📄 ২. দাওয়াত বা প্রচারের ক্ষেত্রে তাওয়াক্কুলের আদেশ
আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ - 'এরপরেও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলে দাও, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তার উপরেই আমি ভরসা করি। আর তিনিই হচ্ছেন মহান আরশের মালিক' (তওবা ৯/১২৯)। আল্লাহ্র কাছে এসেই তো সকল শক্তি, রাষ্ট্রক্ষমতা, শ্রেষ্ঠত্ব, পদ-পদবী শেষ হয়ে যায়। যে তাঁর আশ্রয় নেয় তিনি তার জন্য যথেষ্ট। তাঁর শরণ গ্রহণকারীর জন্য দ্বিতীয় কারো লাগে না। সকল ক্ষয়-ক্ষতি দূর করে তিনি তাকে রক্ষা করেন।
নবী নূহ (আঃ) দাওয়াতী কাজে আল্লাহ্র উপর ভরসা করেছিলেন। আল্লাহ বলেন, وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ نُوْحٍ إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ إِنْ كَانَ كَبُرَ عَلَيْكُمْ مَقَامِي وَتَذْكِيرِي بِآيَاتِ اللهِ فَعَلَى اللهِ تَوَكَّلْتُ فَأَجْمِعُوا أَمْرَكُمْ وَشُرَكَاءَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُنْ أَمْرُكُمْ عَلَيْكُمْ غُمَّةً ثُمَّ اقْضُوا إِلَيَّ وَلَا تُنْظِرُوْنِ - 'আর তুমি তাদেরকে নূহের বৃত্তান্ত পাঠ করে শুনাও। যখন সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! যদি তোমাদের কাছে আমার অবস্থান ও আল্লাহ্র আয়াত সমূহ দ্বারা উপদেশ দান ভারী মনে হয়, তাহ'লে আমি আল্লাহ্র উপর ভরসা করলাম। এখন তোমরা তোমাদের সকল শক্তি এবং তোমাদের শরীকদের একত্রিত কর। যাতে তোমাদের সেই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তোমাদের কারো কাছে কোনরূপ গোপনীয়তা না থাকে। অতঃপর আমার ব্যাপারে তোমরা একটা ফায়ছালা করে ফেল এবং আমাকে মোটেই অবকাশ দিয়ো না' (ইউনুস ১০/৭১)।
হযরত নূহ (আঃ) দীর্ঘদিন ধরে তার জাতিকে দাওয়াত দিয়েছেন, দাওয়াতী কাজে তিনি দীর্ঘকাল তাদের মাঝে অবস্থান করেছেন, তারপরও তারা তাকে মিথ্যাবাদী বলেছে। তখন তিনি আল্লাহ্র উপর তাওয়াক্কুল করার সাথে তার কাজ আল্লাহ্র নিকট ন্যস্ত করেন এবং দাওয়াতী কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।
একজন মুসলিম প্রচারকের বৈশিষ্ট্য তো এমনিতর হওয়া উচিত। দাওয়াতের পথে সকল কষ্টে সে ধৈর্য ধারণ করবে এবং আল্লাহ্র উপর তাওয়াক্কুল করে চলবে।
📄 ৩. বিচার-ফায়ছালায় তাওয়াক্কুল
আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيْهِ مِنْ شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبِّي عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ - ')হে মানুষ)! তোমরা যে বিষয়ে মতবিরোধ কর, তার ফায়ছালা তো আল্লাহ তা'আলারই হাতে। জেনে রাখ, তিনি হচ্ছেন আল্লাহ, তিনিই আমার প্রতিপালক। আমি তাঁর উপরই ভরসা করি এবং তার দিকেই রুজু হই' (শূরা ৪২/১০)।
এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, বিচারক কিংবা শাসক আল্লাহ্র উপর ভরসা করে বিচার কিংবা শাসন কাজ চালালে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তারা সাহায্য-সহযোগিতা পাবেন এবং তারা সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের উপর থাকতে পারবেন।
📄 ৪. জিহাদ ও শত্রুর সাথে যুদ্ধে তাওয়াক্কুল
আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَإِذْ غَدَوْتَ مِنْ أَهْلِكَ تُبَوِّئُ الْمُؤْمِنِينَ مَقَاعِدَ لِلْقِتَالِ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ - إِذْ هَمَّتْ طَائِفَتَانِ مِنْكُمْ أَنْ تَفْشَلَا وَاللَّهُ وَلِيُّهُمَا وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُوْنَ - আর তুমি স্মরণ কর সেদিনের কথা, যেদিন (ওহোদের দিন) তুমি মুমিনদেরকে যুদ্ধের জন্য ঘাঁটিতে সন্নিবেশ করার উদ্দেশ্যে স্বীয় পরিবার থেকে প্রভাতকালে বের হয়েছিলে। বস্তুতঃ আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন'। 'যখন তোমাদের মধ্যকার দু'টি দল ভীরুতা প্রকাশের সংকল্প করছিল। অথচ আল্লাহ তাদের অভিভাবক ছিলেন। আর আল্লাহ্র উপরেই মুমিনদের ভরসা করা উচিত' (আলে ইমরান ৩/১২১-১২২)।
