📄 নবী করীম (ছাঃ) ও তরবারিওয়ালা
এক সফরে নবী করীম (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবীগণ এক মরু উপত্যকায় বিশ্রামের জন্য ডেরা ফেলেন। নবী করীম (ছাঃ) একটা গাছে তাঁর তরবারি ঝুলিয়ে রেখে শুয়ে পড়েন। ছাহাবীরাও যে যার মত ছায়াদার গাছ দেখে বিশ্রামে মশগুল হয়ে পড়েন। হঠাৎ করে নবী করীম (ছাঃ)-এর গলার আওয়াযে তারা ঘাবড়িয়ে যান। তারা তাঁর কাছে এসে দেখেন তাঁর পাশে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে, আর তার পাশে একটা তরবারি পড়ে আছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁদের বললেন,
إِنَّ رَجُلاً أَتَانِي وَأَنَا نَائِمٌ فَأَخَذَ السَّيْفَ فَاسْتَيْقَظْتُ وَهُوَ قَائِمٌ عَلَى رَأْسِي فَلَمْ أَشْعُر إِلا وَالسَّيْفُ صَلْنَا فِي يَدِهِ فَقَالَ لِي مَنْ يَمْنَعُكَ مِنِّي قَالَ قُلْتُ اللَّهُ. ثُمَّ قَالَ فِي الثَّانِيَةِ مَنْ يَمْنَعُكَ مِنِّى قَالَ قُلْتُ اللَّهُ. قَالَ فَشَامَ السَّيْفَ فَهَا هُوَ ذَا جَالِسٌ -
'আমি ঘুমিয়ে ছিলাম, এমন সময় এই লোকটা এসে তরবারিটা হাতে করে। আমি জেগে দেখি, সে আমার শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম তার হাতে তরবারির খাপ খোলা। সে আমাকে বলল, আমার হাত থেকে কে তোমাকে রক্ষা করবে? আমি বললাম, আল্লাহ। দ্বিতীয়বার সে বলল, আমার হাত থেকে কে তোমাকে রক্ষা করবে? আমি বললাম, আল্লাহ। এবার সে তরবারিটা খাপে পুরে ফেলল। এখন তো তাকে দেখছ, সে বসে পড়েছে'। একেই বলে ভরসা, আত্মসমর্পণ ও আল্লাহ্র নিকট সাহায্য প্রার্থনা।
টিকাঃ
৪৮. মুসলিম হা/৮৪৩।
📄 নবী করীম (ছাঃ) গিরিগুহায়; জনৈকা মহিলা ও তার ছাগপাল
আবুবকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, وَأَنَا فِي الْغَارِ لَوْ أَنْ أَحَدَهُمْ نَظَرَ تَحْتَ قَدَمَيْهِ لأَبْصَرَنَا . فَقَالَ : مَا ظَنُّكَ يَا أَبَا بَكْرٍ بِاثْنَيْنِ اللَّهُ ثَالِثُهُمَا - '(ছাওর) গিরিগুহায় থাকাকালে আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বললাম, (হে আল্লাহ্র রাসূল!) কেউ যদি তার দু'পায়ের নিচ দিয়ে তাকায় তাহ'লে তো সে অবশ্যই আমাদের দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, হে আবুবকর! দু'জন ভাবছ কি? আল্লাহ তো তাদের (আমাদের) তৃতীয়জন'।
