📄 যা বিশ্বাস করি
সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত সকল বিষয়ে আমাদের আকীদা (বিশ্বাস) হলো ন্যায়নিষ্ঠ পূর্বসূরিগণের (সালফে সালিহীনদের) আকীদার অনুরূপ।
আগের অধ্যায়ে যে চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের কথা আলোচনা করলাম, তা হলো প্রতিটি মুসলিমের কিবলাহ (দিক)। কথা, কাজ ও নিয়্যাতের মাধ্যমে এই দিকেই সে এগিয়ে চলে। আর আকীদা হলো তাকে সেই দিকে পরিচালিত করার ইঞ্জিন। এটিই তাকে লক্ষ্যপানে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করে এবং হাল ছেড়ে দিতে বাধা দেয়।
আকীদা নষ্ট হয়ে গেলে বা হৃদয়ে এর প্রভাব কমে গেলে নেক আমল করার স্পৃহা শেষ হয়ে যায় অথবা কমে যায়। ফলে, বান্দা তার চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের দিকে অগ্রসর হওয়া থামিয়ে দিয়ে অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় কাজে মগ্ন হয়ে যায়। বান্দার জীবনে কেবল দুটিই অবস্থা। হয় তার আকীদা তাকে আল্লাহর রাস্তায় সামনে চালিয়ে নিয়ে যেতে থাকবে। নয়তো শয়তানের ধোঁকায় পড়ে সে আল্লাহর থেকে দূরে সরে যাতে থাকবে। এর মাঝামাঝি কিছু নেই।
আকীদা কেবল কতগুলো মৌখিক দাবির সমষ্টি নয়। এগুলো কোনো ফাঁকা আড়ম্বরপূর্ণ বাণী নয় যে, কেবল ছন্দ-অলংকারবিদেরাই তা নিয়ে পড়ে থাকবে আর বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ থাকবে না। খালি মুখে স্বীকার করলে, বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা দিলে আর খণ্ডের পর খণ্ড বই লিখে গেলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
আকীদাকে হৃদয়ে এমনভাবে প্রোথিত করে নিতে হয় যাতে কথা ও কাজে এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। এই ব্যাপারে কুরআন এতই গুরুত্ব দিয়েছে যে, ঈমান ও নেক আমলের কথা বারবার একসাথে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায় যে, আমলকে আকীদার সঙ্গী বানিয়ে নিতে হবে। কারণ অন্তরের আকীদার প্রমাণ হলো বাহ্যিক কাজকর্ম। কাজে প্রতিফলিত না হলে ঈমানের মৌখিক দাবি গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَبِكَ هُمْ خَيْرُ الْبَرِيَّةِ ۞
"নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারা হলো সৃষ্টির সেরা।”
وَأَمَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُ جَزَاءً الْحُسْنَى
"আর যে ব্যক্তি ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, তার জন্য আছে উত্তম পুরস্কার। "
مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ )
“যে-কেউ আল্লাহ ও আখিরাত-দিবসের প্রতি ঈমান আনবে আর সৎকাজ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই, চিন্তা নেই।”
مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ *
"যারাই আল্লাহ ও শেষ-দিবসে বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট পুরস্কার আছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।”
فَمَنْ آمَنَ وَأَصْلَحَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ *
"যারা ঈমান আনে ও নিজেকে সংশোধন করে, তাদের নেই কোনো ভয়, নেই তাদের কোনো দুঃখ।”
وَإِنِّي لَغَفَّارُ لِمَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى *
"আর যে তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আর সৎপথে অটল থাকে, আমি তার জন্য অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল।”
إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَبِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ شَيْئًا *
"যারা তাওবা করবে, ঈমান আনবে আর সৎকাজ করবে, তারা বাদে। ফলে এরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে, এদের প্রতি এতটুকুও অবিচার করা হবে না।”
فَأَمَّا মَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَعَسَىٰ أَن يَكُونَ مِنَ الْمُفْلِحِينَ
“যে ব্যক্তি তার জীবনে তাওবা করেছিল আর ঈমান এনেছিল আর সৎকাজ করেছিল, আশা করা যায় সে সাফল্যমণ্ডিতদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”
وَمَا أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُم بِالَّتِي تُقَرِّبُكُمْ عِندَنَا زُلْفَىٰ إِلَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ لَهُمْ جَزَاءُ الضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوا وَهُمْ فِي الْغُرُفَاتِ آمِنُونَ
"না তোমাদের ধন-সম্পদ আর না তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করতে পারবে। তবে যে-কেউ ঈমান আনে আর সৎকাজ করে, তাদেরই জন্য আছে তাদের কাজের বহুগুণে প্রতিদান। তারা সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।”
وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ
"যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য আছে জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত।”
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَٰئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
"যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে, তারাই জান্নাতবাসী। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে।”
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ ۖ فَعَسَىٰ أُولَٰئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
“আল্লাহর মসজিদের আবাদ তো তারাই করবে যারা আল্লাহ ও শেষ-দিবসের প্রতি ঈমান আনে, সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায় তারাই সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।”
مَّا يَفْعَلُ اللَّهُ بِعَذَابِكُمْ إِن شَكَرْتُمْ وَآمَنتُمْ وَكَانَ اللَّهُ شَاكِرًا عَلِيمًا "তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো ও ঈমান আনো, তা হলে তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহ কী করবেন? আল্লাহ পুরস্কারদাতা, সর্ববিষয়ে জ্ঞাত।”
এগুলো কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণা। বারবার এগুলো ঘুরেফিরে এসেছে। খোলাচোখ ও খোলামনসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিই এগুলো অস্বীকার করতে পারে না।
فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ "আসল ব্যাপার হচ্ছে, চোখ অন্ধ হয় না বরং হৃদয় অন্ধ হয়ে যায়, যা বুকের মধ্যে আছে।”
রাসূলুল্লাহ -এর হাদীস থেকেও প্রমাণিত হয় যে, সদাচরণ হলো ঈমানের অংশ। নবীজি বলেন, "ঈমানের সত্তরটিরও অধিক শাখা রয়েছে। এর সর্বোচ্চ শাখা হলো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' ঘোষণা করা এবং সবচেয়ে নিচের শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।”
“তোমাদের যে-কেউ কোনো অন্যায় সংঘটিত হতে দেখে, সে যেন তা হাত (কাজ) দিয়ে প্রতিরোধ করে। সে যদি তা করতে অসমর্থ হয়, তা হলে জিহ্বা (কথা) দিয়ে। যদি তা-ও করতে অসমর্থ হয়, তা হলে অন্তর দিয়ে। আর এটিই ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।”
“যে তাদের বিরুদ্ধে হাত দিয়ে লড়াই করল, সে মুমিন। যে তাদের বিরুদ্ধে জিহ্বা দিয়ে লড়াই করল, সে মুমিন। আর যে তাদের বিরুদ্ধে অন্তর দিয়ে লড়াই করল, সেও মুমিন। এর পরে আর সরিষার দানা পরিমাণ ঈমানেরও অস্তিত্ব নেই।”
ঈমানের দাবিদার সকলেই ঈমানের দাবিতে সত্যবাদী নয়। ঈমানের বাহ্যিক কোনো প্রমাণ না থাকলে সেই দাবি মিথ্যে হয়ে যাবে। ফাঁকা বুলি আর সত্য কথার মাঝে আকাশ- পাতাল ফারাক। চলুন উম্মাহর দুই যুগের দুটি প্রজন্মের একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা করি। একটি ইসলামের শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম সাহাবিগণের, আরেকটি আমাদের বর্তমান সময়ের।
সাহাবিগণের যেই প্রজন্মটিকে আমরা বিশ্বাস ও কাজের দিক দিয়ে অনুকরণ করতে চাই, তাঁরা এমন এক প্রজন্ম যাঁদের আকীদা তাঁদের জাহিলিয়াতের থাবা ও শিরকের আবর্জনা থেকে মুক্ত করে সত্য ও তাওহীদের আলোর দিকে নিয়ে আসে।
আকীদা তথা বিশ্বাসই ছিল তাঁদের এই অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সবচেয়ে মৌলিক প্রভাবক। আমরা বিভিন্ন উদাহরণ থেকে বোঝার চেষ্টা করব যে, এই আকীদা কীভাবে তাঁদের বাহ্যিক কাজকর্মে প্রতিফলিত হয়েছিল। আসলে এরকম উদাহরণ এত অগণিত যে, এর মধ্য থেকে কয়েকটি বেছে বের করা কঠিন। মুহাজির ও আনসারগণের কথাই ধরুন। তাঁদের মধ্যে বয়স্ক, তরুণ, শিশু, নারী, পুরুষ সকলেই ছিলেন। প্রাচুর্য ও সংকট উভয় অবস্থায় তাঁরা দ্বীনের ওপর অবিচল থেকেছেন।
তাঁরা ছিলেন দিনের বেলার অশ্বারোহী আর রাতের বেলার সন্ন্যাসী। অর্থাৎ, দিন কাটত আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে আর রাত কাটত তাহাজ্জুদে চোখের পানি ফেলে। আল্লাহর কাছে তাঁরা নিজেদের জীবন ও সম্পদ বিক্রি করে দিয়েছিলেন জান্নাতের বিনিময়ে। তাঁরপরও তাঁরা প্রচুর তাওবা-ইস্তিগফার করে আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ চাইতেন।
তাঁদের প্রতিটি ঘটনায় সত্যিকার ঈমানের উজ্জ্বল আলোকচ্ছটা ঠিকরে বেরিয়ে আসে। যারা তাঁদের দিকে তাকায়, তাদের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। তারা ভাবতে বসে, “কোন সে জিনিস, যা তাঁদের এত দ্রুত অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে গেল? কীসে তাঁদের শ্রেষ্ঠতম প্রজন্ম বানিয়ে দিল?"
এই তো বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু! মনিব উমাইয়্যাহ ইবনু খালাফকে অমান্য করে, পিঠের নিচের তপ্ত বালি আর বুকের ওপরের ভারি পাথরকে অগ্রাহ্য করে তিনি "আহাদ! আহাদ!” বলে চলেছেন। আর ওই যে খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু আনহু! শরীরের প্রতিটি অংশে লোহিত রঙা তপ্ত লোহার খোঁচা খেয়েও আল্লাহর দ্বীনকে আঁকড়ে ধরে আছেন। আর ওই যে ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর স্ত্রী সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা! খুন হয়ে গেছেন, হায় নিহত হয়ে গেছেন! তবুও ঈমান এক বিন্দু টলেনি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন, "ধৈর্য ধরে থাকো, হে ইয়াসিরের পরিবার! জান্নাত তোমাদের অপেক্ষায়।”
ওই যে দেখুন মুহাজিরগণের কাফেলা! জীবনসঙ্গী, বাচ্চাকাচ্চা, জমিজমা ছেড়ে খালি হাতে ওই যে মরুর পথ ধরে চলেছেন মক্কা ছেড়ে মদীনার দিকে। চলেছেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর দিকে।
ওই দেখুন বদর যুদ্ধে নিজ পিতাকে জবাই করে দিলেন আবু'উবায়দা রাদিয়াল্লাহু আনহু, নিজের ছেলেকে প্রায় মেরেই ফেলেছিলেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু, মুসআব রাদিয়াল্লাহু আনহু হত্যা করে ফেললেন আপন ভাই উবাইদ বিন উমাইরকে।
আরেকটু পেছনে চলে যাই। দেখে আসি আল-আকাবায় রাসূল-এর দিকে আনুগত্যের শপথের হাত বাড়িয়ে থাকা আনসারগণকে। তাঁরা জানতেন এই শপথের কারণে গোটা আরব তাঁদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে হামলে পড়বে, মেরে ফেলবে তাঁদের শ্রেষ্ঠতম মানুষগুলোকে। তারপরও তাঁরা তাদের এই শপথকে লাভজনক বলে জানলেন। সুখে- দুঃখে সকল অবস্থায় এই প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করার ওয়াদা করলেন।
দেখুন কীভাবে তাঁরা মুহাজির ভাইদের সাথে ঘরবাড়ি, টাকাপয়সা, জমিজমা ভাগ করে নিচ্ছেন। আল্লাহ তাঁদের ব্যাপারে বলেন,
يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَبِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
"যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে, তাদের তারা ভালোবাসে। মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে, তা পাওয়ার জন্য তারা নিজেদের অন্তরে কোনো কামনা রাখে না। আর নিজেরা যত অভাবগ্রস্তই হোক না কেন, তাদের (মুহাজিরদের) নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়। মূলত যেসব লোককে তার মনের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে তারাই সফলকাম।”
ওই যে শুনুন বদর যুদ্ধের দিন তাঁরা নবীজি-কে বলছেন, "আপনার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যর দিকে এগিয়ে যান, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার সাথে আছি। সে সত্তার শপথ করে বলছি যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, আপনি যদি সাগরও পাড়ি দিতে সিদ্ধান্ত নেন, আমরা আপনাকে অনুসরণ করব। আমাদের একজনও পেছনে পড়ে থাকবে না। আল্লাহর দয়ায় এগিয়ে চলুন।”
আর এই তো উহুদের দিন নবীজিকে বাঁচাতে গিয়ে তাঁদের মধ্যে সাতজন শহীদ হয়ে গেলেন। আর ওই যে হুনাইনের দিন যখন ১২০০০ যোদ্ধা নবীজি-এর আদেশ মানতে পারলেন না, তখন মাত্র আশিজন আনসার ছুটে এসে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিলেন। হাওয়াযিন গোত্রকে পরাজিত করে গনীমাতের মাল নিয়ে আসলেন। নবীজি আনসারদের ছাড়া অন্যদের মাঝে গনীমাত ভাগ করে দিলেন। সবার আগে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তি থেকে শুরু করে সবার শেষে ফেরত আসা ব্যক্তিদের পর্যন্ত দিলেন। তাদের অন্তর ইসলামের দিকে ঝুঁকে ছিল। আনসারগণ গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আমাদের অংশ কী, হে আল্লাহর রাসূল?" নবীজি জবাব দিলেন, "অন্যেরা (গনীমাতের) উট-ভেড়া নিয়ে ফিরছে, আর তোমরা আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে ফিরছ। এতে কি তোমরা সন্তুষ্ট নও?” তাঁরা কেঁদে বলে উঠলেন, "আমরা আল্লাহর রাসূলকে পেয়ে সন্তুষ্ট।”
চলুন আবার মদীনায় ফিরে যাই। দেখুন আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম সেনাবাহিনীর জন্য তাঁর সব সম্পদ দান করে দিলেন। নিজের পরিবারের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ছাড়া আর কিছুই রাখলেন না। আর এই যে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সহায়-সম্বলের অর্ধেকটা দান করে দিলেন। আর ওই যে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু পুরো সেনাবাহিনীকে নিজ খরচে সজ্জিত করে দিলেন।
চলুন পরিখা (খন্দকের) পেছনে দাঁড়াই। সেই দিনটিকে দেখি যেদিন সম্মিলিত বাহিনী (আহযাব) মদীনাকে ঘিরে ফেলে এক মাস অবরোধ দিয়ে রেখেছিল। আর মুসলিমদের "চক্ষু হয়েছিল বিস্ফোরিত আর প্রাণ হয়েছিল কণ্ঠাগত। " এমন সময় ঈমানদারগণ ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বলে উঠলেন,
وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُ
"আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তো এরই ওয়াদা করেছিলেন।”
মুগ্ধ নয়নে তাকান তাবুকের দিকে, দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে চলা মুসলিম বাহিনীর দিকে। নবীজি-এর সাথে তাঁরা বের হয়েছিলেন দুর্যোগপূর্ণ এক বছরে। মাত্রই পাকতে শুরু করা ফলমূল আর ঘরের আরাম ছেড়ে অল্প কিছু শুকনো খেজুর আর পানিকে সম্বল করে মরুভূমি ধরে রাসূল-এর সাথে খুশিমনে হেঁটে চলেছেন।
আসুন, আসুন! মদীনায় ফিরে গিয়ে ওই গরিব সাহাবিগণের সাথে বসে কাঁদি, যাদের কাছে জিহাদের জন্য দান করার মতো কোনো টাকা ছিল না। রাসূল-এর কাছেও তাঁদের দেওয়ার মতো কোনো বাহন ছিল না।
تَوَلَّوا وَأَعْيُنُهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ حَزَنًا أَلَّا يَجِدُوا مَا يُنفِقُونَ *
"তখন তারা ফিরে গেল, আর সে-সময় তাদের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ছিল এই দুঃখে যে, ব্যয়বহন করার মতো কোনো কিছু তাদের ছিল না।”
শত্রুর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে প্রস্তুত মুসলিম সেনাদের সারিগুলো ধরে হাঁটি, চলুন। দেখবেন তাঁদের মাঝে লুকিয়ে আছেন উমাইর ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু। কারণ নবীজি তাঁকে দেখে ফেললে তো অল্পবয়সী হওয়ার কারণে ফিরিয়ে দেবেন!
মদীনার রাস্তা ধরে হাঁটি, আসুন। দেখুন মদ হারামের আয়াত নাযিল হওয়ার সাথে সাথে রাস্তাগুলো কীভাবে ভেসে যাচ্ছে ফেলে দেওয়া মদের বন্যায়!
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ )
“হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি আর ভাগ্য নির্ধারক তির ঘৃণিত শয়তানী কাজ। তোমরা তা বর্জন করো যাতে তোমরা সাফল্যমণ্ডিত হতে পারো। শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মাঝে শত্রুতা সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে ও সালাত থেকে তোমাদের বাধা দিতে। কাজেই তোমরা কি এসব থেকে বিরত থাকবে?"
