📄 ১.২ অনুগ্রহ শব্দার্থের ব্যাখ্যা
ইবনে মাজাহতে উল্লেখ আছে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত নবী (সঃ) বলেন, “এমন আর কোন অনুগ্রহ নেই যা আল্লাহ তাঁর বান্দাকে প্রদান করেন 'আলহামদুলিল্লাহ' বলার কারনে, মেনে নেওয়া যে তিনি যা নিয়েছেন তা অপেক্ষা তিনি যা দিয়েছেন তা অধিক ভালো।” উমর ইবনে আব্দুল আজিজ এবং সালাফদের মধ্যে অন্যান্যরা একে আল-হাসান বলেছেন।
অতীত ও বর্তমানের অসংখ্য আলেমগন এই হাদিসের মর্মার্থ নিয়ে সমস্যা তৈরি করেছেন, কিন্তু একে যদি পুর্বের আলোচনার আলোকে বুঝা যায় তাহলে এর অর্থ পরিষ্কার। হাদিসে উল্লেখিত অনুগ্রহ হচ্ছে দুনিয়াবী অনুগ্রহ এবং বাক্যের মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা করা অন্যতম ধর্মীয় অনুগ্রহ। দুনিয়াবী অনুগ্রহ অপেক্ষা ধর্মীয় অনুগ্রহ উত্তম। বান্দা আল্লাহর প্রশংসা স্পষ্ট করে উচ্চারন করার কারনে আল্লাহ বান্দার উপর অনুগ্রহ আরোপ করেছেন, বান্দার এই মৌলিক অনুগ্রহের জন্য আল্লাহ তাকে আরো উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন অনুগ্রহের জন্য বিবেচনা করছেন। এই কারনেই ব্যাখ্যায় উল্লেখিত হয়েছে, 'প্রশংসাসূচক আল-হামদুলিল্লাহ তাঁর অনুগ্রহের জন্য উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত; তাঁর শাস্তি দমন করে; এবং তাঁর অতিরিক্ত সংযোজনের জন্য বিনিময় হিসেবে কাজ করে।'
এই আলোকে বুঝা যায়, প্রশংসাসূচক বাক্যের উচ্চারন হলো জান্নাতের জন্য মজুদস্বরূপ।
টিকাঃ
১৪. আনাস (রাঃ) হতে ইবনে মাজাহ এটি নথিবদ্ধ করেন #৩৮০৫। বুদায়রি বলেন, 'এটির ইসনাদ হাসান।' সুয়ুতি একই কথা বলেন, আল-দুর্ আল-মানথুর, ভলিয়ুম ১, পৃষ্ঠা ৩৪, আলবানি তার সাহীহ আল-তারগিব#১৫৭৩ তে একে হাসান রায় দিয়েছেন। "তিনি দিয়েছিলেন” প্রশংসাসূচক বাক্য এবং "তিনি নিয়ে গেলেন” অনুগ্রহ সুচক বাক্য। সিন্দি, হাশিয়াহ আ'লা ইবনে মাজাহ, ভলিয়ুম ৪, পৃষ্ঠা ২৫১।
১৫. বায়হাকি, শুয়াব আল-ইমান#১০০৩৮।
১৬. যেমন বকর ইবনে আব্দুল্লাহ, ইবাডা #৪৪0৮।
১৭. ইবাডা #৪৪0৬ এবং ইবনে আবি আল-দুনিয়া, আল-শুকর #১১১। স্বাস্তবিক পক্ষে এক আল্লাহই উভয় নির্ধারন করে থাকেন।
১৯. ইবনে হাজর, তালখিস আল-হাবির, ভলিয়ুম ৪, পৃষ্ঠা ১৭১, বলেন, "এটি বিবৃত আছে যে জিবরাইল (আঃ) আদম (আঃ) কে শিখিয়েছিলেন, প্রশংসাসূচক আল-হামদুলিল্লাহ তাঁর অনুগ্রহের জন্য উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত; তাঁর শাস্তি দমন করে; এবং তাঁর অতিরিক্ত সংযোজনের জন্য বিনিময় হিসেবে কাজ করে। "তারপর তিনি বলেন, 'প্রশংসাসূচক শব্দগুলোর মধ্যে অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শব্দ আমি আপনাকে শিখিয়েছি।' ইবনে আল-সালাহ তার আলোচনায় বলেন, আল-ওয়াসিত, দ'ইয়ফ ইসনাদ, মুনকাতি। নাওয়ায়ি, আল-রাওদাহ, 'আমি এটা ইবনে সালাহ তে পেয়েছি, আল-আমালি... এবং এটি মু'ডাল।'
