📄 আল্লাহর পরিচয়
আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসার আগেই “আল্লাহ” সম্পর্কে জানতে হবে। আল্লাহ শব্দটি এমন একটি ইসমে জাত বা Proper Name যা আকাশে ও জমিনে তিনি ছাড়া অন্য কেউ এই নামটি ব্যবহার করা সমীচীন মনে করেন না। যে নামটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য ব্যবহৃত হয় তাকে Proper Name বলে।
আল্লাহ শব্দের প্রতিশব্দ বিভিন্ন ধর্ম গ্রন্থে লিখা হয়েছে। যেমন GOD, ঈশ্বর, পরমাশ্বর, ভগবান, দেবতা ইত্যাদি। এই শব্দগুলোকে বহুবচন অথবা স্ত্রী লিঙ্গ করা যায়। কিন্তু আল্লাহ শব্দের কোন পুরুষ বাচক বা স্ত্রী বাচক রূপ নেই। আল্লাহ জেণ্ডার বা লিঙ্গ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে। (বিভিন্ন ধর্মে আল্লাহ সম্পর্কে ধারণা, পৃ. নং-৩০- ডা. জাকির নায়েক)
এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই আছেন। সৃষ্টিকর্তা ছাড়া এই বিশ্ব লোক কখনই অস্তিত্ব লাভ করতে পারতো না বা পারেনি। তিনি বহু নন, তিনি এক বা একক। তিনি স্বীয় কুদরতে মহাবিশ্ব সম্পূর্ণ নতুনভাবে পূর্বের কোন নমুনা না দেখেই সৃষ্টি করেছেন। আসমান ও জমিনের সবকিছুই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ মহাবিশ্বকে নিজ শক্তি বলে সৃষ্টি করে নিজেকে আড়ালে রেখে, তাকে কঠিন ও শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করছেন। (স্রষ্টা ও সৃষ্টিতত্ত্ব, পৃ. ৬৮- মাও. মোহাম্মদ আবদুর রহীম)
বর্তমান যুগ হচ্ছে বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল অধ্যয়ন ও গবেষণার পর ফ্লোরিডা একাডেমী অব সায়েন্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্ট-ম্যাককনরস উইনচেষ্টার বলেছেন, আল্লাহতে আমার বিশ্বাস শিথিল না হয়ে আরও জোরদার হয়েছে এবং পূর্বাপেক্ষা এ বিশ্বাস আরও মজবুত বুনিয়াদের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি বৈজ্ঞানিক নয়া আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞান সর্বশক্তিমান আল্লাহর মর্যাদা আর সর্বশক্তি সম্পর্কে যে অন্তর্দৃষ্টি দান করে, তা আরও জোরদার হয়েছে। (চল্লিশ জন সেরা বিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে আল্লাহর অস্তিত্ব পৃ. ১৩২- জন ক্লোভার মোনজমা)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার পরিচয় সম্পর্কে তাঁর পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থ আল-কোরআনে বলেছেন :
قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ - اللهُ الصَّمَدُ - لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ. (الاخلاص : ٤-١)
অর্থ : (হে নবী) বলুন, তিনি আল্লাহ একক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি (সন্তান নেই) এবং তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি (পিতামাতা নেই)। তাঁর সমতুল্য কেউ নেই। (সূরা আল-ইখলাস: ১-৪ নং আয়াত)
আরবী অভিধানে আল্লাহ শব্দের মূল : (اَلَ - إل) “আল-ইলাহ” লেখা হয়েছে। উচ্চারণের সুবিধার্থে ও নামের শ্রুতি মধুরের উদ্দেশ্যে "ইলাহ” শব্দের শুরুতে “হামজাটি” বিলুপ্ত করা হয়েছে। তারপর পাশাপাশি "দুই লামের” মধ্যে ইদগাম বা সংযুক্তি করার পর الله (আল্লাহ) নামটি গঠিত হয়েছে। এ বিষয়ে আসল তথ্য আল্লাহই জানেন। (আল-মু'জামুল ওয়াসিত, পৃ. ৪৫)
