাসূলকে (সা) হিংসা করতেন। সবসময় তারা সুযোগ খুঁজতেন যাতে সুযোগ মতো তারা রাসূলকে (সা) তার সঙ্গী সাথীসহ নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারেন। রাসূলের (সা) উপর তাদের রাগ বেশি ছিল। তার কারণেই সবাই ইসলাম গ্রহণ করেছিল আর দেব-দেবতার পূজা করার বদলে আল্লাহর ইবাদত করতে শুরু করেছিল।
এসব গোত্রগুলো সবসময়ই নবি মুহাম্মাদ (সা) এবং তার সাথীদের হত্যা করার জন্য ভীষণ তৎপর থাকত। মদিনায় বসবাসরত মুসলমানদের পক্ষেও ইসলামের দাওয়াতি কাজ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। এমনকি তারা তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ঠিক মতো করতে পারত না। তারা খেজুর উৎপাদন করতে বা মৌসুম শেষে গাছ থেকে খেজুর সংগ্রহ করতে গিয়েও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছিল। ফলে মুসলমানরা ক্রমশ অভাব, দারিদ্রতা আর খাদ্যকষ্টে পড়ে যাচ্ছিল আর এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার মতো কোনো উপায়ও চোখে পড়ছিল না।
মদিনার মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি করছিল মুহারিব ও গাতফান গোত্র। নিতান্ত বাধ্য হয়েই রাসূলকে (সা) তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে এই দুই গোত্রকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু করতে হলো।
এই দুই গোত্রের প্রধান ব্যক্তিরা যখন জানতে পারল নবি মুহাম্মাদ (সা) তার সাহাবিদের নিয়ে তাদের আক্রমণ করার জন্য আসছে, সঙ্গে সঙ্গে তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল এবং লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেল। ময়দানে গিয়ে রাসূল (সা) আর তার সঙ্গীরা শত্রুদের কাউকেই দেখতে পেলেন না। তারা আবার মদিনায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
ততক্ষণে রাত হয়ে গিয়েছিল। মুসলমানরা একটি সরু পাহাড়ি উপত্যকায় শিবির স্থাপন করল। রাসূল (সা) সাহাবিদের জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করার নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে তাবু তৈরি করতে এবং রাতের খাবারও প্রস্তুত করতে বললেন। উপত্যকার মুখ দিয়ে যাতে হুট করে শত্রুপক্ষের কেউ প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য রাসূল (সা) প্রবেশ মুখে পাহারা বসানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। মুহাজির সাহাবি আম্মার বিন ইয়াসির (রা) এবং আনসার সাহাবি আব্বাদ বিন বিসরকে (রা) তিনি পাহারা দেয়ার দায়িত্ব দিলেন।
আম্মার ও আব্বাদ (রা) মিলে প্রবেশ মুখের কাছেই একটি চমৎকার জায়গাকে বাছাই করলেন, যেখান থেকে একই সাথে মুসলমানদের বসতি শিবির দেখা যায়, আবার প্রবেশ মুখটাকেও ভালোভাবে লক্ষ্য করা যায়। আব্বাদ (রা) তার সাথে খুবই মূল্যবান জিনিস নিয়ে এসেছিলেন। তার কাছে হরিণের চামড়ার তৈরি একটি কাগজ ছিল, যেখানে তিনি তার প্রিয় সুরাটি লিখে এনেছিলেন। কাগজটি তার পকেটেই ছিল। যখন এই যুদ্ধের ঘোষণা এলো এবং তাকে মদিনা থেকে বেরিয়ে আসতে হলো, তখনও তিনি এই সূরাটি মুখস্থ করার চেষ্টা করছিলেন। তখন থেকে কাগজটা তার পকেটেই ছিল।
আব্বাদ (রা) তার সঙ্গী আম্মারকে (রা) বললেন, “প্রিয় ভাই, আসুন আমরা আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বটি দুই ভাগে ভাগ করে নিই। রাত্রের একটি অংশে একজন পাহারা দিব, আর অপর অংশে অন্যজন। আপনি কি রাজি?”
