📄 প্রকাশকের নিবেদন
بسم الله الرحمن الرحيم
আল্লাহ্র অশেষ রহমতে আমরা সউদী আরবের প্রখ্যাত ইসলামী বিদ্বান ও সুপ্রসিদ্ধ ফৎওয়া ওয়েবসাইট www.islamqa.com-এর কর্ণধার মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ (জন্ম: রিয়ায, ১৯৬০ খৃ.) রচিত 'অন্তরের আমল সমূহ' (سلسلة أعمال القلوب) সিরিজের ২য় পুস্তক التوكل-এর বঙ্গানুবাদ 'আল্লাহ্র উপর ভরসা' সম্মানিত পাঠকদের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হ'লাম। ফালিল্লাহিল হাম্দ। ইতিপূর্বে মাসিক 'আত-তাহরীক'-য়ে ধারাবাহিকভাবে (অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৬ খৃ.) পুস্তকটির বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ গুরুত্বপূর্ণ পুস্তকে সম্মানিত লেখক 'তাওয়াক্কুল' (আল্লাহ্র উপর ভরসা)-এর সংজ্ঞা, গুরুত্ব, উপকারিতা, তাওয়াক্কুল পরিপন্থী কাজ, আল্লাহ্ উপর ভরসার কতিপয় ঘটনা প্রভৃতি বিষয়ে সংক্ষেপে সুন্দরভাবে আলোকপাত করেছেন।
আল্লাহ্র উপর ভরসা মুমিন জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এটি আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যমও বটে। আল্লাহ্র উপর ভরসাকে দ্বীনের অর্ধেক হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। কারণ তাঁর উপর ভরসা ছাড়া কোন কাজই সুচারুরূপে সম্পাদিত হয় না। এজন্য যেকোন কাজ সমাধা করার জন্য প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ অবলম্বন পূর্বক সত্যিকার অর্থে আল্লাহ্র উপর ভরসা করতে হবে। তাহ'লে তিনি বান্দার জন্য সেই কাজ সহজসাধ্য করে দিবেন।
অন্যদিকে উপায়-উপকরণ অবলম্বন না করা তাওয়াক্কুল নয়; বরং তাওয়াক্কুলের ভান (تَوَاكُلُّ)। যেমন কোন ব্যক্তি জীবিকা অন্বেষণের কোন উপায় অবলম্বন না করে যদি ঘরে বসে থাকে তাহ'লে সেটি হবে তাওয়াক্কুলের ভান। এরূপ নিশ্চেষ্ট বসে থাকা ইসলাম সমর্থন করে না।
📄 ভূমিকা
সকল প্রশংসা আল্লাহ্, যিনি সৃষ্টিকুলের প্রতিপালনকারী। ছালাত ও সালাম আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর, যিনি নবী ও রাসূলকুলের শ্রেষ্ঠ। সেই সঙ্গে ছালাত ও সালাম তাঁর পরিবার ও ছাহাবীগণের উপর।
অতঃপর আমাদের এই 'তাওয়াক্কুল' (আল্লাহ্র উপরে ভরসা) পুস্তিকাটি 'অন্তরের আমল সমূহ' সিরিজের দ্বিতীয় রচনা। কোন এক জ্ঞান-গবেষণা মজলিসে আল্লাহ তা'আলা আমাকে এটি উপস্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এটি তৈরীতে একদল নিবেদিতপ্রাণ বিদ্যানুরাগী আমাকে সহায়তা করেছেন। এখন আল্লাহ্র রহমতে এটি পুস্তক আকারে মুদ্রিত হ'তে যাচ্ছে।
আল্লাহ্র উপর ভরসা মানব জীবনে একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্তর। এর প্রভাব-প্রতিপত্তিও সুদূরপ্রসারী। ঈমানের যেসব বিষয় ফরয বা আবশ্যকীয়, এটি তন্মধ্যে শ্রেষ্ঠ। দয়াময় আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভে যে সকল আমল ও ইবাদত রয়েছে, তন্মধ্যে এটি উত্তম। আল্লাহ্ একত্ববাদের স্বীকৃতিদানে তাওয়াক্কুলের মত উঁচু স্তর দ্বিতীয়টি মেলে না। কেননা যাবতীয় কাজ আল্লাহ্র উপর ভরসা ও তাঁর সাহায্য ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়।
