📘 আল্লাহর উপর ভরসা > 📄 (ক) আল্লাহ কর্তৃক তাঁর নবীকে তাওয়াক্কুলের আদেশ

📄 (ক) আল্লাহ কর্তৃক তাঁর নবীকে তাওয়াক্কুলের আদেশ


কুরআনের বহু আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বিশেষভাবে তাঁর নবীকে তাঁর উপর তাওয়াক্কুল করার আদেশ দিয়েছেন। যেমন: فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّكَ عَلَى الْحَقِّ الْمُبِينِ - 'অতএব তুমি আল্লাহ্র উপর ভরসা কর। তুমি তো স্পষ্ট সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত' (নামল ২৭/৭৯)।

আল্লাহ বলেন, فَاعْبُدْهُ وَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ 'অতএব তুমি তাঁর ইবাদত কর ও তাঁর উপরেই ভরসা কর' (হৃদ ১১/১২৩)। আল্লাহ আরও বলেন, وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لاَ يَمُوْتُ وَسَبِّحْ بِحَمْدِهِ وَكَفَى بِهِ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا - 'ভরসা কর সেই চিরঞ্জীব সত্তার উপর, যাঁর মৃত্যু নেই এবং তুমি তাঁর প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা কর। বস্তুতঃ বান্দাদের পাপসমূহের খবর রাখার ব্যাপারে তিনিই যথেষ্ট' (ফুরক্বান ২৫/৫৮)।

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ 'আল্লাহর রহমতের কারণেই তুমি তাদের প্রতি (অর্থাৎ স্বীয় উম্মতের প্রতি) কোমলহৃদয় হয়েছ। যদি তুমি কর্কশভাষী কঠোর হৃদয়ের হ'তে তাহ'লে তারা তোমার পাশ থেকে সরে যেত। কাজেই তুমি তাদের ক্ষমা করে দাও ও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং যরূরী বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর যখন তুমি সংকল্পবদ্ধ হবে, তখন আল্লাহ্র উপর ভরসা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর উপর ভরসাকারীদের ভালবাসেন' (আলে ইমরান ৩/১৫৯)।

📘 আল্লাহর উপর ভরসা > 📄 (খ) আল্লাহ কর্তৃক তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে তাঁর উপর ভরসা করার আদেশ

📄 (খ) আল্লাহ কর্তৃক তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে তাঁর উপর ভরসা করার আদেশ


আল্লাহ তা'আলা তার মুমিন বান্দাদেরকে তাঁর উপর ভরসা করতে আদেশ দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন, وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ ‘আর আল্লাহ্র উপরেই মুমিনদের ভরসা করা উচিত' (আলে ইমরান ৩/১২২)।

📘 আল্লাহর উপর ভরসা > 📄 (গ) মুমিনরা তাদের রবের উপর 'তাওয়াক্কুলকারী' বিশেষণে বিশেষিত

📄 (গ) মুমিনরা তাদের রবের উপর 'তাওয়াক্কুলকারী' বিশেষণে বিশেষিত


আল্লাহ্র উপর ভরসা করা দয়াময় আল্লাহ্র বান্দাদের একটি বড় গুণ। এটি তাদের এমন একটি প্রতীক, যা দ্বারা অন্যদের থেকে তাদের পৃথক করা যায়। মুমিনদের জন্য এটি একটি সুস্পষ্ট চিহ্ন। আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ - 'নিশ্চয়ই মুমিন তারাই, যখন তাদের নিকট আল্লাহকে স্মরণ করা হয়, তখন তাদের অন্তর সমূহ ভয়ে কেঁপে ওঠে। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে' (আনফাল ৮/২)।