আম্মার (রা) বললেন, "জি, আমি রাজি।” আব্বাদ (রা) আবার তাকে প্রশ্ন করলেন, “আপনি রাতের কোন ভাগে দায়িত্ব পালন করতে চান, এখন নাকি পরের অংশে?” আম্মার (রা) বললেন, “আমার এখন বড্ড ঘুম পাচ্ছে। আমি এখন কাজটা ভালোভাবে করতে পারব না। আমি বরং রাতের প্রথম অংশে ঘুমিয়ে নিই। দ্বিতীয় অংশে আমি পাহারা দিব ইনশাআল্লাহ।” আব্বাদ (রা) বললেন, “কিন্তু দ্বিতীয় অংশে দায়িত্ব পালন কঠিন হবে বেশি। তখন আপনার জেগে থাকতে আরো বেশি কষ্ট হবে।” আম্মার (রা) বললেন, “অসুবিধা নেই। আমার নামাজ পড়ার নিয়ত আছে। নামাজ পড়লে আর সহজে ঘুম আসবে না ইনশাআল্লাহ।" এভাবেই দুই সাহাবি নিজেদের মধ্যে কাজটি বোঝাপড়া করে নিলেন।
এদিকে শত্রুপক্ষের (গাতফান গোত্রের) একজন সদস্য দূর থেকে রাসূল (সা) আর তার সাহাবিদের তাবুগুলোর উপর নজর রাখছিল। যে জায়গা থেকে সে চোখ রাখছিল, তা দুই পাহারারত সাহাবি আম্মার (রা) আর আব্বাদের (রা) অবস্থান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। শত্রুপক্ষের এই লোকটি মুসলমানদের উপর বেজায় ক্ষিপ্ত ছিল। তার স্ত্রীও মুসলমানদের ক্ষতি করার জন্য একটা সময় প্রাণপণ চেষ্টা করত। এরকমই এক চেষ্টা করতে গিয়ে একটি খণ্ড যুদ্ধে লোকটির স্ত্রী নিহত হয়। তারপর থেকে এই ব্যক্তি প্রতিজ্ঞা করেছে কমপক্ষে একজন সাহাবিকে হত্যা করে হলেও সে তার স্ত্রী হত্যার প্রতিশোধ নেবে।
সে যখন উপত্যকার প্রবেশ মুখের দিকে এগিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই আব্বাদ (রা) নামাজে দাঁড়াচ্ছিলেন। তিনি বসতি শিবিরের সামান্য আলোতেই তার নতুন শেখা সূরাটি দিয়ে নামাজ শুরু করলেন। এভাবে পড়তে পড়তেই তিনি কেমন যেন ঘোরে চলে গেলেন। সেই সূরার আয়াতগুলো তাকে এতোটাই মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলল, তার ঈমান এতোটাই বেড়ে গেল এবং তিনি ইবাদতে এতোটাই নিবিষ্ট হয়ে পড়লেন যে, তিনি তার চারপাশের বাস্তবতা এক রকম ভুলেই গেলেন। তিনি তখন সূরা আর রাহমানের আয়াতগুলো পড়ছিলেন,
“তিনি দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের মালিক। অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন অবদানকে অস্বীকার করবে?” (সূরা আর রাহমান: ১৮-১৯)
সাহাবিকে এভাবে তন্ময় হয়ে ইবাদত করতে দেখে অপেক্ষমান শত্রুর চোখ যেন জ্বলে উঠল। সে তার ধনুকে শক্ত করে তীর গেঁথে আব্বাদকে (রা) টার্গেট করে তীরটা ছুড়ে দিল। তীরটা সোজা গিয়ে আব্বাদের (রা) শরীরের এক পাশে বিঁধল। আব্বাদ (রা) তীরটি হাত দিয়ে টান দিয়ে বের করে পাশে রেখে দিলেন এবং তার তেলাওয়াত অব্যাহত রাখলেন।
“নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলের সব কিছুই তাঁর উপর নির্ভরশীল। তিনি সর্বদাই কোনো না কোনো কাজে রত আছেন। অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন অবদানকে অস্বীকার করবে?" (সূরা আর রাহমান : আয়াত ২৯-৩০)
গাতফান গোত্রের সেই ব্যক্তি নিজের মনেই ঐ সাহাবিকে গালি দিল। আবার সে একটি তীর ধনুকে স্থাপন করল এবং আব্বাদকে (রা) লক্ষ্য করে ছুড়ে দিল। এবার তীরটা গিয়ে লাগল আব্বাদের (রা) পায়ে। আব্বাদ (রা) নিচু হয়ে পা থেকে তীরটি বের করে তেলাওয়াত করতে থাকলেন।
এরপর তৃতীয় তীরটি যখন গিয়ে তার শরীরে লাগল এবং ক্ষতস্থানগুলো থেকে বেশি রক্ত বের হতে শুরু করল তখন আব্বাদ (রা) তার তেলাওয়াত শেষ করলেন। তিনি রুকুতে গেলেন, সিজদা করলেন এবং সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করলেন। তারপর তিনি তার সঙ্গী হযরত আম্মারকে (রা) ডেকে তুললেন।
আব্বাদ (রা) একটু নিচু হয়ে তার সহকর্মীকে ডাকছিলেন বলে গাতফান গোত্রের লোকটি মনে করল বোধ হয় তৃতীয় তীরটিতে কাজ হয়েছে এবং তিনি মারা গেছেন। সে আনন্দে মাথা উঁচু করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু যখন সে দেখতে পেল পাহারায় একজন নয় বরং দুজন আছেন এবং দুজনেই জীবিত আছেন, তখন সে ঘাবড়ে গেল। তার মনে ভয় জাগল সে ধরা পড়ে যেতে পারে। তাই সে আর এক মুহূর্তও সেখানে না থেকে দৌঁড়ে পালিয়ে গেল।
হযরত আব্বাদের (রা) ডাক শুনে আম্মার (রা) ঘুম থেকে উঠলেন। যখনি তার চোখ প্রিয়তম সঙ্গী আব্বাদের (রা) উপর পড়ল, তিনি রীতিমতো চমকে উঠলেন। প্রশ্ন করলেন, “প্রথম যখন আপনার শরীরে তীর এসে লাগল, আপনি কেন তখনি আমাকে ডেকে তোলেননি?” আম্মার (রা) খুবই অপরাধবোধে ভুগছিলেন। তার বন্ধু এতো আঘাত পেল, অথচ তিনি কিছুই টের পেলেন না, উল্টো দিব্যি ঘুমিয়ে কাটালেন। এই বিষয়টা তাকে খুবই ব্যথা দিয়েছিল। যাহোক, তিনি তাড়াতাড়ি আব্বাদের (রা) ক্ষতস্থানগুলোতে ব্যান্ডেজ লাগানোর চেষ্টা করলেন।
আব্বাদ (রা) হযরত আম্মারের (রা) অস্বস্তি ও অনুশোচনাবোধ দেখে হেসে ফেললেন আর বললেন, “আম্মার (রা) আপনার কোনো দোষ নেই। প্রকৃতপক্ষে আমি এতো বেশি আনন্দে ছিলাম, এতো বেশি প্রশান্তি পাচ্ছিলাম যে, তীরের আঘাত টেরই পাইনি। আমি শুধু কোনো রকমে তীরগুলো বের করে সূরাটি পড়ে যাচ্ছিলাম। তৃতীয় তীরটি যখন এসে বিঁধল ততক্ষণে আমার সূরাটাও শেষ হয়ে গেছে। তাই নামাজ শেষ করেই আমি আপনাকে একবারে ডেকে তুললাম। আমি আরো কিছুক্ষণ এভাবেই সূরা পড়ে যেতে পারতাম। কিন্তু এরপর যদি আমি মারা যেতাম, আর আপনি টের না পেয়ে ঘুমাতে থাকতেন, তাহলে তো শিবিরে থাকা আমাদের সব সঙ্গীরাই বিপদে পড়ে যেত। আমি তো কোনোভাবেই আমার সাথীদের, বিশেষ করে প্রিয়নবিকে (সা) ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারি না।"