এই হ'ল ভরসা ও আল্লাহতে সমর্পণ, যা ভীষণ সঙ্কট কালে বান্দার থেকে খোলাখুলি ফুটে উঠেছে। বান্দা অন্তর থেকে আল্লাহ্র মুখাপেক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার উপর ভরসা করেছে এবং তার নিকটেই নিজের যাবতীয় কাজ অর্পণ করেছে, বিশেষ করে যখন আল্লাহ্র নিকট সমর্পণ ব্যতীত তার আর কোন অবলম্বন অবশিষ্ট নেই।
মহিলা ও তার ছাগল পালের ঘটনায় তাওয়াক্কুলের গুরুত্বের চূড়ান্ত রূপ ধরা পড়েছে। ভরসা করলে একজন মানুষ কী ফল লাভ করতে পারে সে কথাও এ ঘটনা থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে।
ইমাম আহমাদ (রহঃ) তাঁর গ্রন্থে নবী করীম (ছাঃ)-এর যুগের এ ঘটনাটি সংকলন করেছেন।
إِنَّ امْرَأَةً كَانَتْ فِيْهِ فَخَرَجَتْ فِي سَرِيَّةِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ وَتَرَكَتْ ثِنْتَيْ عَشْرَةَ عَنْزاً لَهَا وَصِيْصِيَتَهَا كَانَتْ تَنْسِجُ بِهَا - قَالَ : فَفَقَدَتْ عَنْزاً مِنْ غَنَمِهَا وَصِيْصِيَتَهَا فَقَالَتْ يَا رَبِّ إِنَّكَ قَدْ ضَمِنْتَ لِمَنْ خَرَجَ فِي سَبِيلِكَ أَنْ تَحْفَظُ عَلَيْهِ وَإِنِّي قَدْ فَقَدْتُ عَنْزاً مِنْ غَنَمِي وَصِيصِيَتِي وَإِنِّي أَنْشُدُكَ عَنْزِي وَصِيصِيَتِي. قَالَ فَجَعَلَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَذْكُرُ شِدَّةَ مُنَا شَدَتِهَا لِرَبِّهَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَأَصْبَحَتْ عَنْزُهَا وَمِثْلُهَا وَصِيصِيتُهَا وَمِثْلُهَا - १० १०
'জনৈকা মহিলা মদীনায় বাড়ীতে ছিল। অতঃপর সে মুসলিম সেনাদলের সাথে যুদ্ধে যাত্রা করেছিল। বাড়ীতে সে ১২টা ছাগল এবং তার কাপড় বুননের একটা তাঁত/কাঁটা/মাকু রেখে গিয়েছিল। বাড়ী ফিরে এসে সে দেখে, তার ছাগপাল থেকে একটা ছাগল আর তার সেই তাঁত/কাঁটা/মাকু নেই। সে তখন আল্লাহ্র কাছে ফরিয়াদ করে বলল, হে আমার মালিক! তুমি তো তোমার রাস্তায় যে বের হবে তার হেফাযতের দায়িত্ব নিয়েছ। এদিকে আমি তোমার রাস্তায় বের হয়ে ফিরে এসে দেখছি আমার ছাগপাল থেকে একটা ছাগল আর আমার কাপড় বুননের তাঁত/কাঁটা/মাকু নেই। আমি তোমাকে কসম দিয়ে বলছি, আমার ছাগল ও তাঁত/কাঁটা/মাকু ফিরিয়ে দাও। উক্ত মহিলা তার মালিকের নিকট কঠিনভাবে যে শপথ করেছিল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বার বার তার উল্লেখ করলেন। অবশেষে মহিলাটি সকাল বেলা তার ছাগল ও অনুরূপ একটা ছাগল আর তাঁত/কাঁটা/মাকু এবং অনুরূপ একটা তাঁত/কাঁটা/মাকু ফিরে পেল'। সুবহানাল্লাহ! কী ভীষণ ব্যাপার!!