📄 ১.৩ কর্ম ও জান্নাত উভয় আসে আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে
অতএব, আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার দ্বারা বিশ্বাসী বান্দাদের জান্নাত এবং কর্ম নির্ধারিত হয়। এ কারনেই জান্নাতের অধিবাসীরা সেখানে প্রবেশ করেই বলবে,
وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِم مِّنْ غِلَّ تَجْرِي مِن تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَنُودُواْ أَن تِلْكُمُ الْجَنَّةُ أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
...তারা বলবে, 'প্রশংসা আল্লাহ্রই যিনি আমাদেরকে এই পথ দেখিয়েছেন। আল্লাহ আমাদেরকে পথ না দেখালে আমরা কখনও পথ পেতাম না। আমাদের প্রতিপালকের রাসুলগণ তো সত্যবাণী এনেছিলেন,'... [সুরা আ'রাফঃ ৪৩]
যখন তারা স্বীকার করবে যে, তাদের জন্য জান্নাত নির্ধারিত হয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহের দ্বারা এবং তাঁর অনুগ্রহ দ্বারা তাদের মধ্যে ঐক্য নির্ধারন করা হয়েছিলো মুখ্য ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়ে একটি বিহিত করার জন্য, এর অর্থ হলো, তাঁর হিদায়াহ এবং তাঁর প্রশংসা করার পর তাদেরকে এই বলে পুরস্কৃত করা হবে যে,
أَن تِلْكُمُ الْجَنَّةُ أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
... এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, 'তোমরা যা করতে তারই জন্য তোমাদেরকে এই জান্নাতের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে।' [সুরা আ'রাফঃ ৪৩]
তাদের কৃতকর্ম গুলোকে তাদের গুণ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সেগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে।
সার্বিকভাবে বিবেচনার পর কোন কোন সালাফ বলেন, "যখন কোন বান্দা গুনাহ করে এবং বলে, 'হে আল্লাহ, এটা তোমারই হুকুম!' তখন আল্লাহ বলবে, 'তুমিই সে, যে গুনাহ করলো এবং আমাকে অমান্য করলো!' এখন বান্দা যদি বলে, 'হে আল্লাহ, আমি ভুল করেছি, গুনাহ করেছি এবং মন্দ কাজ করেছি!' তখন আল্লাহ এই বলে সাড়া দিবেন, 'আমি তোমার উপর এটা হুকুম করেছি, আমি তোমাকে ক্ষমা করবো।”
📄 ১.৪ আল্লাহর ক্ষমা ও ন্যায়পরায়ণতার মধ্য দিয়ে আসে সুখ-দুঃখ
