📘 আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধানে 📄 আমাদের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য

📄 আমাদের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য


আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে
১. একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিজেদেরকে বিশুদ্ধভাবে সমর্পণ করা
২. সত্যিকার অর্থেই তাঁর রাসূল-এর অনুসরণ করা
আবূ সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি বলেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতিদের ডেকে বলবেন, 'হে জান্নাতিরা!' তারা জবাব দেবে, 'আমরা হাজির, হে আমাদের প্রতিপালক! সকল কল্যাণ আপনারই হাতে।' তিনি তাদের জিজ্ঞেস করবেন, 'তোমরা কি এখন সন্তুষ্ট?' তারা জবাব দেবে, 'কেন হব না, হে আমাদের প্রতিপালক? আপনি তো আমাদের এমন সব অনুগ্রহ দান করেছেন, যা আপনার অন্য কোনো সৃষ্টিকে দান করেননি।' তিনি তারপর তাদের বলবেন, 'আমি কি তোমাদেরকে এরচেয়েও উত্তম কিছু দেব না?' জান্নাতিরা জানতে চাইবে, 'এর চেয়ে উত্তম আর কী হতে পারে?' আল্লাহ বলবেন, 'আমি তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম এবং এরপর আর কখনোই তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হব না।”
হে আল্লাহ! নিশ্চয় আপনার সন্তুষ্টি অন্য যে-কোনো সুযোগ-সুবিধার চেয়ে অধিক উত্তম। আমরা আপনার সন্তুষ্টি অর্জন করাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ও অগ্রে স্থান দিই। এভাবে আমরা নবীজি-এর অনুকরণ করতে চাই। কারণ তিনি জান্নাতের দুআ করার আগে আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের দুআ করে বলেছেন, “হে আল্লাহ! আমি আপনার সন্তুষ্টি ও জান্নাত চাই।”
আল্লাহ তাআলাই আমাদের কাছে সবচেয়ে দামি এবং তিনি সবচেয়ে মহান। তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য অন্য যে-কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের চেয়ে বেশি সাধনা করা প্রয়োজন।
وَرِضْوَانٌ মِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ "আর সবচেয়ে বড় হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। এটাই হলো বিরাট সাফল্য।"
আল্লাহ তাআলাই প্রথম, তাঁর পূর্বে কিছুই ছিল না; তিনিই সর্বশেষ, তাঁর পর আর কোনোকিছু থাকবে না; তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে, তাঁর ঊর্ধ্বে কিছু নেই; তিনি সর্বনিকটে, তাঁর চেয়ে নিকটবর্তী কোনোকিছুই নেই। তিনি শাশ্বত, আর তিনি সকল কিছুর রিযিকদাতা ও রক্ষাকর্তা। তিনি সর্বশক্তিমান, সবচেয়ে প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ, তিনি সবকিছু দেখেন, সর্বময় প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার অধিকারী, তিনি সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান, সবকিছু তাঁর মুখাপেক্ষী, তাঁর জন্য সবকিছু সহজ, আর তিনি কোনোকিছুর মুখাপেক্ষী নন।
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ “কোনোকিছুই তাঁর সমকক্ষ বা সদৃশ নয়। তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।”
তিনিই সবকিছুকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আনেন এবং বিপর্যস্তকে সহায়-সম্বল দান করেন দেন। তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। তিনি মৃতদেরকে পুনরুত্থিত করেন। আর কিয়ামাতের দিন তাঁর কাছেই হবে আমাদের চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন। তিনি যাকে ইচ্ছা, দয়া করে ক্ষমা করে দেবেন। আর যার শাস্তি প্রাপ্য, তাকে ন্যায়বিচার করে শাস্তি দেবেন।
ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ “এই হলেন তোমাদের প্রতিপালক, সর্বময় কর্তৃত্ব তাঁরই, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। কাজেই তোমাদেরকে কোন দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে?” তাঁর সুউচ্চ সত্তা ব্যতীত সবই ধ্বংস হবে।
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ “পৃথিবীপৃষ্ঠে যা আছে সবই ধ্বংসশীল। কিন্তু চিরস্থায়ী তোমার প্রতিপালকের চেহারা, যিনি মহীয়ান, গরীয়ান।”
তাই কী করে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর অন্য কোনোকিছুকে প্রাধান্য দিতে পারি? কী করে আমরা মিছে নিরাপত্তা ও সুখের আশায় আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে সাংঘর্ষিক বিষয়ে জড়িয়ে পড়তে পারি?
فَفِرُّوا إِلَى اللَّهِ إِنِّي لَكُم مِّنْهُ نَذِيرٌ مُّبِينٌ
"অতএব, দৌড়াও আল্লাহর দিকে, আমি (মুহাম্মাদ) তোমাদের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে স্পষ্ট সতর্ককারী।
আমাদের নবীজি আমাদের শিখিয়েছেন যে আমাদের রব্ব আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, "আমি এক রাতে আল্লাহর রাসূলকে বিছানায় না পেয়ে তাঁকে খোঁজ করতে গেলাম। মসজিদে আমার হাত হঠাৎ তাঁর পায়ের তালু স্পর্শ করল। সেগুলো সিজদাহ করার ভঙ্গিতে উঁচু ছিল আর তিনি বলছিলেন,
اللَّهُمَّ أَعُوْذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ وَبِمُعَافَاتِكَ مِنْ عُقُوْبَتِكَ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْكَ لَا أُحْصِى ثَنَاءً عَلَيْكَ أَنْتَ كَمَا أَثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ
"হে আল্লাহ! আমি আপনার ক্রোধ থেকে আপনার সন্তুষ্টির আশ্রয় চাই। আপনার শাস্তি থেকে আপনার ক্ষমার আশ্রয় চাই। আমি আপনার থেকে আপনারই কাছে আশ্রয় চাই। আমি কখনোই আপনার (প্রাপ্য) যথাযথ প্রশংসা করতে পারব না। আপনি আপনার নিজের যেমন প্রশংসা করেছেন, আপনি তেমনই। "
আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি হাসিল করা এমনই গুরুত্বপূর্ণ এক লক্ষ্য, যার সামনে অন্য সব লক্ষ্য মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যায়।
وَاللَّهُ خَيْرٌ وَأَبْقَى
“আল্লাহই শ্রেষ্ঠতর (ফিরআউনের প্রতিশ্রুত পুরস্কারের চেয়ে) এবং স্থায়ী (ফিরআউনের হুমকি দেওয়া শাস্তির চেয়ে)।"
আল্লাহর সন্তুষ্টি যে পেয়ে গেল, সে তার প্রয়োজনীয় সবকিছুই পেয়ে গেল। আর যে এটি হারাল বা এর থেকে পথভ্রষ্ট হয়ে গেল, সে সবই হারাল। এরাই এমন সব ব্যক্তি যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,
وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَن يَهْدِيهِ مِن بَعْدِ اللَّهِ
“...আর তার কানে ও অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন আর তার চোখের ওপর টেনে দিয়েছেন পর্দা। তা হলে আল্লাহর পরে আর কে আছে যে তাকে সঠিক পথ দেখাবে?”
যারা মনেপ্রাণে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করে, আল্লাহ তাদের তা দান করেন। এটি বান্দার প্রতি আল্লাহর দেওয়া একটি শ্রেষ্ঠ রহমত।
اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ
“আল্লাহ যাকে ইচ্ছে করেন তাঁর পথে বেছে নেন। আর যে তাঁর অভিমুখী হয়, তাকে তিনি তাঁর পথে পরিচালিত করেন।”
হিদায়াতকামনাকারী কোনো বান্দাকে আল্লাহ তাআলা ফিরিয়ে দেন না। বরং তাকে হিদায়াত পেতে সহায়তা করেন।
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
“যারা আমার জন্য সংগ্রাম-সাধনা করবে তাদেরকে আমি আমার পথ দেখাবো।”
হাদীসে কুদসিতে এসেছে, “আল্লাহ বলেন, ‘বান্দা আমার ব্যাপারে যে-রকম ধারণা রাখে, আমি তেমনই। সে যখন আমাকে স্মরণ করে, তখন আমি তার সঙ্গে থাকি। সে যদি মনে মনে আমাকে স্মরণ করে, আমিও নিজে নিজে তাকে স্মরণ করি। আর যদি সে জনসমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, তবে আমি তাদের চেয়ে উত্তম সমাবেশে তাকে স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, তবে আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। যদি সে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দুই হাত অগ্রসর হই। আর সে যদি আমার কাছে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।”
আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কিছু কী করে আমাদের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হতে পারে? আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একটি হাদীস বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “হে আমার বান্দারা! আমি জুলুম করাকে নিজের জন্য হারাম করেছি আর তোমাদের জন্যও হারাম করেছি। অতএব, একে অপরকে জুলুম কোরো না। হে আমার বান্দারা! আমি যাদের হিদায়াত করি তারা ব্যতীত তোমাদের সবাই পথভ্রষ্ট। অতএব আমার নিকট হিদায়াত চাও, আমি তোমাদের হিদায়াত দেব। হে আমার বান্দারা! আমি যাদের খাবার খাওয়াই, তারা ব্যতীত তোমাদের সকলেই ক্ষুধার্ত। অতএব আমার কাছে খাদ্য চাও, আমি তোমাদের খাদ্য দেব। হে আমার বান্দারা! আমি যাদের পোশাক পরাই, তারা ব্যতীত তোমাদের সকলেই উলঙ্গ। অতএব আমার কাছে বস্ত্র চাও, আমি তোমাদের পরিধান করাব। হে আমার বান্দারা! তোমরা তো দিন-রাত গুনাহ করতে থাকো আর আমি তোমাদের ক্ষমা করি। অতএব আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দেব। হে আমার বান্দারা! তোমরা আমার ক্ষতি করতে চাইলে ক্ষতি করতে পারবে না। আবার আমার উপকার করতে চাইলে উপকারও করতে পারবে না।
হে আমার বান্দারা! তোমাদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল মানুষ ও জিন যদি সবচেয়ে ধার্মিক ব্যক্তিটির সমান ধার্মিক হয়ে যায়, তা হলে তা আমার রাজত্ব একটুও বৃদ্ধি পাবে না। হে আমার বান্দারা! তোমাদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল মানুষ ও জিন যদি সবচেয়ে পাপিষ্ঠ ব্যক্তিটির সমান পাপিষ্ঠ হয়ে যায়, তা হলে তা আমার রাজত্বে একটুও কমাতে পারবে না। হে আমার বান্দারা! তোমাদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল মানুষ ও জিন যদি কোনো জায়গায় উঠে আমার কাছে দুআ করে, আর আমি প্রত্যেককে তার কাঙ্ক্ষিত বস্তু দিয়েও দিই, তা হলে আমার ভাণ্ডার থেকে ততটুকুই কমবে, সুচের আগায় করে পানি তুললে সাগর থেকে যতটুকু কমে।”
আল্লাহ তাঁর ওলি বা প্রিয় বন্ধুদেরকে রক্ষা করেন ও সাহায্য করেন। কে না চায় আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করে সেই সৌভাগ্যবানদের মধ্যে শামিল হতে?
إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا “নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের রক্ষা করেন।”
আল্লাহ তাআলা হাদীসে কুদসিতে বলেন, “যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সাথে শত্রুতা করে, তার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করি...।”
আমাদের তো অবশ্যই সে-সকল ওলিগণের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। একই হাদীসে কুদসিতে আল্লাহ সেসব সৌভাগ্যবানদের ব্যাপারে বলেন, "আমার বান্দা আমার নিকট প্রিয় যে কাজের দ্বারা আমার নৈকট্য সবচেয়ে বেশি লাভ করে, তা হলো ফরয ইবাদতসমূহ। এরপর আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে। অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসতে থাকি। আমি যখন তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার শ্রবণক্ষমতা হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, আমি তার দৃষ্টিশক্তি হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, সেই হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে, তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে হাঁটে। সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি। আর সে যদি আমার কাছে আশ্রয় চায়, তা হলে অবশ্যই তাকে আশ্রয় দান করি।”
আমরা তাঁর সন্তুষ্টি হাসিল করতে চাই এবং তাঁর সৎকর্মশীল বান্দাদের সাথে আখিরাতে জান্নাতে প্রবেশের আকাঙ্ক্ষা রাখি।
يَا عِبَادِ لَا خَوْفٌ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ وَلَا أَنتُمْ تَحْزَنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا مُسْلِمِينَ ادْخُلُوا الْجَنَّةَ أَنتُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ تُحْبَرُونَ * يُطَافُ عَلَيْهِم بِصِحَافٍ مِّن ذَهَبٍ وَأَكْوَابٍ وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ وَأَنتُمْ فِيهَا خَالِدُونَ وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي أُورِثْتُمُوهَا بِمَا কُنتُمْ تَعْمَلُونَ لَكُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ كَثِيرَةٌ مِنْهَا تَأْكُلُونَ
“হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই আর তোমরা দুঃখিতও হবে না। যারা আমার আয়াতসমূহ বিশ্বাস করেছিলে এবং অনুগত ছিল, তোমরা ও তোমাদের স্ত্রীরা সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। তাদের কাছে ঘুরে ঘুরে পরিবেশন করা হবে স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র। তোমাদের মনে যা চাইবে, আর যাতে চোখ পরিতৃপ্ত হবে সেখানে এরকম (সবকিছুই) আছে। তোমরা তাতে চিরকাল থাকবে। এই হলো জান্নাত, যার উত্তরাধিকারী করা হয়েছে তোমাদের। কারণ তোমরা (সৎ) কাজ করতে। তোমাদের জন্য এখানে আছে প্রচুর ফল, যা থেকে তোমরা খাবে।”
এতকিছুর পরও কি আমাদের অন্য কোনো লক্ষ্য থাকতে পারে?
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ أَمْ هَلْ تَسْتَوِي الظُّلُمَاتُ وَالنُّورُ
"বলো, যে অন্ধ আর যে দৃষ্টিশক্তিধর, তারা কি সমান হতে পারে? অথবা অন্ধকার কি আলোর সমান?"
أَفَمَن يَمْشِي مُكِبًا عَلَى وَجْهِهِ أَهْدَى أَمَّن يَمْشِي سَوِيًّا عَلَى صِرَاطٍ مُّসْتَقِيمٍ
“কে বেশি সৎপথপ্রাপ্ত? যে মুখে ভর দিয়ে উল্টো হয়ে চলে, নাকি যে সোজা হয়ে সরল সঠিক পথে চলে?"।
মুসলিমের জীবনের এই চূড়ান্ত উদ্দেশ্যই তার চলার পথকে আলোকিত করে; তার প্রচেষ্টার রূপরেখা ঠিক করে দেয়; তার পদক্ষেপ, কাজকর্ম ও অবস্থানের মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়। তাকে মাটিতে হাঁটতে দেখা যায়, অথচ তার মন থাকে আসমানে। সে কখনো সামনে অগ্রসর হয়, কখনো থেমে উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষা করে। কখনো দ্রুত কাজ করে, কখনো ধীরেসুস্থে। প্রয়োজনে কথা বলে, প্রয়োজনে চুপ থাকে। এ সব কাজই সে করে ওই এক লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য। আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘিত হওয়া তার কাছে অসহ্য। কারণ এমনটা করলে তার লক্ষ্য অটুট থাকবে না, বাধা পড়ে যাবে। সে কিছুতেই সময়ের অপব্যবহার করে না। ক্রমহ্রাসমান সময়ের একটি মুহূর্তও যেন রব্বের অসন্তুষ্টিে না কাটে, এ ব্যাপারে সে সদা সচেতন!
চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ঠিক রাখার আরেকটি উপকারিতা হলো, লক্ষ্যে পৌঁছানোর মাধ্যমগুলোও ঠিক হয়ে যাওয়া। উদ্দেশ্য ঠিক আছে বলেই যেন-তেন একটা রাস্তা অবলম্বন করার কোনো অধিকার তার নেই। বরং উদ্দেশ্য ঠিক করে নেওয়ার সাথে সাথেই নির্ধারিত হয়ে গেছে তাকে কোন রাস্তায় চলতে হবে আর কোন রাস্তায় সে চলতে পারবে না। লক্ষ্য যদি হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি, তা হলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর হুকুমের বাইরে গিয়ে কোনো পথই অবলম্বন করা যাবে না। সালাফদের প্রচেষ্টাই থাকত জীবনে কেবল একটি বিষয় নিয়েই মাথা ঘামানো—কীভাবে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি হাসিল করা যায়। এর ফলেই দুনিয়াবি কামনা-বাসনাকে দূরে ঠেলে তাঁরা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে বিদ্যমান যে- কোনো বাধা-বিপত্তি সহজে পার হয়ে যেতে পারতেন। এভাবেই তাঁরা ধার্মিকতা, জ্ঞান ও ন্যায়পরায়ণতায় সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয়ে আছেন। তাঁদের চেষ্টা-প্রচেষ্টার যথাযথ প্রতিদান আল্লাহ তাঁদের দিয়েছেন।
আমরা আজকের মুসলিমরা এর সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে গেছি। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টিকে পেছনে ছুড়ে ফেলে দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে ছুটে চলেছে। আর কেউ কেউ ভাবছে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করার পাশাপাশি সকল দুনিয়াবি উদ্দেশ্যও পূরণ করা সম্ভব। এমন লোকদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
رَّجُلًا فِيهِ شُرَكَاءُ مُتَشَاكِسُونَ
"পরস্পরবিরোধী একাধিক মালিকের দাস।”
আল্লাহ তাআলা কোনো শরিক গ্রহণের মুখাপেক্ষী নন। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিও চায়, আবার অন্যান্য উপাস্যদের সন্তুষ্টিও চায়, তাদেরকে আল্লাহ সেসব মিথ্যা উপাস্যের কাছেই সোপর্দ করে দেন। এজন্যই আজকের মুসলিমরা সংখ্যায় এত বেশি হওয়ার পরও উত্তাল সাগরে ভাসমান ফেনার মতো হয়ে গেছে। তুচ্ছাতি-তুচ্ছ বিষয়েও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, আপন খেয়ালখুশি আর ধর্মদ্রোহিতা নিয়ে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়ছে। ঠিক নবীজি -এর সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়ে গেছে। খাবার খাওয়ার জন্য যেভাবে পরস্পরকে ডাকা হয়, মুসলিমদের আক্রমণ করার জন্য সেভাবেই কাফিররা একে অপরকে ডাকছে।
পরিস্থিতি অতি ভয়াবহ। যে উদ্দেশ্যে আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, সেটিকে অবজ্ঞা করলে শুধু যে দুনিয়াতেই লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ভোগ করতে হবে, এমন না। আখিরাতেও প্রত্যেককে তার অবজ্ঞার মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করা লাগবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাকে লক্ষ্য না বানানোর অর্থই হলো আল্লাহর ক্রোধ অর্জন করাকে লক্ষ্য বানিয়ে নেওয়া। কারো যদি ইচ্ছে হয় নিজ নিজ ভ্রান্তিতে ঘুরে ঘুরে মরার, তবে সে তা-ই করুক। কিন্তু নিজেদের ভুলভাল কাজকে নানা রকম চটকদার নাম দিলেও আল্লাহর ক্রোধ থেকে কিছুতেই বাঁচা যাবে না। সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ, জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম- এই সকল আবরণ দিয়েও বাস্তবতাকে ঢাকা যাবে না। বাস্তবতা হলো তারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ "প্রকৃত সত্যের পর পথভ্রষ্টতা ছাড়া আর কীই-বা থাকতে পারে?”
আল্লাহ সত্যই বলেছেন, أُولَٰئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الضَّلَالَةَ بِالْهُدَىٰ وَالْعَذَابَ بِالْمَغْفِرَةِ ۚ فَمَا أَصْبَرَهُمْ عَلَى النَّارِ “এরাই সেসব লোক যারা হিদায়াতের বিনিময়ে পথভ্রষ্টতা ক্রয় করেছে এবং ক্ষমার বিনিময়ে শাস্তি ক্রয় করেছে। (জাহান্নামের) আগুন ভোগ করার ব্যাপারে তারা কতই-না ধৈর্যশীল!”
وَلَبِئْسَ مَا شَرَوْا بِهِ أَنفُسَهُمْ ۚ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ “আর যার বিনিময়ে তারা নিজেদের আত্মা বিক্রি করেছে, তা কতই-না জঘন্য! যদি তারা জানত!”
তাই আমরা আমাদের জাতিকে সতর্ক করে দিচ্ছি যেন তারা সঠিক পথে ফিরে আসে।
اسْتَجِيبُوا لِرَبِّكُم "তোমাদের প্রতিপালকের আহ্বানে সাড়া দাও।”
আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির দিকে ফিরে আসুন। আনুগত্য হোক নিষ্ঠার সাথে আর সংগ্রাম চলুক অবিরাম।
يَا قَوْمَنَا أَجিবُوا دَاعِيَ اللَّهِ وَآمِنُوا “হে আমাদের সম্প্রদায়! আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী (নবী)-র প্রতি সাড়া দাও এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনো।”
আর জেনে রাখুন, আল্লাহ তাআলা যাদের সাহায্য করেন, তাদের জন্য এই মহান লক্ষ্য অর্জন করা খুবই সহজ। আল্লাহ তাআলা যাদের দয়া করে পথ দেখান, তাদের জন্য এই রাস্তা একেবারেই পরিষ্কার-নিষ্কণ্টক।
وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ "আর যে তাঁর অভিমুখী হয়, তিনি তাকে তাঁর পথে পরিচালিত করেন।”
যারা এই পথের পথিক হতে চায়, তাদের তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য কেবল দুটি জিনিস সাথে রাখতে হবে: ১. ইখলাস বা নিষ্ঠা সহকারে সর্বশক্তিমান আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা। ২. প্রকৃতভাবেই রাসূল -এর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা।
১. ইখলাস বা নিষ্ঠা সহকারে সর্বশক্তিমান আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা
বান্দার ছোট-বড় যে-কোনো কাজ আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার শর্ত হলো, সেই কাজটি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই করতে হবে।
হাদীসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমি স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমার কোনো অংশীদারের প্রয়োজন নেই। অতএব, কেউ যদি কোনো একটি কাজ করে আমার পাশাপাশি অন্য কারো সন্তুষ্টিও অর্জন করতে চায়, তা হলে আমি নিজের পক্ষ থেকে সেই কাজকে প্রত্যাখ্যান করি। আর আমার সাথে যাকে অংশীদার বানানো হলো, তার জন্য পুরোটা দিয়ে দিই।”
একজন মুসলিমের সব কথা, কাজ, চিন্তা, ভাবনা, হাঁটা, চলা, বসা, ঘুমানো, আধ্যাত্মিক কাজকর্ম, জাগতিক কাজকর্ম, ভালোবাসা, ঘৃণা, দান করা, দান করা থেকে বিরত থাকা—সবকিছু হতে হবে আল্লাহকে খুশি করার জন্য।
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ "বলুন (হে মুহাম্মাদ!), নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।”
বান্দার সব কাজে আল্লাহ তাআলার প্রতি ইখলাস থাকতে হবে।
قُلْ إِنِّي أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ اللَّهَ مُخْلِصًا لَّهُ الدِّينَ * "বলুন (হে মুহাম্মাদ!) আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত করতে।”
ইখলাস বা একনিষ্ঠতা বলতে বোঝায় শুধুমাত্র আল্লাহকেই খুশি করার নিয়্যাত রাখা, তাঁরই ইবাদত করা, স্রষ্টার ওপর সৃষ্টিকে স্থান না দেওয়া, সকল কর্মকাণ্ডকে ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে মুক্ত রাখা। আল্লাহ তাআলার মর্যাদা, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, প্রজ্ঞা ও দয়ার বিপরীতে বান্দাদের অক্ষমতা সম্পর্কে যাদের প্রকৃতই ধারণা আছে, তাদের পক্ষে কখনোই সম্ভব না আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য নিজেকে কুরবান করা। কুরআনেরই বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাঁর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। যেমন:
هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ “তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ। তিনিই প্রকাশিত তিনিই গোপন।”
আবার সৃষ্টি সম্পর্কে তিনি বলেছেন,
لَن يَخْلُقُوا ذُبَابًا وَلَوِ اجْتَمَعُوا لَهُ وَإِن يَসْلُبْهُمُ الذُّبَابُ شَيْئًا لَّا يَسْتَنقِذُوهُ مِنْهُ
"...এমনকি সকলে একত্র হয়ে একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারে না। আর মাছি যদি তাদের থেকে কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তা হলে তার থেকে সেটি উদ্ধারও করতে পারে না।"
وَلَا يَمْلِكُونَ لِأَنفُسِهِمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا وَلَا يَمْلِكُونَ مَوْتًا وَلَا حَيَاةً وَلَا نُشُورًا "তারা নিজেদের ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না; জীবন, মৃত্যু, পুনরুত্থানের ওপরও কোনো ক্ষমতা রাখে না।”
مَا يَمْلِكُونَ مِن قِطْمِيرٍ "তারা তো একটি কিতমীরেরও মালিক নয়।"
এতকিছু জেনেও কী করে বান্দা আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করতে পারে?
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ বলেন, “সকল কাজ (এর ফলাফল) নিয়্যাতের ওপর নির্ভরশীল। আর মানুষ তা-ই পাবে, যার নিয়্যাত সে করেছে। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য হিজরত করে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই (অর্থাৎ, আখিরাতে এর প্রতিদান সে পাবে)। আর যে কোনো দুনিয়াবি স্বার্থ বা কোনো নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে হিজরত করল, সে যেই উদ্দেশ্যে হিজরত করেছে সেটিই পাবে (অর্থাৎ, আল্লাহর সন্তুষ্টি বা পরকালীন কোনো প্রতিদান পাবে না)।”
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়নি, এরকম প্রতিটি কাজ বৃথা ও অনর্থক। আল্লাহর প্রতি ইখলাস না রেখেই কেউ হয়তো অনেক মহৎ মহৎ কাজ করে ফেলল। কিন্তু এসকল কাজই দুনিয়া ও আখিরাতে তার মহাবিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। নবীজি আমাদের জানান-
“সর্বপ্রথম তিনজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচার করা হবে। প্রথমজন একজন শহীদ। তাকে এনে আল্লাহ তার প্রতি নিজের অনুগ্রহসমূহ জানাবেন এবং সে তা স্বীকার করবে। আল্লাহ বলবেন, 'তুমি এগুলোর বিনিময়ে কী করেছ?' সে বলবে, 'আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য শহীদ না হওয়া পর্যন্ত আপনার রাস্তায় যুদ্ধ করেছি।' তিনি বলবেন, 'তুমি মিথ্যে বলেছ। তুমি এজন্যই যুদ্ধ করেছ যাতে লোকে তোমাকে বীর বলে। এবং তা বলা হয়েছে।' তারপর তাকে মুখের ওপর উপুড় করে টেনে জাহান্নামে ফেলার হুকুম দেওয়া হবে। দ্বিতীয়জন (দ্বীনের) জ্ঞান শিখত ও শেখাত এবং কুরআন তিলাওয়াত করত। তাকে এনে আল্লাহ তার প্রতি নিজের অনুগ্রহসমূহ জানাবেন এবং সে তা স্বীকার করবে। আল্লাহ বলবেন, 'তুমি এগুলোর বিনিময়ে কী করেছ?' সে বলবে, 'আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য (দ্বীনের) শিক্ষা অর্জন করেছি ও অন্যকে শিখিয়েছি এবং কুরআন তিলাওয়াত করেছি। তিনি বলবেন, 'তুমি মিথ্যে বলেছ। তুমি এজন্যই শিক্ষা অর্জন করেছ যাতে লোকে তোমাকে জ্ঞানী বলে। এবং তা বলা হয়েছে। তারপর তাকে মুখের ওপর উপুড় করে টেনে জাহান্নামে ফেলার হুকুম দেওয়া হবে। তৃতীয়জন হবে এমন এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সব ধরনের সম্পদ দান করেছেন। তাকে এনে আল্লাহ তার প্রতি নিজের অনুগ্রহসমূহ জানাবেন এবং সে তা স্বীকার করবে। আল্লাহ বলবেন, 'তুমি এগুলোর বিনিময়ে কী করেছ?' সে বলবে, 'আপনি যেসব রাস্তায় সম্পদ খরচ করা পছন্দ করেন, আপনার সন্তুষ্টির আশায় আমি সেগুলোর কোনো পথেই সম্পদ খরচ করতে বাদ রাখিনি।' আল্লাহ বলবেন, 'তুমি মিথ্যে বলেছ। তুমি এজন্যই সম্পদ ব্যয় করেছ যাতে লোকে তোমাকে দানশীল বলে। এবং তা বলা হয়েছে।' তারপর তাকে মুখের ওপর উপুড় করে টেনে জাহান্নামে ফেলার হুকুম দেওয়া হবে।
এই হাদীস থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, অনেক বড় বড় নেক আমলও ইখলাসের অভাবে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইখলাসের বিপরীত হলো 'আর-রিয়া'। এর অর্থ হলো-মানুষকে দেখানো বা শোনানোর জন্য নেক আমল করা। মুনাফিকদের সব কাজ ছিল লোক-দেখানো।
وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ
"আর যখন তারা সালাতের জন্য দাঁড়ায়, তখন দাঁড়ায় নিতান্ত অলসতার সাথে এবং মানুষকে দেখানোর জন্য।"
কিছু ক্ষেত্রে রিয়া এমন হয়ে থাকে যে, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যও থাকে, আবার এর সাথে সাথে মানুষের প্রশংসা পাওয়ারও ইচ্ছা থাকে। আরেক রকম রিয়া হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করে মাঝপথে গিয়ে বা কাজ শেষে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়ে যায়।
মুসলিমদের হুকুম করা হয়েছে তারা যেন নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করে সব রকম রিয়া থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে। তবে রিয়ার ভয়ে নেক আমল ত্যাগ করাও আবার ঠিক নয়। নেক আমল করে যেতে হবে এবং নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করার চেষ্টা করে যেতে হবে।
فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا ۞
"অতএব যে-কেউ তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের দাসত্বে আর কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত না করে।"
আত্মাকে দুনিয়াবি কামনা-বাসনা থেকে পরিশুদ্ধ করে এক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্য স্থির করার জন্য ইখলাস আবশ্যক এবং গুরুত্বপূর্ণ।
২. প্রকৃতভাবে রাসূল -এর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের দ্বিতীয় শর্ত হলো নবীজি -এর সুন্নাহ অনুসরণ। কথা- কাজে নিষ্ঠার সাথে সুন্নাহ অনুসরণকারীদের ব্যাপারে ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, “এরা হলো ইয়্যাকা না'বুদু (আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি) আয়াতের বাস্তব উদাহরণ। এদের কথা, কাজ, দান করা, দান করা থেকে বিরত থাকা, ভালোবাসা, ঘৃণা, প্রকাশ্য, গোপনীয় সবকিছুই হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তারা মানুষের কাছে পুরস্কার বা ধন্যবাদ আশা করে না, সমাজে উঁচু আসন পেতে লালায়িত না। তারা প্রশংসা পেতে চায় না, নিন্দিত হওয়াকে ভয় করে না। এদের কাছে মানুষ হলো মরা লাশের মতো যারা (আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে) কোনো উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না। জীবন, মৃত্যু আর পুনরুত্থানের ওপরও এদের কোনো ক্ষমতা নেই।”
একদিকে রবের শ্রেষ্ঠত্ব অপরদিকে মানুষের (নিচু) স্বভাব-এ দুটি বিষয় যারা সঠিকভাবে জানে না তারাই কেবল দুনিয়াবি নাম-যশ-খ্যাতির পেছনে ছুটতে পারে। আর এই দুই ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান থাকলে মানুষের (খারাপ) প্রতিক্রিয়াকে অগ্রাহ্য করে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করা সম্ভব হয়। আল্লাহর পছন্দ-অপছন্দ মেনে কাজ করা সম্ভব হয়। এরকম ইখলাসপূর্ণ কাজই কেবল আল্লাহর দরবারে কবুল হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ۞ الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
“অতি মহান ও শ্রেষ্ঠ তিনি, সর্বময় কর্তৃত্ব ও রাজত্ব যার হাতে; তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন; যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন যে, কাজের দিক দিয়ে তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম।”
তিনি আরো বলেন,
إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
"জমিনের ওপর যা কিছু আছে, আমি সেগুলোকে তার শোভা-সৌন্দর্য করেছি যাতে আমি মানুষকে পরীক্ষা করি যে, আমলের (কাজের) দিক দিয়ে কারা উত্তম।”
ফুযাইল ইবনু ইয়ায বলেন, “সর্বোত্তম আমল হলো সেটি, যা সবচেয়ে নিষ্ঠাপূর্ণ ও সবচেয়ে সঠিক।”
তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, "হে আবুল হাসান! সেটা কেমন?”
তিনি বললেন, “যে কাজটি নিষ্ঠাপূর্ণ কিন্তু সঠিক নয়, তা কবুল হবে না। আর যে কাজটি সঠিক কিন্তু নিষ্ঠাপূর্ণ নয়, তাও কবুল হবে না। দুটিই ঠিক থাকতে হবে।”
এখানে নিষ্ঠাপূর্ণ বলতে বোঝানো হয়েছে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা কাজ। আর সঠিক বলতে বোঝানো হয়েছে নবীজি ﷺ-এর সুন্নাহ মেনে করা কাজ। আল্লাহ তাআলা ঠিক এই বক্তব্যই তুলে ধরেন:
فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا ۞
"আর যে-কেউ তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কোনো শরীক সাব্যস্ত না করে। "
وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِّمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং অধিকন্তু সে সৎকর্মশীল সেই ব্যক্তির চেয়ে এই দ্বীনে আর কে উত্তম থাকতে পারে?”
কোনো কাজে এই দুই বৈশিষ্ট্য না থাকলে কিছুতেই তা আল্লাহর কাছে কবুল হবে না। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবীজি বলেন, “আমাদের শিক্ষার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যে-কোনো আমলই বাতিল বলে গণ্য হবে।”
নবীজি -এর সুন্নাহর সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আমল আল্লাহর সাথে বান্দার দূরত্বই কেবল বৃদ্ধি করে। কারণ আল্লাহর ইবাদতও করতে হবে আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতি অনুযায়ী। কারো খেয়াল-খুশি অনুযায়ী নয়। বান্দা যে আসলেই আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, এর স্বপক্ষে প্রমাণ হিসেবে বান্দা আল্লাহর কাছে নবী -এর সুন্নাহ অনুসরণ করাকে পেশ করে।
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ
“(মানবজাতিকে) বলো (হে মুহাম্মাদ!), তোমরা যদি আসলেই আল্লাহকে ভালোবাসো, তা হলে আমার অনুসরণ করো। (তা হলেই) আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি মার্জনা করে দেবেন।”
রাসূল -এর সুন্নাহ কেবল তখনই প্রকৃতভাবে অনুসরণ করা হবে যখন বিদআতকে প্রত্যাখ্যান করা হবে। বিদআত হলো দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত জিনিস, ইসলামের মধ্যে জোর করে ঢুকিয়ে-দেওয়া মানুষের বিভিন্ন আচার-প্রথা। বিশ্বাসে ও কাজকর্মে, ধার্মিকতায় ও আচরণে, বিচার-আচারে, যুদ্ধাবস্থায় ও শান্তি অবস্থায়, কথাবার্তায় ও নীরবতায়, স্মরণে ও শয়নে-সব ব্যাপারে একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো পরিপূর্ণভাবে রাসূলুল্লাহ -এর সুন্নাহ অনুসরণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا *
"যারা আল্লাহ ও শেষ-দিবসে বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে, নিশ্চয় তাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম দৃষ্টান্ত।”
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا
“আর রাসূল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে তিনি নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো।”
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَوَلَّوْا عَنْهُ وَأَنتُمْ تَسْمَعُونَ *
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং আদেশ শোনার পর তা অমান্য কোরো না।”
কুরআনের চল্লিশটি জায়গায় আল্লাহর অনুসরণের সাথে রাসূলের অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। কাজেই নবীজির সুন্নাহ না মেনে উপায় নেই। সুন্নাহর প্রকৃত অনুসারীদের জন্যই কল্যাণের সব দরজা খোলা। মানুষ বিভিন্ন রকমে সুন্নাহর বিপরীত করে থাকে। যেমন: ক. ইসলামকে নিজেদের পছন্দ-অপছন্দের সাথে খাপ-খাওয়ানোর জন্য নতুন নতুন মতবাদ ও তত্ত্ব খাড়া করানো। খ. শরীয়তকে মানদণ্ড ধরে মানুষকে বিচার করার বদলে মানুষকে মানদণ্ড ধরে শরীয়তকে বিচার করা। শরীয়ত অনুযায়ী বিচার না করে মানুষের মতামত অনুযায়ী কাজ করা। গ. নিজেদের কথা ও কাজকে কুরআন ও সুন্নাহর আগে স্থান দেওয়া।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা (কোনো বিষয়েই) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আগে বেড়ে যেয়ো না; আল্লাহকে ভয় করো; আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর আওয়াজের ওপর তোমাদের আওয়াজ উচ্চ কোরো না।”
ঘ. কিছু বিষয়ে নবীজি ﷺ-কে অনুসরণ করা আর অন্যান্য বিষয়ে তাঁর নির্দেশকে অবহেলা করা। যেমন: সালাত আদায় ও সাওম রাখার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পদ্ধতি অনুসরণ করা, কিন্তু বিচার-আচার ও রাষ্ট্রে পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর পদ্ধতি না মানা। আল্লাহ বলেন,
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ
"তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস করো আর কিছু অংশ অবিশ্বাস করো? "
হিদায়াতের রাস্তায় থাকতে পারা ও ভ্রান্ত পথ থেকে বাঁচতে পারার একমাত্র গ্যারান্টি হলো সুন্নাহকে সঠিকভাবে আঁকড়ে ধরে থাকা।
وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِ
“এটাই আমার সরল-সঠিক পথ, অতএব এর অনুসরণ করো। আর নানান পথের অনুসরণ কোরো না, তা হলে তোমরা তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে।”
অতীতে মুসলিমরা এই সুন্নাহর অনুসরণ ছেড়ে দেওয়ার কারণেই বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। বিদআত ও ধর্মদ্রোহের উদ্ভব এবং বাহাত্তরটি জাহান্নামি দলের উদ্ভব হয় সুন্নাহর অনুসুরণ ছেড়ে দেওয়ার কারণেই। নাজাতের একমাত্র পথ সুন্নাহর প্রকৃত অনুসরণ। সব রকম বিদআত ও ধর্মদ্রোহিতা কুৎসিত। এদের উদ্ভাবকরা ঘৃণিত, তাদের কর্মকাণ্ড পরিত্যাজ্য, তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন।
হে মুসলিম ভাইয়েরা! আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই হলো আপনাদের জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, যা অর্জন করার জন্য আপনাকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হওয়া এবং নবীজি -এর সুন্নাহর অনুসরণ করা আবশ্যক।
এই পথ পুরোটা হেঁটে গিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে আপনাকে এই জনসমাজে সংখ্যালঘু অচেনা মানুষের মতো জীবনযাপন করতে হবে। কারণ বেশিরভাগ মানুষই এ পথে হাঁটা ছেড়ে দিয়েছে। তাদের কাছে এ পথের পথিকরা অপরিচিত, অদ্ভুত। মিথ্যায় বসবাস করা লোকদের কাছে সত্যের আলোয় চলা লোকেরা অদ্ভুত। নবীজি বলেন, "ইসলাম শুরু হয়েছিল অপরিচিত অবস্থায় এবং আবারো এটি অপরিচিত অবস্থায় ফিরে যাবে। অতএব, অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ!”
এ দুনিয়ায় মানুষ সম্পদ-প্রতিপত্তি, খ্যাতি-ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতা করে। তারা এই দুনিয়াকেই একমাত্র আবাস ও শেষ গন্তব্য মনে করে। এটি অর্জনের লক্ষ্যেই তারা চেষ্টা-মেহনত করে। আর আখিরাতকামনাকারীরা তাদের কাছে নিতান্ত অপরিচিত, অদ্ভুত। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “এই দুনিয়ায় একজন মুসাফির বা পথিকের মতো বসবাস করো।” মুসাফির বা পথিকের মন তো তার চূড়ান্ত গন্তব্য ঘরেই পড়ে থাকে। পথিমধ্যে রঙ-বেরঙের বিনোদন দেখে সে সেখানে থেমে থাকে না।
لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا
“মুত্তাকীদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট এমন এমন বাগান রয়েছে, যার নিচে দিয়ে ঝরনাধারা প্রবাহিত। তারা তাতে চিরকাল বসবাস করবে।”