অপর দিকে, “ইলাহ” শব্দ থেকে اَللَّهُ নামটি প্রকাশ পেয়েছে। আল্লাহ তা'য়ালার অসংখ্য গুণবাচক নামের মধ্যে "ইলাহ” শব্দটি রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে মাবুদ, উপাস্য। (আধুনিক আরবী-বাংলা অভিধান, পৃ. ১২৪- ড. মোহাম্মদ ফজলুর রহমান)
আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী প্রধান ধর্মসমূহ চূড়ান্ত বিচারে উচ্চতর স্তরে একজন সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বা আল্লাহতে বিশ্বাস করে। সকল ধর্মগ্রন্থই প্রকৃত অর্থেই একেশ্বরবাদের পক্ষে অর্থাৎ প্রকৃত ঈশ্বরে তথা এক আল্লাহতে বিশ্বাসের কথা বলে। (বিভিন্ন ধর্মে আল্লাহ সম্পর্কে ধারণা, পৃ. ৪০- ডা. জাকির নায়েক)
“আল ইলাহ” থেকে “আল্লাহ” নামটি রূপান্তরিত হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে মাবুদ। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন: সকল সৃষ্টির উপর যার দাসত্ব ও মাবুদ হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে তিনি হচ্ছেন “আল্লাহ”। (ফিকহে আল-আসমাউল হোসনা, পৃ. ৯২- আবদুর রাজ্জাক আল-বদর)
জর্ডান বিশ্ববিদ্যালয়ে “আল্লাহ” শব্দটি নিয়ে গবেষণা হয়েছে সেই গবেষণার ফলাফল ইন্টারনেটেও তুলে ধরা হয়েছে। তা এখানে তুলে ধরছি।
ক. আল্লাহ হচ্ছেন জীবিত ও চিরন্তন, তার কোন ঘুম, নিদ্রা নেই। মহান আল্লাহ বলেন:
اللهُ لاَ إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ - لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلا نَوْمٌ . (البقرة : ٢٥٥)
অর্থ : আল্লাহ হচ্ছেন তিনি, তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি জীবিত, চিরন্তন, তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। (সূরা আল-বাকারা : ২৫৫ নং আয়াত)
খ. প্রত্যেক জিনিসের স্রষ্টা হচ্ছেন 'আল্লাহ'। এ সম্পর্কে তিনি বলেন :
اللهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ - (الزمر : ٦٢)
অর্থ : আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের সৃষ্টিকারী। প্রত্যেকটি বস্তুর তিনি সংরক্ষক, পর্যবেক্ষক ও কর্তৃত্বশীল। (সূরা আয-যুমার: ৬২ নং আয়াত)
গ. আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তার মাতাপিতা, সন্তান নেই, তার সমতুল্য কেউ নেই। তাঁর ভাষায়-
اللهُ الصَّمَدُ - لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ. (الاخلاص : ٤-٢)
অর্থ : আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি (স্ত্রী ও সন্তান নেই) এবং তাঁকে জন্ম দেয়া হয়নি (পিতা-মাতা নেই)। তাঁর সমতুল্য কেউ নেই। (সূরা আল-ইখলাস : ২-৫ আয়াত)
(“”) লিল্লাহ শব্দ দিয়ে আল্লাহ-কে চেনার উপায় :
আল্লাহ (الله) শব্দের শুরু- “হামযা” টি বাদ দিলে, শব্দটি তখন “লিল্লাহ” হবে। এই শব্দটি দিয়েও আল্লাহকে চেনা যাবে।
ক. আকাশ ও জমিনের মালিকানা 'লিল্লাহ বা আল্লাহর'। আল্লাহ বলেন :
لِلَّهِ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ - (البقرة : ٢٨٤)
আকাশে ও জমিনে যা কিছু আছে, সকল কিছু লিল্লাহর বা আল্লাহর। (সূরা আল-বাকারা : ২৮৪ নং আয়াত)