রাসুল (সঃ) এর বাণী, “শুধুমাত্র তোমাদের আমল তোমাদের কারোকে রক্ষা করবেনা।” “আমলনামা একা কখনই একজনের জান্নাতে প্রবেশ করার কারন হবেনা।” এগুলোর মর্মার্থ আরো ভালভাবে বুঝা যাবে যখন এটা অনুধাবন করা সম্ভব হবে যে, সৎকর্মের পুরস্কার, বহুসংখ্যক গুণ বেড়ে যায় শুধুমাত্র মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর বদান্যতা ও অনুগ্রহের কারনে। তিনি যাকে ইচ্ছা সৎকর্মের জন্য পুরস্কৃত করেন দশ হতে সাতশত গুণ পর্যন্ত। যদি তিনি সৎকর্মের পুরস্কার সেই কর্মের সমান করতেন, যেমন্টা তিনি করেছেন অসৎ কর্মের শাস্তির ক্ষেত্রে, তাহলে কখনই সৎকর্মের প্রতিদান অসৎ কর্মগুলোকে বাতিল করতে পারতো না এবং একজন ব্যক্তি নিঃসন্দেহে ধ্বংস হয়ে যেত।
সৎ আমলের বর্ণনা দিতে গিয়ে ইবনে মা'সুদ (রাঃ) বলেন, "যদি একজন আল্লাহর ওলির পরমাণু পরিমাণ ভালো অবশিষ্ট থাকে, (পারস্পরিক হিসাব-নিকাশের পর), আল্লাহ তাকে বহুসংখ্যক গুন বাড়িয়ে দিত যেন সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। যদি সে এমন একজন হয় যার জন্য দুঃখ-দুর্দশা নির্ধারিত আছে, তখন ফেরেশতা বলে, 'হে আল্লাহ, তার সৎ আমল শেষ হয়ে গিয়েছে, এখনও অনেক মানুষ আছে যারা ক্ষতিপূরন চাইছে (পারস্পরিক হিসাব-নিকাশ)। 'তিনি উত্তর দিবেন, 'তাদের গুনাহ গুলো নাও এবং সেগুলো তার আমলনামায় যোগ করো, তারপর তাকে আগুনের তীব্র যন্ত্রণাকর জায়গার জন্য প্রস্তুত করো।”
অতএব এটা পরিষ্কার যে আল্লাহ যাদেরকে সুখ দিতে ইচ্ছা করেন তাদের ভালো কাজ অনেক গুন বাড়িয়ে দেন যতক্ষন পর্যন্ত না তারা কোন শাস্তির চুড়ান্ত ঋণ পরিশোধ (এমন কোন একজনকে যে পারস্পরিক হিসাব-নিকাশ চায়) শেষ করে; এবং এই সবকিছুর পরে, যদি পরমাণু পরিমাণ ভালো অবশিষ্ট থাকে, আল্লাহ এটা বহুগুণ বৃদ্ধি করে দিবেন যতক্ষন না সে এর দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করে। এই সবকিছু হবে তাঁর দয়া ও বদান্যতা দ্বারা! যেকোন উপায়ে হোক, আল্লাহর যে কারো জন্য দুঃখ-দুর্দশা নির্ধারন করেছেন; তাদের ভালো কাজ ঐ পরিমাণ বৃদ্ধি করা হবে না যেন সে শাস্তির চূড়ান্ত ঋণ পরিশোধ করতে পারে। বরং দুইয়ের মধ্যে পরে উল্লেখিত ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত কোন একটি ভালো কাজকে দশ গুণ করা হবে না, এগুলো তার দাবিদারদের মধ্যে ন্যায্যভাবে বন্টন করে দেয়া হবে যারা এগুলো গ্রহন করতে সম্মত হবে, তখন পর্যন্ত যদি অবশিষ্ট অবিচারের জন্য আরো অতিরিক্ত পরিশোধ বাকি থাকে, তাহলে তাকে তাদের অসৎ কর্মগুলোর ভার তার আমলনামায় বহন করতে হয়, এটাই তার আগুনে প্রবেশের কারন হয়ে দাঁড়ায়। এটা তাঁরই ন্যায়বিচার।
এই আলোকে ইয়াহিয়া ইবনে মা'সুদ বলেন, “যখন তিনি তাঁর অনুগ্রহ প্রসারিত করেন, তখন ঐ ব্যক্তির একটিও মন্দকাজ অবশিষ্ট থাকে না!, যখন তার ন্যায়পরায়নতা সামনে চলে আসে, ঐ ব্যক্তির একটিও সৎ কর্ম অবশিষ্ট থাকে না।”
