📘 আল্লাহর উপর ভরসা > 📄 তাওয়াক্কুল ও তাওয়াকুলের (ভান) মধ্যে পার্থক্য

📄 তাওয়াক্কুল ও তাওয়াকুলের (ভান) মধ্যে পার্থক্য


ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

لَوْ أَنَّكُمْ كُنتُمْ تَوَكَّلُوْنَ عَلَى اللهِ حَقَّ تَوَكَّلِهِ لَرُزِقْتُمْ كَمَا تُرْزَقُ الطَّيْرُ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوْحُ بِطَانًا -

'তোমরা যদি আল্লাহ্র উপর যথার্থভাবে ভরসা করতে তাহ'লে পাখ-পাখালির মতই তোমরা জীবিকা পেতে। তারা ভোর বেলায় ওঠে ক্ষুধার্ত অবস্থায় আর সন্ধ্যায় ভরাপেটে নীড়ে ফেরে'।

এ হাদীছে উপায়-উপকরণ গ্রহণের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। যে পাখির খাবার যোগাড়ের দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছেন সে তো তার কাছে খাবার আপনা থেকে আসবে সেই আশায় তার বাসায় বসে থাকে না। বরং খুব ভোরে ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। আল্লাহ তার ইচ্ছে পূরণ করে দেন। ফলে সে যখন বাসায় ফিরে তখন তার পেট ভরা ও পরিতৃপ্ত থাকে।

অবশ্য মুসলমানকে জাগতিক কোন উপকরণ ও পন্থা অবলম্বন করতে হ'লে প্রথমেই তাকে দেখতে হবে শরী'আতের নিরিখে তা বৈধ কি-না। আমরা কিছু লোককে দেখি, তারা তাদের উদ্দেশ্য হাছিলের জন্য কর্মচারীদের ঘুষ প্রদান করে আর বলে, এটা তাওয়াক্কুলের অংশ। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় নকল করে অথচ বলে এটাও তাওয়াক্কুল। অথচ এর কোনটাই আদৌ তাওয়াক্কুল নয়। বরং এগুলো তাওয়াক্কুলের সম্পূর্ণ বিপরীত ও বিরোধী। এহেন মুসলিম যদি আল্লাহ্র উপর প্রকৃতই ভরসা করত তাহ'লে তারা কখনই শরী'আত গর্হিত কোন কাজ করত না।

পূর্বেই বলা হয়েছে তাওয়াক্কুলের জন্য বিভিন্ন উপায়-উপকরণ ও কাজের পথ অবলম্বন অপরিহার্য। কিন্তু কোন কিছু না করে নিশ্চেষ্ট বসে থাকার নাম তাওয়াক্কুল নয়; বরং তা তাওয়াক্কুলের ভান (تواکل)। তাওয়াকুল বা নিশ্চেষ্ট বসে থেকে আল্লাহ্র উপর ভরসা যাহির করা আল্লাহ্র দ্বীনের কোন কিছুতেই পড়ে না।

বলা হয়ে থাকে, যে তাওয়াক্কুল ছেড়ে দেয় তার তাওহীদে খুঁত তৈরী হয়, আর যে জাগতিক উপায়-উপকরণ বা কাজকর্ম ছেড়ে দেয় তার বিবেক-বুদ্ধি বিনষ্ট হয়ে যায়। মুসলিম জাতির দুর্বলতার অন্যতম কারণ এই তাওয়াকুল বা নিশ্চেষ্ট বসে থেকে সময় পার করা। লোকে বাড়ি বসে থেকে জীবিকা লাভের আশা করে, একটু নড়েচড়ে দেখে না; আবার দাবী করে আমি আল্লাহ্র উপর ভরসা করে আছি। লোকেরা আশায় থাকে যে, আল্লাহ তাদেরকে তাদের শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য করবেন অথচ সেজন্য তাদের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, যুদ্ধের প্রস্তুতিজনিত অস্ত্র-শস্ত্র এবং আনুষঙ্গিক জিনিসের কোনই ব্যবস্থা ও উদ্যোগ নেই।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, كَانَ أَهْلُ الْيَمَنِ يَحُجُّونَ وَلَا يَتَزَوَّدُوْنَ وَيَقُولُوْنَ نَحْنُ الْمُتَوَكِّلُوْنَ، فَإِذَا قَدِمُوا مَكَّةَ سَأَلُوا النَّاسَ - 'ইয়ামানবাসীরা হজ্জ করতে আসত কিন্তু পথখরচ আনত না। তারা বলত, আমরা আল্লাহ্র উপর ভরসাকারী। তারপর যখন তারা মক্কায় পৌঁছত তখন মানুষের কাছে হাত পাতত'। এতদপ্রেক্ষিতে আল্লাহ নাযিল করেন, وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى 'আর (হজ্জের জন্য) তোমরা পাথেয় সাথে নাও। নিশ্চয়ই সর্বোত্তম পাথেয় হ'ল আল্লাহভীতি' (বাক্বারাহ ২/১৯৭)।