খানসা রাদিয়াল্লাহু আনহা কী বলছেন শুনুন। কাদিসিয়ার যুদ্ধে নিজের চার চারজন পুত্রের মৃত্যুসংবাদ শুনে তিনি বলেছেন, “প্রশংসা আল্লাহর যিনি এই চারজনের মৃত্যুর মাধ্যমে আমাকে সম্মানিত করলেন।” ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন, “আমার চারিপাশে এত মাতমকারী না থাকলে আমি নিজেকেই হত্যা করে ফেলতাম।”
এঁরাই তো সে-সকল সাহাবিয়াত, যারা কুরআনের হুকুম শুনে নিজেদের মুখ ঢেকে ফেলেছিলেন।
وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ
"তারা যেন 'জুয়ুবিহিন্না' (তাদের শরীর, ঘাড়, বুক ইত্যাদি) মাথার কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়।"
ওই তো দিনার গোত্রের সেই নারী, যাকে তাঁর স্বামী, ভাই ও পিতার শহীদ হওয়ার সংবাদ দিলে তিনি জিজ্ঞেস করেছেন, “আরে রাসূলুল্লাহ কেমন আছেন?” তাঁকে জানানো হলো রাসূলুল্লাহ ভালো আছেন। রাসূলকে জীবিত দেখতে পেয়ে তিনি বললেন, "আপনার ভালো থাকার তুলনায় আমার যে-কোনো বিপদ-আপদ তুচ্ছ হয়ে যায়।”
গামিদিয়্যাহকে দেখুন। তিনি গোপনে ব্যভিচার করেছিলেন, কেউ জানতে পারেনি। কিন্তু তিনি এত অনুতপ্ত হন যে বারবার এসে রাসূলুল্লাহ -কে জোরাজুরি করতে থাকেন তাঁকে শরীয়ত নির্ধারিত শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে পবিত্র করার জন্য। পাথর নিক্ষেপে নিহত হয়ে তিনি আল্লাহর দরবারে এমনভাবে কবুল হলেন যে, তাঁর তাওবা মদীনার সত্তরজন মানুষের মধ্যে ভাগ করে দিলে তা সবার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে।
মহান সাহাবি আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু মাটিতে গাল ঠেকিয়ে পড়ে আছেন ওই দেখুন! বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বারবার বলছেন তাঁর গালে পাড়া দেওয়ার জন্য। কারণ তিনি বিলালকে একবার শুধু তুচ্ছার্থে “হে কালো নারীর সন্তান!” ডেকে বসেছিলেন।
সাহাবি-প্রজন্মের মুসলিমগণের এত এত দৃষ্টান্তের সামনে দাঁড়িয়ে কানে বাজে আল্লাহ তাআলার বাণী:
مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ذَلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ وَعدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
“মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর তার সাথে যারা আছে, তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর আর নিজেদের মধ্যে পরস্পর দয়ার্দ্র। তুমি তাদের আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টির সন্ধানে রুকু-সেজদারত অবস্থায় দেখতে পাবে। তাদের চিহ্ন হলো তাদের চেহারায় সেজদার প্রভাব পরিস্ফুট হয়ে আছে। তাওরাতে তাদের বর্ণনা এমনই। আর ইঞ্জিলে তাদের উপমা হলো একটি চারাগাছ তার কচিপাতা বের করে, তারপর তা শক্ত হয়, অতঃপর তা কাণ্ডের ওপর মজবুত হয়ে দাঁড়িয়ে যায় যা চাষিকে আনন্দিত করে। ফলে কাফিরদের অন্তর রাগে জ্বলে যায়। তাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহা পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।”
এই তো গেল অতীত ইতিহাসের পাতা। পাতা উল্টে আজকের যুগের অধ্যায়ে আসলে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখতে হয়। নিতান্ত অনিচ্ছাবশত আমাদের এই অপ্রিয় বর্তমানের দিকে তাকানো লাগে। যেন চারিদিকে অন্ধকার, মানুষের ঈমান দুর্বল আর নড়বড়ে। একে নতুন করে বর্ণনা করার কিছু নেই। কারণ আমরা সশরীরে এই বাস্তবতার ভেতর বসবাস করছি। চরম দুঃখ নিয়ে আমরা দেখছি এই উম্মাহর ভাঙন আর বিভেদ, কখনো নরম (ইরজা) আবার কখনো চরমপন্থার (তাকফির) দিকে দুলতে থাকা আকীদা, ধর্মদ্রোহিতা, প্রবৃত্তির অনুসরণ আর কুসংস্কারে ভরা পরিবেশ। পাশ্চাত্যের কাফির বা প্রাচ্যের নাস্তিকদের সাথে আমাদের শাসকেরা খোলাখুলি জঘন্য মিত্রতায় লিপ্ত। এদের সব ভালোবাসা যেন ইহুদি-খ্রিষ্টানদের জন্য আর সকল ঘৃণা ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি। তারা আল্লাহর দেওয়া শরীয়তের বিধানের বদলে মানবরচিত আইন প্রতিষ্ঠা করে, আবার নিজেদের মুসলিম বলেও দাবি করে। এদেরকে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে দুনিয়ালোভী আলেমরা যারা এসব শাসককে 'খলিফা', 'আমীরুল মুমিনীন' ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করে।
সাধারণ মুসলিম জনগণকে এসব শাসকের আনুগত্য করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এদের কুফরি আইনের কাছে বিচার চাইতে বাধ্য করা হচ্ছে। সেক্যুলারিজম হয়ে গেছে নতুন ধর্ম। গণমাধ্যম আর শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে এটিকে প্রবীণ ও নবীন সমাজে প্রচার করা হচ্ছে। এই নতুন ধর্মের দাবি হলো রাজনীতি থেকে ধর্মের পৃথকীকরণ, শুধু মসজিদ নাকি আল্লাহর জন্য আর সংসদ শাসকের জন্য। পথভ্রষ্ট আলেমরা ইরজাগ্রস্ত আকীদা প্রচার করে বেড়াচ্ছে। বলে বেড়াচ্ছে অন্তরে ঈমান থাকলে আর আমলের প্রয়োজন নেই, শাসকসহ সবাই-ই নাকি মুমিন। সুফিবাদ, বাহাই মতবাদ, কাদিয়ানি মতবাদ, নুসাইরি মতবাদসহ যতসব ভ্রান্তির লাগাম খুলে দেওয়া হয়েছে। মুসলিমদের সঠিক আকীদার ভেতর এগুলো বিনা বাধায় বিকৃতির বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এদের Reactions এ নতুন করে উগ্রখারিজি গোষ্ঠীর উদ্ভব হচ্ছে যারা জযবার চোটে গণহারে মুসলিমদের কাফির বলে আখ্যা দিচ্ছে।
এই সব ভ্রান্ত গোষ্ঠীগুলোকে তন্নতন্ন করে খুঁজেও আমাদের সত্যনিষ্ঠ পূর্বসূরিদের আকীদা খুঁজে পাওয়া যায় না। মুষ্টিমেয় যেসব মানুষকে আল্লাহ দয়া করেছেন, তাদের ছাড়া আর কারো মধ্যেই ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে সালাফদের সঠিক আকীদা অবশিষ্ট নেই। সাহাবিগণের প্রজন্ম আলোচনা করার সময় ক্ষণিকের জন্য যে আলোকচ্ছটা আমরা দেখেছিলাম, বর্তমানের আলোচনায় তা নিকষ আঁধারে হারিয়ে যায়।
অতীত-বর্তমানের মাঝে এরকম আকাশ-পাতাল পার্থক্যের পরও উভয় পক্ষই নিজেদের সত্যিকারের মুমিন বলে দাবি করে। মুখের দাবি তো কেবল একটা পতাকার মতো যা তুলে ধরে কেবল নাড়ালেই হলো। কিন্তু এক পক্ষ এই পতাকা ধরেছিল নিষ্ঠার সাথে, কাজেকর্মে সেই দাবি বাস্তবায়ন করে। কিন্তু আরেক পক্ষ পতাকা ধরেছে কেবল ধরতে হয় বলে, পূর্বপুরুষদেরকে ধরতে দেখেছে বলে। কিন্তু কাজকর্মে সেটির কোনো প্রতিফলন নেই।
ইমাম শাফিঈ (আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন) বলেছেন, "মানুষ যদি কেবল সূরা আল-আসর অধ্যয়ন করত, তা হলে এটাই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো।” এই সূরাতে বলা হয়েছে,
وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ * إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ )
"আল-আসর (সময়) এর শপথ! নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে। শুধু তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, একে অপরকে সত্যের উপদেশ দেয় আর ধৈর্যের উপদেশ দেয়।"
আকীদা নিয়ে, তাওহীদ নিয়ে আমরা এত আলোচনা করি কেবল তাত্ত্বিক আলাপ বা দার্শনিক বিতর্কের উদ্দেশ্যে না। আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য হলো উম্মাহর সংশোধন, সব রকম ভ্রান্তি থেকে মুসলিমদের পরিশুদ্ধি। বারবার আলোচনার মাধ্যমে যেন এই বিষয়গুলো আমাদের অন্তরে গেঁথে যায়, তাওহীদ আমাদের কাছে যা কিছু দাবি করে তা যেন আমাদের কাজেকর্মে চলে আসে। আল্লাহর কাছে আমরা সব রকম ভ্রান্ত আকীদা থেকে নিজেদের দায়মুক্তি ঘোষণা করছি। সালাফগণের আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক কথা ও কাজ থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইছি।
টিকাঃ
৬৬. সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, ৯৮: ৭
৬৭. সূরা আল-কাহফ, ১৮: ৮৮
৬৮. সূরা আল-মাইদাহ ৫:৬৯
৬৯. সূরা আল-বাকারাহ ২:৬২
৭০. সূরা আল-আনআম ৬:৪৮
৭১. সূরা ত্বা-হা ২০:৮২
৭২. সূরা মারইয়াম ১৯:৬০
৭৩. সূরা আল-কাসাস ২৮:৬৭
৭৪. সূরা সাবা ৩৪:৩৭
৭৫. সূরা আল-বাকারাহ ২:২৫
৭৬. সূরা আল-বাকারাহ ২:৮২
৭৭. সূরা আত-তাওবা ৯:১৮
৭৮. সূরা আন-নিসা ৪:১৪৭
৭৯. সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪৬
৮০. বুখারি: ৯, মুসলিম: ১৬১
৮১. মুসলিম: ১৮৬
৮২. মুসলিম: ১৮৮
৮৩. সূরা আল-হাশর ৫৯:৯
৮৪. সূরা আল-আহযাব ৩৩:১০
৮৫. সূরা আল-আহযাব ৩৩:২২
৮৬. সূরা আত-তাওবা ৯:৯২
৮৭. সূরা আল-মাইদাহ ৫:৯০-৯১
৮৮. সূরা আন-নূর ২৪:৩১
৮৯. সূরা আল-ফাতহ ৪৮:২৯
৯০. সূরা আল-আসর ১০৩:১-৩
📄 এই আমাদের আকীদা
• ঈমান হলো মুখ দ্বারা ঘোষণা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা কাজ ও অন্তর দ্বারা বিশ্বাস করার নাম। নেক আমল করলে ঈমান বাড়ে, বদ আমল করলে ঈমান কমে। একইভাবে মুমিনরাও বিভিন্ন স্তরের হয়ে থাকে।
• গুনাহের কাজ করলে ঈমান কমে যায়, কিন্তু এর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায় না। পক্ষান্তরে বড় কুফর (কুফরুল আকবার) ঈমানকে পুরোপুরি বিলীন করে দেয়।
• কুফর দুই ধরনের: বড় (আকবার) ও ছোট (আসগার)। বড় কুফরের কারণে মানুষ ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় এবং কাফির বলে সাব্যস্ত হয়। ছোট কুফরের কারণে মানুষ ইসলাম থেকে বের হয় না। তবে এটি কঠোরভাবে তিরস্কারযোগ্য গুনাহ। বড়-ছোট'র এই প্রকারভেদ শিরক (অংশীবাদ), নিফাক (ভণ্ডামি), যুলুম (অবিচার) ও ফিসক (পাপাচার) এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
• কোনো মুসলিম যত গুনাহ-ই করুক না কেন, অন্তরে সেগুলোকে হারাম বলে মানলে সে কাফির হবে না। এমনকি তাওবা না করলেও না। যেই ফাসিক (পাপাচারী) তার গুনাহের কাজগুলোকে হারাম বলে স্বীকার করে, সে কাফির (অবিশ্বাসী) নয়। এমনকি সে তাওবা ছাড়াই আমৃত্যু এসব গুনাহ করলেও নয়। আখিরাতে তার বিচারের ভার আল্লাহর দায়িত্বে। আল্লাহ চাইলে তাকে মাফ করে দেবেন, চাইলে তাকে সাময়িকভাবে জাহান্নামে শাস্তি দেওয়ার পর জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
• ঈমান ও ইসলামের কথা একসঙ্গে উল্লেখ করা হলে, ঈমান দিয়ে বোঝানো হয় অন্তরের বিশ্বাসকে আর ইসলাম দিয়ে বোঝানো হয় বাহ্যিক আমলকে। আর যখন এর কোনো একটি উল্লেখ করা হয়, তখন এর দ্বারা সম্পূর্ণ দ্বীন ইসলামকে বোঝানো হয়।
• কেউ কুফরি কাজ করলেই আমরা তাকে কাফির বলে সাব্যস্ত করি না, যদি না তা করার জন্য সুস্পষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। কোনোরূপ ব্যাখ্যাও না থাকে। সে জেনেবুঝে ইচ্ছাকৃত ও স্বাধীনভাবে এই কাজ করেছে—এমনটা প্রমাণিত হলেই কেবল জ্ঞানসম্পন্ন যোগ্য ব্যক্তিগণ তাকে কাফির ঘোষণা করবেন।
• আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ তাআলা হলেন স্রষ্টা, রিযিকদাতা; তিনিই জীবন দেন, তিনিই জীবন নেন; তিনিই সকল ভালো-মন্দের নিয়ন্ত্রক। তাঁর পাশাপাশি আমরা অন্য কোনো রব অনুসন্ধান করি না।
قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِي رَبًّا "বলো, 'আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য রব তালাশ করব?'..." [৯১]
• আল্লাহ তাআলা কোনো সঙ্গী, সন্তান, অংশীদার ও প্রতিদ্বন্দ্বীর ঊর্ধ্বে।
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ * "বলো, 'আল্লাহ তিনি অদ্বিতীয়। আল্লাহ আস-সমাদ (যিনি অমুখাপেক্ষী; তাঁর কাউকে দরকার নেই, কিন্তু তাঁকে সবারই দরকার; তিনি ক্ষুধা-তৃষ্ণার ঊর্ধ্বে)। তিনি জন্ম দেন না ও জন্ম নেননি। তাঁর সমকক্ষ বা সমতুল্য কিছু নেই'।" [৯২]
• আল্লাহই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য। ভয়, আশা, স্মরণ, প্রার্থনা, ভালোবাসা, আত্মসমর্পণ, সাহায্য চাওয়া, নাজাত চাওয়া, নির্ভরতা, উৎসর্গ, শপথ ও অন্য সব রকমের উপাসনা শুধু আল্লাহর উদ্দেশ্যেই করতে হবে।
• আমরা কোনো গাছ, পাথর বা কবরের কাছে দুআ করি না। আমরা শুধু আল্লাহর কাছেই দুআ করি। আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলির মাধ্যমে, আমাদের করা নেক আমলের মাধ্যমে অথবা কোনো জীবিত নেককার মানুষের মাধ্যমেই আমরা দুআ করি। আমরা কোনো কবর ঘিরে তাওয়াফ করি না, মৃতের কাছে দুআ করি না, জিন বা মৃত কোনো বুযুর্গের উদ্দেশ্যে কুরবানি করি না, আল্লাহ ছাড়া কারো নামে শপথ করি না। যারা এগুলোর কোনোটা করে, তারা নিশ্চিতভাবেই শিরকে লিপ্ত।
• আল্লাহকে ছাড়া আমরা যেমন অন্য কোনো রব গ্রহণ করি না, তেমনি তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে বিধানদাতা বলে মানি না। তাঁর দেওয়া বিধান ছাড়া অন্য কিছুকে আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণ করি না। সার্বভৌমত্ব আল্লাহর। তিনি বিধান দেন, আদেশ করেন, নিষেধ করেন, বিচার-ফয়সালা দেন, বৈধ-অবৈধ নির্ধারণ করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞানী ও সব বিষয়ে অবহিত।
• যে আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য কোনো আইন প্রণয়ন করে এবং আল্লাহর আইনকে অন্য কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপন করে, সে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে গিয়েছে। সে বিচারকার্যে নিজেকে আল্লাহর সাথে শরীক করেছে। এভাবে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে। সে যদি শাসক হয়ে থাকে, তা হলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাকে অপসারণ করতে হবে।
• আল্লাহ তাঁর কিতাবে ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ-এর মাধ্যমে নিজের যে-সকল নাম ও বৈশিষ্ট্যের কথা জানিয়েছেন, আমরা সেই সবগুলোতে বিশ্বাস করি। আমরা এগুলোর কোনোটিকে পরিবর্তন করি না, অবিশ্বাস করি না, অর্থ বিকৃত করি না, কোনো সৃষ্টির সাথে সেগুলোর সাদৃশ্য সাব্যস্ত করি না। তাঁর বৈশিষ্ট্যসমূহের ধরন- প্রকৃতি সম্পর্কে জানার দাবিও আমরা করি না। কারণ, “কোনোকিছুই তাঁর সদৃশ নয়; তিনি সব শোনেন, সব দেখেন।” [৯৩]
• আল্লাহ নিজের যেসব বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে নিশ্চিত করেছেন এবং মুহাম্মাদ-কে দিয়ে নিজের যেসব বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে নিশ্চিত করেছেন, সেই সবগুলোতে আমরা নিশ্চিত বিশ্বাস করি। যেমন: জ্ঞান, সামর্থ্য, শ্রবণ, দৃষ্টি, চেহারা, হাত ইত্যাদি। এর কোনোটিই কোনো সৃষ্টির সদৃশ নয়।
• আমরা তা-ই বলি যা আল্লাহ জানিয়েছেন, “দয়াময় (আল্লাহ) আরশে সমুন্নত আছেন।”[৯৪] অতএব, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকূলের ঊর্ধ্বে আরশে সমুন্নত। তিনি যে আরশে সমুন্নত, তা জ্ঞাত, কিন্তু তিনি কীভাবে আরশে আছেন তা অজানা। এতে বিশ্বাস করা ওয়াজিব। তিনি কীভাবে আরশে আছেন, তা জিজ্ঞেস করা বিদআত।
• আল্লাহ যখন যা যেভাবে করতে ইচ্ছা করেন, তখন তা সেভাবেই করেন। তিনি আনন্দিত হন, হাসেন, ভালোবাসেন, ঘৃণা করেন, সম্মতি দেন, রাগান্বিত হন-তাঁর শানের সাথে যেভাবে সামঞ্জস্যশীল, সেভাবেই হন-যেমনটা কুরআন ও হাদীসে আছে। তাঁর কোনো কাজই সৃষ্টিকূলের কারো কাজের মতো নয়। মরণশীলদের মাঝে কেউই এগুলোর ধরন-প্রকৃতি সম্পর্কে জানে না।
• কুরআন আল্লাহর সত্য ও অসৃষ্ট কথা, কোনোভাবেই তা মানুষের কথার প্রকৃতির সদৃশ নয়। এমনভাবে তিনি এ কথা বলেছেন, যা সম্পর্কে আমাদের কোনো জ্ঞান নেই।
• আমরা ফেরেশতা ও নবী-রাসূলে বিশ্বাস করি।
• আমরা রাসূলগণের ওপর নাযিল হওয়া সকল কিতাবে বিশ্বাস করি এবং রাসূলগণের মাঝে কোনো পার্থক্য করি না।
• আমরা বিশ্বাস করি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তিনি সমগ্র মানবজাতির সেরা ও নেতা। তিনি নবীগণের সীলমোহর এবং মুত্তাকিগণের নেতা।
• আমরা বিশ্বাস করি মুহাম্মাদ -কে রাতের বেলা জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে জেরুসালেমের মসজিদুল আকসায় নেওয়া হয়েছে এবং আসমানে যে উচ্চতায় আল্লাহ চেয়েছেন, সে উচ্চতায় তাঁকে নেওয়া হয়েছে।
• আমরা নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করি যে, মাহদী (হিদায়াতপ্রাপ্ত ইমাম বা নেতা) মুহাম্মাদ -এর উম্মাহর মধ্য থেকে শেষ জামানায় আবির্ভূত হবেন।
• কুরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদীসে কিয়ামাতের যেসব লক্ষণ বর্ণিত হয়েছে, আমরা সেসবে বিশ্বাস করি। দাজ্জালের আগমন, আসমান থেকে ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর অবতরণ, পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদয়, ভূপৃষ্ঠ থেকে বিশেষ এক প্রাণীর আবির্ভাব ইত্যাদি এসব লক্ষণের অন্তর্ভুক্ত।
• মুনকার এবং নাকীর নামক দুইজন ফেরেশতা কর্তৃক কবরের প্রশ্নোত্তরে আমরা বিশ্বাস করি। রব্ব, দ্বীন ও নবী মুহাম্মাদ -এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে।
• আমরা কবরের আযাবে বিশ্বাস করি। যারা এর যোগ্য, তারা তা ভোগ করবে। আল্লাহ আমাদের তা থেকে রক্ষা করুন। কবর হয় জান্নাতরে একটি উদ্যান বা জাহান্নামের একটি গর্ত হবে। প্রত্যেক বান্দাই তার প্রাপ্য যথাযথভাবে পাবে।
• বিচার-দিবসে কবর থেকে পুনরুত্থিত হয়ে আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে আমরা বিশ্বাস করি। হিসাব-নিকাশ, আমলনামা পাঠ, মীযান স্থাপন, সিরাত পার হওয়া, শাস্তি ও পুরস্কারে বিশ্বাস করি।
• আমরা বিশ্বাস করি নবীজি উম্মাতের জন্য বিচার-দিবসে সুপারিশ করবেন।
• আমরা হাউযে কাউসার বিশ্বাস করি। এটি একটি জলাধার যা থেকে পানি পান করিয়ে উম্মাতের পিপাসা নিবারণ করার জন্য আল্লাহ তাঁর রাসূলকে দান করবেন।
• আমরা বিশ্বাস করি জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়ই সত্য। এগুলো সৃষ্ট এবং কখনো বিলীন হবে না।
• আমরা বিশ্বাস করি যে, জান্নাতবাসীরা তাদের দৃষ্টি সর্বব্যাপী হওয়া ছাড়াই আল্লাহকে সরাসরি দেখবে এবং এই দেখার ধরণ-প্রকৃতি অজানা। ঠিক যেভাবে আল্লাহ বলেছেন, সেভাবেই তা হবে: “কতক চেহারা সেদিন উজ্জ্বল হবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।”[৯৫]
• আমরা তাকদীর ও এর ভালো-মন্দে বিশ্বাস করি। আর আল্লাহ যা বলেছেন, তা-ই বলি : “বলো, 'সবকিছুই আল্লাহর তরফ থেকে।'...”[৯৬] ভালো-মন্দ সবই আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। বিশ্বজগতের সকল কিছু তাঁর ইচ্ছায় সংঘটিত হয়।
• আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে কুফরি ও পাপকাজ করার আদেশ দেন না। বান্দা এগুলো করলে তাতে সন্তুষ্টও হন না। “তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরি পছন্দ করেন না।”[৯৭] আর তিনি যদি কাফিরের জন্য কুফরিকেই পূর্বনির্ধারিত করে থাকেন, তা হলে তার কারণ শুধু তিনিই জানেন। আল্লাহর ন্যায়বিচার, নিজের বিরুদ্ধে বান্দার যুলুম এবং বান্দার অতীত পাপের ফল হিসেবে। "তোমার কোনো কল্যাণ হলে তা হয় আল্লাহর তরফ থেকে এবং তোমার কোনো অকল্যাণ হলে তা হয় তোমার নিজের কারণে।”[৯৮] এ সবকিছুই ঘটে আল্লাহর ইচ্ছে অনুসারে। আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন, তা-ই হবে। আর তিনি যা চান না, তা হবে না। আর আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দার প্রতি অবিচার করেন না। “নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও অবিচার করেন না।”[৯৯]
• আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কর্ম সৃষ্টি করেছেন। “আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদের এবং তোমরা যা তৈরি করো সেগুলোও।”[১০০] বান্দা তাদের নিজেদের কাজ বাস্তবেই সম্পন্ন করে, রূপকভাবে নয়।
• আমরা নবীজি ﷺ-এর সকল সাহাবিকে ভালোবাসি। আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন। তাঁরা শ্রেষ্ঠতম প্রজন্ম। আমরা তাঁদের গুণাবলি স্মরণ করি, তাঁদের অত্যন্ত সম্মান করি ও তাঁদের প্রতি হৃদ্যতা প্রদর্শন করি। তাঁরা যা নিয়ে মতভেদ করেছেন, তা থেকে আমরা দূরে থাকি। তাঁদের ভালোবাসা ইসলামের অংশ, ঈমানের অংশ, ইহসানের অংশ। তাঁদের ঘৃণা করা কুফর ও নিফাক।
• আমরা সমগ্র উম্মাতের ওপর আবু বকর আস-সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করি এবং তাঁর খিলাফতকে স্বীকার করি। একইভাবে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু, উসমান বিন আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং আলী বিন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফাতকে স্বীকার করি। তাঁরা হলেন খুলাফায়ে রাশেদীন ও ন্যায়পরায়ণ নেতা। এঁদের ব্যাপারে নবীজি বলেছেন, “অবশ্যই আমার সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ মেনে চলো এবং তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো।" [১০১]
• আলেমগণের (এই উম্মাহর প্রথম তিন প্রজন্ম ও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী) ব্যাপারে সম্মান সহকারে কথা বলতে হবে। যে ব্যক্তি তাঁদের নিন্দা করে, সে সঠিক পথে নেই।
এই হলো আমাদের আকীদা, যা আমাদের কাছে নিজেদের জীবনের চেয়েও বেশি দামি। চৌদ্দ শতক ধরে এগুলো অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত আছে। কাফিরদের আক্রমণ, মুনাফিকদের ছড়ানো সন্দেহ ও পথভ্রষ্টদের বানানো বিদআতের মোকাবিলায় এগুলো কিয়ামাত পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকবে। অসংখ্য মুসলিমের অবহেলা ও অবজ্ঞা সত্ত্বেও এগুলো টিকে আছে।
আমাদের আকীদার টিকে থাকাই প্রমাণ করে যে, এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। সকল ভ্রান্ত আকীদা বিলুপ্ত হয়ে যায় আর অন্য সব ধর্ম বিকৃত হয়ে যায়। শুধু ইসলামের বিশুদ্ধ রূপ টিকে থাকে। কারণ এটিই একমাত্র সত্য। মিথ্যা ও সন্দেহ দ্বারা একে প্রভাবিত করা যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
“নিশ্চয় আমিই (কুরআন) নাযিল করেছে আর অবশ্যই আমি তার সংরক্ষক।" [১০২]
আমাদের এই বিশ্বাসমালা আমাদের দেয় শক্ত-মজবুত এক ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের দিকে যাত্রা করি। আল্লাহই একমাত্র সত্য ইলাহ এ ব্যাপারে আমরা দৃঢ় বিশ্বাসী। কারণ তিনিই সবকিছুর মালিক, যিনি তাঁর মালিকানাধীন সবকিছুকে কর্তৃত্ব সহকারে শাসন করেন। আর পরিপূর্ণতার বৈশিষ্ট্যসমূহ তাঁরই। তিনি ছাড়া আমাদের অন্য কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই। তিনিই সবচেয়ে মহান।
এই আকীদা আল্লাহর পূর্ণ কর্তৃত্বকে সত্যায়ন করে। তাঁর কর্তৃত্বের কাছে মাথানত করাকে ঈমানের শর্ত ও ইখলাসের চিহ্ন হিসেবে প্রমাণ করে।
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিনা নারী উক্ত নির্দেশের ভিন্নতা করার কোনো অধিকার রাখে না।”[১০৩]
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا )
"কিন্তু না, তোমার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসার ভার তোমার অর্থাৎ (রাসূলের) ওপর ন্যস্ত না করে, অতঃপর তোমার ফয়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কিছুমাত্র কুণ্ঠাবোধ না থাকে, আর তারা তার সামনে নিজেদের পূর্ণরূপে সমর্পণ করে।”[১০৪]
এই আকীদার দাবিই হলো সব ব্যাপার আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে ন্যস্ত করা, এমনকি মতভেদের সময়েও।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا.
