📘 আল্লাহর পথে যাত্রা > 📄 ১.১ আল-হামদুলিল্লাহ সকল অনুগ্রহের সরবরাহকারী

📄 ১.১ আল-হামদুলিল্লাহ সকল অনুগ্রহের সরবরাহকারী


এমন বলা হয় যে; কিন্তু হাবীব ইবনে আল-শাহীদ একে হাসান বলেছেন, “আল-হামদুলিল্লাহ সকল অনুগ্রহের সরবরাহকারী এবং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ/জান্নাতের সরবরাহক।”
এই উক্তির মর্মার্থ বিশিষ্ট একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে রাসুল (সঃ) হতে আনাস (রাঃ), আবু যার (রাঃ) এবং অন্যান্যদের কাছ থেকে। যদিও এই হাদিসগুলোর সবগুলো ইসনাদ দুর্বল, আল্লাহর নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা এই উক্তির মর্মার্থ সমর্থিত হয়েছে,
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالإِنجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُم بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
নিশ্চয়ই আল্লাহ মু'মিনদের নিকট হতে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে এর বিনিময়ে। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, নিধন করে ও নিহত হয়। তাওরাত, ইনজীল ও কুরআনে এই সম্পর্কে তাদের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর কে আছে? তোমরা যে সওদা করেছো সেই সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং এটাই তো মহাসাফল্য। [সুরা তওবাঃ ১১১]
এখানে জান্নাতকে একজন ব্যক্তির ব্যক্তিসত্তা ও তার বিত্ত-বৈভবের মজুদ হিসেবে নির্ধারন করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানু ওয়া তা'আলা তাঁর বদান্যতা, ক্ষমা, দয়া এবং উদারতা দ্বারা তাঁর বান্দাদের এমন এক পথের দিকে ডাকছেন যা তাদেরকে তাঁর আজ্ঞা পালনে অনুপ্রাণিত করবে, এক্ষেত্রে তিনি এর সাথে এমন এক ভাষা ও ধ্যান-ধারনাকে সম্পর্কিত করেছেন যেন তারা অনায়াসে বুঝতে পারে। এক্ষেত্রে তিনি নিজেকে বসিয়েছেন একজন ক্রেতা ও ঋণী এর স্থানে, এবং তাদেরকে বসিয়েছেন বিক্রেতা ও ঋণদাতাদের স্থানে। এটাই তাদেরকে তাদের রবের ডাকে সাড়া দিতে সাহস যোগায় এবং দ্রুত বেগে তারা তাঁর আজ্ঞানুবর্তিতা গ্রহন করে। যে কোন উপায়েই হোক, বাস্তবিক পক্ষে, সবকিছুর মালিক আল্লাহ এবং তাঁর অনুগ্রহ ও দয়া হতে প্রদত্ত; প্রত্যেক ব্যক্তি ও তার সম্পত্তির মালিকানা তাঁর এবং এই কারনেই চরম দুর্দশার সময় তিনি আমাদেরকে এই বলতে আদেশ করেন যে,
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُواْ إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعونَ
যারা তাদের উপর বিপদ আপতিত হলে বলে, “আমরা তো আল্লাহ্রই এবং নিশ্চিতভাবে তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।” [সুরা বাকারাহঃ ১৫৬]
তা সত্ত্বেও, তিনি প্রশংসা করেন তাদেরকে যারা তাদের জান ও মাল ব্যয় করে আল্লাহর রাস্তায়, তাদেরকে তিনি তুলনা করছেন বিক্রেতা ও ঋণদাতাদের সাথে। সুতরাং এরকম একজন মানুষকে তুলনা করা হয়েছে এমন একজন ব্যক্তির সাথে যার বিক্রি করার মত সম্পদ আছে এবং যার সম্পদ নেই তাকে ধার দেয়ার মত সামর্থ রাখে।
একইভাবে সমস্ত কার্য সংঘটিত হয় আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার ফলস্বরূপ, তথাপি তিনি তাদের প্রশংসা করেন যারা এগুলো সম্পাদন করে, ঐ কর্মগুলো দ্বারা তাদেরকে গুণান্বিত করেন এবং তাদেরকে তাঁর অনুগ্রহের প্রতি বিনিময় ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য নির্ধারন করেন।