বুখারী এবং মুসলিমে উল্লেখ আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, "যার আমলনামা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পরীক্ষা করা হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে।” অন্য বর্ণনায় এসেছে "...শাস্তি দেয়া হবে।” এবং অন্য আরেকটি বর্ণনায় এসেছে "...পরাভূত করা হবে।”
আবু নুয়াইম সংগৃহীত আলি (রাঃ) হতে বর্ণিত যে নবী (সঃ) বলেছেন, “বনি ইসরাইলের নবীদের মধ্য হতে একজন নবীকে আল্লাহ জানিয়ে দেন, 'আপনার কওমের মধ্যে যারা আমাকে মান্য করে তাদেরকে বলুন, বিচারদিবসের জন্য তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের উপর অতিরিক্ত মাত্রায় ভরসা করো না, আমার বান্দাকে আমি শাস্তি দেওয়ার ইচ্ছা করলে আমি তার আমলনামার নিষ্পত্তি করবো না তাকে শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত। আপনার উম্মতের মধ্যে যারা আমাকে অমান্য করে তাদেরকে বলুন, তারা যেন হতাশ না হয় কেননা আমি ইচ্ছা করলে অনেক বড় গুনাহ ক্ষমা করে দেই।”
আব্দুল-আজিজ ইবনে আবু রাও-ওয়াদ বলেন, 'আল্লাহ দাউদ (আঃ)কে এই বলে উৎসাহিত করেন, “সুখবর দাও গুনাহগারদের আর সাদাকা দানকারীদের সতর্ক করো।” বিস্ময়কর। দাউদ বলেন, “হে আল্লাহ, আমি কেন গুনাহগারদের সুখবর আর সাদাকা দানকারীদের সতর্ক করবো?” তিনি উত্তর দিলেন, গুনাহগারদের এই সুখবর দিন যে এমন কোন নিদারুন গুনাহ আমি খুজে পাইনি যা ক্ষমার অযোগ্য এবং তাদেরকে সতর্ক করুন যারা এমনভাবে সাদাকা দেয় যে এমন কোন বান্দা নেই যার উপর আঁমি আমার বিচার ও রায় পরিমাপ করে দেইনি, তারা ছাড়া সে ধ্বংস হয়ে যাবে।
ইবনে উয়ায়নাহ বলেন, “সুবিবেচনা বলতে এখানে বুঝানো হয়েছে মন্দ কাজগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরিক্ষার মধ্য দিয়ে এমনভাবে অতিক্রম করানো যেন কোনকিছু অবশিষ্ট না থাকে।”
ইবনে ইয়াযিদ বলেন, "কঠিন হিসাব হলো সেটা যেখানে কোন ক্ষমা নেই আর সহজ হিসাব হলো সেটা যেখানে একজনের গুনাহগুলোকে ক্ষমা করা হয় এবং ভালো কাজগুলোকে গ্রহন করা হয়।”
সবগুলো বিবরন থেকে দেখা যায়, ক্ষমাশীলতা, দয়া এবং ভুলত্রুটির উপেক্ষা ছাড়া বান্দা সফল হতে পারবেনা। এখানে আরো দেখা যায়, বান্দা নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হবে যদি আল্লাহ পুরোপুরি ন্যায়সঙ্গত ভাবে বিহিত করেন।
টিকাঃ
২০. মুসলিম #১৩১/৩৩৮
২১. এই একই অর্থ হাকিম #৭৬৪১ এ উল্লেখ আছে, #৭৬৪২ তে ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত নবী (সঃ) বলেন, "... যদি সৎ আমল বাকি থাকে, আল্লাহ সহৃদয় হয়ে জান্নাতে তার জন্য জায়গা সম্প্রসারিত করবেন।" যাহাবীর সহমতে হাকিম একে সহীহ বলেছেন।
২২. আবু নাইয়িম, ভলিয়ুম ৪, পৃষ্ঠা ২২৪#৫৩২৮; ইবনে আল-মুবারাক, আল-যুহুদ #১৪১৬।