দেখুন, কিভাবে আল্লাহ তা'আলা তাদের তাওয়াক্কুলের দাবীকে প্রত্যাখ্যান করেছেন; অথচ তারা তো হজ্জের কাজে লাগতে পারে এমন কোন পাথেয়ই সাথে না এনে কেবলই আল্লাহ্র উপর ভরসা করেছিল। আবার তাওয়াক্কুলের ঈপ্সিত লক্ষ্য এটাও নয় যে, বান্দা উপকরণের পেছনে তার জীবনপাত করবে এবং সাধ্যাতীত কাজে নিজেকে নিয়োজিত করবে। বরং কখনো কখনো তার জন্য সহজ ও লঘু উপকরণও যথেষ্ট হ'তে পারে। তার প্রমাণ মারইয়াম (আঃ)-এর ঘটনা। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে খেজুর গাছ ধরে ঝাঁকি দিতে বলেছিলেন, যাতে তাঁর সামনে খেজুর ঝরে পড়ে। আল্লাহ বলেন, وَهُزَّيْ إِلَيْكِ بِجذْعِ النَّخْلَةِ تُسَاقِطْ عَلَيْكِ رُطَبًا جَنِيًّا 'আর তুমি খেজুর গাছের কাণ্ড ধরে নাড়া দাও। সেটি তোমার উপর পাকা খেজুর নিক্ষেপ করবে' (মারিয়াম ১৯/২৫)।

অনেকের মনে বিস্ময় জাগে- এহেন দুর্বল গর্ভবতী মহিলা কিভাবে মযবৃত ও শক্ত খেজুর গাছ ধরে এমনভাবে ঝাঁকি দিল যে টপটপ করে খেজুর ঝরে পড়ল? আমরা বলি, হ্যাঁ, এই মহীয়সী মহিলার ঘটনা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে উপকরণ গ্রহণের গুরুত্ব শিক্ষা দিয়েছেন- চাই সেসব উপকরণ লঘু ও দুর্বল হৌক। কেননা এই সতী-সাধ্বী মহিলার সেই মুহূর্তে এরূপ দুর্বল ধরনের কাজ করা ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না।

আল্লাহ তা'আলার জন্য কোন মাধ্যম ছাড়াই খেজুর নীচে ফেলানো অবশ্যই সম্ভব ছিল। কিন্তু যেহেতু কোন কিছু পেতে হ'লে মাধ্যম একটি জাগতিক নিয়ম হিসাবে রয়েছে, সেহেতু আল্লাহ মারিয়াম (আঃ)-কে কাণ্ড ধরে ঝাঁকি দিতে বলেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি আল্লাহ্র উপর যথাযথভাবে ভরসা করেছিলেন এবং তাঁর দুর্বল পদ্ধতি কাজে লাগিয়েছিলেন তখন আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা ফলবতী করেছিলেন এবং ফলগুলোকে তাঁর নাগালের মধ্যে এনে দিয়েছিলেন। কবি বলেছেন,

توكل على الرحمن في كل حاجة + ولا تؤثرن العجز يوماً على الطلب
ألم تر أن الله قال لمريم + إليكِ فهنِّي الْحِزْعَ يَسَّاقَطِ الرُّطَب
ولو شاء أن تجنيه من غير هزّها + جَنَتْهُ ولكن كلُّ شيءٍ له سبب

ভরসা কর সকল কাজে আল্লাহ দয়াময়ের পরে
প্রাধান্য দিও না অক্ষমতাকে চেষ্টার পরে মুহূর্ত তরে।
তুমি কি দেখনি, বলেছেন আল্লাহ মারিয়ামকে
খেজুর পেতে নাড়া দাও তুমি খেজুর গাছের কাণ্ডটাকে
চাইলে তিনি দিতেন খেজুর ঝাঁকি ছাড়াই
কিন্তু কিছু পাইতে হ'লে উপকরণ বিনে উপায় নাই।

যখন মানুষ সম্ভাব্য সব উপকরণ হারিয়ে ফেলে তখন যেন সে সবচেয়ে মহান ও শক্তিশালী উপকরণের কথা ভুলে না যায়। তাহ'ল মহান আল্লাহ্র সমীপে দো'আ ও ফরিয়াদ।