এই মহিলা আল্লাহ্র উপর প্রকৃত অর্থে ভরসা করেছিল। ফলে আল্লাহ কেবল তার ছাগলই হেফাযত করেননি; বরং তাওয়াক্কুলের বরকতে তাকে দ্বিগুণ করে দিয়েছেন।
টিকাঃ
৪৯. বুখারী হা/৩৬৫৩; মুসলিম হা/২৩৭১।
৫০. আহমাদ হা/২০৬৮৩; ছহীহাহ হা/২৯৩৫, হাদীছ ছহীহ।
📄 জনৈকা মহিলা ও তার চুলা
ইমাম আহমাদ (রহঃ) আরেকটি ঘটনা তাঁর সনদে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন,
'অতীতকালে দু'জন স্বামী-স্ত্রী ছিল। ধন-সম্পদ বলতে তাদের কিছুই ছিল না। স্বামী বেচারা একদিন সফর করে বাড়ী ফিরে এল। সে ছিল প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত। ক্ষুধায় অবসন্ন হয়ে সে তার স্ত্রীর নিকটে বলল, তোমার কাছে খাবার মত কিছু আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ, সুসংবাদ শোন তোমার নিকট আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক এসেছে। [তার কাছে আসলে কিছুই ছিল না, কেবলই আল্লাহ্র উপর আশা-ভরসা ও নির্ভর করে সে একথা বলেছিল]। পুরুষ লোকটা বলল, তোমার ভাল হোক, তোমার কাছে কিছু থাকলে একটু জলদি কর। সে বলল, হ্যাঁ আছে বৈকি। একটু ছবর কর, আমরা আল্লাহ্র রহমতের আশা করছি। এভাবে যখন তার ক্ষুধা দীর্ঘায়িত হয়ে চলল তখন সে তার স্ত্রীকে বলল, তোমার উপর রহম হোক, ওঠো, দেখ, তোমার কাছে রুটি-টুটি থাকলে তা নিয়ে এস। আমি তো ক্ষুধায় একবারে শেষ হয়ে গেলাম। স্ত্রী বলল, এই তো চুলা পেকে এল বলে, তাড়াহুড়ো কর না। এভাবে কিছুক্ষণ কেটে গেলে যখন স্বামীটা আবার কথা বলবে বলবে এমন সময় স্ত্রী মনে মনে বলল, আমি উঠে গিয়ে আমার চুলাটা দেখি না। সে গিয়ে দেখল, চুলা ছাগলের সিনার/রানের গোশতে ভরপুর হয়ে আছে, আর তার যাঁতা দু'টো থেকে আটা বের হয়ে চলেছে। সে যাঁতার নিকট গিয়ে তা ঝেড়ে মুছে আটা বের করে নিল এবং চুলা থেকে ছাগলের সিনার/রানের গোশত বের করে আনল। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, যাঁর হাতে আবুল কাসেম মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর জীবন তাঁর শপথ! মহিলাটি যদি তার দু'যাঁতায় যা আটা ছিল এবং ঝাড়ামুছা না করত তাহ'লে ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত যাঁতাটি তাকে আটা দিয়ে যেত'।
📄 ওমর (রাঃ) ও কুষ্ঠরোগী এবং খালিদ (রাঃ) ও বিষ
হাদীছের গ্রন্থগুলোতে দু'টি ঘটনার উল্লেখ আছে কিছু লোক যা দুষ্কর মনে করে।
একটি ঘটনা ইবনু ওমর (রাঃ)-এর সঙ্গে জড়িত। তিনি একজন কুষ্ঠরোগীর সাথে বসে খেয়েছিলেন।
