📄 আমাদের পথ
১. দাওয়াত ও তাবলীগ
২. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ (হিসবাহ)
৩. জামাতের অধীনে থেকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। এই জামাতের কাজকর্ম পরিচালিত হবে ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী। এটি কাফিরদের মন রক্ষা করার জন্য তাদের সাথে কোনো সমঝোতায় যাবে না এবং অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে।
‘যেভাবে বিশ্বাস করি’ অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করেছি যে আমাদের দ্বীনের বুঝ হতে হবে এই উম্মাতের সত্যনিষ্ঠ আলেমগণের বুঝের অনুরূপ। আরো বলা হয়েছে যে, কোনোরূপ পরিবর্তন-পরিবর্ধন ছাড়া পূর্ণ ইসলাম পালনের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে বোঝা। খণ্ডিত বুঝ লাভ করে ইসলামি আন্দোলন শুরু করলে হয় কাটছাঁট করে সীমিত ইসলাম পালন করা হবে, আর নয়তো সীমালঙ্ঘন করে চরমপন্থার বিকাশ ঘটবে। অতএব, বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির বিরুদ্ধে সুরক্ষিত থাকার উপায় হলো ইসলামের পরিপূর্ণ বুঝ হাসিল করা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামি আন্দোলনের পন্থা জানার পর আমরা এমন মানুষদের দেখা পাব, যারা আকীদা, ইসলামের বুঝ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ব্যাপারে আমাদের সাথে একমত। এ ধরনের লোকদের প্রতি আমাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। তাদের সাথে মিলেমিশে জামাতবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। সেই সাথে এমনো অনেক মানুষ খুঁজে পাব যারা অজ্ঞতা বা অবহেলার কারণে ইসলামের ভুল বুঝ অর্জন করেছে। এ ধরনের লোকদের কাছে সঠিক দাওয়াত পৌঁছানোর চেষ্টায় কোনো ত্রুটি করা যাবে না। এমণো মানুষ পাওয়া যাবে যারা অসৎকাজ করে, সৎকাজ করে না। এক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্ব হলো সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা। আবার কিছু মানুষ পাওয়া যাবে এমন যারা গোঁয়ারের মতো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করবে। এদের সাথে আচরণের পদ্ধতি হলো জিহাদ।
নানান মতের নানান রকম মানুষ থাকলেও তাদের সকলেই কোনো না কোনোভাবে উপর্যুক্ত কোনো একটি শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হবে। এজন্যই আমরা আমাদের চলার পথের নকশা এভাবে দেখিয়েছি : ১. দাওয়াত ও তাবলীগ ২. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ (হিসবাহ) ৩. জামাত এর অধীনে থেকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। এই জামাতের কাজকর্ম পরিচালিত হবে ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী। এটি কাফিরদের মন রক্ষা করার জন্য তাদের সাথে কোনো সমঝোতায় যাবে না এবং অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে।
যে-কোনো স্থানে যে-কোনো জায়গায় বাস্তবতার সকল চাহিদা, চ্যালেঞ্জ ও জটিলতাকে যারা ইসলামের দেওয়া ফর্মুলা অনুযায়ী মোকাবিলা করতে চায়, তারা সকলেই এই তিন বিষয়ের ওপর আমল করে : দাওয়াত, হিসবাহ ও জিহাদ। এই প্রতিটি ইবাদতেরই নিজস্ব বিধিবিধান, সীমা-পরিসীমা ও প্রায়োগিক ক্ষেত্র রয়েছে। যথাস্থানে তা আরো বিস্তারিত আলোচনা হবে ইন-শা-আল্লাহ। আমাদের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হওয়ার জন্য যে জামাতবদ্ধভাবে কাজ করা দরকার, তার ওপরও আলোকপাত করা হবে। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী এবং জামাতবদ্ধ হয়ে আন্দোলন পরিচালনা করা কেন জরুরি, সেটিও ইসলাম ও বাস্তবতার আলোকে দেখানো হবে। জামাতবদ্ধভাবে কাজ করার পূর্বশর্ত ও কারণসমূহও আলোচিত হবে। তবে মূল আলোচনায় ঢোকার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা জরুরি।
প্রথমত, ইসলাম একটি ব্যাপকবিস্তৃত জীবনব্যবস্থা। এর কর্মপদ্ধতির মধ্যেও তাই বৈচিত্র্য আছে। পৃথিবীতে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি পরিবর্তন আনার জন্য বেশ কয়েকটি মাধ্যম ধাপে ধাপে ব্যবহৃত হয়। প্রথম ধাপ হলো নম্রভাবে দাওয়াত প্রদান। এসময় প্রতিপক্ষের থেকে আসা অপমানকে ভালো আচরণ দিয়ে প্রতিহত করা হয়। আর সর্বশেষ ধাপ হলো তলোয়ার দিয়ে শত্রুপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়া। এই দুই প্রান্তের মাঝামাঝি আরো অনেক ধাপ রয়েছে। তবে এই সকল ধাপই মোটা দাগে দাওয়াত, হিসবাহ ও জিহাদ—এই তিন শিরোনামের অধীনে পড়ে। ইসলাম যে একটি বাস্তবসম্মত দ্বীন, এরই একটি প্রমাণ হলো এর কর্মপদ্ধতির বৈচিত্র্য। বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন, গোষ্ঠী বা সরকার ইসলামের সাথে কীরকম আচরণ করে, তার ভিত্তিতে কাজ করার জন্য ইসলামের বাস্তবসম্মত পদ্ধতি রয়েছে। কাজেই ইসলামের হুকুম-আহকাম মেনেই এই সব রকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব।
মানুষের মনে যেসব ভুল ধারণা আছে, সেগুলো দূর করার মাধ্যম হলো দাওয়াত। প্রজ্ঞা সহকারে উপদেশ ও উত্তম পদ্ধতিতে বিতর্ক করে মানুষকে ইসলামের ব্যাপারে সঠিক বিষয়গুলো জানাতে হবে। ফলে তারা অবিশ্বাস, অজ্ঞতা, ভ্রান্তি ও পাপের আঁধার ছেড়ে ঈমান, ইলম, সুন্নাহ ও নেকির আলোর দিকে আসতে পারবে। যাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়, তাদের সাদরে স্বাগত জানানো হয়। আর যারা প্রত্যাখ্যান করে, তাদের প্রত্যাখ্যানের মাত্রা বিভিন্নরকম হয়ে থাকে। কেউ ব্যক্তিজীবনে ইসলামের আদেশ-নিষেধ লঙ্ঘন করে। এখান থেকে হিসবাহ'র বিভিন্ন ধাপ শুরু হয়। হিসবাহ হলো সেই হাতিয়ার, যার মাধ্যমে পাপীকে পুণ্যের পথে ফিরিয়ে আনা হয়। আর যদি ফিরিয়ে আনা সম্ভব না-ও হয়, অন্তত তার অনিষ্ট থেকে মুসলিম সমাজকে রক্ষা করা হয়।
আবার এমনো মানুষ আছে যারা নিজেরা তো আল্লাহর দ্বীনকে প্রত্যাখ্যান করেই, তার ওপর অন্যদের কাছেও দাওয়াত পৌঁছাতে বাধা দেয়। তারা নিজেদের ক্ষমতা-প্রতিপত্তি খাটিয়ে দাওয়াতকে বাধা দেয়। ফিরআউনের যোগ্য উত্তরাধিকারীর মতো করে নিজেদের বানানো বিধি-বিধান চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ফিরআউন বলেছিল: “হে পরিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের কোনো উপাস্য আছে বলে আমি জানি না।”[২১০] “আমিই তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিপালক।”[২১১] এদেরকে শায়েস্তা করার একমাত্র পথ হলো তরবারি। জিহাদ হলো এদের সাথে আচরণের একমাত্র পথ। কারণ এদের ধ্যান-ধারণা-বিশ্বাস পরিবর্তনের জন্য দাওয়াত যথেষ্ট নয়। এদের অনিষ্ট প্রতিরোধ করার জন্য হিসবাহ যথেষ্ট নয়। তাই একটাই পথ খোলা থাকে। তা হলো সশস্ত্র মুজাহিদ বাহিনীকে এদের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো। “নিশ্চয় আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন যারা তাঁর রাস্তায় এমনভাবে সারিবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করে, যেন তারা সীসাঢালা প্রাচীর।”[২১২]
দাওয়াত, হিসবাহ ও জিহাদের ক্ষেত্রগুলো গুলিয়ে ফেললে হবে না। এগুলোর প্রতিটিরই আলাদা আলাদা কাজ, বিধান ও পরিস্থিতি রয়েছে। দুঃখের ব্যাপার হলো, ইসলামের জন্য কাজ করা অনেক ব্যক্তি এবং দলই এগুলোর পার্থক্য বোঝে না। তাই যেখানে কোমলতা দরকার, সেখানে তারা কঠোরতা দেখিয়ে বসে। আবার যেখানে কঠোরতা দরকার, সেখানে কোমল হয়ে যায়। কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে কোমল কথা বলতে থাকে, আবার কেউ অজায়গায় নির্বিচারে অস্ত্র চালাতে শুরু করে। এগুলোর কারণ হয় অজ্ঞতা, নয়তো নফসকে খুশি করা। অজ্ঞতা হলে তো বিপদ, আর নফসকে খুশি করার জন্য হলে মহাবিপদ।
দ্বিতীয়ত, ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের নিয়ে আলোচনা দরকার। পৃথিবীতে নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। দাওয়াতর জন্য তাদের থাকতে হবে যথেষ্ট জ্ঞান, প্রজ্ঞা, স্পষ্ট যুক্তি, বুদ্ধিমত্তা এবং মানবপ্রকৃতির খেয়াল-খুশি সম্পর্কে ধারণা। হিসবাহ'র জন্য তাদের থাকতে হবে প্রয়োজনীয় জ্ঞান, ধৈর্য, সহ্যশক্তি, দৃঢ়তা ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস। জিহাদের জন্যও থাকতে হবে প্রয়োজনীয় শক্তি, নিরাপত্তাব্যবস্থা, সাহস, আত্মত্যাগ, প্রশিক্ষণ, প্রস্তুতি ও দক্ষতা।
ইসলামি আন্দোলনের কর্মীরা যদি এই ব্যাপক শিক্ষাক্রমের কিছু কিছু অংশ শিখে বাকি অংশগুলোকে অবহেলা করে, তা হলে তারা কখনোই জমিনে আল্লাহর দ্বীন কায়েম করতে পারবে না। আমাদের এমন কোনো দা'ওয়াতি সংগঠন হলে চলবে না যারা শুধু দা'ওয়াত ও তাবলীগেই দক্ষ, অথচ কিছু লোককে যে শক্তি প্রয়োগ করা ছাড়া পাপকাজ থেকে ফেরানো যাবে না এবং কিছু সরকার ও গোষ্ঠীকে যে অস্ত্র ছাড়া মোকাবিলা করা যাবে না-তা ভুলে যায় অথবা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে। আবার সবাই মিলে এমন সেনাবাহিনী হয়ে গেলে চলবে না, যারা কথায় কথায় অস্ত্র চালায়, সঠিকভাবে দাওয়াত দিতে জানে না, দ্বীনের জ্ঞান অর্জন ও বিতরণ করতে জানে না। যেখানে নসিহত প্রয়োজন সেখানে অস্ত্রধারণ, আর যেখানে অস্ত্রধারণ প্রয়োজন সেখানে ওয়াজ-নসিহত কখনো কাম্য নয়। শান্তি বর্ষিত হোক নবীজি ওপর যিনি সকল পরিস্থিতিতে সঠিক কাজটি করে গেছেন। আল্লাহ বলেন: “হে নবী! আমি তোমাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষীস্বরূপ এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর পথে আহ্বানকারী ও আলোকপ্রদ প্রদীপরূপে।”[২১৩] “সে তাদের সৎকাজের আদেশ দেয় ও অসৎকাজ করতে নিষেধ করে।”[২১৪] “অতএব, আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করো।”[২১৫] “নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ-দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”[২১৬]
তৃতীয়ত, বিশ্বে ইসলামি পরিবর্তন আনার মাধ্যম হিসেবে দাওয়াত, হিসবাহ ও জিহাদকে ব্যবহারের অর্থ হলো বাকি যেসব পন্থা ব্যবহারের অনুমতি আল্লাহ দেননি, সেগুলোকে বর্জন করা। ইসলাম-বহির্ভূত এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি আনয়নকারী সকল বিদআতি পদ্ধতিকে আমরা প্রত্যাখ্যান করি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও তন্ত্রের মাধ্যমে জাহিলিয়াতের আইন-কানুন মেনে তৈরি করা কর্মপদ্ধতিগুলো আমরা প্রত্যাখ্যান করি। বিদায় হাজ্জের ভাষণে নবীজি বলেছেন, “জাহিলিয়াতের সকল কিছু আমার পায়ের তলায়।”[২১৭]
আল্লাহর রাসূল যেগুলোকে পদদলিত করে গেছেন, সেগুলো তুলে নিয়ে কী করে আমরা হিদায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারি? মানুষ শয়তান ও জিন শয়তানরা আমাদের সেসব জাহিলি পদ্ধতির শরণাপন্ন হওয়ার লোভ দেখাবে। তারা দেখাতে চাইবে যে, এই পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করলে আল্লাহ বিজয় দান করবেন আর জমিনে কর্তৃত্ব দেবেন। ইবলিসের ওপর আল্লাহর লা'নত। সে-ই তো আদম আলাইহিস সালাম-এর সামনে তাঁর পাপকে শোভনীয় করে উপস্থাপন করে তাঁকে জান্নাত থেকে বহিষ্কারের ব্যবস্থা করেছিল। “কিন্তু শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিল। সে বলল, 'হে আদম! আমি কি তোমাকে জানিয়ে দেব চিরস্থায়ী জীবনদায়ী গাছের কথা আর এমন রাজ্যের কথা যা কোনোদিন ক্ষয় হবে না?”[২১৮] “হে আদম-সন্তান! শয়তান যেন তোমাদের কিছুতেই ফিতনায় ফেলতে না পারে, যেভাবে তোমাদের পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল।”[২১৯] “আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।”[২২০]
কাজেই আমাদের দৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহর দ্বীনই আমাদের জন্য যথেষ্ট। এর বাইরের সকল পদ্ধতি হলো ভ্রান্তি ও মরীচিকা। অতীতের জাহিলিয়াতও তার নিজস্ব বিকল্পগুলোর প্রস্তাব দিয়ে নবীজিকে সরলপথ থেকে সরানোর চেষ্টা করেছিল। কুরাইশ নেতারা তাঁকে সম্পদ, ক্ষমতা ও রাজত্বের লোভ দেখিয়েছিল। কেউ কেউ তো এক বছর দেব-দেবীর উপাসনা ও আরেক বছর আল্লাহর ইবাদত করা নিয়ে সমঝোতায় আসতে চেয়েছিল। “আমি তোমার প্রতি যে ওহি করেছি, তা থেকে তোমাকে পদস্খলিত করার জন্য তারা চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেনি যাতে তুমি আমার সম্বন্ধে তার (অর্থাৎ নাযিলকৃত ওহির) বিপরীতে মিথ্যা রচনা করো, তা হলে তারা তোমাকে অবশ্যই বন্ধু বানিয়ে নিতো। আমি তোমাকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত না রাখলে তুমি তাদের দিকে কিছু না কিছু ঝুঁকেই পড়তে। তুমি তা করলে আমি তোমাকে এ দুনিয়ায় দ্বিগুণ আর পরকালেও দ্বিগুণ আযাবের স্বাদ আস্বাদন করাতাম। সে অবস্থায় তুমি তোমার জন্য আমার বিরুদ্ধে কোনো সাহায্যকারী পেতে না।”[২২১] “তারা চায় যে, তুমি যদি নমনীয় হও, তা হলে তারাও নমনীয় হবে।”[২২২]
কিন্তু আল্লাহ তাঁর রাসূলকে জাহিলিয়াতের পথ অনুসরণ করা থেকে রক্ষা করেছেন। ইসলামের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া কর্মীদের পূর্ণ আস্থা থাকতে হবে যে জাহিলিয়াতের পথ ও পন্থা ছাড়াই এই দ্বীন বিজয়ী হবে : “এই দিনে আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবুল করে নিলাম।”[২২৩] ইসলামের বিশ্বাস, বিধানাবলি ও আচার-অনুষ্ঠান স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর অনুসারীরা একে বিজয়ী করার জন্য কোন পথে হাঁটবে, সেটি এখানে স্পষ্ট করে বলা আছে। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কোন কোন মাধ্যম ব্যবহার করতে হবে, সেটিও বলে দেওয়া হয়েছে। তাই আমাদের কখনোই উচিত না জাহিলি পদ্ধতি ব্যবহার করে নিজেদের ইসলামের খাদেম দাবি করা। বরং এরকম করার মাধ্যমে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে আমরা জাহিলিয়াতের খাদেমেই পরিণত হব। ইসলামের কাজের ধারা এবং পুঁজিবাদ-সমাজবাদ ইত্যাদি জাহিলি মতাদর্শের মধ্যে বিস্তারিত তুলনা দেখানো এই পরিসরে সম্ভব নয়। বরং মানবরচিত মতবাদের সাথে তুলনা হওয়াটা ইসলামের মর্যাদার সাথেও যায় না। “তোমরা সীমালঙ্ঘনকারীদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না, তা হলে আগুন তোমাদের স্পর্শ করবে। আর আল্লাহ ছাড়া কেউ তোমাদের অভিভাবক হওয়ার নেই; নেই তোমাদের সাহায্যকারী কেউ।”[২২৪] “অন্ধ ও চক্ষুষ্মান সমান নয়। সমান নয় অন্ধকার ও আলো, কিংবা ছায়া ও রোদ।”[২২৫]
১. দাওয়াত
আল্লাহ তাঁর রাসূলকে দাওয়াত ও তাবলীগের নির্দেশ দিয়ে বলেন : “ওহে বস্ত্রাবৃত! ওঠো, সতর্ক করো।”[২২৬] নবীজি এই নির্দেশ মেনে মানুষকে গোপনে আল্লাহর দিকে ডাকতে শুরু করেন। তিন বছর এভাবেই কাটে। তারপর আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করেন : “কাজেই তোমাকে যে বিষয়ের আদেশ করা হয়েছে, তা জোরেশোরে প্রচার করো। আর মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।”[২২৭] এরপরই নবীজি আস-সাফা পাহাড়ে উঠে দাঁড়ান এবং কুরাইশের গোত্রগুলোকে জড়ো করে বলেন, “আমি তোমাদের এক ভয়াবহ শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করছি।”[২২৮] সেই থেকে নিয়ে আমৃত্যু নবীজির কাজ ও পেশা হয়ে যায় দাওয়াত। মক্কার ছেলে-বুড়ো, মুক্ত ও দাস, সকলকে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করতে থাকেন রাসূলুল্লাহ ﷺ। হাজ্জ ও ব্যবসায়িক কাজে মক্কায় আসা বিদেশীদের প্রতিও তাঁর দাওয়াত কার্যক্রম প্রসারিত হয়। সাকিফ গোত্রকে দাওয়াত প্রদানের জন্য তিনি তাইফে যান। আল-আকাবার বাইয়াতের পর তিনি মুসআব বিন উমাইরকে মদীনায় পাঠিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের কাছে দাওয়াত পৌঁছান। পরে তিনি নিজেই মদীনায় হিজরত করে সেখানে মসজিদ স্থাপন করেন। নবগঠিত জনগোষ্ঠীর কাছে ইসলামের প্রচার করতে থাকেন “সাক্ষীস্বরূপ এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর পথে আহ্বানকারী ও আলোকপ্রদ প্রদীপরূপে।”[২২৯]
আনসার সাহাবিগণের বিভিন্ন দল শিক্ষক ও প্রচারক হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় প্রেরিত হতে থাকেন। পুরো আরব উপদ্বীপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে নবীজি -এর প্রতিনিধিদের নেটওয়ার্ক। মুআয বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু কে ইয়েমেনের আহলে কিতাবদেরকে ইসলামের দিকে ডাকতে পাঠানো হয়। উরওয়াহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে তাঁর নিজের গোত্র সাকিফের কাছে পাঠানো হয়। আলা' বিন হাদরামি রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে পাঠানো হয় বাহরাইনে। এমনকি নবীজি নিজেও মক্কা বিজয়ের পর কা'বার ফটকে দাঁড়িয়ে মক্কাবাসীদের ইসলামের দিকে ডাকেন। তিনি মাদীনায় ফেরার পর আরবের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিনিধিদল ছুটে আসতে থাকে তাঁর কাছে ইসলাম শেখার জন্য। সেই বছরটিকে বলা হয় 'আমুল উফুদ' প্রতিনিধিদলের বছর। তারা সেখানে দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করে নিজ নিজ জাতির কাছে ফিরে গিয়ে দাওয়াতি কার্যক্রম চালাতে থাকে।
পুরো আরব ভূখণ্ড ইসলামের পতাকাতলে চলে আসার পর নবীজি তাঁর প্রতিনিধিদের আরব উপদ্বীপের আশপাশের রাজা-বাদশাহদের কাছে ইসলামের বার্তাসহ প্রেরণ করতে থাকেন। “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে রোমানদের সম্রাট হেরাক্লিয়াসের প্রতি। শান্তি বর্ষিত হোক তাদের ওপর যারা সঠিক পথের অনুসরণ করে। পর সমাচার এই যে, আমি আপনাকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, তা হলে আপনি নিরাপদ হয়ে যাবেন। ইসলাম গ্রহণ করুন, তা হলে আল্লাহ আপনাকে দেবেন দ্বিগুণ পুরস্কার। আর আপনি যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তা হলে আপনার প্রজাদের পাপের ভারও আপনাকে বইতে হবে।”[২৩০] “বলুন, হে আহলে কিতাব! এমন এক কথার দিকে এসো যা তোমাদের ও আমাদের মধ্যে একই। তা এই যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করব না এবং কোনোকিছুকে তাঁর শরিক করব না এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাদের মধ্যে কাউকে রব্ব হিসেবে গ্রহণ করব না। তারপরও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলে দাও, তোমরা এ বিষয়ে সাক্ষী থাকো যে, আমরা মুসলিম।”[২৩১] বিদায় হাজ্জের সময় হাজার হাজার মুসলিম নবীজি ﷺ-এর এই আহ্বান শুনেছে: “নিশ্চয় জাহিলিয়াতের সাথে সম্পর্কিত সবকিছু আমার পায়ের তলায়... আমি তোমাদের কাছে এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা আঁকড়ে ধরে থাকলে তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব।”[২৩২] জীবনের অন্তিম সময়ে নবীজি মাথায় পট্টি বাঁধা অবস্থায় মাসজিদে প্রবেশ করে মিম্বরে বসে বলেন, “... আল্লাহর কসম! আমার এই দুশ্চিন্তা নেই যে আমার মৃত্যুর পর তোমরা শিরকে ফিরে যাবে। আমি ভয় করি তোমাদের দুনিয়াপ্রীতি ও এ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্যাপারে।”[২৩৩]
নবীজি ﷺ-এর জীবন শেষ হয়েছে উম্মাহর কাছে সঠিকভাবে দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার পর। আমাদের পূর্বাপর কোটি কোটি মানুষের সাথে সাথে আমরাও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। এখন যে দায়িত্ব আমাদের কাঁধে রয়েছে, তা হলো মুসলিম উম্মাহর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর হয়ে আমাদের হাতে আসা এই আমানতের যথাযথ সুরক্ষা। নবীজি যেভাবে জীবনযাপন করেছেন ও মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছেছেন, আমরাও ঠিক সে রকমটাই করতে বাধ্য। আমাদের আসা-যাওয়া, সকাল-সাঁঝ, কথা-কাজ যেন দাওয়াতের দায়িত্ব পালনের জন্যই হয়। নবীজি ﷺ-এর মতো করেই যেন আমরা মানুষের তিরস্কার-নির্যাতন-শত্রুতা উপেক্ষা করে আল্লাহর পথে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ চালিয়ে যাই। দাওয়াতি কাজের তৎপরতা হলো এক মহা সম্মানের কাজ : “তার কথার চেয়ে কার কথা উত্তম যে (মানুষকে) আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, 'আমি মুসলিমদের একজন'?”[২৩৪] এমনটা করার মাধ্যমে আমরা রাসূলুল্লাহ -এর পদাঙ্কই অনুসরণ করছি, যিনি বলেছেন, “আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে সতেজ রাখুন যে আমার কোনো কথা শুনে তা অন্তরে সংরক্ষণ করে এবং বিশ্বস্ততার সাথে অন্যদের কাছে পৌঁছে দেয়।”[২৩৫] “আল্লাহর কসম! আল্লাহ যদি একজনকেও তোমার মাধ্যমে (ইসলামের দিকে) পথ দেখান, তা হলে তা তোমার জন্য দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম সুখ ভোগ করার চেয়েও উত্তম।”[২৩৬] উমর ইবনুল খাত্তাবের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন, যিনি বলেছেন, “সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি রাসূল আগমনের ধারা শেষ হওয়ার পর জ্ঞানবানদের (আহলুল ইলম) একটি অংশকে রেখে দেওয়ার মাধ্যমে মানুষকে রহম করেছেন। তাঁরা পথভ্রষ্টদেরকে হিদায়াতের দিকে আহ্বান করেন, তাদের দেওয়া কষ্টগুলো সহ্য করে নেন, (অন্তর) অন্ধ হয়ে যাওয়া লোকগুলোকে আল্লাহর কিতাব দেখান। ইবলিসের কত শিকারকে যে তাঁরা উদ্ধার করেছেন আর কত পথভ্রষ্টকে যে তাঁরা পথ দেখিয়েছেন! তাঁরা নিজেদের জানমাল কুরবানি করে (আল্লাহর) বান্দাদের ধ্বংস হওয়া রোধ করেছেন। অতএব, তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে ভুলো না। কারণ তাঁরা অতি উচ্চ মর্যাদার আসনে আছেন।”[২৩৭]
দাওয়াত ও তাবলীগের দায়িত্বে অবহেলা করার অর্থ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবমাননা করা, তাঁদের গড়ে তোলা দাঈগণকে অবমাননা করা। এসকল আহ্বানকারী এই দায়িত্ব পালন面に নিজেদের রক্ত আর সম্পদ বিলিয়ে দিলেন। উম্মাতের অতীত-বর্তমানের আলেমগণ স্পষ্ট করে বলে গেলেন যে দাওয়াতের দায়িত্ব ফরযে কিফায়া। কথা বলা, প্রচার করা, সুসংবাদ শোনানো ও সতর্ক করা এবং দলিলের মাধ্যমে সংশয়-নিরসন করার সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা এই দায়িত্ব পালন করলে সকলে দায়মুক্ত হয়ে যাবে। আর কেউই এ দায়িত্ব পালন না করলে সামর্থ্যবান সকলে গুনাহগার হবে। অতীতের যে-কোনো সময়ের তুলনায় দাওয়াতের গুরুত্ব এখন আরো বেশি। আল্লাহর দ্বীন থেকে মানুষকে বিমুখ করতে যত ভ্রান্ত মত-পথের উদ্ভব হচ্ছে, দাওয়াত ও তাবলীগের গুরুত্ব ততই বেড়ে চলেছে।
আমাদের চারপাশে জাহিলিয়াত সফলভাবে তাদের মূলনীতি, তত্ত্ব, আদর্শ, নিয়মকানুন, স্লোগান আর সংস্কৃতি তৈরি করে নিয়েছে। পৃথিবীতে ব্যবহারিকভাবে এগুলো প্রয়োগ করতেও তারা সফল হয়েছে। ইসলামি ভূখণ্ডগুলোতেও নিজেদের লাইফস্টাইল আর মূল্যবোধ প্রচার করে সেগুলোকে তারা তাদের বলয়ে আবর্তিত হতে বাধ্য করেছে। এই দেশগুলোও হয়ে গেছে তাদের বুলি আওড়ানো তোতাপাখি। বাসা-বাড়ি, বিদ্যালয়, রাস্তাঘাট, কর্মস্থল, সংসদ, কোর্ট-কাছারি, পত্রিকা-গণমাধ্যম যে দিকেই তাকান, তাদের জাহিলি ডাক আপনাকে অনুসরণ করে চলেছে। মানুষকে ফিতরাত (স্বভাবধর্ম) থেকে সরিয়ে দিয়ে এটি সফলভাবে তাদের নিয়ে গেছে কুফর, নিফাক, ইলহাদ ও ফিসকের দিকে। আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত অল্পকিছু মানুষ কেবল এই ভয়াবহ পরিণতি থেকে বেঁচে থাকতে পেরেছে। তাই সময় এসেছে যে ইসলামি দাওয়াতের মাধ্যমে এই জাহিলিয়াতের সাথে সম্মুখ-সমরে লিপ্ত হওয়ার। মানুষকে নতুন করে ইসলামের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার, যা হলো “সু-প্রতিষ্ঠিত দ্বীন, একনিষ্ঠ ইবরাহীমের মিল্লাত। তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।”[২৩৮] দাঈ-র দায়িত্ব হলো এ সকল মিথ্যে আহ্বানের অসারতা তুলে ধরা, মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়া যে জাহিলিয়াতের এসব আহ্বান হলো, বানের জলে ভেসে আসা ক্ষণস্থায়ী আবর্জনা। সময়ের আবর্তনে এগুলো ধুয়েমুছে যাবে। রয়ে যাবে শুধু সত্য : “ফেনা তো খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। আর যা মানুষের জন্য উপকারী, তা জমিনে স্থিতিশীল হয়।”[২৩৯] দাঈ-র দায়িত্ব মানুষকে এই দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ রূপ চিনিয়ে দেওয়া। একবারে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্য থেকে শুরু করে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা পর্যন্ত।
অজ্ঞদের শেখানো, অবহেলাকারীদের সতর্ক করা, ঘুমন্তকে জাগানো, অহংকারীকে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের উপদেশ দান, অবিশ্বাসীদেরকে বিশ্বাসের দিকে ধাবিত করা, বহুত্ববাদীদের একত্ববাদের দিকে আনা, বিদআতিকে সুন্নাহর কাছে আনা ও অবাধ্যকে বাধ্য করা—সবই এই দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। যারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে, তাদের সামনে প্রমাণ উপস্থিত করতে হবে “যাতে তোমার প্রতিপালকের সামনে (দায়িত্ব পালন না করার) অভিযোগ থেকে মুক্ত হওয়া যায় এবং যাতে তারা আল্লাহকে ভয় করে।”[২৪০] বাতিলর বন্যার সামনে রুখে দাঁড়ানো হকের দায়িত্ব। কারা নেবে এই দায়িত্ব? এক বিলিয়ন খ্রিস্টান ও ইহুদীদেরকে কারা ডাকবে এক আল্লাহকে বিশ্বাস করার দিকে? কারা যাবে দুই বিলিয়ন মুশরিক ও নাস্তিকের কাছে এক আল্লাহর উপাসনার দাওয়াত নিয়ে? এক বিলিয়ন গাফেল মুসলিমকে কারা ফিরিয়ে আনবে পূর্ণাঙ্গ ইসলামের দিকে?: ভোগ-বিলাসে ডুবে থাকা যুবসমাজকে দুনিয়ায় সংয়ম ও আখিরাতের ভোগ-বিলাসের পথ দেখাবে কারা? কারা হাত বাড়িয়ে দেবে সেসব বৃদ্ধদের দিকে, যারা মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসেও তাওবা করছে না? বন্দির কব্জিতে বাঁধা শেকলের মতো আমাদের ওপর চেপে বসা বাতিলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে কারা প্রস্তুত আছে?