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর অনুগত হও এবং রাসূলের অনুগত হও ও কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তিগণের; যদি কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে, তা হলে সেই বিষয়কে আল্লাহ ও রাসূলের (নির্দেশের) দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাত-দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাকো। এটাই উত্তম এবং সুন্দরতম মর্মকথা।”[১০৫]
এই আকীদা আমাদের মধ্যকার সমঝোতা ও ঐক্য রক্ষা করে এবং ঝগড়া-বিবাদের সম্ভাবনা মিটিয়ে দেয়। মুসলিমদের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পথ দেখিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এটি মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করে। দেশ-জাতি-বর্ণে পার্থক্য থাকার পরও সকল মুসলিম একই লক্ষ্যের দিকে ছোটে।
এই আকীদা ধারণকারী প্রতিটি ব্যক্তি নিজের কাজকর্মের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকে। কারণ সে বিশ্বাস করে আখিরাতে তাকে বলা হবে,
اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا )
“পড়ো তোমার আমলনামা। আজ তোমার হিসেব গ্রহণের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।”[১০৬]
এর ফলে মুমিনের অন্তরে আল্লাহর আদেশ-নিষেধের অবাধ্যতার প্রতি ঘৃণা তৈরি হয়। কখনো যদি সে ভুল পথে চলেও যায়, তা হলে এই আকীদা তাকে সাথে সাথে সঠিক পথে ফিরে আসতে উদ্দীপ্ত করে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় অবিরাম প্রচেষ্টা করে যাওয়ার শক্তি যোগায়।
অন্য সব মতাদর্শ ও দর্শনের সাথে আমাদের আকীদার পার্থক্যটা এখানেই। এর ফলেই আমরা তাদের চেয়ে উঁচু মর্যাদায় আসীন। ইসলাম এই আকীদাকে এমন উঁচু মর্যাদার আসন দিয়েছে যেই স্থানটির জন্য অন্য সব মতাদর্শ লালায়িত। তাদের মতাদর্শ আর আমাদের আকীদার বিরাট তফাতের কারণে তাদের কাছে সেই উঁচু মর্যাদার ধারেকাছে পৌঁছানোও অলীক স্বপ্ন।
ইসলামি আকীদা মুসলিমদের এই নিশ্চয়তা দেয় যে, আল্লাহ তাআলা তাদের সাথে আছেন। তাদের তিনি দেখেন, শোনেন, তাদের অন্তরের গোপন খবর জানেন। আর তিনিই তাদের শেষ বিচারের দিনে পুনরুত্থিত করে পুরস্কার বা শাস্তি দেবেন।
সা'সা বিন মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার নবীজি -এর কাছে এসে এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন: "অতএব কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে সে তা দেখবে। আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকাজ করলে, সেও তা দেখবে।”[১০৭] নবীজি বললেন, “এই আয়াত ক'টি শোনাই আমার জন্য যথেষ্ট।”[১০৮]
এই আকীদা আমাদের মিত্রতাকে শুধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদের জন্যই বরাদ্দ রাখে। এ ছাড়া বাকি সবাই আল্লাহ থেকে তাদের দূরত্বের ভিত্তিতে বিভিন্ন মাত্রায় শত্রুতা ও ঘৃণা পাওয়ার যোগ্য। এটি এমন এক আকীদা, যা এর অনুসারীদের দুনিয়ার জীবনের সংকীর্ণতা থেকে বের করে এনে আখিরাতের প্রশস্ততার দিকে নিয়ে যায়। এই আকীদার মানুষদের জমিনে হাঁটতে দেখা গেলেও তাদের অন্তর পড়ে থাকে জান্নাতে। তারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের জন্য সহায়-সম্বল প্রস্তুত রাখে। তারা ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জন্য মেহনত করে না। আল্লাহ ও আখিরাতের দিকে যাত্রায় পাথেয় হিসেবে এখান থেকে যতটুকু নেওয়া দরকার, ততটুকুই তারা কেবল নেয়।
وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ )
“দুনিয়ার জীবন খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই না। যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য পরকালের জীবনই অতি কল্যাণময়। তবুও কি তোমাদের বোধোদয় হবে না?"[১০৯]
وَاللَّهُ خَيْرٌ وَأَبْقَى )
“আল্লাহই (পুরস্কার প্রদানে) শ্রেষ্ঠতর ও (শাস্তি প্রদানে) অধিকতর স্থায়ী।”[১১০]
এই আকীদা তার ধারক-বাহকদেরকে দেয় সম্মানজনক জীবন, যাতে অপমান- অপদস্থতার লেশমাত্র নেই। তাদের জীবনে প্রাচুর্যও আসে, সংকীর্ণতাও আসে; জয়ও আসে, পরাজয়ও আসে। কিন্তু কোনোকিছুই তাদের ঈমান থেকে ও জীবনের লক্ষ্য থেকে টলাতে পারে না। কারণ তারা সম্মান আশা করে কেবল মহান প্রতিপালকের কাছ থেকে, যিনি "উচ্চ মর্যাদাশীল, মহান।"[১১১] এবং وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ) “মহাপরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানী।"[১১২] তারা সম্পদ বা প্রভাব-প্রতিপত্তিতে সম্মান খোঁজে না। পৃথিবীর কোনো ক্ষমতার কাছে ইজ্জত চায় না। তারা যেন এই আয়াতের মূর্ত প্রতিচ্ছবি,
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ
“কিন্তু সমস্ত মান-মর্যাদা তো আল্লাহর, তাঁর রাসূলের ও মুমিনদের।”[১১৩]
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ )
"তোমরা হীনবল ও দুঃখিত হোয়ো না। বস্তুত তোমরাই জয়ী থাকবে, যদি তোমরা মুমিন হও।"[১১৪]
এই আকীদা তার অনুসারীদের দেয় দুনিয়ায় শান্তি ও আখিরাতের কামিয়াবি। আল্লাহরই জন্য সকল কষ্ট সহ্য করে তাঁর সাক্ষাৎ লাভের আশায় তাদের রাখে অবিচল।
টিকাঃ
৯১. সূরা আল-আনআম ৬:১৬৪
৯২. সূরা আল-ইখলাস ১১২:১-৪
৯৩. সূরা আশ-শুরা ৪২:১১
৯৪. সূরা ত্বা-হা ২০:৫
৯৫. সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫:২২-২৩
৯৬. সূরা আন-নিসা ৪:৭৮
৯৭. সূরা আয-যুমার ৩৯:৭
৯৮. সূরা আন-নিসা ৪:৭৯
৯৯. সূরা আন-নিসা ৪:৪০
১০০. সূরা আস-সফফাত ৩৭:৯৬
১০১. তিরমিযি: ২৬৭৬, ইবনু মাজাহ: ৪২, আহমাদ: ১৭১৮৪
১০২. সূরা আল-হিজর ১৫:৯
১০৩. সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৬
১০৪. সূরা আন-নিসা ৪:৬৫
১০৫. সূরা আন-নিসা ৪:৫৯
১০৬. সূরা আল-ইসরা ১৭:১৪
১০৭. সূরা আয-যিলযাল ৯৮:৭-৮
১০৮. মুস্তাদরাক আল-হাকিম: ৬৫৭১
১০৯. সূরা আল-আনআম ৬:৩২
১১০. সূরা ত্বা-হা ২০:৭৩
১১১. সূরা আল-বাকারাহ ২:২৫৫
১১২. সূরা আস-সাফ ৬১:১
১১৩. সূরা আল-মুনাফিকুন ৬৩:৮
১১৪. সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৯
📄 যেভাবে বিশ্বাস করি
পরিপূর্ণ ইসলামকে আমরা সেইভাবেই বুঝতে চাই, যেভাবে নবীজি ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ অনুসরণকারী নির্ভরযোগ্য আলেমগণ বুঝেছিলেন।
আমরা নিজেদের 'মুসলিম' পরিচয় দেওয়া যথেষ্ট মনে করি। এর অর্থ হলো, এই উম্মাতের সত্যনিষ্ঠ আলেমগণ ও সালফে সালিহীন ইসলামকে যেভাবে বুঝেছিলেন, আমরাও ঠিক সেভাবেই ইসলামকে বুঝতে চাই। দুঃখের ব্যাপার হলো, 'মুসলিম' বলতে আমরা যা বোঝাতে চাই, আজকের যুগে এই শব্দটি আর সেই একই অর্থ প্রকাশ করছে না। এর ভিন্নরকম অর্থ প্রচলিত হয়ে গেছে। একজন মুসলিমকে ইসলাম সম্পর্কে কতটুকু জানা উচিত, ইসলাম কীভাবে মানা উচিত—এগুলোর ধারণাই পাল্টে দেওয়া হয়েছে। আজকাল 'সমাজতান্ত্রিক মুসলিম', 'উদারপন্থী মুসলিম', 'প্রগতিশীল মুসলিম', 'সেক্যুলার মুসলিম' নামে নতুন নতুন শব্দগুচ্ছ আবিষ্কার হচ্ছে। হুদুদ (ইসলামি পেনাল কোড), হিসবাহ (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ), জিহাদের মতো ইসলামের অনেক মৌলিক বিষয়গুলোই এরা সহ্য করতে পারে না, তারপরও পরিচয় দেয় 'মুসলিম'।
এ থেকেই বোঝা যায় যে নবীজি -এর ওপর ইসলামের যেই বুঝ নাযিল হয়েছিল, আজকের মুসলিমরা আর ইসলামকে সেভাবে বোঝে না। নানা রকম কুফরি-ফাসেকি শক্তি কয়েক শতাব্দী ধরে পরিশ্রম করেছে শুধুমাত্র মুসলিমদের দ্বীনের বুঝকে বিকৃত করে দিতে। এরা চেয়েছে ইসলামের ব্যাপারে মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস নড়বড়ে করে দিতে, দ্বীনের ব্যাপারে হীনম্মন্যতা তৈরি করতে, ঈমান থেকে বের করে পূর্ণ কুফরের দিকে নিতে না পারলেও অন্তত বড়সড় পথভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যেতে। ইসলামের বাস্তবতাকে বিকৃত করতে ও অসংখ্য মুসলিমের ধ্যান-ধারণা অস্পষ্ট করে দিতে তারা অনেকাংশে সফল।
চৌদ্দশ বছর ধরে ইসলামের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকা শত্রুরা ইতিহাস থেকে অনেক কিছু শিখেছে। মুসলিম তলোয়ারের আঘাতে রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের পতন দেখে তারা শিক্ষা নিয়েছে। মঙ্গোলিয়ানদের ধ্বংসযজ্ঞ সিরিয়া, ইরাক, এশিয়া মাইনর পার করে ইসলামি সাম্রাজ্যের প্রায় শেষ সীমা মিশরের পূর্ব দিক পর্যন্ত চলে এসেছিল। এরপর মুসলিমরা কীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাদের পাল্টা আঘাতে একেবারে পর্যুদস্ত করে দিল, সেটাও শত্রুরা দেখেছে। মিশর আর সিরিয়া ভূমিতে দুই শতক ধরে মুহুর্মুহু আছড়ে পড়া ক্রুসেডার জলোচ্ছ্বাসকে মুসলিমরা কীভাবে দমিয়ে দিয়েছে, সেটিও তাদের অজানা নয়। তারা দেখেছে যে, ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে প্রাচ্যের দিকে চীনদেশের অধিবাসীদের কাছ থেকে জিযিয়া নিতে শুরু করেছে, ওদিকে পশ্চিমে ইউরোপের প্রাণকেন্দ্র স্পেন জয় করে ভিয়েনার ফটক পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
শত্রুরা বুঝে গেছে যে ইসলামের পাক্কা অনুসারীরা যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন ইসলাম বিজয়ী হতেই থাকবে। এমন সব অনুসারী, যারা আরব-অনারব-সাদা-কালো নির্বিশেষে সকলেই ইসলামকে একমাত্র সঠিক জীবনব্যবস্থা বলে বিশ্বাস করে।
وَيَوْمَئِذٍ يَفْرَحُ الْمُؤْمِنُونَ بِنَصْرِ اللَّهِ يَنصُرُ مَن يَشَاءُ وَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ ﴿٤﴾
"সেদিন মুমিনরা আনন্দ করবে আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে। যাকে ইচ্ছে তিনি সাহায্য করেন। তিনি মহাপরাক্রমশালী, বড়ই দয়ালু।” [১১৫]
প্রতিপক্ষ যত শক্তিশালী আর অস্ত্রসজ্জিতই হোক, ইসলামের নিষ্ঠাবান অনুসারীদের আল্লাহ বিজয় দিতেই থাকবেন এই বাস্তবতা আমাদের শত্রুদের সামনে প্রতিভাত হওয়ার পর তাদের মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম হয়। এজন্য তারা "রাগে নিজেদের আঙুলের মাথা কামড়াতে থাকে।" [১১৬] এবং নানা রকম চক্রান্ত করতে থাকে। "কিন্তু তাদের চক্রান্ত আল্লাহর নজরেই আছে, যদিও তাদের পরিকল্পনা পাহাড়ও টলিয়ে ফেলার মতো হয়।" [১১৭] আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে রক্ষা করলেন আর তাদের সব চক্রান্ত ভেস্তে দিলেন। “এটা আমাদের প্রতি ও সমগ্র মানবজাতির প্রতি আল্লাহর রহমত।”[১১৮]
উপায় না দেখে শত্রুরা এবার চিন্তার ময়দানে নেমে পড়ে। মুসলিমদের মনে ইসলামের প্রতিচ্ছবিকে বিকৃত করতে তারা মরিয়া হয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ শুরু করে। এর শুরুটা হয়েছিল কুরাইশদের হাতেই। তারা নবীজি -কে কবি, গণক, পাগল ইত্যাদি বলে অপপ্রচার চালাত। সেই জাহিলিয়াতের জের ধরেই ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সেই একই যুদ্ধ এখনো চালানো হচ্ছে। মুসলিমদের মনের মধ্যে ছুরিকাঘাত করে ইসলামের ব্যাপারে ধারণা পাল্টে দেওয়া হচ্ছে। অনেক মুসলিমই এভাবে তাদের শিকারে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয় যখন আমাদেরই মধ্য থেকে কিছু মানুষ বের হয়ে গিয়ে ইসলামের শত্রুদের দলে যোগ দেয়। তারা হয়ে ওঠে জাহান্নামের দরজার দিকে আহ্বানকারী, আমাদের শত্রুদের পণ্যের বিজ্ঞাপনদাতা আর তাদের হয়ে তীর নিক্ষেপকারী। শত্রুদের কাছে কোনোরকম কৃতজ্ঞতা বা পুরস্কারের আশা না করেই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে আমাদের দেশের সরকারগুলো তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে থাকে।
বিপুলসংখ্যক মুসলিমের মনে ভুল ধারণা গেড়ে বসার পরও তা হলে এই দ্বীনের প্রহরায় কারা এগিয়ে আসতে পারে? মুসলিম বুদ্ধিজীবীরাই তো শত্রুদের মুখপাত্র আর ভ্রান্ত মতাদর্শের প্রচারক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শত্রুদের এজেন্টদের জন্য আমাদের সরকারগুলো নিরাপত্তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ করতেও দ্বিধা করছে না। অতি অল্পসংখ্যক মানুষ সত্যকে আঁকড়ে ধরে আছে। অন্তরে সত্য আঁকড়ে থাকা অনেক মানুষই আবার বাস্তবতার ময়দানে পথভ্রষ্টতার এই ঢেউয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে অপারগতা প্রকাশ করছে। ফলস্বরূপ, তারা ইসলামের এই বিকৃত রূপকে মৌখিক স্বীকৃতি দিয়ে পথভ্রষ্টদের মিছিলের তালে তালেই হাঁটা দিয়েছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইসলামের কর্মীদের উচিত ছিল ঔষধ প্রয়োগ করা। কিন্তু তারাই উল্টো রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। এদের কেউ ইসলামকে কিছু আচার-প্রথার সমষ্টি হসেবে মেনে নিয়েছে, সালাত ও দুআর বাইরে কোনো দাওয়াত প্রচারকেই গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে না। যেন জিহাদ, হিসবাহ, শরিয়ার আইন দিয়ে শাসনের বিধানগুলো পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবগুলোর মতো মানসুখ (রহিত) হয়ে গেছে। অনেকেই বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী ও কুসংস্কার ছেড়ে আসার দাওয়াত দেয়। অথচ যেসব সেক্যুলার শাসক মানবরচিত আইন দিয়ে শাসন করে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে, তাদের ব্যাপারে টু শব্দও করে না।
কেউ আবার ইসলামি জ্ঞান শেখা ও শেখানোকে গুরুত্ব দেয়, কিন্তু দাওয়াত ও জিহাদ-প্রসঙ্গ এলে আর কিছু বলে না। কেউ কেউ পানাহার, পোশাক-আশাক, বিবাহ-শাদির ব্যাপারে রাসূল -এর সুন্নাহকে পুনর্জীবিত করার চেষ্টায় থাকলেও জিহাদ, শাসন ও বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে রাসূল -এর সুন্নাতের কথা বলে না। অনেকে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে জিহাদের জন্য হাঁকডাক ছাড়তে থাকে, কিন্ত জিহাদ ও ইসলামি রাজ্যশাসন করার মতো আত্মিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল গড়ে তোলার দিকে নজর দেয় না। এভাবে খণ্ডিত দ্বীনের অনুসারী হয়ে কোনো অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হয় না।
মুসলিমরা একের পর এক পরাজয়ের স্বীকার হচ্ছে। আমজনতা কেবল নির্বাক চেয়ে চেয়ে দেখছে। অল্প কিছু কর্মী অসহায়ভাবে হতবিহ্বল অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ইসলামকে পরাজয় থেকে বিজয়ের পানে নিয়ে যেতে হলে রোগের কারণ খুঁজে বের করে যথাযথ ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে, এখন তা যত তেতোই হোক না কেন।
وَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ
"কিন্তু তোমরা যা অপছন্দ করো, তা হয়তো কল্যাণকর।”[১১৯]