টিকাঃ
১২. বুখারি: ৬৫৪৯; মুসলিম: ৭৩১৮
১৩. সূরা আত-তাওবা, ৯: ৭২
১৪. সূরা আশ-শুরা, ৪২: ১১
১৫. সূরা আয-যুমার, ৩৯: ৬
১৬. সূরা আর-রাহমান, ৫৫: ২৬-২৭
১৭. সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫০
১৮. তিরমিযি: ৩৫৬৬; ইবনু মাজাহ: ১১৭৯
১৯. সূরা ত্বা-হা, ২০: ৭৩
২০. সূরা আল-জাসিয়াহ, ৪৫: ২৩
২১. সূরা আশ-শুরা, ৪২: ১৩
২২. সূরা আল-আনকাবুত, ২৯: ৬৯
২৩. বুখারি: ৭৫৩৭, মুসলিম: ৭০০৬
২৪. মুসলিম: ৬৭৩৭
২৫. সূরা আল-হাজ্জ, ২২: ৩৮
২৬. বুখারি: ৬৫০২
২৭. সূরা আয-যুখরুফ, ৪৩: ৬৮-৭৩
২৮. সূরা আর-র'দ, ১৩: ১৬
২৯. সূরা আল-মুলক, ৬৭: ২২
৩০. সূরা আয-যুমার, ৩৯: ২৯
৩১. সূরা ইউনুস, ১০: ৩২
৩২. সূরা আল-বাকারাহ, ২: ১৭৫
৩৩. সূরা আল-বাকারাহ, ২: ১০২
৩৪. সূরা আশ-শুরা, ৪২: ৪৭
৩৫. সূরা আল-আহকাফ, ৪৬: ৩১
৩৬. সূরা আশ-শুরা, ৪২: ১৩
৩৭. মুসলিম: ৭৬৬৬
৩৮. সূরা আল-আনআম, ৬: ১৬২
৩৯. সূরা আয-যুমার, ৩৯: ১১
৪০. সূরা আল-হাদীদ, ৫৭:৩
৪১. সূরা আল-হাজ্জ, ২২: ৭৩
৪২. সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৩
৪৩. কিতমীর হলো খেজুরের আঁটি সংলগ্ন পাতলা একটি আবরণ, যা তুচ্ছতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
৪৪. সূরা ফাতির, ৩৫: ১৩
৪৫. বুখারি: ১
৪৬. তিরমিযী: ২৩৮২
৪৭. সূরা আন-নিসা, ৪: ১৪২
৪৮. সূরা আল-কাহফ, ১৮: ১১০
৪৯. মাদারিজুস সালিকিন, ১/৮৩
৫০. সূরা আল-মুলক, ৬৭: ১-২
৫১. সূরা আল-কাহফ, ১৮: ৭
৫২. তাফসির ইবনুল কাইয়্যিম, ১/১১৯
৫৩. সূরা আল-কাহফ, ১৮: ১১০
৫৪. সূরা আন-নিসা, ৪: ১২৫
৫৫. বুখারি: ২৬৯৭, মুসলিম: ৪৫৮৯
৫৬. সূরা আলে ইমরান, ৩: ৩১
৫৭. সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ২১
৫৮. সূরা আল-হাশর, ৫৯: ৭
৫৯. সূরা আল-আনফাল, ৮: ২০
৬০. সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯ : ১-২
৬১. সূরা আল-বাকারাহ, ২: ৮৫
৬২. সূরা আল-আনআম, ৬: ১৫৩
৬৩. মুসলিম: ৩৮৯
৬৪. বুখারি: ৬৪১৬
৬৫. সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৫

📘 আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধানে 📄 যা বিশ্বাস করি

📄 যা বিশ্বাস করি


সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত সকল বিষয়ে আমাদের আকীদা (বিশ্বাস) হলো ন্যায়নিষ্ঠ পূর্বসূরিগণের (সালফে সালিহীনদের) আকীদার অনুরূপ।
আগের অধ্যায়ে যে চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের কথা আলোচনা করলাম, তা হলো প্রতিটি মুসলিমের কিবলাহ (দিক)। কথা, কাজ ও নিয়্যাতের মাধ্যমে এই দিকেই সে এগিয়ে চলে। আর আকীদা হলো তাকে সেই দিকে পরিচালিত করার ইঞ্জিন। এটিই তাকে লক্ষ্যপানে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করে এবং হাল ছেড়ে দিতে বাধা দেয়।
আকীদা নষ্ট হয়ে গেলে বা হৃদয়ে এর প্রভাব কমে গেলে নেক আমল করার স্পৃহা শেষ হয়ে যায় অথবা কমে যায়। ফলে, বান্দা তার চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের দিকে অগ্রসর হওয়া থামিয়ে দিয়ে অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় কাজে মগ্ন হয়ে যায়। বান্দার জীবনে কেবল দুটিই অবস্থা। হয় তার আকীদা তাকে আল্লাহর রাস্তায় সামনে চালিয়ে নিয়ে যেতে থাকবে। নয়তো শয়তানের ধোঁকায় পড়ে সে আল্লাহর থেকে দূরে সরে যাতে থাকবে। এর মাঝামাঝি কিছু নেই।
আকীদা কেবল কতগুলো মৌখিক দাবির সমষ্টি নয়। এগুলো কোনো ফাঁকা আড়ম্বরপূর্ণ বাণী নয় যে, কেবল ছন্দ-অলংকারবিদেরাই তা নিয়ে পড়ে থাকবে আর বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ থাকবে না। খালি মুখে স্বীকার করলে, বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা দিলে আর খণ্ডের পর খণ্ড বই লিখে গেলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
আকীদাকে হৃদয়ে এমনভাবে প্রোথিত করে নিতে হয় যাতে কথা ও কাজে এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। এই ব্যাপারে কুরআন এতই গুরুত্ব দিয়েছে যে, ঈমান ও নেক আমলের কথা বারবার একসাথে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায় যে, আমলকে আকীদার সঙ্গী বানিয়ে নিতে হবে। কারণ অন্তরের আকীদার প্রমাণ হলো বাহ্যিক কাজকর্ম। কাজে প্রতিফলিত না হলে ঈমানের মৌখিক দাবি গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَبِكَ هُمْ خَيْرُ الْبَرِيَّةِ ۞
"নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারা হলো সৃষ্টির সেরা।”
وَأَمَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُ جَزَاءً الْحُسْنَى
"আর যে ব্যক্তি ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, তার জন্য আছে উত্তম পুরস্কার। "
مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ )
“যে-কেউ আল্লাহ ও আখিরাত-দিবসের প্রতি ঈমান আনবে আর সৎকাজ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই, চিন্তা নেই।”
مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ *
"যারাই আল্লাহ ও শেষ-দিবসে বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট পুরস্কার আছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।”
فَمَنْ آمَنَ وَأَصْلَحَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ *
"যারা ঈমান আনে ও নিজেকে সংশোধন করে, তাদের নেই কোনো ভয়, নেই তাদের কোনো দুঃখ।”
وَإِنِّي لَغَفَّارُ لِمَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى *
"আর যে তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আর সৎপথে অটল থাকে, আমি তার জন্য অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল।”
إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَبِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ شَيْئًا *
"যারা তাওবা করবে, ঈমান আনবে আর সৎকাজ করবে, তারা বাদে। ফলে এরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে, এদের প্রতি এতটুকুও অবিচার করা হবে না।”
فَأَمَّا মَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَعَسَىٰ أَن يَكُونَ مِنَ الْمُفْلِحِينَ
“যে ব্যক্তি তার জীবনে তাওবা করেছিল আর ঈমান এনেছিল আর সৎকাজ করেছিল, আশা করা যায় সে সাফল্যমণ্ডিতদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”
وَمَا أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُم بِالَّتِي تُقَرِّبُكُمْ عِندَنَا زُلْفَىٰ إِلَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ لَهُمْ جَزَاءُ الضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوا وَهُمْ فِي الْغُرُفَاتِ آمِنُونَ
"না তোমাদের ধন-সম্পদ আর না তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করতে পারবে। তবে যে-কেউ ঈমান আনে আর সৎকাজ করে, তাদেরই জন্য আছে তাদের কাজের বহুগুণে প্রতিদান। তারা সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।”
وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ
"যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য আছে জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত।”
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَٰئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
"যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে, তারাই জান্নাতবাসী। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে।”
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ ۖ فَعَسَىٰ أُولَٰئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
“আল্লাহর মসজিদের আবাদ তো তারাই করবে যারা আল্লাহ ও শেষ-দিবসের প্রতি ঈমান আনে, সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায় তারাই সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।”
مَّا يَفْعَلُ اللَّهُ بِعَذَابِكُمْ إِن شَكَرْتُمْ وَآمَنتُمْ وَكَانَ اللَّهُ شَاكِرًا عَلِيمًا "তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো ও ঈমান আনো, তা হলে তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহ কী করবেন? আল্লাহ পুরস্কারদাতা, সর্ববিষয়ে জ্ঞাত।”
এগুলো কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণা। বারবার এগুলো ঘুরেফিরে এসেছে। খোলাচোখ ও খোলামনসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিই এগুলো অস্বীকার করতে পারে না।
فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ "আসল ব্যাপার হচ্ছে, চোখ অন্ধ হয় না বরং হৃদয় অন্ধ হয়ে যায়, যা বুকের মধ্যে আছে।”
রাসূলুল্লাহ -এর হাদীস থেকেও প্রমাণিত হয় যে, সদাচরণ হলো ঈমানের অংশ। নবীজি বলেন, "ঈমানের সত্তরটিরও অধিক শাখা রয়েছে। এর সর্বোচ্চ শাখা হলো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' ঘোষণা করা এবং সবচেয়ে নিচের শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।”
“তোমাদের যে-কেউ কোনো অন্যায় সংঘটিত হতে দেখে, সে যেন তা হাত (কাজ) দিয়ে প্রতিরোধ করে। সে যদি তা করতে অসমর্থ হয়, তা হলে জিহ্বা (কথা) দিয়ে। যদি তা-ও করতে অসমর্থ হয়, তা হলে অন্তর দিয়ে। আর এটিই ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।”
“যে তাদের বিরুদ্ধে হাত দিয়ে লড়াই করল, সে মুমিন। যে তাদের বিরুদ্ধে জিহ্বা দিয়ে লড়াই করল, সে মুমিন। আর যে তাদের বিরুদ্ধে অন্তর দিয়ে লড়াই করল, সেও মুমিন। এর পরে আর সরিষার দানা পরিমাণ ঈমানেরও অস্তিত্ব নেই।”
ঈমানের দাবিদার সকলেই ঈমানের দাবিতে সত্যবাদী নয়। ঈমানের বাহ্যিক কোনো প্রমাণ না থাকলে সেই দাবি মিথ্যে হয়ে যাবে। ফাঁকা বুলি আর সত্য কথার মাঝে আকাশ- পাতাল ফারাক। চলুন উম্মাহর দুই যুগের দুটি প্রজন্মের একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা করি। একটি ইসলামের শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম সাহাবিগণের, আরেকটি আমাদের বর্তমান সময়ের।
সাহাবিগণের যেই প্রজন্মটিকে আমরা বিশ্বাস ও কাজের দিক দিয়ে অনুকরণ করতে চাই, তাঁরা এমন এক প্রজন্ম যাঁদের আকীদা তাঁদের জাহিলিয়াতের থাবা ও শিরকের আবর্জনা থেকে মুক্ত করে সত্য ও তাওহীদের আলোর দিকে নিয়ে আসে।
আকীদা তথা বিশ্বাসই ছিল তাঁদের এই অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সবচেয়ে মৌলিক প্রভাবক। আমরা বিভিন্ন উদাহরণ থেকে বোঝার চেষ্টা করব যে, এই আকীদা কীভাবে তাঁদের বাহ্যিক কাজকর্মে প্রতিফলিত হয়েছিল। আসলে এরকম উদাহরণ এত অগণিত যে, এর মধ্য থেকে কয়েকটি বেছে বের করা কঠিন। মুহাজির ও আনসারগণের কথাই ধরুন। তাঁদের মধ্যে বয়স্ক, তরুণ, শিশু, নারী, পুরুষ সকলেই ছিলেন। প্রাচুর্য ও সংকট উভয় অবস্থায় তাঁরা দ্বীনের ওপর অবিচল থেকেছেন।
তাঁরা ছিলেন দিনের বেলার অশ্বারোহী আর রাতের বেলার সন্ন্যাসী। অর্থাৎ, দিন কাটত আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে আর রাত কাটত তাহাজ্জুদে চোখের পানি ফেলে। আল্লাহর কাছে তাঁরা নিজেদের জীবন ও সম্পদ বিক্রি করে দিয়েছিলেন জান্নাতের বিনিময়ে। তাঁরপরও তাঁরা প্রচুর তাওবা-ইস্তিগফার করে আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ চাইতেন।
তাঁদের প্রতিটি ঘটনায় সত্যিকার ঈমানের উজ্জ্বল আলোকচ্ছটা ঠিকরে বেরিয়ে আসে। যারা তাঁদের দিকে তাকায়, তাদের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। তারা ভাবতে বসে, “কোন সে জিনিস, যা তাঁদের এত দ্রুত অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে গেল? কীসে তাঁদের শ্রেষ্ঠতম প্রজন্ম বানিয়ে দিল?"
এই তো বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু! মনিব উমাইয়্যাহ ইবনু খালাফকে অমান্য করে, পিঠের নিচের তপ্ত বালি আর বুকের ওপরের ভারি পাথরকে অগ্রাহ্য করে তিনি "আহাদ! আহাদ!” বলে চলেছেন। আর ওই যে খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু আনহু! শরীরের প্রতিটি অংশে লোহিত রঙা তপ্ত লোহার খোঁচা খেয়েও আল্লাহর দ্বীনকে আঁকড়ে ধরে আছেন। আর ওই যে ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর স্ত্রী সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা! খুন হয়ে গেছেন, হায় নিহত হয়ে গেছেন! তবুও ঈমান এক বিন্দু টলেনি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন, "ধৈর্য ধরে থাকো, হে ইয়াসিরের পরিবার! জান্নাত তোমাদের অপেক্ষায়।”
ওই যে দেখুন মুহাজিরগণের কাফেলা! জীবনসঙ্গী, বাচ্চাকাচ্চা, জমিজমা ছেড়ে খালি হাতে ওই যে মরুর পথ ধরে চলেছেন মক্কা ছেড়ে মদীনার দিকে। চলেছেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর দিকে।
ওই দেখুন বদর যুদ্ধে নিজ পিতাকে জবাই করে দিলেন আবু'উবায়দা রাদিয়াল্লাহু আনহু, নিজের ছেলেকে প্রায় মেরেই ফেলেছিলেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু, মুসআব রাদিয়াল্লাহু আনহু হত্যা করে ফেললেন আপন ভাই উবাইদ বিন উমাইরকে।
আরেকটু পেছনে চলে যাই। দেখে আসি আল-আকাবায় রাসূল-এর দিকে আনুগত্যের শপথের হাত বাড়িয়ে থাকা আনসারগণকে। তাঁরা জানতেন এই শপথের কারণে গোটা আরব তাঁদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে হামলে পড়বে, মেরে ফেলবে তাঁদের শ্রেষ্ঠতম মানুষগুলোকে। তারপরও তাঁরা তাদের এই শপথকে লাভজনক বলে জানলেন। সুখে- দুঃখে সকল অবস্থায় এই প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করার ওয়াদা করলেন।
দেখুন কীভাবে তাঁরা মুহাজির ভাইদের সাথে ঘরবাড়ি, টাকাপয়সা, জমিজমা ভাগ করে নিচ্ছেন। আল্লাহ তাঁদের ব্যাপারে বলেন,
يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَبِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
"যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে, তাদের তারা ভালোবাসে। মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে, তা পাওয়ার জন্য তারা নিজেদের অন্তরে কোনো কামনা রাখে না। আর নিজেরা যত অভাবগ্রস্তই হোক না কেন, তাদের (মুহাজিরদের) নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়। মূলত যেসব লোককে তার মনের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে তারাই সফলকাম।”
ওই যে শুনুন বদর যুদ্ধের দিন তাঁরা নবীজি-কে বলছেন, "আপনার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যর দিকে এগিয়ে যান, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার সাথে আছি। সে সত্তার শপথ করে বলছি যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, আপনি যদি সাগরও পাড়ি দিতে সিদ্ধান্ত নেন, আমরা আপনাকে অনুসরণ করব। আমাদের একজনও পেছনে পড়ে থাকবে না। আল্লাহর দয়ায় এগিয়ে চলুন।”
আর এই তো উহুদের দিন নবীজিকে বাঁচাতে গিয়ে তাঁদের মধ্যে সাতজন শহীদ হয়ে গেলেন। আর ওই যে হুনাইনের দিন যখন ১২০০০ যোদ্ধা নবীজি-এর আদেশ মানতে পারলেন না, তখন মাত্র আশিজন আনসার ছুটে এসে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিলেন। হাওয়াযিন গোত্রকে পরাজিত করে গনীমাতের মাল নিয়ে আসলেন। নবীজি আনসারদের ছাড়া অন্যদের মাঝে গনীমাত ভাগ করে দিলেন। সবার আগে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তি থেকে শুরু করে সবার শেষে ফেরত আসা ব্যক্তিদের পর্যন্ত দিলেন। তাদের অন্তর ইসলামের দিকে ঝুঁকে ছিল। আনসারগণ গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আমাদের অংশ কী, হে আল্লাহর রাসূল?" নবীজি জবাব দিলেন, "অন্যেরা (গনীমাতের) উট-ভেড়া নিয়ে ফিরছে, আর তোমরা আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে ফিরছ। এতে কি তোমরা সন্তুষ্ট নও?” তাঁরা কেঁদে বলে উঠলেন, "আমরা আল্লাহর রাসূলকে পেয়ে সন্তুষ্ট।”
চলুন আবার মদীনায় ফিরে যাই। দেখুন আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম সেনাবাহিনীর জন্য তাঁর সব সম্পদ দান করে দিলেন। নিজের পরিবারের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ছাড়া আর কিছুই রাখলেন না। আর এই যে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সহায়-সম্বলের অর্ধেকটা দান করে দিলেন। আর ওই যে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু পুরো সেনাবাহিনীকে নিজ খরচে সজ্জিত করে দিলেন।
চলুন পরিখা (খন্দকের) পেছনে দাঁড়াই। সেই দিনটিকে দেখি যেদিন সম্মিলিত বাহিনী (আহযাব) মদীনাকে ঘিরে ফেলে এক মাস অবরোধ দিয়ে রেখেছিল। আর মুসলিমদের "চক্ষু হয়েছিল বিস্ফোরিত আর প্রাণ হয়েছিল কণ্ঠাগত। " এমন সময় ঈমানদারগণ ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বলে উঠলেন,
وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُ
"আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তো এরই ওয়াদা করেছিলেন।”
মুগ্ধ নয়নে তাকান তাবুকের দিকে, দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে চলা মুসলিম বাহিনীর দিকে। নবীজি-এর সাথে তাঁরা বের হয়েছিলেন দুর্যোগপূর্ণ এক বছরে। মাত্রই পাকতে শুরু করা ফলমূল আর ঘরের আরাম ছেড়ে অল্প কিছু শুকনো খেজুর আর পানিকে সম্বল করে মরুভূমি ধরে রাসূল-এর সাথে খুশিমনে হেঁটে চলেছেন।
আসুন, আসুন! মদীনায় ফিরে গিয়ে ওই গরিব সাহাবিগণের সাথে বসে কাঁদি, যাদের কাছে জিহাদের জন্য দান করার মতো কোনো টাকা ছিল না। রাসূল-এর কাছেও তাঁদের দেওয়ার মতো কোনো বাহন ছিল না।
تَوَلَّوا وَأَعْيُنُهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ حَزَنًا أَلَّا يَجِدُوا مَا يُنفِقُونَ *
"তখন তারা ফিরে গেল, আর সে-সময় তাদের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ছিল এই দুঃখে যে, ব্যয়বহন করার মতো কোনো কিছু তাদের ছিল না।”
শত্রুর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে প্রস্তুত মুসলিম সেনাদের সারিগুলো ধরে হাঁটি, চলুন। দেখবেন তাঁদের মাঝে লুকিয়ে আছেন উমাইর ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু। কারণ নবীজি তাঁকে দেখে ফেললে তো অল্পবয়সী হওয়ার কারণে ফিরিয়ে দেবেন!
মদীনার রাস্তা ধরে হাঁটি, আসুন। দেখুন মদ হারামের আয়াত নাযিল হওয়ার সাথে সাথে রাস্তাগুলো কীভাবে ভেসে যাচ্ছে ফেলে দেওয়া মদের বন্যায়!
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ )
“হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি আর ভাগ্য নির্ধারক তির ঘৃণিত শয়তানী কাজ। তোমরা তা বর্জন করো যাতে তোমরা সাফল্যমণ্ডিত হতে পারো। শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মাঝে শত্রুতা সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে ও সালাত থেকে তোমাদের বাধা দিতে। কাজেই তোমরা কি এসব থেকে বিরত থাকবে?"
খানসা রাদিয়াল্লাহু আনহা কী বলছেন শুনুন। কাদিসিয়ার যুদ্ধে নিজের চার চারজন পুত্রের মৃত্যুসংবাদ শুনে তিনি বলেছেন, “প্রশংসা আল্লাহর যিনি এই চারজনের মৃত্যুর মাধ্যমে আমাকে সম্মানিত করলেন।” ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন, “আমার চারিপাশে এত মাতমকারী না থাকলে আমি নিজেকেই হত্যা করে ফেলতাম।”
এঁরাই তো সে-সকল সাহাবিয়াত, যারা কুরআনের হুকুম শুনে নিজেদের মুখ ঢেকে ফেলেছিলেন।
وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ
"তারা যেন 'জুয়ুবিহিন্না' (তাদের শরীর, ঘাড়, বুক ইত্যাদি) মাথার কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়।"
ওই তো দিনার গোত্রের সেই নারী, যাকে তাঁর স্বামী, ভাই ও পিতার শহীদ হওয়ার সংবাদ দিলে তিনি জিজ্ঞেস করেছেন, “আরে রাসূলুল্লাহ কেমন আছেন?” তাঁকে জানানো হলো রাসূলুল্লাহ ভালো আছেন। রাসূলকে জীবিত দেখতে পেয়ে তিনি বললেন, "আপনার ভালো থাকার তুলনায় আমার যে-কোনো বিপদ-আপদ তুচ্ছ হয়ে যায়।”
গামিদিয়্যাহকে দেখুন। তিনি গোপনে ব্যভিচার করেছিলেন, কেউ জানতে পারেনি। কিন্তু তিনি এত অনুতপ্ত হন যে বারবার এসে রাসূলুল্লাহ -কে জোরাজুরি করতে থাকেন তাঁকে শরীয়ত নির্ধারিত শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে পবিত্র করার জন্য। পাথর নিক্ষেপে নিহত হয়ে তিনি আল্লাহর দরবারে এমনভাবে কবুল হলেন যে, তাঁর তাওবা মদীনার সত্তরজন মানুষের মধ্যে ভাগ করে দিলে তা সবার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে।
মহান সাহাবি আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু মাটিতে গাল ঠেকিয়ে পড়ে আছেন ওই দেখুন! বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বারবার বলছেন তাঁর গালে পাড়া দেওয়ার জন্য। কারণ তিনি বিলালকে একবার শুধু তুচ্ছার্থে “হে কালো নারীর সন্তান!” ডেকে বসেছিলেন।
সাহাবি-প্রজন্মের মুসলিমগণের এত এত দৃষ্টান্তের সামনে দাঁড়িয়ে কানে বাজে আল্লাহ তাআলার বাণী:
مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ذَلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ وَعدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
“মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর তার সাথে যারা আছে, তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর আর নিজেদের মধ্যে পরস্পর দয়ার্দ্র। তুমি তাদের আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টির সন্ধানে রুকু-সেজদারত অবস্থায় দেখতে পাবে। তাদের চিহ্ন হলো তাদের চেহারায় সেজদার প্রভাব পরিস্ফুট হয়ে আছে। তাওরাতে তাদের বর্ণনা এমনই। আর ইঞ্জিলে তাদের উপমা হলো একটি চারাগাছ তার কচিপাতা বের করে, তারপর তা শক্ত হয়, অতঃপর তা কাণ্ডের ওপর মজবুত হয়ে দাঁড়িয়ে যায় যা চাষিকে আনন্দিত করে। ফলে কাফিরদের অন্তর রাগে জ্বলে যায়। তাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহা পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।”
এই তো গেল অতীত ইতিহাসের পাতা। পাতা উল্টে আজকের যুগের অধ্যায়ে আসলে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখতে হয়। নিতান্ত অনিচ্ছাবশত আমাদের এই অপ্রিয় বর্তমানের দিকে তাকানো লাগে। যেন চারিদিকে অন্ধকার, মানুষের ঈমান দুর্বল আর নড়বড়ে। একে নতুন করে বর্ণনা করার কিছু নেই। কারণ আমরা সশরীরে এই বাস্তবতার ভেতর বসবাস করছি। চরম দুঃখ নিয়ে আমরা দেখছি এই উম্মাহর ভাঙন আর বিভেদ, কখনো নরম (ইরজা) আবার কখনো চরমপন্থার (তাকফির) দিকে দুলতে থাকা আকীদা, ধর্মদ্রোহিতা, প্রবৃত্তির অনুসরণ আর কুসংস্কারে ভরা পরিবেশ। পাশ্চাত্যের কাফির বা প্রাচ্যের নাস্তিকদের সাথে আমাদের শাসকেরা খোলাখুলি জঘন্য মিত্রতায় লিপ্ত। এদের সব ভালোবাসা যেন ইহুদি-খ্রিষ্টানদের জন্য আর সকল ঘৃণা ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি। তারা আল্লাহর দেওয়া শরীয়তের বিধানের বদলে মানবরচিত আইন প্রতিষ্ঠা করে, আবার নিজেদের মুসলিম বলেও দাবি করে। এদেরকে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে দুনিয়ালোভী আলেমরা যারা এসব শাসককে 'খলিফা', 'আমীরুল মুমিনীন' ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করে।
সাধারণ মুসলিম জনগণকে এসব শাসকের আনুগত্য করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এদের কুফরি আইনের কাছে বিচার চাইতে বাধ্য করা হচ্ছে। সেক্যুলারিজম হয়ে গেছে নতুন ধর্ম। গণমাধ্যম আর শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে এটিকে প্রবীণ ও নবীন সমাজে প্রচার করা হচ্ছে। এই নতুন ধর্মের দাবি হলো রাজনীতি থেকে ধর্মের পৃথকীকরণ, শুধু মসজিদ নাকি আল্লাহর জন্য আর সংসদ শাসকের জন্য। পথভ্রষ্ট আলেমরা ইরজাগ্রস্ত আকীদা প্রচার করে বেড়াচ্ছে। বলে বেড়াচ্ছে অন্তরে ঈমান থাকলে আর আমলের প্রয়োজন নেই, শাসকসহ সবাই-ই নাকি মুমিন। সুফিবাদ, বাহাই মতবাদ, কাদিয়ানি মতবাদ, নুসাইরি মতবাদসহ যতসব ভ্রান্তির লাগাম খুলে দেওয়া হয়েছে। মুসলিমদের সঠিক আকীদার ভেতর এগুলো বিনা বাধায় বিকৃতির বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এদের Reactions এ নতুন করে উগ্রখারিজি গোষ্ঠীর উদ্ভব হচ্ছে যারা জযবার চোটে গণহারে মুসলিমদের কাফির বলে আখ্যা দিচ্ছে।
এই সব ভ্রান্ত গোষ্ঠীগুলোকে তন্নতন্ন করে খুঁজেও আমাদের সত্যনিষ্ঠ পূর্বসূরিদের আকীদা খুঁজে পাওয়া যায় না। মুষ্টিমেয় যেসব মানুষকে আল্লাহ দয়া করেছেন, তাদের ছাড়া আর কারো মধ্যেই ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে সালাফদের সঠিক আকীদা অবশিষ্ট নেই। সাহাবিগণের প্রজন্ম আলোচনা করার সময় ক্ষণিকের জন্য যে আলোকচ্ছটা আমরা দেখেছিলাম, বর্তমানের আলোচনায় তা নিকষ আঁধারে হারিয়ে যায়।
অতীত-বর্তমানের মাঝে এরকম আকাশ-পাতাল পার্থক্যের পরও উভয় পক্ষই নিজেদের সত্যিকারের মুমিন বলে দাবি করে। মুখের দাবি তো কেবল একটা পতাকার মতো যা তুলে ধরে কেবল নাড়ালেই হলো। কিন্তু এক পক্ষ এই পতাকা ধরেছিল নিষ্ঠার সাথে, কাজেকর্মে সেই দাবি বাস্তবায়ন করে। কিন্তু আরেক পক্ষ পতাকা ধরেছে কেবল ধরতে হয় বলে, পূর্বপুরুষদেরকে ধরতে দেখেছে বলে। কিন্তু কাজকর্মে সেটির কোনো প্রতিফলন নেই।
ইমাম শাফিঈ (আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন) বলেছেন, "মানুষ যদি কেবল সূরা আল-আসর অধ্যয়ন করত, তা হলে এটাই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো।” এই সূরাতে বলা হয়েছে,
وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ * إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ )
"আল-আসর (সময়) এর শপথ! নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে। শুধু তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, একে অপরকে সত্যের উপদেশ দেয় আর ধৈর্যের উপদেশ দেয়।"
আকীদা নিয়ে, তাওহীদ নিয়ে আমরা এত আলোচনা করি কেবল তাত্ত্বিক আলাপ বা দার্শনিক বিতর্কের উদ্দেশ্যে না। আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য হলো উম্মাহর সংশোধন, সব রকম ভ্রান্তি থেকে মুসলিমদের পরিশুদ্ধি। বারবার আলোচনার মাধ্যমে যেন এই বিষয়গুলো আমাদের অন্তরে গেঁথে যায়, তাওহীদ আমাদের কাছে যা কিছু দাবি করে তা যেন আমাদের কাজেকর্মে চলে আসে। আল্লাহর কাছে আমরা সব রকম ভ্রান্ত আকীদা থেকে নিজেদের দায়মুক্তি ঘোষণা করছি। সালাফগণের আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক কথা ও কাজ থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইছি।

টিকাঃ
৬৬. সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, ৯৮: ৭
৬৭. সূরা আল-কাহফ, ১৮: ৮৮
৬৮. সূরা আল-মাইদাহ ৫:৬৯
৬৯. সূরা আল-বাকারাহ ২:৬২
৭০. সূরা আল-আনআম ৬:৪৮
৭১. সূরা ত্বা-হা ২০:৮২
৭২. সূরা মারইয়াম ১৯:৬০
৭৩. সূরা আল-কাসাস ২৮:৬৭
৭৪. সূরা সাবা ৩৪:৩৭
৭৫. সূরা আল-বাকারাহ ২:২৫
৭৬. সূরা আল-বাকারাহ ২:৮২
৭৭. সূরা আত-তাওবা ৯:১৮
৭৮. সূরা আন-নিসা ৪:১৪৭
৭৯. সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪৬
৮০. বুখারি: ৯, মুসলিম: ১৬১
৮১. মুসলিম: ১৮৬
৮২. মুসলিম: ১৮৮
৮৩. সূরা আল-হাশর ৫৯:৯
৮৪. সূরা আল-আহযাব ৩৩:১০
৮৫. সূরা আল-আহযাব ৩৩:২২
৮৬. সূরা আত-তাওবা ৯:৯২
৮৭. সূরা আল-মাইদাহ ৫:৯০-৯১
৮৮. সূরা আন-নূর ২৪:৩১
৮৯. সূরা আল-ফাতহ ৪৮:২৯
৯০. সূরা আল-আসর ১০৩:১-৩

📘 আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধানে 📄 এই আমাদের আকীদা

📄 এই আমাদের আকীদা


• ঈমান হলো মুখ দ্বারা ঘোষণা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা কাজ ও অন্তর দ্বারা বিশ্বাস করার নাম। নেক আমল করলে ঈমান বাড়ে, বদ আমল করলে ঈমান কমে। একইভাবে মুমিনরাও বিভিন্ন স্তরের হয়ে থাকে।
• গুনাহের কাজ করলে ঈমান কমে যায়, কিন্তু এর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায় না। পক্ষান্তরে বড় কুফর (কুফরুল আকবার) ঈমানকে পুরোপুরি বিলীন করে দেয়।
• কুফর দুই ধরনের: বড় (আকবার) ও ছোট (আসগার)। বড় কুফরের কারণে মানুষ ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় এবং কাফির বলে সাব্যস্ত হয়। ছোট কুফরের কারণে মানুষ ইসলাম থেকে বের হয় না। তবে এটি কঠোরভাবে তিরস্কারযোগ্য গুনাহ। বড়-ছোট'র এই প্রকারভেদ শিরক (অংশীবাদ), নিফাক (ভণ্ডামি), যুলুম (অবিচার) ও ফিসক (পাপাচার) এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
• কোনো মুসলিম যত গুনাহ-ই করুক না কেন, অন্তরে সেগুলোকে হারাম বলে মানলে সে কাফির হবে না। এমনকি তাওবা না করলেও না। যেই ফাসিক (পাপাচারী) তার গুনাহের কাজগুলোকে হারাম বলে স্বীকার করে, সে কাফির (অবিশ্বাসী) নয়। এমনকি সে তাওবা ছাড়াই আমৃত্যু এসব গুনাহ করলেও নয়। আখিরাতে তার বিচারের ভার আল্লাহর দায়িত্বে। আল্লাহ চাইলে তাকে মাফ করে দেবেন, চাইলে তাকে সাময়িকভাবে জাহান্নামে শাস্তি দেওয়ার পর জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
• ঈমান ও ইসলামের কথা একসঙ্গে উল্লেখ করা হলে, ঈমান দিয়ে বোঝানো হয় অন্তরের বিশ্বাসকে আর ইসলাম দিয়ে বোঝানো হয় বাহ্যিক আমলকে। আর যখন এর কোনো একটি উল্লেখ করা হয়, তখন এর দ্বারা সম্পূর্ণ দ্বীন ইসলামকে বোঝানো হয়।
• কেউ কুফরি কাজ করলেই আমরা তাকে কাফির বলে সাব্যস্ত করি না, যদি না তা করার জন্য সুস্পষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। কোনোরূপ ব্যাখ্যাও না থাকে। সে জেনেবুঝে ইচ্ছাকৃত ও স্বাধীনভাবে এই কাজ করেছে—এমনটা প্রমাণিত হলেই কেবল জ্ঞানসম্পন্ন যোগ্য ব্যক্তিগণ তাকে কাফির ঘোষণা করবেন।
• আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ তাআলা হলেন স্রষ্টা, রিযিকদাতা; তিনিই জীবন দেন, তিনিই জীবন নেন; তিনিই সকল ভালো-মন্দের নিয়ন্ত্রক। তাঁর পাশাপাশি আমরা অন্য কোনো রব অনুসন্ধান করি না।
قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِي رَبًّا "বলো, 'আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য রব তালাশ করব?'..." [৯১]
• আল্লাহ তাআলা কোনো সঙ্গী, সন্তান, অংশীদার ও প্রতিদ্বন্দ্বীর ঊর্ধ্বে।
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ * "বলো, 'আল্লাহ তিনি অদ্বিতীয়। আল্লাহ আস-সমাদ (যিনি অমুখাপেক্ষী; তাঁর কাউকে দরকার নেই, কিন্তু তাঁকে সবারই দরকার; তিনি ক্ষুধা-তৃষ্ণার ঊর্ধ্বে)। তিনি জন্ম দেন না ও জন্ম নেননি। তাঁর সমকক্ষ বা সমতুল্য কিছু নেই'।" [৯২]
• আল্লাহই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য। ভয়, আশা, স্মরণ, প্রার্থনা, ভালোবাসা, আত্মসমর্পণ, সাহায্য চাওয়া, নাজাত চাওয়া, নির্ভরতা, উৎসর্গ, শপথ ও অন্য সব রকমের উপাসনা শুধু আল্লাহর উদ্দেশ্যেই করতে হবে।
• আমরা কোনো গাছ, পাথর বা কবরের কাছে দুআ করি না। আমরা শুধু আল্লাহর কাছেই দুআ করি। আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলির মাধ্যমে, আমাদের করা নেক আমলের মাধ্যমে অথবা কোনো জীবিত নেককার মানুষের মাধ্যমেই আমরা দুআ করি। আমরা কোনো কবর ঘিরে তাওয়াফ করি না, মৃতের কাছে দুআ করি না, জিন বা মৃত কোনো বুযুর্গের উদ্দেশ্যে কুরবানি করি না, আল্লাহ ছাড়া কারো নামে শপথ করি না। যারা এগুলোর কোনোটা করে, তারা নিশ্চিতভাবেই শিরকে লিপ্ত।
• আল্লাহকে ছাড়া আমরা যেমন অন্য কোনো রব গ্রহণ করি না, তেমনি তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে বিধানদাতা বলে মানি না। তাঁর দেওয়া বিধান ছাড়া অন্য কিছুকে আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণ করি না। সার্বভৌমত্ব আল্লাহর। তিনি বিধান দেন, আদেশ করেন, নিষেধ করেন, বিচার-ফয়সালা দেন, বৈধ-অবৈধ নির্ধারণ করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞানী ও সব বিষয়ে অবহিত।
• যে আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য কোনো আইন প্রণয়ন করে এবং আল্লাহর আইনকে অন্য কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপন করে, সে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে গিয়েছে। সে বিচারকার্যে নিজেকে আল্লাহর সাথে শরীক করেছে। এভাবে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে। সে যদি শাসক হয়ে থাকে, তা হলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাকে অপসারণ করতে হবে।
• আল্লাহ তাঁর কিতাবে ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ-এর মাধ্যমে নিজের যে-সকল নাম ও বৈশিষ্ট্যের কথা জানিয়েছেন, আমরা সেই সবগুলোতে বিশ্বাস করি। আমরা এগুলোর কোনোটিকে পরিবর্তন করি না, অবিশ্বাস করি না, অর্থ বিকৃত করি না, কোনো সৃষ্টির সাথে সেগুলোর সাদৃশ্য সাব্যস্ত করি না। তাঁর বৈশিষ্ট্যসমূহের ধরন- প্রকৃতি সম্পর্কে জানার দাবিও আমরা করি না। কারণ, “কোনোকিছুই তাঁর সদৃশ নয়; তিনি সব শোনেন, সব দেখেন।” [৯৩]
• আল্লাহ নিজের যেসব বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে নিশ্চিত করেছেন এবং মুহাম্মাদ-কে দিয়ে নিজের যেসব বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে নিশ্চিত করেছেন, সেই সবগুলোতে আমরা নিশ্চিত বিশ্বাস করি। যেমন: জ্ঞান, সামর্থ্য, শ্রবণ, দৃষ্টি, চেহারা, হাত ইত্যাদি। এর কোনোটিই কোনো সৃষ্টির সদৃশ নয়।
• আমরা তা-ই বলি যা আল্লাহ জানিয়েছেন, “দয়াময় (আল্লাহ) আরশে সমুন্নত আছেন।”[৯৪] অতএব, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকূলের ঊর্ধ্বে আরশে সমুন্নত। তিনি যে আরশে সমুন্নত, তা জ্ঞাত, কিন্তু তিনি কীভাবে আরশে আছেন তা অজানা। এতে বিশ্বাস করা ওয়াজিব। তিনি কীভাবে আরশে আছেন, তা জিজ্ঞেস করা বিদআত।
• আল্লাহ যখন যা যেভাবে করতে ইচ্ছা করেন, তখন তা সেভাবেই করেন। তিনি আনন্দিত হন, হাসেন, ভালোবাসেন, ঘৃণা করেন, সম্মতি দেন, রাগান্বিত হন-তাঁর শানের সাথে যেভাবে সামঞ্জস্যশীল, সেভাবেই হন-যেমনটা কুরআন ও হাদীসে আছে। তাঁর কোনো কাজই সৃষ্টিকূলের কারো কাজের মতো নয়। মরণশীলদের মাঝে কেউই এগুলোর ধরন-প্রকৃতি সম্পর্কে জানে না।
• কুরআন আল্লাহর সত্য ও অসৃষ্ট কথা, কোনোভাবেই তা মানুষের কথার প্রকৃতির সদৃশ নয়। এমনভাবে তিনি এ কথা বলেছেন, যা সম্পর্কে আমাদের কোনো জ্ঞান নেই।
• আমরা ফেরেশতা ও নবী-রাসূলে বিশ্বাস করি।
• আমরা রাসূলগণের ওপর নাযিল হওয়া সকল কিতাবে বিশ্বাস করি এবং রাসূলগণের মাঝে কোনো পার্থক্য করি না।
• আমরা বিশ্বাস করি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তিনি সমগ্র মানবজাতির সেরা ও নেতা। তিনি নবীগণের সীলমোহর এবং মুত্তাকিগণের নেতা।
• আমরা বিশ্বাস করি মুহাম্মাদ -কে রাতের বেলা জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে জেরুসালেমের মসজিদুল আকসায় নেওয়া হয়েছে এবং আসমানে যে উচ্চতায় আল্লাহ চেয়েছেন, সে উচ্চতায় তাঁকে নেওয়া হয়েছে।
• আমরা নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করি যে, মাহদী (হিদায়াতপ্রাপ্ত ইমাম বা নেতা) মুহাম্মাদ -এর উম্মাহর মধ্য থেকে শেষ জামানায় আবির্ভূত হবেন।
• কুরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদীসে কিয়ামাতের যেসব লক্ষণ বর্ণিত হয়েছে, আমরা সেসবে বিশ্বাস করি। দাজ্জালের আগমন, আসমান থেকে ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর অবতরণ, পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদয়, ভূপৃষ্ঠ থেকে বিশেষ এক প্রাণীর আবির্ভাব ইত্যাদি এসব লক্ষণের অন্তর্ভুক্ত।
• মুনকার এবং নাকীর নামক দুইজন ফেরেশতা কর্তৃক কবরের প্রশ্নোত্তরে আমরা বিশ্বাস করি। রব্ব, দ্বীন ও নবী মুহাম্মাদ -এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে।
• আমরা কবরের আযাবে বিশ্বাস করি। যারা এর যোগ্য, তারা তা ভোগ করবে। আল্লাহ আমাদের তা থেকে রক্ষা করুন। কবর হয় জান্নাতরে একটি উদ্যান বা জাহান্নামের একটি গর্ত হবে। প্রত্যেক বান্দাই তার প্রাপ্য যথাযথভাবে পাবে।
• বিচার-দিবসে কবর থেকে পুনরুত্থিত হয়ে আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে আমরা বিশ্বাস করি। হিসাব-নিকাশ, আমলনামা পাঠ, মীযান স্থাপন, সিরাত পার হওয়া, শাস্তি ও পুরস্কারে বিশ্বাস করি।
• আমরা বিশ্বাস করি নবীজি উম্মাতের জন্য বিচার-দিবসে সুপারিশ করবেন।
• আমরা হাউযে কাউসার বিশ্বাস করি। এটি একটি জলাধার যা থেকে পানি পান করিয়ে উম্মাতের পিপাসা নিবারণ করার জন্য আল্লাহ তাঁর রাসূলকে দান করবেন।
• আমরা বিশ্বাস করি জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়ই সত্য। এগুলো সৃষ্ট এবং কখনো বিলীন হবে না।
• আমরা বিশ্বাস করি যে, জান্নাতবাসীরা তাদের দৃষ্টি সর্বব্যাপী হওয়া ছাড়াই আল্লাহকে সরাসরি দেখবে এবং এই দেখার ধরণ-প্রকৃতি অজানা। ঠিক যেভাবে আল্লাহ বলেছেন, সেভাবেই তা হবে: “কতক চেহারা সেদিন উজ্জ্বল হবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।”[৯৫]
• আমরা তাকদীর ও এর ভালো-মন্দে বিশ্বাস করি। আর আল্লাহ যা বলেছেন, তা-ই বলি : “বলো, 'সবকিছুই আল্লাহর তরফ থেকে।'...”[৯৬] ভালো-মন্দ সবই আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। বিশ্বজগতের সকল কিছু তাঁর ইচ্ছায় সংঘটিত হয়।
• আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে কুফরি ও পাপকাজ করার আদেশ দেন না। বান্দা এগুলো করলে তাতে সন্তুষ্টও হন না। “তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরি পছন্দ করেন না।”[৯৭] আর তিনি যদি কাফিরের জন্য কুফরিকেই পূর্বনির্ধারিত করে থাকেন, তা হলে তার কারণ শুধু তিনিই জানেন। আল্লাহর ন্যায়বিচার, নিজের বিরুদ্ধে বান্দার যুলুম এবং বান্দার অতীত পাপের ফল হিসেবে। "তোমার কোনো কল্যাণ হলে তা হয় আল্লাহর তরফ থেকে এবং তোমার কোনো অকল্যাণ হলে তা হয় তোমার নিজের কারণে।”[৯৮] এ সবকিছুই ঘটে আল্লাহর ইচ্ছে অনুসারে। আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন, তা-ই হবে। আর তিনি যা চান না, তা হবে না। আর আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দার প্রতি অবিচার করেন না। “নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও অবিচার করেন না।”[৯৯]
• আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কর্ম সৃষ্টি করেছেন। “আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদের এবং তোমরা যা তৈরি করো সেগুলোও।”[১০০] বান্দা তাদের নিজেদের কাজ বাস্তবেই সম্পন্ন করে, রূপকভাবে নয়।
• আমরা নবীজি ﷺ-এর সকল সাহাবিকে ভালোবাসি। আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন। তাঁরা শ্রেষ্ঠতম প্রজন্ম। আমরা তাঁদের গুণাবলি স্মরণ করি, তাঁদের অত্যন্ত সম্মান করি ও তাঁদের প্রতি হৃদ্যতা প্রদর্শন করি। তাঁরা যা নিয়ে মতভেদ করেছেন, তা থেকে আমরা দূরে থাকি। তাঁদের ভালোবাসা ইসলামের অংশ, ঈমানের অংশ, ইহসানের অংশ। তাঁদের ঘৃণা করা কুফর ও নিফাক।
• আমরা সমগ্র উম্মাতের ওপর আবু বকর আস-সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করি এবং তাঁর খিলাফতকে স্বীকার করি। একইভাবে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু, উসমান বিন আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং আলী বিন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফাতকে স্বীকার করি। তাঁরা হলেন খুলাফায়ে রাশেদীন ও ন্যায়পরায়ণ নেতা। এঁদের ব্যাপারে নবীজি বলেছেন, “অবশ্যই আমার সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ মেনে চলো এবং তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো।" [১০১]
• আলেমগণের (এই উম্মাহর প্রথম তিন প্রজন্ম ও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী) ব্যাপারে সম্মান সহকারে কথা বলতে হবে। যে ব্যক্তি তাঁদের নিন্দা করে, সে সঠিক পথে নেই।
এই হলো আমাদের আকীদা, যা আমাদের কাছে নিজেদের জীবনের চেয়েও বেশি দামি। চৌদ্দ শতক ধরে এগুলো অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত আছে। কাফিরদের আক্রমণ, মুনাফিকদের ছড়ানো সন্দেহ ও পথভ্রষ্টদের বানানো বিদআতের মোকাবিলায় এগুলো কিয়ামাত পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকবে। অসংখ্য মুসলিমের অবহেলা ও অবজ্ঞা সত্ত্বেও এগুলো টিকে আছে।
আমাদের আকীদার টিকে থাকাই প্রমাণ করে যে, এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। সকল ভ্রান্ত আকীদা বিলুপ্ত হয়ে যায় আর অন্য সব ধর্ম বিকৃত হয়ে যায়। শুধু ইসলামের বিশুদ্ধ রূপ টিকে থাকে। কারণ এটিই একমাত্র সত্য। মিথ্যা ও সন্দেহ দ্বারা একে প্রভাবিত করা যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
“নিশ্চয় আমিই (কুরআন) নাযিল করেছে আর অবশ্যই আমি তার সংরক্ষক।" [১০২]
আমাদের এই বিশ্বাসমালা আমাদের দেয় শক্ত-মজবুত এক ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের দিকে যাত্রা করি। আল্লাহই একমাত্র সত্য ইলাহ এ ব্যাপারে আমরা দৃঢ় বিশ্বাসী। কারণ তিনিই সবকিছুর মালিক, যিনি তাঁর মালিকানাধীন সবকিছুকে কর্তৃত্ব সহকারে শাসন করেন। আর পরিপূর্ণতার বৈশিষ্ট্যসমূহ তাঁরই। তিনি ছাড়া আমাদের অন্য কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই। তিনিই সবচেয়ে মহান।
এই আকীদা আল্লাহর পূর্ণ কর্তৃত্বকে সত্যায়ন করে। তাঁর কর্তৃত্বের কাছে মাথানত করাকে ঈমানের শর্ত ও ইখলাসের চিহ্ন হিসেবে প্রমাণ করে।
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিনা নারী উক্ত নির্দেশের ভিন্নতা করার কোনো অধিকার রাখে না।”[১০৩]
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا )
"কিন্তু না, তোমার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসার ভার তোমার অর্থাৎ (রাসূলের) ওপর ন্যস্ত না করে, অতঃপর তোমার ফয়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কিছুমাত্র কুণ্ঠাবোধ না থাকে, আর তারা তার সামনে নিজেদের পূর্ণরূপে সমর্পণ করে।”[১০৪]
এই আকীদার দাবিই হলো সব ব্যাপার আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে ন্যস্ত করা, এমনকি মতভেদের সময়েও।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا.
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর অনুগত হও এবং রাসূলের অনুগত হও ও কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তিগণের; যদি কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে, তা হলে সেই বিষয়কে আল্লাহ ও রাসূলের (নির্দেশের) দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাত-দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাকো। এটাই উত্তম এবং সুন্দরতম মর্মকথা।”[১০৫]
এই আকীদা আমাদের মধ্যকার সমঝোতা ও ঐক্য রক্ষা করে এবং ঝগড়া-বিবাদের সম্ভাবনা মিটিয়ে দেয়। মুসলিমদের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পথ দেখিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এটি মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করে। দেশ-জাতি-বর্ণে পার্থক্য থাকার পরও সকল মুসলিম একই লক্ষ্যের দিকে ছোটে।
এই আকীদা ধারণকারী প্রতিটি ব্যক্তি নিজের কাজকর্মের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকে। কারণ সে বিশ্বাস করে আখিরাতে তাকে বলা হবে,
اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا )
“পড়ো তোমার আমলনামা। আজ তোমার হিসেব গ্রহণের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।”[১০৬]
এর ফলে মুমিনের অন্তরে আল্লাহর আদেশ-নিষেধের অবাধ্যতার প্রতি ঘৃণা তৈরি হয়। কখনো যদি সে ভুল পথে চলেও যায়, তা হলে এই আকীদা তাকে সাথে সাথে সঠিক পথে ফিরে আসতে উদ্দীপ্ত করে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় অবিরাম প্রচেষ্টা করে যাওয়ার শক্তি যোগায়।
অন্য সব মতাদর্শ ও দর্শনের সাথে আমাদের আকীদার পার্থক্যটা এখানেই। এর ফলেই আমরা তাদের চেয়ে উঁচু মর্যাদায় আসীন। ইসলাম এই আকীদাকে এমন উঁচু মর্যাদার আসন দিয়েছে যেই স্থানটির জন্য অন্য সব মতাদর্শ লালায়িত। তাদের মতাদর্শ আর আমাদের আকীদার বিরাট তফাতের কারণে তাদের কাছে সেই উঁচু মর্যাদার ধারেকাছে পৌঁছানোও অলীক স্বপ্ন।
ইসলামি আকীদা মুসলিমদের এই নিশ্চয়তা দেয় যে, আল্লাহ তাআলা তাদের সাথে আছেন। তাদের তিনি দেখেন, শোনেন, তাদের অন্তরের গোপন খবর জানেন। আর তিনিই তাদের শেষ বিচারের দিনে পুনরুত্থিত করে পুরস্কার বা শাস্তি দেবেন।
সা'সা বিন মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার নবীজি -এর কাছে এসে এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন: "অতএব কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে সে তা দেখবে। আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকাজ করলে, সেও তা দেখবে।”[১০৭] নবীজি বললেন, “এই আয়াত ক'টি শোনাই আমার জন্য যথেষ্ট।”[১০৮]
এই আকীদা আমাদের মিত্রতাকে শুধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদের জন্যই বরাদ্দ রাখে। এ ছাড়া বাকি সবাই আল্লাহ থেকে তাদের দূরত্বের ভিত্তিতে বিভিন্ন মাত্রায় শত্রুতা ও ঘৃণা পাওয়ার যোগ্য। এটি এমন এক আকীদা, যা এর অনুসারীদের দুনিয়ার জীবনের সংকীর্ণতা থেকে বের করে এনে আখিরাতের প্রশস্ততার দিকে নিয়ে যায়। এই আকীদার মানুষদের জমিনে হাঁটতে দেখা গেলেও তাদের অন্তর পড়ে থাকে জান্নাতে। তারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের জন্য সহায়-সম্বল প্রস্তুত রাখে। তারা ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জন্য মেহনত করে না। আল্লাহ ও আখিরাতের দিকে যাত্রায় পাথেয় হিসেবে এখান থেকে যতটুকু নেওয়া দরকার, ততটুকুই তারা কেবল নেয়।
وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ )
“দুনিয়ার জীবন খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই না। যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য পরকালের জীবনই অতি কল্যাণময়। তবুও কি তোমাদের বোধোদয় হবে না?"[১০৯]
وَاللَّهُ خَيْرٌ وَأَبْقَى )
“আল্লাহই (পুরস্কার প্রদানে) শ্রেষ্ঠতর ও (শাস্তি প্রদানে) অধিকতর স্থায়ী।”[১১০]
এই আকীদা তার ধারক-বাহকদেরকে দেয় সম্মানজনক জীবন, যাতে অপমান- অপদস্থতার লেশমাত্র নেই। তাদের জীবনে প্রাচুর্যও আসে, সংকীর্ণতাও আসে; জয়ও আসে, পরাজয়ও আসে। কিন্তু কোনোকিছুই তাদের ঈমান থেকে ও জীবনের লক্ষ্য থেকে টলাতে পারে না। কারণ তারা সম্মান আশা করে কেবল মহান প্রতিপালকের কাছ থেকে, যিনি "উচ্চ মর্যাদাশীল, মহান।"[১১১] এবং وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ) “মহাপরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানী।"[১১২] তারা সম্পদ বা প্রভাব-প্রতিপত্তিতে সম্মান খোঁজে না। পৃথিবীর কোনো ক্ষমতার কাছে ইজ্জত চায় না। তারা যেন এই আয়াতের মূর্ত প্রতিচ্ছবি,
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ
“কিন্তু সমস্ত মান-মর্যাদা তো আল্লাহর, তাঁর রাসূলের ও মুমিনদের।”[১১৩]
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ )
"তোমরা হীনবল ও দুঃখিত হোয়ো না। বস্তুত তোমরাই জয়ী থাকবে, যদি তোমরা মুমিন হও।"[১১৪]
এই আকীদা তার অনুসারীদের দেয় দুনিয়ায় শান্তি ও আখিরাতের কামিয়াবি। আল্লাহরই জন্য সকল কষ্ট সহ্য করে তাঁর সাক্ষাৎ লাভের আশায় তাদের রাখে অবিচল।