নিঃসন্দেহে এগুলো আমাদেরই দায়িত্ব। ছন্নছাড়া ও বিক্ষিপ্ত কিছু প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই দায়িত্ব সম্পূর্ণ আদায় করা সম্ভব নয়। এই দায়িত্ব যদি কেউই আদায় না করে, কুরআনের একটা আয়াতও যদি পৌঁছে না দেয়, তা হলে সবাই গুনাহগার হবে, সবাই! বাতিল তো তার আদর্শের বিজ্ঞাপন প্রচার করতে সংকোচ বোধ করেনি, ইতস্তত করেনি, লজ্জা পায়নি। বরং এতই অহংকারের সাথে এরা নিজেদের প্রচার-প্রোপাগান্ডা করেছে যে, ইসলাম ও মুসলিমদের দিকেও তারা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি নিক্ষেপ করার সাহস পেয়েছে। তারা চায় আমরা যেন আমাদের দ্বীন নিয়ে লজ্জিত হই, অস্বস্তি বোধ করি। এরা চায় আমরা যেন আমাদের দাওয়াতকে সলজ্জ ভঙ্গিতে লুকিয়ে রাখি, আমাদের ভালো-মন্দের মানদণ্ড বদলে ফেলি। আমরা কখনোই এসব কথার মারপ্যাঁচে দিশেহারা হয়ে তাদের সাথে স্থান বিনিময় করব না। নিজেদের মর্যাদার আসনকে তাদের হাতে সঁপে দিয়ে নিজেরা গিয়ে অসম্মানের আসনে বসব না। আমরাই সত্যের ওপর আছি। আমাদের কণ্ঠ তাদের কণ্ঠের ওপর উঁচু থাকবে। আমরাই দাঁড়াব মাথা উঁচু করে। আমাদের যারা চেনে ও যারা চেনে না, সবাই আমাদের দেখবে। আমাদের বলতে শুনবে; “এই যে আমরা, দাওয়াতের কর্মীরা! এই আমাদের দ্বীন যা আমরা সমগ্র মানবজাতির কাছে পেশ করছি।” ইসলামের গৌরব-সম্মান প্রচারিত হবে দাঈর নম্রতার মাধ্যমে। ইসলামি আদর্শ ও জীবনব্যবস্থা যে-কোনো মিথ্যে আদর্শের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। ইসলাম মানুষের প্রতি দয়ালু; এমনকি যারা গুনাহগার, তাদের প্রতিও। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমরা এখানে একে অপরকে তাদের সমস্যা মোকাবিলা করতে উৎসাহ দিই।
ইসলামের দোর্দণ্ড প্রতাপের সাথে ইসলামের আহ্বানকারীর নম্রতার কোনো বিরোধ নেই। ইসলামের গৌরব-প্রতিপত্তি আমাদের মনে হীনম্মন্যতা ও পরাজিত মানসিকতা তৈরি হতে বাধা দেয়। “তোমরা হীনবল হোয়ো না, দুঃখিত হোয়ো না। তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।”[২৪১] ইসলামের শক্তিমত্তা, আমাদের উৎসাহ যোগায়। কোনো রাখঢাক না রেখে, নির্ভয়ে খোলাখুলি পূর্ণাঙ্গ ইসলামের দাওয়াত দিতে। বাতিল কখনো আমাদের গলা টিপে ধরতে পারে না। আমরা বাতিলের সাথে ইসলামকে মিশ্রিত করে খিচুড়ি পাকাই না। আমরা তাদের মতো হতে চাই যারা “আল্লাহর বাণী প্রচার করত আর তাঁকে ভয় করত। আল্লাহ ছাড়া কাউকে তারা ভয় করত না।”[২৪২] দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইসলামের এই শক্তিমত্তার ছাপ আজ অনেক দাঈর ভেতরেই দেখা যায় না। মিথ্যের কাছে পরাজয় মেনে নিয়ে এখন তারা তাদের কাছে থাকা সত্যের ব্যাপারে লজ্জিত। তারা সত্যকে নরম করতে করতে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, এখন তারা মিথ্যের কাছে সন্তুষ্টি ভিক্ষা করে। যেন বলছে, “হে মনিব! দয়া করে আপনার সাথে আমাকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে দিন। আমার মধ্যে এমনকিছু নেই যা আপনাকে দুশ্চিন্তায় ফেলবে। আমি আপনার মতোই। মানুষকে কল্যাণ, জ্ঞান, ন্যায়পরায়ণতা, সাম্য, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্বের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কী দুর্ভাগ্য আমাদের! দাওয়াতের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা একে বাতিল শক্তির 'প্রগতিশীলতা' ও খেয়াল-খুশির সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে! বড় দুঃখ হয় যখন দেখা যায় সত্যকে টুকরো টুকরো করে তারা একে নতুন করে গড়ে তুলতে চাচ্ছে, যাতে শিরক-কুফর-ফিসকের আধুনিকতাবাদীরা খুশি হয়। আরো দুঃখের ব্যাপার হলো, অনেকে ইসলামকে শাসকদের স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। ইসলামকে শাসকের প্রাসাদের চাকর বানিয়ে সমাজতন্ত্র বা পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠায় কাজে লক্ষ্য। নিজেদের এবং অন্যদের নফসকে সন্তুষ্ট করতে আজ সত্যের আহ্বানকারীরা জেনেশুনে সত্য গোপন করছে।
আমরা এই আহ্বানকারীদের জেগে ওঠার আহ্বান জানাই। তাদের এই বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে যে, উম্মাহর দুর্দশার জন্য দায়ী আজকের এসকল সমাজ ও শাসনব্যবস্থা হলো যুগ যুগ ধরে আমাদের মাঝে প্রচারিত হওয়া বাতিল আদর্শেরই ফলাফল। এই বাতিলের সাথে সমঝোতায় পৌঁছানো আমাদের লক্ষ্য নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো সত্য দিয়ে আঘাত করে বাতিলের মস্তক চূর্ণ করা: “ফেনা তো খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। আর যা মানুষের জন্য উপকারী, তা জমিনে স্থিতিশীল হয়।”[২৪৩] আমাদের দায়িত্ব হলো আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত স্পষ্টভাবে, পূর্ণাঙ্গরূপে ও দৃঢ়তার সাথে পৌঁছে দেওয়া। এভাবে দাওয়াত দিলেই মানুষ ভ্রান্ত মতাদর্শগুলোর সাথে ইসলামের তুলনাটা সঠিকভাবে করতে পারবে। আলো-আঁধার, চক্ষুষ্মান-অন্ধ, জীবিত-মৃতের পার্থক্য ধরতে পারবে। তাদের জোরসে ঝাঁকুনি দিয়ে সম্বিৎ ফিরিয়ে এনে বলতে হবে : “তোমাদের প্রতিপালকের আহ্বানে সাড়া দাও।”[২৪৪] “দৌড়াও আল্লাহর দিকে।”[২৪৫]
আমাদের দায়িত্ব মানুষকে প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে সরিয়ে এনে আল্লাহর দাসত্বে লিপ্ত করা। সত্য দ্বীন আর মিথ্যের মাঝে বন্ধুত্ব স্থাপন করা আমাদের লক্ষ্য নয়। এমনটা করলে তা হবে আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি মহাবিশ্বাসঘাতকতা। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ও সমাজ ইসলামের ব্যাপারে অবহেলাকারী এবং বাতিল মতাদর্শ দিয়ে প্রভাবিত-এটা বাতিলের সাথে সমঝোতা করার কোনো অজুহাত হতে পারে না। বরং এই পরিস্থিতি আমাদের আরো স্পষ্টভাবে খোলাখুলি দাওয়াত প্রচার করার উৎসাহ যোগায় : “যার ইচ্ছে ঈমান আনুক, আর যার ইচ্ছে প্রত্যাখ্যান করুক।”[২৪৬] “যে ধ্বংস হওয়ার, সে যেন সুস্পষ্ট প্রমাণ (দেখা)র পরই ধ্বংস হয়; এবং যে টিকে থাকার, সেও যেন সুস্পষ্ট প্রমাণ (দেখা)র পরই টিকে থাকে।”[২৪৭]
আমাদের শত্রুরা বহু আগেই বুঝতে পেরেছে যে, ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা অসম্ভব। এজন্যই তারা একে বিকৃত করার প্রকল্প হাতে নিয়েছে যেন তা তাদের ভ্রান্ত মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয় এবং মুসলিমদেরকে তাদের দলে ভিড়ানো যায়। তারাও তাদের নিজ নিজ মতাদর্শের দাওয়াত ও তাবলীগে লিপ্ত। মুসলিমদের এই প্রজন্মকে তারা ভুলভাবে ও ভুল উদ্দেশ্যে ইসলামকে জানার দিকে আহ্বান জানায়। তারা এমন এক মুসলিম প্রজন্ম গড়ে তুলতে যায়, যারা বাতিলের প্রতি কোনো হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না। অতএব, এই ঘৃণ্য চক্রান্তের ফাঁদে পড়ে তাদের সহযোগী হওয়াটা নিশ্চয় অন্যায়। যারা ইসলামের দাওয়াত কাজে নিয়োজিত, তাদের জন্য এটি আরো বড় গুনাহ। সত্যকে যারা মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করে, তারাও গুনাহগার: “আমি তোমার প্রতি যে ওহি নাযিল করেছি তা থেকে তোমাকে পদস্খলিত করার জন্য তারা চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেনি, যাতে তুমি আমার সম্বন্ধে তার (নাযিলকৃত বিধানের) বিপরীতে মিথ্যা রচনা করো। তা হলে তারা তোমাকে অবশ্যই বন্ধু বানিয়ে নিত। আমি তোমাকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত না রাখলে তুমি তাদের দিকে কিছু না কিছু ঝুঁকেই পড়তে। তুমি তা করলে আমি তোমাকে এ দুনিয়ায় দ্বিগুণ আর পরকালেও দ্বিগুণ আযাবের স্বাদ আস্বাদন করাতাম। সে অবস্থায় তুমি তোমার জন্য আমার বিরুদ্ধে কোনো সাহায্যকারী পেতে না। তারা তোমাকে জমিন থেকে উৎখাত করতে চেয়েছিল যাতে তারা তোমাকে তা থেকে বের করে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা এখানে তোমার পরে অল্পকালই টিকে থাকত। তোমার পূর্বে আমি আমার যেসব রাসূল পাঠিয়েছিলাম, তাদের ক্ষেত্রেও এটাই ছিল আমার নিয়ম। আর তুমি আমার নিয়মের কোনো পরিবর্তন দেখতে পাবে না।”[২৪৮]
এখানে তাই আত্মত্যাগ প্রয়োজন। ইসলামের দিকে আহ্বানকারীরা হয় আল্লাহর কাছে নিজেদের জীবন বিক্রি করবে, আর নয়তো শত্রুদের কাছে দ্বীনকে বিক্রি করবে। এখন যে যার রাস্তা বেছে নিক। দাওয়াত হলো হিদায়াতের পথে প্রবেশের দরজা। জাহিলিয়াত কখনোই এ দরজা বন্ধ করতে পারবে না। ইসলামের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় মুহুর্মুহু আক্রমণ করেও জাহিলিয়াত সফল হয়নি। চৌদ্দ শতাব্দীজুড়ে অসংখ্য আক্রমণের পরও দাওয়াত জারি আছে। দীনের প্রতিরক্ষায় নবী-রাসূল ও তাঁদের প্রকৃত অনুসারীরা যেভাবে কুরবানি করেছেন, প্রতিটি দাঈকেই তার জীবন ও সম্পদ কোনো না কোনোভাবে কুরবানি করা লাগবেই লাগবে।
শত্রুদের তৈরি করা সন্দেহ-সংশয় দূর করা ও তাদের কুযুক্তি খণ্ডন করার জন্য দাওয়াত হলো একমাত্র হাতিয়ার। তাদের কোমলমতি সন্তান-সন্ততিকেও তারা যেসব ভ্রান্ত শিক্ষা দিয়ে বড় করছে, সেগুলো থেকেও তাদের উদ্ধার করার পথ এই দাওয়াত। এভাবেই তাদের নিয়ে আসতে হবে অন্ধকার থেকে আলোতে। বানাতে হবে উমর ইবনুল খাত্তাব, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, আমর ইবনিল আস ও ইকরিমা বিন আবু জাহল রাদিয়াল্লাহ আনহুম-এর উত্তরসূরি। এঁরা সকলেই এমন সাহাবা, যাদের বাপ কিংবা দাদা ছিল অমুসলিম।
দাওয়াত-সংক্রান্ত আলোচনা শেষে আমরা উল্লেখ করতে চাই যে, দ্বীনের দাঈ ও মুবাল্লিগগণ নবীজি -এর পদাঙ্কই অনুসরণ করছে। নবীজির জীবনের সুদীর্ঘ তেইশ বছর কেটেছে এই দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে, মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার কাজে। নবুওয়্যাত প্রদানের আগে আল্লাহ তাঁর রাসূল-কে সর্বোত্তম উপায়ে পরিশুদ্ধ করে নিয়েছেন। আমাদেরও দাওয়াতের এই দায়িত্ব কাঁধে নিতে হলে নবীজি-এর মতো সুন্দর চরিত্র অর্জন করতে হবে। হাদীস ও সীরাতের কিতাবাদিতে নবীজি-এর চরিত্র-আচার-ব্যবহারের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ এসেছে। কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেন: তেইশ বছরের নবুওয়্যাতি মিশন চলাকালে রাসূল কার সাথে কীভাবে আচরণ করেছেন, তা আমাদের জানা থাকতে হবে। কিছু মুসলিম দাওয়াতের কাজে জড়িয়ে পড়ে, অথচ এর পূর্বশর্ত হিসেবে যথাযথ জ্ঞান ও চারিত্রিক মাধুর্য অর্জন করে নেয় না। এর ফলে তাদের দাওয়াতি কাজ ব্যর্থ হয়। মানুষ তাদের ওপর বিরক্ত হয়ে সত্য দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এরকম দাঈর কথা ও কাজে কোনো মিল পাওয়া যায় না। ছোট থেকে বড় সকল ক্ষেত্রেই নববী আচার-আচরণের অনুসরণ করা দাঈর জন্য আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ ﷺ যাদেরকে দাওয়াত দিতেন, তাদের প্রতি নম্র-ভদ্র আচরণ করতেন। ব্যক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে জীবনেও কারো ওপর প্রতিশোধ নেননি। তাঁর জীবনযাপন ছিল অনাড়ম্বর। ভালো-মন্দের মাঝামাঝি সন্দেহপূর্ণ বিষয়গুলো তিনি এড়িয়ে চলতেন। সত্যকে তুলে ধরার ব্যাপারে তিনি ছিলেন সাহসী ও আপসহীন। লজ্জাশীলতা, ধৈর্য ও দানশীলতায় তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দাওয়াতের কাজে তিনি ছিলেন সদা অবিচল। হতাশা কখনো তাঁকে গ্রাস করেনি। “তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য একজন রাসূল এসেছে। তোমাদের যা কিছু কষ্ট দেয়, তা তাঁর নিকটও খুবই কষ্টদায়ক। সে তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি করুণাসিক্ত, বড়ই দয়ালু।”[২৫০]
২. হিসবাহ (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ)
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী সব একরকম। তারা অন্যায় কাজের নির্দেশ দেয় আর সৎকাজ করতে নিষেধ করে।”[২৫১] “মুমিন পুরুষ আর মুমিন নারী পরস্পরের আওলিয়া (সহায়ক, বন্ধু, সমর্থক)। তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে।”[২৫২] এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা হলো মুমিন ও মুনাফিকদের মাঝে পার্থক্যকারী বৈশিষ্ট্য। তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে, মন্দ কাজে নিষেধ করা ও ভালো কাজের আদেশ করা কেবল মুমিনেরই গুণ। এই বৈশিষ্ট্য দিয়েই আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন এবং তাঁর কিতাব নাযিল করেছেন। এটি আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি বৈশিষ্ট্য, যা কুরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, “তিনি তাদের ভালো কাজের আদেশ দেন ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করেন।”[২৫৩] এটি এই উম্মাহরও একটি গুণ এবং তাদের দ্বীনদারি ও সাফল্যের পূর্বশর্ত। “তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ, যাদেরকে মানবজাতির জন্য উত্থিত করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ হতে নিষেধ এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে থাকো।”[২৫৪] মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাত হতে হলে এই আয়াতে উল্লেখিত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে।” আল-কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যদি তোমরা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করো তবেই তোমরা সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত।”
এ দুটি কাজ যদি আমরা না করি, তা হলে আমরা এই সম্মানের অধিকারী হতে পারব না। সেক্ষেত্রে আমরা হব তিরস্কৃত ও শাস্তিযোগ্য। ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “জেনে রাখতে হবে যে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করার এই গুণটিকে দীর্ঘদিন যাবত অবহেলা করা হয়েছে। আমাদের কাছে যা অবশিষ্ট রয়েছে তা হলো এই কাজের অল্পকিছু নাম-নিশানা। অথচ এটি সকল কাজের মধ্যমণির মতোই গুরুত্বপূর্ণ।”[২৫৫] অতএব, যারা আখিরাতে কামিয়াবি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করতে চায়, তাদের এই বিস্মৃত দায়িত্ব পালন করতেই হবে। এ কাজের জন্য নিয়্যতকে পরিশুদ্ধ করে নিতে হবে এবং এ কাজের বিরোধিতাকারীদের ভয় করা চলবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাহায্য করেন যারা তাঁকে সাহায্য করে।”[২৫৬]
সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের বহুবিধ কারণ রয়েছে। আল্লাহর কাছে পুরস্কারের আশা এবং তাঁর শাস্তির ভয়, আল্লাহর নির্ধারণ করা সীমা লঙ্ঘিত হতে দেখে রাগান্বিত হওয়া, মুমিনদেরকে আল্লাহর নির্দেশ মানানোর মাধ্যমে তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন, আল্লাহ তাআলার প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদি। আল্লাহর মর্যাদা সমুন্নত রাখার তুলনায় দুনিয়াবি সম্পদ ও আরাম-আয়েশ নিতান্ত তুচ্ছ। সালফে সালিহীনের একজন বলেছেন, “আমার ইচ্ছা হয় আমার শরীরের মাংস কেঁচি দিয়ে কেটে যাওয়ার বিনিময়ে যদি সকলেই আল্লাহর অনুগত হয়ে যেত!” এই বাস্তবতাকে যে উপলব্ধি করে, তার জন্য আল্লাহর রাস্তায় যে-কোনো কষ্ট ভোগ করা সহজ হয়ে যাবে। উমর বিন আব্দুল আযীযকে রাহিমাহুল্লাহ তাঁর ছেলে আব্দুল মালিককে বলেন, “আমার ইচ্ছা হয় আল্লাহর রাস্তায় কাজ করতে গিয়ে যদি আমি ফুটন্ত গরম পানি দিয়ে নির্যাতিত হতাম!” আলেমগণ হিসবাহ এর সংজ্ঞায় বলেছেন, “এটি হলো স্পষ্টভাবে পরিত্যক্ত ভালো কাজের আদেশ করা এবং প্রকাশ্যে চর্চিত মন্দ কাজের নিষেধ করা।” ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা থেকে প্রমাণিত যে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ একটি (ইসলামি) বাধ্যবাধকতা।”[২৫৭] হিসবাহ করার নির্দেশ কুরআনে অনেক সময় খুব স্পষ্টভাবে এসেছে। যেমন: “তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল হোক যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করে, সৎকাজের আদেশ করে এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করে।”[২৫৮] নবীজি বলেন, “যে ব্যক্তি কোনো অসৎকর্ম (সংঘটিত হতে) দেখে, সে যেন অবশ্যই তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে। যদি তা না পারে, তা হলে মুখ দিয়ে। যদি (তাও) না পারে, তা হলে অন্তর দিয়ে। এটিই ঈমানের দুর্বলতম স্তর।”[২৫৯] আবার কিছু জায়গায় হিসবাহ-কে মুমিনদের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে: “মুমিন পুরুষ আর মুমিন নারী পরস্পরের আওলিয়া (সহায়ক, বন্ধু, সমর্থক)। তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে, সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। তাঁদের প্রতিই তো আল্লাহ্ করুণা প্রদর্শন করবেন। আল্লাহ্ তো প্রবল পরাক্রান্ত, মহাপ্রজ্ঞাময়।”[২৬০] আবার কিছু জায়গায়। এ কাজে অবহেলাকারীদের প্রতি তিরস্কার ও শাস্তির হুমকি এসেছে। “বনী-ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরি করেছিল, তাদেরকে দাউদ ও ঈসা ইবনু মারইয়ামের মুখে (উচ্চারিত কথার দ্বারা) অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। এটা এই কারণে যে তারা অমান্য করেছিল আর তারা ছিল সীমালঙ্ঘনকারী। তারা যেসব অসৎকর্ম করত, তা থেকে একে অন্যকে নিষেধ করত না। তারা যা করত, তা কতই-না নিকৃষ্ট!”[২৬১] নবীজি আরো বলেন, “কোনো জাতির মাঝে যদি (আল্লাহর) অবাধ্যতা স্বাভাবিক হয়ে পড়ে আর সামর্থ্য থাকা সত্ত্বের কেউ এ অবস্থার পরিবর্তন না করে, তা হলে আল্লাহ তাদের প্রতি ধ্বংসাত্মক আযাব পাঠাবেন।”[২৬২] আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তোমরা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করো। না হলে আল্লাহ তোমাদের ওপর এমন যালিম শাসক চাপিয়ে দেবেন যে তোমাদের মধ্যকার বয়স্কদের সম্মান করবে না এবং ছোটদের প্রতি দয়া দেখাবে না। তোমাদের মধ্যকার দ্বীনদাররা তার ধ্বংসের জন্য দুআ করলে সেই দুআ কবুল করা হবে না। তোমাদের আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলে তিনি সাহায্য করবেন না। তোমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি ক্ষমা করবেন না।” বিলাল বিন সাঈদ বলেন, “কোনো মন্দকাজ যদি গোপনে করা হয়, তা হলে তা শুধু ওই ব্যক্তিরই ক্ষতি করবে। কিন্তু যদি তা প্রকাশ্যে করা হয় এবং তাতে বাধা না দেওয়া হয়, তাহলে তা সকলের ক্ষতি করবে।”[২৬৩] ইমাম নববী বলেন, “হিসবাহ হলো সকল কাজের মধ্যমণির মতোই গুরুত্বপূর্ণ। মন্দকাজ যদি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তা হলে দ্বীনদার-পাপী নির্বিশেষে সবার ওপর আল্লাহর আযাব আপতিত হবে। যদি তারা সীমালঙ্ঘনকারীকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়, তা হলে তাঁর আযাব সকলের ওপর আপতিত হবে।” “যারা তার (রাসূলের) আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা সতর্ক হোক যে তাদের ওপর পরীক্ষা নেমে আসবে কিংবা তাদের ওপর নেমে আসবে ভয়াবহ আযাব।”[২৬৫] আবূ বকর সিদ্দীক, রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হে লোকসকল! তোমরা এই আয়াত পাঠ করে থাকো : “হে মুমিনগণ! তোমাদের দায়িত্ব তোমাদের ওপর। যদি তোমরা সত্যপথ-প্রাপ্ত হয়ে থাকো, তা হলে পথভ্রষ্টরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”[২৬৬] ‘অথচ তোমরা এর প্রকৃত তাৎপর্য জানো না। আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, মানুষ যদি কাউকে অন্যায় করতে দেখেও তাকে সংশোধন না করে, আল্লাহ তাদের প্রায় নিশ্চিতভাবেই তাদের সবাইকে আযাবে নিপতিত করবেন।’ আরেক বর্ণনায় আছে, তারা যদি খারাপ কাজ হতে দেখে এবং তা নিরোধ করার ব্যবস্থা না নেয়...[২৬৭] নববী বলেন, “এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, এটি (হিসবাহ) চর্চা করা ফরজ। এটিই উম্মতের ইজমা। তিনি আরো বলেন, “সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ হলো ফরজে কিফায়া। কিছু মানুষ তা সম্পাদন করলে সকলে দায়মুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু, কেউই যদি তা সম্পাদন না করে, তা হলে শারঈ ওজর ব্যতীত এই কাজ ত্যাগ করার কারণে সরূলেই গুনাহগার হবে। আর যদি এমন হয় যে, কোনো একটি কাজ খারাপ হওয়ার ব্যাপারে একজনই জানে এবং ওই একজনই তাতে বাধা দিতে সক্ষম, তা হলে ওই একজনের ওপরই তা ফরজে আইন হয়ে যায়।”[২৬৮] হিসবাহ-র বিষয়টি আলোচনা করতে গিয়ে ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেন, “এটি এমনিতে ফরজে কিফায়া। কিন্তু কেউ যদি এই দায়িত্ব পালন না করে, তা হলে তা ফরজে আইন হয়ে যাবে।” তিনি আরো বলেন, “এই দায়িত্ব পালনের মাত্রা হলো যার যার সামর্থ্য। যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, সেই পরিমাণে এ দায়িত্ব আদায় করতে হবে। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় করো।”[২৬৯][২৭০]