২৩. মুসলিম #২৫৮১/৬৫৭৯, তে আবু হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, আল্লাহর রাসুল (সঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, "তোমরা কি জানো দেউলিয়া ব্যক্তি কে?” তারা বলল, 'আমাদের মধ্যে সেই দেউলিয়া যার সাথে কোন দিরহাম বা সম্পদ কিছুই নেই।' তিনি বলেন, "আমার উম্মাহর মধ্যে দেউলিয়া ব্যক্তি হবে সে যে পুনরুত্থান দিবসে সালাহ, সিয়াম এবং যাকাত নিয়ে আসবে কিন্তু সে এই ব্যক্তিকে গালিগালাজ করেছে, সে ঐ ব্যক্তির সম্পর্কে অপবাদ দিয়েছে, অন্যায়ভাবে ঐ ব্যক্তির সম্পদ ভোগ করেছে, ঐ ব্যক্তির রক্তপাত ঘটিয়েছে এবং ঐ ব্যক্তিকে প্রহার করেছে। তাই তার সৎ কর্মগুলো ঐসব ব্যক্তিদের আমলনামায় যোগ হয়ে যাবে (পাল্টা দুর্ব্যবহারের নীতি অনুসারে) আর যদি তার সৎ কর্ম কম পড়ে যায় হিসাব মিলাতে গিয়ে, তাহলে তাদের অসৎ কর্মগুলো তার আমলনামায় যোগ হবে আর সে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে।” মুসলিম #২৫৮২/৬৫৮০ তে অবু হুরায়রাহ হতে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন, "বিচারদিবসে সবার সব হক ফিরিয়ে দেয়া হবে। এমনকি শিংবিহীন ছাগল যাকে কিনা ভেড়া গুতো দিয়েছিলো সেও ন্যায়বিচার পাবে।"
২৪. আবু নুয়াইম, ভলিয়ুম ১০, পৃষ্ঠা ৬৯ #১৪৫৯৩।
২৫. বুখারী #৬৫৩৭ এবং মুসলিম #২৮৭৬/৭২২৭, ৭২২৮ আয়শা (রাঃ) হতে বর্ণিত। বুখারীতে লেখা আছে আয়শা (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, "আল্লাহ কি বলেন নাই, 'যাকে তার আমলনামা ডানহাতে দেওয়া হবে; তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেওয়া হবে।' [সুরা আল-ইনশিকাকঃ ৭-৮] তিনি উত্তর দিলেন, 'ঐটা পরীক্ষা-নিরিক্ষা নয়, ঐটা হল উপস্থাপন, যে হোক না কেন আমলনামা পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষিত হলে শাস্তি পাবে।”
২৬. বুখারী #৬৫৩৬ এবং #২৮৭৬/৭২২৫ আয়শা (রাঃ) হতে বর্ণিত। উপরিউক্ত বাক্যগুলো তিরমীযি #৩৩৩৮ তে আনাস (রাঃ) হতে সংগৃহীত আছে।
২৭. হাকিম #৮৭২৮ এবং যাহাবী বলেন, এর ইসনাদ দুর্বল। ইবনে আবু শায়বাহ, ভলিয়ুম ১৩, পৃষ্ঠা ৩৬০, এ লেখা আছে, "... ক্ষমা করা হবে না।" এবং ইবনে আল-মুবারাক, আল-জুহুদ, #১৩২৪ এ বাক্যটি উল্লেখ করেছেন আয়শা (রাঃ) এর বক্তব্য হিসেবে।
২৮. তাবারানি, আল-আওসাত #৪৮৪৪। হায়সামি, ভলিয়ুম ১, পৃষ্ঠা ৩০৭ এর মতে এই ইসনাদে দুর্বল বর্ণনাকারী আছে। লেখক, জামি-আল- উলুম, ভলিয়ুম ১, পৃষ্ঠা ১৭৭ এ বলেন, এর ইসনাদ দুর্বল।
২৯. এমনকি শিরক যদি কেউ অনুশোচনা করে।
৩০. আবু নুয়াইম, ভলিয়ুম ৮, পৃষ্ঠা ২১১ #১১৯০৬।
৩১. ইবনে আবু শায়বাহ #৩৫৬৪৪, এ উল্লেখ আছে আবু আল-জাওযা আয়াতটি সম্পর্কে বলেন, "...এবং ভয় করে কঠোর হিসাবকে” [সুরা রা'দঃ ২১]'এর অর্থ হলো একজনের কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হওয়া।'