টিকাঃ
৯১. সূরা আল-আনআম ৬:১৬৪
৯২. সূরা আল-ইখলাস ১১২:১-৪
৯৩. সূরা আশ-শুরা ৪২:১১
৯৪. সূরা ত্বা-হা ২০:৫
৯৫. সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫:২২-২৩
৯৬. সূরা আন-নিসা ৪:৭৮
৯৭. সূরা আয-যুমার ৩৯:৭
৯৮. সূরা আন-নিসা ৪:৭৯
৯৯. সূরা আন-নিসা ৪:৪০
১০০. সূরা আস-সফফাত ৩৭:৯৬
১০১. তিরমিযি: ২৬৭৬, ইবনু মাজাহ: ৪২, আহমাদ: ১৭১৮৪
১০২. সূরা আল-হিজর ১৫:৯
১০৩. সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৬
১০৪. সূরা আন-নিসা ৪:৬৫
১০৫. সূরা আন-নিসা ৪:৫৯
১০৬. সূরা আল-ইসরা ১৭:১৪
১০৭. সূরা আয-যিলযাল ৯৮:৭-৮
১০৮. মুস্তাদরাক আল-হাকিম: ৬৫৭১
১০৯. সূরা আল-আনআম ৬:৩২
১১০. সূরা ত্বা-হা ২০:৭৩
১১১. সূরা আল-বাকারাহ ২:২৫৫
১১২. সূরা আস-সাফ ৬১:১
১১৩. সূরা আল-মুনাফিকুন ৬৩:৮
১১৪. সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৯

📘 আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধানে 📄 যেভাবে বিশ্বাস করি

📄 যেভাবে বিশ্বাস করি


পরিপূর্ণ ইসলামকে আমরা সেইভাবেই বুঝতে চাই, যেভাবে নবীজি ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ অনুসরণকারী নির্ভরযোগ্য আলেমগণ বুঝেছিলেন।
আমরা নিজেদের 'মুসলিম' পরিচয় দেওয়া যথেষ্ট মনে করি। এর অর্থ হলো, এই উম্মাতের সত্যনিষ্ঠ আলেমগণ ও সালফে সালিহীন ইসলামকে যেভাবে বুঝেছিলেন, আমরাও ঠিক সেভাবেই ইসলামকে বুঝতে চাই। দুঃখের ব্যাপার হলো, 'মুসলিম' বলতে আমরা যা বোঝাতে চাই, আজকের যুগে এই শব্দটি আর সেই একই অর্থ প্রকাশ করছে না। এর ভিন্নরকম অর্থ প্রচলিত হয়ে গেছে। একজন মুসলিমকে ইসলাম সম্পর্কে কতটুকু জানা উচিত, ইসলাম কীভাবে মানা উচিত—এগুলোর ধারণাই পাল্টে দেওয়া হয়েছে। আজকাল 'সমাজতান্ত্রিক মুসলিম', 'উদারপন্থী মুসলিম', 'প্রগতিশীল মুসলিম', 'সেক্যুলার মুসলিম' নামে নতুন নতুন শব্দগুচ্ছ আবিষ্কার হচ্ছে। হুদুদ (ইসলামি পেনাল কোড), হিসবাহ (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ), জিহাদের মতো ইসলামের অনেক মৌলিক বিষয়গুলোই এরা সহ্য করতে পারে না, তারপরও পরিচয় দেয় 'মুসলিম'।
এ থেকেই বোঝা যায় যে নবীজি -এর ওপর ইসলামের যেই বুঝ নাযিল হয়েছিল, আজকের মুসলিমরা আর ইসলামকে সেভাবে বোঝে না। নানা রকম কুফরি-ফাসেকি শক্তি কয়েক শতাব্দী ধরে পরিশ্রম করেছে শুধুমাত্র মুসলিমদের দ্বীনের বুঝকে বিকৃত করে দিতে। এরা চেয়েছে ইসলামের ব্যাপারে মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস নড়বড়ে করে দিতে, দ্বীনের ব্যাপারে হীনম্মন্যতা তৈরি করতে, ঈমান থেকে বের করে পূর্ণ কুফরের দিকে নিতে না পারলেও অন্তত বড়সড় পথভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যেতে। ইসলামের বাস্তবতাকে বিকৃত করতে ও অসংখ্য মুসলিমের ধ্যান-ধারণা অস্পষ্ট করে দিতে তারা অনেকাংশে সফল।
চৌদ্দশ বছর ধরে ইসলামের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকা শত্রুরা ইতিহাস থেকে অনেক কিছু শিখেছে। মুসলিম তলোয়ারের আঘাতে রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের পতন দেখে তারা শিক্ষা নিয়েছে। মঙ্গোলিয়ানদের ধ্বংসযজ্ঞ সিরিয়া, ইরাক, এশিয়া মাইনর পার করে ইসলামি সাম্রাজ্যের প্রায় শেষ সীমা মিশরের পূর্ব দিক পর্যন্ত চলে এসেছিল। এরপর মুসলিমরা কীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাদের পাল্টা আঘাতে একেবারে পর্যুদস্ত করে দিল, সেটাও শত্রুরা দেখেছে। মিশর আর সিরিয়া ভূমিতে দুই শতক ধরে মুহুর্মুহু আছড়ে পড়া ক্রুসেডার জলোচ্ছ্বাসকে মুসলিমরা কীভাবে দমিয়ে দিয়েছে, সেটিও তাদের অজানা নয়। তারা দেখেছে যে, ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে প্রাচ্যের দিকে চীনদেশের অধিবাসীদের কাছ থেকে জিযিয়া নিতে শুরু করেছে, ওদিকে পশ্চিমে ইউরোপের প্রাণকেন্দ্র স্পেন জয় করে ভিয়েনার ফটক পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
শত্রুরা বুঝে গেছে যে ইসলামের পাক্কা অনুসারীরা যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন ইসলাম বিজয়ী হতেই থাকবে। এমন সব অনুসারী, যারা আরব-অনারব-সাদা-কালো নির্বিশেষে সকলেই ইসলামকে একমাত্র সঠিক জীবনব্যবস্থা বলে বিশ্বাস করে।
وَيَوْمَئِذٍ يَفْرَحُ الْمُؤْمِنُونَ بِنَصْرِ اللَّهِ يَنصُرُ مَن يَشَاءُ وَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ ﴿٤﴾
"সেদিন মুমিনরা আনন্দ করবে আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে। যাকে ইচ্ছে তিনি সাহায্য করেন। তিনি মহাপরাক্রমশালী, বড়ই দয়ালু।” [১১৫]
প্রতিপক্ষ যত শক্তিশালী আর অস্ত্রসজ্জিতই হোক, ইসলামের নিষ্ঠাবান অনুসারীদের আল্লাহ বিজয় দিতেই থাকবেন এই বাস্তবতা আমাদের শত্রুদের সামনে প্রতিভাত হওয়ার পর তাদের মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম হয়। এজন্য তারা "রাগে নিজেদের আঙুলের মাথা কামড়াতে থাকে।" [১১৬] এবং নানা রকম চক্রান্ত করতে থাকে। "কিন্তু তাদের চক্রান্ত আল্লাহর নজরেই আছে, যদিও তাদের পরিকল্পনা পাহাড়ও টলিয়ে ফেলার মতো হয়।" [১১৭] আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে রক্ষা করলেন আর তাদের সব চক্রান্ত ভেস্তে দিলেন। “এটা আমাদের প্রতি ও সমগ্র মানবজাতির প্রতি আল্লাহর রহমত।”[১১৮]
উপায় না দেখে শত্রুরা এবার চিন্তার ময়দানে নেমে পড়ে। মুসলিমদের মনে ইসলামের প্রতিচ্ছবিকে বিকৃত করতে তারা মরিয়া হয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ শুরু করে। এর শুরুটা হয়েছিল কুরাইশদের হাতেই। তারা নবীজি -কে কবি, গণক, পাগল ইত্যাদি বলে অপপ্রচার চালাত। সেই জাহিলিয়াতের জের ধরেই ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সেই একই যুদ্ধ এখনো চালানো হচ্ছে। মুসলিমদের মনের মধ্যে ছুরিকাঘাত করে ইসলামের ব্যাপারে ধারণা পাল্টে দেওয়া হচ্ছে। অনেক মুসলিমই এভাবে তাদের শিকারে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয় যখন আমাদেরই মধ্য থেকে কিছু মানুষ বের হয়ে গিয়ে ইসলামের শত্রুদের দলে যোগ দেয়। তারা হয়ে ওঠে জাহান্নামের দরজার দিকে আহ্বানকারী, আমাদের শত্রুদের পণ্যের বিজ্ঞাপনদাতা আর তাদের হয়ে তীর নিক্ষেপকারী। শত্রুদের কাছে কোনোরকম কৃতজ্ঞতা বা পুরস্কারের আশা না করেই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে আমাদের দেশের সরকারগুলো তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতে থাকে।
বিপুলসংখ্যক মুসলিমের মনে ভুল ধারণা গেড়ে বসার পরও তা হলে এই দ্বীনের প্রহরায় কারা এগিয়ে আসতে পারে? মুসলিম বুদ্ধিজীবীরাই তো শত্রুদের মুখপাত্র আর ভ্রান্ত মতাদর্শের প্রচারক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শত্রুদের এজেন্টদের জন্য আমাদের সরকারগুলো নিরাপত্তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ করতেও দ্বিধা করছে না। অতি অল্পসংখ্যক মানুষ সত্যকে আঁকড়ে ধরে আছে। অন্তরে সত্য আঁকড়ে থাকা অনেক মানুষই আবার বাস্তবতার ময়দানে পথভ্রষ্টতার এই ঢেউয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে অপারগতা প্রকাশ করছে। ফলস্বরূপ, তারা ইসলামের এই বিকৃত রূপকে মৌখিক স্বীকৃতি দিয়ে পথভ্রষ্টদের মিছিলের তালে তালেই হাঁটা দিয়েছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইসলামের কর্মীদের উচিত ছিল ঔষধ প্রয়োগ করা। কিন্তু তারাই উল্টো রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। এদের কেউ ইসলামকে কিছু আচার-প্রথার সমষ্টি হসেবে মেনে নিয়েছে, সালাত ও দুআর বাইরে কোনো দাওয়াত প্রচারকেই গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে না। যেন জিহাদ, হিসবাহ, শরিয়ার আইন দিয়ে শাসনের বিধানগুলো পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবগুলোর মতো মানসুখ (রহিত) হয়ে গেছে। অনেকেই বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী ও কুসংস্কার ছেড়ে আসার দাওয়াত দেয়। অথচ যেসব সেক্যুলার শাসক মানবরচিত আইন দিয়ে শাসন করে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে, তাদের ব্যাপারে টু শব্দও করে না।
কেউ আবার ইসলামি জ্ঞান শেখা ও শেখানোকে গুরুত্ব দেয়, কিন্তু দাওয়াত ও জিহাদ-প্রসঙ্গ এলে আর কিছু বলে না। কেউ কেউ পানাহার, পোশাক-আশাক, বিবাহ-শাদির ব্যাপারে রাসূল -এর সুন্নাহকে পুনর্জীবিত করার চেষ্টায় থাকলেও জিহাদ, শাসন ও বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে রাসূল -এর সুন্নাতের কথা বলে না। অনেকে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে জিহাদের জন্য হাঁকডাক ছাড়তে থাকে, কিন্ত জিহাদ ও ইসলামি রাজ্যশাসন করার মতো আত্মিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল গড়ে তোলার দিকে নজর দেয় না। এভাবে খণ্ডিত দ্বীনের অনুসারী হয়ে কোনো অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হয় না।
মুসলিমরা একের পর এক পরাজয়ের স্বীকার হচ্ছে। আমজনতা কেবল নির্বাক চেয়ে চেয়ে দেখছে। অল্প কিছু কর্মী অসহায়ভাবে হতবিহ্বল অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ইসলামকে পরাজয় থেকে বিজয়ের পানে নিয়ে যেতে হলে রোগের কারণ খুঁজে বের করে যথাযথ ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে, এখন তা যত তেতোই হোক না কেন।
وَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ
"কিন্তু তোমরা যা অপছন্দ করো, তা হয়তো কল্যাণকর।”[১১৯]
আমাদের ইসলামের বুঝ কেমন হওয়া উচিত, সেই আলোচনায় যাবার আগে মুসলিমরা কোন জায়গায় ভুল বোঝাবুঝিতে লিপ্ত সেটা পরিষ্কার করে বলা দরকার। এই বিষাক্ত ভুলের পেছনে কারা আছে, কারা একে সমর্থন দিয়ে পরিপুষ্ট করছে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা উচিত। কোন জায়গা থেকে আমাদের লক্ষ্য করে তির মারা হচ্ছে, সেটা তা হলে বের হয়ে আসবে। আমাদের পূর্ববর্তীরা যে ভুল করেছে, তার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সে ব্যবস্থা করা লাগবে। মুসলিমদের এই সুপরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের বিরুদ্ধে সচেতন করতে হবে। আমাদের এই তুচ্ছ প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য থাকবে সত্যনিষ্ঠ পূর্বসূরিদের অনুরূপ দ্বীনের বুঝসম্পন্ন একটি প্রজন্ম গড়ে দিয়ে যাওয়া। এক সুদূর পরাহত লক্ষ্যকে আবারো কাছে নিয়ে আসার জন্য এই প্রজন্ম কাজ করবে সালাফগণের বিশ্বাস ও কর্মপদ্ধতি অনুযায়ী।
ইসলামের অর্থ হলো জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি বশ্যতা স্বীকার, আনুগত্য ও পূর্ণ আত্মসমর্পণ। নবীজি -এর সুন্নাহর অনুসরণও এর অন্তর্ভুক্ত। এতে রয়েছে আমাদের জীবন পরিচালনায় অপরিহার্য আদেশ-নিষেধ ও নিয়ম-কানুন। রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে মানবজাতির সকল বিষয়াদির পূর্ণাঙ্গ সমাধান।
সংক্ষেপে এটিই হলো দ্বীন ইসলামের সেই বুঝ, যা নবীজি -এর ওপর নাযিল হয়েছিল, যেভাবে সালফে সালিহীন একে বুঝেছিলেন, এবং যেমনটা আমরা এই উম্মাহর সত্যনিষ্ঠ আলেমগণের কাছ থেকে শিখেছি। আমাদের আকীদা একেই সত্যায়ন করে যে “আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা।”[১২০] তিনি সবকিছুর ব্যাপারে সম্যক অবগত। যা হয়েছে, যা হবে, আর যা হওয়ার নয়, তার সবই তিনি জানেন। "তিনি যাবতীয় অদৃশ্যের ব্যাপারে জ্ঞানী। আকাশ ও পৃথিবীতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুকণা বা তার চেয়ে ছোট-বড় কোনোকিছুই তাঁর থেকে লুক্কায়িত নেই। সবই সংরক্ষিত আছে এক সুস্পষ্ট কিতাবে।”[১২১] কথা, কাজ ও বিধানের ব্যাপারে তিনি সকল প্রজ্ঞার অধিকারী। বান্দার জন্য আজ কোনটা ভালো, কাল কোনটা ভালো এ ব্যাপারে তিনি পূর্ণ অবগত। মুহাম্মাদ -এর নবুয়্যাত হলো ওহির ধারায় শেষ সীলমোহর। কিয়ামাত পর্যন্ত আগমনরত পুরো মানবজাতির ওপর এই দ্বীন প্রযোজ্য। সকল মানুষ এই দ্বীন মেনে চলার আদেশপ্রাপ্ত।
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا "বলুন (হে মুহাম্মাদ!), 'হে মানব-সম্প্রদায়! নিশ্চয় আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল!” [১২২]
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ "আর যে-কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দ্বীন সন্ধান করে, এটি তার কাছ থেকে কখনোই কবুল করা হবে না। আর আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” [১২৩]
আল্লাহর এই বাণী থেকেই স্পষ্ট হয় যে, এই আসমানী জীবনব্যবস্থা সমগ্র মানবজাতির জন্য। মানুষের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। কোনটিতে মানুষের কল্যাণ, তা এই দ্বীনই বলে দেবে। আমাদের বিশ্বাস, আনুগত্য, নৈতিকতা, রাষ্ট্রীয় কর্মনীতি ও বিশ্বাস, সামাজিক নেতৃত্ব, বিবাদ মীমাংসা, বিচার-ফয়সালা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এই দ্বীনের ভিত্তিতে তৈরি হবে।
এভাবেই নবীজি জীবন পরিচালনা করেছেন। তিনি ছিলেন রাসূল, দাঈ, শাসক, বিচারক, শিক্ষক, সেনাপতি, এবং সালাতের ইমাম। খুলাফায়ে রাশেদীনও ঠিক এই রীতি মেনে চলেছেন। আবু নাজীহ ইরবায রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “একবার আল্লাহর রাসূল এমন খুতবা দিলেন যে আমাদের অন্তর ভীত হয়ে গেল, চোখ অশ্রুসজল হয়ে গেল। আমরা বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! মনে হচ্ছে যেন এটি শেষ খুতবা। তাই আমাদের কিছু উপদেশ দিয়ে যান।' রাসূল বললেন, 'আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি আল্লাহকে ভয় করার এবং কোনো দাসও যদি তোমাদের নেতা হয় তার অনুসরণ করার। নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে যারা (দীর্ঘদিন) বাঁচবে, তারা প্রচুর মতবিরোধ দেখতে পারবে। অতএব, তোমরা অবশ্যই আমার সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরে থাকবে। দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত বিষয় থেকে সাবধান। কারণ প্রতিটি নতুন বিষয়ই বিদআত, প্রতিটি বিদআতই পথভ্রষ্টতা এবং প্রতিটি পথভ্রষ্টতাই জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।" [১২৪]
আমাদের নবীজি সকল শিক্ষা পেয়েছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে। খুলাফায়ে রাশেদীন নবীজির দৃষ্টান্ত ছাড়া আর কোনোকিছুই অনুসরণ করেননি। এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, মানবজীবনের সকল ক্ষেত্র পরিচালনার জন্য নবীজির দেখানো পথ অনুসরণই যথেষ্ট। সালাফে সালেহীন এরকমই করে গেছেন।
আল্লাহ বলেছেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবুল করে নিলাম।" [১২৫]
এই আয়াতাংশ তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। ইসলাম যে পূর্ণাঙ্গ, বোধগম্য এবং জীবনের সকল সময়ের সকল স্থানে বাস্তবায়নযোগ্য, তার দলিল হিসেবে প্রতিটি অংশই আলাদা আলাদাভাবে যথেষ্ট।
'দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা' বলতে বোঝায়, ইসলামে কোনো ছোট-বড় বিষয়কেই অগ্রাহ্য করা হয়নি। সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে আলোচিত হয়েছে। এ থেকে আরো বোঝা যায় যে আকীদা, অর্থনীতি, রাজনীতি, শান্তি, যুদ্ধ, সরকার-কোনো বিষয়েই, কোনো সময়েই, কেউই নতুন কিছু যোগ করে দাবি করতে পারবে না যে, সে ইসলামকে পূর্ণতা দিয়েছে।
'অনুগ্রহের পূর্ণতা'র অর্থ হলো ইসলামের চেয়ে পূর্ণাঙ্গ ও শ্রেষ্ঠতর কিছুই নেই। কারণ এই দ্বীনে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি নেই।
'দ্বীন হিসেবে ইসলামকে নির্ধারণ করা'র অংশ থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ তাঁর বান্দার জন্য কোনো ত্রুটিপূর্ণ দ্বীন পছন্দ করেন না। মুহাম্মাদ -এর প্রতি নাযিল হওয়ার সময় থেকে নিয়ে কিয়ামাত পর্যন্ত আল্লাহ ইসলামকে আমাদের দ্বীন হিসেবে কবুল করে সন্তুষ্ট। কেউ যেন এমন না বলে যে, ইসলাম একটা যুগে পরিপূর্ণ ও সন্তোষজনক ছিল কিন্তু এখন আর তেমনটা নেই। এমনটা বলার অর্থ হলো যে, আল্লাহ মানবজাতিকে সৃষ্টি করে তাদের দেওয়ার মতো চিরস্থায়ী ও সর্বব্যাপী কোনো সমাধান খুঁজে পাননি, সময় ও পরিস্থিতির পরিবর্তনে এমন সমস্যার উদ্ভব হয়েছে যা সম্পর্কে সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান আল্লাহর কোনো ধারণাই ছিল না (নাউযুবিল্লাহ)।
سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ “আল্লাহ (এ অপবাদ থেকে) পবিত্র ও মহান! এটা তো এক গুরুতর অপবাদ।" [১২৬]
এটি এমন এক দ্বীন, যা মেনে চলার জন্য কিয়ামাত পর্যন্ত আসন্ন সকল মানুষকে হুকুম করা হয়েছে।
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ "আল্লাহ ছাড়া কোনো বিধানদাতা নেই।" [১২৭]
وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ "আর তোমরা যেসব বিষয়ে মতভেদ করো, তার মীমাংসা আল্লাহর ওপর সোপর্দ।" [১২৮]
তা হলে কীভাবে এসব নিকৃষ্ট দাবি করা যায় যে, ইসলাম দিয়ে সবকিছুর সমাধান সম্ভব না, প্রয়োজনে এর মৌলিক শিক্ষাগুলো থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে কাজ করতে হবে? বদ্ধ উন্মাদ ছাড়া আর কেউই দাবি করতে পারে না যে সে অর্থনীতি, রাজনীতি, শান্তি, যুদ্ধ, বিশ্বাস ও উপাসনার ক্ষেত্রে ইসলামের চেয়ে ভালো ও পূর্ণাঙ্গ কোনো বিধান নিয়ে আসবে। এমনকি কেউ যদি এমন দাবি করেও বসে, তা হলেও কি আমরা কখনো ইসলাম ছেড়ে সেই পথভ্রষ্টের দিকে দৌড়ে যাব?
ব্যাপকতা, পূর্ণতা, মর্যাদা, পূর্ণাঙ্গতা, প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচার, সূক্ষ্মতা, সহজতা ও ব্যবহারিক প্রয়োগযোগ্যতার দিক দিয়ে ইসলামের চেয়ে উত্তম কোনো বিধান না কখনো মানবজাতি জানত, আর না কখনো জানবে। এটাই রূঢ় বাস্তবতা। ইসলাম জীবনের সর্বব্যাপী। এ হলো কলম-তরাবারি, ইলম-আমল, আকীদা-শরিয়াহ, নীতি ও রাজনীতি, কাজ ও প্রতিদান, দুনিয়া ও আখিরাত।
مَّا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِن شَيْءٍ "কিতাবে আমি কোনোকিছুই বাদ দিইনি।" [১২৯]
ইসলামে রয়েছে আকীদা-বিষয়ক নির্দেশ:
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا "আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক কোরো না।" [১৩০]
রয়েছে ইবাদতের পদ্ধতি: حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ "তোমরা (ফরয) সালাতের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষত মধ্যবর্তী সালাতের (আসর) প্রতি এবং আল্লাহর সামনে বিনীতভাবে দণ্ডায়মান হও।”[১৩১]
শয়তান ও কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আদেশ : وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ "শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না।" [১৩২]
أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا “তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখো না, যে আপন কামনা-বাসনাকে নিজের উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে?”[১৩৩]
পিতামাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ : وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "আর পিতামাতার প্রতি সদ্‌ব্যবহার করো।”[১৩৪]
জ্ঞানার্জনের উৎসাহ : وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا "আর বলো, 'হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।”[১৩৫]
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ "তাদের বলো (হে মুহাম্মাদ!), 'যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান?”[১৩৬]
সার্বিক সদাচরণের নির্দেশ :
وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا “এবং মানুষের সাথে সদালাপ করবে।”[১৩৭]
আল্লাহর আইন দিয়ে শাসন করার নির্দেশ :
وَأَنِ احْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ “অতএব, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী তুমি তাদের মধ্যে বিচার- ফয়সালা করো।" [১৩৮]
মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা এবং এই দ্বীনের প্রচার-প্রচারণা-তাবলীগের নির্দেশ :
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ “তোমার প্রতিপালকের দিকে (মানুষকে) ডাকো জ্ঞান-বুদ্ধি ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করো উত্তম পন্থায়।" [১৩৯]
সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ :
وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ * "তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল হোক, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করে, সৎকাজের আদেশ করে এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করে। আর এরাই সফলকাম।" [১৪০]
আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করার বিধান:
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهُ لَّكُمْ “তোমাদের ওপর যুদ্ধ বাধ্যতামূলক করা হলো, যদিও তোমরা তা অপছন্দ করো।" [১৪১]
সৎকাজে সৎ উদ্দেশ্যে সাহায্য-সহযোগিতা করার আদেশ:
فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا ﴾
“আর যে তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন সৎকাজ করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক না করে।”[১৪২]
কর্ম ও এর প্রতিদানের বর্ণনা:
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ ﴿ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ ﴾
“অতএব, যে অণু পরিমাণ সৎকর্ম করে সে তা দেখতে পাবে। আর যে অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করে, সেও তা দেখতে পাবে।”[১৪৩]
মুসলিম শাসকের আনুগত্য করার বিধান :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর অনুগত হও এবং রাসূলের অনুগত হও ও তোমাদের মধ্যকার কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তিগণের।" [১৪৪]
দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার করার হুকুম :
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ
“নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন হকদারকে তার প্রাপ্য হক তাদের কাছে পৌঁছে দিতে। এবং তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে।" [১৪৫]
নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে স্বেচ্ছাচারিতা না করে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার হুকুম:
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ “কাজকর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো।”[১৪৬]
ইসলাম যেমন ব্যক্তির সাথে প্রতিবেশীর দায়িত্ব-অধিকার নিয়ে আলোচনা করে, তেমনি প্রতিবেশী অমুসলিম জাতিগুলোর সাথে মুসলিম জাতির আচরণবিধিও বর্ণনা করে। বিয়ে, (সন্তান) পরিচর্যা ও তালাকের মতো পারিবারিক বিষয় থেকে শুরু করে সামাজিক জীবনযাপনের ব্যাপারেও বিধিবিধান দেয়। শাসক ও শাসিতের মধ্যে সম্পর্কের রূপরেখা ঠিক করে দেয়। অর্থের লেনদেন এবং আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্র নির্ধারণ করে দেয়। প্রত্যেককে তার নিজ কাজকর্মের পাহারাদার হিসেবে নিযুক্ত করে, কারণ আখিরাতে সকলেই এগুলোর ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। আল্লাহর অবাধ্যতার পরিণাম সম্পর্কে সঠিক বুঝ অন্তরে পয়দা করে। কেউ সীমালঙ্ঘন করলে তার শাস্তি কতটুকু হবে, সেটাও নির্ধারণ করে দেয়। মোটকথা, একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কাঠামোর মধ্যে থেকে ইসলাম মানবজাতির জীবনের সকল বিষয়ের সমাধান দেয়। এমন একটি জীবনব্যবস্থাকে কী করে অন্য কোনো জীবনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে? আল্লাহ বলেন :
أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ ® “যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানবেন না? তিনি অতি সূক্ষ্মদর্শী ও ওয়াকিবহাল।”[১৪৭]
ইসলামকে আংশিক বানিয়ে ফেলার যে-কোনো প্রচেষ্টাই অমার্জনীয় পাপ, কারণ এর মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাটিই ধসে পড়বে। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস বাদ দিয়ে ইসলামি কাজকর্ম করা যায় না, আবার ইসলামি কর্মকাণ্ড বাদ দিলে শুধু বিশ্বাসের কোনো কার্যকারিতা থাকে না। মানুষের পারস্পরিক আচার-আচরণের ইসলামি নীতি বাদ দিয়ে কেবল ইসলামি আচার-অনুষ্ঠান পালন করলেও সেটা আর ইসলাম থাকতে না। আমাদের মুসলিমদের কখনোই উচিত হবে না ইসলামের কিছু অংশ গ্রহণ করে অপর কিছু অংশ বাদ দিয়ে দেওয়া। এমনটা করলে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই বরবাদ হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন:
وَأَنِ احْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ وَاحْذَرْهُمْ أَن يَفْتِنُوكَ عَن بَعْضِ مَا أَنزَلَ اللَّهُ إِلَيْكَ
"আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী তুমি তাদের মাঝে বিচার- ফয়সালা করো। তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ কোরো না। আর তাদের থেকে সতর্ক থাকো; যেন আল্লাহ যা কিছু নাযিল করেছেন, তার কোনো কিছু থেকে তারা তোমাকে ফিতনায় ফেলতে না পারে।"[১৪৮]
ইসলাম পরিপূর্ণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ দ্বীন বলেই এটি মানবজীবনকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করতে সফল হয়। এর কোনো অংশ বাদ দিলে বা পরিবর্তন করলে তা আর সফল হতে পারে না। তার ওপর আধুনিক বিশ্ব এত এত চাহিদা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে যে, ইসলামের সকল অংশকে গ্রহণ না করলে আমরা এগুলোর মোকাবিলা করতে পারব না।
আমাদের সঠিক আকীদা-সম্পন্ন হতে হবে, যেন আমাদের হৃদয় হয় আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়চেতা। এর ফলে আমরা আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করে সব বাধা অগ্রাহ্য করে আমাদের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারব। এমন আকীদার দিকেই আমরা মানুষকে ডাকি এবং এরই শিক্ষা দিই।
ফরয-নফল সকল রকম ইবাদতই আমাদের করতে হবে। কারণ পরকালের চিরস্থায়ী জীবনে এগুলোই আমাদের সাথে যাবে। পাথেয় ছাড়া ভ্রমণ কী করে সম্ভব? এই ইবাদত তথা নেক আমলের ফলে আমাদের অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানের বিরুদ্ধে এগুলো আমাদের হাতিয়ার। নিজেরা তা পালন করা ও অন্যদেরকে এর দিকে ডাকার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করি।
আল্লাহ যেভাবে চান, সেভাবে তাঁর ইবাদত করার জন্য ইলম তথা ইসলামি জ্ঞান অর্জন করতে হবে। সরল পথ থেকে যাতে বিচ্যুত না হয়ে যাই, তার জন্য জ্ঞান অপরিহার্য। নাহলে আমরা তাদের মতো হয়ে যাব "দুনিয়ার জীবনে যাদের চেষ্টা সাধনা ব্যর্থ হয়ে গেছে আর তারা নিজেরা মনে করেছে যে তারা অনেক ভালো কাজ করছে।”[১৪৯] তাই আমাদের লক্ষ্য হলো নিজেরা জ্ঞান অর্জন করে অপরকেও শিক্ষা দেওয়া।
আমাদের আচার-আচরণ যেন সঠিক ও সুন্দর হয়, সেজন্য আমাদের উত্তম চরিত্র অর্জন করতে হবে। শরিয়ত যার সাথে যখন যেভাবে আচরণ করতে বলেছে, তার সাথে তখন সেভাবেই আচরণ করতে হবে। জাহিলি আচরণের কাদায় পিছলে পড়া যাবে না। আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকতে হবে নিজের ও আমাদের আশপাশের মানুষদের চরিত্র পরিশুদ্ধ করার।
ইসলামের এই বার্তাকে সমগ্র মানবজাতির কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কাফিরকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত, মুসলিমকে সঠিকভাবে নেক আমল করার দাওয়াত, গুনাহগারকে তাওবা করার দাওয়াত দিয়ে যেতে হবে। ইসলামের প্রচার-প্রসার না করা হলে এর বিশুদ্ধ বার্তা হারিয়ে যাবে। বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদের প্রচারণা ইসলামের দাওয়াতকে ঢেকে দেবে। তাই মানুষের কাছে এই দ্বীনের তাবলীগ করতে হবে, জান্নাতের সুসংবাদ ও জাহান্নামের ব্যাপারে সতর্কতা জানাতে হবে।
সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করতে হবে। অন্যথায় ইসলামের দাওয়াত ধ্বংস হয়ে যাবে। যতরকম অসৎকাজ আমাদের চোখে পড়ে সেগুলো দূর করতে এবং যতরকম সৎকাজ থেকে আমরা বঞ্চিত সেগুলো অর্জন করতে কঠোর প্রচেষ্টা করতে হবে। এই প্রচেষ্টা হবে ইসলামি আইন ও আলেমগণের শিক্ষা অনুযায়ী।
আমাদের জিহাদ করতে হবে। কারণ জিহাদ ছাড়া কখনোই ইসলামের পতাকা উত্তোলন এবং কুফরি শক্তিগুলোর প্রভাব-প্রতিপত্তি খতম করা যাবে না। আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে মানবরচিত আইন দিয়ে শাসন করা শাসকদেরকে হটিয়ে পুনরায় খিলাফাত প্রতিষ্ঠা করার জন্য জিহাদ অপরিহার্য। এ ছাড়া, আমাদের যেসব ভূখণ্ড কাফিররা দখল করে নিয়েছে, সেগুলো পুনরুদ্ধারের পথও জিহাদ। আমাদের নিজেদের জিহাদের প্রস্তুতি নিতে হবে এবং মুমিনদের এর জন্য উৎসাহিত করতে হবে। আমাদের ছোট-বড় সকল বিষয়ে নবীজি ﷺ-এর দেখানো পদ্ধতি মেনে চলতে হবে। এর ফলে আমাদের অন্তরে নবীর প্রতি ও আল্লাহর দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। এটি আল্লাহকে ভালোবাসার একটি নিদর্শন :
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمُ
“(হে মুহাম্মাদ! মানবজাতিকে) বলো, তোমরা যদি (সত্যিই) আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো, তা হলে আমার অনুসরণ করো। আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি মার্জনা করে দেবেন। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" [১৫০]
আমাদের নবীজির পথ অনুসরণের সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে ও অন্যদেরও এর দিকে ডাকতে হবে। আমাদের সকল বিষয়ে আল্লাহর আইনের শরণাপন্ন হওয়া অপরিহার্য। আমাদের দায়িত্ব হলো এর দিকে আহ্বান জানানো ও আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করার জন্য জিহাদ করা।
এই সবকিছু এবং আরো যা কিছুর হুকুম ইসলাম আমাদের দেয়, সেই সবকিছুই আমাদের পালন করতে হবে। এর যে-কোনো একটি অংশ ছেড়ে দেওয়ার অর্থই হলো আমাদের আন্দোলনের ব্যর্থতা ও পরাজয়কে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা। কারণ আল্লাহ তাঁর রাসূল -এর ওপর নাযিলকৃত এই দ্বীনকে বিজয়ী করার ওয়াদা করেছেন ঠিকই। কিন্তু এই বিজয় তিনি তাদেরই দেবেন, যারা এই দ্বীনকে সঠিকভাবে আঁকড়ে ধরে থাকে:
وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ
“আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশক্তিমান, মহাপরাক্রান্ত।" [১৫১]
উল্টোদিক থেকে বললে, অন্য সব নব-উদ্ভাবিত ও আল্লাহর কাছে অগ্রহণযোগ্য মতাদর্শ কখনোই বিজয় বা গৌরবের অধিকারী হবে না। ইসলামের অপরিহার্য কোনো অংশকে বর্জন করলে সেটা আর ইসলাম থাকে না বরং অন্য মতাদর্শের মতোই হয়ে যায়। তা হলে আমাদের ইসলামকে কাটছাঁট করার সাহস কীভাবে হয়? আমাদের আর কী অজুহাত থাকতে পারে? যখন আমাদের প্রতিপালক বলেই দিয়েছেন:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ নِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবুল করে নিলাম।”[১৫২]
ইসলামের কোনো অংশকে আলাদা সরিয়ে রেখে সেটাকে ইসলাম-বহির্ভূত দাবি করার কোনো অধিকার বান্দার নেই। অথবা ইসলামের কোনো একটি অংশকে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম বলে দাবি করারও কোনো অধিকার নেই। আল্লাহ খুব কড়া ভাষায় আমাদের এসব করতে নিষেধ করে দিয়েছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْফُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِ الْعَذَابِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
“তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস করো আর কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করো? অতএব তোমাদের মধ্যে যে এমনটা করে, তাদের পার্থিব জগতে লাঞ্ছনা-অবমাননা ছাড়া আর কী প্রতিদান হতে পারে? এবং কিয়ামাতের দিন তারা কঠিন শাস্তির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে। আর তারা যা করে, তা সম্পর্কে আল্লাহ অনবহিত বেখবর নন।"[১৫৩]
কত নাদান যে আজকাল আল্লাহর কিতাব, নবীজি -এর সুন্নাহ ও সালাফগণের বুঝের ওপর নিজেদের ধ্যান-ধারণাকে স্থান দিতে শুরু করেছে তার ইয়ত্তা নেই। অনেকে আছে যারা ইসলামের প্রাথমিক যুগের জন্য প্রযোজ্য নিয়মগুলোই কেবল আঁকড়ে ধরে থাকে। কেউ কেউ 'মাক্কী যুগে'র অজুহাত দেয়, কেউ শুধু গোপনে ইসলাম প্রচারকে যথেষ্ট মনে করে, কেউ শুধু 'রক্ষণাত্মক জিহাদে'র বিধানকে স্বীকার করে। অনেককে দেখে তো আবার মনে হয় এখনো ওহি নাযিলই হয়নি! এরকম প্রতিটা মানুষই ইসলামের কোনো না কোনো অংশকে বাদ দিয়ে হিসবে করে। কেউ হিসবাহ অস্বীকার করে, কেউ জিহাদ এড়িয়ে চলে, কেউ দাওয়াত দেয় না, আর কেউ পুরো ইসলামকেই ত্যাগ করে বসেছে। এই সব লোক ও তাদের মিথ্যাচারের মুখোশ উন্মোচন করা আমাদের দায়িত্ব। এদেরকে অবশ্যই আল্লাহকে ভয় করার নসিহত করতে হবে এবং পূর্ণাঙ্গ ইসলামে ফিরে আসার আহ্বান জানাতে হবে।
আল্লাহর কসম! এরা ইসলামের একেক অংশ অস্বীকার করে কেবল নিজেদের ভীরুতা ও অলসতার কারণেই। ইসলামের যেসব অংশকে তাদের খেয়াল-খুশির বিরুদ্ধে মনে হয় না, সেগুলোকেই কেবল তারা নির্দ্বিধায় মানে। তারা যদি ইসলামকে কাটছাঁট না করে নিজেদের ভীরুতা ও অলসতার কথা স্বীকার করে নিত, তা হলে সেটাই তাদের জন্য কল্যাণকর হতো। কিন্তু না! তারা ইসলামকে কাটছাঁট করে নিজেদের ভীরুতা ও অলসতার সাথে মানিয়ে নিয়েছে।
এখানেই শেষ না। তারা এই দাবি করারও সাহস পায় যে, তাদের এই কর্মপদ্ধতিই নাকি বেশি প্রজ্ঞাপূর্ণ। নেতা-বুদ্ধিজীবী-দার্শনিক-তাত্ত্বিক হিসেবে তাদের পদগুলো যতদিন টিকে আছে, ততদিন আল্লাহর দ্বীন বিকৃত হলো কি হলো না এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
এই লোকগুলোর মুখোশ উন্মোচন করা জরুরি। কারণ তারা ইসলামকে রক্ষা করার মৌখিক দাবি করছে, অথচ ইসলামের ভিত্তিকে নিজেরাই গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। এরা ইসলামকে ভাঙচুর করে, অথচ দাবি করে একে নির্মাণ করার। এরা ইসলামকে প্যারালাইজড করে দেয়, নিরস্ত্র করে ফেলে, পঙ্গু করে দেয়, তারপর দোর্দণ্ড জাহিলিয়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিয়ে দেয়। এরপর তাদের এই বিকলাঙ্গ ইসলাম যখন পরাজিত হয়, তখন মানুষ ভাবে যে আল্লাহর দ্বীন ইসলাম পরাজিত হয়ে গেছে।
একটা প্রশ্ন জাগে। ইসলাম কি এতই অসহায় যে, কিছু লোক 'বুদ্ধিবৃত্তিক খবরদারি' না করলে এর চলেই না? অথচ এসকল বুদ্ধিজীবীরাই তো কুরআন-সুন্নাহ-ইজমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইসলামের কিছু অংশ মুছে ফেলার ও পরিবর্তন করার 'মহান' দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে।
سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يَقُولُونَ عُلُوًّا كَبِيرًا )
“তিনি (আল্লাহ) পবিত্র ও অতি উচ্চ, তারা যা বলে তা থেকে অনেক অনেক ঊর্ধ্বে।"[১৫৪]
নিশ্চয় আল্লাহ ভালো করেই জানেন ইসলামকে কীভাবে সাজাতে হবে, কীভাবে এর অনুসারীদের জীবনকে পরিচালিত করতে হবে, কীভাবে শিক্ষা দিতে হবে, এবং গুরুত্বের ভিত্তিতে কাজের ক্রম কীভাবে নির্ধারণ করতে হবে। আল্লাহ ভালো করেই জানিয়ে দিয়েছেন জাহিলিয়াতকে কখন আক্রমণ করতে হয়, কখন আক্রমণ না করে সুযোগের অপেক্ষা করতে হয়। এই উম্মাতের সত্যনিষ্ঠ আলেমগণ এই সব বিষয় ধরে ধরে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। আর সব যুগেই এমন আলেম থাকবেন যারা এই বিশুদ্ধ বার্তা মানুষের কানে পৌঁছে দেবেন। আর যারা ভ্রান্ত মত-পথ আর নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে, ইসলাম তাদের ছাড়াই চলতে পারবে। তাদের 'অভিভাবকগিরি' আর তত্ত্ব-দর্শনের কোনো প্রয়োজনীয়তা ইসলামের নেই। দাওয়াত ও জিহাদের ময়দানে এরা মূল্যহীন। ইসলাম চায় একনিষ্ঠ অনুসারী, যারা এতে কোনো পরিবর্তন, সংকোচন বা পরিবর্ধন সাধন করবে না।
যারা ইসলামের ওপর 'অভিভাবকগিরি' করতে চায়, তাদেরই বরং উচিত ইসলামকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যের চিকিৎসা করা। নিজেদের বুদ্ধিহীনতার কারণেই তারা ইসলামের উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জ্ঞানকে আয়ত্ত করতে পারেনি। এজন্যই তারা ইসলামকে নিজেদের পর্যায়ে নামিয়ে আনতে চায়।
ইসলামের শিক্ষা এবং মুসলিম আলেমগণের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি যে, জিহাদ করার সামর্থ্য না থাকলে তখন আর জিহাদ করা ফরয থাকে না। কিন্তু তখন জিহাদের সামর্থ্য অর্জন করাটাই ফরয হয়ে যায়। কোনো অসৎকাজের নিষেধ করতে গেলে যদি ফলস্বরূপ এর চেয়েও অসৎ কোনো কাজ শুরু হয়ে যায়, তা হলে ওই ক্ষেত্রে অসৎকাজের নিষেধ স্থগিত রাখতে হয়। অসৎকাজের নিষেধ করাটাই তখন নিষেধ। কিন্তু এগুলো হলো বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিশেষ বিধান। তাই বলে দুর্বলতার অজুহাত দিয়ে হিসবাহ কিংবা জিহাদকে একেবারে চিরতরে ত্যাগ করা, নতুন বিধান আবিষ্কার করা বা ইসলামের মানসুখ (রহিত) বিধানগুলো পুনরায় চর্চা করতে শুরু করা—এ সবই অমার্জনীয় অপরাধ। এমন অবস্থান গ্রহণের অর্থ হলো নিজেদের দুর্বল অবস্থাকে চিরস্থায়ী করার চেষ্টা করা। আল্লাহ তাআলা যখন দ্বীনকে পূর্ণ করেই দিয়েছেন, তখন এর বিধিবিধানগুলো আমাদের ওপর চিরতরে আবশ্যক হয়ে গেছে। কোনো একটা সময়ে এসে যদি আমরা নিজেদের দুর্বল অবস্থায় আবিষ্কার করি, তা হলে দুর্বলতা কাটিয়ে সবল অবস্থায় ফেরার জন্য চেষ্টা করতে হবে। তা না করে দুর্বল অবস্থায়ই সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকলে চিরস্থায়ী গ্লানি ও অপমানের বোঝা বইতে হবে।
যারা এই দুর্বল অবস্থাকে স্থায়ী করার জন্য নতুন নতুন বিধান আবিষ্কার করে, তারা একসময় এই অপমানজনক অবস্থা মাথায় নিয়েই মারা যাবে। সেই সাথে তাদের বিকৃত কর্মপদ্ধতিও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আর নয়তো তারা তাওবা করে সঠিক ইসলামে ফিরে আসবে। এদের দুর্বল দলিল ও যুক্তিগুলো শুনলে অবাক হয়ে যেতে হয়। সত্যনিষ্ঠ পূর্বসূরিগণের কেউই কখনোই এসব কথাবার্তা বলেননি। বোঝায় যায় যে এসব যুক্তিতর্কের দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হলো ইসলামের বিধিবিধানকেই ছুড়ে ফেলা। যারা 'মাক্কী যুগে'র দোহাই দেয়, তারা কি মাক্কী যুগের মতোই জেরুজালেমের মসজিদুল আকসার দিকে ফিরে সালাত আদায় করবে? মদপানকে হালাল ঘোষণা করবে? তাহাজ্জুদ সালাতকে ফরয বলে মেনে নেবে? নাকি 'মাক্কী যুগে'র অজুহাত কেবল জিহাদ, হিসবাহ আর তাদের অপছন্দের সব বিধানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য?
ইসলামকে সঠিকভাবে বোঝার মানদণ্ড হলো যেভাবে এই উম্মাহর সত্যনিষ্ঠ পূর্বসূরিগণ বুঝেছেন। তাঁরা হলেন সাহাবি, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম তাবিঈ, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম তাবি-তাবিঈনগণ এবং তাঁদের সকলের পদাঙ্ক অনুসরণকারী অন্য সবাই। এঁরা এই দ্বীনে নতুন কিছু যোগ করেননি, কিছু পরিবর্তন করেননি, কোনো অংশ বাদ দিয়ে দেননি। তাঁরা নবীজির এই কথার বাস্তব প্রতিচ্ছবি, "অবশ্যই আমার সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ মেনে চলো এবং তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো।” (তিরমিযি)
এঁরাই হলেন আমাদের পথ চলার আলো। এঁদের ধরে ধরে আমরা সেই ইসলামের কাছে পৌঁছাব, যা নাযিল হয়েছিল মুহাম্মাদ-এর ওপর। এই আমানত বহনের জন্য আল্লাহ প্রতিটি প্রজন্ম থেকেই সৎ আলেমগণকে বেছে নিয়েছেন। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধানে লিপ্ত, তাদের অবশ্যই এসকল আলেমগণের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে হবে।
আওযাঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “ধৈর্য ধরে সুন্নাহর অনুসরণ করতে থাকো। তাঁরা (সাহাবিগণ) যে অবস্থান নিয়েছেন, সে অবস্থান ধরে রাখো। তাঁরা যা বলেছেন, তা-ই বলো। তাঁরা যা এড়িয়ে গেছেন, তা এড়িয়ে চলো। এবং সালফে সালিহীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করো।" [১৫৫]
নবীজির ওপর নাযিল হওয়া ইসলামকে যারা মানতে চায়, তাদের জন্য কয়েকজন আদর্শ হলেন আবূ বকর, উমর ইবনুল খাত্তাব, 'উসমান বিন আফফান, আলী ইবনু আবি তালিব, যায়দ বিন সাবিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ, আব্দুল্লাহ ইবনু উমর, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আল-আস, সাঈদ বিন মুসাইয়্যিব, খারিজাহ ইবনু যায়দ, উরওয়া ইবনুয যুবাইর, সুলাইমান বিন ইয়াসার, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্দুল্লাহ উতবাহ, আবূ বকর ইবনু আব্দুর রহমান, সামিল ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু উমর, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ, ইমাম আহমাদ, বুখারি, মুসলিম, ইবনু মাঈন, ইবনুল মাদীনী, ইবনু তাইমিয়্যাহ, যাহাবী, ইবনুল কাইয়্যিম, ইবনু রজব-সহ আরো অনেকে।
আর যারা ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে সন্তুষ্ট, তারা "সঠিক পথ হারিয়ে ফেলেছে।”[১৫৬] তারা সত্যকে ছেড়ে মিথ্যা বেছে নিয়েছে। "অতএব, সত্যের পর পথভ্রষ্টতা ব্যতীত আর কীই-বা থাকতে পারে?"[১৫৭]
সত্যনিষ্ঠ পূর্বসূরিগণের বুঝেরই অনুসরণ করতে হবে। কারণ তাঁদের ছিল ইজতিহাদ করার মানসিক সক্ষমতা। প্রতি শতাব্দীতে আল্লাহ তাঁদের মতো প্রাজ্ঞ মুজাদ্দিদ প্রেরণ করেন, যারা উম্মাতের জন্য এই দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করেন। বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা তাঁদের জ্ঞান, দ্বীনদারি, প্রজ্ঞা ও সৎপথে চলার কথা স্বীকার করে। তাঁরা আল্লাহকে ভয় করেন, দুনিয়াবি লোভ বা শাসকের ভয়ে সত্য গোপন করা থেকে বিরত থাকেন। যে- কোনো কথা বলার আগে তাঁরা যেন চোখের সামনে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখতে পান। তাঁরা এই আয়াতের ওপর আমল করেন:
الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللَّهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللَّهَ وَكَفَى بِاللَّهِ حَسِيبًا
"তারা আল্লাহর বাণী প্রচার করত আর তাঁকে ভয় করত। আল্লাহ ছাড়া কাউকে তারা ভয় করত না। হিসাব গ্রহণের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।”[১৫৮]
তাঁরা কখনোই কুরআন-সুন্নাহর ওপর নিজেদের যুক্তিতর্ককে স্থান দেননি। নিজেদের মতামতকে তাঁরা কুরআন ও সুন্নাহর দলিল দ্বারা প্রমাণ করতেন। তাঁদের কোনো কথা যদি অনিচ্ছাবশত নবীজির সুন্নাহর বিরুদ্ধে চলে গিয়েও থাকে, তা প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে সেই কথা ছুঁড়ে ফেলার নির্দেশ দিয়ে গেছেন। নিজেদের যে-কোনো ভুলত্রুটি থেকে আল্লাহর দ্বীনের সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করে গেছেন। নবীজি -এর বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য কোনো আলেমের অন্ধ অনুসরণ করাকে তাঁরা নিষেধ করে গেছেন। তাঁরা বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির পথ পরিহার করে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছেন।
তাঁরা ইখলাস সহকারে আল্লাহর আনুগত্য করতেন, সুন্নাহ অনুসরণ করতেন ও এই সত্য দ্বীন মেনে চলতেন। তাই আল্লাহ তাঁদের কোনো ভুল মতের ওপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন। তাঁদের বানিয়েছেন হক পথের মাইলফলক, যাদের দেখে দেখে পথিক বুঝতে পারে যে সত্যের পথেই আছে। আল্লাহ বলেন :
وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَيَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا ﴿١١٥ “যে ব্যক্তি সত্য প্রকাশিত হওয়ার পরও রাসূলের বিরোধিতা করে এবং মুমিনদের পথ বাদ দিয়ে ভিন্ন পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে সে পথেই ফিরাব যে পথে সে ফিরে যায়। আর তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করব। কত মন্দই- না সে আবাস!” [১৫৯]
সালফে সালিহীনের পথ অনুসরণ করা হলো ভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতার বিরুদ্ধে আমাদের গ্যারান্টি। এটি হলো মুমিনদের সেই 'বিজয়ী দলে'র অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চাবিকাঠি, যেই দলের ব্যাপারে নবীজি বলেছেন, "আমার উম্মাহর একটি দল সত্যের ওপর থেকে যুদ্ধ করতে থাকবে এবং কিয়ামাত পর্যন্ত বিজয়ী থাকবে।” (বুখারি) এই পথ ছেড়ে অন্য পথের অনুসারী হয়েও নিজেকে ইসলামের অনুসারী দাবি করাটা মিথ্যে দাবি। এমন মিথ্যে দাবিতে আমাদের চারপাশ আজ ভরপুর।

টিকাঃ
১১৫. সূরা আর-রুম ৩০:৪-৫
১১৬. সূরা আলে ইমরান ৩:১১৯
১১৭. সূরা ইবরাহীম ১৪:৪৬
১১৮. সূরা ইউসুফ ১২:৩৮
১১৯. সূরা আল-বাকারাহ ২:২১৬
১২০. সূরা আয-যুমার ৩৯:৬২
১২১. সূরা সাবা ৩৪:৩
১২২. সূরা আল-আরাফ ৭:১৫৮
১২৩. সূরা আলে ইমরান ৩:৮৫
১২৪. আবু দাউদ: ৪৬০৭, তিরমিযি: ২৬৭৬; হাসান সহীহ
১২৫. সূরা আল-মাইদাহ ৫:৩
১২৬. সূরা আন-নূর ২৪:১৬
১২৭. সূরা ইউসুফ ১২:৪০
১২৮. সূরা আশ-শুরা ৪২:১০
১২৯. সূরা আল-আনআম ৬:৩৮
১৩০. সূরা আন-নিসা ৪:৩৬
১৩১. সূরা আল-বাকারাহ ২:২৩৮
১৩২. সূরা আল-বাকারাহ ২:১৬৮
১৩৩. সূরা আল-ফুরকান ২৫:৪৩
১৩৪. সূরা আন-নিসা ৪:৩৬
১৩৫. সূরা ত্বা-হা ২০:১১৪
১৩৬. সূরা আয-যুমার ৩৯:৯
১৩৭. সূরা আল-বাকারাহ ২:৮৩
১৩৮. সূরা আল-মাইদাহ ৫:৪৯
১৩৯. সূরা আন-নাহল ১৬:১২৫
১৪০. সূরা আলে ইমরান ৩:১০৪
১৪১. সূরা আল-বাকারাহ ২:২১৬
১৪২. সূরা আল-কাহফ ১৮:১১০
১৪৩. সূরা যিলযাল ৯৯:৭-৮
১৪৪. সূরা আন-নিসা ৪:৫৯
১৪৫. সূরা আন-নিসা ৪:৫৮
১৪৬. সূরা আলে ইমরান ৩:১৫৯
১৪৭. সূরা আল-মুলক ৬৭:১৪
১৪৮. সূরা আল-মাইদাহ ৫:৪৯
১৪৯. সূরা আল-কাহফ ১৮:১০৪
১৫০. সূরা আলে ইমরান ৩:৩১
১৫১. সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪০
১৫২. সূরা আল-মাইদাহ ৫:৩
১৫৩. সূরা আল-বাকারাহ ২:৮৫
১৫৪. সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:৪৩
১৫৫. উসুলু ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, ১/৩০৭
১৫৬. সূরা আল-মাইদাহ ৫:১২
১৫৭. সূরা ইউনুস ১০:৩২
১৫৮. সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৯
১৫৯. সূরা আন-নিসা ৪:১১৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px