'তারা তাদের মালিকের উপরই ভরসা করে'- বাক্যটির মর্মার্থ হ'ল তারা আল্লাহকে ছাড়া কাউকে আকাঙ্ক্ষা করে না; তিনি ছাড়া কেউ তাদের উদ্দেশ্য নয়; তারা তাঁর নিকট ছাড়া কোথাও আশ্রয় নেয় না; তারা কেবলই তাঁর নিকট তাদের প্রয়োজন পূরণের আবেদন জানায়; তারা তাকে ছাড়া আর কারো প্রতি আকর্ষণ বোধ করে না। তারা জানে যে, তিনি যা চান তাই হয় এবং তিনি যা চান না তা হয় না। তিনিই ক্ষমতার একচ্ছত্র প্রয়োগকারী, তাঁর কোন শরীক নেই, তাঁর হুকুম রদ করার শক্তিও কারো নেই এবং তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। আয়াতের এরূপ ব্যাখ্যাই দিয়েছেন হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ)।

টিকাঃ
১৯. তাফসীর ইবনে কাছীর ২/৩৭৯।

📘 আল্লাহর উপর ভরসা > 📄 (ঘ) নবীগণের তাওয়াক্কুলের কতিপয় উদাহরণ

📄 (ঘ) নবীগণের তাওয়াক্কুলের কতিপয় উদাহরণ


আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর সাথীদেরকে আদর্শ ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে গ্রহণের জন্য আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ, 'তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার সাথীদের মধ্যে রয়েছে সুন্দরতম আদর্শ' (মুমতাহিনা ৬০/৪)।

আল্লাহ জাল্লা শানুহু আমাদের নিকট তাদের সম্পর্কে বলেছেন যে, তারা বলেন رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّlنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ 'হে আমাদের মালিক! আমরা তোমারই উপর ভরসা করেছি, তোমার দিকে প্রত্যাবর্তন করছি। আর তোমার নিকটেই তো প্রত্যাবর্তন স্থল' (মুমতাহিনা ৬০/৪)। অর্থাৎ আমাদের যাবতীয় কাজে আমরা তোমারই উপর ভরসা করি এবং তোমারই নিকট সব কাজ সমর্পণ ও সোপর্দ করেছি। এমনিভাবে তারা আল্লাহ্র উপর ভরসা করেছিলেন এবং যাবতীয় কাজ আল্লাহ্র কাছে নিঃশর্তভাবে সমর্পণ করেছিলেন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে তারা তাওয়াক্কুলকে সাথী করে নিয়েছিলেন। দয়াময় আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তারা তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যয় করেছিলেন।

ইবরাহীম (আঃ)-কে তো তাঁর জাতি পুড়িয়ে মারার ব্যবস্থা করেছিল। এজন্য তারা প্রচুর জ্বালানী কাঠ যোগাড় করেছিল। সুদ্দী বলেন, সে সময় একজন মহিলা অসুস্থ হ'লে সে মানত করত যদি সে সুস্থ হয়ে ওঠে তাহ'লে ইবরাহীমকে পোড়ানোর জন্য এক বোঝা কাঠ সে বয়ে দিয়ে আসবে।

তারপর তারা ইবরাহীম (আঃ)-কে পোড়ানোর জন্য বড় একটা গর্ত খুঁড়ে তাতে কাঠ জমা করে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন যখন খুব উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং তার লেলিহান শিখা বিস্তার করতে থাকে, তখন মিনজানীক নামক এক ধরনের যন্ত্রে করে তারা ইবরাহীম (আঃ)-কে ঐ আগুনে ফেলে দেয়। ফেলে দেওয়ার সময় ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেন, حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ 'আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট । তিনি কতই না সুন্দর তত্ত্বাবধায়ক'! (আলে ইমরান ৩/১৭৩)। যেমন ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে এসেছে তিনি বলেন, 'ইবরাহীম (আঃ)-কে যখন আগুনে ফেলা হয় তখন তিনি বলেছিলেন حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ 'আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক'।