দ্বিতীয় ঘটনা হযরত খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ)-এর বিষ পানের সাথে জড়িত। আবুস সাফার থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার খালিদ বিন ওয়ালীদ হিরা নগরে অবস্থান করছিলেন। তখন লোকেরা তাকে বলল, احْذَرِ السُّمَّ لاَ يَسْقِيَكَهُ الْأَعَاجِمُ ، فَقَالَ: إِيتُونِي بِهِ فَأُتِيَ بِهِ، فَأَخَذَهُ بِيَدِهِ ثُمَّ اقْتَحَمَهُ وَقَالَ: بِسْمِ اللَّهِ فَلَمْ يَضُرَّهُ شَيْئًا - 'আপনি কিন্তু সাবধানে থাকবেন, অনারবরা যেন আপনাকে বিষ পান না করিয়ে দেয়। তিনি তখন বললেন, তোমরা আমার নিকট বিষ নিয়ে এস। তাঁর নিকট বিষ নিয়ে আসা হ'ল। তিনি 'বিসমিল্লাহ' বলে তা পান করে নিলেন। বিষে তার মোটেও কোন ক্ষতি হ'ল না'।
হযরত ওমর (রাঃ)-এর ঘটনায় আল্লাহ তা'আলার উপর তাঁর কঠিন তাওয়াক্কুলের নিদর্শন মেলে। আলেমগণ এ ঘটনার বেশ কিছু দিক উল্লেখ করেছেন। যেমন-
(১) ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) রোগ সংক্রমণের বিষয়কে দৃঢ়ভাবে নাকচ করতে চেয়েছেন এবং কুষ্ঠরোগী থেকে নবী করীম (ছাঃ)-এর দূরে থাকার আদেশ লঙ্ঘন করতে চাননি।
(২) ওমর (রাঃ) কুষ্ঠ রোগীকে সমবেদনা জানাতে এরূপ করেছিলেন।
)৩) যে আল্লাহ্র উপর শক্তিশালী ভরসা রাখে সে হাদীছ لَاَ عَدْوَى 'রোগ সংক্রমণ বলে কিছু নেই'-এর উপর আমল করবে; আর যে আল্লাহ্র উপর তাওয়াক্কুলে দুর্বল সে 'কুষ্ঠরোগী থেকে পালিয়ে যাও' )فِرَّ مِنَ الْمَحْذُومِ( হাদীছের উপর আমল করবে।
আর খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ)-এর ঘটনা থেকে বুঝা যায় তিনি আল্লাহ তা'আলার উপর যথার্থ ভরসা করেছিলেন বলেই বিষ তাঁর উপর কোনই ক্রিয়া করতে পারেনি। তাই বলে অন্য কারো জন্য বিষ পানে খালিদ (রাঃ)-এর অনুকরণ আদৌ সিদ্ধ হবে না। বিদ্বানগণ তাঁর ঘটনারও বেশ কিছু দিক তুলে ধরেছেন। যেমন-
(১) এটি ছিল খালিদ (রাঃ)-এর কারামত। তাই অন্য কারো পক্ষে তার অনুসরণ বৈধ হবে না। নচেৎ বিষের প্রভাবে সে নিহত হ'তে পারে।
(২) হ'তে পারে যে, নবী করীম (ছাঃ)-এর পক্ষ থেকে খালিদের জন্য এমন কোন অঙ্গীকার ছিল যে, বিষ তাকে কোন ক্ষতি করতে পারবে না। তাই খালিদ (রাঃ) আল্লাহ্র উপর ভরসা করে তা পান করে নিয়েছিলেন।
(৩) কিছু বর্ণনায় এসেছে, শত্রুপক্ষ যাতে এ দৃশ্য দেখে তার অনুগত হয় এবং মুসলমানদের জান-মালের কোন ক্ষতি না করে সেজন্য তিনি বিষ পান করেছিলেন।
টিকাঃ
৫১. আহমাদ হা/৯৪৪৫, হায়ছামী মাজমাউয যাওয়ায়েদ গ্রন্থে (হা/১৭৮৭৪) এর বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্য আখ্যা দিয়েছেন। তবে শায়খ আলবানী ও শু'আয়েব আরনাউত যঈফ বলেছেন। ছহীহাহ হা/২৯৩৭-এর আলোচনা দ্রঃ।
৫২. তিরমিযী হা/১৮১৭, সনদ যঈফ; মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হা/২৫০২২; মূল বইয়ে ভুলবশতঃ ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব ছাপা হয়েছে।
৫৩. মুসনাদে আবু ইয়া'লা হা/৭১৮৬; মুহাক্কিক আসাদ সালীম বলেন, এর রাবীগণ ছিকাহ। কিন্তু সনদ মুনকাতি'।
৫৪. বুখারী হা/৫৭০৭; মিশকাত হা/৪৫৭৭।
৫৫. ফাতহুল বারী, ১০/২৪৮।