হযরত আম্মার (রা) আব্বাদের (রা) কথা শুনে কেঁদে ফেললেন। সূরা আর রাহমানের প্রতি তার এতোটা দরদ আর রাসূল (সা) ও সাহাবিদের জন্য আব্বাদের (রা) অনুভূতি দেখে হযরত আম্মার (রা) নির্বাক হয়ে পড়লেন। তিনি পরম মমতায় আব্বাদকে (রা) জড়িয়ে ধরে রাখলেন। কুরআনের প্রতি রাসূলের (সা) সাহাবিদের দরদ ছিল এমনই। আল্লাহ আমাদেরকেও একইভাবে কুরআনকে ভালোবাসার তাওফিক দিন। আমিন।
📄 আল্লাহ ও রাসূলই (সাঃ) আমার জন্য যথেষ্ট
বাইজান্টাইন সেনাবাহিনী মুসলমানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
এমন একটি খবর দ্রুত বেগে মদিনাসহ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল। বাইজান্টাইনরা এবার সিদ্ধান্ত নিয়েই মাঠে নেমেছে। তারা মুসলমানদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করেই ফিরবে। কিন্তু রাসূল (সা) এসব কোনো সংবাদেই ঘাবড়াননি। তিনি জানতেন ও বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ তায়ালা যদি সাহায্য করেন তাহলে বিশাল সংখ্যার বাইজান্টাইন বাহিনীকে মুসলমানরা সহজেই হারিয়ে দিতে পারবে।
বাইজান্টাইন বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য রাসূল (সা) জিহাদের ডাক দিলেন। তিনি সকল মুসলমানকে আল্লাহর পথে নিজেদের সর্বোচ্চ কুরবানি দেয়ার আহ্বান করলেন। বাইজান্টাইনরা এবার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী বাহিনী তৈরি করেছে। তাদেরকে প্রতিরোধের জন্য মুসলমানদেরও ব্যাপক পরিমাণে তলোয়ার, ঢাল ও অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জামাদির প্রয়োজন হবে। তাছাড়া তখন গ্রীষ্মকাল, প্রচণ্ড রোদ। এরকম প্রতিকুল সময়ে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে অভিযানে যেতে হলে মুসলমানদের অনেক বেশি পানিরও প্রয়োজন পড়বে।
এখন প্রশ্ন হলো কারা নবিজির (সা) ডাকে সাড়া দেবে? আর কয়েকদিন পরই ফসল কাটার মৌসুম। এই সময়ে কে আবার যুদ্ধে যেতে চাইবে? কে-ই বা নিজের বাসায় পরিবারের সাথে একান্তে সময় কাটানোর সুযোগ ছেড়ে এরকম একটি বিশাল শত্রুবাহিনীকে মোকাবেলা করতে চাইবে? কিংবা কে-ই বা নিজেদের অর্থ ও সম্পদ দান করে ত্যাগ স্বীকার করতে চাইবে?