মুসলিম বাহিনী যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম, অস্ত্র-শস্ত্র সব কিছুই প্রস্তুত করেছিল, তারা সৈন্য সমাবেশও করেছিল, তারপরও আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাঁর উপর ভরসা করতে বলেছেন। কেননা তিনিই সাহায্যকারী এবং বিজয় দানকারী। এ তথ্য স্পষ্ট করা হয়েছে আল্লাহ্র নিম্নোক্ত বাণীতে- إِنْ يَنْصُرْكُمُ اللهُ فَلاَ غَالِبَ لَكُمْ وَإِنْ يَخْذُلْكُمْ فَمَنْ ذَا الَّذِي يَنْصُرُكُمْ مِنْ بَعْدِهِ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُوْنَ - 'যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তবে কেউই তোমাদের উপর জয়লাভ করবে না। আর যদি তিনি তোমাদের পরিত্যাগ করেন, তবে তাঁর পরে কে আছে যে তোমাদের সাহায্য করবে? অতএব মুমিনদের উচিত আল্লাহ্র উপরেই ভরসা করা' (আলে ইমরান ৩/১৬০)।
দুর্বল অবস্থাতে মহান আল্লাহই সাহায্যকারী। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ هَمَّ قَوْمٌ أَنْ يَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ فَكَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُوْنَ - 'হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহ্র অনুগ্রহকে স্মরণ কর। যখন একটি সম্প্রদায় (ইহুদীগণ) তোমাদের প্রতি হস্ত প্রসারিত করার সংকল্প করেছিল । তখন তিনি তাদের হাতকে তোমাদের থেকে প্রতিহত করেন। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর আল্লাহ্র উপরেই মুমিনদের ভরসা করা উচিত' (মায়েদাহ ৫/১১)।
আবার সবল শক্তিশালী অবস্থাতেও তিনিই সাহায্যকারী। আল্লাহ বলেন, لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ ۙ وَيَوْمَ حُنَيْنِ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا - 'আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন বহু ক্ষেত্রে (স্মরণ করে) হুনায়েন-এর দিনে। যেদিন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে প্রফুল্ল করেছিল। কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি' (তওবা ৯/২৫)।
মূসা (আঃ)-এর কাহিনীতেও শক্তিমানদের বিরুদ্ধে আল্লাহ্র সাহায্যের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, قَالُوا يَا مُوسَى إِنَّ فِيْهَا قَوْمًا جَبَّارِينَ وَإِنَّا لَنْ نَدْخُلَهَا حَتَّى يَخْرُجُوا مِنْهَا فَإِنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا فَإِنَّا دَاخِلُوْنَ - قَالَ رَجُلَانِ مِنَ الَّذِينَ يَخَافُوْنَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمَا ادْخُلُوا عَلَيْهِمُ الْبَابَ فَإِذَا دَخَلْتُمُوهُ فَإِنَّكُمْ غَالِبُوْنَ وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوْا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ - 'তারা বলল, হে মূসা! সেখানে পরাক্রমশালী একটি সম্প্রদায় রয়েছে। অতএব আমরা সেখানে কখনো প্রবেশ করব না, যতক্ষণ না তারা সেখান থেকে বের হয়ে যায়। যদি তারা বের হয়ে যায়, তাহ'লে আমরা প্রবেশ করব। তখন দুই ব্যক্তি বলল, যারা আল্লাহকে ভয় করত এবং আল্লাহ যাদের উপর অনুগ্রহ করেছিলেন, তোমরা তাদের উপর হামলা চালিয়ে শহরের প্রধান ফটক পর্যন্ত যাও। ফলে যখনই তোমরা সেখানে পৌঁছবে, তখনই তোমরা জয়লাভ করবে। আর আল্লাহ্র উপরে তোমরা ভরসা কর, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও' (মায়েদাহ ৫/২২-২৩)।
📄 ৫. সন্ধিস্থলে আল্লাহ্র উপর ভরসা
আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَإِنْ جَنَحُوْا لِلسَّلْمِ فَاجْنَحْ لَهَا وَتَوَكَّلْ عَلَى اللهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ - 'যদি তারা সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তুমিও সেদিকে ঝুঁকে পড় এবং আল্লাহ্র উপর ভরসা কর। নিঃসন্দেহে তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ' (আনফাল ৮/৬১)।
অনেকে সন্ধির সময়ে তাওয়াক্কুলকে অনর্থক মনে করে। তাদের কথা যুদ্ধই যখন বন্ধ, মুসলমানদের উপর শত্রুপক্ষের হস্তক্ষেপও যখন বন্ধ তখন তাওয়াক্কুলের আবশ্যকতা কি?
আসলে এমন ক্ষেত্রেও তাওয়াক্কুলের বহুবিধ উপকারিতা আছে। যেমন কুরাইশ কাফের ও নবী করীম (ছাঃ)-এর মধ্যে হুদায়বিয়ার সন্ধি হয়েছিল। এই সন্ধির পর আল্লাহ্র উপর তাওয়াক্কুলের প্রেক্ষিতে আরব উপদ্বীপের অসংখ্য লোক ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিল। মুসলমানদের জন্য এ সন্ধি বিজয়ের দ্বার খুলে দিয়েছিল।