📘 আল্লাহর দিকে রাসুল সাঃ এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা > 📄 গ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াতী কাজ থেকে বিরত রাখার প্রচেষ্টা

📄 গ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াতী কাজ থেকে বিরত রাখার প্রচেষ্টা


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা‘আদ ইবন উবাদাহ-এর নিকট যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলে পথে আব্দুল্লাহ ইবন উবাইর ও তার কাওমের লোকদের সাথে দেখা হয়। তাদের দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নেমে তাদের সালাম দেয়, তাদের নিকট কিছু সময় অবস্থান করে তাদেরকে কুরআনের তিলাওয়াত শোনান। তাদের আল্লাহর দিকে ডাকেন, আল্লাহর স্মরণ করিয়ে দেন, আযাব হতে সতর্ক করেন, জান্নাতের সু-সংবাদ দেন এবং জাহান্নামের ভয় দেখান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা শেষ করার পর আব্দুল্লাহ ইবন উবাই তাকে বলে, আমরা তোমার কথা পছন্দ করি না। যদি তুমি যা বলছ, তা সত্য হয়, তাহলে তুমি ঘরে বসে থাক, যে তোমার কাছে আসবে, তাকে তুমি শোনাও আর যে আসবে না তাকে তুমি শাস্তি দিতে যেও না। তুমি এমন লোকদের মজলিসে যাবে না, যারা তোমার কথাকে অপছন্দ করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কিছুই বলেননি, কোনো প্রকার শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দেন।

টিকাঃ
১৩৫. দেখুন: সীরাতে ইবন হিশাম ২১৯, ২১৮/২।

📘 আল্লাহর দিকে রাসুল সাঃ এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা > 📄 ঘ. বনী নাজিরদের স্বীয় ভূমিতে বহাল থাকতে উদ্বুদ্ধকরণ

📄 ঘ. বনী নাজিরদের স্বীয় ভূমিতে বহাল থাকতে উদ্বুদ্ধকরণ


বনী নাজির যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার পরিকল্পনা করে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাকে তাদের নিকট এ নির্দেশ দিয়ে পাঠান, তারা যেন এ শহর থেকে বের হয়ে যায়। কিন্তু মুনাফিকরা বিশেষ করে তাদের সরদার আব্দুল্লাহ ইবন উবাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের বিরোধিতা করে তাদের নির্দেশ দেন যে, তারা যেন বের না হয়। তারা বলে আমরা তোমাদের ছাড়বো না, যদি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে আমরা তোমাদের হয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করব, আর যদি তোমাদের বের করে দেয়, তাহলে আমরাও তোমাদের সাথে বের হয়ে যাব। তাদের কথা শোনে ইয়াহুদীদের সাহস বেড়ে গেল, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশকে অমান্য করল। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ঘেরাও করে ফেলে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ঘেরাও করে ফেললে, আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করে দেয়। তারপর তারা আত্মসমর্পণ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দেশান্তর করে এবং খাইবরে গিয়ে তারা আশ্রয় নেয়।

এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবন উবাইকে ছেড়ে দেয় এবং তাকে কোনো প্রকার শাস্তি দেয়নি।

টিকাঃ
১৩৬. সীরাতে ইবন হিশাম ১৯২/৩; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ ৭৫/৪; যাদুল মায়াদ ১২৭/৩।

📘 আল্লাহর দিকে রাসুল সাঃ এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা > 📄 ঙ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাদের সাথে ‘মুরাইসী’-এর যুদ্ধে গাদ্দারী ও তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র

📄 ঙ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাদের সাথে ‘মুরাইসী’-এর যুদ্ধে গাদ্দারী ও তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র


এ যুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলুল কয়েকটি নির্লজ্জ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যে গুলো তার শাস্তি ও হত্যাকে ওয়াজিব করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কমবখত মুনাফিকটিকে কোনো প্রকার শাস্তি দেন নি বা হত্যা করেন নি।

এক. মুনাফিকরা এ যুদ্ধে ইফকের ঘটনা আবিষ্কার করে এবং তারাই এর পিছনে পড়ে। তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে, সে হলো, আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলুল।

দুই. এ যুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলুল বলেছিল,

﴿لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ ۖ وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَٰكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ﴾ المنافقون: 8

"যদি আমরা মদীনায় ফিরে যাই, তাহলে অবশ্যই সেখান থেকে প্রবলরা দুর্বলদেরকে বহিষ্কার করবে। কিন্তু সকল মর্যাদাতো আল্লাহর, তার রাসূলের ও মুমিনদের, কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না”। [সুরা আল-মুনাফিকূন, আয়াত: ৮]

তিন. আল্লাহর শত্রু আব্দুল্লাহ ইবন উবাই বলেছিল, তোমরা তাদের জন্য তোমাদের ধন সম্পদ হতে খরচ করো না। আল্লাহ তা'আলা তার বর্ণনা দিতে বলেন,

﴿هُمُ ٱلَّذِينَ يَقُولُونَ لَا تُنفِقُواْ عَلَىٰ مَنْ عِندَ رَسُولِ ٱللَّهِ حَتَّىٰ يَنفَضُّواْ وَلِلَّهِ خَزَائِنُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ وَلَٰكِنَّ ٱلْمُنَٰفِقِينَ لَا يَفْقَهُونَ ﴾ [المنافقون: 7]