মূসা (আঃ)-কে দেখুন, কিভাবে তিনি আল্লাহ্র উপর ভরসা করেছিলেন এবং তাঁর জাতিকে তার উপর ভরসা করতে হুকুম দিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন, وَقَالَ مُوسَى يَا قَوْمِ إِنْ كُنْتُمْ آمَنْتُمْ بِاللهِ فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُسْلِمِينَ - 'আর মূসা (তার নির্যাতিত কওমকে সান্ত্বনা দিয়ে) বলল, হে আমার কওম! যদি তোমরা (সত্যিকার অর্থে) আল্লাহ্র উপর ঈমান এনে থাক, তাহ'লে তাঁর উপরেই তোমরা ভরসা কর। যদি তোমরা আত্মসমর্পণকারী হয়ে থাক' (ইউনুস ১০/৮৪)।

শায়খ সুলায়মান বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব (রহঃ) বলেন, আয়াতের অর্থ এই যে, মূসা (আঃ) তাঁর উম্মতকে আল্লাহ কর্তৃক তাদের জন্য নির্ধারিত পবিত্র ভূমিতে প্রবেশের আদেশ দিয়েছিলেন। তিনি তাদের বলেছিলেন, তারা যেন স্বৈরাচারীদের ভয়ে পিছটان না দেয়; বরং সামনে এগিয়ে যায়, তাদের ভয় না করে, তাদের দেখে তটস্থ ও সন্ত্রস্ত না হয়। প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে তারা যেন আল্লাহ্র উপর ভরসা করে। তারা যেন বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহ তাদের সাথে কৃত অঙ্গীকার সত্যি-সত্যিই বাস্তবায়ন করবেন, যদি তারা মুমিন হয়।

উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবীগণের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। ওহোদ যুদ্ধের প্রাক্কালের ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوْا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيْمَانًا وَقَالُوْا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ - 'যাদেরকে লোকেরা বলেছিল, নিশ্চয়ই তারা (কুরায়েশ বাহিনী) তোমাদের বিরুদ্ধে সমবেত হয়েছে। অতএব তোমরা তাদের থেকে ভীত হও। একথা শুনে তাদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পায় এবং তারা বলে 'আমাদের জন্য আল্লাহ যথেষ্ট। তিনি কতই না উত্তম তত্ত্বাবধায়ক'! (আলে ইমরান ৩/১৭৩)।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ 'আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তিনি কতই না উত্তম কর্ম বিধায়ক'- বাক্যটি ইবরাহীম (আঃ)-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল তখন তিনি বলেছিলেন, আর মুহাম্মাদ (ছাঃ) এটি বলেছিলেন যখন কাফেররা বলেছিল, 'যাদেরকে লোকেরা বলেছিল, নিশ্চয়ই তারা (কুরায়েশ বাহিনী) তোমাদের বিরুদ্ধে সমবেত হয়েছে। অতএব তোমরা তাদের থেকে ভীত হও। একথা শুনে তাদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পায় এবং তারা বলে, 'আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট । তিনি কতই না উত্তম তত্ত্বাবধায়ক'! (আলে ইমরান ৩/১৭৩)।

সুতরাং যখন ইসলাম বিরোধীরা মুসলমানদের হুমকি দেয় এবং শত্রুপক্ষের জনশক্তি ও অস্ত্র শক্তির ভয় দেখায়, তখন এই তাওয়াক্কুলই মুমিনদের একমাত্র অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। কবি বলেন,

هو القريب المجيب المستغاث به + قل حسبي الله معبودي ومتكلي
খুব নিকটে আছেন, তিনি দো'আ কবুলকারী,
সুখে-দুঃখে তাঁরই কাছে এস আরয করি।
বল সবে আমার তরে আল্লাহ যথেষ্ট,
মা'বুদ আমার, ভরসা আমার সকলের ইষ্ট।

টিকাঃ
২০. ঐ, ৩/২৭৪।
২১. ছহীহ বুখারী হা/৪৫৬৩।
২২. তায়সীরুল আযীযিল হামীদ, পৃঃ ৪৩৮।
২৩. বুখারী হা/৪৫৬৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00