৩২. গুনাহকে উপেক্ষা করা।
৩৩. তাবারি #৩৪৩৬১, ৩৬৭৩৮ আহমাদ #২৪২১৫-২৫৫১৫ তে উল্লেখ আছে আয়শা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি আল্লাহর রাসুলকে (সঃ) জিজ্ঞাসা করেন, ""সহজ হিসাব' কি?” [সুরা আল-ইনশিকাকঃ ৮] যার উত্তরে তিনি বলেন, "একজন ব্যক্তির গুনাহগুলোকে তার সামনে উপস্থাপন করা হবে শুধুমাত্র সেগুলো উপেক্ষা করার জন্য। যার আমলনামা প্রশ্নবিদ্ধ হবে সে নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হবে।” ইবনে হিব্বান #৭৩৭২, ইবনে খুযায়মাহ #৮৪৯, এবং যাহাবির সহমতে হাকিম #৯৩৬ একে সহীহ বলেছেন।
📄 ১.৫ আল্লাহর নিয়ামত কখনোই পরিশোধ যোগ্য নয়
আবারো তাঁর আয়াত থেকে পরিষ্কার হয় যে,
ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ
এরপর অবশ্যই তোমাদেরকে নিয়ামত সম্মন্ধে প্রশ্ন করা হবে। [সুরা তাকাসুরাঃ ৮]
এই আয়াত থেকে দেখা যায় বান্দাদের সেসব নিয়ামাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে যেগুলো তারা এই দুনিয়াতে ভোগ করেছেঃ তারা কি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিলো না করেনি? যে কেউ যার প্রয়োজন ছিলো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার প্রত্যেকটি নিয়ামতের জন্য যেমন ভালো স্বাস্থ্য, সুস্থ মন, ভালো জীবিকা, এবং তাছাড়া আদ্যপান্ত পরীক্ষিত হবে এবং জেনে রাখা উচিত যে তার সমস্ত সৎকর্ম একত্রে এসব নিয়ামতের কিছুসংখ্যকের ঋণও পরিশোধ করতে পারবে না। হতে পারে মানুষটি শাস্তির উপযুক্ত।
খারাইতি, কিতাব আল-শুকুর, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর হতে উল্লেখ করেছেন যে নবী (সঃ) বলেন, “বিচারদিবসে বান্দাদের একত্র করা হবে এবং সে মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে। তিনি তাঁর ফেরেশতাদের বলবেন, 'আমার বান্দার কৃতকর্মসমূহ এবং তার উপর আমার নিয়ামতসমূহ হিসাব করো।' তারা দেখবে এবং বলবে, 'তাকে আপনার পক্ষ থেকে যে নিয়ামতগুলো দেয়া হয়েছিলো এগুলোর সমষ্টি তার একটির সমান নয়।' তখন তিনি বলবেন, 'তার ভালোকাজ ও মন্দকাজের হিসাব করো।' তারা হিসাব করবে এবং একই অবস্থা দেখবে যার ফলে তিনি বলবেন, 'হে আমার বান্দা, আমি তোমার ভালো কাজগুলোকে গ্রহন করেছি এবং মন্দকাজগুলো ক্ষমা করে দিয়েছি। আমি তোমাকে আমার অনুগ্রহ দান করেছি।””
তাবারানিতে উল্লেখ আছে ইবনে উমার (রদিয়াল্লাহু আ'নহুমা) হতে বর্ণিত নবী (সঃ) বলেন, “বিচারদিবসে একজন ব্যক্তিকে এত সতকর্ম সহ আল্লাহর সামনে হাজির করা হবে যে সেগুলোকে একটি পাহাড়ের উপর স্থাপন করলে তা পাহাড়ের জন্য বোঝা স্বরূপ হয়ে যেতো! তারপর আল্লাহর অনেক নিয়ামতের মধ্যে একটিমাত্র নিয়ামতকে হাজির করা হবে এবং তা তার প্রায় সমস্ত কৃতকর্মকে ধূলিসাৎ করে দিত যদি না আল্লাহ দয়া করে সেগুলোকে ফুলিয়ে-ফাপিয়ে না দিতেন।”