"তারাই বলে, যারা আল্লাহর রাসূলের কাছে আছে তোমরা তাদের জন্য খরছ করো না, যতক্ষণ না তারা সরে যায়। আর আসমানসমূহ ও যমীনের ধন-ভাণ্ডার তো আল্লাহরই, কিন্তু মুনাফিকরা তা বুঝে না"। [সুরা আল-মুনাফিকূন, আয়াত: ৭]

ফিতনার আগুন নিবানো ও আব্দুল্লাহ ইবন উবাইর খারাবী থেকে আত্মরক্ষার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিকমত এ কৌশল স্পষ্ট। তিনি আল্লাহর অনুগ্রহ, তারপর ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে তার সকল ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করেন। তার নির্যাতন অন্যায় অনাচারের কোনো রকম প্রতিবাদ না করে, তাকে ক্ষমা ও তার প্রতি উদারতা দেখানোর মাধ্যমে তিনি সব কিছু সমাধান করেন। কারণ, সে মুখে ইসলাম প্রকাশ করত, তার সাথে যদি কোনো সংঘর্ষে যাওয়া হতো, ইসলামের দাওয়াত বাধাগ্রস্ত হবে এ আশংকায় উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন আমি তাকে হত্যা করে ফেলি, তখন তিনি বলেন,

دعه حتى لا يتحدث الناس أن محمداً يقتل أصحابه

"তাকে তার আপন অবস্থার ওপর ছেড়ে দাও। কারণ, লোকেরা বলবে মুহাম্মাদ তার সাথীদের হত্যা করা আরম্ভ করছে”। যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যা করত, তাহলে তা মানুষের জন্য ইসলামে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করত। কারণ, তারা জানে আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলুল একজন মুসলিম। তারা ভাবতো মুসলিমরা মুসলিমদের হত্যা করছে।

এ সব ঘটনা দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিভিন্ন ফিতনা-ফাসাদের ওপর ধৈর্য ধারণ করার কারণটি স্পষ্ট হয়। তিনি যখন দেখতে পেতেন এ ফিতনার প্রতিবাদ করতে গেলে আরও বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে, তখন তিনি ধৈর্য ধারণ করতেন। ফিতনার প্রতিবাদ করতে যেতেন না। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন মুনাফিক সরদারকে হত্যা করতে চাইলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতি দেন নি। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু পরবর্তী এর হিকমত বুঝতে পারেন। এ কারনেই তিনি বলেন,

«قد والله علمت، لأمر رسول الله صلى الله عليه وسلم أعظم بركة من أمري»

“আল্লাহর শপথ করে বলছি, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ ও সিদ্ধান্ত আমার মতামত এ সিদ্ধান্ত হতে অধিক বরকতপূর্ণ”।

দা'ঈদের জন্য উচিৎ হলো, তারা তাদের দাওয়াতী ময়দানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের অনুকরণ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে হিকমতের পথ অবলম্বন করেছেন, তারাও তা আবিষ্কার করবে।

وآخر دعوانا أن الحمد الله رب العالمين، وصلى الله وسلم وبارك على نبينا محمد وعلى آله وأصحابه ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين.

এই বইটিতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে যে ধরণের ত্যাগ ও যুলুম-নির্যাতনের স্বীকার হন, তা আলোচনা করা হয় এবং তিনি দাওয়াতী ময়দানে দাওয়াত দিতে গিয়ে কী কী ধরণের হিকমত ও কৌশল অবলম্বন করেন তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়।

টিকাঃ
১৩৭. দেখুন: ইফকের ঘটনা। সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, পরিচ্ছেদ: হাদীসুল ইফক, হাদীস নং ৪১৪১; কিতাবুত তাফসীর, সুরা আন-নূর: আল্লাহর বানী- ﴿وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُم مَّا يَكُونُ لَنَا أَن نَّتَكَلَّمَ بِهَٰذَا سُبْحَانَكَ هَٰذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ﴾; সহীহ মুসলিম, কিতাবুত তাওবাহ ২১২৯/৪।
১৩৮. আরো দেখুন: সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর, আল্লাহ তা'আলার বাণী- سواء عَلَيْهِمْ أَسْتَغْفَرْتَ لَهُمْ أَمْ لَمْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ لَن يَغْفِرَ اللهُ لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ , হাদীস নং ৪৯০৫; সহীহ মুসলিম, কিতাবল বির ওয়াস সিলাহ, পরিচ্ছেদ: তোমার ভাই যালেম ও মযলুমকে সাহায্য করা বিষয় ১৯৯৮/৪; সীরাতে ইবন হিশাম ৩৩৪/৩।
১৩৯. সহীহ বুখারী, কিতাবুত-তাফসীর, সূরা আল-মুনাফিকূন, পরিচ্ছেদ: আল্লাহ তা'আলার বাণি- ﴾وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا يَسْتَغْفِرْ لَكُمْ رَسُولُ اللَّهِ﴿ হাদীস নং ৪৯০৫; সহীহ মুসালিম, কিতাব: মুনাফিকদের বর্ণনা ও তাদের বিধান ৬৩/২৫৮৪।
১৪০. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১৮৫/২; শরহে নববী ১৩৯/১৬; হাযাল হাবীবু ইয়া মুহিব্ব ৩৩৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00