📄 ১.৬ কৃতজ্ঞতা একটি অন্যতম বড় নিয়ামত
বহুসংখ্যক মহৎ কাজের অধিকারী যে তার সর্বদা অবশ্যই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে ব্যস্ত থাকা উচিত, বান্দাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সঙ্গতি দেয়া হল আল্লাহর পক্ষ থেকে তার প্রতি অন্যতম বড় নিয়ামত। এটা তার উপর ফারদ যে সে কৃতজ্ঞতার সহিত এই কাজগুলো সম্পন্ন করবে এবং ন্যায্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভাব উপলব্ধি করবে।
ওহাব ইবনে অবু ওয়ার্দকে যখন একটি বিশেষ কাজের প্রতিদান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তখন তিনি বললেন, 'এর প্রতিদান চেয়ো না, কিন্তু ঐ কাজ করার তৌফিক অর্জনের কারনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।'
আবু সুলাইমান বলতো, 'একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি কিভাবে তার কৃতকর্ম দ্বারা অভিভূত হতে পারে? কৃতকর্মগুলো হচ্ছে আল্লাহর অন্যতম নিয়ামত, বিনয় প্রদর্শন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যই এটা তার উপর অর্পন করা হয়। কেবলমাত্র কাদারিয়াহ-রাই তাদের কৃতকর্ম দ্বারা অভিভুত হয়!' এরা হলো তারাই যারা বিশ্বাস করে না যে মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ তার বান্দার কর্ম নির্ধারন করেন।
যেদিন দাউদ আল-তাই মারা গেলেন সেদিন কতই না সুন্দর কথা বলেছেন আবু বকর আল-নাহশালি। তার দাফনের পর ইবনে আল সাম্মাক দাঁড়িয়ে তার সতকর্মগুলোর প্রশংসা করেন এবং নিজে কাঁদলেন ও উপস্থিত সকলকে কাঁদালেন এবং শপথ করে বললেন যে তিনি যা বলেছেন তা সত্য বলেছেন... আবু বকল আল-নাহশালি দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করুন এবং তার প্রতি দয়া প্রদর্শন করুন এবং তার কর্মের উপর তাকে ছেড়ে দিবেন না!'
যায়িদ ইবনে সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আবু দাউদে উল্লেখিত আছে যে আল্লাহর রাসুল (সঃ) বলেন, "আল্লাহ যদি দুনিয়া ও জান্নাতের অধিবাসীদের শাস্তি দিতে চাইতেন, তাহলে তিনি যেকোন উপায়ে কোন রকম নিষ্ঠুরতা ছাড়াই তা করতে পারতেন। যদি তাদের প্রতি দয়া দেখাতে চান, তাহলে তাঁর দয়া তাদের কৃতকর্ম অপেক্ষা উত্তম।”
জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত হাকিমে উল্লেখ আছে নবীজির কাছে একজন লোক আসলেন এবং বললেন, 'পাপ! পাপ!' দুই-তিনবার একই কথার পুনারাবৃত্তি করলেন। আল্লাহর রাসুল (সঃ) বললেন, “বল, হে আল্লাহ, আপনার ক্ষমাশীলতা আমার পাপের চেয়ে সুবিশাল এবং আমি আমার কৃতকর্মের চেয়ে তার উপর বেশি আশা রাখি।” সে তাই বলল এবং আল্লাহর রাসুল (সঃ) বললেন, "আবার বল।" সে তা করল এবং তাকে পুনরায় বলতে হুকুম করা হলে সে আবারও বলল। তারপর তিনি (সঃ) বললেন, “দাঁড়াও তোমাকে ক্ষমা করা হয়েছে।”
পাপের বিবেচনায় আমি ছিলাম প্রাচুর্যময়, কিন্তু আমার রবের ক্ষমা তার চেয়ে বেশি প্রাচুর্যময়ঃ আমার কর্মের কাছে ছিল না কোন প্রত্যাশা তবে আল্লাহর দয়া আমাকে দিয়েছে প্রতীক্ষা।
টিকাঃ
৪১. আবু নুয়াইম, ভলিয়ুম ৮, পৃষ্ঠা ১৫৫।
৪২. ইবিদ, ভলিয়ুম ৯, পৃষ্ঠা ২৭৬ #১৩৮৯৬।
৪৩. ইবিদ, ভলিয়ুম ৮, পৃষ্ঠা ২২৩ #১১৯৪৯ এ উল্লেখ আছে যে তিনি বলতেন, 'এটা স্তম্ভিত করে যে মানুষের চোখ ঘুমে বিভোর হতে পারে যখন মৃত্যুর ফেরেশতা তার বালিশের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।'
৪৪. ইবিদ, ভলিয়ুম ৭, পৃষ্ঠা ৩৯৬ #১০৯৭৭।
৪৫. আবু দাউদ #৪৬৯৯ এবং ইবনে মাজাহ #৭৭। ইবনে হাব্বান (#৭২৭) এবং আলবানি একে সহীহ ঘোষণা করেছেন, সাহীহ আল-জামি' #৫২৪৪, মহান আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ মানুষকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিলে ভূ-পৃষ্ঠে কোন জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না, কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন। অতঃপর তাদের নির্দিষ্ট কাল এসে গেলে আল্লাহ তো আছেন তাঁর বান্দাদের সম্যক দ্রষ্টা।” [সুরা ফাতিরাঃ ৪৫] ইবনে হাব্বান #৬৫৯ এ উল্লেখিত আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আল্লাহর রাসুল (সঃ) বলেন, "আল্লাহ যদি আমার ও ঈসার গুনাহ বিবেচনা করতেন, নুন্যতম জুলুম না করে তিনি আমাদের শাস্তি দিতে পারতেন।" ইবনে হিব্বান ও আলবানি একে সহীহ বলেছেন, সাহীহ আল-তারঘিব #২৪৭৫।
৪৬. হাকিম #১৯৯৪। আলবানি একে দা'ইয়িফ ঘোষণা করেছেন, দা' ইয়িফ আল-জামি' #৪১০১।
📄 ১.৭ আল্লাহর অনুগ্রহের স্বীকারোক্তি
নিজেদের মধ্যে এখন যে উন্নত নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটাই এই কাজের পরিচিতি, আগুন হতে নাজাত এবং জান্নাতে প্রবেশকে অপরিহার্য করে তোলা নয়, জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরে উত্তরণকে অপরিহার্য করে তোলাঃ তাদের স্তরে যা কাছে আনে এবং দুনিয়ার পালনকর্তার মুখ দেখা এবং এটা জানা যে শুধুমাত্র আল্লাহর দয়া, অনুগ্রহ ও ক্ষমাশীলতার মধ্যদিয়ে অতিক্রম করতে পারলে তা পাওয়া সম্ভব। এর জন্য এখন প্রয়োজন মুমিনদের স্বীয় কর্ম সম্পর্কে উচ্চ ধারনা ত্যাগ করা এবং শুধুমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ ও নিয়ামতের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনা।
একজন জ্ঞানীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো, 'কোন কাজটা উত্তম?' তিনি উত্তর দিলেন, 'মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর অনুগ্রহ অনুধাবন করা।'
কোন উপায়ে পারো কিছু পরিমাণে দান করতে, যোগসাজশ করবে সে অসাড়ের সাথে সুবিজ্ঞের।
যখন সবকিছু বোধগম্য হয়, ইমানদার বান্দার জন্য এটা ফরজ; যে বান্দা আগুন থেকে নাজাত ও জান্নাতে প্রবেশ করতে চায়, যে তার প্রভুর নিক্টবর্তী হতে চায়, তাঁর মুখ দর্শন করতে চায়; এই সব পেতে হবে এমন এক উপায় গ্রহন করে যা অর্জন করবে আল্লাহর দয়া, অব্যাহতি, ক্ষমা, সন্তুষ্টি এবং ভালোবাসা। এই পথেই সে তাঁর বদান্যতা অর্জন করবে। আল্লাহর নির্ধারিত বিভিন্ন কর্মকান্ড করাই হল সেই পথঃ শুধুমাত্র সেইসব কাজ যেগুলো তিনি তাঁর রাসুলের (সঃ) উপর নাজিল করেছেনঃ শুধুমাত্র ঐসব কর্মকান্ড যা সম্পর্কে রাসুল (সঃ) বলেছেন আমাদেরকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যাবেঃ ঐসব কর্মকান্ড যা তিনি ভালোবাসেন এবং যা তাঁর সন্তুষ্টি ও ক্ষমা অর্জন করে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا وَادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِينَ
...নিশ্চয়ই আল্লাহর অনুগ্রহ সৎকর্মপরায়নদের নিকটবর্তী। [সুরা আ'রাফঃ ৫৬]
وَاكْتُبْ لَنَا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ إِنَّا هُدْنَا إِلَيْكَ قَالَ عَذَابِي أُصِيبُ بِهِ مَنْ أَشَاء وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُم بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُونَ
...'আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি আর আমার দয়া-তা তো প্রত্যেক বস্তুতে ব্যাপ্ত। সুতরাং আমি তা তাদের জন্য নির্ধারিত করবো যারা তাকওয়া অবলম্বন করে...' [সুরা আ'রাফঃ ১৫৬]
সুতরাং একজন বান্দার উপর এটা ফারদ যে সে তাকওয়ার ঐসকল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং ধার্মিকতা খুজে বের করবে যা আল্লাহ তাঁর কুরআন অথবা তাঁর রাসুলের (সঃ) উপর নাজিল করেছেন এবং তিনি যা কিছু নিজে করে গেছেন, এইসব আমল করার মাধ্যমে মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া। একজন মুমিনের লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য এছাড়া আর কোন উপায় নেই।
“তালক ইবনে হাবীবকে তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, 'এটা এমন যে তুমি আল্লাহকে মান্য করো আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত প্রাপ্ত হয়ে, আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার পাওয়ার আশায়। আল্লাহর অবাধ্যতা ত্যাগ করো আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত প্রাপ্ত হয়ে, আল্লাহর শাস্তিকে ভয় পেয়ে'।”
টিকাঃ
৪৭. ইবনে আল মুবারক, আল-যুহদ #৪৭৩ তে সহীহ ইসনাদসহ উল্লেখ করেছেন। ইবনে আল-কাইয়্যুম, আল-রিসালাহ আল-তাবুকিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ২৭ এ বলেন, 'তাকওয়া সম্পর্কিত সবচেয়ে ভালো সংজ্ঞা হলো নিশ্চয়ই প্রত্যেকটি কাজ শুরুর একটি কারন ও উদ্দেশ্য থাকতে হবে। আল্লাহর প্রতি আজ্ঞানুবর্তিতা ও তাঁর নিকটবর্তী হওয়ার কারন কখনই আমল হিসেবে গণ্য হতে পারেনা যতক্ষন পর্যন্ত না এর শুরুর অগ্রভাগ ও কারন হবে নিখাদ বিশ্বাস, না অভ্যাস, না আকংক্ষাভিত্তিক, না প্রশংসা ও অবস্থানের আশায়, না এই ধরনের অন্যকিছু। এর উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর পুরস্কার ও তাঁর সন্তুষ্টি, এটাই ইহতিসাব এর সংজ্ঞা। এই কারনেই মাঝে মাঝে আমরা এই দুইটি বুনিয়াদের যুগল উল্লেখ দেখতে পাই, যেমন তিনি (সঃ) বলেছেন, "যে ঈমানের সাথে রমাদানের সিয়াম পালন করবে এবং ইহতিসাব..." তার বক্তব্য 'আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত প্রাপ্ত হয়ে' প্রথম বুনিয়াদ ঈমানকে ইঙ্গিত করে। তার বক্তব্য, 'আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার আশা করা' দ্বিতীয় বুনিয়াদ ইহতিসাবকে ইঙ্গিত করে।'