ইবনে আবু আল-দানিয়া আনাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে নবী (সঃ) বলেন, “বিচারদিবসে সতকর্ম ও অসতকর্মের পাশাপাশি অনুগ্রহকে অগ্রবর্তী করা হবে। আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহগুলোর মধ্যে শুধু একটি কথা বলবেন, 'তুমি তোমার ন্যায্য পাওনা তার ভালো কাজগুলো থেকে নিয়ে নাও,' এবং এটা তার সমস্ত ভালো কাজকে নিয়ে যাবে।”
তিনি আরো উল্লেখ করেন ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ বলেন, 'এক বান্দা পঞ্চাশ বছর আল্লাহর ইবাদত করেছিলেন, আল্লাহ তাকে এই বলে অনুপ্রাণিত করেছিলেন যে "আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।” বান্দা জিজ্ঞাসা করলেন, “হে স্রষ্টা, আপনার ক্ষমা করার কি আছে? আমি কোন গুনাহ করি নাই!” অতঃপর আল্লাহ তার ঘাড়ের একটি শিরাকে হুকুম করলেন যন্ত্রণাদায়কভাবে স্পন্দন করতে যেন সে ইবাদত করতে না পারে এবং ঘুমাতে না পারে। অচিরেই এটি ভালো হয়ে গেলো এবং একজন ফেরেশতা তার কাছে আসলো এবং তার কাছে সে তার শিরা সম্পর্কে অভিযোগ করলো। ফেরেশতা তাকে বলল, “তোমার মহান ও সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা বলেন, তোমার গত পঞ্চাশ বছরের ইবাদাত তোমার ঐ শিরা উপশমের সমান।”'
জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত হাকিম এ উল্লেখ আছে নবী (সঃ) বলেন যে জিবরাইল (আঃ) বলেন, “এক বান্দা পাঁচশত বছর আল্লাহর ইবাদত করেছিলেন পাহাড়ের উপরে এবং সমুদ্রের মধ্য হতে। এরপর সে আল্লাহর কাছে সিজদারত অবস্থায় মৃত্যু কামনা করলেন। প্রত্যেক উঠানামার সময় আমরা তাকে অতিক্রম করতাম আর আমরা লিখিত পেতাম যে (প্রাক-অনন্তর জ্ঞান হতে) বিচারদিবসে সে পুনরুত্থিত হবে এবং মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে। আল্লাহ বলবেন, 'আমার ক্ষমার উতকর্ষে আমার বান্দাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও। 'বান্দা বলবে, 'হে আমার পালনকর্তা, বরং আমার কৃতকর্মের উতকর্ষে!' এই ঘটনা তিনবার ঘটবে, তারপর আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদের বলবেন, 'তার কৃতকর্মের বিপরীতে আমার নিয়ামত ওজন কর,' এবং তারা দেখবে যে দৃষ্টিশক্তির নিয়ামত একাই তার পাচশত বছরের ইবাদতকে নিয়ে নিয়েছে, শরীরের অন্যান্য নিয়ামত এখনও বাকি আছে। তিনি বলবেন, 'আমার বান্দাকে আগুনে দাও।' তাকে টেনে হিঁচড়ে আগুনের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে আর সে আর্তনাদ করতে থাকবে, 'আপনার ক্ষমার উতকর্ষে আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আপনার ক্ষমার উতকর্ষে আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।' এরপর সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” জিবরাইল এই বলে চলে গেলেন, “হে মুহাম্মাদ, সবকিছু আল্লাহর ক্ষমার কারনেই ঘটে।”