এই ছোট্ট পুস্তিকায় আমরা চেষ্টা করব তাওয়াক্কুলের অর্থ ও তাৎপর্য বর্ণনা করতে এবং তাওয়াক্কুল ও তাওয়াকুলের (ভান) পার্থক্য তুলে ধরতে। তারপর আমরা আলোচনা করব তাওয়াক্কুলের উপকারিতা, তাওয়াক্কুল পরিপন্থী কাজকর্ম এবং শেষ করব আল্লাহ্র উপর ভরসাকারী কিছু লোকের ঘটনার বিবরণ দিয়ে।
আমরা এ কাজে মহান আল্লাহ্র সাহায্য-সহযোগিতা প্রার্থনা করছি আর ছালাত ও সালাম পেশ করছি আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ), তাঁর পরিবার-পরিজন ও সঙ্গী-সাথী মহান ছাহাবীগণের উপর।
📄 তাওয়াক্কুলের পরিচয়
তাওয়াক্কুল-এর আভিধানিক অর্থ : 'তাওয়াক্কুল' শব্দটি যখন আল্লাহ্র সঙ্গে যোগ করে বলা হবে তখন তার অর্থ হবে আল্লাহতে সম্পূর্ণ ভরসা করা। আরবীতে এ শব্দটি سَمِعَ (সামি'আ), تَفَعَّلٌ (তাফা'উল) ও افْتِعَالٌ (ইফতি‘আল) বাব থেকে উক্ত একই অর্থে আসে। বলা হয়, ،وَكِلَ بالله وتوكل عليه، واتكل 'সে আল্লাহতে সবগুলো শব্দের অর্থ ‘সে আল্লাহ্র নিকট দায়িত্ব অর্পণ করল'। কোন কাজের সাথে তাওয়াক্কুল যোগ করলে তা সম্পন্ন করার দায়িত্ব নেওয়া অর্থে আসে। যেমন تَوَكَّلَ بِالْأَمْرِ 'সে কাজটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত করার দায়িত্ব নিয়েছে'।
তাওয়াক্কুল (توکل)-এর অনুসর্গ إلى হরফ হ'লে অর্থ হয় কোন কাজে অন্যের উপর নির্ভর করা। যেমন وَكُلْتُ أَمْرِي إِلَى فُلَان 'আমার কাজটিতে আমি অমুকের উপর ভরসা করেছি'। যদি অনুসর্গ (حرف جر) ছাড়াই সরাসরি কর্মকারকের সাথে তাওয়াক্কুল যুক্ত হয় তাহ'লে তার অর্থ হবে নিজের কাজ নিজে করতে অক্ষম হয়ে অন্যকে তা করার দায়িত্ব দেওয়া তথা উকিল (Agent) বা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া। সে কাজটা করে দিবে বলে তার উপর ভরসা করা।' সুতরাং 'তাওয়াক্কুল' শব্দের অর্থ هو إظهار العجز والاعتماد على الغير 'নিজের অক্ষমতা যাহির করা এবং অন্যের উপর ভরসা করা'।
পারিভাষিক অর্থে তাওয়াক্কুল :
বিদ্বানগণ তাওয়াক্কুলের নানা সংজ্ঞা দিয়েছেন।
১. ইবনু রজব (রহঃ) বলেছেন, هُوَ صِدْقُ اعْتِمَادِ الْقَلْبِ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ في اسْتِجْلاَبِ الْمَصَالِحِ، وَدَفْعِ الْمَضَارِّ مِنْ أُمُورِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ - 'দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কাজে মঙ্গল লাভ ও অমঙ্গল প্রতিহত করতে আন্ত রিকভাবে আল্লাহ্র উপর ভরসা করাকে তাওয়াক্কুল বলে'।
২. হাসান (রহঃ) বলেছেন, إن توكل العبد على ربه أن يعلم أن الله هو ثقته 'মালিকের উপর বান্দার তাওয়াক্কুলের অর্থ, আল্লাহই তার নির্ভরতার স্থান- একথা সে মনে রাখবে'।
৩. যুবায়দী (রহঃ) বলেন, التوكل : الثقة بما عند الله واليأس مما في أيدي الناس - 'আল্লাহ তা'আলার নিকট যা আছে তার উপর নির্ভর করা এবং মানুষের হাতে যা আছে তার প্রতি আশাহত থাকাকে তাওয়াক্কুল বলে'।