খ. নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সকল বাহিনী 'লিল্লাহর' বা আল্লাহর। তিনি বলেন,
وَلِلَّهِ جُنُودُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَكَانَ اللهُ عَلِيمًا حَكِيمًا - (الفتح : ٤)
অর্থ: নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যতো বাহিনী রয়েছে সকলই লিল্লাহর বা আল্লাহর। (সূরা আল-ফাতাহ : ৪ নং আয়াত)
অর্থাৎ : সকল সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে কাউকে শাস্তি, কাউকে রক্ষার কাজ বাস্তবায়ন করে।
গ. আকাশ ও জমিনের রাজত্ব 'লিল্লাহর'। তিনিই ছেলে, মেয়ে দান করেন,
لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَّثًا ويَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ - (الشورى : ٤٩)
অর্থ: নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব 'লিল্লাহর' বা আল্লাহর। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। (সূরা আশ-শুরা : ৪৯ নং আয়াত)
(১) লাহ শব্দ দিয়েও আল্লাহকে চেনা যাবে
“লিল্লাহ” শব্দের প্রথম লামটি যদি বাদ দেয়া হয়, তখন শব্দটি “J” লাহু শব্দে পরিণত হবে। এই শব্দটি দিয়েও আল্লাহকে চেনা যাবে।
ক. ক্ষমতা এবং রিযিকের প্রশস্ততা ও সংকোচন (১) বা আল্লাহর।
لَهُ مَقَالِيدُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ . (الشورى : ۱۲)
অর্থ : আকাশ ও জমিন নিয়ন্ত্রণের (ক্ষমতা) লাহু বা আল্লাহর। তিনি যাকে ইচ্ছা রিযিক বৃদ্ধি করেন এবং যাকে ইচ্ছা পরিমিত রিযিক দেন। (সূরা আশ-শূরা : ১২ নং আয়াত)
খ. বাদশাহী, প্রশংসা এবং প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতা 'লাহুর'
لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ - (تَغَابُنُ : ۱)
অর্থ : বাদশাহী বা রাজত্ব এবং সকল প্রশংসা 'লাহুর' বা আল্লাহর। তিনি প্রত্যেকটি জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। (সূরা আত-তাগাবুন : ১ নং আয়াত)
গ. আল্লাহর সুন্দর সুন্দর (নিরানব্বইটি) নামের কথা “এ” তে বলা হয়েছে।
لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى - (طه : (۸)
অর্থ: (লাহুর) আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ রয়েছে। (সূরা ত্বোহা : ৮ নং আয়াত)
অর্থাৎ : এই নামগুলোর মাধ্যমে আল্লাহকে ডাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আল্লাহ তা'য়ালার পরিচয় জানতে হলে আল্লাহর সৃষ্টি জগৎ নিয়ে চিন্তা বা অনুধাবন করুন, তখন তাঁকে চেনা যাবে। যেমন ধরুন, মানুষের সৃষ্টি রহস্য। ডারউইনের থিউরীতে বলা হয়েছে মানুষ হচ্ছে বানরের বংশধর। অপর দিকে ড. মরিস বুকাইলীর মতে, মানুষের সৃষ্টির মূল বস্তু হচ্ছে "মাটি”। মানুষের দেহে বারটি পদার্থ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়, তা হচ্ছে “অক্সিজেন, কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ক্লোরিন, সালফার ও আয়রণ।” তাছাড়া আরো আটটি পদার্থ মানব দেহে স্বল্প পরিমাণে পাওয়া যায় যেমন, সিলিকন, ক্লোরিন, কোবাল্ট, ম্যাঙ্গানিজ, আয়োডিন, কপার, জিংক এবং মলিবডেনাম। (স্রষ্টা ও সৃষ্টিতত্ত্ব, পৃ. ৪০৯ এর টীকা অংশ - মাও. মোহাম্মদ আবদুর রহীম রহ.)