পূর্বে যা কিছু সংঘটিত হয়েছে তার সবকিছু যে বুঝে তারা প্রত্যেকে নিজেরাই উপলব্ধী করবে যে তার কৃতকর্ম, তা যতই মহান হোক না কেন, তার সফলতার জন্য যোগ্যতারক্ষেত্রে এবং জান্নাতে প্রবেশের জন্য অথবা আগুন হতে নাজাতের জন্য পর্যাপ্ত নয়। উদাহরণস্বরূপ, সে আর কখনই তার কৃতকর্মের উপর মাত্রাতিরিক্ত ভরসা করবে না বা তাদের দ্বারা প্রভাবিত হবে না এমনকি যদিওবা তা মহান ও বিস্ময়কর হয়। যদি এই ঘটনা হয় বহুসংখ্যক মহৎ কাজের অবস্থা, তাহলে বহুসংখ্যক তুচ্ছ কাজ নিয়ে একজনের কি ভাবা উচিত? এই ধরনের মানুষের তার ইবাদতের হীনতা বিবেচনা করা উচিত এবং অনুতাপ ও অনুশোচনার মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখা উচিত।
টিকাঃ
৩৪. তিরমীযি #৩৩৫৮ এ উল্লেখ আছে আবু হুরাইরাহ হতে বর্ণিত নবী (সঃ) বলেন, "বিচারদিবসে প্রথম যে জিনিস সম্পর্কে বান্দাকে জিজ্ঞাসা করা হবে তা হল, নিয়ামতঃ আঁমরা কি তোমাকে সুস্বাস্থ্য দেইনি? আঁমরা কি তোমাকে পান করার জন্য ঠান্ডা পানি দেইনি?" ইবনে হাব্বান #৭৩৬৪ এবং হাকিম #৭২০৩ যাহাবির সহমতে সাহীহ বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
৩৫. খারাইতি #৫৭। লেখক, জামি', ভলিয়ুম ২, পৃষ্ঠা ৭৯, বলেন, এর ইসনাদ সংশয়িত।
৩৬. তাবারানি, আল-আওসাত #১৬০৪, ইবনে উমার হতে সংগ্রহীত। লেখক, জামি', ভলিয়ুম ২, পৃষ্ঠা ৭৭ এবং হায়সামি, ভলিয়ুম ১০, পৃষ্ঠা ৪২০, বলেন এর ইসনাদ দুর্বল।
৩৭. ইবনে আবি আল-দানিয়া পৃষ্ঠা ২৪। এই ইসনাদে একজন বর্ণনা কারী রয়েছেন যিনি মাতরুক এবং লেখক, জামি', ভলিয়ুম ২, পৃষ্ঠা ৭৮, এ বলেন, এই ইসনাদ দ'ইফ। কিন্তু, এর অর্থ সঠিক বলা যেতে পারে।
৩৮. আবু নুয়াইম, ভলিয়ুম ৪, পৃষ্ঠা ৭০, #৪৭৮৪ এবং ইবনে আবি আল-দানিয়া #১৪৮।
৩৯. হাকিম #৭৬৩৭ যিনি একে সহীহ বলেছেন কিন্তু যাহাবী এই তথ্যটির সমালোচনা করেছেন এই বলে যে এর একজন বর্ণনাকারীর উপর ভরসা করা যায় না। লেখক, জামি', ভলিয়ুম ২, পৃষ্ঠা ৭৯ উল্লেখ করেন যে এই হাদিসটি সত্য নয়।
৪০. আহমাদ #১৭৬৫০ তে উল্লেখ আছে মুহাম্মদ ইবনে আবি আমিরাহ হতে বর্ণিত আল্লাহর রাসুল (সঃ) বলেন, "বান্দা তার জন্ম থেকে বৃদ্ধাবস্থায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি আনুগত্যসহ যদি সিজদারত অবস্থায় থাকতো, বিচারদিবসে সে তার গুরুত্বতা বিবেচনা করতে পারবে এবং সে আবার এই দুনিয়াতে ফেরত আসতে চাইবে যেন সে তার পুরস্কার বৃদ্ধি করতে পারে।" আলবানি একে সহীহ বলেছেন, সাহিহ আল- তারগিব #৩৫৯৭।