আমাদের ইসলামের বুঝ কেমন হওয়া উচিত, সেই আলোচনায় যাবার আগে মুসলিমরা কোন জায়গায় ভুল বোঝাবুঝিতে লিপ্ত সেটা পরিষ্কার করে বলা দরকার। এই বিষাক্ত ভুলের পেছনে কারা আছে, কারা একে সমর্থন দিয়ে পরিপুষ্ট করছে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা উচিত। কোন জায়গা থেকে আমাদের লক্ষ্য করে তির মারা হচ্ছে, সেটা তা হলে বের হয়ে আসবে। আমাদের পূর্ববর্তীরা যে ভুল করেছে, তার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সে ব্যবস্থা করা লাগবে। মুসলিমদের এই সুপরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের বিরুদ্ধে সচেতন করতে হবে। আমাদের এই তুচ্ছ প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য থাকবে সত্যনিষ্ঠ পূর্বসূরিদের অনুরূপ দ্বীনের বুঝসম্পন্ন একটি প্রজন্ম গড়ে দিয়ে যাওয়া। এক সুদূর পরাহত লক্ষ্যকে আবারো কাছে নিয়ে আসার জন্য এই প্রজন্ম কাজ করবে সালাফগণের বিশ্বাস ও কর্মপদ্ধতি অনুযায়ী।
ইসলামের অর্থ হলো জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি বশ্যতা স্বীকার, আনুগত্য ও পূর্ণ আত্মসমর্পণ। নবীজি -এর সুন্নাহর অনুসরণও এর অন্তর্ভুক্ত। এতে রয়েছে আমাদের জীবন পরিচালনায় অপরিহার্য আদেশ-নিষেধ ও নিয়ম-কানুন। রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে মানবজাতির সকল বিষয়াদির পূর্ণাঙ্গ সমাধান।
সংক্ষেপে এটিই হলো দ্বীন ইসলামের সেই বুঝ, যা নবীজি -এর ওপর নাযিল হয়েছিল, যেভাবে সালফে সালিহীন একে বুঝেছিলেন, এবং যেমনটা আমরা এই উম্মাহর সত্যনিষ্ঠ আলেমগণের কাছ থেকে শিখেছি। আমাদের আকীদা একেই সত্যায়ন করে যে “আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা।”[১২০] তিনি সবকিছুর ব্যাপারে সম্যক অবগত। যা হয়েছে, যা হবে, আর যা হওয়ার নয়, তার সবই তিনি জানেন। "তিনি যাবতীয় অদৃশ্যের ব্যাপারে জ্ঞানী। আকাশ ও পৃথিবীতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুকণা বা তার চেয়ে ছোট-বড় কোনোকিছুই তাঁর থেকে লুক্কায়িত নেই। সবই সংরক্ষিত আছে এক সুস্পষ্ট কিতাবে।”[১২১] কথা, কাজ ও বিধানের ব্যাপারে তিনি সকল প্রজ্ঞার অধিকারী। বান্দার জন্য আজ কোনটা ভালো, কাল কোনটা ভালো এ ব্যাপারে তিনি পূর্ণ অবগত। মুহাম্মাদ -এর নবুয়্যাত হলো ওহির ধারায় শেষ সীলমোহর। কিয়ামাত পর্যন্ত আগমনরত পুরো মানবজাতির ওপর এই দ্বীন প্রযোজ্য। সকল মানুষ এই দ্বীন মেনে চলার আদেশপ্রাপ্ত।
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا "বলুন (হে মুহাম্মাদ!), 'হে মানব-সম্প্রদায়! নিশ্চয় আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল!” [১২২]
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ "আর যে-কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দ্বীন সন্ধান করে, এটি তার কাছ থেকে কখনোই কবুল করা হবে না। আর আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” [১২৩]
আল্লাহর এই বাণী থেকেই স্পষ্ট হয় যে, এই আসমানী জীবনব্যবস্থা সমগ্র মানবজাতির জন্য। মানুষের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। কোনটিতে মানুষের কল্যাণ, তা এই দ্বীনই বলে দেবে। আমাদের বিশ্বাস, আনুগত্য, নৈতিকতা, রাষ্ট্রীয় কর্মনীতি ও বিশ্বাস, সামাজিক নেতৃত্ব, বিবাদ মীমাংসা, বিচার-ফয়সালা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এই দ্বীনের ভিত্তিতে তৈরি হবে।
এভাবেই নবীজি জীবন পরিচালনা করেছেন। তিনি ছিলেন রাসূল, দাঈ, শাসক, বিচারক, শিক্ষক, সেনাপতি, এবং সালাতের ইমাম। খুলাফায়ে রাশেদীনও ঠিক এই রীতি মেনে চলেছেন। আবু নাজীহ ইরবায রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “একবার আল্লাহর রাসূল এমন খুতবা দিলেন যে আমাদের অন্তর ভীত হয়ে গেল, চোখ অশ্রুসজল হয়ে গেল। আমরা বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! মনে হচ্ছে যেন এটি শেষ খুতবা। তাই আমাদের কিছু উপদেশ দিয়ে যান।' রাসূল বললেন, 'আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি আল্লাহকে ভয় করার এবং কোনো দাসও যদি তোমাদের নেতা হয় তার অনুসরণ করার। নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে যারা (দীর্ঘদিন) বাঁচবে, তারা প্রচুর মতবিরোধ দেখতে পারবে। অতএব, তোমরা অবশ্যই আমার সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরে থাকবে। দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত বিষয় থেকে সাবধান। কারণ প্রতিটি নতুন বিষয়ই বিদআত, প্রতিটি বিদআতই পথভ্রষ্টতা এবং প্রতিটি পথভ্রষ্টতাই জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।" [১২৪]
আমাদের নবীজি সকল শিক্ষা পেয়েছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে। খুলাফায়ে রাশেদীন নবীজির দৃষ্টান্ত ছাড়া আর কোনোকিছুই অনুসরণ করেননি। এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, মানবজীবনের সকল ক্ষেত্র পরিচালনার জন্য নবীজির দেখানো পথ অনুসরণই যথেষ্ট। সালাফে সালেহীন এরকমই করে গেছেন।
আল্লাহ বলেছেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবুল করে নিলাম।" [১২৫]
এই আয়াতাংশ তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। ইসলাম যে পূর্ণাঙ্গ, বোধগম্য এবং জীবনের সকল সময়ের সকল স্থানে বাস্তবায়নযোগ্য, তার দলিল হিসেবে প্রতিটি অংশই আলাদা আলাদাভাবে যথেষ্ট।
'দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা' বলতে বোঝায়, ইসলামে কোনো ছোট-বড় বিষয়কেই অগ্রাহ্য করা হয়নি। সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে আলোচিত হয়েছে। এ থেকে আরো বোঝা যায় যে আকীদা, অর্থনীতি, রাজনীতি, শান্তি, যুদ্ধ, সরকার-কোনো বিষয়েই, কোনো সময়েই, কেউই নতুন কিছু যোগ করে দাবি করতে পারবে না যে, সে ইসলামকে পূর্ণতা দিয়েছে।
'অনুগ্রহের পূর্ণতা'র অর্থ হলো ইসলামের চেয়ে পূর্ণাঙ্গ ও শ্রেষ্ঠতর কিছুই নেই। কারণ এই দ্বীনে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি নেই।
'দ্বীন হিসেবে ইসলামকে নির্ধারণ করা'র অংশ থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ তাঁর বান্দার জন্য কোনো ত্রুটিপূর্ণ দ্বীন পছন্দ করেন না। মুহাম্মাদ -এর প্রতি নাযিল হওয়ার সময় থেকে নিয়ে কিয়ামাত পর্যন্ত আল্লাহ ইসলামকে আমাদের দ্বীন হিসেবে কবুল করে সন্তুষ্ট। কেউ যেন এমন না বলে যে, ইসলাম একটা যুগে পরিপূর্ণ ও সন্তোষজনক ছিল কিন্তু এখন আর তেমনটা নেই। এমনটা বলার অর্থ হলো যে, আল্লাহ মানবজাতিকে সৃষ্টি করে তাদের দেওয়ার মতো চিরস্থায়ী ও সর্বব্যাপী কোনো সমাধান খুঁজে পাননি, সময় ও পরিস্থিতির পরিবর্তনে এমন সমস্যার উদ্ভব হয়েছে যা সম্পর্কে সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান আল্লাহর কোনো ধারণাই ছিল না (নাউযুবিল্লাহ)।
سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ “আল্লাহ (এ অপবাদ থেকে) পবিত্র ও মহান! এটা তো এক গুরুতর অপবাদ।" [১২৬]
এটি এমন এক দ্বীন, যা মেনে চলার জন্য কিয়ামাত পর্যন্ত আসন্ন সকল মানুষকে হুকুম করা হয়েছে।
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ "আল্লাহ ছাড়া কোনো বিধানদাতা নেই।" [১২৭]
وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ "আর তোমরা যেসব বিষয়ে মতভেদ করো, তার মীমাংসা আল্লাহর ওপর সোপর্দ।" [১২৮]
তা হলে কীভাবে এসব নিকৃষ্ট দাবি করা যায় যে, ইসলাম দিয়ে সবকিছুর সমাধান সম্ভব না, প্রয়োজনে এর মৌলিক শিক্ষাগুলো থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে কাজ করতে হবে? বদ্ধ উন্মাদ ছাড়া আর কেউই দাবি করতে পারে না যে সে অর্থনীতি, রাজনীতি, শান্তি, যুদ্ধ, বিশ্বাস ও উপাসনার ক্ষেত্রে ইসলামের চেয়ে ভালো ও পূর্ণাঙ্গ কোনো বিধান নিয়ে আসবে। এমনকি কেউ যদি এমন দাবি করেও বসে, তা হলেও কি আমরা কখনো ইসলাম ছেড়ে সেই পথভ্রষ্টের দিকে দৌড়ে যাব?
ব্যাপকতা, পূর্ণতা, মর্যাদা, পূর্ণাঙ্গতা, প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচার, সূক্ষ্মতা, সহজতা ও ব্যবহারিক প্রয়োগযোগ্যতার দিক দিয়ে ইসলামের চেয়ে উত্তম কোনো বিধান না কখনো মানবজাতি জানত, আর না কখনো জানবে। এটাই রূঢ় বাস্তবতা। ইসলাম জীবনের সর্বব্যাপী। এ হলো কলম-তরাবারি, ইলম-আমল, আকীদা-শরিয়াহ, নীতি ও রাজনীতি, কাজ ও প্রতিদান, দুনিয়া ও আখিরাত।
مَّا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِن شَيْءٍ "কিতাবে আমি কোনোকিছুই বাদ দিইনি।" [১২৯]
ইসলামে রয়েছে আকীদা-বিষয়ক নির্দেশ:
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا "আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক কোরো না।" [১৩০]
রয়েছে ইবাদতের পদ্ধতি: حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ "তোমরা (ফরয) সালাতের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষত মধ্যবর্তী সালাতের (আসর) প্রতি এবং আল্লাহর সামনে বিনীতভাবে দণ্ডায়মান হও।”[১৩১]
শয়তান ও কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আদেশ : وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ "শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না।" [১৩২]
أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا “তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখো না, যে আপন কামনা-বাসনাকে নিজের উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে?”[১৩৩]
পিতামাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ : وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "আর পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করো।”[১৩৪]
জ্ঞানার্জনের উৎসাহ : وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا "আর বলো, 'হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।”[১৩৫]
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ "তাদের বলো (হে মুহাম্মাদ!), 'যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান?”[১৩৬]
সার্বিক সদাচরণের নির্দেশ :
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا “এবং মানুষের সাথে সদালাপ করবে।”[১৩৭]
আল্লাহর আইন দিয়ে শাসন করার নির্দেশ :
وَأَنِ احْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ “অতএব, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী তুমি তাদের মধ্যে বিচার- ফয়সালা করো।" [১৩৮]
মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা এবং এই দ্বীনের প্রচার-প্রচারণা-তাবলীগের নির্দেশ :
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ “তোমার প্রতিপালকের দিকে (মানুষকে) ডাকো জ্ঞান-বুদ্ধি ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করো উত্তম পন্থায়।" [১৩৯]
সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ :
وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ * "তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল হোক, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করে, সৎকাজের আদেশ করে এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করে। আর এরাই সফলকাম।" [১৪০]
আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করার বিধান:
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهُ لَّكُمْ “তোমাদের ওপর যুদ্ধ বাধ্যতামূলক করা হলো, যদিও তোমরা তা অপছন্দ করো।" [১৪১]
সৎকাজে সৎ উদ্দেশ্যে সাহায্য-সহযোগিতা করার আদেশ:
فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا ﴾
“আর যে তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন সৎকাজ করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক না করে।”[১৪২]
কর্ম ও এর প্রতিদানের বর্ণনা:
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ ﴿ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ ﴾
“অতএব, যে অণু পরিমাণ সৎকর্ম করে সে তা দেখতে পাবে। আর যে অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করে, সেও তা দেখতে পাবে।”[১৪৩]
মুসলিম শাসকের আনুগত্য করার বিধান :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর অনুগত হও এবং রাসূলের অনুগত হও ও তোমাদের মধ্যকার কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তিগণের।" [১৪৪]
দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার করার হুকুম :
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ
“নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন হকদারকে তার প্রাপ্য হক তাদের কাছে পৌঁছে দিতে। এবং তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে।" [১৪৫]
নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে স্বেচ্ছাচারিতা না করে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার হুকুম:
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ “কাজকর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো।”[১৪৬]
ইসলাম যেমন ব্যক্তির সাথে প্রতিবেশীর দায়িত্ব-অধিকার নিয়ে আলোচনা করে, তেমনি প্রতিবেশী অমুসলিম জাতিগুলোর সাথে মুসলিম জাতির আচরণবিধিও বর্ণনা করে। বিয়ে, (সন্তান) পরিচর্যা ও তালাকের মতো পারিবারিক বিষয় থেকে শুরু করে সামাজিক জীবনযাপনের ব্যাপারেও বিধিবিধান দেয়। শাসক ও শাসিতের মধ্যে সম্পর্কের রূপরেখা ঠিক করে দেয়। অর্থের লেনদেন এবং আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্র নির্ধারণ করে দেয়। প্রত্যেককে তার নিজ কাজকর্মের পাহারাদার হিসেবে নিযুক্ত করে, কারণ আখিরাতে সকলেই এগুলোর ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। আল্লাহর অবাধ্যতার পরিণাম সম্পর্কে সঠিক বুঝ অন্তরে পয়দা করে। কেউ সীমালঙ্ঘন করলে তার শাস্তি কতটুকু হবে, সেটাও নির্ধারণ করে দেয়। মোটকথা, একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কাঠামোর মধ্যে থেকে ইসলাম মানবজাতির জীবনের সকল বিষয়ের সমাধান দেয়। এমন একটি জীবনব্যবস্থাকে কী করে অন্য কোনো জীবনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে? আল্লাহ বলেন :
أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ ® “যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানবেন না? তিনি অতি সূক্ষ্মদর্শী ও ওয়াকিবহাল।”[১৪৭]
ইসলামকে আংশিক বানিয়ে ফেলার যে-কোনো প্রচেষ্টাই অমার্জনীয় পাপ, কারণ এর মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাটিই ধসে পড়বে। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস বাদ দিয়ে ইসলামি কাজকর্ম করা যায় না, আবার ইসলামি কর্মকাণ্ড বাদ দিলে শুধু বিশ্বাসের কোনো কার্যকারিতা থাকে না। মানুষের পারস্পরিক আচার-আচরণের ইসলামি নীতি বাদ দিয়ে কেবল ইসলামি আচার-অনুষ্ঠান পালন করলেও সেটা আর ইসলাম থাকতে না। আমাদের মুসলিমদের কখনোই উচিত হবে না ইসলামের কিছু অংশ গ্রহণ করে অপর কিছু অংশ বাদ দিয়ে দেওয়া। এমনটা করলে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই বরবাদ হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন:
وَأَنِ احْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ وَاحْذَرْهُمْ أَن يَفْتِنُوكَ عَن بَعْضِ مَا أَنزَلَ اللَّهُ إِلَيْكَ
"আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী তুমি তাদের মাঝে বিচার- ফয়সালা করো। তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ কোরো না। আর তাদের থেকে সতর্ক থাকো; যেন আল্লাহ যা কিছু নাযিল করেছেন, তার কোনো কিছু থেকে তারা তোমাকে ফিতনায় ফেলতে না পারে।"[১৪৮]
ইসলাম পরিপূর্ণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ দ্বীন বলেই এটি মানবজীবনকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করতে সফল হয়। এর কোনো অংশ বাদ দিলে বা পরিবর্তন করলে তা আর সফল হতে পারে না। তার ওপর আধুনিক বিশ্ব এত এত চাহিদা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে যে, ইসলামের সকল অংশকে গ্রহণ না করলে আমরা এগুলোর মোকাবিলা করতে পারব না।
আমাদের সঠিক আকীদা-সম্পন্ন হতে হবে, যেন আমাদের হৃদয় হয় আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়চেতা। এর ফলে আমরা আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করে সব বাধা অগ্রাহ্য করে আমাদের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারব। এমন আকীদার দিকেই আমরা মানুষকে ডাকি এবং এরই শিক্ষা দিই।
ফরয-নফল সকল রকম ইবাদতই আমাদের করতে হবে। কারণ পরকালের চিরস্থায়ী জীবনে এগুলোই আমাদের সাথে যাবে। পাথেয় ছাড়া ভ্রমণ কী করে সম্ভব? এই ইবাদত তথা নেক আমলের ফলে আমাদের অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানের বিরুদ্ধে এগুলো আমাদের হাতিয়ার। নিজেরা তা পালন করা ও অন্যদেরকে এর দিকে ডাকার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করি।
আল্লাহ যেভাবে চান, সেভাবে তাঁর ইবাদত করার জন্য ইলম তথা ইসলামি জ্ঞান অর্জন করতে হবে। সরল পথ থেকে যাতে বিচ্যুত না হয়ে যাই, তার জন্য জ্ঞান অপরিহার্য। নাহলে আমরা তাদের মতো হয়ে যাব "দুনিয়ার জীবনে যাদের চেষ্টা সাধনা ব্যর্থ হয়ে গেছে আর তারা নিজেরা মনে করেছে যে তারা অনেক ভালো কাজ করছে।”[১৪৯] তাই আমাদের লক্ষ্য হলো নিজেরা জ্ঞান অর্জন করে অপরকেও শিক্ষা দেওয়া।
আমাদের আচার-আচরণ যেন সঠিক ও সুন্দর হয়, সেজন্য আমাদের উত্তম চরিত্র অর্জন করতে হবে। শরিয়ত যার সাথে যখন যেভাবে আচরণ করতে বলেছে, তার সাথে তখন সেভাবেই আচরণ করতে হবে। জাহিলি আচরণের কাদায় পিছলে পড়া যাবে না। আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকতে হবে নিজের ও আমাদের আশপাশের মানুষদের চরিত্র পরিশুদ্ধ করার।
ইসলামের এই বার্তাকে সমগ্র মানবজাতির কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কাফিরকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত, মুসলিমকে সঠিকভাবে নেক আমল করার দাওয়াত, গুনাহগারকে তাওবা করার দাওয়াত দিয়ে যেতে হবে। ইসলামের প্রচার-প্রসার না করা হলে এর বিশুদ্ধ বার্তা হারিয়ে যাবে। বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদের প্রচারণা ইসলামের দাওয়াতকে ঢেকে দেবে। তাই মানুষের কাছে এই দ্বীনের তাবলীগ করতে হবে, জান্নাতের সুসংবাদ ও জাহান্নামের ব্যাপারে সতর্কতা জানাতে হবে।
সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করতে হবে। অন্যথায় ইসলামের দাওয়াত ধ্বংস হয়ে যাবে। যতরকম অসৎকাজ আমাদের চোখে পড়ে সেগুলো দূর করতে এবং যতরকম সৎকাজ থেকে আমরা বঞ্চিত সেগুলো অর্জন করতে কঠোর প্রচেষ্টা করতে হবে। এই প্রচেষ্টা হবে ইসলামি আইন ও আলেমগণের শিক্ষা অনুযায়ী।
আমাদের জিহাদ করতে হবে। কারণ জিহাদ ছাড়া কখনোই ইসলামের পতাকা উত্তোলন এবং কুফরি শক্তিগুলোর প্রভাব-প্রতিপত্তি খতম করা যাবে না। আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে মানবরচিত আইন দিয়ে শাসন করা শাসকদেরকে হটিয়ে পুনরায় খিলাফাত প্রতিষ্ঠা করার জন্য জিহাদ অপরিহার্য। এ ছাড়া, আমাদের যেসব ভূখণ্ড কাফিররা দখল করে নিয়েছে, সেগুলো পুনরুদ্ধারের পথও জিহাদ। আমাদের নিজেদের জিহাদের প্রস্তুতি নিতে হবে এবং মুমিনদের এর জন্য উৎসাহিত করতে হবে। আমাদের ছোট-বড় সকল বিষয়ে নবীজি ﷺ-এর দেখানো পদ্ধতি মেনে চলতে হবে। এর ফলে আমাদের অন্তরে নবীর প্রতি ও আল্লাহর দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। এটি আল্লাহকে ভালোবাসার একটি নিদর্শন :
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمُ
“(হে মুহাম্মাদ! মানবজাতিকে) বলো, তোমরা যদি (সত্যিই) আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো, তা হলে আমার অনুসরণ করো। আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি মার্জনা করে দেবেন। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" [১৫০]
আমাদের নবীজির পথ অনুসরণের সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে ও অন্যদেরও এর দিকে ডাকতে হবে। আমাদের সকল বিষয়ে আল্লাহর আইনের শরণাপন্ন হওয়া অপরিহার্য। আমাদের দায়িত্ব হলো এর দিকে আহ্বান জানানো ও আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করার জন্য জিহাদ করা।
এই সবকিছু এবং আরো যা কিছুর হুকুম ইসলাম আমাদের দেয়, সেই সবকিছুই আমাদের পালন করতে হবে। এর যে-কোনো একটি অংশ ছেড়ে দেওয়ার অর্থই হলো আমাদের আন্দোলনের ব্যর্থতা ও পরাজয়কে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা। কারণ আল্লাহ তাঁর রাসূল -এর ওপর নাযিলকৃত এই দ্বীনকে বিজয়ী করার ওয়াদা করেছেন ঠিকই। কিন্তু এই বিজয় তিনি তাদেরই দেবেন, যারা এই দ্বীনকে সঠিকভাবে আঁকড়ে ধরে থাকে:
وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ
“আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশক্তিমান, মহাপরাক্রান্ত।" [১৫১]
উল্টোদিক থেকে বললে, অন্য সব নব-উদ্ভাবিত ও আল্লাহর কাছে অগ্রহণযোগ্য মতাদর্শ কখনোই বিজয় বা গৌরবের অধিকারী হবে না। ইসলামের অপরিহার্য কোনো অংশকে বর্জন করলে সেটা আর ইসলাম থাকে না বরং অন্য মতাদর্শের মতোই হয়ে যায়। তা হলে আমাদের ইসলামকে কাটছাঁট করার সাহস কীভাবে হয়? আমাদের আর কী অজুহাত থাকতে পারে? যখন আমাদের প্রতিপালক বলেই দিয়েছেন:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ নِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবুল করে নিলাম।”[১৫২]
ইসলামের কোনো অংশকে আলাদা সরিয়ে রেখে সেটাকে ইসলাম-বহির্ভূত দাবি করার কোনো অধিকার বান্দার নেই। অথবা ইসলামের কোনো একটি অংশকে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম বলে দাবি করারও কোনো অধিকার নেই। আল্লাহ খুব কড়া ভাষায় আমাদের এসব করতে নিষেধ করে দিয়েছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْফُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِ الْعَذَابِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
“তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস করো আর কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করো? অতএব তোমাদের মধ্যে যে এমনটা করে, তাদের পার্থিব জগতে লাঞ্ছনা-অবমাননা ছাড়া আর কী প্রতিদান হতে পারে? এবং কিয়ামাতের দিন তারা কঠিন শাস্তির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে। আর তারা যা করে, তা সম্পর্কে আল্লাহ অনবহিত বেখবর নন।"[১৫৩]
কত নাদান যে আজকাল আল্লাহর কিতাব, নবীজি -এর সুন্নাহ ও সালাফগণের বুঝের ওপর নিজেদের ধ্যান-ধারণাকে স্থান দিতে শুরু করেছে তার ইয়ত্তা নেই। অনেকে আছে যারা ইসলামের প্রাথমিক যুগের জন্য প্রযোজ্য নিয়মগুলোই কেবল আঁকড়ে ধরে থাকে। কেউ কেউ 'মাক্কী যুগে'র অজুহাত দেয়, কেউ শুধু গোপনে ইসলাম প্রচারকে যথেষ্ট মনে করে, কেউ শুধু 'রক্ষণাত্মক জিহাদে'র বিধানকে স্বীকার করে। অনেককে দেখে তো আবার মনে হয় এখনো ওহি নাযিলই হয়নি! এরকম প্রতিটা মানুষই ইসলামের কোনো না কোনো অংশকে বাদ দিয়ে হিসবে করে। কেউ হিসবাহ অস্বীকার করে, কেউ জিহাদ এড়িয়ে চলে, কেউ দাওয়াত দেয় না, আর কেউ পুরো ইসলামকেই ত্যাগ করে বসেছে। এই সব লোক ও তাদের মিথ্যাচারের মুখোশ উন্মোচন করা আমাদের দায়িত্ব। এদেরকে অবশ্যই আল্লাহকে ভয় করার নসিহত করতে হবে এবং পূর্ণাঙ্গ ইসলামে ফিরে আসার আহ্বান জানাতে হবে।
আল্লাহর কসম! এরা ইসলামের একেক অংশ অস্বীকার করে কেবল নিজেদের ভীরুতা ও অলসতার কারণেই। ইসলামের যেসব অংশকে তাদের খেয়াল-খুশির বিরুদ্ধে মনে হয় না, সেগুলোকেই কেবল তারা নির্দ্বিধায় মানে। তারা যদি ইসলামকে কাটছাঁট না করে নিজেদের ভীরুতা ও অলসতার কথা স্বীকার করে নিত, তা হলে সেটাই তাদের জন্য কল্যাণকর হতো। কিন্তু না! তারা ইসলামকে কাটছাঁট করে নিজেদের ভীরুতা ও অলসতার সাথে মানিয়ে নিয়েছে।
এখানেই শেষ না। তারা এই দাবি করারও সাহস পায় যে, তাদের এই কর্মপদ্ধতিই নাকি বেশি প্রজ্ঞাপূর্ণ। নেতা-বুদ্ধিজীবী-দার্শনিক-তাত্ত্বিক হিসেবে তাদের পদগুলো যতদিন টিকে আছে, ততদিন আল্লাহর দ্বীন বিকৃত হলো কি হলো না এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
এই লোকগুলোর মুখোশ উন্মোচন করা জরুরি। কারণ তারা ইসলামকে রক্ষা করার মৌখিক দাবি করছে, অথচ ইসলামের ভিত্তিকে নিজেরাই গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। এরা ইসলামকে ভাঙচুর করে, অথচ দাবি করে একে নির্মাণ করার। এরা ইসলামকে প্যারালাইজড করে দেয়, নিরস্ত্র করে ফেলে, পঙ্গু করে দেয়, তারপর দোর্দণ্ড জাহিলিয়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিয়ে দেয়। এরপর তাদের এই বিকলাঙ্গ ইসলাম যখন পরাজিত হয়, তখন মানুষ ভাবে যে আল্লাহর দ্বীন ইসলাম পরাজিত হয়ে গেছে।
একটা প্রশ্ন জাগে। ইসলাম কি এতই অসহায় যে, কিছু লোক 'বুদ্ধিবৃত্তিক খবরদারি' না করলে এর চলেই না? অথচ এসকল বুদ্ধিজীবীরাই তো কুরআন-সুন্নাহ-ইজমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইসলামের কিছু অংশ মুছে ফেলার ও পরিবর্তন করার 'মহান' দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে।
سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يَقُولُونَ عُلُوًّا كَبِيرًا )
“তিনি (আল্লাহ) পবিত্র ও অতি উচ্চ, তারা যা বলে তা থেকে অনেক অনেক ঊর্ধ্বে।"[১৫৪]
নিশ্চয় আল্লাহ ভালো করেই জানেন ইসলামকে কীভাবে সাজাতে হবে, কীভাবে এর অনুসারীদের জীবনকে পরিচালিত করতে হবে, কীভাবে শিক্ষা দিতে হবে, এবং গুরুত্বের ভিত্তিতে কাজের ক্রম কীভাবে নির্ধারণ করতে হবে। আল্লাহ ভালো করেই জানিয়ে দিয়েছেন জাহিলিয়াতকে কখন আক্রমণ করতে হয়, কখন আক্রমণ না করে সুযোগের অপেক্ষা করতে হয়। এই উম্মাতের সত্যনিষ্ঠ আলেমগণ এই সব বিষয় ধরে ধরে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। আর সব যুগেই এমন আলেম থাকবেন যারা এই বিশুদ্ধ বার্তা মানুষের কানে পৌঁছে দেবেন। আর যারা ভ্রান্ত মত-পথ আর নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে, ইসলাম তাদের ছাড়াই চলতে পারবে। তাদের 'অভিভাবকগিরি' আর তত্ত্ব-দর্শনের কোনো প্রয়োজনীয়তা ইসলামের নেই। দাওয়াত ও জিহাদের ময়দানে এরা মূল্যহীন। ইসলাম চায় একনিষ্ঠ অনুসারী, যারা এতে কোনো পরিবর্তন, সংকোচন বা পরিবর্ধন সাধন করবে না।
যারা ইসলামের ওপর 'অভিভাবকগিরি' করতে চায়, তাদেরই বরং উচিত ইসলামকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যের চিকিৎসা করা। নিজেদের বুদ্ধিহীনতার কারণেই তারা ইসলামের উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জ্ঞানকে আয়ত্ত করতে পারেনি। এজন্যই তারা ইসলামকে নিজেদের পর্যায়ে নামিয়ে আনতে চায়।
ইসলামের শিক্ষা এবং মুসলিম আলেমগণের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি যে, জিহাদ করার সামর্থ্য না থাকলে তখন আর জিহাদ করা ফরয থাকে না। কিন্তু তখন জিহাদের সামর্থ্য অর্জন করাটাই ফরয হয়ে যায়। কোনো অসৎকাজের নিষেধ করতে গেলে যদি ফলস্বরূপ এর চেয়েও অসৎ কোনো কাজ শুরু হয়ে যায়, তা হলে ওই ক্ষেত্রে অসৎকাজের নিষেধ স্থগিত রাখতে হয়। অসৎকাজের নিষেধ করাটাই তখন নিষেধ। কিন্তু এগুলো হলো বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিশেষ বিধান। তাই বলে দুর্বলতার অজুহাত দিয়ে হিসবাহ কিংবা জিহাদকে একেবারে চিরতরে ত্যাগ করা, নতুন বিধান আবিষ্কার করা বা ইসলামের মানসুখ (রহিত) বিধানগুলো পুনরায় চর্চা করতে শুরু করা—এ সবই অমার্জনীয় অপরাধ। এমন অবস্থান গ্রহণের অর্থ হলো নিজেদের দুর্বল অবস্থাকে চিরস্থায়ী করার চেষ্টা করা। আল্লাহ তাআলা যখন দ্বীনকে পূর্ণ করেই দিয়েছেন, তখন এর বিধিবিধানগুলো আমাদের ওপর চিরতরে আবশ্যক হয়ে গেছে। কোনো একটা সময়ে এসে যদি আমরা নিজেদের দুর্বল অবস্থায় আবিষ্কার করি, তা হলে দুর্বলতা কাটিয়ে সবল অবস্থায় ফেরার জন্য চেষ্টা করতে হবে। তা না করে দুর্বল অবস্থায়ই সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকলে চিরস্থায়ী গ্লানি ও অপমানের বোঝা বইতে হবে।
যারা এই দুর্বল অবস্থাকে স্থায়ী করার জন্য নতুন নতুন বিধান আবিষ্কার করে, তারা একসময় এই অপমানজনক অবস্থা মাথায় নিয়েই মারা যাবে। সেই সাথে তাদের বিকৃত কর্মপদ্ধতিও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আর নয়তো তারা তাওবা করে সঠিক ইসলামে ফিরে আসবে। এদের দুর্বল দলিল ও যুক্তিগুলো শুনলে অবাক হয়ে যেতে হয়। সত্যনিষ্ঠ পূর্বসূরিগণের কেউই কখনোই এসব কথাবার্তা বলেননি। বোঝায় যায় যে এসব যুক্তিতর্কের দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হলো ইসলামের বিধিবিধানকেই ছুড়ে ফেলা। যারা 'মাক্কী যুগে'র দোহাই দেয়, তারা কি মাক্কী যুগের মতোই জেরুজালেমের মসজিদুল আকসার দিকে ফিরে সালাত আদায় করবে? মদপানকে হালাল ঘোষণা করবে? তাহাজ্জুদ সালাতকে ফরয বলে মেনে নেবে? নাকি 'মাক্কী যুগে'র অজুহাত কেবল জিহাদ, হিসবাহ আর তাদের অপছন্দের সব বিধানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য?
ইসলামকে সঠিকভাবে বোঝার মানদণ্ড হলো যেভাবে এই উম্মাহর সত্যনিষ্ঠ পূর্বসূরিগণ বুঝেছেন। তাঁরা হলেন সাহাবি, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম তাবিঈ, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম তাবি-তাবিঈনগণ এবং তাঁদের সকলের পদাঙ্ক অনুসরণকারী অন্য সবাই। এঁরা এই দ্বীনে নতুন কিছু যোগ করেননি, কিছু পরিবর্তন করেননি, কোনো অংশ বাদ দিয়ে দেননি। তাঁরা নবীজির এই কথার বাস্তব প্রতিচ্ছবি, "অবশ্যই আমার সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ মেনে চলো এবং তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো।” (তিরমিযি)
এঁরাই হলেন আমাদের পথ চলার আলো। এঁদের ধরে ধরে আমরা সেই ইসলামের কাছে পৌঁছাব, যা নাযিল হয়েছিল মুহাম্মাদ-এর ওপর। এই আমানত বহনের জন্য আল্লাহ প্রতিটি প্রজন্ম থেকেই সৎ আলেমগণকে বেছে নিয়েছেন। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধানে লিপ্ত, তাদের অবশ্যই এসকল আলেমগণের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে হবে।
আওযাঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “ধৈর্য ধরে সুন্নাহর অনুসরণ করতে থাকো। তাঁরা (সাহাবিগণ) যে অবস্থান নিয়েছেন, সে অবস্থান ধরে রাখো। তাঁরা যা বলেছেন, তা-ই বলো। তাঁরা যা এড়িয়ে গেছেন, তা এড়িয়ে চলো। এবং সালফে সালিহীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করো।" [১৫৫]
নবীজির ওপর নাযিল হওয়া ইসলামকে যারা মানতে চায়, তাদের জন্য কয়েকজন আদর্শ হলেন আবূ বকর, উমর ইবনুল খাত্তাব, 'উসমান বিন আফফান, আলী ইবনু আবি তালিব, যায়দ বিন সাবিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ, আব্দুল্লাহ ইবনু উমর, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আল-আস, সাঈদ বিন মুসাইয়্যিব, খারিজাহ ইবনু যায়দ, উরওয়া ইবনুয যুবাইর, সুলাইমান বিন ইয়াসার, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্দুল্লাহ উতবাহ, আবূ বকর ইবনু আব্দুর রহমান, সামিল ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু উমর, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ, ইমাম আহমাদ, বুখারি, মুসলিম, ইবনু মাঈন, ইবনুল মাদীনী, ইবনু তাইমিয়্যাহ, যাহাবী, ইবনুল কাইয়্যিম, ইবনু রজব-সহ আরো অনেকে।
আর যারা ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে সন্তুষ্ট, তারা "সঠিক পথ হারিয়ে ফেলেছে।”[১৫৬] তারা সত্যকে ছেড়ে মিথ্যা বেছে নিয়েছে। "অতএব, সত্যের পর পথভ্রষ্টতা ব্যতীত আর কীই-বা থাকতে পারে?"[১৫৭]
সত্যনিষ্ঠ পূর্বসূরিগণের বুঝেরই অনুসরণ করতে হবে। কারণ তাঁদের ছিল ইজতিহাদ করার মানসিক সক্ষমতা। প্রতি শতাব্দীতে আল্লাহ তাঁদের মতো প্রাজ্ঞ মুজাদ্দিদ প্রেরণ করেন, যারা উম্মাতের জন্য এই দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করেন। বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা তাঁদের জ্ঞান, দ্বীনদারি, প্রজ্ঞা ও সৎপথে চলার কথা স্বীকার করে। তাঁরা আল্লাহকে ভয় করেন, দুনিয়াবি লোভ বা শাসকের ভয়ে সত্য গোপন করা থেকে বিরত থাকেন। যে- কোনো কথা বলার আগে তাঁরা যেন চোখের সামনে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখতে পান। তাঁরা এই আয়াতের ওপর আমল করেন:
الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللَّهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللَّهَ وَكَفَى بِاللَّهِ حَسِيبًا
"তারা আল্লাহর বাণী প্রচার করত আর তাঁকে ভয় করত। আল্লাহ ছাড়া কাউকে তারা ভয় করত না। হিসাব গ্রহণের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।”[১৫৮]
তাঁরা কখনোই কুরআন-সুন্নাহর ওপর নিজেদের যুক্তিতর্ককে স্থান দেননি। নিজেদের মতামতকে তাঁরা কুরআন ও সুন্নাহর দলিল দ্বারা প্রমাণ করতেন। তাঁদের কোনো কথা যদি অনিচ্ছাবশত নবীজির সুন্নাহর বিরুদ্ধে চলে গিয়েও থাকে, তা প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে সেই কথা ছুঁড়ে ফেলার নির্দেশ দিয়ে গেছেন। নিজেদের যে-কোনো ভুলত্রুটি থেকে আল্লাহর দ্বীনের সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করে গেছেন। নবীজি -এর বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য কোনো আলেমের অন্ধ অনুসরণ করাকে তাঁরা নিষেধ করে গেছেন। তাঁরা বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির পথ পরিহার করে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছেন।
তাঁরা ইখলাস সহকারে আল্লাহর আনুগত্য করতেন, সুন্নাহ অনুসরণ করতেন ও এই সত্য দ্বীন মেনে চলতেন। তাই আল্লাহ তাঁদের কোনো ভুল মতের ওপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। তাঁদের বানিয়েছেন হক পথের মাইলফলক, যাদের দেখে দেখে পথিক বুঝতে পারে যে সত্যের পথেই আছে। আল্লাহ বলেন :
وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَيَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا ﴿١١٥ “যে ব্যক্তি সত্য প্রকাশিত হওয়ার পরও রাসূলের বিরোধিতা করে এবং মুমিনদের পথ বাদ দিয়ে ভিন্ন পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে সে পথেই ফিরাব যে পথে সে ফিরে যায়। আর তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করব। কত মন্দই- না সে আবাস!” [১৫৯]
সালফে সালিহীনের পথ অনুসরণ করা হলো ভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতার বিরুদ্ধে আমাদের গ্যারান্টি। এটি হলো মুমিনদের সেই 'বিজয়ী দলে'র অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চাবিকাঠি, যেই দলের ব্যাপারে নবীজি বলেছেন, "আমার উম্মাহর একটি দল সত্যের ওপর থেকে যুদ্ধ করতে থাকবে এবং কিয়ামাত পর্যন্ত বিজয়ী থাকবে।” (বুখারি) এই পথ ছেড়ে অন্য পথের অনুসারী হয়েও নিজেকে ইসলামের অনুসারী দাবি করাটা মিথ্যে দাবি। এমন মিথ্যে দাবিতে আমাদের চারপাশ আজ ভরপুর।
টিকাঃ
১১৫. সূরা আর-রুম ৩০:৪-৫
১১৬. সূরা আলে ইমরান ৩:১১৯
১১৭. সূরা ইবরাহীম ১৪:৪৬
১১৮. সূরা ইউসুফ ১২:৩৮
১১৯. সূরা আল-বাকারাহ ২:২১৬
১২০. সূরা আয-যুমার ৩৯:৬২
১২১. সূরা সাবা ৩৪:৩
১২২. সূরা আল-আরাফ ৭:১৫৮
১২৩. সূরা আলে ইমরান ৩:৮৫
১২৪. আবু দাউদ: ৪৬০৭, তিরমিযি: ২৬৭৬; হাসান সহীহ
১২৫. সূরা আল-মাইদাহ ৫:৩
১২৬. সূরা আন-নূর ২৪:১৬
১২৭. সূরা ইউসুফ ১২:৪০
১২৮. সূরা আশ-শুরা ৪২:১০
১২৯. সূরা আল-আনআম ৬:৩৮
১৩০. সূরা আন-নিসা ৪:৩৬
১৩১. সূরা আল-বাকারাহ ২:২৩৮
১৩২. সূরা আল-বাকারাহ ২:১৬৮
১৩৩. সূরা আল-ফুরকান ২৫:৪৩
১৩৪. সূরা আন-নিসা ৪:৩৬
১৩৫. সূরা ত্বা-হা ২০:১১৪
১৩৬. সূরা আয-যুমার ৩৯:৯
১৩৭. সূরা আল-বাকারাহ ২:৮৩
১৩৮. সূরা আল-মাইদাহ ৫:৪৯
১৩৯. সূরা আন-নাহল ১৬:১২৫
১৪০. সূরা আলে ইমরান ৩:১০৪
১৪১. সূরা আল-বাকারাহ ২:২১৬
১৪২. সূরা আল-কাহফ ১৮:১১০
১৪৩. সূরা যিলযাল ৯৯:৭-৮
১৪৪. সূরা আন-নিসা ৪:৫৯
১৪৫. সূরা আন-নিসা ৪:৫৮
১৪৬. সূরা আলে ইমরান ৩:১৫৯
১৪৭. সূরা আল-মুলক ৬৭:১৪
১৪৮. সূরা আল-মাইদাহ ৫:৪৯
১৪৯. সূরা আল-কাহফ ১৮:১০৪
১৫০. সূরা আলে ইমরান ৩:৩১
১৫১. সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪০
১৫২. সূরা আল-মাইদাহ ৫:৩
১৫৩. সূরা আল-বাকারাহ ২:৮৫
১৫৪. সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:৪৩
১৫৫. উসুলু ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, ১/৩০৭
১৫৬. সূরা আল-মাইদাহ ৫:১২
১৫৭. সূরা ইউনুস ১০:৩২
১৫৮. সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৯
১৫৯. সূরা আন-নিসা ৪:১১৫
📄 আমাদের লক্ষ্য
১. মানবজাতিকে এক আল্লাহর দাসত্বের দিকে নিয়ে আসা।
২. নবীজি -এর কর্মপদ্ধতি অনুযায়ী খিলাফাত প্রতিষ্ঠা করা।
মোটকথা, আল্লাহর এই হুকুম বাস্তবায়ন করা :
أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ "তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করো।”[১৬০]
আমাদের লক্ষ্য হলো, প্রতিটি ব্যক্তির জীবনে, প্রতি ইঞ্চি ভূখণ্ডে, প্রতিটি ঘরে, প্রতিষ্ঠানে ও সমাজে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা। এ কাজে সফল হওয়ার জন্য আমাদের দুটি কাজ অবশ্যই করতে হবে।
১. মানুষকে তাদের রবের দাসত্বের দিকে ফিরিয়ে আনা, এবং
২. নবীজির গড়ে যাওয়া ভিত্তির ওপর খিলাফাত প্রতিষ্ঠা করা।
দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর দেওয়া হুকুম বাস্তবায়নের জন্য এই দুটি লক্ষ্যকে আমরা বাস্তবায়নের চেষ্টা করি।
আগেও বলা হয়েছে যে, মানুষ হলো আল্লাহর দাস এবং এই পৃথিবী আল্লাহরই মালিকানাধীন। অতএব, প্রতিটি ব্যক্তিকে ইসলামে প্রবেশ করতে বলা হবে এবং প্রতিটি ভূখণ্ড ইসলাম অনুযায়ী শাসিত হবে। যেসব মানুষ জীবনের আসল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে দিগবিদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের হুঁশ ফিরিয়ে এনে সরল পথে ডেকে আনতে হবে। 'মানুষকে তাদের রবের ইবাদতের দিকে ফিরিয়ে আনা' বলতে এটিই বোঝানো হয়েছে। জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রেই তা করতে হবে-বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান, আচরণ, লেনদেন, চরিত্র ও বিচার-আচার সবখানেই। এর অর্থ হলো সরকারব্যবস্থাও ইসলামি হতে হবে। ইসলামি আইনসমূহ প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর করতে হবে। ইসলাম নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যবস্থাই পারে মানুষের দ্বীনকে সুরক্ষা দিতে। যে-সকল জিন ও মানুষ শয়তান তাদের দ্বীনের বাইরে নিয়ে যেতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে।
অনৈসলামিব্যবস্থার অধীনে বসবাস করার অর্থ হলো, বিবাদ মীমাংসার জন্য বিচারক হিসেবে ইসলামকে না মেনে নেওয়া তথা পূর্ণাঙ্গ দ্বীন ইসলাম কায়েম না করা। ইসলামকে তার এই ন্যায্য অবস্থান থেকে সরানো মানেই হলো, সেই জায়গায় জাহিলি শক্তিকে আসন গেড়ে বসতে দেওয়া-যা মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের বাইরে নিয়ে যাবে। দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করার একটি ভিত্তিই হলো জনগণকে শাসন করা ও পথ দেখানোর জন্য একটি রাজনৈতিকব্যবস্থা গড়ে তোলা। এমন একটি ব্যবস্থা ছাড়া দ্বীন কখনোই পূর্ণ হবে না।
ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “জেনে রাখুন যে, শাসন ও সরকারব্যবস্থা পরিচালনা করা ইসলামের সবচেয়ে বড় হুকুমগুলোর একটি। এটি ছাড়া কখনোই দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।” [১৬১]
অতএব, নবীওয়ালা তরিকায় খিলাফাত প্রতিষ্ঠা করা আমাদের লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমরা ইসলামের শেখানো মাধ্যমগুলোই ব্যবহার করব। যেমন: দাওয়াত, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পথে এই প্রতিটি মাধ্যমেরই নিজ নিজ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিটিরই নিজ নিজ প্রয়োগক্ষেত্র এবং নিয়মাবলি রয়েছে। এর বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যাবে 'আমাদের পথ' অধ্যায়ে।
১. মানুষকে তাদের রবের দাসত্বের দিকে আনা
আসমান-জমিন, ফেরেশতা-মানুষ, দিন-রাত, সিরাত-মীযান, জান্নাত-জাহান্নাম সবকিছু সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর ইবাদত সংঘটিত হওয়া।
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ ﴾
"আসমান ও জমিন এবং এ দুইয়ের মধ্যবর্তী কোনোকিছু আমি খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি।" [১৬২]
মানবজাতিকেও বেহুদা সৃষ্টি করা হয়নি।
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ * فَتَعَالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ ﴾
“তোমরা কি ভেবেছিলে যে, আমি তোমাদের তামাশাচ্ছলে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদের আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না? সুউচ্চ মহান আল্লাহ যিনি প্রকৃত মালিক, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই, সম্মানিত আরশের অধিপতি।”[১৬৩]
মানুষ ও জিন জাতিকে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া সৃষ্টি করা হয়নি।
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ ) "আমি জিন ও মানবজাতিকে শুধুমাত্র আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি।”[১৬৪]
তাই আমাদের এই পুরো অস্তিত্বের একমাত্র কারণ হলো আল্লাহর ইবাদত করা। আমরা সৃষ্টিই হয়েছি আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব পালন করার জন্য। এই দায়িত্ব নবীজি -এর হাদীসে সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে। তিনি মুআয বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে তিনবার ডেকে বললেন, "তুমি কি জানো বান্দার ওপর আল্লাহর অধিকার কী?” মুআয জবাব দিলেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।” নবীজি বলেন, “বান্দার ওপর আল্লাহর অধিকার এই যে, বান্দা শুধু আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।”[১৬৫]
এই সেই দায়িত্ব, যা পালন করতে বান্দা বাধ্য। আল্লাহর দাসত্ব করা; পূর্ণ বিনয়, ভালোবাসা, আস্থা, সচ্চরিত্র ও ভয় নিয়ে তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করা। এজন্যই আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের দিকে ডাকার উদ্দেশ্যে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন।
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ أَفَلَا تَتَّقُونَ ) "আর নিশ্চয় নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, 'হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো ইলাহ নেই। তোমরা কি (তাঁকে) ভয় করবে?'”[১৬৬]
وَإِبْرَاهِيمَ إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاتَّقُوهُ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ )
"স্মরণ করো, যখন ইব্রাহীম তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, 'তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে!'” [১৬৭]
وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ “এবং আদ জাতির প্রতি (পাঠিয়েছিলাম) তাদের ভাই হুদকে। সে বলেছিল, 'হে আমার জাতি! আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো ইলাহ নেই।”[১৬৮]
وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ "আর সামূদ জাতির প্রতি (পাঠিয়েছিলাম) তাদের ভাই সালিহকে। সে বলেছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো ইলাহ নেই।” [১৬৯]
وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا قَالَ يَا قَوْমِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ "আর মাদইয়ানের লোকদের নিকট (পাঠিয়েছিলাম) তাদের ভাই শুআইবকে। সে বলেছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো ইলাহ নেই।'” [১৭০]
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ "এবং নিশ্চয় আমি প্রত্যেক উম্মাহর মাঝে রাসূল পাঠিয়েছি (যাতে তারা প্রচার করে), 'আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগূতকে (মিথ্যা উপাস্য) প্রত্যাখ্যান করো।” [১৭১]
কুরআনে আরো উল্লেখ আছে বানী ইসরাঈলের প্রতি মারইয়ামপুত্র ঈসার আহ্বান : وَإِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمُ ) “নিশ্চয় আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং তোমাদের প্রতিপালক। কাজেই তাঁরই ইবাদত করো, এটিই সঠিক পথ।”[১৭২]
নবীজি-এর আগমনের কারণও এটিই- “যাতে শুধুই আল্লাহর ইবাদত করা হয়, কোনো শরিক ছাড়া।” [১৭৩]
সাহাবিগণও রাসূলুল্লাহ-র কাছ থেক এই লক্ষ্যের কথাই বুঝেছিলেন। পারস্যের সেনাপতি রুস্তম যখন মুসলিমদের আগমনের কারণ জানতে চান, তখন রিবিঈ বিন আমির রাদিয়াল্লাহু আনহু জবাব দেন, “আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন মানুষকে সৃষ্টির দাসত্ব থেকে বের করে সর্বশক্তিমান এক আল্লাহর দাসত্বের দিকে নিয়ে আসার জন্য।” মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই কারো না কারো দাস হয়ে থাকতে বাধ্য। এটি মানুষের অন্তর্নিহিত এক বৈশিষ্ট্য। এটি দূর করার কোনো ক্ষমতাই তার নেই। সে অবশ্যই আনুগত্য, ভালোবাসা, ভয় ও আশা সহকারে কারো না কারো দাস হয়ে থাকে। মানুষ যদি তার এই দাস প্রবৃত্তিকে সত্যিকারের উপাস্য আল্লাহর জন্য নির্ধারিত না রাখে, তা হলে অবশ্যই সে মিথ্যা উপাস্যদের দাসত্ব করতে শুরু করবে যারা "কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট। আর নিজেদের ক্ষতি বা উপকার করার কোনো ক্ষমতাও তাদের নেই। আর তারা জীবন, মৃত্যু বা পুনরুত্থানকে নিয়ন্ত্রণ করে না।” [১৭৪]
এই বাস্তবতা আমাদের মানতেই হবে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর দাসত্ব ছেড়ে দিলে মিথ্যা উপাস্যদের দাসত্ব করাই লাগে। বিশ্বজগতে আল্লাহ যেসব অলঙ্ঘনীয় নিয়ম গেঁথে দিয়েছেন, এটি তার মধ্যে একটি।
খ্রিষ্টানরা ঈসা আলাইহিস সালাম-কে উপাসনা করে। ইহুদিরা বাছুরের উপাসনা করেছে। আরব মুশরিকরা খেজুর পিষে মূর্তি বানিয়ে সেগুলোর পূজা করত। ক্ষুধা লাগলে আবার সেগুলোকেই খেয়ে ফেলত। কয়েক মিনিট আগেই তারা যাকে সেজদা করে খাদ্য-পানীয় চাইছিল, তাকেই তারা খেয়ে ফেলত। আজো এমন মানুষ আছে-যারা আগুন, গাভি, গাছ, চাঁদ, সূর্য ইত্যাদির পূজা করে। এ ছাড়া অন্যরা হলো নিজেদের খেয়াল-খুশির গোলাম।
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةٌ فَمَن يَهْدِيهِ مِن بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ *
"তুমি কি তাকে দেখোনি যে আপন কামনা-বাসনাকে নিজের উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করে নেয়? আল্লাহ জেনেশুনেই তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন আর তার কানে ও অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন আর তার চোখের ওপর টেনে দিয়েছেন পর্দা। অতঃপর আল্লাহর পর আর কে (আছে যে) তাকে সঠিক পথ দেখাবে? এরপরও কি তোমরা শিক্ষাগ্রহণ করবে না?”[১৭৫]
ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “মানুষের কামনা-বাসনাও আল্লাহর পাশাপাশি পূজিত হওয়া একটি মিথ্যা উপাস্য।” [১৭৬] বলা হয়, “মানুষ তার যেসব খেয়াল-খুশির দাস, আল্লাহর দৃষ্টিতে সেগুলোর চেয়ে নিকৃষ্ট আর কিছুই নেই।”
যারা নিজেদের খাহেশাত ও কামনা-বাসনার গোলাম, তাদের ব্যাপারে ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা এই মিথ্যা উপাস্যকে ভালোবাসা, ভয়, আশা, স্তুতি ও বিনয় সহকারে পূজা করে। তাদের সব ভালোবাসা, ঘৃণা, দান করা, দান করা থেকে বিরত থাকা—এ সবই হয়ে থাকে নিজের খাহেশাতকে খুশি করার জন্য। আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে নফসের সন্তুষ্টিই তাদের কাছে বেশি প্রিয়। খাহেশাত তার নেতা, কামনা-বাসনা তার পথপ্রদর্শক, অজ্ঞতা তার পরিচালক, অবহেলা তার বাহন।” [১৭৭]