এই দুই বিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে দুটো তথ্য বেরিয়েছে। মানুষ আসলে বানরের বংশধর, নাকি মাটি থেকে সৃষ্টি? বানর ও মাটি কে বানিয়েছেন? সবাই বলবেন 'আল্লাহ' বানিয়েছেন। মানুষের সৃষ্টি কিভাবে গঠিত হয়েছে তা সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থে আল্লাহ উল্লেখ করে বলেছেন:
اللَّهُ خَلَقَكُمْ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ جَعَلَكُمْ أَزْوَاجًا . (فاطر : (۱۱)
অর্থ : আল্লাহ তোমাদের কে মাটি থেকে, তারপর বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। এরপর তোমাদের যুগল (স্বামী ও স্ত্রী) বানিয়েছেন। (সূরা আল-ফাতির : ১১ নং আয়াত)
অর্থাৎ : মাটি থেকে বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্য উৎপন্ন হয়। সেই খাদ্য দ্রব্য মানুষে খাওয়ার পর শুক্র সৃষ্টি হয়েছে। তারপর স্বামী ও স্ত্রীর যৌন মিলনের ফলে শুক্র ও ডিম্বাণু নারীর গর্ভে সুরক্ষিত স্থানে আল্লাহ রেখেছেন। তারপর রক্ত, মাংসপিণ্ড, অস্থি-পিঞ্জর এবং অস্থির উপরে মাংস দ্বারা আবৃত করেছেন। (সূরা আল-মুমিনূনের : ১৪ নং আয়াতের ব্যাখ্যা- তাফসীরে মারেফুল কোরআন)
📄 আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টিসমূহ
পৃথিবী গ্রহটি একটি গোলরূপে মহাশূন্যে ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। তা স্বীয় মেরু কিলকের উপর এমন নিরবচ্ছিন্নভাবে আবর্তিত হচ্ছে যে, তার ফলে দিনের পরে রাত এবং রাতের পর দিনের আগমন নির্গমন অব্যাহত ধারায় সংঘটিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে তা সূর্যকে কেন্দ্র করেও প্রদক্ষিণ করছে। এই গতিময়তা পৃথিবীকে মহাশূন্যে সঠিক দিকে স্থিত করে রাখে। মেরুরেখার উপর নিজ অক্ষের দিকে পৃথিবীর ২৩ ডিগ্রি পরিমাণ ঝুঁকে থাকার দরুন মৌসুমের পরিবর্তন নিয়মিতভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। এর ফলে পৃথিবীর অধিক এলাকা আবাদ যোগ্য হয়ে যাচ্ছে এবং নানা প্রকারের ও রঙ-বেরঙের শ্যামলতা উর্বরতা জমিনের চাকচিক্য ও কল্যাণ কয়েক গুন বৃদ্ধি পেয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া জীবন রক্ষার জন্য একান্ত অপরিহার্য গ্যাসসমূহ পৃথিবীর উপরিভাগে মহাশূন্যে প্রায় পাঁচশত মাইল উচ্চতা পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। তার একটি পুরুস্তর ভূমণ্ডলকে বেষ্টন করে রয়েছে। ফলে মহাশূন্য থেকে দুই কোটি সংখ্যায় প্রতি সেকেণ্ডে ত্রিশ মাইল বেগে দৈনন্দিন ভূ-মণ্ডলের শূন্য লোকে প্রবেশকারী উল্কাসমূহের ধ্বংসকারিতা থেকে সংরক্ষিত থাকা পৃথিবীর পক্ষে সম্ভব হয়েছে। সূর্য থেকে পৃথিবীর বর্তমান দূরত্ব সামান্যতম বৃদ্ধি করা হলে জীবন বরফের মতো জমাটবদ্ধ হয়ে যেত। আর দূরত্ব হ্রাস করা হলে, সব কিছু জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যেতো। কে এ ব্যবস্থা করেছেন? তিনি হচ্ছেন 'আল্লাহ'। (স্রষ্টা ও সৃষ্টিতত্ত্ব: পৃ. ১২, ১৩-মাও. মোহাম্মদ আবদুর রহীম)