হিসবাহ-র উপাদান চারটি।
আল-মুহতাসিব (যে হিসবাহ পালন করে), আল-মুহতাসাবু আলাইহি (যার প্রতি হিসবাহ পালন করা হয়), আল-মুহতাসাবু ফীহি (যে বিষয়ে হিসবাহ করা হয়) এবং ইহতিসাব (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ)।
১. আল-মুহতাসিব : এর অর্থ হলো যিনি হিসবাহ-র দায়িত্ব সম্পাদন করেন। তিনি মুসলিমদের শাসক কর্তৃক নিয়োজিত কর্মকর্তাও হতে পারেন, অথবা অন্য কেউও হতে পারেন। মুহতাসিব হতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়, (ক) মুসলিম, (খ) মুকাল্লাফ, (গ) কাদির। প্রথম শর্তের ফলে কাফিররা বাদ পড়ে যায়। মুকাল্লাফ অর্থ প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন। অর্থাৎ, নাবালক ও পাগলরা বাদ। ব্যতিক্রম হলো, নাবালকেরা এ কাজ করতে পারে কিন্তু এটা তাদের ওপর ফরয না। কাদির দিয়ে বোঝানো হয় হিসবাহ সম্পাদনের সামর্থ্য থাকা। যাদের হিসবাহ করার সামর্থ্য নেই, তারা মনে মনে ঘৃণা করাই যথেষ্ট। ইবনু রজব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “অন্তর দিয়ে মন্দকে ঘৃণা করা আবশ্যক। মুমিন যদি অন্তর দিয়েই মন্দকে ঘৃণা না করে, তা হলে বোঝা যাবে যে তার অন্তরে আর ঈমানই নেই। মুখ এবং হাত দিয়ে হিসবাহ করা মূলত সংশ্লিষ্ট সামর্থ্যবানদের দায়িত্ব।” অপূরণীয় কোনো ক্ষতির ভয় থাকলে সামর্থ্যবানের ওপরও হিসবাহ ফরয থাকে না। তবে সামর্থ্যবান ব্যক্তি যদি সে ক্ষতি মোকাবিলা করারও সামর্থ্য রাখেন, তখন আবার হিসবাহ ফরয হবে। নবীজি এ প্রসঙ্গে বলেন, “শ্রেষ্ঠতম শহীদ হলেন হামযাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং সেই ব্যক্তি যে যালিম শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করে তার হাতে নিহত হয়।”[২৭১] পক্ষান্তরে, গালিগালাজ বা নিন্দা-সমালোচনার মতো সহনীয় মাত্রার ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও হিসবাহ ফরয থাকে। এক্ষেত্রে মুহতাসিবের দায়িত্ব হলো এসবের মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা। লুকমান আলাইহিস সালাম তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন : “হে আমার প্রিয় বৎস! তুমি সালাত প্রতিষ্ঠা করো, সৎকাজের আদেশ দাও আর মন্দ কাজ হতে নিষেধ করো এবং বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চয় এটা দৃঢ় সংকল্পের কাজ।”[২৭২] পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে, সামর্থ্যও আছে, কোনো ক্ষতির আশঙ্কাও নেই, কিন্তু হিসবাহ করে যে লাভ হবে না সেটা বোঝাই যাচ্ছে, এক্ষেত্রেও হিসবাহ ফরয থাকে বলেই প্রতীয়মান হয়। ইমাম নববী বলেছেন, “মুহতাসিবের দায়িত্ব সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা, গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া তার দায়িত্ব না।” তিনি আরো বলেন, “উলামায়ে কিরাম বলেছেন যে, দায়িত্বশীল ব্যক্তির যদি মনে হয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করে এই বিশেষ ক্ষেত্রে লাভ হবে না, তা হলেই ওই ক্ষেত্রে হিসবাহ-র ফরযিয়্যাত রহিত হয়ে যায় না।”[২৭৩] “আর স্মরণ করিয়ে দাও। নিশ্চয় স্মরণ করিয়ে দিলে মুমিনরা উপকৃত হয়।”[২৭৪] দায়িত্বপ্রাপ্তদের ব্যাপারে ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তাদের দায়িত্ব অন্য যে- কারো চেয়ে বেশি। কারণ দায়িত্ব হলো সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল। সামর্থ্যবানের ওপর যা আবশ্যক, অসমর্থ্যের ওপর তা নয়।”[২৭৫] আল্লাহ তাআলা বলেন, “কাজেই আল্লাহকে সাধ্যমতো ভয় করো।”[২৭৬] নবীজি বলেন, “আমি যদি তোমাদের কোনোকিছু করার নির্দেশ দিই, তা হলে যতটুকু সাধ্যে কুলায় ততটুকু করবে।”[২৭৭]
এই সকল বিধিবিধান তখনই প্রযোজ্য যখন একজন মুসলিম নেতা বিদ্যমান থাকেন এবং তিনি যোগ্যতা অনুসারে কাউকে হিসবাহ-র দায়িত্ব আরোপ করেন। কিন্তু আমাদের যুগে শরীয়তের আইন পরিবর্তন করে মুরতাদ হয়ে যাওয়া শাসকেরা হিসবাহ-র দায়িত্ব পালনের কোনো অধিকার রাখে না। বরং, উলামাদের ঐকমত্য অনুযায়ী এদেরকে অপসারণ করাটাই দায়িত্ব। ইমামুল হারামাইন আল-জুয়াইনী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই যে, মুসলিম ইমামের অনুপস্থিতিতেও একদল মানুষ জমিনে ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের হাত থেকে সমাজকে পরিচ্ছন্ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।” মুহতাসিবের যেসব নৈতিক শর্ত পূরণ করতে হয়, সেগুলোর মধ্যে আছে ইখলাস, হিসবাহ-সংক্রান্ত জ্ঞান, ধৈর্য, অবিচলতা, নম্রতা, অন্যকে যা আদেশ-নিষেধ করে নিজেও সে অনুযায়ী চলা। শেষেরটা যদিও হিসবাহ করার আবশ্যক কোনো শর্ত না, কিন্তু মুহতাসিব এই শর্ত পূরণ করলে মানুষের ওপর তাঁর হিসবাহ-র প্রভাব বাড়ে।
২. আল-মুহতাসাবু আলাইহি: এর অর্থ হলো এমন কোনো কার্য-সম্পাদনকারী, যার কাজের ফলে তার ওপর হিসবাহ সম্পাদন করতে হয়। এমন ব্যক্তির মুকাল্লাফ হওয়া শর্ত। অর্থাৎ, সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ, যে আদেশ-নিষেধ বুঝতে সক্ষম।
৩. আল-মুহতাসাবু ফীহি: এর অর্থ হলো এমন সব মন্দ কাজ, যা মন্দ হওয়ার বিষয়টি ঐকমত্যের ভিত্তিতে সুপরিচিত, বর্তমানে সংঘটিত হচ্ছে এবং কোনো রকম গোয়েন্দাগিরি ছাড়াই মুহতাসিবের গোচরে আসে। আরবি শব্দ 'মুনকারে'র অর্থ করা হয়েছে 'মন্দ'। এটা দিয়ে ঠিক গুনাহের কাজের চেয়েও ব্যাপক কিছু বোঝানো হয়। যেমন একটি নাবালক শিশু মদপান করলে আখিরাতে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে না। কিন্তু মদপানের কাজটি কিন্তু ঠিকই মন্দ। এই কাজটিকে ঘৃণা করতে হবে ও এ কাজে বাধা দিতে হবে। ঐকমত্যে সুপরিচিত হওয়ার অর্থ হলো ইখতিলাফি বিষয় না হওয়া। যেসব ব্যাপারে আলিমগণের দলিলভিত্তিক বৈধ মতভেদ আছে, সেসব ক্ষেত্রে হিসবাহ করা হবে না। ভুলভাল দলিলের ভিত্তিতে বা শায মত দিয়ে মতভেদ করা হলে তা আবার গ্রহণযোগ্য নয়। 'বর্তমানে সংঘটিত' বলতে বোঝানো হচ্ছে যে, অতীতে কোনো একটা মন্দ কাজ করা হতো, এখন আর করা হয় না এরকম কাজের ভিত্তিতে কাউকে সতর্ক করা বা শাস্তি দেওয়া হবে না। কোনো একটা মন্দ কাজ ভবিষ্যতে করা হতে পারে, এরকম আশঙ্কার ক্ষেত্রেও কেবল উপদেশ-নসিহতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। 'গোয়েন্দাগিরি ছাড়াই মুহতাসিবের গোচরে আসা' কথাটির মাধ্যমে আল্লাহর এই নির্দেশের কথা বলা হচ্ছে “তোমরা একে অপরের ওপর (দোষ খোঁজাখুঁজির উদ্দেশ্যে) গুপ্তচরবৃত্তি কোরো না।”[২৭৮]
৪. আল-ইহতিসাব : এটি দিয়ে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করার কাজটাকে বোঝানো হয়। আগেই বলা হয়েছে যে, পাপের প্রতি অন্তরে ঘৃণা পোষণ করা প্রতিটি মুসলিমের ওপরই আবশ্যক। কারণ নবীজি বলেছেন, “এর পরে আর কোনো ঈমানই নেই।” এর সাথেও এও যোগ করতে হয় যে, অন্তরে ঘৃণা করার শর্ত হলো যেখানে পাপ সংঘটিত হচ্ছে, সেখানে উপস্থিত না থাকা। এ প্রসঙ্গে বলা হয়, “যে মন্দ কাজে বাধা দিতে পারে না, সে যেন অবশ্যই সেই পাপ সংঘটনের স্থান এড়িয়ে চলে।”
পাপকাজে বাধা দেওয়ার সামর্থ্য থাকলে তা সম্পাদন করার ক্রম হবে এরকম:
ক) জানানো : যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করছে, তার হয়তো জানা না থাকতে পারে যে সেই কাজটি খারাপ। সেক্ষেত্রে তাকে এ বিষয়টি নম্রভাবে জানিয়ে দিতে হবে। যদি তাতে কাজ না হয়, তা হলে পরবর্তী ধাপে যেতে হবে।
খ) উপদেশ-নসিহত: যে মন্দকাজ করছে, তাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। তাকে আল্লাহর শাস্তির ভয় দেখাতে হবে এবং সৎকাজ করে আল্লাহর পুরস্কারের আশা করতে বলতে হবে। এক্ষেত্রেও নম্রতা বজায় রাখতে হবে। ইমাম শাফিঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে তার (মুসলিম) ভাইকে গোপনে উপদেশ দিল, সে তার প্রতি ভালো আচরণ করল। আর যে প্রকাশ্যে তা করল, সে আসলে তাকে অপমান-অপদস্থ করল।”
গ) তিরস্কার করা: কিন্তু এক্ষেত্রেও হালাল পন্থায়ই কথা বলতে হবে। পাশাপাশি শুধু যতটুকু দরকার, ততটুকুই তিরস্কার করতে হবে। সীমালঙ্ঘন করা যাবে না।
ঘ) হাত দিয়ে বাধা দেওয়া: এর উদাহরণ হলো বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলা, মদ ফেলে দেওয়া। এমনটা করা তখনই জায়িয হবে, যখন মন্দ কাজ সম্পাদনকারী নিজে থেকে সেই কাজ না করে। এ ছাড়া শুধু ততটুকু উপকরণই নষ্ট করতে হবে, যতটুকু গুনাহের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
ঙ) ধমক দেওয়া ও সতর্ক করা: বৈধ শাস্তি ছাড়া অন্য কিছুর হুমকি দেওয়া যাবে না।
চ) শারীরিক সহিংসতার দিকে যাওয়া: যেমন হাত-পা ব্যবহার। এক্ষেত্রে খারাপ কাজটি থামিয়ে দেওয়ার জন্য যতটুকু সহিংসতা যথেষ্ট, ঠিক ততটুকুতেই কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
ছ) সাহায্যের আবেদন ও অস্ত্রধারণ: পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে সাহায্যের জন্য লোক ডাকা এবং একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করা লাগতে পারে। ফুকাহায়ে কিরামের একাংশের মতে সাধারণ জনগণ এমনটা করতে পারবে। ইমাম গাযালি এটাকেই সঠিকতর মত বলেছেন। আরেক অংশের মতে, এক্ষেত্রে খলিফা বা মুসলিম শাসকের অনুমতি আবশ্যক।
ফুকাহায়ে কিরামের সকলে একমত যে, কোনো একটি অসৎকাজের নিষেধ করতে গিয়ে যদি ফলস্বরূপ এরচেয়ে বড় কোনো খারাপ কাজ হয়ে যায়, অথবা ওই খারাপ কাজের চেয়ে বড় কোনো ভালো কাজের লঙ্ঘন হয়ে যায়, তা হলে সেক্ষেত্রে হিসবাহ করা বন্ধ রাখতে হবে। ক্ষতির কথা জেনেশুনেও যে এসব ক্ষেত্রে হিসবাহ করবে, সে গুনাহগার হবে। যদি এমন হয় যে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ভালো-খারাপ দুইই মিলিয়ে করে (অর্থাৎ, তারা দুটিই করতে পারে অথবা দুটিই ছেড়ে দিতে পারে), তা হলে দুইরকম কাজের মধ্যে তুলনা করে দেখতে হবে। যদি ভালোর পরিমাণ বেশি হয়, তা হলে সেই ভালো কাজের আদেশ দিতে হবে। এমনকি তা করতে গিয়ে সেটার চেয়ে কম পরিমাণ মন্দ কাজ করা লাগলেও। সেই অল্প মন্দকে নিষেধ করা তখন হারাম বলে গণ্য হবে। কারণ সেই অল্প মন্দ কাজের নিষেধ করতে গিয়ে বড় একটি ভালো কাজে বাধা পড়ে যাবে। কিন্তু যদি ভালো-মন্দের পরিমাণ সমান হয়, তা হলে আদেশ ও নিষেধ উভয়ই হারাম। ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেন, “কিছু কিছু ক্ষেত্রে সৎকাজের আদেশ প্রয়োজন। কিছু ক্ষেত্রে মন্দ কাজের নিষেধ প্রয়োজন। আবার কিছু ক্ষেত্রে সৎকাজের আদেশ ও মন্দকাজের নিষেধ কোনোটাই করা যাবে না। এটি সেসব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যখন কোনো কাজে ভালো-খারাপ দুটোই মিশ্রিত থাকে। আইনের ভাষায় বললে, সৎকাজের আদেশ আর অসৎকাজের নিষেধ হলো অখণ্ড বিধান। ভালো কাজের আদেশ এরকমই হতে হবে যে এর মাধ্যমে যেন তার চেয়ে বড় কোনো ভালো কাজে বাধা না পড়ে বা তার চেয়ে বড় কোনো মন্দ কাজ সংঘটিত না হয়ে যায়। আর মন্দ কাজের নিষেধ এরকমই হতে হবে যেন এর ফলে এর চেয়ে বড় কোনো মন্দ সংঘটিত না হয়ে যায় বা এরচেয়ে বড় কোনো ভালো কাজে বাধা না পড়ে।[২৭৯]
এখানে মনে রাখতে হবে যে, ভালো-খারাপ নির্ধারণ করার মানদণ্ড হবে শরীয়ত। কারো খেয়াল-খুশি বা মনগড়া বিধান নয়। এই কাজ করার দায়িত্ব কেবল সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ মনমানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তির। বেপরোয়াভাবে অথবা ভীতির ফলে প্রদত্ত কোনো মতামত এখানে বিবেচ্য নয়। হিসবাহ অতি উত্তম এক নেক আমল। এটি ব্যক্তিপর্যায়কে ছাপিয়ে সমগ্র সমাজেরই উপকার করে। অনেক পাপাচারীকেই নসিহত-তিরস্কারের মাধ্যমে থামিয়ে দেওয়া যায়। উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে অনেক বেখেয়াল মানুষকে নেক আমলের দিকে ফিরিয়ে আনা যায়। এভাবে হাত ও মুখের মাধ্যমে অনেক কবিরা গুনাহে বাধা পড়ে। সামান্য ক্ষতির ভয়ে এত বড় নেক আমল ত্যাগ করা কখনোই উচিত নয়। বিশাল-সংখ্যক মুসলিম এই দায়িত্ব পালন ছেড়ে দিয়েছে, এটা কোনো অজুহাতই হতে পারে না। “তুমি যদি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ করো, তা হলে তারা আল্লাহর পথ হতে তোমাকে বিচ্যুত করে ফেলবে।”[২৮০] বরং আমাদের উচিত সালফে সালিহীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করা। তাঁরা যেদিকে অগ্রসর হয়েছেন, সেদিকে অগ্রসর হওয়া। তারা যেদিক থেকে বিরত ছিলেন, সেদিক থেকে বিরত থাকা। শরীয়তকে বাদ দিয়ে যারা নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুগামী হয়েছে, তাদের প্রতি ধিক্কার। শরীয়তের ওপর নিজেদের বিচারবুদ্ধিকে প্রাধান্য দানকারীদেরও ধিক্কার। আমাদের তো লুকমানের এই উপদেশ মেনে চলতে হবে, যা তিনি তাঁর ছেলেকে দিয়েছিলেন: “হে আমার প্রিয় বৎস! তুমি সালাত প্রতিষ্ঠা করো, সৎকাজের আদেশ দাও আর মন্দ কাজ হতে নিষেধ করো এবং বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চয় এটা দৃঢ় সংকল্পের কাজ।”[২৮১] একজন সত্যিকারের মুমিন কখনোই মন্দের আধিক্য দেখে দমে যায় না। কারণ সেসব মন্দের “উদাহরণ হলো নোংরা বৃক্ষ যাকে ভূমি থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে এবং এর কোনো স্থায়িত্ব নেই।”[২৮২] মন্দের আধিক্য দেখে হিসবাহ-র গুরুত্ব ভুলে গেলে তা হবে বিরাট অপরাধ। অসৎকাজের আদেশ ও মন্দকাজের নিষেধের মাধ্যমে শুধু সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনই আসবে না, বরং ভালো-খারাপের ধারণা বিকৃত হয়ে যাওয়ার হাত থেকেও রক্ষা পাবে। হিসবাহ পরিত্যাগ করলে একসময় না একসময় এমন অবস্থা দাঁড়ায় যে, ভালোকে মন্দ আর মন্দকে ভালো মনে করা হতে থাকে।
হিসবাহ-সংক্রান্ত আলোচনা শেষ করার আগে আমরা একটি ভ্রান্ত মতের খণ্ডন করতে চাই। অনেকে দাবি করে যে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করতে হলে আগে নিজে সম্পূর্ণ ন্যায়নিষ্ঠ হওয়া (আদালাত অর্জন করা) আবশ্যক। আদালাত থাকা অবশ্যই মুহতাসিবের জন্য ভালো, কিন্তু এটি আবশ্যক কোনো শর্ত নয়। ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে অসৎকাজের নিষেধ করে, তার (সম্পূর্ণ) ন্যায়পরায়ণ হওয়াটা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামাতের মতে আবশ্যিক কোনো শর্ত নয়।” পরিপূর্ণ ন্যায়নিষ্ঠ হওয়াটা অল্প কিছু মানুষের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ সকল মুসলিমের দায়িত্ব। অনেকে এই আয়াতগুলো তুলে এনে দেখাতে পারে: “তোমরা কি (মানুষকে) সৎকাজের আদেশ দিবে, অথচ নিজেরা (তা করতে) ভুলে যাবে?”[২৮৩] “আল্লাহর দৃষ্টিতে এটা অত্যন্ত নিন্দনীয় যে, তোমরা এমন কথা বলবে যা তোমরা করো না।”[২৮৪] এর জবাব হলো, এখানে মন্দ কাজ করার ব্যাপারে ধমক দেওয়া হয়েছে। অন্যকে মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতে মানা করা হয়নি।[২৮৫] ইমাম নববী একে ব্যাখ্যা করে বলেন, “(একজন মুসলিমের) উচিত একইসাথে দুটো কাজ করা। নিজের প্রতিও হিসবাহ করা, অন্যদের প্রতিও হিসবাহ করা। কেউ যদি এর মধ্যে একটাকে অবহেলা করে, তা হলে এটা কী করে অন্যটাকেও অবহেলা করার অজুহাত হতে পারে?”[২৮৬] আবু হামিদ গাযালিও রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সঠিক ব্যাপার এই যে, গুনাহগারও হিসবাহ করবে।”[২৮৭]
আবার আরেকদল দাবি করে যে, শাসকের নিযুক্ত কর্মকর্তা ছাড়া আর কেউই হিসবাহ করার অধিকার রাখে না। এটা একেবারেই ভুল মত। কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশ থেকে এটাই স্পষ্ট হয় যে, এই দায়িত্ব সকলের ওপর প্রযোজ্য। কারো জন্য নির্দিষ্ট নয়। সালাফগণ ইমামের অনুমতি ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে হিসবাহ করতেন। এমনকি শাসক নিজে যখন শরীয়ত-বিরোধী কাজ করত, তখন তারা শাসকের ওপরও হিসবাহ করতেন। নবীজি বলেন, “শ্রেষ্ঠতম একটি জিহাদ হলো যালিম শাসকের সামনে হক কথা বলা।”[২৮৮] এই হাদীস থেকেই বোঝা যায় যে, সাধারণ মানুষও শাসককে মন্দ কাজ করা থেকে নিষেধ করতে পারবে। সুস্থ মস্তিষ্কের কেউই দাবি করতে পারে না যে, শাসককে উপদেশ দেওয়ার জন্য শাসকেরই অনুমতি নিতে হবে। ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আলিমগণ বলেছেন যে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ একচ্ছত্রভাবে শাসকের দায়িত্ব নয়। সাধারণ মুসলিম জনগণও তা করতে পারবে। ইমামুল হারামাইন বলেন, এর দলিল পাওয়া যায় মুসলিমদের ইজমা থেকে। মুসলিমদের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের লোকদের মধ্যে সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্তরা ছাড়াও অন্যেরাও সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করতেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমগণ কখনোই তাঁদেরকে অনধিকার চর্চার অভিযোগে অভিযুক্ত করেনি। এবং আল্লাহই ভালো জানেন।”[২৮৯] ইমাম নববী আরো বলেন, “イমামুল হারামাইন বলেছেন, সাধারণ মুসলিমদের জন্যও কবীরা গুনাহকারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো জায়েয।”[২৯০] প্রশ্ন উঠতে পারে যে, হিসবাহ যেহেতু এক ধরনের দায়িত্বশীলতা, তা হলে এই দায়িত্ব সাধারণ মুসলিমদের হাতে অর্পণ করার কর্তৃত্ব কার হাতে? এর জবাব হলো, মুহতাসিবের দায়িত্ব সর্বশক্তিমান আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশের মাধ্যমেই অর্পিত হয়েছে। হ্যাঁ, রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত মুহতাসিবের কাজের পরিধি সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। কিন্তু তার কোনো অধিকার নেই সাধারণ জনগণের ব্যক্তিগত হিসবাহ পালনের দায়িত্বে বাধা দেওয়ার। ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেন, “সরকারি দায়িত্বশীলরা অন্য যে-কারো চেয়ে (এই দায়িত্ব পালনে) বেশি সমর্থ্য ও বেশি বাধ্য। কারণ এ কাজ করার পূর্ব শর্ত হলো এই কাজ করার সামর্থ্য থাকা; আর প্রত্যেকেরই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এ দায়িত্ব পালন করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় করো।”[২৯১]