টিকাঃ
১৫. তিরমিযী হা/২৩৪৪; ইবনু মাজাহ হা/৪১৬৪; হাকেম হা/৭৮৯৪, ৪/৩৫৪; মিশকাত হা/৫২৯৯।
১৬. বুখারী হা/১৫২৩; মিশকাত হা/২৫৩৩।
১৭. ইবনু আব্দিল বার, বাহজাতুল মাজালিস ওয়া উনসুল মাজালিস, ১/২৬ পৃঃ।

📘 আল্লাহর উপর ভরসা > 📄 তাওয়াক্কুলের হুকুম

📄 তাওয়াক্কুলের হুকুম


নিশ্চয়ই আল্লাহ্র উপর ভরসা করা শীর্ষস্তরের ফরযসমূহের অন্তর্গত একটি বড় ফরয। ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, فإن التوكل على الله واجب من أعظم الواجبات كما أن الإخلاص لله واجب وقد أمر الله بالتوكل في غير آية أعظم مما أمر بالوضوء وغسل الجنابة، ونهى عن التوكل على غيره سبحانه - 'আল্লাহ্র উপর ভরসা করা ফরয। এটি উচ্চাঙ্গের ফরয সমূহের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ্র জন্য ইখলাছ বা বিশুদ্ধচিত্তে কাজ করা ফরয। ওযু ও অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতার জন্য গোসলের ব্যাপারে যেখানে আল্লাহ তা'আলা একটি আয়াতে একবার বলে তা ফরয সাব্যস্ত করেছেন, সেখানে একাধিক আয়াতে তিনি তাঁর উপর ভরসা করার আদেশ দিয়েছেন এবং তাঁকে ছাড়া অন্যের উপর ভরসা করতে নিষেধ করেছেন'।

বরং তাওয়াক্কুল ঈমানের শর্ত। এজন্য আল্লাহর বাণী وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوْا إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ 'আর আল্লাহ্হ্র উপরে তোমরা ভরসা কর, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও' (মায়েদাহ ৫/২৩) এই আয়াতের মর্মার্থ এই দাঁড়াচ্ছে যে, বান্দার থেকে তাওয়াক্কুল দূর হয়ে গেলে সাথে সাথে ঈমানও দূর হয়ে যাবে।

তাওয়াক্কুল তাওহীদে উলুহিয়্যা বা উপাস্যের একত্ববাদের যেসব ভিত্তি রয়েছে তন্মধ্যে একটি। সূরা ফাতিহার পাঁচ নং আয়াত একথার প্রমাণ বহন করে। আল্লাহ বলেন, إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ 'আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং একমাত্র আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি' (ফাতিহা ১/৫)।

টিকাঃ
১৮. মাজমূ' ফাতাওয়া ৭/১৬।

📘 আল্লাহর উপর ভরসা > 📄 শেষ কথা

📄 শেষ কথা


প্রিয় ভাই আমার! উপরের আলোচনা থেকে আপনার কাছে আল্লাহ্র উপর ভরসা করার শ্রেষ্ঠত্ব ও গুরুত্ব পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমরা আপনাকে ব্যাখ্যা করেছি যে, ভরসা উপায়-উপকরণ অবলম্বনে বাধা দেয় না এবং উপায়-উপকরণ অবলম্বন না করাকে ভরসা (توکل) বলে না; বরং তাওয়াকুল (التواكل) বা তাওয়াক্কুলের ভান বলে। তাওয়াকুল বাতিলের পূজারী ও কুঁড়েদের দর্শন।

আমরা আপনার সামনে আল্লাহ্র উপর ভরসার হুকুম বা বিধান এবং যেসব ক্ষেত্রে আল্লাহ তাওয়াক্কুলের আদেশ দিয়েছেন তেমন কিছু ক্ষেত্রও আলোচনা করেছি।

আমরা আল্লাহ্র উপর যথার্থ ভরসাকারী কিছু লোকের ঘটনা এবং তাদের অর্জিত ফলাফলের কথাও আপনার সামনে তুলে ধরেছি। ভরসা বিষয়ে আল্লাহ্র সহযোগিতায় আমাদের সামান্য কিছু আলোচনা এখানেই শেষ করছি।

আল্লাহ তা'আলার নিকট আমাদের একান্ত প্রার্থনা তিনি যেন আমাদেরকে এবং আপনাদেরকে তাঁর উপর ভরসাকারীদের শ্রেণীভুক্ত করেন, আমাদেরকে একত্ববাদীদের দলভুক্ত করেন এবং আমাদেরকে তাদের অন্ত র্ভুক্ত করেন, যারা হক কথা বলে এবং হক মত বিচার করে। আর আল্লাহ্র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হৌক আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ), তাঁর পরিবার-পরিজন এবং তাঁর ছাহাবীগণের উপর।

***

سبحانك اللهم وبحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك وأتوب إليك،
اللهم اغفر لي ولوالدي وللمؤمنين يوم يقوم الحساب

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00