পৃথিবীকে স্থিতিশীল একমাত্র আল্লাহই করেছেন, আল্লাহ বলেন :
اللهُ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فَرَارًا - (غافر : ٦٤)
অর্থ : আল্লাহ তো তিনিই যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে স্থিতিশীল করেছেন। (সূরা গাফির: ৬৪ নং আয়াত)
অর্থাৎ : পৃথিবীকে স্থিতিশীলের উপযোগীর জন্য তিনি জমিনের মধ্যে পাহাড়, পর্বতের ব্যবস্থা করেছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন :
وَالْقَى فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ وَأَنْهَارًا وسُبُلاً. (النحل : ١٥)
অর্থ : তিনি (আল্লাহ) পৃথিবীতে ভারী পাহাড় পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে তা তোমাদেরকে নিয়ে নাড়াচাড়া না করে এবং নদী ও (গিরি) পথ তৈরী করেছেন। (সূরা আন-নাহল : ১৫ নং আয়াত)
পাহাড়ের মধ্যে লাল, সাদা কালো গিরিশিখর ব্যবস্থা আল্লাহ করেছেন। (সূরা আল-ফাতির : ২৭ নং আয়াত)
পাহাড় থেকে নদী-নালার ঝর্ণা ধারা তিনি (আল্লাহ) করে পৃথিবীকে আকর্ষণীয় করেছেন। নদীর পানি দিয়ে জমিনে বিভিন্ন রকমের ফসল উৎপন্ন করার ব্যবস্থা আল্লাহ করেছেন। নদী-নালা থেকে তাজা মাছ ও মণি মুক্তার ব্যবস্থা আল্লাহ করেছেন। আল্লাহ বলেন :
وَهُوَ الَّذِي سَخَّرَ الْبَحْرَ لِتَأْكُلُوا مِنْهُ لَحْمًا طَرِيًّا وَتَسْتَخْرِجُوا مِنْهُ حِلْيَةً تَلْبَسُونَهَا وَتَرَى الْفُلْكَ مَوَاخِرَ فِيهِ. (النحل : ١٤)
অর্থ : তিনি (আল্লাহ) সমুদ্রকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা তাজা মাছ (মাংস) খেতে পারো এবং পরিধেয় অলংকার বের করো। আর জল যানসমূহকে তুমি দেখবে পানি চিরে চলতে। (সূরা আন-নাহল : ১৪ নং আয়াত)
অর্থাৎ : মানুষ ও চতুষ্পদ জীবদের যা কিছু প্রয়োজন, সকল কিছুর ব্যবস্থা যিনি করেছেন তিনি হচ্ছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন।
আমাদের এ মহাবিশ্বটি সৃষ্টির পর থেকে মহাসম্প্রসারণের কারণে কল্পনাतीतভাবে চতুর্দিকে সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমানে ২০ হাজার বিলিয়ন আলোকবর্ষ ব্যাপি ছড়িয়ে পড়েছে। বিশাল এ মহাবিশ্বের মাঝে গ্যালাক্সি ৩ লক্ষ-ই হচ্ছে বৃহত্তম সংগঠন। এরপর তৃতীয় বৃহত্তম সংগঠন হচ্ছে এক একটি গ্যালাক্সি। একটি গ্যালাক্সির ব্যাস হচ্ছে প্রায় এক লক্ষ আলোকবর্ষ। মহাবিশ্বে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি গ্যালাক্সি আবিষ্কৃত হয়েছে। একটি গ্যালাক্সি হতে আরেকটি গ্যালাক্সির গড় দূরত্ব হচ্ছে প্রায় ২২ লক্ষ আলোকবর্ষ। প্রতিটি গ্যালাক্সিতে আবার অবস্থান করছে গড়ে প্রায় ৪০ কোটি নক্ষত্র। এদের অধিকাংশ নক্ষত্রই হচ্ছে সৌর পরিবার। সৌর জগতের তুলনায় আমাদের পৃথিবী অনেক ক্ষুদ্র মহাজাগতিক বস্তু। সমস্ত মহাবিশ্বের তুলনায় আমাদের এই পৃথিবী বিন্দুর সমতুল্য। সে হিসেবে ব্যক্তি মানুষ মহাবিশ্বের তুলনায় অনুপ্রেরযোগ্য। অথচ সেই মানুষকেই আল্লাহ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মর্যাদা দান করেছেন। (কুরআনুল কারীমের সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ-৪র্থ খণ্ডের সিরিয়া স্তব্দ-মুহাম্মদ আনওয়ার হুসাইন)