৪. ইবনু উছায়মীন (রহঃ) বলেন, التوكل هو صدق الاعتماد على الله عز وجل في جلب المنافع ودفع المضار مع فعل الأسباب التي أمر الله بها - 'কল্যাণ অর্জনে ও অকল্যাণ দূরীকরণে সত্যিকারভাবে আল্লাহ্র উপর ভরসা করা এবং এতদসঙ্গে আল্লাহ যে সকল উপায়-উপকরণ অবলম্বন করতে বলেছেন তা অবলম্বন করাকে তাওয়াক্কুল বলে'। এই সংজ্ঞাটি তাওয়াক্কুলের উৎকৃষ্ট সংজ্ঞা, যার মধ্যে সব দিকই শামিল রয়েছে। (এতে একদিকে আল্লাহ্র রহমতের উপর ভরসা এবং অন্যদিকে আল্লাহ্র নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করার কথা রয়েছে)।
টিকাঃ
১. ইবনু মানযূর, লিসানুল আরব ১১/৭৩৪।
২. ইবনু রজব, জামে'উল উলূম ওয়াল হিকাম, পৃঃ ৪৩৬।
৩. ঐ, পৃঃ ৪৩৭।
৪. মুরতাযা আয-যুবায়দী, তাজুল 'আরূস' শীর্ষ শব্দ (وکل)।
৫. উছায়মীন, মাজমূ' ফাতাওয়া ও রাসাইল ১/৬৩।
📄 বিষয়ের গুরুত্ব
সাঈদ ইবনু জুবায়ের (রহঃ) বলেছেন, التوكل على الله جماع الإيمان 'আল্লাহ্র উপর ভরসা ঈমানের সামষ্টিক রূপ'।
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, التوكل نصف الدين والنصف الثاني الإنابة 'তাওয়াক্কুল দ্বীনের অর্ধেক; বাকী অর্ধেক হ'ল ইনাবা'। কেননা দ্বীন হ'ল সাহায্য কামনা ও ইবাদতের নাম। এই সাহায্য কামনা হ'ল তাওয়াক্কুল এবং ইবাদত-বন্দেগী হ'ল ইনাবা। আরবী 'ইনাবা' (الإنابة) অর্থ আল্লাহ্র দিকে মনোনিবেশ ও তওবা করে ফিরে আসা।
আল্লাহ্র উপর ভরসার মর্যাদা ও গুরুত্ব ব্যাপক জায়গা জুড়ে রয়েছে। তাওয়াক্কুল সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ব্যাপকতা এবং বিশ্ববাসীর প্রয়োজনের আধিক্যের ফলে তাওয়াক্কুলকারীদের দ্বারা এর আঙিনা সদাই ভরপুর থাকে।
সুতরাং তাওয়াক্কুল জড়িয়ে আছে ওয়াজিব (ফরয), মুস্তাহাব, মুবাহ সবকিছুরই সাথে। এমনকি যেসব নাস্তিক আল্লাহ্র অস্তিত্ব অস্বীকার করে ক্ষেত্রবিশেষে তারাও নিজেদের লক্ষ্য পূরণে আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা করে। আসলে মানুষের প্রয়োজনের কোন সীমা-পরিসীমা নেই। কাজেই প্রয়োজন পূরণার্থে তাদেরকে অবশ্যই আল্লাহ্র উপর নির্ভর করতে হয়।
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, বান্দা যদি কোন পাহাড় সরাতে আদিষ্ট হয় আর যদি সে কাজে সে আল্লাহ তা'আলার উপর যথার্থভাবে ভরসা করতে পারে, তবে সে পাহাড়ও সরিয়ে দিতে পারবে।
সুতরাং একজন মুসলিম তার যাবতীয় কাজে আল্লাহ্ উপর ভরসাকে একটা মুস্তাহাব বিষয় ভাবতে পারে না; বরং সে তাওয়াক্কুলকে একটি দ্বীনী দায়িত্ব বা আবশ্যিক কর্তব্য বলে মনে করবে।
শায়খ সুলায়মান বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব (রহঃ) বলেন, যে মূল থেকে ইবাদতের নানা শাখা-প্রশাখা উদগত হয়েছে তা হ'ল : আল্লাহ্র উপর ভরসা, তাঁর নিকট সত্য দিলে আশ্রয় নেওয়া এবং আন্ত রিকভাবে তাঁর উপর নির্ভর করা। তাওয়াক্কুলই আল্লাহ্র একত্ববাদের স্বীকারোক্তির সারকথা। এর মাধ্যমেই তাওহীদের চূড়ান্তরূপ নিশ্চিত হয়। আল্লাহ তা'আলার প্রতি ভালবাসা, ভয়, রব ও উপাস্য হিসাবে তাঁর নিকট আশা-ভরসা এবং তাঁর নির্ধারিত তাক্বদীর বা ফায়ছালায় সন্তুষ্ট থাকার মত মহতী বিষয়গুলো তাওয়াক্কুল থেকেই উৎপত্তি লাভ করে। এমনকি অনেক
টিকাঃ
৬. মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা ৭/২০২।
৭. ইবনুল কাইয়িম, মাদারিজুস সালিকীন ২/১১৩।
৮. ঐ, ১/৮১।