কেউ কেউ এতই অহংকারী যে, আল্লাহর দাস হতে তারা লজ্জা পায়। তাই নিজেদের সম্পদের দাস হয়ে থাকে। নবীজি বলেন, “দিনার, দিরহাম ও দামি রেশমি কাপড়ের দাসেরা ধ্বংস হোক! তাকে যদি এসব দেওয়া হয়, তা হলে সে খুশি হয়। আর দেওয়া না হলে অসন্তুষ্ট দুঃখিত হয়। সে কাঁটাবিদ্ধ হলে তা আর বের করে আনা যায় না।” [১৭৮]
ইবনু হাজার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “দিনারের দাস মানে হলো সম্পদলোভী। সে এগুলোর প্রতি এতই আগ্রহী, যেন সে এগুলোর বান্দা।” [১৭৯]
আবার অনেকে আল্লাহর দাস হতে লজ্জা পেয়ে মানবরচিত আইন দিয়ে শাসনকারী শাসকদের দাস হয়ে থাকে। ইহুদি-খ্রিষ্টানদের আলেমরাও আল্লাহর দেওয়া বিধিবিধান পাল্টে ফেলত। তাদের কথা মেনে চলা সাধারণ মানুষ ছিল তাদের বান্দা।
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ
"আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা তাদের আলেম ও পাদ্রিদের রব বানিয়ে নিয়েছে।” [১৮০]
আদী ইবনু হাতিম রাদিয়াল্লাহু আনহু নবীজি -কে বলেন, “কিন্তু তারা তো তাদের উপাসনা করে না, হে রাসূলুল্লাহ!” নবীজি জবাব দিলেন, “তারা হালালকে হারাম বানাত আর হারামকে হালাল বানাত। আর মানুষ তাদের অনুসরণ করত। এভাবেই তারা তাদের উপাসনা করত।”[১৮১]
আমাদের দায়িত্ব হলো মানুষকে ঝাড়া দিয়ে ঘুম থেকে তুলে বাস্তবতা দেখানো আর জিজ্ঞেস করা:
مُتَفَرِّقُونَ خَيْرُ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ )
“ভিন্ন ভিন্ন রব ভালো, নাকি মহাপরাক্রমশালী এক আল্লাহ?”[১৮২]
তাদের ঝাঁকুনি দিয়ে বলতে হবে :
يَا أَيُّهَا النَّاسُ ضُرِبَ مَثَلٌ فَاسْتَمِعُوا لَهُ إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ لَن يَخْلُقُوا ذُبَابًا وَلَوِ اجْتَمَعُوا لَهُ ۖ وَإِن يَسْلُبْهُمُ الذُّبَابُ شَيْئًا لَّا يَسْتَنقِذُوهُ مِنْهُ ۚ ضَعُفَ الطَّالِبُ وَالْمَطْلُوبُ مَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ
“হে মানুষ! একটি উপমা দেওয়া হচ্ছে। অতএব, মনোযোগ দিয়ে শোনো। নিশ্চয় আল্লাহকে ছেড়ে তোমরা যাদের ডাকো, তারা সকলে মিলে একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারে না। এমনকি মাছি তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নিলে তারা তা উদ্ধার করতে পারে না। উপাসক ও উপাস্য উভয়ই দুর্বল। তারা আল্লাহর যথাযোগ্য মর্যাদা দেয় না। আল্লাহ নিশ্চিতই ক্ষমতাশালী, মহাপরাক্রান্ত।”[১৮৩]
তাদের ঝাড়া দিয়ে বলতে হবে:
ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا رَجُلًا فِيهِ شُرَكَاءُ مُتَشَاكِسُونَ وَرَجُلًا سَلَمًا لِرَجُلٍ هَلْ يَسْتَوِيَانِ مَثَلًا
“আল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন। এক ব্যক্তি, যার পরস্পরবিরোধী অনেক মনিব। আরেক ব্যক্তি, যার সম্পূর্ণ মালিকানা একজনের (ওপর ন্যস্ত)। তুলনায় এ দুজন কি সমান?”[১৮৪]
আমরা তাদের ঝাঁকুনি দিয়ে বলি-হয় এক আল্লাহর দাসত্ব করো, আর নয়তো পরস্পরবিরোধী অসংখ্য মালিকের টানাহেঁচড়ার মধ্যে পড়ে যাও। এরা না কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে, না রিযিক দিতে পারে, না সৃষ্টি করতে পারে, না সম্মান বা অপমান দিতে পারে, না জীবন বা মৃত্যু দিতে পারে।
"তারা আল্লাহর পরিবর্তে অনেক উপাস্য গ্রহণ করেছে এই আশায় যে, তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। ওইসব ইলাহ তাদের সাহায্য করতে সক্ষম নয়। বরং (উল্টো) এ লোকেরাই সদা প্রস্তুত সেনাবাহিনীর মতো হাজির হয়ে আছে (ওইসব ইলাহকে সাহায্য করার জন্য)।”[১৮৫]
وَاتَّخَذُوا مِن دُونِ اللَّهِ آلِهَةً لِّيَكُونُوا لَهُمْ عِزًّا ۞ كَلَّا سَيَكْفُرُونَ بِعِبَادَتِهِمْ وَيَكُونُونَ عَلَيْهِمْ ضِدًّا
"তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যান্য উপাস্য গ্রহণ করেছে যাতে তারা তাদের জন্য পৃষ্ঠপোষক হয়। কক্ষনো না! তারা তাদের ইবাদত অস্বীকার করবে আর তাদের বিরোধী হয়ে যাবে।”[১৮৬]
এইসকল মিথ্যা উপাস্য আখিরাতে তাদের ত্যাগ করবে। কী অদ্ভুত এক বাস্তবতা! আল্লাহর উপাসনা ছেড়ে মানুষ এইসব মিথ্যা উপাস্যগুলোকে কত মনপ্রাণ দিয়ে যে উপাসনা করে। কীসের আশায়, কী কারণে-তা বোঝাটাই দায়! এসকল মিথ্যা ইলাহ তাদের কোনো উপকার তো করবেই না, বরং শেষ বিচারের দিন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে শুরু করবে।
لَّا تَجْعَلْ مَّعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ فَتَقْعُدَ مَذْمُومًا مَّخْذُولًا
"আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহ সাব্যস্ত কোরো না। করলে তিরস্কৃত হতভাগ্য হয়ে পড়ে থাকবে।"[১৮৭]
وَلَا تَجْعَلْ مَّعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ فَتُلْقَىٰ فِي جَهَنَّمَ مَلُومًا مَّدْحُورًا
"আর আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্য স্থির কোরো না। করলে তুমি নিন্দিত ও যাবতীয় কল্যাণ বঞ্চিত হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।"[১৮৮]
উবুদিয়্যাহ (ইবাদত/দাসত্ব) কাকে বলে? এটা কি শুধু সালাত, দুআ আর যিকিরেই সীমাবদ্ধ? এর উত্তর হলো-এগুলোও দাসত্বের অন্তর্ভুক্ত, তবে এগুলোই সব নয়। দুনিয়ায় মানবজীবনের প্রতিটি কাজ ও সকল পরিস্থিতিই 'উবুদিয়্যাহ বা দাসত্বের' অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ আমাদের কাছে যে ধরনের ইবাদত চান, তা হলো কথা ও কাজ। উভয়ের মাধ্যমেই আদম আলাইহিস সালাম-এর এই সাক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করা : أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ "সারা জগতের রব আল্লাহর কাছে আমি আত্মসমর্পণ করলাম। "[১৮৯]
নবী-রাসূলসহ সকল প্রকৃত বান্দাই কথা ও কাজের মাধ্যমে এই সাক্ষ্য দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা নবীজি-কে আদেশ দেন: قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ "বলো, 'নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ (সবকিছুই) সারা জগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই। আমাকে এরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমিই সর্বপ্রথম আত্মসমর্পণকারী।” [১৯০]
আল্লাহ আমাদের যেই দাসত্বের জন্য সৃষ্টি করেছেন, সেটা হলো আমাদের পুরো জীবনই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। আমাদের দিন-রাত, চিন্তা-ভাবনা, কথা-কাজ, জীবন-মরণ সবই আল্লাহকে খুশি করার জন্য হতে হবে।
ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ ইবাদতের সংজ্ঞায় বলেন, "প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যে-কোনো কথা ও কাজ, যা আল্লাহ ভালোবাসেন ও অনুমোদন দেন, তার সবই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, সালাত, যাকাত, সিয়াম, হাজ্জ, সত্য বলা, আমানত রক্ষা করা, পিতামাতার প্রতি সদাচরণ, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধ, কাফির-মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ, প্রতিবেশী-ইয়াতীম-মিসকীন-মুসাফিরের প্রতি সদাচরণ, মালিকানাধীন দাসদাসী ও পশুপাখির প্রতি সদাচরণ, দুআ, যিকির, কুরআন তিলাওয়াতসহ সবকিছুই ইবাদতের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে। অনুরূপভাবে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা, আল্লাহকে ভয় করা, তাঁর নিকট তাওবা করা, ইখলাস, আল্লাহর সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ধৈর্যধারণ, তাঁর অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা আদায় করা, আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকা, তাওয়াক্কুল করা, আল্লাহর দয়া আশা করা, তাঁর শাস্তিকে ভয় করা ইত্যাদি সবই ইবাদতের উদাহরণ।” [১৯১]
এজন্যই আমাদের লক্ষ্য হলো মানুষকে জীবনের সকল ব্যাপারে এক আল্লাহর দাসত্বের দিকে নিয়ে আসা। নিজের ও নিজের জীবনের সবকিছুর ব্যাপারেই বান্দা আল্লাহর প্রতি ঋণী। তাঁর ইবাদত করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। সে যদি আল্লাহর আনুগত্য না করে, তা হলে সে হবে একজন ফেরারি আসামি, আর ওই “ব্যক্তির রয়েছে পরস্পর বিরোধী অনেক মালিক।”[১৯২]
অপরদিকে যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করে জীবনের ছোট-বড় সকল ক্ষেত্রেই, তার "মালিক মাত্র একজন।”[১৯৩] এটি সেই ইবাদত/দাসত্ব, যার ব্যাপারে আজকের অধিকাংশ ব্যক্তি ও সমাজের কোনো ধারণাই নেই। প্রচুর ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সরকারের ব্যর্থতা ও দুর্দশার এটিই কারণ। একটু থেমে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, মানবজাতি আজ কেন ধুঁকছে? সরল উত্তর হলো, আল্লাহর দাসত্ব ছেড়ে, অন্যদের দাসত্ব করছে বলে। মাত্র একজন নিয়ন্ত্রণকারী ছাড়া আসমান-জমিন ঠিকভাবে চলতেই পারবে না:
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا
“(আসমান ও জমিনে) যদি আল্লাহ ছাড়াও আরো কোনো ইলাহ থাকত, তা হলে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত।"[১৯৪]
হাজারো উপাস্যের কথামতো চলতে গিয়েই আজ মানবজাতির পার্থিব জীবন দুঃখ-কষ্টে ভরপুর হয়ে গেছে। কেউ আল্লাহর পাশাপাশি অন্য ইলাহকে মানছে, কেউ আল্লাহকে একেবারেই বাদ দিয়ে অন্য ইলাহর শরণাপন্ন হচ্ছে।
ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহ ছাড়াও আরো কোনো ইলাহ থাকলে যেমন আসমান-জমিন ধ্বংস হয়ে যেত, একই ব্যাপার অন্তরের ক্ষেত্রেও ঘটে। একই অন্তর যদি আল্লাহকেও খুশি রাখতে চায় আবার অন্য মিথ্যা উপাস্যকেও খুশি রাখতে চায়, তা হলে অন্তর জটিলভাবে রোগাক্রান্ত ও দূষিত হয়ে যাবে। সেই রোগ ভালো করার একমাত্র উপায় হলো হৃদয় থেকে সব মিথ্যা উপাস্যকে বের করে দিয়ে এক আল্লাহর প্রতি সব ভালোবাসা, ভয়, আশা, আস্থা ও তাওবা বরাদ্দ রাখা।”[১৯৫]
বড়ই সত্যি কথা। মানুষ তার অবস্থা উন্নয়নের জন্য কত চেষ্টাই না করে! কিন্তু মানবতাকে আগে এক আল্লাহর দাসত্বের দিকে না আনলে সবই দিনশেষে পণ্ডশ্রম। সংস্কার ও প্রগতির নামে যত ফাঁকা স্লোগান আজকের যুগে প্রচলিত, সেগুলো দেখে বিভ্রান্ত না হওয়ার মতো অন্তর্দৃষ্টি মুসলিম হিসেবে আমাদের থাকা উচিত। সম্পদের অভাব, জুলুমের প্রসার, বিধ্বংসী যুদ্ধ, সম্পদের অসম বণ্টন, গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি-এগুলো কোনোটিই মানবজাতির মূল সমস্যা নয়। সব সমস্যার শিকড় হলো আল্লাহর দাস হতে অস্বীকার করা, অথবা আল্লাহর দাসত্ব যে করতে হয় এটাই না জানা।
যেখান থেকে কাজ শুরু করতে হবে, তা হলো নিরবচ্ছিন্নভাবে, গুরুত্ব সহকারে, বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে মানুষকে তাদের রবের দাসত্বের দিকে আনতে থাকা। অন্য যে-কোনো প্রচেষ্টাই নিঃসন্দেহে সময় ও শ্রমের অপচয়। মুসলিমদের একমাত্র সমস্যা হলো আল্লাহর দাসত্ব ছেড়ে দেওয়া এবং জীবনের সব বিষয়ে পথভ্রষ্ট জাতিগুলোর অনুসরণ করা। এসকল পথভ্রষ্ট মুসলিম ও অমুসলিম জাতিগুলোকে সিরাতুল মুস্তাকিমে ফিরিয়ে আনতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। আর এজন্য দরকার আমাদের পক্ষ থেকে সত্যের দিকে নিরলস দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া। যারা সত্য দ্বীনের দিকে ফিরে আসবে, তারা আল্লাহর ক্ষমাপ্ত হবে। আর যারা গোঁয়ারের মতো প্রত্যাখ্যান করবে, তাদের প্রতিরোধ করার জন্য হিসবাহ অথবা জিহাদ করা হবে, যে ক্ষেত্রে যেটি প্রযোজ্য। মানুষের সামনে পথ মাত্র দুটি। হয় তাদের আসল রব্ব আল্লাহর পথে ফিরে আসা; আর নয়তো নিজেদের মিথ্যে বিশ্বাস নিয়ে পথ ছেড়ে দাঁড়ানো, আল্লাহর অনুগত বান্দাদের হাতে শাসিত হওয়ার জন্য কর্তৃত্বের আসন ছেড়ে দেওয়া। আল্লাহর জমিনে শিরকের পাপ চালিয়ে যাওয়া এবং শিরকি আইন দিয়ে জমিন শাসন করার কোনো অধিকার তাদের নেই।
২. নবীওয়ালা তরিকায় খিলাফাত প্রতিষ্ঠা করা
মুসলিমদের অবহেলা ও অজ্ঞতার কারণে খিলাফাত প্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত আজ বিস্মৃতপ্রায়। মুসলিমদের বিরাট একটা অংশ জানেই না যে, খিলাফাত প্রতিষ্ঠা নামে একটি ইবাদত আছে। তারা ভাবে, এটা মুসলিমদের প্রথম দিককার ইতিহাসের একটি অধ্যায়, যা এখন হারিয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতেও কখনো আর ফিরে আসবে না। পক্ষান্তরে যারা প্রকৃতই ইসলামের জন্য কাজ করে, তারা খিলাফাত পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই দায়িত্বকে অবহেলা করে না।
ইসলামের হুকুম মানার জন্যই আমরা খিলাফাত পুনরুজ্জীবিত করতে আগ্রহী। এর গৌরবময় অতীত ইতিহাস আমাদের স্পৃহা আরো বৃদ্ধি করে। আমরা ইসলামি রাষ্ট্র ফিরিয়ে আনতে চাই, যা পূর্বে চীন থেকে পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত এবং উত্তরে মধ্য ইউরোপ থেকে দক্ষিণে মধ্য আফ্রিকা পর্যন্ত তের শতক ধরে ন্যায়বিচার কায়েম করে গেছে। ইসলাম আমাদের খিলাফাত প্রতিষ্ঠা ও খলিফা নির্বাচনের হুকুম দেয়। মুসলিম উম্মাহর ব্যবস্থাপনার জন্য যে একজন খলিফা নিয়োগ করতে হবে, এ ব্যাপারে শিয়া-সুন্নি-মুরজিয়াসহ সকলেই একমত।
এই লক্ষ্যে কাজ করতে শুরু করলেই মুনাফিক ও রোগাক্রান্ত অন্তরধারীদের আমরা বলতে শুনি :
غَرَّ هَؤُلَاءِ دِينُهُمْ
“এই লোকগুলোকে তাদের দ্বীন ধোঁকায় ফেলে রেখেছে।”[১৯৬]
কিন্তু আমরা তাদের জবাবে বলি :
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ *
“কেউ যদি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তা হলে আল্লাহ তো প্রবল পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী।”[১৯৭]
আমরা এই মহান লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাই। আমাদের জানা আছে যে, আমাদের আত্মত্যাগের অনুপাতেই আসবে বিজয়ের সুবাস।
আমরা শুধু এমন খিলাফাতই মেনে নেব যা রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যা আল্লাহর আইন দিয়ে শাসন করে। অতএব, আমাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ যেন সেই পর্যায়েরই হয়। জমিনের যত ইঞ্চি আমরা খিলাফাতের অধীনে আনতে চাই, তার পুরোটাই যেন আমাদের রক্তে সিঞ্চিত হয়। আমাদের আত্মত্যাগ হোক উম্মাহর প্রথম জামানার মুসলিমদের অনুরূপ, যারা খিলাফাত প্রতিষ্ঠায় চেষ্টার বিন্দুমাত্র ত্রুটি করেননি। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত ন্যায়পরায়ণ খিলাফাতর অধীনে এসেছিল সে-সময়কার বেশিরভাগ জনসংখ্যা। এর রাজধানী আবর্তিত হয়েছে মদীনা থেকে কুফা, দামেস্ক, বাগদাদ, কায়রো আর ইস্তাম্বুলে।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মুসলিমদের অবহেলা, শাসকদের সীমালঙ্ঘন এবং ভেতর ও বাইরের শত্রুদের ষড়যন্ত্রের কারণে খিলাফাত অনেকসময় দুর্বল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এ সবকিছুর পরও এটি ছিল ইসলাম, মুসলিম জনগণ ও মুসলিম ভূখণ্ডগুলোর সংরক্ষক। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে একে টিকে থাকতে হয়েছে। ইসলামের ভ্রূণাবস্থার মদীনা রাষ্ট্রে কুরাইশদের আক্রমণের মাধ্যমে এই ধারা শুরু হয়। তারপর পশ্চিমে ক্রুসেডার আর পূর্বে মঙ্গোলিয়ানদের সাথে তুমুল সংঘর্ষ হয়। সবশেষে এসে এটি ইহুদি-খ্রিষ্টানদের সাথে কামাল আতাতুর্কের মতো মুরতাদ সেক্যুলারিস্টদের সম্মিলিত শয়তানি জোটের আক্রমণের শিকার হয়। ১৩৪০ বছরের প্রচেষ্টার পর অবশেষে ঈসায়ী ১৯২৪ সনে শয়তান তার সর্বশক্তি দিয়ে সফল আঘাত হানতে সমর্থ হয়। বিলুপ্তি ঘটে খিলাফাতের।
খিলাফাত পতনের সাথে সাথে স্রোতের মতো শত্রুদের প্রবেশের দুয়ার খুলে যায়। ১৩৪০ বছরের চাপা আক্রোশ বুকে নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। উম্মাহর ভূমিগুলো তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা শুরু করে। আমাদের বেশিরভাগ ভূমি ও জনগণের শাসনক্ষমতা পেয়ে বসে তারা। সামরিক আক্রমণের সাথে হাতে হাত ধরে চলেছে ভয়ংকর মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ। মুসলিমদের হৃদয় ও অন্তরগুলোকে লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিটা ধর্ম ও গোষ্ঠীর নেকড়েমানবদের থাবা। এই সাংস্কৃতিক আক্রমণের সফল শিকারে পরিণত হয় পরবর্তী মুসলিম প্রজন্মগুলো। তাদের আকীদা বিকৃত করে দেওয়া হয়, তাদের ঈমান নড়বড়ে করে ফেলা হয়। কেউ পুরোপুরি ইসলাম ত্যাগ করে। নামমাত্র মুসলিম থাকা অনেকেই হয়ে পড়ে অন্তঃসারশূন্য খোলস মাত্র।
এই বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে সব রকম তাত্ত্বিক ও দার্শনিক অস্ত্র ব্যবহার করে সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মতো ভ্রান্ত আদর্শগুলোর দিকে মুসলিমদেরকে আহ্বান করা শুরু হয়। কথিত উদারপন্থা ও স্বাধীনতার বুলি প্রচার করে মুসলিম তরুণ সমাজকে ইসলামি শালীনতা ও ভাবগাম্ভীর্য থেকে বের করে আনা হয়। তাদের বানানো হয় পার্থিব কামনা-বাসনা ও খেয়াল-খুশির গোলাম। গণমাধ্যম ও শিক্ষাব্যবস্থা হলো এই আক্রমণের প্রধান দুটি অস্ত্র। ইহুদি-খ্রিষ্টানদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠান-সংগঠন নিয়ে গড়ে ওঠে সেনাবাহিনী। এদেরকে পূর্ণ রসদ যোগায় দালাল সরকার ও তাদের পেটোয়া বাহিনী।
কুফরি শক্তির সামরিক বিভাগের কাজ ছিল খিলাফাতকে ধ্বংস করা। কারণ এটি ছিল মুসলিমদের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা। তারা তাদের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। অপরদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক বিভাগের কাজ হলো ইসলামের অনুসারীদের মনে সন্দেহ-সংশয় ও হীনমন্যতা তৈরি করা, ইসলামের অর্থ বিকৃত করে দেওয়া। তারা তাদের কাজে অনেকাংশেই সফল।
আমাদের শত্রুরা ভালো করেই বুঝতে পেরেছে যে, খিলাফাত ধ্বংস করলেই ইসলাম ধ্বংস হয়ে যাবে না। সেটার জন্য আরো কাজ করা লাগবে। তারা দেখল যে, ইসলাম যতদিন তার পূর্ণাঙ্গ ও সর্বব্যাপী রূপ নিয়ে মুসলিমদের মনে প্রোথিত থাকবে, ততদিন পর্যন্ত এর অনুসারীরা হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাবে। ইতিহাসে এমনটা অনেকবার ঘটেছে এবং শত্রুরা এগুলো দেখে শিক্ষা নিয়েছে। ঐতিহাসিক প্রমাণ এই যে, খিলাফাতের দায়িত্ব পালনে একেকবার একেক ভূমি নেতৃত্ব দিয়েছে। প্রথমে হিজায, তারপর শাম, ইরাক, মিশর হয়ে তুরস্ক পর্যন্ত এর ডানা বিস্তৃত হয়েছে। তাই সামগ্রিকভাবে মুসলিমদের মন থেকে যদি ইসলামের সঠিক ধারণা দূর করা যায়, তা হলে এই খিলাফাতের আবার মাথা তুলে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নিঃশেষ হয়ে যাবে।
ঠিক এ কারণেই মুসলিম বিশ্বে সেক্যুলারিজমকে এত জোরেশোরে একটি নতুন ধর্মের মতো প্রচার করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল এটি যেন ইসলামকে সরিয়ে নতুন একটি সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। আরব বিশ্বের অনেক প্রজাতন্ত্র ও রাজতন্ত্র এর ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে। সেক্যুলারিজমের প্রচারকরা ধর্ম ও রাজনীতির পৃথকীকরণের ডাক দিয়ে ইসলামকে শাসনতন্ত্র, রাজনীতি ও সরকার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চায়। এই নতুন ধর্মের মত হলো, ইসলামকে শুধু মসজিদে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, শুধুমাত্র আচার-অনুষ্ঠানবাদ্ধ থাকতে হবে আর ধর্মীয় পালা-পার্বণগুলো পালন করা যাবে। ইসলামকে নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের আসনগুলোর কাছেও ভিড়তে দেওয়া হবে না, কারণ এগুলো সেক্যুলারিস্টদের একচ্ছত্র মালিকানায়। ইসলামকে এই নতুন ধর্মটি মসজিদের মিম্বর ছাড়া সমাজের অন্য কোনো আসন ব্যবহার করতে দেয় না। রাষ্ট্রকে নিজের এবং মসজিদকে ইসলামের সম্পত্তি বলে ঘোষণা দেয়। কেউ কারো সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করবে না।
অনেক মুসলিমই এই আকীদা গ্রহণ করে নিয়েছে এবং অনেক রাষ্ট্র এই মতবাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বিশ্বাস, ব্যবস্থা ও আদর্শ হিসেবে সেক্যুলারিজমকে মেনে নিয়ে আমরা ও আমাদের সরকারগুলো দীর্ঘসময় অতিবাহিত করেছে। মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে এই নতুন ধর্মটি জীবনের সকল পর্যায়ে আসন গেড়ে বসেছে। সরকার, আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, শিক্ষা ও গণমাধ্যম সবখানে। আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে শয়তানের আইন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা জাহিল রেজিমগুলো আমাদেরও এই তন্ত্রে মগজধোলাই করতে চাচ্ছে। এরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সব রকম জাহিলিয়াতের প্রতি আনুগত্য দেখাচ্ছে। অথচ আল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا
“তোমাদের (সত্যিকার) বন্ধু কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনগণ।”[১৯৮]
হককে বাদ দিয়ে তারা লিবারেলিজম আর সোশ্যালিজমের দিকে ডাকে। অথচ আল্লাহর হুকুম হলো:
وَأَنِ احْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ
“আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তদনুযায়ী তাদের মাঝে বিচার-ফয়সালা করো। আর তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ কোরো না।”[১৯৯]
তারা জাতীয়তাকে ঐক্য ও ভেদাভেদের ভিত্তি হিসেবে বিশ্বাস করে। অথচ আল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ “মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই।”[২০০]
তারা আমাদের ভূমি ও সম্মানকে শত্রুদের জন্য ছেড়ে দেয়। অথচ আল্লাহ বলেন:
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ “আর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকো, যতদিন না ফিতনা (শিরক ও কুফর) দূরীভূত হয়ে যায় এবং দ্বীন পুরোপুরি আল্লাহর জন্য হয়ে যায়।”[২০১]
ইসলামকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে তারা নিজেদের মতো আইন রচনা করে; ইসলামের দিকে আহ্বানকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, এর অনুসারীদের হত্যা করে; ইসলামের নির্ধারিত সীমাগুলোর তোয়াক্কা করে না, হারামকে হালাল আর হালালকে হারাম বানায়, মানুষের দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ই ধ্বংস করে দেয়।
এসব রেজিম বা সরকারের ব্যাপারে ইসলামের স্পষ্ট বিধান হলো যে, এরা কাফির, জাহিল ও অবৈধ। এদের টিকে থাকার কোনো অধিকারই নেই। এদের অপসারণ করতে হবে। মুসলিমদের মর্যাদা ও ভূমি পুনরুদ্ধার এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও প্রতিরক্ষার জন্য খিলাফাত ফিরিয়ে আনতে হবে।
এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আমাদের কঠোর সংগ্রাম করতে হবে। আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিতে হবে—এই যে আমরা আবারো চলে এসেছি! আমরা মুহাম্মাদ -এর উম্মাত। খিলাফাত পুনঃপ্রতিষ্ঠা আমাদের লক্ষ্য। নবীজির হিজরতের সময় থেকে নিয়ে উসমানী শাসনামল পর্যন্ত আমাদের শত্রুরা নিরলস যুদ্ধ করেছে। ইসলামি রাষ্ট্র পুনরুদ্ধারে আমাদের জিহাদ-সংগ্রামও নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকবে। আমাদের শত্রুরা যেভাবে কষ্ট ভোগ ও আত্মত্যাগ করেছে, আমরাও সেভাবে কষ্ট ও আত্মত্যাগ করব। কিন্তু তারা আর আমরা সমান নই। আমরা আল্লাহর কাছে পুরস্কার ও শাহাদাত কামনা করি, তারা সেটা করে না। আমাদের শহীদগণ আছেন জান্নাতে, আর তাদের মৃতরা আছে জাহান্নামে।
যেই খিলাফাতের কথা আমরা বলি, তা ইতিহাসের কোনো মানবরচিত সরকারব্যবস্থার মতো নয়। আমাদের রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি হলো, আল্লাহ হলেন বিধানদাতা এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির কাছে বার্তাবাহক।
আইন-বিধান প্রণয়নের অধিকার না খলিফার, না মজলিসে শুরার উপদেষ্টাদের, না সংসদের, না কোনো দলের, না কারো। এটি কেবলই আল্লাহর অধিকার। তবে হ্যাঁ, ইজতিহাদকে বিধানপ্রণয়ন বলে না। আল্লাহ যেসব পন্থার অনুমোদন দিয়েছেন, নতুন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেগুলো ব্যবহার করে সেই নতুন বিষয়ে আল্লাহর ফয়সালা খুঁজে বের করাকে ইজতিহাদ বলে। এ ব্যাপারে আল্লাহ আমাদের জানান:
وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ
"যদি তারা তা রাসূল কিংবা তাদের দায়িত্বশীলদের কাছে ন্যস্ত কর, তা হলে যারা জ্ঞাণ অন্বেষণ করে তারা প্রকৃত বিষয়টি জেনে নিতে পারত।” [২০২]
এভাবে নতুন উদ্ভূত বিষয়ে আল্লাহর ফয়সালা খুঁজে বের করার দায়িত্ব কেবল এ কাজের যোগ্য আলেমগণের হাতে ন্যস্ত। ইজতিহাদ করার মাধ্যমে তাঁরা উম্মাহর জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করেন না। বরং ইসলামি আইনের মূলনীতিগুলো মেনেই তাঁরা নতুন সিদ্ধান্তে আসেন।
আমাদের খিলাফাত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-এর ওপর কোনোকিছুকেই স্থান দিতে পারবে না। হোক তা কথা, কাজ, আদেশ, নিষেধ যে-কোনো বিষয়।
وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ
"তোমরা যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য করো, তার মীমাংসা আল্লাহর ওপর সোপর্দ।” [২০৩]
فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ
যদি কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতপার্থক্য ঘটে, তা হলে সেই বিষয়কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (নির্দেশের) দিকে ফিরিয়ে দাও।” [২০৪]
আমাদের খিলাফাত তার শাসিত মানুষ ও ভূমির ওপর পূর্ণাঙ্গরূপে ইসলাম কায়েম করতে বাধ্য। শান্তি, যুদ্ধ, সন্ধি, চুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে বাকি বিশ্বের সাথে কখন কেমন আচরণ করতে হবে—সেগুলোও ইসলামি বিধানের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
খলিফার কাজ হলো কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর হুকুমগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করা। তাঁর আসল দায়িত্ব দ্বীনের সুরক্ষা, এর প্রচার-প্রসার এবং জাগতিক সকল ব্যাপারে এর নিয়মাবলির বাস্তবায়ন। ইমাম আল-মাওয়ারদি বলেন, “ইমামতের দায়িত্ব হলো নবুওয়্যাতের প্রতিনিধিত্ব করা, দ্বীনের প্রতিরক্ষা বিধান, আর মুসলিমদের জীবনের বিষয়াবলির প্রশাসন।” [২০৫]
আপসে সলা-পরামর্শ করা মুসলিম খলিফার অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য: وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقناهُمْ يُنفِقُونَ *
“যারা তাদের প্রতিপালকের (নির্দেশ পালনের মাধ্যমে তাঁর) প্রতি সাড়া দেয়, নিয়মিত সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে নিজেদের কার্যাদি পরিচালনা করে।” [২০৬]
তার শাসনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হতে হবে ন্যায়বিচার : وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ
“এবং যখন মানুষের মাঝে বিচার করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে।” [২০৭]
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা নির্দেশ দিয়েছেন, সেটাই ন্যায়বিচার। খলিফার যে-কোনো বিচারের রায় হয় সরাসরি কুরআন-হাদীসের বিধানের বাস্তবায়ন, আর নয়তো ইজতিহাদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে কুরআন-হাদীসের মূলনীতিসমূহের বাস্তবায়ন। আলেমগণ শর্ত দিয়েছেন যে, খলিফাকে নতুন উদ্ভূত বিষয়াদিতে ইজতিহাদ করতে পারার মতো যথেষ্ট ইলমসম্পন্ন হতে হবে।
খলিফা নিযুক্ত করার তিনটি পদ্ধতি:
১. আল-ইস্তিখলাফ : এক্ষেত্রে খলিফা নিজেই তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে একজনকে নির্ধারণ করে যান। অথবা একদল মানুষের একটি পরিষদ গঠন করে দিয়ে যান, যারা পরে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে খলিফা নির্বাচন করেন।
২. বাইয়াহ : এর অর্থ আনুগত্যের শপথ। খলিফা হওয়ার শর্ত পূরণ করা কোনো ব্যক্তিকে আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ আনুগত্যের অঙ্গীকার দেন।
৩. আল-ইস্তীলা : এটি ইমারাতুল মুতাগাল্লিব নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে জোর করে নতুন একজন খলিফার আসন গ্রহণ করেন।
এই সবগুলোর বিস্তারিত বিধিবিধান ফিকহ ও সিয়াসাতের কিতাবসমূহে পাওয়া যাবে। আর খলিফা হওয়ার জন্য যেসব শর্ত পূরণ করতে হয়, সে ব্যাপারে আল-মাওয়ারদি সাতটি বিষয়ের উল্লেখ করেন:
১. ন্যায়পরায়ণতার সকল বিস্তারিত শর্তাদি পূরণ করা।
২. নতুন উদ্ভূত বিষয়াদিতে ইজতিহাদ করতে পারার মতো জ্ঞান।
৩. সুস্থ শ্রবণক্ষমতা, দৃষ্টিশক্তি ও বাক্শক্তি।
৪. শারিরীকভাবে বিকলাঙ্গ না হওয়া।
৫. প্রজাদের বিষয়াদি ও অন্যান্য বিষয় পরিচালনা করতে পারার মতো সুস্থ মতামত ও বিচারক্ষমতা।
৬. মুসলিম জনগণ ও মুসলিমদের ভূখণ্ডগুলোর প্রতিরক্ষার জন্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারার মতো সাহস ও তৎপরতা।
৭. কুরাইশ বংশের হওয়া। এ ব্যাপারে হাদীস থেকে দলিল এবং উম্মাহর আলেমগণের ইজমা আছে।
খলিফার প্রতি আনুগত্য ফরয এবং এটি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর আনুগত্য করার অংশ। তাঁর সকল নির্দেশ মানা আবশ্যক। তবে যদি তিনি আল্লাহর বিধানের বিপরীত কোনো হুকুম দিয়ে থাকেন, তা হলে সেই হুকুম মানা যাবে না। তিনি যদি ফিসক বা জুলুম করেন, তা হলে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না। তবে যদি এমন হয় যে এসকল অন্যায় তিনি বারবার করছেন এবং তাঁকে অপসারণ না করার ক্ষতির চেয়ে অপসারণ করার ক্ষতি কম, তা হলে তাঁকে অপসারণ করতে হবে। তবে এই বিষয়টি নিয়ে উম্মাহর আলেমগণের মাঝে ভালো রকমের মতভেদ রয়েছে।
আল্লাহ না করুন, খলিফা যদি কাফির হয়ে যায়, তা হলে প্রয়োজনে সশস্ত্র পদক্ষেপ নিয়ে হলেও তাকে অপসারণ করে একজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিম খলিফা নিয়োগ করা ফরয। ন্যায্য খলিফা আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকতে পারেন, অথবা স্বেচ্ছা পদত্যাগ করতে পারেন। অথবা (বয়স, রোগ ইত্যাদি কারণে) সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারেন।
খিলাফাত রাষ্ট্রই হলো ইসলামের সঠিক প্রয়োগ। একমাত্র এরকম রাজনৈতিক কাঠামোতেই ইসলাম পূর্ণরূপে বিকশিত হয় এবং আল্লাহর আইন কার্যকর করা সম্ভব হয়।
দ্বীন ও দুনিয়ার সুরক্ষাকল্পে খিলাফাত প্রতিষ্ঠার হুকুম ইসলামই দিয়েছে। এবং ইসলামই এর উদ্দেশ্য, আদর্শ ও নিয়মাবলি বলে দিয়েছে। কারোই ক্ষমতা নেই এই হুকুমকে পাল্টে দেওয়ার, সে যে-ই হোক না কেন। এই হুকুম লঙ্ঘন করলে জাহিলি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, যাকে অপসারণ করা আবশ্যক। মুসলিমরা আজকে যেসব সমস্যার সম্মুখীন, ইসলামি খিলাফাতই হলো সেগুলোর সমাধান। যে অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতার কারণে আমরা আজ নাস্তিক্যবাদী প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের গোলাম হয়ে আছি, সেটার চিকিৎসা খিলাফাত। কথিত মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে পশ্চাৎপদতার সমাধান খিলাফাত। আমাদের ভূমি ও তীর্থস্থানগুলোর সুরক্ষা দিতে পারার মতো সামরিক অক্ষমতা-দুর্বলতার সমাধানও খিলাফাত। এটিই সমাধা করবে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া জুলুম-অবিচারের। মুসলিমদের নৈতিক পদস্খলন, হীনম্মন্যতা ও পরাজিত মানসিকতারও এটিই সমাধান।
ইসলামি খিলাফাত এভাবেই আমাদের জন্য সর্বরোগের ঔষধের মতো কাজ করবে। ইতিহাসের দিকে তাকালেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। খিলাফাতের দুর্বল অবস্থার সময়গুলোতেই কেবল মুসলিমরা এসব সমস্যায় পড়েছে। আর যখন স্বয়ং খিলাফাতেরই পতন ঘটল, তখন এসব সমস্যা পর্বতসম হয়ে দেখা দিল। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলকে আল্লাহ রহম করুন। তিনি বলেছেন, “ফিতনা শুরু হয়, যখন মুসলিমদের বিষয়াদি সামলানোর জন্য কোনো ইমাম (খলিফা) থাকে না।"
আজকের দিনে মানবতা যেসব সমস্যার সম্মুখীন, সেগুলোর সমাধান রয়েছে খিলাফাতব্যবস্থার মধ্যেই। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র এক-পঞ্চমাংশ মানুষ নিজ স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য বাকি সবাইকে দাস বানিয়ে রেখেছে। কথিত 'উন্নত' ও 'সভ্য' রাষ্ট্রগুলোর বানানো মতাদর্শ আর সরকারব্যবস্থার কল্যাণে ধনী হয়েছে আরো ধনী, গরিব হয়েছে আরো গরিব। এমনকি সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্রগুলোতেও এসব শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা। তারা এমন কোনো আদর্শবাদী, বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি, যা গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থের বদলে বিশ্বমানবতার কল্যাণের কথা ভাবে। এদিকে আজকের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো গরিবদেরকে চুষে নিজেরা ধনী হয়, আর ওদিকে অতীতের খিলাফাত প্রায় অর্ধ-পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত থেকেও কারো প্রতি এমন জুলুম করেনি।
বিশ্বজগতের নিয়ম-কানুন স্বাভাবিক গতি লাভ করে ইসলামের শাসনাধীনে থাকতে পারলে। এ ছাড়া অন্য যে-কোনো আকীদা-মতবাদের কবলে পড়লে তা ব্যাহত হয়। মানবরচিত বিধিবিধান কখনো আল্লাহর সৃষ্টিজগতে সাফল্য পায় না। বরং আল্লাহর বিধান দিয়ে আল্লাহর সৃষ্টিজগতকে শাসন করলেই সবকিছু ভারসাম্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। অতএব, খিলাফাতই হলো একমাত্র রাজনৈতিকব্যবস্থা যা সারা পৃথিবীর সকল সমাজের উন্নতি, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। আজ থেকে প্রায় এক শতক আগে যেই খিলাফাতের পতন হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করা আমাদের লক্ষ্য। মানুষকে এক আল্লাহর উপাসনার দিকে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করলেই আল্লাহর হুকুম "দ্বীন প্রতিষ্ঠা করো” এর বাস্তবায়ন হয়।
আমরা যখন বলি যে খিলাফাত অবশ্যই ফিরে আসবে এবং পৃথিবী শাসন করবে, তখন অনেকেই বিশ্বাস করতে চায় না। তারা বলে এটা নাকি অবাস্তব কথাবার্তা, অলীক স্বপ্ন। কিন্তু এসকল নৈরাশ্যবাদীরা আমাদের হতাশ করতে পারে না। কারণ রাসূল ﷺ ওয়াদা করেছেন, “আল্লাহ আমার জন্য পৃথিবীর শেষ সীমানাগুলো কাছে এনে দেখিয়েছেন এবং আমি পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত দেখেছি। যে সীমানাগুলো আমাকে কাছে এনে দেখানো হয়েছে, সেই সীমাগুলো পর্যন্ত আমার উম্মাতের শাসন বিস্তার লাভ করবে।”[২০৮]
নবীজি ﷺ আরো বলেছেন, "নবুওয়্যাত তোমাদের মাঝে থাকবে যতদিন আল্লাহ ইচ্ছা করবেন। তারপর তিনি যখন ইচ্ছা করবেন, তখন তা তুলে নেবেন। তারপর আসবে নবুওয়্যাতের আদলে খিলাফাত। আল্লাহ যতদিন ইচ্ছা করবেন, ততদিন তা থাকবে। তারপর যখন আল্লাহ ইচ্ছা করবেন, তখন তা তুলে নেবেন। তারপর আসবে জালিম শাসকেরা। আল্লাহ যতদিন ইচ্ছা করবেন, ততদিন তা থাকবে। তারপর যখন আল্লাহ ইচ্ছা করবেন, তখন তা তুলে নেবেন। তারপর আসবে জোর করে চেপে বসা শাসকেরা। আল্লাহ যতদিন ইচ্ছা করবেন, ততদিন তা থাকবে। তারপর আল্লাহ যখন ইচ্ছা করবেন, তখন তা তুলে নেবেন। তারপর আবার ফিরে আসবে নবুওয়্যাতের আদলে খিলাফাত।”[২০৯]
টিকাঃ
১৬০. সূরা আশ-শুরা ৪২:১৩
১৬১. আস-সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ, ১/২১৭
১৬২. সূরা আল-আম্বিয়া ২১:১৬
১৬৩. সূরা আল-মুমিনূন ২৩:১১৫-১১৬
১৬৪. সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬
১৬৫. বুখারি: ৬২৬৭; মুসলিম: ১৫২
১৬৬. সূরা আল-মুমিনূন ২৩:২৩
১৬৭. সূরা আল-আনকাবূত ২৯:১৬
১৬৮. সূরা হুদ ১১:৫০
১৬৯. সূরা হুদ ১১:৬১
১৭০. সূরা হুদ ১১:৮৪
১৭১. সূরা আন-নাহল ১৬:৩৬
১৭২. সূরা মারইয়াম ১৯:৩৬
১৭৩. মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবাহ: ১৯৭৪৭
১৭৪. সূরা আল-ফুরকান ২৫:৩
১৭৫. সূরা আল-জাসিয়াহ ৪৫:২৩
১৭৬. তাফসির আল-কুরতুবি, ১৩/৩৫
১৭৭. ইগাসাতুল লাহফান, ১/৯
১৭৮. বুখারি: ২৮৮৭
১৭৯. ফাতহুল বারী, ২৫/৪০৪
১৮০. সূরা আত-তাওবা ৯:৩১
১৮১. তিরমিযি: ৩০৯৫, বাইহাকি: ২০৮৪৭
১৮২. সূরা ইউসুফ ১২:৩৯
১৮৩. সূরা আল-হাজ্জ ২২:৭৩-৭৪
১৮৪. সূরা আয-যুমার ৩৯:২৯
১৮৫. সূরা ইয়াসীন ৩৬:৭৪-৭৫
১৮৬. সূরা মারইয়াম ১৯:৮১-৮২
১৮৭. সূরা আল-ইসরা ১৭:২২
১৮৮. সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৯
১৮৯. সূরা আল-বাকারাহ ২:১৩১
১৯০. সূরা আল-আনআম ৬:১৬২-১৬৩
১৯১. আল-উবুদিয়্যাহ, ইবনু তাইমিয়্যাহ, পৃ. ৩৮
১৯২. সূরা আয-যুমার ৩৯:২৯
১৯৩. সূরা আয-যুমার ৩৯: ২৯
১৯৪. সূরা আল-আম্বিয়া ২১:২২
১৯৫. ইগাসাতুল লাহফান, ৩০ পৃ.
১৯৬. সূরা আল-আনফাল ৮:৪৯
১৯৭. সূরা আল-আনফাল ৮:৪৯
১৯৮. সূরা আল-মাইদাহ ৫:৫৫
১৯৯. সূরা আল-মাইদাহ ৫:৪৯
২০০. সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১০
২০১. সূরা আল-আনফাল ৮:৩৯
২০২. সূরা আন-নিসা ৪:৮৩
২০৩. সূরা আশ-শুরা ৪২:১০
২০৪. সূরা আন-নিসা ৪:৫৯
২০৫. আল-খুলাসাতু ফি আহকামি আহলিয যিম্মাহ, ১/৪৭২
২০৬. সূরা আশ-শুরা ৪২:৩৮
২০৭. সূরা আন-নিসা ৪:৫৮
২০৮. মুসলিম: ৭৪৪০
২০৯. আহমাদ: ১৮৪৩০