মহাশূন্যের গ্রহ-নক্ষত্র একটি আরেকটি থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। এদের এই দূরত্ব ও বিরাটত্বই এদের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করে রেখেছে। পক্ষান্তরে মহাশূন্যে যে সব বস্তু যত নিকটে- তাদের পারস্পরিক আকর্ষণ তত শক্তিশালী। চাঁদের বেলায় একথা সত্য বলে প্রমাণিত। তাই মহাশূন্যের গ্রহ-নক্ষত্রগুলো একটি নিয়মের মধ্যে বিরাজমান। ফলে তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ঘটবার কোন অবকাশ নেই। (আল-কোরআন থেকে আধুনিক বিজ্ঞান পৃ. ১৮১, সোলেমানিয়া বুক হাউজ, ঢাকা-১১০০)
আকাশ সৃষ্টি সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা আল-কোরআনে বলেন :
ألَمْ تَرَوْا كَيْفَ خَلَقَ اللهُ سَبْعَ سَمَوَاتِ طَبَاقًا وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيهِنَّ نُورًا وَجَعَلَ الشَّمْسَ سِرَاجًا - (نوح : ١٦-١٥)
অর্থ : তোমরা কি ভেবে দেখছো? আল্লাহ কিভাবে স্তর বিন্যাস করে সপ্ত আকাশ সৃষ্টি করেছেন। চন্দ্রকে আলো এবং সূর্যকে প্রদীপ বানিয়েছেন। (সূরা নূহ: ১৫, ১৬ নং আয়াত)
অর্থাৎ : আকাশকে সাতটি স্তরে আল্লাহ বানিয়েছেন। আকাশ সৃষ্টি সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা আরো বলেন:
ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانٌ - (فصلت : (۱۱)
অর্থ : তারপর আল্লাহ আকাশ (সৃষ্টি) বিষয়ে মনোনিবেশ করলেন, তখন (আকাশ) তা ছিল ঘনীভূত ধোঁয়া বা বাষ্প। (সূরা ফুসসিলাত: ১১ নং আয়াত)
ধোঁয়া বা বাষ্প থেকে সাতটি আসমান আল্লাহ দুই দিনে বানিয়েছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন :
فَقَضَهُنَّ سَبْعَ سَمَوَاتٍ فِي يَوْمَيْنِ - (فصلت : (۱۲)
অর্থ : তারপর সাত আকাশকে দুই দিনে সমাপ্ত করেছেন। (সূরা ফুসসিলাত : ১২ নং আয়াত)
তারপর দেখা যাচ্ছে আকাশে অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্র রয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন :
والسَّمَاءِ ذَاتِ الْبُرُوج - (البروج : (۱)
অর্থ : শপথ গ্রহ-নক্ষত্র সুশোভিত আকাশের। (সূরা আল-বুরূজ: ১ নং আয়াত)
বিজ্ঞানিরা বুরূজ মানে 'গ্যালাক্সি' হিসেবে ধরে নিয়েছেন। এটি হচ্ছে নক্ষত্রের শহর। বর্তমানে বৈজ্ঞানিকরা একশত কোটি গ্যালাক্সির সন্ধান লাভ করেছে। (কোরআন, মহাবিশ্ব, মূলতত্ত্ব- ৩য় খণ্ডের সূচনা ও পৃ. ৪৪৮ -মুহাম্মদ আনোয়ার হুসাইন)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মহাবিশ্বের মধ্যে রাত থেকে বা কৃষ্ণ গহ্বর বানিয়ে নক্ষত্র পতনের ব্যবস্থা করেছেন, মহাশূন্যে প্রত্যেক বস্তুকে ঘুর্ণন করা হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন :
فَلَا أُقْسِمُ بِمَوَاقِعِ النُّجُومِ وَإِنَّهُ لَقَسَمٌ لَّوْ تَعْلَمُونَ عَظِيمٌ .