সাধারণ মানুষ তো বটেই, ইসলামি আন্দোলনের অনেক কর্মীও আজকাল এই ধারণা প্রচার করে বেড়াচ্ছেন যে হিসবাহ হলো শুধুই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব যা খলিফা ও প্রতিষ্ঠিত মুসলিম জামাত ছাড়া কেউই আদায় করতে পারবে না। এই ধারণার বিরোধিতা করাটাকেই অপরাধ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এই আয়াতটা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয় : “তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল হোক, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করে, সৎকাজের আদেশ করে এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করে। আর এরাই সফলকাম।”[২৯২] আসল কথা হলো সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর অনন্য দায়িত্ব। অন্য কোনো জাতি এই দায়িত্ব নিয়ে আবির্ভূত হয়নি। আর রাজনৈতিক ক্ষমতা মুসলিমদের হাতে সব সময় না-ও থাকতে পারে। তাই বলে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ কখনোই থেমে থাকবে না। এটি আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন: “তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের বের করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করো।”[২৯৩] তার মানে যতদিন মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব থাকবে, রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকুক বা না থাকুক, হিসবাহ-র এই দায়িত্ব ততদিন রয়ে যাবে।
ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করা লোকদের উচিত হিসবাহ-র এই দায়িত্বে নেতৃত্ব প্রদান করা। তাদের উচিত শুধু নিজেরা ভালো কাজ করা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার দায়িত্বে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্যদেরকেও সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা। তা হলেই জমিনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য আল্লাহর দেওয়া শর্ত পুরণ হবে : “তাদের (অর্থাৎ মুসলিম শাসককে) আমি জমিনে কর্তৃত্ব দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দিবে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করবে।”[২৯৪] এমনটা বলার কি কোনো যুক্তি আছে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা পাওয়ার আগ পর্যন্ত সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান করা বন্ধ থাকবে? সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের ব্যাপারেও একই কথা। বর্ণিত আছে যে, এক আব্বাসি খলিফার জামানায় তাঁর অনুমতি না নিয়ে একজন সাধারণ মুসলিম মুহতাসিবের কাজ করতে শুরু করায় খলিফা তাঁকে তিরস্কার করেন। তিনি নিজের মতের পক্ষে দলিল হিসেবে এই আয়াত তুলে ধরেন “তাদের (মুসলিম শাসক) আমি জমিনে কর্তৃত্ব দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দিবে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করবে।”[২৯৫] তাঁর উদ্দেশ্য ছিল হিসবাহকে শাসকের ও শাসকের নিযুক্ত কর্মকর্তার একচ্ছত্র দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা। জবাবে সেই সাধারণ মুসলিম এই আয়াত তুলে ধরেন “মুমিন পুরুষ আর মুমিন নারী পরস্পরের আওলিয়া (সহায়ক, বন্ধু, সমর্থক)। তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে।”[২৯৬] খলিফা এই জবাব শুনে আর কোনো কথা বাড়ালেন না। আজকের মিথ্যা প্রচারকারীরা যদি অন্তত এই খলিফার মতো চুপ করে যেত, তা হলেও একটা কথা ছিল।
এ কথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে থাকলে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা অনেক সহজ ও ফলপ্রসূ হয়ে যায়। কিন্তু তাই বলে আজকের এই যুগে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা না থাকার দোহাই দিয়ে হিসবাহ-র দায়িত্ব থেকে হাত গুটিয়ে ফেলা ঠিক নয়। তার ওপর মুসলিম শাসক থাকাকালীনই যদি শাসকের অনুমতি ছাড়া এ কাজ করা যায়, তা হলে শাসকের অনুপস্থিতিতে এ কাজ তো আরো বেশি জরুরি। কেউই অস্বীকার করতে পারে না যে হিসবাহ-সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসগুলো খাস (বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) নয়, বরং আম (সর্বাত্মকভাবে প্রযোজ্য)। নিশ্চয় এখানে সকল মুসলিমদের উদ্দেশ্যে নিজ নিজ সামর্থ্য পরিমাণ কাজ করতে বলা হয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন। শুধু তা-ই না, হিসবাহ হলো ইসলামি আন্দোলন কর্মীদের সাফল্যের অন্যতম শর্ত। জাহিলিয়াত আমাদের চারপাশে নতুন নতুন মাধ্যম ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। আমাদের শরীয়ত স্বয়ংসম্পূর্ণ, ব্যাপক বিস্তৃত ও যে-কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম। এই চ্যালেঞ্জগুলোর কোনোটাকে দাওয়াত দিয়ে, কোনোটাকে হিসবাহ দিয়ে, কোনোটাকে জিহাদ দিয়ে মোকাবিলা করতে হয়। আমরা হিসবাহ পরিত্যাগ করলে জাহিলিয়াত আমাদের পরাজিত করে ছাড়বে। কারণ এটি পরিত্যাগ করার অর্থ হলো যুদ্ধের ময়দানের এক জায়গায় দরকারি একটি অস্ত্র হাত থেকে ফেলে দেওয়া। ফলে সেই জায়গায় পরাজিত হয়ে সমগ্র ময়দানেই টালমাটাল পরিস্থিতিতে পড়ে যাওয়া।
শরীয়তের নির্দেশ ও আলিমগণের দিনির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের দাওয়াতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো সকল মন্দ দূর করতে ও সকল হারিয়ে যাওয়া ভালো কাজকে পুনরুজ্জীবিত করতে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। এভাবেই তো আমরা নিজেদের ও অন্যদের দ্বীন ও দুনিয়া রক্ষার্থে যথাসম্ভব উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে পারব। আগেই বলা হয়েছে যে, মানুষকে তাদের প্রতিপালকের ইবাদতের দিকে নিয়ে আসা আমাদের মৌলিক লক্ষ্যগুলোর একটি। অনেকে দাবি করে যে হিসবাহ-র মতো ছোটখাটো (!) দায়িত্ব ছেড়ে সবচেয়ে বড় মন্দের (জাহিলি আইন-বিধান) অপসারণ ও সবচেয়ে বড় ভালোর (শরীয়তের আইন-বিধান) প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দিতে। হ্যাঁ, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে জাহিলি বিধান উপড়ে ফেলে শরীয়ত প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে বড় দায়িত্বগুলোর অন্যতম। কিন্তু এই কথিত 'সবচেয়ে বড় ভালো' কাজের আদেশ ও 'সবচেয়ে মন্দ' কাজের নিষেধের থেকে সাধারণ হিসবাহকে আলাদা করাটাই একটা ভুল। যদি পার্থক্য থাকেই, তা হলে তা বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ কিছু ব্যক্তির জন্য। আলিমগণ তাঁদের আলোচনায় এসব ক্ষেত্রবিশেষকে যথাযথভাবে সংজ্ঞায়িত করে গেছেন। কেউ যদি মনে করে যে হিসবাহ পরিত্যাগ করলে অনেক শক্তি ও সময় বেঁচে যাবে, অন্যান্য কাজ করে এমনি এমনিই শরীয়ত প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে, তা হলে বলতে হয় তারা শরীয়তের ওপর নিজেদের যুক্তিবুদ্ধিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা হয় আল্লাহকে ভুলে যাচ্ছে বা আল্লাহকে ভুলে থাকার ভান করছে। আল্লাহ নিজেই তো হিসবাহ করার আদেশ দিয়েছেন: “আল্লাহ তাদের অবশ্যই সাহায্য করবেন যারা তাঁকে সাহায্য করে।”[২৯৭] আল্লাহরই একটি হুকুম অমান্য করে আল্লাহরই সাহায্য পাওয়ার আশা কীভাবে করা যায়? আল্লাহর দেওয়া সীমা লঙ্ঘিত হতে দেখে ক্রোধান্বিত না হয়ে কী করে আল্লাহর ক্রোধ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়? আমরা তো পশুর মতো আচরণ করছি। কানে আঙুল ঢুকিয়ে কাপড় দিয়ে চোখ ঢেকে রাখছি। নিজেদেরকে ভাবছি আল্লাহর দ্বীনের অভিভাবক, যে ইচ্ছেমতো এখানে কমবেশি করতে পারে। ইমাম শাফিঈ বলেছেন, “(আল্লাহর দেওয়া সীমা লঙ্ঘিত হতে দেখেও) যে আল্লাহর ওয়াস্তে রাগান্বিত হয় না, সে আসলে একটা গাধা।”[২৯৮] যারা অসৎকর্ম সংঘটিত হতে দেখে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তা পরিবর্তন করার চেষ্টা করে না, তারা একসময় এতে গা সওয়া হয়ে যাবে। ভালকে মন্দ আর মন্দকে ভালো ভাবতে শুরু করবে। তারা বানী ইসরাঈলের সেই কতিপয় ব্যক্তির মতো অভিশপ্ত হওয়ার যোগ্য: “বানী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরি করেছিল, তাদের প্রতি দাউদ ও ঈসা ইবনু মারইয়ামের মুখ দিয়ে অভিশাপ করা হয়েছে। কারণ তারা ছিল অবাধ্য ও তারা সীমালঙ্ঘন করত। তারা যেসব অপকর্ম করত, তা থেকে একে অপরকে নিষেধ করত না। নিশ্চয় তারা যা করত, তা অত্যন্ত মন্দ।”[২৯৯] নবীজি বলেছেন, “সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! হয় তোমরা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করবে, পাপাচারীকে সত্যপন্থী হতে সাহায্য করবে, আর নয়তো আল্লাহ তোমাদের অন্তরে একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি করে দেবেন অথবা তোমাদেরকে তাদের (বানী ইসরাঈলের) মতো অভিশাপ দেবেন।”[৩০০] আল্লাহ তাআলা আমাদের ছোট-বড় সকল মন্দ প্রতিরোধ করার আদেশ দিয়েছেন। মন্দকে প্রতিরোধ করার হাদীসটিতে মুনকার শব্দটির সাথে সুনির্দিষ্ট নির্দেশক নেই। অতএব, এর দ্বারা নির্দিষ্ট কোনো মন্দকাজকে না বুঝিয়ে সকল মন্দকে বোঝানো হয়েছে। কাজেই যারা দাওয়াতের স্বার্থে হিসবাহ ত্যাগ করার কথা বলে, তাদের কোনো উত্তর দেওয়ার দরকার নেই। দাওয়াতের নির্দেশ দিয়েছেন যিনি, হিসবাহ-র নির্দেশও দিয়েছেন তিনিই। আমাদের যা আদেশ করা হয়েছে, তা-ই করতে হবে।
৩. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ
জিহাদ নিয়ে কথা বলতেই আজ আমাদের দুঃখ হয়। জিহাদের সাথে করে যতই দুর্ভোগ আর বিপদ আসুক না কেন, সত্যিকারের মুমিনদের কাছে এই ইবাদতটি চোখের মণি। কারণ, এই ইবাদত আল্লাহর ইচ্ছায় মুমিনদেরকে অসম্মান-অপমানের জীবন থেকে উদ্ধার করে সম্মান-মর্যাদার দিকে নিয়ে যায়। আখিরাতেও এটি জান্নাত অর্জন করার পথ সুগম করে দেয়। “যাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করা হলো এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো, অবশ্যই সে সফলকাম হলো। কারণ পার্থিব জীবন তো ছলনার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।”[৩০১] নবীজি বলেন, “আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ধুলা এবং জাহান্নামের আগুনের ধোঁয়া কখনো একত্র হবে না।”[৩০২] “উটের দুধ দোহন করার মধ্যবর্তী সময় পরিমাণ সময় যে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”[৩০৩] “আল্লাহর পথে যার দু'পা ধূলোমলিন হয়েছে, আল্লাহ তার ওপর জাহান্নামকে হারাম করে দিয়েছেন।”[৩০৪] এ কারণেই কয়েকজন গরীব সাহাবি জিহাদে ব্যয় করার মতো অর্থ না থাকার দুঃখে কান্না করেছিলেন। “তখন তারা ফিরে গেল, আর সেই সময় তাদের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ছিল এই দুঃখে যে, (জিহাদে) ব্যয় করার মতো অর্থ তাদের ছিল না।”[৩০৫] অথচ এই জিহাদকে এড়িয়ে যেতেই আজকের মুসলিমরা চেষ্টার কোনো ত্রুটিই করি না। কে যেন একে যথার্থই 'ভুলে যাওয়া ফরয' বলে অভিহিত করেছিলেন। উম্মাহর প্রথম প্রজন্মের সাথে আমাদের বিশাল ফারাক বোঝানোর জন্য এই একটি বিষয়ই যথেষ্ট। এ থেকে আরো বোঝা যায় সাহাবাগণ কেন সম্মানিত হয়েছিলেন আর আমরা কেন অপদস্থতার গর্তে পড়ে আছি। নবীজি যথার্থই বলেছেন, “মানুষ যখন দিনার-দিরহামের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্য আর কৃষিকাজে ব্যস্ত হয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা ছেড়ে দিবে, তখন আল্লাহ তাদের ওপর এমন বিপদ নাযিল করবেন যা তাদের কখনোই পরিত্যাগ করবে না, যতদিন না তারা তাদের দ্বীনের দিকে ফিরে আসছে।”[৩০৬] এই কথা সত্যি হয়ে গেছে। আল্লাহরই দেওয়া জান-মালকে মানুষ আল্লাহরই কাছে জান্নাতের বিনিময়ে বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। “নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন, কারণ তাদের জন্য বিনিময়ে আছে জান্নাত...” এই লাভজনক ব্যবসার বাজার এই দিকে— “তারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে, হত্যা করে ও নিহত হয়...” চুক্তির দলিল— “এ ওয়াদা তাঁর ওপর অবশ্যই পালনীয়, যা আছে তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে। আর আল্লাহর চেয়ে কে বেশি ওয়াদা পালনকারী?” তিনি এই বাণিজ্যে খুশি হতে বলেছেন— “কাজেই তোমরা যে ক্রয়-বিক্রয় সম্পাদন করেছ, তার জন্য আনন্দিত হও।” কারণ হলো— “আর এটাই হলো মহান সফলতা।”[৩০৭]
বান্দা তার মালিকের কাছে একটি জিনিস বিক্রয় করল, যা এমনিতেই তার নিজের না। বিনিময়ে পেয়ে গেল আসমান-জমিনের মতো প্রশস্ত জান্নাত। এমন জান্নাত, যা কেউ নিজের নেক আমলের জোরে লাভ করতে পারে না। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ বলেন, “মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো, (অন্তত) এর কাছাকাছি থেকো এবং সুসংবাদ গ্রহণ করো। কারো আমলই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না।” লোকেরা বলল, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও কি নন?” তিনি বললেন, “আমিও নই, যদি না আল্লাহ আমাকে তাঁর রহমতের চাদরে ঢেকে দেন।”[৩০৮] শুধু তা-ই না, যথাযথ মূল্য পরিশোধকারীদের ব্যাপারে আল্লাহ এতই উদার যে, তিনি ঘোষণা দেন: “যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদের মৃত ভেবো না। বরং তারা জীবিত। তাদের প্রতিপালকের সান্নিধ্যে থেকে তারা রিযিকপ্রাপ্ত হচ্ছে।”[৩০৯] নবীজি বলেন, “শহীদদের আত্মাগুলো থাকে সবুজ পাখির ভেতরে, যারা আল্লাহর আরশ থেকে ঝুলে থাকা ঝাড়বাতিদানে বসা থাকে এবং জান্নাতের যেখানে খুশি সেখানেই ঘুরে বেড়ায়।”[৩১০] এভাবেই আল্লাহ তাঁর চুক্তি অনুযায়ী শহীদদের জীবন ও সম্পদ ফিরে দিয়েই ক্ষান্ত হন না, তাদের সম্মানজনক রিযিকও দিতে থাকেন। এতকিছুর পরও আজকের মুসলিমরা এই ইবাদতকে ছেড়ে দেয়। ভুলে যায় যে “(ইসলামের) চূড়া হলো জিহাদ।”[৩১১] আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমাদের ওপর যুদ্ধ ফরয করা হলো, যদিও তোমরা তা অপছন্দ করো। কিন্তু তোমাদের কাছে যা অপছন্দনীয়, হতে পারে তা কল্যাণকর। আর যা তোমাদের কাছে পছন্দনীয়, হতে পারে তা কল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।”[৩১২] দীর্ঘদিন ধরে জিহাদ পরিত্যাগ করতে করতে এর চিহ্নগুলো হারিয়ে গিয়েছে, এর ফিকহ মানুষ ভুলে বসেছে, মানুষের হৃদয়ে এর প্রভাব দুর্বল হয়ে গিয়েছে। মানুষের অজ্ঞতা আর অপছন্দের কারণে জিহাদ কোনটা নিয়ে কথা বলাই হয়ে গেছে দুরূহ। কারণ “তাদের ওপর অতিবাহিত হয়ে গেছে বহু বহু যুগ, ফলে তাদের অন্তর হয়ে গেল কঠিন।”[৩১৩] জিহাদ নিয়ে কথা বলা কঠিন হয়ে গেছে, কারণ দুনিয়া আমাদের পেছন থেকে টেনে ধরে রেখেছে। শয়তান আমাদের মনে মিথ্যে আশা আর ভয় জাগ্রত করে। ভীরুতা আমাদের মৃত্যুর প্রতি বিতৃষ্ণ করে তুলেছে। দুনিয়ার মোহ আমাদের পথে অনড় এক পাথরের মতো আটকে আছে। এমনকি আমাদের নফসও এই দায়িত্ব থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে। বলছে: “হে আমাদের প্রতিপালক! কেন আমাদের ওপর যুদ্ধ ফরয করলেন? আরেকটু সময় কেন দিলেন না?”[৩১৪] আল্লাহ এর মোক্ষম জবাব দেন: “(তাদের) বলো (হে মুহাম্মাদ), 'পার্থিব ভোগ তো সামান্যই। যে তাকওয়া অবলম্বন করে, তার জন্য আখিরাতই উত্তম। তোমাদের প্রতি বিন্দুমাত্র অন্যায় করা হবে না।' তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদের পেয়ে বসবেই। যদিও তোমরা সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গের মধ্যে থাকো।”[৩১৫] তা হলে আমাদের কি উচিত নয় এই সামান্য ভোগ-বিলাসকে পেছনে ফেলে আখিরাতের জন্য কাজ করা? তখনই কেবল আমরা রাসূল সাহাবাগণের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) মতো করে জিহাদকে ভালোবাসতে পারব। তখনই কেবল আমরা জিহাদের নাম শুনে জান্নাতের সুগন্ধ অনুভব করব। নবীজি বলেন, “জান্নাত হলো তরবারির ছায়াতলে।”[৩১৬] তখনই কেবল আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করা নিয়ে কথা বলা সম্ভব। কিন্তু এই আলোচনা কোথা থেকে শুরু করা উচিত? এর বৈশিষ্ট্য-প্রকৃতি থেকে? নাকি এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে? নাকি এর বিভিন্ন পর্যায়-ক্রম থেকে? নাকি ঐতিহাসিক ও আইনগত প্রয়োজনীয়তা থেকে? আচ্ছা তাদের ব্যাপারে আলোচনা করলে কেমন হয়, যারা খোঁড়া অজুহাতে জিহাদ পরিত্যাগ করেছিল? চলুন সেই দিনটিতে ফিরে যাই, যেদিন নবীজি সর্বপ্রথম ওহি লাভ করেন।
ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তাঁর প্রতি তাঁর রব্বের নাযিলকৃত সর্বপ্রথম ওহি হলো তাঁর প্রতিপালকের নামে পড়ার হুকুম, যিনি সৃষ্টি করেছেন। এটি হয়েছিল তাঁর মিশনের একদম শুরুর দিকে। কাজেই প্রথম নির্দেশ ছিল অন্যকে জানানোর আগে নিজে অন্তর দিয়ে জ্ঞান অনুধাবন করা। এর কিছুকাল পর নাযিল হলো, “ওহে বস্ত্র আবৃত (ব্যক্তি)! ওঠো, সতর্ক করো।”[৩১৭] তো দেখা যাচ্ছে যে প্রথমে মুহাম্মাদ -কে “পড়ো।”[৩১৮] আদেশ দিয়ে নবুওয়্যাত দেওয়া হয়েছে। তারপর মানুষের কাছে দাওয়াত ছড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দিয়ে রাসূলের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। প্রথমে নিকটাত্মীয়, তারপর নিজের গোত্র, তারপর সংলগ্ন আরব, তারপর পূর্ণ আরব ভূখণ্ড, তারপর সবশেষে সমগ্র মানব ও জিন জাতির কাছে পর্যায়ক্রমে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ এসেছে। নবুওয়্যাতের প্রথম প্রায় দশ বছরে মুহাম্মাদ-কে ইসলামের বাণী প্রচার করতে বলা হয়েছে। জিহাদ বা জিযিয়ার বিধান তখনও দেওয়া হয়নি। বিরুদ্ধবাদীদের পক্ষ থেকে আসা বিভিন্ন আচার-আচরণকে ধৈর্য ও ক্ষমার মাধ্যমে মোকাবিলা করতে বলা হয়েছে। তারপর তাঁকে হিজরত করা ও পালটা লড়াইয়ের অনুমতি দেওয়া হয়। তারপর যারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, শুধু তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাকিদেরকে ছাড় দিতে বলা হয়। কিছুকাল পর তাঁকে সাধারণভাবে সকল মুশরিকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদেশ করা হয়, যতদিন না দ্বীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহরই জন্য হয়ে যায়।
জিহাদের নির্দেশ আসার পর কাফিরদেরকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। প্রথমত, যাদের সাথে মুসলিমদের শান্তিচুক্তি আছে (আহলুস সুলহ ওয়াল হুদনাহ বা আহলুল 'আহদ); দ্বিতীয়ত, যাদের বিরুদ্ধে মুসলিমরা যুদ্ধরত (আহলুল হারব); তৃতীয়ত, যেসব অমুসলিম জিযিয়া পরিশোধ করার মাধ্যমে মুসলিম সরকারের নিরাপত্তাধীন আছে (আহলুয যিম্মাহ)। নবীজি-কে প্রথম দলটির সাথে অতীতে যেসব চুক্তি হয়েছে, তারা সেই চুক্তির কোনো শর্ত ভঙ্গ করার আগ পর্যন্ত তাদের সাথে সেসব চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ করতে বলা হয়। কিন্তু যদি তাদের মধ্যে কারো বিশ্বাসঘাতকতা করার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেয়, তা হলে চুক্তি বাতিল করার কথা জানিয়ে দিয়ে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়। চুক্তিভঙ্গকারীদের সাথে যুদ্ধের বিধানও বলে দেওয়া হয়। এই সকল শ্রেণীর মানুষদের ব্যাপারে শরীয়তের অবস্থান বর্ণনা করে সূরা আত-তাওবা নাযিল হয়। আহলে কিতাব সম্প্রদায় (ইহুদী ও খ্রিষ্টান) যতক্ষণ না ইসলাম গ্রহণ করে অথবা জিযিয়া প্রদান করে, ততক্ষণ তাদের সাথে যুদ্ধ করার আদেশ করা হয়। তাঁকে আল্লাহ আরও আদেশ করেন কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে। কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয় অস্ত্রের মাধ্যমে আর মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয় যুক্তি-তর্ক ও লেখনীর মাধ্যমে। আহলুল-আহদকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়-
১) যারা নবীজি সাথে চুক্তি করার পরে তা ভঙ্গ করে এবং বিশ্বাসঘাতকতা করে। এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ করা হয়।
২) যারা চুক্তিভঙ্গকারী কোনো কাজ করেনি, বিশ্বাসঘাতকতা করেনি এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কাউকে সমর্থন করেনি। এদের সাথে চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ করতে বলা হয়।
৩) যাদের সাথে নবীজি -এর কোনো চুক্তি নেই এবং তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাউকে সমর্থনও করেনি অথবা যাদের সাথে স্থায়ী চুক্তি আছে। এদেরকে চার মাস সময় দিতে বলা হয়, এই চার মাস পর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে। একইভাবে, এদের মধ্যে যারা চুক্তি ভঙ্গ করে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আদেশ করা হয়। আর যারা চুক্তি ভঙ্গ করেনি বা যাদের সাথে স্থায়ী চুক্তি আছে, তাদের চার মাস সময় দেওয়া হয়। রাসূল মেয়াদ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত সকল চুক্তিকে সম্মান করেছেন। এ ছাড়া তিনি আহলে কিতাব সম্প্রদায়কে জিযিয়া পরিশোধ করার আদেশ দেন, এর বিনিময়ে তারা নির্ভয়ে স্বাধীনভাবে নিজেদের ধর্ম পালন করতে পারবে।
অর্থাৎ, সূরা তাওবা অনুযায়ী, কাফিরদেরকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয় :
১) আহলুল হারব (তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত)
২) আহলুল আহদ (তাঁর সাথে চুক্তিবদ্ধ)
৩) আহলুয যিম্মাহ (জিযিয়া প্রদানের মাধ্যমে মুসলিমদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত আহলে কিতাব)
দ্বিতীয় দলটি ইসলাম গ্রহণ করার পর প্রতিপক্ষ হিসেবে থেকে যায় কেবল আহলুল হারব এবং আহলুয যিম্মাহ। অতএব, ইসলাম এসেছে সকল মানুষকে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার জন্য। “বলো, 'হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রাসূল, যিনি আকাশসমূহ ও পৃথিবীর রাজত্বের মালিক। তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোনো উপাস্য নেই। তিনিই জীবত করেন আর মৃত্যু আনেন।”[৩১৯] ইসলাম এসেছে পৃথিবীর বুক থেকে সব রকম শিরকের শেকড় উপড়ে ফেলে এক আল্লাহর ইবাদত চালু করার জন্য। নবীজি বলেছেন, “আমাকে কিয়ামতের আগে তরবারিসহ প্রেরণ করা হয়েছে যতদিন না কোনো শরীক ছাড়া এক আল্লাহর উপাসনা করা হয়।”[৩২০] এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য মক্কায় নবীজি -এর আহ্বানের ভাষা ছিল, “বলো, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ!" “বলো, 'হে মানবজাতি! আমি (প্রেরিত হয়েছি) তোমাদের জন্য এক সুস্পষ্ট সতর্ককারীরূপে।”[৩২১] মুসলিম সেনাবাহিনী মদীনা থেকে আরব উপদ্বীপের সকল প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন, সেখান থেকে যান পারস্য ও রোমে। তের শতক ধরে ইসলামি খিলাফাতের রাজধানী ঘুরে বেড়িয়েছে মদীনা থেকে দামেস্ক, বাগদাদ, কায়রো হয়ে কন্সটান্টিনোপলে। প্রতিটি রাজধানী থেকেই সত্যের সেনাবাহিনী ইসলামের পতাকা নিয়ে পৃথিবীর দিকে দিকে অভিযানে বেরিয়ে পড়েছে।
এই সকল দাওয়াত কার্যক্রমে মুসলিমদের একটিই লক্ষ্য ছিল। নবীজি-এর হাতে মক্কার কা'বার ভেতরকার ও তৎসংলগ্ন এলাকার মূর্তিগুলো ধ্বংস করার উদ্দেশ্যও একটিই ছিল। এই একই উদ্দেশ্যেই মুসলিম সেনাবাহিনীগুলো পৃথিবীর নানা অংশে অভিযানে বেরিয়েছে। পারস্য সেনাপতি রুস্তম যখন জানতে চাইল, “কীসে তোমাদের এখানে আনল?” তখন মুসলিম সেনা রিবিঈ বিন আমির জবাব দিয়েছিলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের প্রেরণ করেছেন মানুষকে সৃষ্টির দাসত্ব থেকে বের করে স্রষ্টার দাসত্বের দিকে নিয়ে আসার জন্য। মানবরচিত ধর্মের যুলুম থেকে বের করে ইসলামের ন্যায়পরায়ণতার দিকে নিয়ে আসার জন্য। এই দুনিয়ার কাঠিন্য থেকে বের করে আখিরাতের আরাম-আয়েশের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।" আসলে রাসূলুল্লাহ ও তাঁর সাহাবিগণের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) লক্ষ্য এটিই ছিল। এই লক্ষ্যে কখনো পরিবর্তন আসেনি। কিন্তু পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী আল্লাহরই হুকুমে এই লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম ও পদ্ধতিতে যথোচিত পরিবর্তন-সংযোজন-বিয়োজন এসেছে। নবীজি প্রথমে গোপনে দাওয়াত দিয়েছেন। একদম কাছের মানুষদের মধ্যে যাদেরকে আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দেওয়ার উপযুক্ত মনে হয়, বেছে বেছে তাদের কাছেই দাওয়াত পৌঁছানো হয়েছে। তিন বছর পর প্রকাশ্যে দাওয়াতের নির্দেশ দেওয়া হয়। মক্কা ও অন্যান্য জায়গায় নবীজি এই দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে প্রায় দশ বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। বিরোধিতার জবাবে নবী ও সাহাবিগণকে ধৈর্য ধরতে বলা হয়। আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করতে নিষেধ করা হয়। এ কারণে 'আকাবাহর দ্বিতীয় বাই'য়াতের সময় তিনি শপথ গ্রহণকারীদের মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, “আমাদেরকে তা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়নি।”[৩২২] মদীনায় হিজরতের পরপর শুধু তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হয়, যারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এই পর্যায়ে বদর, উহুদ, খন্দকের যুদ্ধ ও অন্যান্য ছোটখাটো যুদ্ধ হয়। খন্দকের যুদ্ধে সম্মিলিত মিত্রবাহিনীর (আল-আহযাব) পরাজয়ের পর জিহাদের চূড়ান্ত বিধান আসে। খন্দকের যুদ্ধ থেকে ফেরার পর নবীজি বলেন, “এবার সময় এসেছে আমাদের পক্ষ থেকে তাদের আক্রমণ করার। তারা আর আমাদের আক্রমণ করবে না। এখন থেকে আমরাই তাদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হব।”[৩২৩]
কিয়ামত পর্যন্ত জিহাদের সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়মগুলো স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে সূরা আত-তাওবা নাযিল হয়। সেখানে আল্লাহ আদেশ দেন যে সকল কাফিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। এভাবে জিহাদ পরিণত হলো আল্লাহর দ্বীনকে ছড়িয়ে দেওয়ার ও আল্লাহর কালামকে বুলন্দ করার একটি ফরয বিধানে। নবীজি বলেন, “আমাকে কিয়ামতের আগে তরবারিসহ প্রেরণ করা হয়েছে যতদিন না কোনো শরীক ছাড়া এক আল্লাহর উপাসনা করা হয়। আমার রিযিক দেওয়া হয় আমার বর্শার নিচ থেকে। আমার বিরুদ্ধাচারণকারীদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে অপদস্থতা-লাঞ্ছনা।”[৩২৪] এক হাতে কুরআন আর অপর হাতে তরবারি নিয়ে মুসলিম সেনাবাহিনীগুলো ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জাতি, রাজ্য, সাম্রাজ্য ও গোত্রকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করার জন্য। যে মেনে নিয়েছে, তাকেই ইসলামের ভেতর স্বাগত জানানো হয়েছে। কিন্তু যে তা প্রত্যাখ্যান করেছে, তাদের বশ্যতা স্বীকার করিয়ে জিযিয়া কর আদায় করা হয়েছে অথবা তাদের সাথে যুদ্ধ করা হয়েছে। লক্ষ্য কখনো পাল্টায়নি। নবীজি ও সাহাবিগণের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) দাওয়াত ও জিহাদ আবর্তিত হয়েছে একটি লক্ষ্যকে কেন্দ্র করেই। কুরআনে এটি খুব চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে: “তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাও, যে পর্যন্ত না ফিতনা (শিরক ও কুফর) খতম হয়ে যায় আর দ্বীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়।”[৩২৫] মক্কা বিজয়ের পর মূর্তি ধ্বংসের ঘটনা তাওহীদের বিজয়ের একটি প্রতীক। যুদ্ধও তাওহীদের দিকে ডাকার একটি মাধ্যম। যেমনটা নবীজি বলেছেন, “আমাকে আদেশ করা হয়েছে মানুষের সাথে ততক্ষণ লড়াই করে যাওয়ার জন্য, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর রাসূল।”[৩২৬] যুদ্ধ করা ইসলামের দিকে আহ্বানেরই একটি অংশ। শাসক ও রাজা-বাদশাহরা আল্লাহর ভূমি ও সৃষ্টিগুলোকে নিজেদের মালিকানাধীন দাবি করে সেখানে ইসলামের প্রবেশে বাধার সৃষ্টি করছিল। তাই তাদের সাথে লড়াই করা অপরিহার্য হয়ে যায়। এ ছাড়া এসকল যালিম শাসক মানবরচিত আইন প্রণয়ন করে জনগণকে তা মানতে বাধ্য করার মাধ্যমে শিরকে লিপ্ত করছিল। আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে উপাসনা করা এবং ইসলামের দাওয়াতের বিরোধিতা করা এইসব শাসকদেরকে অপসারণ করা আবশ্যক। এসব শাসকের মধ্যে যারাই ইসলামে প্রবেশ করতে বা জিযিয়া দিয়ে বশ্যতা স্বীকার করে নিতে অস্বীকৃতি জানাবে, তাদের সবার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করা হবে। ফিতনা তথা শিরক ও কুফর নির্মূল করার জন্য যুদ্ধের কোনো বিকল্প নেই। “তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকো যতদিন না ফিতনা নির্মূল হয়ে যায় এবং দ্বীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহরই জন্য হয়ে যায়।”[৩২৭]
কেউই আল্লাহর পাশাপাশি বা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেকে স্রষ্টা বলে দাবি করতে পারে না। তেমনিভাবে আল্লাহর পাশাপাশি বা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেকে আইন প্রণেতা বলেও কেউ দাবি করতে পারে না। ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কারো অধিকার নেই আল্লাহর সৃষ্টির মাঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আইন ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে বিচার-ফায়সালা করার। এমনকি একজন মুসলিম ও একজন কাফিরের মধ্যকার বিচারও না।”[৩২৮] মুসলিম হিসেবে আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আল্লাহর ভূমি ও সৃষ্টিজগতের ওপর আল্লাহর আইনের সার্বভৌমত্ব কায়েম করার জন্য। আমাদের আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আমরা যেন আল্লাহর আইন ছাড়া অন্য কোনোকিছু দিয়ে মানুষের মাঝে বিচার না করি। যে-কেউ তা প্রত্যাখ্যান করবে বা এতে বাধা দেবে, তার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করা হবে। অনেকে বলতে পারে যে, আমরা মানব জাতির ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিচ্ছি। আমাদের জবাব হলো—এই কর্তৃত্ব আল্লাহর সৃষ্টির ওপর আল্লাহর কর্তৃত্ব। আমরা কেবল মানবজাতির কল্যাণের জন্য বের করা সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাত হিসেবে আল্লাহর এই নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে চলেছি। মানুষ কখনোই এমন কোনো আইনবিধান বানাতে পারবে না, যা আল্লাহর আইনের সমান বা তার চেয়ে বেশি ন্যায়ানুগ। যে ইসলামকে মেনে নিবে, সে নিঃসন্দেহে দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হবে। কিন্তু যে-কেউ কাফির হিসেবে থাকাকেই বেছে নেয়, সে তা করার ব্যাপারে স্বাধীন। কিন্তু এর বিনিময়ে অবশ্যই তাকে জিযিয়া দিয়ে ইসলামের আইনব্যবস্থার প্রতি অনুগত হয়ে থাকতে হবে।
অজ্ঞ লোকেরা প্রশ্ন করতে পারে, “আপনাদেরকে এবং ইসলামকে মানুষের ওপর নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব চালানোর অধিকার কে দিয়েছে?” আমরা জবাব দিই- “মানবজাতির রব, মানবজাতির অধিপতি, মানবজাতির ইলাহ আল্লাহ আমাদের এই অধিকার দিয়েছেন।” এখন আমাদের পালটা প্রশ্ন, “তোমাদেরকে ইচ্ছেমতো আইন বানিয়ে মানবজাতির ওপর নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব ফলানোর অধিকার কে দিয়েছে?” আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ব্যাপারে এটিই সঠিক বুঝ। যারা এর অন্যথা ভাবে, তাদের উচিত ইসলামি শাস্ত্রের উৎসগুলো অধ্যয়ন করে তার বুঝকে সংশোধন করে নেওয়া। ইসলাম কেবল কিছু বিশ্বাসের সমষ্টি নয়, মুখে যার সাক্ষ্য দিয়ে এবং জবান ও কলম দিয়ে যাকে সমর্থন করলেই সব দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। এই খণ্ডিত বুঝের পক্ষে অনেকে দলিল হিসেবে এই আয়াত উল্লেখ করে : “আর বলে দাও, 'সত্য এসেছে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে। কাজেই যার ইচ্ছে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছে সত্যকে অস্বীকার করুক।”[৩২৯] এই আয়াত উল্লেখ করে জিহাদকে অস্বীকার করতে চাওয়াটা অপব্যাখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। ইসলাম একটি জীবনব্যবস্থা; মানুষের জীবন পরিচালনার জন্য আল্লাহর নাযিল করা বিধান। এ কারনেই মুসলিমদের আকীদা-সম্পর্কিত একটি ভাষণ বা খুতবা দিয়ে দেওয়াটাই ইসলাম প্রতিরক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং আমাদের সকল দায়িত্বই পালন করতে হবে। মুখ ও সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে দাওয়াত দিতে হবে, বাগ্মিতার সহিত প্রমাণ তুলে ধরতে হবে এবং অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করতে হবে। জিহ্বা, সুন্দর আচরণ ও বাগ্মিতা হলো মন ও মননের জন্য। কাজেই হয় মানুষ ঈমান এনে অন্তরের শান্তি লাভ করবে। আর নয়তো বশ্যতা স্বীকার করে জিযিয়া পরিশোধ করে নিজের ওপর ইসলামি আইন-বিধানের কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেবে। কিন্তু কেউ অহংকার করে তা প্রত্যাখান করলে আমাদের তরবারি চালাতে হবে, যতদিন না এসব মিথ্যা উপাস্য মুখ থুবড়ে পড়ে। তারপরই আমরা এই আয়াতের সকল হক আদায় করে তিলাওয়াত করতে পারব : “আর বলো দাও, 'সত্য এসেছে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে। কাজেই যার ইচ্ছে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছে সত্যকে অস্বীকার করুক।”[৩৩০]
এটিই হলো ইসলামে যুদ্ধের বিধানের কারণ, যা আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলে দিয়েছেন: “তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকো যতদিন না ফিতনা নির্মূল হয়ে যায় এবং দ্বীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহরই জন্য হয়ে যায়।”[৩৩১] এভাবেই ধাপে ধাপে ইসলামের নিয়মাবলি পূর্ণতা লাভ করেছে। চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছার পর এর বিধান কিয়ামত পর্যন্ত কার্যকর হয়ে গেছে। “মুশরিকদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করো, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে।”[৩৩২] “তারপর এই নিষিদ্ধ মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেলে মুশরিকদেরকে যেখানে পাও হত্যা করো। তাদের ঘেরাও করো। তাদের অপেক্ষায় প্রত্যেক ঘাঁটিতে ওঁৎ পেতে বসে থাকো।”[৩৩৩] “আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা (১) আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না, (২) শেষ-দিবসের প্রতি ঈমান আনে না, (৩) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন, তাকে হারাম গণ্য করে না, আর (৪) সত্য দ্বীনকে নিজেদের দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করে না—তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকো, যে পর্যন্ত না তারা বশ্যতা স্বীকার করে স্বেচ্ছায় জিযিয়া দেয়।”[৩৩৪] এগুলো হলো ইসলামে জিহাদের বিধানের কারণ। ইসলামের অবশ্য ঠেকা পড়েনি তার কোনো বিধানের পক্ষে সাফাই গাওয়ার। যারা নিজেদের দ্বীনের ব্যাপারে লজ্জিত, জাহিলিয়াতকে খুশি করার জন্য তৎপর, জাহিলি বিধানের পক্ষে যুদ্ধ করতে নির্লজ্জ, তাদের খুশি করতে না পারলে ইসলামের কিছু আসে যায় না। আজকাল অনেক মুসলিমই জিহাদের ব্যাপারে কথা বলাও এড়িয়ে চলে। এভাবে তারা প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের 'প্রভু'দেরকে খুশি রাখতে চায়, তাদের রোষানল থেকে বাঁচতে চায়!
অনেক মুসলিম প্রশ্ন করে, “জিহাদ আবার কী? আল্লাহ আমাদের শুধু দাওয়াত করতে বলেছেন। কারণ তিনি বলেন: “জ্ঞান-বুদ্ধি আর উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তুমি (মানুষকে) তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান জানাও আর লোকদের সাথে বিতর্ক করো এমন পন্থায় যা অতি উত্তম।”[৩৩৫] এসকল লোক ভুল করে জিহাদকে দাওয়াতের বিপরীত মনে করে। এই আয়াতটা যে দাওয়াতের নিয়ম-কানুন বর্ণনা করে আর জিহাদের যে নিজস্ব নিয়ম-কানুন ও মূলনীতি আছে, এই বিষয়টা তারা এড়িয়ে যায় অথবা না দেখার ভান করে। অন্যান্য আয়াতে আল্লাহ জিহাদের নিয়ম-কানুনও বলেছেন: “হে নবী! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করো। তাদের প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করো। তাদের বাসস্থান হলো জাহান্নাম। আর তা কতই-না নিকৃষ্ট আবাসস্থল!”[৩৩৬] আবার কিছু মুসলিম বলে, “ইসলামে জিহাদের বিধান দেওয়া হয়েছে শুধুই আত্মরক্ষা করার জন্য। অতএব, জাহিলিয়াতকে বিরক্ত না করে তাকে তার মতো থাকতে দিন। সে যতদিন আমাদের ভূমি আক্রমণ না করছে, ততদিন পর্যন্ত আমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে পারি।” এই অজ্ঞ লোকেরা ইসলাম আর জাহিলিয়াতকে এক করে দেখতে। মনে করে, এই দুটি মতাদর্শই আল্লাহর সৃষ্টির ওপর নিজ নিজ সীমা-পরিসীমা অনুযায়ী শাসন-কর্তৃত্ব বজায় রাখার অধিকারী। এরা জিহাদের বিধানকে অনির্দিষ্টকালের জন্য রহিত প্রমাণ করার চেষ্টা করে। তাদের খোঁড়া যুক্তি হলো, নবীজি তো প্রথমে গোপনে দাওয়াত প্রদান শুরু করেছেন। তারপর প্রকাশ্যে দাওয়াত দিয়ে বিরোধিতাকারীদের অত্যাচার সহ্য করে গেছেন। তারপর যারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তাদের বিরুদ্ধে রক্ষণাত্মক যুদ্ধ করেছেন। সব শেষে গিয়ে আক্রমণাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। তা হলে আমরাও এভাবে ধাপে ধাপে আগাই। এত তাড়াহুড়ার কী আছে?
এরা ভুলে যায়, অথবা ভুলে যাওয়ার ভান করে যে, নবীজি এই সবকিছু করেছেন আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী। তিনিও যদি এসব নির্দেশের অন্যথা করতেন, তা হলে তাঁরও গুনাহ হতো। তবে তিনি এমনটা করেননি এবং তিনি নিষ্পাপ। জিহাদের বিধান যখন চলেই এসেছে, তখন আমরা তা অমান্য করার অর্থ হলো গুনাহ্ ও সীমালঙ্ঘনে লিপ্ত হওয়া। আবার অনেকে আছে যারা বলে যে, জিহাদ তো ফরয ঠিক আছে। কিন্তু খিলাফাত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে এভাবে নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় কোনো জিহাদ করা যাবে না। এখানেও তারা দুই ক্ষেত্রের দুটি বিধানকে গুলিয়ে ফেলছে। একটি হলো নেতা থাকা অবস্থায় তাঁর অনুমতি নিয়ে যুদ্ধ করার বিধান, আরেকটি হলো মুসলিম নেতা ক্ষমতায় না থাকা অবস্থায় কী করা হবে তার বিধান। যেখানে আমরা জিহাদ করবই মুসলিম শাসককে ক্ষমতায় আনার জন্য, সেখানে কী করে কেউ এসে এই দাবি করতে পারে যে শাসকের অনুমতি ছাড়া জিহাদ হবে না? ইবনু কুদামাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুসলিম শাসকের অনুপস্থিতি যেন জিহাদ বন্ধ না করে (অর্থাৎ, জিহাদ বন্ধ করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত না হয়)। তা হলে এটি (জিহাদ) থেকে যেসব ফায়দা পাওয়া যেত, তা বন্ধ হয়ে যাবে। আর মুসলিমরা যদি এমতাবস্থায় কোনো গনিমত লাভ করে, তা হলে তা শরীয়তের বিধান অনুযায়ী বণ্টন করবে।”[৩৩৭] ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কেউ যদি কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ও অন্যায়কারীদের শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়, তা হলে (আল্লাহর) আনুগত্যের ব্যাপারে সে যেসব নির্দেশনা দিবে তা মেনে চলা বাধ্যতামূলক।”[৩৩৮]
আসলে অজুহাত যারা দিতে চায়, তাদের কাছে অজুহাতের অভাব কখনোই হবে না। জিহাদ এমনিতেই এমন একটা ইবাদত, যেখানে কষ্ট সবচেয়ে বেশি। নিজের ঘরবাড়ি-পরিবার, আরাম-আয়েশ ছেড়ে চলে যাওয়া লাগে। আজকের দুনিয়ালোভী ও মৃত্যুভয়ে ভীত মুসলিমরা তা হলে কেনই বা অজুহাত দেবে না? মজার ব্যাপার হলো, একই রকমের অজুহাত নবীজি -এর যুগেও অনেকে দিত। কেউ বলত : “আমাকে (জিহাদে না যাওয়ার) অনুমতি দিন এবং আমাকে ফিতনায় ফেলবেন না।”[৩৩৯] “এই গরমের মধ্যে অভিযানে বের হোয়ো না।”[৩৪০] “যদি আমরা যুদ্ধ করতে জানতাম, তা হলে অবশ্যই আমরা তোমাদের অনুসরণ করতাম।”[৩৪১] “হে আমাদের রব! কেন আমাদের ওপর যুদ্ধ ফরয করলেন? কেন আমাদের আরেকটু সময় দিলেন না?”[৩৪২] “এই লোকগুলোকে তাদের ধর্ম ধোঁকায় ফেলে রেখেছে।”[৩৪৩] “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়।”[৩৪৪] “তোমরা (শত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে) দাঁড়াতে পারবে না। কাজেই তোমরা ফিরে যাও।”[৩৪৫] “আমাদের সম্পদ-সম্পত্তি আর পরিবার-পরিজন আমাদের ব্যস্ত রেখেছিল। কাজেই আপনি আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।”[৩৪৬] “নিশ্চয় আমাদের বাড়িঘর অরক্ষিত।”[৩৪৭] কিন্তু এই সকল লোককে ভীতু ও মিথ্যুক আখ্যা দিয়ে নাযিল হয় আল্লাহর কালাম : “তাদের যদি (যুদ্ধাভিযানে) বের হওয়ার ইচ্ছে থাকত, তবে তারা সেজন্য অবশ্যই প্রস্তুতি নিত। কিন্তু তাদের অভিযানে গমনই আল্লাহর পছন্দ নয়। কাজেই তিনি তাদের পশ্চাতে ফেলে রাখেন। আর তাদের বলা হলো, 'যারা (নিষ্ক্রিয় হয়ে) বসে থাকে, তাদের সাথে বসে থাকো।”[৩৪৮] মুনাফিক ও যাদের অন্তর রোগাক্রান্ত, তাদের পক্ষে কখনোই সম্ভব না জিহাদের মতো উঁচু চূড়ায় আরোহণ করা। যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকে ঘৃণা করে, জিহাদ তাদেরই ঘৃণা করে। যারা দয়াময় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে চায় ও তাঁর জান্নাতে বাস করতে চায়, দুনিয়ার জীবনকে আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেয়, তাদের একান্ত সম্পত্তি হিসেবেই জিহাদ নিজেকে উপস্থাপন করে। যারা জিহাদকে আল্লাহর হুকুম বলে জানে ও মানে, তাদেরই একচ্ছত্র অধিকার হয়ে রয় জিহাদ। জিহাদ ইসলামের অপরিহার্য বিধান, জাহিলিয়াতের অনিবার্য প্রতিক্রিয়া আর ইতিহাসের অনস্বীকার্য বাস্তবতা।
ইসলামের বেশ কয়েকটি ফরয বিধান জিহাদ ছাড়া পরিপূর্ণ করা সম্ভব না। যেমন:
১. আলিমদের ইজমা হলো, কাফির শাসকদেরকে অপসারণ করতে হবে। শরীয়ত আইন বাদ দিয়ে মানবরচিত জাহিলি আইন দিয়ে শাসন করে আমাদের শাসকরা কি কাফির হয়ে যায়নি? এমন শাসকদের অপসারণ করার জন্য কি জিহাদ আমাদের ওপর বাধ্যতামূলক নয়?
২. ক্ষমতাশীল কোনো গোষ্ঠী যদি শাসন করার ক্ষেত্রে ইসলামি আইনের এক বা একাধিক ধারা কার্যকর করতে অস্বীকার করে, তা হলে আলিমগণের ইজমা হলো সেই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। আমাদের শাসন করা গোষ্ঠীগুলো কি বেশিরভাগ ইসলামি বিধানের প্রতি অবাধ্য নয়? জিহাদের মাধ্যমে তাদের সেসব আইন মানতে বাধ্য করা কি আমাদের ওপর বাধ্যতামূলক নয়?
৩. আলিমগণের ইজমা হলো একজন খলিফাকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। খিলাফাত কি আজ অনুপস্থিত নয়? শত্রুরা কি ক্ষমতা ও তরবারি প্রয়োগ করে একে ধ্বংস করে দেয়নি? জিহাদ কি তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ নয়?
৪. মুসলিম ভূমিগুলোর প্রতিরক্ষা এবং কাফিরদের হাতে দখল হওয়া মুসলিমদের সকল ভূমি পুনরুদ্ধার করা আলিমদের ইজমা অনুযায়ী ফরয। ফিলিস্তিন, আন্দালুসিয়া, বলকান, মধ্য এশিয়ার মুসলিম রিপাবলিকগুলোসহ পৃথিবীর অনেক জায়গা কি একসময় মুসলিমদের ছিল না? এগুলো পুনরুদ্ধার করতে জিহাদ কি ফরয না?
৫. আলিমগণের ইজমা হলো, কাফিরদের হাতে থাকা সব মুসলিম বন্দিদের মুক্ত করা। পৃথিবীর নানা প্রান্তে কারাগার ও ডিটেনশান সেন্টারগুলো কি হাজার হাজার মুসলিম আলিম ও সাধারণ মুসলিমদের দ্বারা ভর্তি নয়? তাঁদের উদ্ধার করতে জিহাদ কি বাধ্যতামূলক নয়?
নিশ্চয় আমাদের শাসন করা কাফির শাসকদের অপসারণ করার জন্য, এই শাসকদের ঘিরে থাকা চাটুকার ও সমর্থকদের দমানোর জন্য, ইসলামি খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য, মুসলিমদের ভূমি পুনরুদ্ধার ও বন্দিদের মুক্তি করার জন্য জিহাদ আমাদের ওপর ফরয। তখনই কেবল আমাদের সেনাবাহিনীগুলো কুরআন আর তলোয়ার নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারবে। রাজ্য আর সাম্রাজ্যগুলোকে ইসলামের দিকে ডাকতে পারবে। ঠিক যেভাবে ইসলামের প্রথম প্রজন্ম প্রবেশ করেছিল রোম, পারস্য আর অন্যান্য ভূমিতে। এই সব ফরয বিধান আদায় করার জন্য জিহাদ কি আমাদের ওপর ফরয হয়নি? নাকি এই ফরযিয়াত অবহেলা করতে করতে, গুনাহগার হতে হতে একদিন আমাদের ঈমানটাই খুইয়ে বসব? নাকি আমরা “আরো জোরে মাটি কামড়ে ধরব?”[৩৪৯] আখিরাতকে বাদ দিয়ে দুনিয়ার ভোগবিলাসে মত্ত থাকব? নাকি সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেব? “আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তা হলে তিনি (আল্লাহ) তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে নিয়ে আসবেন। তখন তারা তোমাদের মতো হবে না।”[৩৫০] আমরা জানি যে, অনেক সত্যপন্থী মুসলিমই জিহাদের ব্যাপারে এই সকল কথার সাথে একমত। তাঁরা জানেন ও মানেন যে জিহাদ ফরয। তাঁরা একে অবজ্ঞা করার পরিণামও জানেন। তাঁরা ভয় করেন নবীজি -এর এই হাদীস, “যে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ না করে অথবা যুদ্ধের বাসনা মনে না রেখে মৃত্যুবরণ করল, সে নিফাকের একটি শাখার ওপর মৃত্যুবরণ করল।”[৩৫১] কিন্তু এরপর তাঁরা মুসলিমদের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টিপাত করেন। দেখেন যে তারা আজ অত্যাচারিত, শক্তিহীন, রাষ্ট্রহীন, নেতৃত্বশূন্য। এই অবস্থা দেখে তাঁরা এত হতাশ হয়ে পড়েন যে তাঁরা জিহাদকে পেছাতে থাকেন। পরিস্থিতির সাথে সমঝোতায় আসেন। নবী-এর মতো ধাপে ধাপে শক্তিশালী অবস্থার দিকে পৌঁছাবেন বলে নিজেদের বুঝ দেন। এরকম দৃষ্টিভঙ্গি ত্রুটিপূর্ণ। কারণ যখন রাসূলুল্লাহ ও সাহাবাগণ নিজেদের যুদ্ধ থেকে বিরত রেখেছিলেন, তাঁরা সেটা আল্লাহর হুকুম অনুযায়ীই করেছিলেন। সেখানে আমরা এমন এক সময়ে আছি, যখন কুরআন নাযিল হওয়া সম্পূর্ণ হয়ে গেছে এবং জিহাদের বিধান চলে এসেছে। এই দায়িত্বে অবহেলা করে নিশ্চিতভাবেই আমরা গুনাহ করে চলেছি।
অনেকে বলতে পারে, “কিন্তু আমরা তো এখন দুর্বল অবস্থায় আছি। তাই আমাদের ধৈর্য ধরে সবকিছু সহ্য করা উচিত।” এর জবাব হলো, দুর্বল অবস্থায় আছি সেটা ঠিক আছে। কিন্তু তা মুখ বুজে সহ্য করার বদলে আমাদের সেই ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে আমরা শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছে যাই এবং জিহাদ করার সামর্থ্য অর্জন করি। এই লাঞ্ছনার জীবন থেকে মুক্তির উপায় এটিই। আমরা নিজেরাই নিজেদের সামনে যেই বাধা দাঁড় করিয়েছি, তা আমাদের নিজেদেরই ভাঙতে হবে। আমাদেরই তো আল্লাহ বলেছেন, “আর তাদের মোকাবিলা করার জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ববাহিনী সদা প্রস্তুত রাখবে যা দিয়ে তোমরা ভয় দেখাতে থাকবে আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে।”[৩৫২] মক্কার প্রথমদিকের মুসলিমদের সাথে আমাদের পার্থক্য এখানেই। তাঁরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেননি, কারণ তাঁদেরকে তা করতে আদেশ করা হয়নি। আমাদের তা করতে হবে, কারণ আমাদের এর আদেশ করা হয়েছে। যদি জিহাদ করার শক্তি-সামর্থ্য না থাকে, তা হলে তা অর্জন করতে হবে। শক্তি অর্জন প্রচেষ্টা চালানোর সময় নিজেদের মক্কার মুসলিমদের মতো দুর্বল ভাবলে হবে না। কারণ সেই অবস্থার বিধান রহিত হয়ে নতুন বিধান নাযিল হয়েছে। সে সময়কার সাহাবাগণকে যুদ্ধ করতে মানা করা হয়েছিল, আর আমাদের এর প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যখন দুর্বলতার কারণে জিহাদ করা সম্ভব থাকে না, তখন জিহাদের প্রস্তুতি নেওয়া ফরয হয়ে যায়। কারণ যেটি অর্জন ব্যতিরেকে কোনো ফরয দায়িত্ব আটকে থাকে, সেটি অর্জন করাটাই ফরয হয়ে যায়।”[৩৫৩] ইসলামের প্রকৃতি ও আমাদের চারপাশের জাহিলিয়াতের প্রকৃতির কারণেই জিহাদ আমাদের ওপর ফরয। ইসলাম আর কুফর কখনোই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে পারে না। প্রকৃতিগতভাবেই এ দুটি আদর্শ একে অপরের কর্তৃত্ব সহ্য করতে পারে না, তা তাদের কর্তৃত্বাধীন ভূমি একটি আরেকটির থেকে যত দূরেই থাকুক না কেন। প্রকৃতিগতভাবেই তারা একে অপরের মূলোচ্ছেদ করতে তৎপর। যুদ্ধের এই চক্র কিয়ামত পর্যন্ত চলবে। নবীজি বলেন, “আমার উম্মাতের একটি দল হকের ওপর থেকে যুদ্ধ করে যাবে যতদিন না তাদের শেষ দলটি মাসিহ দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়।”[৩৫৪]
আমরা যদি এই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধানকে অবহেলা করার চেষ্টা করি, তা হলে (আল্লাহ না করুন) আমাদের শত্রুরা আমাদের ঈমানহারা করার আগ পর্যন্ত থামবে না। দুটি শিবিরেরই নিজ নিজ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে, যদিও কুফরের শিবির সর্বদাই মিষ্টি কথার আড়ালে তাদের আসল উদ্দেশ্য গোপন রাখার চেষ্টা করে। অপরদিকে ইসলাম কুফরকে এবং কুফরি শাসনব্যবস্থাকে শেকড়সহ উপড়ে ফেলার লক্ষ্যে কাজ করে। সে জায়গায় বপন করে ঈমানের বীজ, যা মহীরুহ হয়ে বেড়ে ওঠে। মুসলিমদের দায়িত্ব হলো ইসলামের এই লক্ষ্যকে নিঃসংকোচে খোলাখুলি প্রকাশ করা এবং এর পরিপূর্ণতার জন্য কাজ করা। কাফির-মুশরিকদের উদ্দেশ্য আমরা না বুঝলেও আল্লাহ ঠিকই তা কুরআনে বলে দিয়েছেন: “আহলে কিতাবদের মধ্যে অনেকেই তাদের কাছে সত্য স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও তাদের অন্তরের হিংসার দাহনে কামনা করে যে, যদি তোমাদের তোমাদের ঈমান আনার পর কুফরিতে ফিরিয়ে নিতে পারত!”[৩৫৫] “যদি তাদের সাধ্যে কুলায় তা হলে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেই থাকবে যে পর্যন্ত না তারা তোমাদের তোমাদের দ্বীন হতে ফিরিয়ে দেয়।”[৩৫৬] “ইহুদী ও খ্রিষ্টানরা কখনোই তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না তোমরা তাদের ধর্ম অনুসরণ করো।”[৩৫৭] “তারা আল্লাহর নূরকে মুখের ফুৎকারে নির্বাপিত করে দিতে চায়।”[৩৫৮] কতই-না বোকামি হবে যদি আমরা শত্রুদের শত্রুতার এই স্পষ্ট প্রমাণগুলো এডিয়ে যাই, যদি তাদের আদর্শের নাম-নিশানা মিটিয়ে দেওয়ার আগে তরবারিগুলো কোষবদ্ধ করে ফেলি। আমরা লড়াই না করলে কুফরও লড়াই করা বন্ধ করে দেবে, এমন ভাবাটা নিতান্ত বোকামি। এই বোকামোর ফল হলো দুটি পরাজয়; একটি দুনিয়ায়, একটি আখিরাতে। কুফরের বাহিনী আমাদের জান ও ঈমান দুইই কেড়ে নেবে। তারা না আমাদের সম্মান করে, না কোনো চুক্তিকে সম্মান করে। সীরাত পড়লেই জানা যায় যে, রাসূল এর সাথে চুক্তি করা কাফির গোষ্ঠীগুলো বারবার নিজেরা আগ বাড়িয়ে চুক্তি ভেঙেছে। আমরা আমাদের অস্ত্র খাপবদ্ধ রাখলেও তারা আমাদের মারবে। জিহাদের গুরুত্বের ব্যাপারে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। নবীজি হিজরতের আগে অস্ত্রই ধরেননি। কিন্তু তাতে কিন্তু কুরাইশরা সাহাবাগণকে নির্যাতন ও হত্যা করা বন্ধ রাখেনি। এর কারণ আর কিছুই নয়। কারণ হলো নবীজি তাদের এই বলে আহ্বান করতেন যে, “আমি এক ভয়াবহ শাস্তির পূর্বে তোমাদের নিকট (প্রেরিত) একজন সতর্ককারী।” (আহমাদ) এবং “আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।” রাসূলুল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রদর্শনের পরও কী কারণ থাকতে পারে কুরাইশদের এর অত্যাচারের? কারণ একটাই। তারা মুসলিমদেরকে তাদের দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দিতে চায়। কুরাইশরা যখন রাসূল -এর মদীনায় হিজরতের পরিকল্পনা আঁচ করল, তারা সর্বশক্তি এক করে তাঁকে হত্যাচেষ্টা করল। অথচ নবীজি তো তাদের তাদের ভূমি, পরিবার ও মিথ্যে উপাস্যগুলো ছেড়ে দিয়েই যাচ্ছিলেন। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় নবীজি নিরাপদে মদীনা পৌঁছান। কিন্তু তারপরও কুরাইশরা তাঁকে জীবিত বা মৃত ধরে আনার জন্য লোক পাঠায়। ইসলাম যদি কুফরের ভূমি ছেড়ে দূরেও চলে যায়, কুফর কখনো ইসলামকে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। এজন্যই নবী ও সাহাবাগণকে শেষ করে দেওয়ার আশা নিয়ে কাফিররা ফিরে ফিরে এসেছে বদর, উহুদ আর খন্দকে।
শিশু অবস্থায় থাকা ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষা করার জন্যই আল্লাহ শুরুতে লড়াই করতে মানা করেছিলেন। যুদ্ধ নিষিদ্ধ থাকলেও আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে, দ্বীনকে ও দ্বীনের অনুসারীদের রক্ষা করেছেন। মদীনায় চলে আসার পর যুদ্ধের অনুমতি ও নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন কোনো মুসলিমই বলেননি, “না থাক। আমরা বরং মক্কার জীবনের মতোই ক্ষমা করি ও ধৈর্য ধরি। আল্লাহই তাঁর দ্বীনকে বাঁচাবেন।" তাঁরা এমনটা বললে কুরাইশরা তাঁদেরকে নিঃশেষ করে দিত এবং ইসলামের কোনো নাম-নিশানাও আর থাকত না। তারপর যখন সর্বাত্মক আক্রমণাত্মক জিহাদের বিধান আসলো, তখন মুসলিমরা এই ভেবে ঘরে বসে থাকেননি যে আগের মতো শুধু রক্ষণাত্মক জিহাদ করলেই হবে। তাঁরা এমনটা করলে তাঁদের দাওয়াত কখনোই মদীনার বাইরে ছড়াতে পারত না। শত্রুভাবাপন্ন আরব সটান দাঁড়িয়ে থেকে ইসলামকে মদীনার বাইরে এক পা-ও ফেলতে দিত না, রোম-পারস্য তো অনেক দূরের কথা। উল্টো কুফরের বাহিনী এসেই এই মুষ্টিমেয় মুসলিমদের বিধ্বস্ত করে দিয়ে যেত। কিন্তু এর কোনোটিই ঘটেনি। কারণ আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের এমন এক প্রজন্ম সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যারা বলবে, “আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম।”[৩৫৯] এই প্রজন্মের কাঁধের ওপর ভর দিয়েই দাঁড়িয়েছে ইসলামের কেল্লা আর এই প্রজন্মের রক্তে ভিজেই ইসলামের জন্য উর্বর হয়েছে দূর-দূরান্তের ভূমি। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই মুসলিমরা অবহেলা বা দুর্বলতাবশত পিঠটান দিয়েছে, তখনই জাহিলিয়াতের সেনারা পাল্টা আক্রমণে এসে ইসলামের ভূমি ও ঘরগুলোতে হামলে পড়েছে। ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা এই যে, আমরা ঠিক যেই বিন্দুতে গিয়ে থমকে দাঁড়াই, কুফরের বাহিনী সেই বিন্দু থেকেই আমাদের ওপর চড়াও হওয়া শুরু করে। চীনের মহাপ্রাচীরে গিয়ে যখন ইসলামের বাহিনী থেমে গেল, তখনই সে দেওয়ালের পেছন থেকে রক্তের বন্যা নিয়ে ধেয়ে এল মঙ্গোলিয়ানরা। ধ্বংস করে দিল খিলাফতের রাজধানীসহ বিস্তীর্ণ জনপদ। ঠিক একই ঘটনা পশ্চিমেও। মুসলিম জয়যাত্রা যখন আন্দালুসিয়া ও দক্ষিণ ফ্রান্স পর্যন্ত গিয়ে থমকে দাঁড়াল, তখনই আসতে লাগল পরাজয়। স্পেনের সেই একই জায়গা থেকে ক্রুসেডাররা তাদের রথের চাকা ঘোরানো শুরু করে। তাদের বাহিনী ও নৌবহর চষে বেড়াল কেপ অব গুড হোপ, দাপিয়ে বেড়াল লোহিত সাগর, পূর্ব উপকূলে নেমে নিশ্বাস ফেলতে লাগল হিজাযের ভূমিতে। একইভাবে উসমানীরা যখন ভিয়েনার ফটকে থেমে গেল, ইউরোপের মধ্যভাগ থেকে উঠে আসা সেনাবাহিনী ইস্তাম্বুলে এসে খিলাফাত ধ্বংস করে দিল আর ছিঁড়েখুঁড়ে খেলো মুসলিম সাম্রাজ্যকে। ইতিহাস যেন আমাদের ডেকে ডেকে বলছে, “দেখো! তোমরা যদি সত্যের হয়ে লড়াই না করো, শত্রুরা কিন্তু ঠিকই মিথ্যের হয়ে লড়াই করবে। তোমরা যদি তাদের আক্রমণ না করো, তারা ঠিকই তোমাদের আক্রমণ করবে। তোমাদের তরবারি যদি আঁধার চিরে আলো না আনে, তাদের তরবারি ঠিকই আলো চিরে আঁধার নামিয়ে আনবে।” ইতিহাস জিহাদের বিধানের পক্ষে কথা বলে!
ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেন, “সকল মুসলিম একমত যে যুদ্ধের বিধানের ভিত্তি হলো জিহাদ, যাতে দ্বীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায় এবং তাঁর কালিমা সুউচ্চ হয়ে যায়। যে-কেউ জিহাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তার বিরুদ্ধে লড়াই করা ইজমা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা নিষেধ, যেমন: নারী, শিশু, সন্ন্যাসী, বৃদ্ধ, অন্ধ, জিযিয়া প্রদানকারী আহলে কিতাব, তারা ইসলামের বিরুদ্ধে কথা ও কাজ দিয়ে যুদ্ধ না করলে তাদের হত্যা করা হবে না।”[৩৬০] এটিই জমহুর উলামার ইজমা। এর বিপরীতে কিছু আলিম এই মত পোষণ করেন যে, শুধুমাত্র কুফরের কারণেই এই সকল কাফিরদেরও হত্যা করা হবে। নারী ও শিশুরা বাদে, তারা গনিমাত হিসেবে হস্তগত হবে। যা-ই হোক, সঠিক মত হলো প্রথমটি। আল্লাহর কালিমাকে বুলন্দ করার জন্য শুধু তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করতে হয়, যারা এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। আল্লাহ বলেন : “তোমরা আল্লাহর রাস্তায় সেই লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। কিন্তু সীমা অতিক্রম কোরো না।”[৩৬১] কারণ আল্লাহ শুধু ততটুকুই হত্যা করা বৈধ করেছেন, যতটুকু করলে মোটের ওপর কল্যাণ হয়। “ফিতনা হত্যা অপেক্ষাও গুরুতর।”[৩৬২] এর অর্থ হলো কাফির কর্তৃক মুসলিমদের ওপর ফিতনা সৃষ্টি করা হত্যা হতেও গুরুতর অপরাধ। যারা মুসলিমদেরকে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় বাধা দেয় না, তারা ব্যক্তিগত জীবনে কুফরের মাধ্যমে কেবল নিজেদেরই ক্ষতি করছে। এ কারণে শরীয়ত কাফিরদের বিরুদ্ধে সাধারণভাবে যুদ্ধের অনুমতি দিলেও অসহায় নারী-শিশুদের বাদ দিয়েছে। কোনো কাফির যদি জিহাদে মুসলিমদের হাতে বন্দি হয়, তা হলে মুসলিম শাসক তাঁর বিবেচনা অনুযায়ী সবচেয়ে কল্যাণজনক সিদ্ধান্তটি নেবেন। দাস বানানো, মুক্ত করে দেওয়া, হত্যা করা, মুক্তিপণ নেওয়া বা মুসলিম বন্দির সাথে বিনিময় করা-এর মধ্যে যে-কোনো একটি বেছে নেওয়া জায়েয। এটিই কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী বেশিরভাগ আলিমের মত। কিছু আলিম অবশ্য মত দিয়েছেন যে, মুক্ত করা বা মুক্তিপণ নেওয়ার বিধান রহিত হয়ে গেছে। আহলে কিতাব ও মাজুসিদের ব্যাপারে বিধান হচ্ছে, তারা ইসলাম গ্রহণ বা জিযিয়া প্রদানের আগ পর্যন্ত তাদের সাথে যুদ্ধ করা হবে। এ ছাড়া অন্যান্যদেরকে জিযিয়া প্রদানের সুযোগ দেওয়া হবে কি না, এ নিয়ে আলিমগণের মতপার্থক্য আছে। বেশিরভাগের মত হলো জিযিয়া নেওয়া হবে না।
এ ছাড়া এ ব্যাপারেও মুসলিম আলিমগণের ঐকমত্য আছে যে, মুসলিমদের মধ্যকার কোনো গোষ্ঠী যদি ইসলামের এক বা একাধিক অকাট্য বিধান মেনে চলতে অস্বীকৃতি জানায়, তা হলে তাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করা হবে। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক যাকাত প্রদানে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধই এর প্রমাণ। অনেক হাদীস থেকে এটিও প্রমাণিত যে, খারিজিদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করতে হবে। কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা থেকে তাই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, যারাই ইসলামি আইনের বাইরে পা ফেলবে, তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করা হবে, যদিও তারা কালেমার সাক্ষ্য দেয়। এসকল গোষ্ঠী ইসলামের বার্তা পেয়ে গেছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। আর তারা যদি আগ বাড়িয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা শুরু করে, তা হলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আরো বড় ফরয হয়ে যায়। কাফির এবং ইসলামের কিছু অংশ অস্বীকারকারীদের (যেমন খাওয়ারিজ ও যাকাত অস্বীকারকারী) বিরুদ্ধে জিহাদ আক্রমণাত্মকও হতে পারে, রক্ষণাত্মকও হতে পারে। প্রথমটির ক্ষেত্রে এটি ফরযে কিফায়া। মুসলিমদের একাংশ এ দায়িত্ব পালন করলে সকলেই দায়মুক্ত হয়ে যাবে। যারা এ দায়িত্ব পালন করবে, শুধু তারাই তাদের কুরবানির কারণে এর ফযিলত ভোগ করবে। আল্লাহ সুবনাহানু ওয়া তাআলা বলেন: “অক্ষম না হওয়া সত্ত্বেও বসে থাকা মুমিনরা আর জান-মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদকারীরা সমান নয়। নিজেদের জান-মাল দ্বারা জিহাদকারীদেরকে বসে থাকা লোকদের ওপর আল্লাহ মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ সকলের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন এবং মুজাহিদদেরকে বসে থাকা লোকদের তুলনায় মহাপুরস্কার দিয়ে আল্লাহ মর্যাদা দান করেছেন। ওটা আল্লাহর নিকট হতে পদমর্যাদা, ক্ষমা ও দয়া। আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।”[৩৬৩]
কিন্তু শত্রুরা মুসলিমদের আক্রমণ করার চেষ্টা করলে জিহাদ ফরযে আইন হয়ে যায়। যেসব মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করা হয়, আর অন্য সকল মুসলিম যারা সাহায্য করতে সক্ষম-উভয় দলের ওপর এই শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ফরয হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন: “কিন্তু যদি তারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাহায্য চায়, তা হলে তাদের সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য। তবে তাদের বিরুদ্ধে নয়, যাদের সঙ্গে তোমাদের মিত্রতা চুক্তি আছে।”[৩৬৪] নবীজি -ও আমাদের আদেশ দিয়েছেন যেন আমরা সেসব মুসলিমদের সাধ্যমতো সাহায্য করি, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে। রক্ষণাত্মক জিহাদে নিজের জানমাল বিলিয়ে দিয়ে ইসলাম এবং এর অনুসারীদের জীবনের পবিত্রতা রক্ষা করার ব্যাপারে কারো কোনো অজুহাত গ্রহণীয় নয়। খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমরা এই দায়িত্বটিই পালন করেছেন। আক্রমণাত্মক জিহাদে যেমন কারো কারো ঘরে বসে থাকার অনুমতি আছে, এই যুদ্ধে আল্লাহ কাউকে সে অনুমতি দেননি। যারাই অব্যাহতি চেয়েছিল, তাদের তিরস্কার করে আল্লাহ বলেন: “আর তাদের একদল এই বলে নবীর কাছে অব্যাহতি চাচ্ছিল যে, 'আমাদের বাড়িঘর অরক্ষিত।' অথচ সেগুলো অরক্ষিত ছিল না। আসলে পালিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।”[৩৬৫] এটি হলো দ্বীনের পবিত্রতা ও মুসলিমদের জীবন রক্ষা করার নিমিত্তে একটি বাধ্যতামূলক যুদ্ধ। রক্ষণাত্মক জিহাদের উদাহরণ বদর, উহুদ, খন্দক। আক্রমণাত্মক জিহাদের উদাহরণ হলো তাবুক ও অন্যান্য যুদ্ধ।
মুসলিমরা আজ এক ওপেন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সসম্মানে বেঁচে থাকা, নয়তো অসম্মানে বেঁচে থাকা। এই চ্যালেঞ্জের জবাব হলো জিহাদ। আমরা মর্যাদা সহকারে বাঁচতে চাইলে অবশ্যই আমাদের আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে হবে। আর যদি আমরা অপমানের জীবন চাই, মৃত্যুকে ভয় করি আর জীবনকে ভালোবাসি, তা হলে জিহাদ ছেড়ে দিলেও সমস্যা নেই। ইসলামের জন্য কাজ করা সকলকেই রাস্তার এই বাঁকে থমকে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। কেউ ইতস্তত করেছে, পথভ্রষ্ট হয়েছে, পিঠটান দিয়ে চলে গেছে। আর কেউ দৃঢ়পদ থেকেছে, আল্লাহর রাস্তায় চলার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছে। অগ্রসর হওয়ার সময় আমাদের অবশ্যই জিহাদের ফলাফল ও দায়িত্বের কথা মাথায় রাখতে হবে। আমাদেরকে এর প্রস্তুতি নিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। আমাদের হাতে আর নষ্ট করার মতো মোটেও সময় নেই। ঈমানের পতাকাতলে সমবেত হয়ে দৃঢ়ভাবে কুরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা, সহীহ আকীদার দুর্গে-বর্মে সুরক্ষিত থাকা এবং তাকওয়া ও নেক আমলের রসদ জমা করে রাখা ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই। আমাদের এক সুদীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে, যা চলবে সকল জাহিলি বিধান বিলুপ্ত হয়ে খিলাফাত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত। এরপর আমরা এক হাতে কুরআন, আরেক হাতে তরবারি নিয়ে অগ্রসর হব ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দিতে। নিঃসন্দেহে এটি খুবই ভারী এক দায়িত্ব। কিন্তু আমাদের মধ্যকার সামর্থ্যবান লোকেদের ওপর এটি ফরয হয়ে আছে। এটি ত্যাগ করলে আমরা গুনাহগার হব। এই ফরয আদায়ের জন্য যেসব প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, সেসব প্রস্তুতিও আরেকটি ফরয। আমাদেরকে একক মুসলিম নেতৃত্বের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। চলুন যুদ্ধ করি-“...আল্লাহর রাস্তায়; তাদের জন্য যারা দুর্বল, নিপীড়িত ও অত্যাচারিত পুরুষ, নারী ও শিশু; যারা দুআ করছে, 'হে আমাদের রব! আমাদের এই জনপদ থেকে উদ্ধার করুন। এখানকার অধিবাসীরা যে যালিম! আর আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে কাউকে রক্ষাকারী বানিয়ে দিন এবং আপনার পক্ষ থেকে কাউকে আমাদের সাহায্যকারী করে দিন।”[৩৬৬] চলুন যুদ্ধ করি- “... যতদিন না ফিতনা নির্মূল হয়ে যায় এবং দ্বীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহরই জন্য হয়ে যায়।”[৩৬৭] চলুন যুদ্ধ করি- “এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদ করবে, অতঃপর সে নিহত হোক অথবা বিজয়ী হোক, অচিরেই আমি তাকে মহা প্রতিফল দান করব।”[৩৬৮] চলুন যুদ্ধ করি- “আর যদি তোমরা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হও কিংবা মৃত্যুবরণ করো, তবে আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা অতি উত্তম, তারা যা সঞ্চয় করে তার চেয়ে।”[৩৬৯] চলুন যুদ্ধ করি- “যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদের মৃত ভেবো না। বরং তারা জীবিত। তাদের প্রতিপালকের কাছে রিযিকপ্রাপ্ত।”[৩৭০] চলুন যুদ্ধ করি- “সুতরাং যারা আখিরাতের বিনিময়ে পার্থিব জীবন বিক্রি করে, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করুক।”[৩৭১] চলুন যুদ্ধ করি- “হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদের এমন ব্যবসায়ের সন্ধান দেব যা তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবে? তা হলো এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং আল্লাহর রাস্তায় তোমাদের সম্পদ ও জীবন দিয়ে যুদ্ধ করবে। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে!”[৩৭২]
৪. জামাত বা সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করা
জামাতের আলোচনায় প্রবেশ করার আগে আমাদের লক্ষ্য, এতে পৌঁছানোর পথ ও আমাদের প্রতি আমাদের শত্রুদের-অবস্থান-সম্পর্কিত আলোচনাগুলো আবার একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক। এতে করে জামাতের পালনীয় ভূমিকা ও দলবদ্ধ হয়ে কাজ করার গুরুত্ব অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ব্যাপারে আল্লাহ আদেশ করেন: “আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করো এবং তাতে বিভক্তি সৃষ্টি কোরো না।”[৩৭৩] আমরা আমাদের লক্ষ্যকে দুটি পর্যায়ে ভাগ করে দেখিয়েছি। মানুষকে তাদের প্রতিপালকের ইবাদতের দিকে নিয়ে আসা এবং নবীজি ﷺ-এর দেখানো তরিকা অনুযায়ী খিলাফাত প্রতিষ্ঠা করা। যেই পথ ধরে চলে এই লক্ষ্য অর্জন করার জন্য আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, তা মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত। দাওয়াত, হিসবাহ এবং জিহাদ।
ভালো করে দেখলেই বোঝা যায় যে, এই পথটি ফুল দিয়ে ভরা নয়। এতে চলার জন্য অনেক আত্মত্যাগ প্রয়োজন। আমাদের এসব দুঃখ-কষ্ট দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে যেতে হবে এবং লক্ষ্যে পৌঁছানো পর্যন্ত শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যেতে হবে। শত্রুদের অবস্থান, সংখ্যা, শক্তি, দুর্বলতা, তাদের লক্ষ্য ও নেতাদের ব্যাপারে সব সময় আমাদের চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। আমাদের শত্রু অনেক। খ্রিষ্টান, ইহুদী, নাস্তিক, মূর্তিপূজারি, গো-পূজারি, অগ্নিপূজারি, মুরতাদ, মুনাফিক, মুসলিম নামধারী সেক্যুলার নেতা-নেত্রীর দল ও তাদের চ্যালা-চামুণ্ডা। তাদের অস্ত্রশস্ত্রও নানা রকম। গণমাধ্যম, শিক্ষাব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও গণবিধ্বংসী অস্ত্রধারী সামরিক বাহিনী। এই সব শত্রু তাদের সব অস্ত্র নিয়ে মুখিয়ে আছে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। যখনই আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর রাস্তায় প্রথম পদক্ষেপ রাখব, তখনই তারা সর্বশক্তি নিয়ে হামলে পড়বে। তারা আমাদের বিরুদ্ধে ও আমাদের ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই করে কখনো ক্লান্ত হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: “যদি তাদের সাধ্যে কুলায় তা হলে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেই থাকবে যে পর্যন্ত না তারা তোমাদের তোমাদের দ্বীন হতে ফিরিয়ে দেয়।”[৩৭৪] “তারা আল্লাহর নূরকে মুখের ফুৎকারে নির্বাপিত করে দিতে চায়।”[৩৭৫]
এখন চলুন আমরা নিজেদের এই কয়েকটি প্রশ্ন করি। আমরা কি একাকী এই রাস্তায় চলতে প্রস্তুত? আমরা কি নিজে নিজে দাওয়াত, হিসবাহ ও জিহাদের গুরুদায়িত্ব পালনে সক্ষম? আমরা কি একা একা এসকল শত্রুর মোকাবিলা করতে তৈরি? আমরা কি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসব লক্ষ্য অর্জন করতে পারব? সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো মানুষই এসব প্রশ্নের হ্যাঁ-সূচক উত্তর দেবে না। বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা কিছুতেই দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল আনবে না। কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়েই আবার যাত্রায় ক্ষান্ত দিতে হবে। এ পথের পুরনো পথিক ও সহযাত্রীদের বাদ দিয়ে যে-ই একা একা চলার চেষ্টা করবে, সে-ই মহাবিপদে পড়বে। দিনশেষে এসব প্রচেষ্টা সামগ্রিক বিচারে নিষ্ফল হয়ে যাবে। আমাদের এই পূর্ণাঙ্গ ও সর্বব্যাপী দিন হলো চূড়ান্ত জীবনব্যবস্থা। ঐক্য-অনৈক্যের নীতিমালার ব্যাপারে চুপ থেকে এই দ্বীন তার অনুসারীদের বিপদে ফেলতে পারে না। এ পথের সব বিপদে-আপদে, পথিকদের কাঁধে থাকা গুরুদায়িত্ব, শত্রুদের ভয়াবহতার ব্যাপারে আগাম সতর্কবার্তা দিয়েই দেওয়া হয়েছে এই দ্বীনে। ইসলামি আইন আমাদের এই চ্যালেঞ্জের যথাযথ জবাব সরবরাহ করে রেখেছে। জাহিলিয়াতের সাথে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হওয়ার অত্যন্ত বাস্তবসম্মত নীতিমালা রয়েছে ইসলামে। আমাদের দায়িত্ব হলো পরিপূর্ণ মনোযোগ ও অধ্যবসায় সহকারে এই নীতিমালা জানা ও মেনে চলা। আল্লাহ আমাদের আদেশ দেন: “আল্লাহর রজ্জুকে সমবেতভাবে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হোয়ো না।"[৩৭৬]
এই আয়াতের তাফসিরে ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদের দলবদ্ধ থাকতে আদেশ দিয়েছেন এবং বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করেছেন। এ-সংক্রান্ত প্রচুর হাদীসও রয়েছে।”[৩৭৭] কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সাম্মাক আল-হানাফিকে বলেন, “ওহে হানাফি! অবশ্যই জামাত (ঐক্য) বদ্ধ থাকো। কারণ পূর্বেকার জাতিগুলো তাদের অনৈক্যের কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে। তোমরা কি আল্লাহর এই বাণী পড়োনি? 'আল্লাহর রজ্জুকে সমবেতভাবে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হোয়ো না।'”[৩৭৮] কুরতুবী আরো বলেন, “ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'আল্লাহ তোমাদের নিকট হতে তিনটি বিষয়ে সন্তুষ্ট থাকেন ও তিনটি বিষয়ে অসন্তুষ্ট হন। তিনি যেসব বিষয়ে সন্তুষ্ট থাকেন তা হলো—তোমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করবে ও তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না, তোমরা আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে না। যে তিনটি বিষয়ে তিনি অসন্তুষ্ট হন তা হলো—বেহুদা কথাবার্তা, অযথা প্রশ্ন ও অর্থ অপচয়।[৩৭৯] তাই আল্লাহ (মুসলিমদের) ওপর বাধ্যতামূলক করেছেন যে, তারা তাঁর কিতাব (কুরআন) আঁকড়ে ধরে থাকবে এবং মতপার্থক্যের সময় এর দিকে রুজু হবে। তিনি আমাদের আদেশ দিয়েছেন ঐক্য রক্ষা করার এবং নিষেধ করেছেন পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে, যা পূর্ববর্তী কিতাবধারীদের ধ্বংসের কারণ হয়েছে।"
কুরতুবী একই আয়াতের ব্যাপারে ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বক্তব্য উল্লেখ করেন, “(তিনি তাদের আদেশ দিয়েছেন) জামাতবদ্ধ থাকার। আল্লাহ তাআলা ঐক্যের আদেশ দেন ও অনৈক্যকে নিষেধ করেন। কারণ অনৈক্য হলো ধ্বংস আর ঐক্য হলো নাজাত।" আল্লাহ তাআলা বলেন: “আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করো এবং তাতে বিভক্তি সৃষ্টি কোরো না।”[৩৮০] “এটাই আমার সরল পথ। অতএব, এর অনুসরণ করো। নানান পথের অনুসরণ কোরো না। তা হলে তোমরা তাঁর (আল্লাহর) পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে।”[৩৮১] আলী ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যেয়ো না। কারণ ঐক্য হলো রহমত আর অনৈক্য হলো আযাব।” আলোচ্য আয়াত দুটির ব্যাপারে ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে জামাত বদ্ধ থাকার আদেশ দিয়েছেন এবং কলহ-বিবাদ ও অনৈক্য হতে নিষেধ করেছেন।” মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ ও অন্যান্যদের থেকেও ইবনু কাসির অনুরূপ বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
আমাদের দ্বীন আমাদের আদেশ দেয়: “সৎকাজ ও আল্লাহভীতির ব্যাপারে তোমরা পরস্পরকে সাহায্য করো। আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে পরস্পরকে সাহায্য কোরো না।”[৩৮২] ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ঐক্য ও সম্প্রীতির আদেশ দিয়েছেন এবং কলহ-বিবাদ ও অনৈক্য হতে নিষেধ করেছেন। তাঁরা আদেশ করেছেন আমরা যেন পরস্পরকে সৎকাজ ও আল্লাহভীতির ব্যাপারে সাহায্য করি এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে পরস্পরকে সাহায্য না করি।"[৩৮৩] আমাদের দ্বীন আমাদের আদেশ দেয়, “একজনের চেয়ে দুইজন উত্তম, দুইজনের চেয়ে তিনজন উত্তম এবং তিনজনের চেয়ে চারজন উত্তম। অতএব ঐক্যবদ্ধ (জামাত) থাকো।"[৩৮৪] এবং “ভেড়ার জন্য নেকড়ে যেমন, মানুষের জন্য শয়তান তেমন। সে দলছুট হওয়া ব্যক্তিদের আক্রমণ করে। অতএব, একাকী রাস্তা পরিহার করে জামাতের সাথে থাকো।"[৩৮৫] আমাদের দ্বীন আরো বলে: “মুমিন পুরুষ আর মুমিন নারী পরস্পরের আওলিয়া (সহায়ক, বন্ধু, সমর্থক)। তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে।”[৩৮৬] “যে-কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং ঈমানদারগণকে আওলিয়া হিসেবে গ্রহণ করবে, (সে দেখতে পাবে যে) আল্লাহর দলই বিজয়ী হবে।”[৩৮৭]
আমাদের দ্বীন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, জামাত হলো মুমিনদেরকে আওলিয়া হিসেবে গ্রহণ করার প্রকৃত চিহ্ন। সংঘবদ্ধ হয়ে সুপরিকল্পিত কাজ না করে ছন্নছাড়া হয়ে এলোপাথাড়ি কাজ করার অর্থ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অমান্য করা। এই আলোচনা থেকে এটাই স্পষ্ট হয় যে, সকল বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-কে মান্য করার সর্বশ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হলো জামাতবদ্ধ থাকা। কিন্তু এগুলোই ঐক্যবদ্ধ থাকার একমাত্র কারণ নয়। ইসলামের একটি মূলনীতি হলো, “যেটি ব্যতিরেকে কোনো ফরয দায়িত্ব আটকে থাকে, সেটি অর্জন করাও ফরয।” দলবদ্ধ না হয়ে আল্লাহর অনেক হুকুমই পালন করা সম্ভব হয় না। আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার ফরয দায়িত্ব পালন করতে গেলেই আমরা এমন এক বাহিনীর মুখোমুখি হব যারা জাহিলিয়াত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। পরিকল্পিত সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া এসকল বাহিনীকে প্রতিহত করা অসম্ভব। তাই উল্লিখিত মূলনীতি অনুযায়ী, মুসলিমদের জামাতবদ্ধ হওয়া, নেতা নিয়োগ করা, সঠিক জায়গায় সঠিক দক্ষতার লোক নিয়োগ করা সবই আমাদের ওপর ফরয। উল্টোদিক থেকে বলা যায়, দলবিচ্ছিন্ন হওয়ার অর্থ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ ছুঁড়ে ফেলা। এর অর্থ দ্বীনের যেসব বিষয় পূরণ করতে দলবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন, সেগুলোকে অবজ্ঞা করা। আজকের জামানায় ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। কিন্তু অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, সামাজিক লেনদেন, সরকার, শাসনব্যবস্থা, যুদ্ধ, চুক্তি — এই সব ক্ষেত্রে ইসলামের বদলে জাহিলিয়াত প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। জাহিলিয়াতের এই বিপুল সমাহারের সাথে আমাদের লড়াই করে টিকতে হলে সংগঠিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই।
ওপরে যা যা বলা হলো, এর পরে মনে হয় না আর কারোই বুঝতে বাকি থাকার কথা যে জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী কাজ করলে কী কী ক্ষতি হয়। এভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অর্থ আসমানী হুকুম-আহকাম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া; জিহাদ, হিসবাহ, দাওয়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া; ফিলিস্তিন, আন্দালুসিয়া সহ সকল মুসলিম ভূমিকে সেক্যুলারদের হাত থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। অজ্ঞদের শিক্ষাদান, অহংকারীকে উপদেশ দান, সৎকাজের আদেশ, জিহাদের প্রস্তুতি, শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ, আমাদের ভূমিগুলো মুক্ত করা, শরিয়া প্রতিষ্ঠা করা এ সবকিছুই দলবদ্ধ হয়ে করার মতো ইবাদত। ইতিহাসে কোনো আলিম কোনোকালেই এমন ফাতওয়া দেননি যে এগুলো ত্যাগ করে শুধুমাত্র সালাত, দুআ, যিকিরের মতো ব্যক্তিগত ইবাদতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে হবে। আবু হামিদ গাযালি রাহিমাহুল্লাহ লিখেন, “জেনে রাখুন, যে-কেউ নিজেকে কেবল ঘরে বসে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখে, সে আজকের যুগে মন্দ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না। কারণ এমনটা করার মাধ্যমে সে মানুষকে পথ দেখানো, শিক্ষাদান, সৎকাজের আদেশ (ইত্যাদি দায়িত্বকে) অবহেলা করছে।”[৩৮৮] গাযালি এসব কথা লিখেছেন তাঁর জীবনকালে, যখন খিলাফাহর অধীনে শরীয়ত প্রতিষ্ঠিত ছিল। তা হলে আজকের অবস্থা চিন্তা করুন!
ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর (ঘোষিত) পবিত্র জিনিসগুলোর পবিত্রতা লঙ্ঘিত হতে দেখে, তাঁর দেওয়া সীমা লঙ্ঘিত হতে দেখে, তাঁর দ্বীন পরিত্যক্ত হতে দেখে, তাঁর রাসূল -এর সুন্নাহকে অবহেলিত দেখে, তারপরও নির্লিপ্ত থাকে, মেজাজ ঠাণ্ডা রাখে, নীরব শয়তানের মতো চুপ করে থাকে, তার মধ্যে আর কী কল্যাণ থাকতে পারে? এমন ব্যক্তিরা আল্লাহর ঘৃণা অর্জন করার পাশাপাশি সবচেয়ে খারাপ রোগে আক্রান্ত হয়। সেই রোগ হলো অন্তরের মৃত্যু। কারণ অন্তরের জীবনীশক্তি যত বেশি হয়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর বিরুদ্ধে কিছু হতে দেখলে তা ততই রাগান্বিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে। দ্বীনের জন্য ততই তার সমর্থন ততই শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ হয়ে থাকে।”[৩৮৯] তিনি আরো বলেন, “ইসলামের শত্রুদের কাছে ভীতি সৃষ্টিকারী একজন সাহসী, শক্তিশালী ব্যক্তির সেনাসারিতে দাঁড়িয়ে এক ঘণ্টা জিহাদ করাটা তার জন্য হাজ্জ, সাওম, দান-সদকা ও নফল ইবাদত থেকে উত্তম। ঠিক একইভাবে, সামাজিক জীবন ত্যাগ করে একাকী সালাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর যিকির করার চেয়ে উত্তম হলো মানুষের সাথে মেশা, সুন্নাহ-হালাল-হারাম-ভালো-মন্দের জ্ঞানসম্পন্ন আলিমের মাধ্যমে তাদের শিক্ষা ও উপদেশ দান করা।”[৩৯০]
আমির আশ-শা'বী থেকে ইবনুল মুবারাক বর্ণনা করেন, কিছু লোক সামাজিক জীবন ত্যাগ করে ইবাদত-বন্দেগী করার জন্য কুফা ত্যাগ করে চলে যায়। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের ব্যাপারে শুনে তাদের সাথে দেখা করতে গেলেন। তারা তাঁকে দেখে খুশি হলো। কিন্তু তিনি বললেন, “কীসে তোমাদের এমনটা করতে প্ররোচিত করল?” তারা বলল, “আমরা ইবাদত করার জন্য লোকেদের থেকে আলাদা হয়েছি।” আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ বললেন, “সবাই যদি তোমাদের মতো এরকম করে, তা হলে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে কারা? তোমরা আমার সাথে ফিরে না চলা পর্যন্ত আমি তোমাদের ত্যাগ করব না।”[৩৯১] ইবনু মাসউদের প্রতি আল্লাহ রহম করুন। তিনি এমন এক সময় এই কথা বলেছেন, যখন জিহাদ ছিল ফরযে কিফায়া। আজকের যুগে যখন জিহাদ ফরযে আইন, এসময় থাকলে তিনি কী বলতেন, ভাবুন! এ ছাড়া বৈরাগ্যবাদীরা কীভাবে এই হাদীস অস্বীকার করতে পারে যেখানে নবীজি বলেন, “আমার উম্মাতের মাঝে একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে শত্রুদের পরাজিত করতে থাকবে এবং বিরোধিতাকারীদের কোনো পরোয়া করবে না।”[৩৯২] এই সকল বিচ্ছিন্নতাবাদীরা কি পড়েনি যে রাসূলুল্লাহ তাঁর সাহাবাগণকেই বৈরাগ্যবাদী হতে নিষেধ করেছেন? বলেছেন, “এটা কোরো না। কারণ আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদে) বের হয়ে যাওয়া তোমাদের ঘরে থেকে সত্তর বছর সালাত আদায় করার চেয়েও উত্তম। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করান? আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করো। কারণ যে ব্যক্তি উটের দুধ দোহনের মধ্যবর্তী সময় পরিমাণও আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে, সে নিশ্চয় জান্নাতে প্রবেশ করবে।”[৩৯৩]
সবশেষে আমরা আমাদের বৈরাগ্যবাদী ভাইদের জন্য শামের মুহাদ্দিস আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক রাহিমাহুল্লাহ-এর একটি কবিতা তুলে ধরছি। তিনি এটি লিখে পাঠিয়েছিলেন মক্কা-মদীনায় ইবাদতে মগ্ন থাকা মহান যাহিদ ফুজাইল ইবনু ইয়াজকে।
ও হারামাইনের আবিদ, যদি তুমি দেখতে মোদের,
তোমার ইবাদতকে ভাবতে-নিছক ছেলেখেলা শিশুদের।
তোমার গাল রাঙাচ্ছ তুমি অশ্রু ঝরিয়ে?
মোদের গলা তো যাচ্ছে রেঙে রুধির বরণ দিয়ে।
ওহে, অযথা ঘোড়ায় সফরকারী! রণক্ষেত্রে নিতি
চিরক্লান্ত ঘোড়াগুলো আমাদেরি।
তব গায়ে সুগন্ধী আতরদেয় রে সুবাস মেলি,
মোদের আতর তো ঘোড়ার খুরে ওড়ে আসা ধুলোবালি।
আমাদের কাছে পৌঁছে গেছে মহানবীর অমীয় বাণী,
চিরসত্য যাহা, নেইকো তাহাতে সন্দেহের লেশখানি।
আল্লাহর রাহে ঘোড়া-খুরের ধূলি যে-জন মাখে গায়,
জাহান্নামী-ধোঁয়া তাহার সনে মিলবে না কভু হায়।
কিতাবুল্লাহ সদা সত্য কথা বলে যায় যে আমাদের-
কভু বোলো না মৃত, আল্লাহর তরে প্রাণ-দানকারীদের।
৫. শরীয়ত অনুযায়ী পরিচালিত জামাত
যে জামাত আল্লাহর দ্বীনের জন্য কাজ করতে চায়, তাদের অবশ্যই শরীয়তের সকল দিক মেনে চলতে হবে। এর লক্ষ্য, বিশ্বাস, বুঝ ও কর্মকাণ্ড সবই হতে হবে শরীয়তসম্মত। শরীয়ত মেনে চলার কথাটি আলাদাভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে এর গুরুত্বের কারণে। এই যে আজকের কতিপয় ইসলামি আন্দোলন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, কোনোটি সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে, কোনোটি আবার শত্রুদের সাথে সমঝোতায় আসছে, এই সবকিছুর কারণ হলো শরীয়তকে ঢিলেঢালাভাবে মানা অথবা এর সীমাগুলো লঙ্ঘন করা। ইসলামি কর্মকাণ্ড তো শরীয়ত দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হতেই হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেক ইসলামি দলই ধরে নিয়েছে যে ইসলামের জন্য কাজ করার মাধ্যমে তারা শরীয়তের সীমা ভেঙে যাচ্ছেতাই করার লাইসেন্স পেয়ে গেছে। এ কারনেই ইসলামি আন্দোলনের নাম দিয়ে অনেক অকাট্য হারাম কাজ প্রসার লাভ করছে আর অনেক অকাট্য ফরয অবহেলিত হচ্ছে। যেন ইসলামি আন্দোলনের চাহিদা পূরণের জন্য ইসলামি শরীয়ত যথেষ্ট নয়! এভাবে শরীয়ত লঙ্ঘন করে তারা এই আয়াত লঙ্ঘন করেছে: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আগে বেড়ে যেয়ো না। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর আওয়াজের ওপর তোমাদের আওয়াজ উচ্চ কোরো না।”[৩৯৪]
এ থেকেই দ্বীনের ব্যাপারে তাদের অজ্ঞতা স্পষ্ট হয়ে যায়। আসল কথা হলো, শরীয়তের নীতিমালা মেনে চললে ইসলামি আন্দোলন যেই গতিতে সফল হতো, তা ইসলামি আন্দোলনকর্মীরা নিজেরাও ধারণা করতে পারবে না। আন্দোলনই যদি শরীয়তের অভিভাবক হয়ে দাঁড়ায়, তা হলে ইসলামের ছদ্মবেশে তা নতুন এক জাহিলিয়াত হয়ে দাঁড়াবে। জামাতের অধীনে থাকাকে ইসলামই ফরযে আইন করেছে। তাই জামাতের উচিত না সেই ইসলামেরই শরীয়তকে লঙ্ঘন করতে শুরু করা। নেতাদের ব্যক্তিগত মতামতের ওপরে ইসলামি শরীয়তকে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে। ইসলামি আন্দোলনকে সঠিক পথে রাখার দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি করে বর্তায় মুত্তাকী, হক্কানী, আল্লাহর পথে জিহাদকারী আলিমগণের কাঁধে। দুনিয়ালোভী এবং সেক্যুলার শাসকদের চাটুকার আলিমদেরকে এই দায়িত্ব দেওয়া যাবে না।
আলিমগণের ওপর অর্পিত এই দায়িত্ব এতই স্পর্শকাতর যে, অন্য কোনো শ্রেণীর মানুষ এই দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম। তাঁদের ইসলামি আন্দোলনকে এমনভাবে পথ দেখাতে হবে যেন তা একইসাথে বাস্তবতার চাহিদাকেও নির্ভয়ে মোকাবিলা করতে পারে, আবার শরীয়তের সীমা-পরিসীমাও লঙ্ঘন না করে। আলিমগণ যদি তাঁদের দায়িত্বে অবহেলা করেন, তা হলে অজ্ঞ লোকেরা এবং জ্ঞানী হওয়ার ভান করা লোকেরা এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবে। আলিমের অভাবে নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে আন্দোলন দিশেহারা হয়ে যাবে। ফলে আন্দোলনের কর্মীদের সামনে শরীয়তের বিধিবিধান অস্পষ্ট হয়ে যাবে। আজকের ইসলামি আন্দোলনগুলোর জন্য আহলুল ইলম রাহাবারের বড় প্রয়োজন, নাহলে কাফেলা পথ খুঁজে পাবে না। ইসলামের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করা ব্যক্তিদের বুঝতে হবে যে আলিমগণ হলেন নবীগণের উত্তরসূরি। তাঁরাই উম্মাহর নেতৃত্বের জন্য যোগ্যতম শ্রেণী। তাই চলুন, আমরা উলামায়ে কিরামকে তাঁদের প্রাপ্য স্থান বুঝিয়ে দেই। আল্লাহ বলেন: “যারা জানে, আর যারা জানে না, তারা কি সমান? বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।”[৩৯৫]
৬. অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া জামাত
আল্লাহ তাআলা বলেন, “অতএব, জমিনে ভ্রমণ করে দেখো, সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের কী পরিণতি হয়েছিল।”[৩৯৬] যারা শিখতে চায়, তাদের জন্য ইতিহাস একটি অসাধারণ বিদ্যালয়। ইসলাম আমাদের অতীতের জাতিগুলোর ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে বলে। আল্লাহ তাআলার প্রতি কুফরি এবং গোঁয়ারের মতো তাঁর হিদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পরিণতি থেকে জ্ঞান আহরণ করতে বলে: “এসব জনপদের কিছু বিবরণ তোমাকে জানালাম। তাদের কাছে তো তাদের রাসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছিল। কিন্তু যেহেতু তারা আগেই প্রত্যাখ্যান করে নিয়েছিল, এজন্য তারা আর ঈমান আনতে প্রস্তুত ছিল না। এভাবেই আল্লাহ কাফিরদের অন্তরে সীল লাগিয়ে দেন।”[৩৯৭] আল্লাহর নিয়ামত ও সন্তুষ্টি হাসিল করতে চাওয়া সত্যিকার মুমিনদের চলার পথ আলোকিত করে আছে ইতিহাসের পাতার অসংখ্য আলোকবর্তিকা। এর মধ্যে সবচেয়ে আদর্শ হলো নবী -এর সীরাত, যা থেকে একজন মুসলিমদের জীবনের প্রতিটি পদে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত জানতে পারা যায়।
উম্মাহর সুদীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাসে হাজারো ঘটনা ঘটেছে। রাজ্য-সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন হয়েছে। পূর্ব-পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়েছে সেনাবাহিনী। শত শত বছর যাবত ইসলামের সূর্য কখনো অস্তমিত হয়নি। তারপর একদিন ইহুদী-নাসারা-মূর্তিপূজারি-নাস্তিকদের সম্মিলিত কুফরি জোটের হাতে ১৯২৪ সালে খিলাফাতের পতন হয়ে মুসলিম উম্মাহ টুকরো টুকরো হয়ে যায়। ইসলামি খিলাফাত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করতে গিয়ে আমাদের ইতিহাসের গতিধারা বুঝতে হবে। এর অনুসরণীয়-বর্জনীয় শিক্ষাগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে শিখতে হবে। আমাদের মহান লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় অতীত ও বর্তমানের ইসলামি আন্দোলনগুলোর ইতিহাস থেকে জ্ঞান আহরণ করতে হবে। তাদের যেসব কাজ শরীয়তসম্মত, তা গ্রহণ করতে হবে। তাদের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আমাদের পূর্ববর্তী আন্দোলনগুলো কেন ব্যর্থ হয়েছে, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। তাঁরা যেখানে থেমে গেছেন, সেখান থেকেই যেন আমাদের পথচলা শুরু হয়। অধ্যয়নের উপযোগী কিছু ইসলামি আন্দোলন হলো আরব উপদ্বীপের আল-ওয়াহহাবিয়্যাহ, লিবিয়ার আস-সান্নুসিয়্যাহ, সুদানের আল-মাহদিয়্যাহ, ইখওয়ানুল মুসলিমীন ভাবধারার আন্দোলন এবং ফিলিপাইন, আফগানিস্তান, শাম, মিশর, আরব মাগরিব, বলকান ইত্যাদি অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত বৈশ্বিক জিহাদী আন্দোলন।
টিকাঃ
[২১০] সূরা আল-কাসাস ২৮:৩৮
[২১১] সূরা আন-নাযিআত ৭৯:২৪
[২১২] সূরা আস-সফ ৬১:৪
[২১৩] সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪৫-৪৬
[২১৪] সূরা আল-আরাফ ৭:১৫৭
[২১৫] সূরা আন-নিসা ৪:৮৪
[২১৬] সূরা আল-আহযাব ৩৩:২১
[২১৭] Muslim : ৩০০৯, আবু দাউদ: ১৯০৭, নাসাঈ: ৪০০১, বাইহাকি: ৮৬০৯, দারিমি: ১৮৫০
[২১৮] সূরা ত্বা-হা ২০:১২০
[২১৯] সূরা আল-আ'রাফ ৭:২৭
[২২০] সূরা আল-বাকারাহ ২:১৬৮
[২২১] সূরা আল-ইসরা ১৭:৭৩-৭৫
[২২২] সূরা আল-কলাম ৬৮:৯
[২২৩] সূরা আল-মাইদাহ ৫:৩
[২২৪] সূরা হুদ ১১:১১৩
[২২৫] সূরা ফাতির ৩৫:১৯-২১
[২২৬] সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:১-২
[২২৭] সূরা আল-হিজর ১৫:৯৪
[২২৮] বুখারি: ৪৯৭০, মুসলিম: ৫২৯
[২২৯] সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪৫-৪৬
[২৩০] বুখারি: ৪৫৫৩, মুসলিম: ৪৭০৭
[২৩১] সূরা আলে ইমরান ৩:৬৪
[২৩২] মুসলিম: ৩০০৯, আবু দাউদ: ১৯০৭, নাসাঈ: ৪০০১, বাইহাকি: ৮৬০৯, দারিমি: ১৮৫০।
[২৩৩] বুখারি: ৪০৪২, মুসলিম: ৬১১৭
[২৩৪] সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩৩
[২৩৫] আহমাদ: ১৬৭৫৪, হাকিম: ২৯৪
[২৩৬] বুখারি: ৩০০৯, মুসলিম: ৬৩৭৬
[২৩৭] তাফসির ইবনুল কাইয়্যিম, ২/১২০
[২৩৮] সূরা আল-আনআম ৬:১৬২
[২৩৯] সূরা আর-র'দ ১৩:১৭
[২৪০] সূরা আল-আরাফ ৭:১৬৪
[২৪১] সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৯
[২৪২] সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৯
[২৪৩] সূরা আর-র'দ ১৩:১৭
[২৪৪] সূরা আশ-শুরা ৪২:৪৭
[২৪৫] সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫০
[২৪৬] সূরা আল-কাহফ ১৮:২৯
[২৪৭] সূরা আল-আনফাল ৪:৪২
[২৪৮] সূরা আল-ইসরা ১৭:৭৩-৭৭
[২৪৯] সূরা আল-কলাম ৬৮:৪
[২৫০] সূরা আত-তাওবা ৯:১২৮
[২৫১] সূরা আত-তাওবা ৯:৬৭
[২৫২] সূরা আত-তাওবা ৯:৭১
[২৫৩] সূরা আল-আরাফ ৭:১৫৭
[২৫৪] সূরা আলে ইমরান ৩:১১০
[২৫৫] শারহুন নববী, ৯/১৮৭
[২৫৬] সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪০
[২৫৭] শারহুন নববী, ১১/২৬
[২৫৮] সূরা আলে ইমরান ৩:১০৪
[২৫৯] মুসলিম: ১৮৬
[২৬০] সূরা আত-তাওবা ৯:৭১
[২৬১] সূরা আল-মাইদাহ ৫:৭৮-৭৯
[২৬২] আবু দাউদ: ৪৩৪০
[২৬৩] কিতাবুয যুহদ, ইবনুল মুবারক, বর্ণনা-নং: ১৩৫০
[২৬৫] সূরা আন-নূর ২৪:৬৩
[২৬৬] সূরা আল-মাইদাহ ৫:১০৫
[২৬৭] আহমাদ: ২৯, তিরমিযি: ২১৬৮
[২৬৮] শারহুন নববী, ১১/২৮
[২৬৯] সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:১৬
[২৭০] মাজমু আল-ফাতাওয়া, ২৮/৬৫
[২৭১] মুস্তাদরাক হাকিম: ৪৮৮৪
[২৭২] সূরা লুকমান ৩১:১৭
[২৭৩] শারহুন নববী, ১১/২৭
[২৭৪] সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৫
[২৭৫] তুরুকুল হাকিমিয়্যাহ ফিস-সিয়াসাতিশ শারইয়্যাহ, ১/৩৪৫
[২৭৬] সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:১৬
[২৭৭] বুখারি: ৭২৮৮, মুসলিম: ৩৩২১
[২৭৮] সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১২
[২৭৯] মাজমু আল-ফাতাওয়া, ২৮/১৩০
[২৮০] সূরা আল-আনআম ৬:১১৬
[২৮১] সূরা লুকমান ৩১:১৭
[২৮২] সূরা ইবরাহীম ১৪:২৬
[২৮৩] সূরা আল-বাকারাহ ২:৪৪
[২৮৪] সূরা আস-সফ ৬১:৩
[২৮৫] তাফসির আল-কুরতুবি, ৪/৪৭
[২৮৬] শারহুন নাবাবী, ২/২৩
[২৮৭] ইয়াহইয়াউ উলুমুদ্দীন, ২/৩১২
[২৮৮] আহমাদ: ১১১৪৩, আবু দাউদ: ৪৩৪৬, তিরমিযি: ২১৭৪, ইবনু মাজাহ: ৪০১১
[২৮৯] শারহুন নাবাবী, ২/২৩
[২৯০] শারহুন নাবাবী, ২/২৫
[২৯১] সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:১৬
[২৯২] সূরা আলে ইমরান ৩:১০৪
[২৯৩] সূরা আলে ইমরান ৩:১১০
[২৯৪] সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪১
[২৯৫] সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪১
[২৯৬] সূরা আত-তাওবা ৯:৭১
[২৯৭] সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪০
[২৯৮] সিরাজুল মুলুক, ১/১৭৩
[২৯৯] সূরা আল-মাইদাহ ৫:৭৮-৭৯
[৩০০] মু'জামুল কাবির: ১০২৬৭
[৩০১] সূরা আলে ইমরান ৩:১৮৫
[৩০২] আহমাদ : ৯৬৯৩, আদাবুল মুফরাদ : ২৮১, ইবনু মাজাহ : ২৭৭৪, মুস্তাদরাক হাকিম: ২৩৯৪
[৩০৩] আহমাদ: ৯৭৬২, আবু দাউদ: ২৫৪৩, তিরমিজি: ১৬৫০
[৩০৪] বুখারি: ৯০৭
[৩০৫] সূরা আত-তাওবা ৯:৯২
[৩০৬] আবু দাউদ: ৩৪৬৪, আহমাদ: ৫৫৬১
[৩০৭] সূরা আত-তাওবা ৯:১১১
[৩০৮] বুখারি: ৬৪৬৭, মুসলিম: ৭৩০০
[৩০৯] সূরা আলে ইমরান ৩:১৬৯
[৩১০] দারিমি: ২৪৬৫, তিরমিযি: ১৬৪১
[৩১১] তিরমিযি: ২৭৪৯, ইবনু মাজাহ: ৩৯৭৩
[৩১২] সূরা আল-বাকারাহ ২:২১৬
[৩১৩] সূরা আল-হাদীদ ৫৭:১৬
[৩১৪] সূরা আন-নিসা ৪:৭৭
[৩১৫] সূরা আন-নিসা ৪:৭৭-৭৮
[৩১৬] বুখারি: ২৮১৮, মুসলিম: ৪৬৪০
[৩১৭] সুরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:১-২
[৩১৮] সূরা আল-আলাক ৯৬:১
[৩১৯] সূরা আল-আরাফ ৭:১৫৮
[৩২০] আহমাদ: ৫১১৫
[৩২১] সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪৯
[৩২২] ইবনু ইসহাক, সীরাতুর রাসূল
[৩২৩] বুখারি: ৪১১০
[৩২৪] আহমাদ: ৫১১৫
[৩২৫] সূরা আল-আনফাল ৮:৩৯
[৩২৬] বুখারি: ১৩৯৯, মুসলিম: ১৩৩
[৩২৭] সূরা আল-আনফাল ৮:৩৯
[৩২৮] মাজমু আল-ফাতাওয়া, ৩৫/৪০৭
[৩২৯] সূরা আল-কাহফ ১৮:২৯
[৩৩০] সূরা আল-কাহফ ১৮:২৯
[৩৩১] সূরা আল-আনফাল ৮:৩৯
[৩৩২] সূরা আত-তাওবা ৯:৩৬
[৩৩৩] সূরা আত-তাওবা ৯:৫
[৩৩৪] সূরা আত-তাওবা ৯:২৯
[৩৩৫] সূরা আন-নাহল ১৬:১২৫
[৩৩৬] সূরা আত-তাওবা ৯:৭৩
[৩৩৭] মুগনি, ১০/৩৬৮; শারহুল কাবির, ১০/৩৭৩
[৩৩৮] মাজমু আল-ফাতাওয়া, ১৮/১৫৮
[৩৩৯] সূরা আত-তাওবা ৯:৪৯
[৩৪০] সূরা আত-তাওবা ৯:৮১
[৩৪১] সূরা আলে ইমরান ৩:১৬৭
[৩৪২] সূরা আন-নিসা ৪:৭৭
[৩৪৩] সূরা আল-আনফাল ৮:৪৯
[৩৪৪] সূরা আল-আহযাব ৩৩:১২
[৩৪৫] সূরা আল-আহযাব ৩৩:১৩
[৩৪৬] সূরা আল-ফাতহ ৪৮:১১
[৩৪৭] সূরা আল-আহযাব ৩৩:১৩
[৩৪৮] সূরা আত-তাওবা ৯:৪৬
[৩৪৯] সূরা আত-তাওবা ৯:৩৮
[৩৫০] সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৩৮
[৩৫১] মুসলিম: ৫০৪০, আবু দাউদ: ২৫০৪
[৩৫২] সূরা আল-আনফাল ৮:৬০
[৩৫৩] মাজমু আল-ফাতাওয়া, ২৮/২৫৯
[৩৫৪] মুস্তাদরাক হাকিম: ২৩৯২
[৩৫৫] সূরা আল-বাকারাহ ২:১০৯
[৩৫৬] সূরা আল-বাকারাহ ২:২১৭
[৩৫৭] সূরা আল-বাকারাহ ২:১২০
[৩৫৮] সূরা আত-তাওবা ৯:৩২
[৩৫৯] সূরা আল বাকারাহ ২:২৮৫
[৩৬০] আস-সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ, ১/১৫৯; মাজমু আল-ফাতাওয়া, ২৮/৩৫৪
[৩৬১] সূরা আল-বাকারাহ ২:১৯০
[৩৬২] সূরা আল-বাকারাহ ২:২১৭
[৩৬৩] সূরা আন-নিসা ৪:৯৫-৯৬
[৩৬৪] সূরা আল-আনফাল ৮:৭২
[৩৬৫] সূরা আল-আহযাব ৩৩:১৩
[৩৬৬] সূরা আন-নিসা ৪:৭৫
[৩৬৭] সূরা আল-আনফাল ৮:৩৯
[৩৬৮] সূরা আন-নিসা ৪:৭৪
[৩৬৯] সূরা আলে ইমরান ৩:১৫৭
[৩৭০] সূরা আলে ইমরান ৩:১৬৯
[৩৭১] সূরা আন-নিসা ৪:৭৪
[৩৭২] সূরা আস-সফ ৬১:১০-১১
[৩৭৩] সূরা আশ-শুরা ৪২:১৩