মুসলমানদের মধ্যে যারা ততটা আন্তরিক নন, ততটা সাহসী নন তারা এই যুদ্ধে যেতে সাহস পেলেন না। কিন্তু সত্যিকার অর্থে যাদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) উপর পূর্ণ বিশ্বাস আছে তারা যে কোনো কিছু করতে এমনকি বড় আকারের ঝুঁকি নিতেও আগ্রহী ছিলেন।
হযরত উমর (রা) ছিলেন এরকমই উন্নত মানসিকতা আর দৃঢ় ঈমানের অধিকারী একজন সাহাবি। রাসূলের (সা) জিহাদের ডাক শুনে তিনি ভাবলেন, “এটাই তো আমার জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ। আমি আল্লাহকে কতটা ভালোবাসি, আল্লাহ তায়ালার প্রতি আমার বিশ্বাস কতটা মজুত, রাসূলের (সা) প্রতি আমি কতটা আন্তরিক, এবার আমি তা-ই প্রমাণ করব।” জিহাদের ডাক শুনে তিনি তাড়াতাড়ি নিজের বাসায় চলে গেলেন। পরিবারের সদস্যদের বললেন, "বাসায় যা আছে সবকিছুকে একত্রিত কর।" একত্রিত করার পর তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "শোন, তোমাদের যার যা কিছু আছে তার অর্ধেক রেখে বাকি অর্ধেক আমাকে দিয়ে দাও। আমি সেই সম্পদগুলো রাসূলের (সা) জিহাদ তহবিলে দান করে দিব।"
এই কথা বলে হযরত উমর (রা) নিজেই সবার আগে তার তলোয়ার আর ঢালগুলো নিয়ে আসলেন। তিনি অর্ধেক নিজের জন্য রেখে বাকি সবটুকু জিহাদের তহবিলের জন্য বরাদ্দ রাখলেন। একইভাবে, তার স্ত্রীও নিজের গয়না আর অন্যান্য সম্পত্তির অর্ধেক জমা দিলেন। এই গয়নাগুলো তার খুব কষ্টের। যখন তারা মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করে আসেন, তখন তিনি কোনো মতে এই সামান্য গয়নাটুকুই সাথে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। স্বামীর অনুরোধে তিনি তার কানের দুলের জোড়াটিও খুলে দিয়ে দিলেন।
হযরত উমর (রা) তাকে বললেন, “তুমি কি শোননি, আমি কি বলেছি? আমি অর্ধেকটা দিতে বলেছি। তুমি কানের দুলের একটা রেখে অপরটা জমা দাও।”
হযরত উমরের (রা) স্ত্রী হাসতে হাসতে বললেন, “প্রিয়তম স্বামী, তুমি জানো না, আমি যদি তোমাকে একটি কানের দুল দেই, তাহলে বাকি দুলটা কেউ কিনবে না। কারণ এগুলো জোড়া হিসেবেই পরতে হয়। আবার আমি যদি একটা দিয়ে অপরটি নিজের কাছে রেখে দিই, তাহলে আমি নিজেও আর দুলটি পরতে পারব না। তাই আমি তোমাকে দুটাই দিয়ে দিলাম।”
নিজের বাড়ি থেকে যতটুকু স্বর্ণ সংগ্রহ হলো তার পরিমাণ বেশ ভালো হওয়ায় হযরত উমর (রা) খুশিই হলেন। তার দুই হাত ভরেই তিনি মূল্যবান সব জিনিসপত্র নিয়ে এবার রাসূলের (সা) কাছে রওনা দিলেন। যতটুকু তিনি হাতে বহন করতে পারলেন না, ততটুকু নিয়ে তার সন্তানরা পেছনে পেছনে আসতে লাগল।
যাত্রাপথে তিনি হযরত আবু বকরকে (রা) দেখতে পেলেন। হযরত উমরের (রা) মতো তিনিও নিজের বাসা থেকে সহায়-সম্পত্তি নিয়ে রাসূলের (সা) কাছে যাচ্ছিলেন। তবে পরিমাণে আবু বকর (রা) খুব বেশি আনতে পেরেছেন বলে হযরত উমরের (রা) কাছে মনে হলো না। অন্তত বাইরে থেকে দেখে তার তেমন ধারণাই হলো।
মনে মনে হযরত উমর (রা) ভাবলেন, “যাক অন্তত একবার আমি আবু বকরকে (রা) ছাড়িয়ে যেতে পেরেছি। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার ক্ষেত্রে অন্তত একবার আমি তাকে পেছনে ফেলতে পেরেছি।” এসব ভাবতে ভাবতে মোটামুটি আনন্দ নিয়েই হযরত উমর (রা) রাসূলের (সা) দরবারে প্রবেশ করলেন।
হযরত উমর (রা) নিজের ও সন্তানদের বহন করা যাবতীয় মালামাল রাসূলের (সা) সামনে রাখলেন আর বললেন, "আপনার আহবানের প্রতিক্রিয়ায় এই হলো আমার সামান্য অবদান। আপনি আল্লাহর রাস্তায় যে কোনো ভাবে আমার এই সম্পদগুলো ব্যবহার করতে পারেন।"
রাসূল (সা) হযরত উমরের (রা) ভূমিকায় খুবই সন্তুষ্ট হলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, “হে উমর, আপনি আপনার নিজের ও পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছেন?" রাসূলের (সা) মনে এরকম প্রশ্ন এলো, কেননা হযরত উমর (রা) এতো বেশি মালামাল নিয়ে এসেছিলেন যে, রাসূল (সা) আশঙ্কা করছিলেন হযরত উমর (রা) তাঁর পরিবারকে না আবার ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেন। তারা না আবার অভাবে পড়ে যায়।
হযরত উমর (রা) নবিজিকে (সা) আশ্বস্ত করে বললেন, “আপনি উদ্বিগ্ন হবেন না। তাদের কাছেও যথেষ্ট আছে।”
রাসূল (সা) আবার প্রশ্ন করলেন, “যথেষ্ট আছে বুঝলাম, কিন্তু কতটুকু?"
হযরত উমর (রা) উত্তর দিলেন, "আমি আপনার সামনে যতটুকু হাজির করেছি ততটুকুই। আমি আমার যাবতীয় সম্পদকে দুইভাগে ভাগ করেছি। একভাগ নিজেদের কাছে রেখেছি আর অপর ভাগ আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেয়ার জন্য নিয়ে এসেছি।" রাসূল (সা) এবার সন্তুষ্ট হলেন।
এবার হযরত আবু বকর (রা) সামনে এগিয়ে এলেন। তিনি তার ছোট ব্যাগটি রাসূলের (সা) সামনে রাখলেন। রাসূল (সা) যে প্রশ্নটি হযরত উমরকে (রা) করেছিলেন সেই একই প্রশ্ন হযরত আবু বকরকেও (রা) করলেন। বললেন, “হে আবু বকর, আপনি আপনার নিজের ও পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছেন?"
আবু বকর (রা) এদিক ওদিক তাকাতে থাকলেন। তিনি প্রশ্নের উত্তরটি সরাসরি না দিয়ে বরং এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। আবার তিনি রাসূলের (সা) কাছে কিছু গোপনও করতে চাইছিলেন না। তিনি অনেক ভেবে উত্তর দিলেন, “তাদের আছে, তাদের নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। আমি তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকেই (সা) রেখে এসেছি। আমাদের পরিবারের কাছে সব মিলিয়ে যা ছিল, আমি পুরোটাই আপনার সামনে হাজির করেছি।”
রাসূল (সা) মৃদু হেসে তার ঘনিষ্ঠ সাহাবি ও বন্ধু আবু বকরের (রা) দিকে তাকালেন। এভাবেই আবু বকর (রা) আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনে এবং নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে থাকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। ইসলাম গ্রহণের পর একেবারে প্রথম দিন থেকেই হযরত আবু বকর (রা) সবসময়ই নিজের সবটুকু রাসূলের (সা) জন্য বিলিয়ে দিতে শুরু করেন। তিনি হলেন সেই সৌভাগ্যবান মানুষ, যিনি রাসূলের (সা) মদিনায় হিজরতের সময় তার সফরসঙ্গী হিসেবে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। হযরত উমর (রা) এই ঘটনার পর অনেকটা লজ্জিত হয়েই বাসায় ফিরে আসলেন। তিনি স্বীকার করলেন, “আবু বকর (রা) আরো একবার প্রমাণ করলেন যে, তিনি আমার চেয়ে কত ভালো মানুষ, কত ভালো মানের মুসলমান। আল্লাহ ও রাসূলের (সা) প্রতি আবু বকরের (রা) যে আনুগত্য, ভালোবাসা ও ত্যাগ- তা সীমাহীন। তার তুলনা শুধু তিনি নিজেই।"