(الواقعة)
অর্থ : না, আমি নক্ষত্র রাজির শপথ করছি, অবশ্যই এটি মহা শপথ, যদি তোমরা জানতে। (সূরা আল-ওয়াকেয়া : ৭৬ নং আয়াত)
মহাবিশ্বের এতো বিরাট সৃষ্টি কে বানিয়েছেন? কে এগুলো যথাস্থানে রাখার ব্যবস্থা করেছেন? আপনারা সকলে বলবেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। আল্লাহ বলেন :
إِنَّ اللَّهَ يُمْسِكُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ أَنْ تَزُولَا - (فاطر : (٤١)
অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহ আসমান ও জমিনকে স্থির (সংরক্ষণ) করে রেখেছেন, যাতে এগুলো নিজ-স্থান থেকে স্থানচ্যুত না হয়। (সূরা আল-ফাতির : ৪১ নং আয়াত)
এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা যে বিষয়গুলো আপনাদের কাছে তুলে ধরেছি এগুলোর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালা। তিনি ছাড়া এ বস্তুগুলো অন্য কেউ বানাতে সক্ষম নয়। আল্লাহ শব্দটি সকল ভাষায় 'আল্লাহ' বলে বলা উচিৎ। কারণ আল্লাহ শব্দটি, ইংরেজীতে GOD বলা হয়, এর বহুবচন করা যায়।
আবার GOD এর শেষে DESS যোগ করলে স্ত্রী বাচক স্রষ্টী বুঝা যায়। GOD শব্দটি উল্টো করলে DOG বা কুকুর হবে। আল্লাহ শব্দটির কোন বহুবচন, স্ত্রী লিঙ্গ কিছুই নেই। এমনকি 'اَللّهُ' শব্দটি উল্টো করলে, তখন তা হবে- “هَللَ” এর অর্থ হচ্ছে تَهْلِيلٌ বা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এর অর্থ : আল্লাহর প্রশংসা বা মহিমা প্রকাশ করা। (আধুনিক আরবী-বাংলা অভিধান পৃ. ৯১৬, ড. মোহাম্মদ ফজলুর রহমান)
শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) মহান আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে বলেছেন:
تَفَكَّرُوا فِي آلَاءِ اللَّهِ وَلَا تَفَكَّرُوا فِي اللهِ عَزَّ وَجَلَّ .
(طبراني / سلسلة أحاديث الصحيحة : ۱۷۸۸)
অর্থ : তোমরা আল্লাহর সৃষ্টি বস্তু নিয়ে চিন্তা করো এবং আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে চিন্তা করো না। (তাবারানী-সিল সিলাতু আহাদিসুস সহীহাহ: ১৭৮৮ নং হাদীস)
আল্লাহর প্রেরিত মহামানব নবী ও রাসূলগণ আল্লাহর সাথে অহীর মাধ্যমে কথা বলেছেন। কিন্তু তারা আল্লাহকে চোখে দেখতে পাননি। মূসা (আ.) আল্লাহকে দেখতে চেয়েছিলেন, আল্লাহ উত্তরে বলেছেন : لَنْ تَرَانِی
অর্থ : কখনো আমাকে দেখা সম্ভব নয়। (সূরা আল-আরাফ: ১৪৩ নং আয়াত)
কিন্তু পরকালে যারা আল্লাহর জান্নাতে প্রবেশ করবে তারা আল্লাহকে দেখতে পাবেন। যেমন আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন :
وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ - (القيامة : ۲۳-۲۲)
অর্থ : সেই দিন অনেক মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তার পালনকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। (সূরা আল-কিয়ামাহ: ২২, ২৩ নং আয়াত)
তাই, আল্লাহকে চোখে দেখার চাইতে তার সৃষ্টি জগৎ গভীরভাবে অবলোকন করুন। তখন তাঁকে চেনা যাবে। যেমন দেখে প্রমাণ করতে পারেন যে, এই ঘড়ি যিনি তৈরী করেছেন, ঘড়ি নির্মাণের উপযোগী কর্মক্ষমতা ও গুণাবলীর অধিকারী এক ব্যক্তি। এ প্রমাণ পেশ করার জন্য ঘড়ি নির্মাতার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ ও তার কার্যাবলী চাক্ষুষ পরিদর্শনের কোন প্রয়োজন নেই। ঘড়ির অস্তিত্ব তার গঠন প্রকৃতি এবং নির্ভুল সময় দেখার ক্ষমতাই, যে কোন বিজ্ঞ ব্যক্তির মনে এ বিশ্বাস জন্মাবার জন্যই যথেষ্ট যে, কোন শক্তি অথবা নিমিত্ত (CAUSE) তাকে তৈরী করেনি বরং এক ব্যক্তি অথবা একটি পরিকল্পনা অনুসারে এক বিশেষ উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় একে তৈরী করেছেন এবং এ ধরনের জিনিস প্রস্তুতকারী ব্যক্তির মধ্যে অবশ্য এক নির্দিষ্ট গুণাবলী রয়েছে। ('চল্লিশ জন সেরা বিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে আল্লাহর অস্তিত্ব' বইটির ভূমিকা- জন ক্লোভার মোনজমা)
তাই, আল্লাহ মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন :