📘 আল্লাহর উপর ভরসা > 📄 বিষয়ের গুরুত্ব

📄 বিষয়ের গুরুত্ব


সাঈদ ইবনু জুবায়ের (রহঃ) বলেছেন, التوكل على الله جماع الإيمان 'আল্লাহ্র উপর ভরসা ঈমানের সামষ্টিক রূপ'।

ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, التوكل نصف الدين والنصف الثاني الإنابة 'তাওয়াক্কুল দ্বীনের অর্ধেক; বাকী অর্ধেক হ'ল ইনাবা'। কেননা দ্বীন হ'ল সাহায্য কামনা ও ইবাদতের নাম। এই সাহায্য কামনা হ'ল তাওয়াক্কুল এবং ইবাদত-বন্দেগী হ'ল ইনাবা। আরবী 'ইনাবা' (الإنابة) অর্থ আল্লাহ্র দিকে মনোনিবেশ ও তওবা করে ফিরে আসা।

আল্লাহ্র উপর ভরসার মর্যাদা ও গুরুত্ব ব্যাপক জায়গা জুড়ে রয়েছে। তাওয়াক্কুল সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ব্যাপকতা এবং বিশ্ববাসীর প্রয়োজনের আধিক্যের ফলে তাওয়াক্কুলকারীদের দ্বারা এর আঙিনা সদাই ভরপুর থাকে।

সুতরাং তাওয়াক্কুল জড়িয়ে আছে ওয়াজিব (ফরয), মুস্তাহাব, মুবাহ সবকিছুরই সাথে। এমনকি যেসব নাস্তিক আল্লাহ্র অস্তিত্ব অস্বীকার করে ক্ষেত্রবিশেষে তারাও নিজেদের লক্ষ্য পূরণে আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা করে। আসলে মানুষের প্রয়োজনের কোন সীমা-পরিসীমা নেই। কাজেই প্রয়োজন পূরণার্থে তাদেরকে অবশ্যই আল্লাহ্র উপর নির্ভর করতে হয়।

ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, বান্দা যদি কোন পাহাড় সরাতে আদিষ্ট হয় আর যদি সে কাজে সে আল্লাহ তা'আলার উপর যথার্থভাবে ভরসা করতে পারে, তবে সে পাহাড়ও সরিয়ে দিতে পারবে।

সুতরাং একজন মুসলিম তার যাবতীয় কাজে আল্লাহ্ উপর ভরসাকে একটা মুস্তাহাব বিষয় ভাবতে পারে না; বরং সে তাওয়াক্কুলকে একটি দ্বীনী দায়িত্ব বা আবশ্যিক কর্তব্য বলে মনে করবে।

শায়খ সুলায়মান বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব (রহঃ) বলেন, যে মূল থেকে ইবাদতের নানা শাখা-প্রশাখা উদগত হয়েছে তা হ'ল : আল্লাহ্র উপর ভরসা, তাঁর নিকট সত্য দিলে আশ্রয় নেওয়া এবং আন্ত রিকভাবে তাঁর উপর নির্ভর করা। তাওয়াক্কুলই আল্লাহ্র একত্ববাদের স্বীকারোক্তির সারকথা। এর মাধ্যমেই তাওহীদের চূড়ান্তরূপ নিশ্চিত হয়। আল্লাহ তা'আলার প্রতি ভালবাসা, ভয়, রব ও উপাস্য হিসাবে তাঁর নিকট আশা-ভরসা এবং তাঁর নির্ধারিত তাক্বদীর বা ফায়ছালায় সন্তুষ্ট থাকার মত মহতী বিষয়গুলো তাওয়াক্কুল থেকেই উৎপত্তি লাভ করে। এমনকি অনেক

টিকাঃ
৬. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা ৭/২০২।
৭. ইবনুল কাইয়িম, মাদারিজুস সালিকীন ২/১১৩।
৮. ঐ, ১/৮১।

📘 আল্লাহর উপর ভরসা > 📄 আল্লাহ্র উপর ভরসার তাৎপর্য

📄 আল্লাহ্র উপর ভরসার তাৎপর্য


তাওয়াক্কুলের হাকীকত বা মূল কথা হ'ল অন্তর থেকে আল্লাহ্র উপর ভরসা করা, সেই সাথে পার্থিব নানা উপায়-উপকরণ ব্যবহার করা এবং পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহই রিযিকদাতা, তিনিই একমাত্র স্রষ্টা, জীবন ও মৃত্যু দাতা। তিনি ছাড়া যেমন কোন ইলাহ বা উপাস্য নেই, তেমনি তিনি ছাড়া কোন প্রতিপালক নেই।

তাওয়াক্কুল শব্দটি ইসতি'আনাহ (الاستعانة) থেকে ব্যাপক অর্থবোধক। কেননা ইসতি‘আনাহ (সাহায্য প্রার্থনা) হ'ল, যে কোন কাজে আল্লাহ তা'আলা যাতে বান্দাকে সাহায্য করেন সেজন্য তাঁর দরবারে সাহায্যের আবেদন-নিবেদন করা।

পক্ষান্তরে তাওয়াক্কুলের মধ্যে যেমন আমাদের যাবতীয় কাজে আল্লাহ্র সাহায্য প্রার্থনা শামিল আছে, তদ্রূপ সব রকম কল্যাণ লাভ ও অকল্যাণ প্রতিহত করতে আল্লাহ্র উপর ভরসাও শামিল আছে। অন্যান্য বিষয়ও তাওয়াক্কুলের আওতাভুক্ত।

ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, যে কাজ করতে আল্লাহ হুকুম করেছেন তাতে আল্লাহ্র সাহায্য চাওয়া তাওয়াক্কুল। আবার যে কাজ বান্দার সামর্থ্যের বাইরে আল্লাহ যাতে তা যুগিয়ে দেন সে নিবেদনও তাওয়াক্কুল। সুতরাং ইসতি‘আনাহ বা সাহায্য প্রার্থনা বান্দার নানা আমলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু তাওয়াক্কুল তার থেকেও কিছু বেশী। মানুষ যাতে কল্যাণ লাভ করতে পারে এবং ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারে সেজন্যও আল্লাহ্র উপর তাওয়াক্কুল করতে হয়। আল্লাহ বলেন, وَلَوْ أَنَّهُمْ رَضُوا مَا آتَاهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَقَالُوا حَسْبُنَا اللهُ سَيُؤْتِينَا اللهُ مِنْ فَضْلِهِ وَرَسُولُهُ إِنَّا إِلَى اللَّهِ

টিকাঃ
৯. শায়খ সুলায়মান বিন আব্দুল্লাহ, তায়সীরুল আযীযিল হামীদ, পৃঃ ৮৬।

📘 আল্লাহর উপর ভরসা > 📄 উপায়-উপকরণ বা মাধ্যম গ্রহণ

📄 উপায়-উপকরণ বা মাধ্যম গ্রহণ


যে কোন চাহিদা পূরণে উপায়-উপকরণ ও মাধ্যম গ্রহণ না করা কোন অবস্থাতেই আল্লাহ্র উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসার মর্মার্থ নয়। তাওয়াক্কুলের বরং দু'টি দিক রয়েছে। এক. আল্লাহ্র উপর ভরসা ও নির্ভরতা। দুই. তাঁর সাথে কাজের উপকরণ অবলম্বন করা।

আসলে লক্ষণীয় যা তা হ'ল- শুধুই উপায়-উপকরণের উপর নির্ভর না করা। বান্দাকে জানতে ও বুঝতে হবে যে, উপায়-উপকরণ গ্রহণ করে চাহিদা পূরণ ও সমস্যা সমাধান কেবল জাগতিক নিয়ম মাত্র। উপকারকারী ও অপকারকারী কেবলই আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা ।

ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, سر التوكل وحقيقته هو اعتماد القلب على الله وحده، فلا يضره مباشرة الأسباب مع خلو القلب من الاعتماد عليها والركون إليها - 'তাওয়াক্কুলের রহস্য ও তাৎপর্য হ'ল- বান্দার অন্তর এক আল্লাহ্র উপর নির্ভরশীল হওয়া; জাগতিক উপায়-উপকরণের প্রতি অন্তরের মোহশূন্য থাকা, তার প্রতি আকৃষ্ট না হওয়া। এসব উপায়-উপকরণের সরাসরি ক্ষতি কিংবা উপকার করার কোনই ক্ষমতা নেই'।

আল্লাহ্র উপর প্রকৃত তাওয়াক্কুলকারী এবং তাওয়াক্কুলের মৌখিক দাবীদারদের মধ্যে এটাই বুনিয়াদী পার্থক্য। কেননা প্রকৃত তাওয়াক্কুলকারীর উপায়-উপকরণ যদি হাতছাড়া হয়েও যায় তবুও তার কিছু যায় আসে না, সে তো ভাল করেই জানে, যে আল্লাহ্র উপর সে নির্ভর করে তিনি নিত্য ও চিরস্থায়ী। কিন্তু তাওয়াক্কুলের মৌখিক দাবীদারের জাগতিক উপায়-উপকরণ হাতছাড়া হওয়ার সাথে সাথে সে ভেঙ্গে পড়ে। আল্লাহ্র উপর ভরসার মাত্রা দুর্বল হওয়ার কারণেই তার এমনটা হয়।

টিকাঃ
১১. ইবনুল কাইয়িম, আল-ফাওয়ায়েদ, পৃঃ ৮৭।

📘 আল্লাহর উপর ভরসা > 📄 নবী করীম (ছাঃ)-এর উপায়-উপকরণ গ্রহণ

📄 নবী করীম (ছাঃ)-এর উপায়-উপকরণ গ্রহণ


নবী করীম (ছাঃ) ছিলেন আল্লাহ্র উপর সবচেয়ে বড় তাওয়াক্কুলকারী। তা সত্ত্বেও তিনি বহুক্ষেত্রে জাগতিক উপায়-উপকরণ অবলম্বন করেছেন তাঁর উম্মতকে একথা বুঝানোর জন্য যে, উপায়-উপকরণ গ্রহণ তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়।

ওহোদ যুদ্ধে তিনি একটার পর একটা করে দু'টো বর্ম গায়ে দিয়েছিলেন। সায়েব ইবনু ইয়াযীদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, أَنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ظَاهَرَ بَيْنَ دِرْعَيْنِ يَوْمَ أُحُدٍ - 'ওহোদ যুদ্ধের দিনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ( দু'টি বর্ম পরে জনসমক্ষে এসেছিলেন'। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর উম্মতের জন্যও যুদ্ধের পোশাকের ব্যবস্থা করেছেন।

মক্কা বিজয়ের দিনে তিনি শিরস্ত্রাণ ব্যবহার করেছিলেন। আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَخَلَ مَكَّةَ يَوْمَ الْفَتْحِ وَعَلَى رَأْسِهِ الْمِغْفَرُ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মক্কা বিজয় দিবসে যখন মক্কায় প্রবেশ করেন তখন তাঁর মাথায় শিরস্ত্রাণ ছিল'।

হিজরতের সময় তিনি একজন পথপ্রদর্শক সাথে নিয়েছিলেন, যে তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তাঁর যাত্রাপথে কোন পদচিহ্ন যাতে না থাকে তিনি সে ব্যবস্থাও নিয়েছিলেন। তিনি যাত্রার জন্য এমন সময় বেছে নিয়েছিলেন যখন লোকজন সাধারণতঃ সজাগ থাকে না। আবার জনগণ সচরাচর যে পথে চলাচল করে তিনি তা বাদ দিয়ে অন্য রাস্তা ধরেছিলেন।

এসব কিছুই উপায় ও মাধ্যম অবলম্বনের অন্তর্গত। তিনি তাঁর উম্মতকে এই শিক্ষাই দিয়েছেন যে, উপায়-উপকরণ গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ্র উপর ভরসাকারী কোন মুসলিমই উপায়-উপকরণ গ্রহণ থেকে দূরে থাকতে পারে না।

টিকাঃ
১২. আহমাদ হা/১৫৭৬০, শু'আইব আরনাউত হাদীছটিকে ছহীহ গণ্য করেছেন।
১৩. ছহীহ ইবনু হিব্বান হা/৭০২৮।
১৪. বুখারী হা/৪২৮৬; মুসলিম হা/১৩৫৭; মিশকাত হা/২৭১৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00