টিকাঃ
১. গাজ্জালী এইসব উদ্ধৃতি দিয়েছেন তার বই ইহিয়া উলুম আল-দিন, ভলিয়ুম ১, পৃষ্ঠা ২৯৯, এবং ইরাকি বলেন, এই তথ্যগুলো প্রদানকারী ইবনে আ'দি ও মুস্তাগফিরি এবং এদের মধ্যে কেউ সত্য নয়।

📘 আল্লাহর পথে যাত্রা > 📄 ১.২ অনুগ্রহ শব্দার্থের ব্যাখ্যা

📄 ১.২ অনুগ্রহ শব্দার্থের ব্যাখ্যা


ইবনে মাজাহতে উল্লেখ আছে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত নবী (সঃ) বলেন, “এমন আর কোন অনুগ্রহ নেই যা আল্লাহ তাঁর বান্দাকে প্রদান করেন 'আলহামদুলিল্লাহ' বলার কারনে, মেনে নেওয়া যে তিনি যা নিয়েছেন তা অপেক্ষা তিনি যা দিয়েছেন তা অধিক ভালো।” উমর ইবনে আব্দুল আজিজ এবং সালাফদের মধ্যে অন্যান্যরা একে আল-হাসান বলেছেন।
অতীত ও বর্তমানের অসংখ্য আলেমগন এই হাদিসের মর্মার্থ নিয়ে সমস্যা তৈরি করেছেন, কিন্তু একে যদি পুর্বের আলোচনার আলোকে বুঝা যায় তাহলে এর অর্থ পরিষ্কার। হাদিসে উল্লেখিত অনুগ্রহ হচ্ছে দুনিয়াবী অনুগ্রহ এবং বাক্যের মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা করা অন্যতম ধর্মীয় অনুগ্রহ। দুনিয়াবী অনুগ্রহ অপেক্ষা ধর্মীয় অনুগ্রহ উত্তম। বান্দা আল্লাহর প্রশংসা স্পষ্ট করে উচ্চারন করার কারনে আল্লাহ বান্দার উপর অনুগ্রহ আরোপ করেছেন, বান্দার এই মৌলিক অনুগ্রহের জন্য আল্লাহ তাকে আরো উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন অনুগ্রহের জন্য বিবেচনা করছেন। এই কারনেই ব্যাখ্যায় উল্লেখিত হয়েছে, 'প্রশংসাসূচক আল-হামদুলিল্লাহ তাঁর অনুগ্রহের জন্য উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত; তাঁর শাস্তি দমন করে; এবং তাঁর অতিরিক্ত সংযোজনের জন্য বিনিময় হিসেবে কাজ করে।'
এই আলোকে বুঝা যায়, প্রশংসাসূচক বাক্যের উচ্চারন হলো জান্নাতের জন্য মজুদস্বরূপ।

টিকাঃ
১৪. আনাস (রাঃ) হতে ইবনে মাজাহ এটি নথিবদ্ধ করেন #৩৮০৫। বুদায়রি বলেন, 'এটির ইসনাদ হাসান।' সুয়ুতি একই কথা বলেন, আল-দুর্ আল-মানথুর, ভলিয়ুম ১, পৃষ্ঠা ৩৪, আলবানি তার সাহীহ আল-তারগিব#১৫৭৩ তে একে হাসান রায় দিয়েছেন। "তিনি দিয়েছিলেন” প্রশংসাসূচক বাক্য এবং "তিনি নিয়ে গেলেন” অনুগ্রহ সুচক বাক্য। সিন্দি, হাশিয়াহ আ'লা ইবনে মাজাহ, ভলিয়ুম ৪, পৃষ্ঠা ২৫১।
১৫. বায়হাকি, শুয়াব আল-ইমান#১০০৩৮।
১৬. যেমন বকর ইবনে আব্দুল্লাহ, ইবাডা #৪৪0৮।
১৭. ইবাডা #৪৪0৬ এবং ইবনে আবি আল-দুনিয়া, আল-শুকর #১১১। স্বাস্তবিক পক্ষে এক আল্লাহই উভয় নির্ধারন করে থাকেন।
১৯. ইবনে হাজর, তালখিস আল-হাবির, ভলিয়ুম ৪, পৃষ্ঠা ১৭১, বলেন, "এটি বিবৃত আছে যে জিবরাইল (আঃ) আদম (আঃ) কে শিখিয়েছিলেন, প্রশংসাসূচক আল-হামদুলিল্লাহ তাঁর অনুগ্রহের জন্য উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত; তাঁর শাস্তি দমন করে; এবং তাঁর অতিরিক্ত সংযোজনের জন্য বিনিময় হিসেবে কাজ করে। "তারপর তিনি বলেন, 'প্রশংসাসূচক শব্দগুলোর মধ্যে অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শব্দ আমি আপনাকে শিখিয়েছি।' ইবনে আল-সালাহ তার আলোচনায় বলেন, আল-ওয়াসিত, দ'ইয়ফ ইসনাদ, মুনকাতি। নাওয়ায়ি, আল-রাওদাহ, 'আমি এটা ইবনে সালাহ তে পেয়েছি, আল-আমালি... এবং এটি মু'ডাল।'

📘 আল্লাহর পথে যাত্রা > 📄 ১.৩ কর্ম ও জান্নাত উভয় আসে আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে

📄 ১.৩ কর্ম ও জান্নাত উভয় আসে আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে


অতএব, আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার দ্বারা বিশ্বাসী বান্দাদের জান্নাত এবং কর্ম নির্ধারিত হয়। এ কারনেই জান্নাতের অধিবাসীরা সেখানে প্রবেশ করেই বলবে,
وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِم مِّنْ غِلَّ تَجْرِي مِن تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَنُودُواْ أَن تِلْكُمُ الْجَنَّةُ أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
...তারা বলবে, 'প্রশংসা আল্লাহ্রই যিনি আমাদেরকে এই পথ দেখিয়েছেন। আল্লাহ আমাদেরকে পথ না দেখালে আমরা কখনও পথ পেতাম না। আমাদের প্রতিপালকের রাসুলগণ তো সত্যবাণী এনেছিলেন,'... [সুরা আ'রাফঃ ৪৩]
যখন তারা স্বীকার করবে যে, তাদের জন্য জান্নাত নির্ধারিত হয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহের দ্বারা এবং তাঁর অনুগ্রহ দ্বারা তাদের মধ্যে ঐক্য নির্ধারন করা হয়েছিলো মুখ্য ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়ে একটি বিহিত করার জন্য, এর অর্থ হলো, তাঁর হিদায়াহ এবং তাঁর প্রশংসা করার পর তাদেরকে এই বলে পুরস্কৃত করা হবে যে,
أَن تِلْكُمُ الْجَنَّةُ أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
... এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, 'তোমরা যা করতে তারই জন্য তোমাদেরকে এই জান্নাতের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে।' [সুরা আ'রাফঃ ৪৩]
তাদের কৃতকর্ম গুলোকে তাদের গুণ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সেগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে।
সার্বিকভাবে বিবেচনার পর কোন কোন সালাফ বলেন, "যখন কোন বান্দা গুনাহ করে এবং বলে, 'হে আল্লাহ, এটা তোমারই হুকুম!' তখন আল্লাহ বলবে, 'তুমিই সে, যে গুনাহ করলো এবং আমাকে অমান্য করলো!' এখন বান্দা যদি বলে, 'হে আল্লাহ, আমি ভুল করেছি, গুনাহ করেছি এবং মন্দ কাজ করেছি!' তখন আল্লাহ এই বলে সাড়া দিবেন, 'আমি তোমার উপর এটা হুকুম করেছি, আমি তোমাকে ক্ষমা করবো।”

📘 আল্লাহর পথে যাত্রা > 📄 ১.৪ আল্লাহর ক্ষমা ও ন্যায়পরায়ণতার মধ্য দিয়ে আসে সুখ-দুঃখ

📄 ১.৪ আল্লাহর ক্ষমা ও ন্যায়পরায়ণতার মধ্য দিয়ে আসে সুখ-দুঃখ


রাসুল (সঃ) এর বাণী, “শুধুমাত্র তোমাদের আমল তোমাদের কারোকে রক্ষা করবেনা।” “আমলনামা একা কখনই একজনের জান্নাতে প্রবেশ করার কারন হবেনা।” এগুলোর মর্মার্থ আরো ভালভাবে বুঝা যাবে যখন এটা অনুধাবন করা সম্ভব হবে যে, সৎকর্মের পুরস্কার, বহুসংখ্যক গুণ বেড়ে যায় শুধুমাত্র মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর বদান্যতা ও অনুগ্রহের কারনে। তিনি যাকে ইচ্ছা সৎকর্মের জন্য পুরস্কৃত করেন দশ হতে সাতশত গুণ পর্যন্ত। যদি তিনি সৎকর্মের পুরস্কার সেই কর্মের সমান করতেন, যেমন্টা তিনি করেছেন অসৎ কর্মের শাস্তির ক্ষেত্রে, তাহলে কখনই সৎকর্মের প্রতিদান অসৎ কর্মগুলোকে বাতিল করতে পারতো না এবং একজন ব্যক্তি নিঃসন্দেহে ধ্বংস হয়ে যেত।
সৎ আমলের বর্ণনা দিতে গিয়ে ইবনে মা'সুদ (রাঃ) বলেন, "যদি একজন আল্লাহর ওলির পরমাণু পরিমাণ ভালো অবশিষ্ট থাকে, (পারস্পরিক হিসাব-নিকাশের পর), আল্লাহ তাকে বহুসংখ্যক গুন বাড়িয়ে দিত যেন সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। যদি সে এমন একজন হয় যার জন্য দুঃখ-দুর্দশা নির্ধারিত আছে, তখন ফেরেশতা বলে, 'হে আল্লাহ, তার সৎ আমল শেষ হয়ে গিয়েছে, এখনও অনেক মানুষ আছে যারা ক্ষতিপূরন চাইছে (পারস্পরিক হিসাব-নিকাশ)। 'তিনি উত্তর দিবেন, 'তাদের গুনাহ গুলো নাও এবং সেগুলো তার আমলনামায় যোগ করো, তারপর তাকে আগুনের তীব্র যন্ত্রণাকর জায়গার জন্য প্রস্তুত করো।”
অতএব এটা পরিষ্কার যে আল্লাহ যাদেরকে সুখ দিতে ইচ্ছা করেন তাদের ভালো কাজ অনেক গুন বাড়িয়ে দেন যতক্ষন পর্যন্ত না তারা কোন শাস্তির চুড়ান্ত ঋণ পরিশোধ (এমন কোন একজনকে যে পারস্পরিক হিসাব-নিকাশ চায়) শেষ করে; এবং এই সবকিছুর পরে, যদি পরমাণু পরিমাণ ভালো অবশিষ্ট থাকে, আল্লাহ এটা বহুগুণ বৃদ্ধি করে দিবেন যতক্ষন না সে এর দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করে। এই সবকিছু হবে তাঁর দয়া ও বদান্যতা দ্বারা! যেকোন উপায়ে হোক, আল্লাহর যে কারো জন্য দুঃখ-দুর্দশা নির্ধারন করেছেন; তাদের ভালো কাজ ঐ পরিমাণ বৃদ্ধি করা হবে না যেন সে শাস্তির চূড়ান্ত ঋণ পরিশোধ করতে পারে। বরং দুইয়ের মধ্যে পরে উল্লেখিত ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত কোন একটি ভালো কাজকে দশ গুণ করা হবে না, এগুলো তার দাবিদারদের মধ্যে ন্যায্যভাবে বন্টন করে দেয়া হবে যারা এগুলো গ্রহন করতে সম্মত হবে, তখন পর্যন্ত যদি অবশিষ্ট অবিচারের জন্য আরো অতিরিক্ত পরিশোধ বাকি থাকে, তাহলে তাকে তাদের অসৎ কর্মগুলোর ভার তার আমলনামায় বহন করতে হয়, এটাই তার আগুনে প্রবেশের কারন হয়ে দাঁড়ায়। এটা তাঁরই ন্যায়বিচার।
এই আলোকে ইয়াহিয়া ইবনে মা'সুদ বলেন, “যখন তিনি তাঁর অনুগ্রহ প্রসারিত করেন, তখন ঐ ব্যক্তির একটিও মন্দকাজ অবশিষ্ট থাকে না!, যখন তার ন্যায়পরায়নতা সামনে চলে আসে, ঐ ব্যক্তির একটিও সৎ কর্ম অবশিষ্ট থাকে না।”
বুখারী এবং মুসলিমে উল্লেখ আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেন, "যার আমলনামা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পরীক্ষা করা হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে।” অন্য বর্ণনায় এসেছে "...শাস্তি দেয়া হবে।” এবং অন্য আরেকটি বর্ণনায় এসেছে "...পরাভূত করা হবে।”
আবু নুয়াইম সংগৃহীত আলি (রাঃ) হতে বর্ণিত যে নবী (সঃ) বলেছেন, “বনি ইসরাইলের নবীদের মধ্য হতে একজন নবীকে আল্লাহ জানিয়ে দেন, 'আপনার কওমের মধ্যে যারা আমাকে মান্য করে তাদেরকে বলুন, বিচারদিবসের জন্য তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের উপর অতিরিক্ত মাত্রায় ভরসা করো না, আমার বান্দাকে আমি শাস্তি দেওয়ার ইচ্ছা করলে আমি তার আমলনামার নিষ্পত্তি করবো না তাকে শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত। আপনার উম্মতের মধ্যে যারা আমাকে অমান্য করে তাদেরকে বলুন, তারা যেন হতাশ না হয় কেননা আমি ইচ্ছা করলে অনেক বড় গুনাহ ক্ষমা করে দেই।”
আব্দুল-আজিজ ইবনে আবু রাও-ওয়াদ বলেন, 'আল্লাহ দাউদ (আঃ)কে এই বলে উৎসাহিত করেন, “সুখবর দাও গুনাহগারদের আর সাদাকা দানকারীদের সতর্ক করো।” বিস্ময়কর। দাউদ বলেন, “হে আল্লাহ, আমি কেন গুনাহগারদের সুখবর আর সাদাকা দানকারীদের সতর্ক করবো?” তিনি উত্তর দিলেন, গুনাহগারদের এই সুখবর দিন যে এমন কোন নিদারুন গুনাহ আমি খুজে পাইনি যা ক্ষমার অযোগ্য এবং তাদেরকে সতর্ক করুন যারা এমনভাবে সাদাকা দেয় যে এমন কোন বান্দা নেই যার উপর আঁমি আমার বিচার ও রায় পরিমাপ করে দেইনি, তারা ছাড়া সে ধ্বংস হয়ে যাবে।
ইবনে উয়ায়নাহ বলেন, “সুবিবেচনা বলতে এখানে বুঝানো হয়েছে মন্দ কাজগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরিক্ষার মধ্য দিয়ে এমনভাবে অতিক্রম করানো যেন কোনকিছু অবশিষ্ট না থাকে।”
ইবনে ইয়াযিদ বলেন, "কঠিন হিসাব হলো সেটা যেখানে কোন ক্ষমা নেই আর সহজ হিসাব হলো সেটা যেখানে একজনের গুনাহগুলোকে ক্ষমা করা হয় এবং ভালো কাজগুলোকে গ্রহন করা হয়।”
সবগুলো বিবরন থেকে দেখা যায়, ক্ষমাশীলতা, দয়া এবং ভুলত্রুটির উপেক্ষা ছাড়া বান্দা সফল হতে পারবেনা। এখানে আরো দেখা যায়, বান্দা নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হবে যদি আল্লাহ পুরোপুরি ন্যায়সঙ্গত ভাবে বিহিত করেন।

টিকাঃ
২০. মুসলিম #১৩১/৩৩৮
২১. এই একই অর্থ হাকিম #৭৬৪১ এ উল্লেখ আছে, #৭৬৪২ তে ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত নবী (সঃ) বলেন, "... যদি সৎ আমল বাকি থাকে, আল্লাহ সহৃদয় হয়ে জান্নাতে তার জন্য জায়গা সম্প্রসারিত করবেন।" যাহাবীর সহমতে হাকিম একে সহীহ বলেছেন।
২২. আবু নাইয়িম, ভলিয়ুম ৪, পৃষ্ঠা ২২৪#৫৩২৮; ইবনে আল-মুবারাক, আল-যুহুদ #১৪১৬।
২৩. মুসলিম #২৫৮১/৬৫৭৯, তে আবু হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, আল্লাহর রাসুল (সঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, "তোমরা কি জানো দেউলিয়া ব্যক্তি কে?” তারা বলল, 'আমাদের মধ্যে সেই দেউলিয়া যার সাথে কোন দিরহাম বা সম্পদ কিছুই নেই।' তিনি বলেন, "আমার উম্মাহর মধ্যে দেউলিয়া ব্যক্তি হবে সে যে পুনরুত্থান দিবসে সালাহ, সিয়াম এবং যাকাত নিয়ে আসবে কিন্তু সে এই ব্যক্তিকে গালিগালাজ করেছে, সে ঐ ব্যক্তির সম্পর্কে অপবাদ দিয়েছে, অন্যায়ভাবে ঐ ব্যক্তির সম্পদ ভোগ করেছে, ঐ ব্যক্তির রক্তপাত ঘটিয়েছে এবং ঐ ব্যক্তিকে প্রহার করেছে। তাই তার সৎ কর্মগুলো ঐসব ব্যক্তিদের আমলনামায় যোগ হয়ে যাবে (পাল্টা দুর্ব্যবহারের নীতি অনুসারে) আর যদি তার সৎ কর্ম কম পড়ে যায় হিসাব মিলাতে গিয়ে, তাহলে তাদের অসৎ কর্মগুলো তার আমলনামায় যোগ হবে আর সে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে।” মুসলিম #২৫৮২/৬৫৮০ তে অবু হুরায়রাহ হতে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন, "বিচারদিবসে সবার সব হক ফিরিয়ে দেয়া হবে। এমনকি শিংবিহীন ছাগল যাকে কিনা ভেড়া গুতো দিয়েছিলো সেও ন্যায়বিচার পাবে।"
২৪. আবু নুয়াইম, ভলিয়ুম ১০, পৃষ্ঠা ৬৯ #১৪৫৯৩।
২৫. বুখারী #৬৫৩৭ এবং মুসলিম #২৮৭৬/৭২২৭, ৭২২৮ আয়শা (রাঃ) হতে বর্ণিত। বুখারীতে লেখা আছে আয়শা (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, "আল্লাহ কি বলেন নাই, 'যাকে তার আমলনামা ডানহাতে দেওয়া হবে; তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেওয়া হবে।' [সুরা আল-ইনশিকাকঃ ৭-৮] তিনি উত্তর দিলেন, 'ঐটা পরীক্ষা-নিরিক্ষা নয়, ঐটা হল উপস্থাপন, যে হোক না কেন আমলনামা পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষিত হলে শাস্তি পাবে।”
২৬. বুখারী #৬৫৩৬ এবং #২৮৭৬/৭২২৫ আয়শা (রাঃ) হতে বর্ণিত। উপরিউক্ত বাক্যগুলো তিরমীযি #৩৩৩৮ তে আনাস (রাঃ) হতে সংগৃহীত আছে।
২৭. হাকিম #৮৭২৮ এবং যাহাবী বলেন, এর ইসনাদ দুর্বল। ইবনে আবু শায়বাহ, ভলিয়ুম ১৩, পৃষ্ঠা ৩৬০, এ লেখা আছে, "... ক্ষমা করা হবে না।" এবং ইবনে আল-মুবারাক, আল-জুহুদ, #১৩২৪ এ বাক্যটি উল্লেখ করেছেন আয়শা (রাঃ) এর বক্তব্য হিসেবে।
২৮. তাবারানি, আল-আওসাত #৪৮৪৪। হায়সামি, ভলিয়ুম ১, পৃষ্ঠা ৩০৭ এর মতে এই ইসনাদে দুর্বল বর্ণনাকারী আছে। লেখক, জামি-আল- উলুম, ভলিয়ুম ১, পৃষ্ঠা ১৭৭ এ বলেন, এর ইসনাদ দুর্বল।
২৯. এমনকি শিরক যদি কেউ অনুশোচনা করে।
৩০. আবু নুয়াইম, ভলিয়ুম ৮, পৃষ্ঠা ২১১ #১১৯০৬।
৩১. ইবনে আবু শায়বাহ #৩৫৬৪৪, এ উল্লেখ আছে আবু আল-জাওযা আয়াতটি সম্পর্কে বলেন, "...এবং ভয় করে কঠোর হিসাবকে” [সুরা রা'দঃ ২১]'এর অর্থ হলো একজনের কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হওয়া।'
৩২. গুনাহকে উপেক্ষা করা।
৩৩. তাবারি #৩৪৩৬১, ৩৬৭৩৮ আহমাদ #২৪২১৫-২৫৫১৫ তে উল্লেখ আছে আয়শা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি আল্লাহর রাসুলকে (সঃ) জিজ্ঞাসা করেন, ""সহজ হিসাব' কি?” [সুরা আল-ইনশিকাকঃ ৮] যার উত্তরে তিনি বলেন, "একজন ব্যক্তির গুনাহগুলোকে তার সামনে উপস্থাপন করা হবে শুধুমাত্র সেগুলো উপেক্ষা করার জন্য। যার আমলনামা প্রশ্নবিদ্ধ হবে সে নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হবে।” ইবনে হিব্বান #৭৩৭২, ইবনে খুযায়মাহ #৮৪৯, এবং যাহাবির সহমতে হাকিম #৯৩৬ একে সহীহ বলেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00