📄 ক. বনী কাইনুকার ইয়াহূদীরা যখন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তখন তাদের বিষয়ে তার সুপারিশ
বদর যুদ্ধের পর মুসলিমদের একজন নারীকে বাজারে উলঙ্গ করে এবং একজন মুসলিমকে হত্যা করে বনী কাইনুকা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। এ ঘটনা ছিল, মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক ও লজ্জস্কর। এ কারণে এর প্রতিশোধ নেয়ার কোনো বিকল্প মুসলিমদের হাতে ছিল না। হিজরতের বিশ মাসের মাথায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাওয়াল মাসের ১৫ তারিখে এ ঘটনার বদলা নিতে তাদের ওপর আক্রমণ করার জন্য বের হন। তিনি প্রথমে তাদেরকে ঘেরাও করে তাদের কিল্লার মধ্যে পনের দিন পর্যন্ত অবরুদ্ধ করে রাখেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লাম তাদের অত্যন্ত শক্তভাবে ঘেরাও করে রাখে। তাদের বাহিরের সাথে যাবতীয় যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
এভাবে চলতে থাকলে, আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করে। তারপর তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে সম্মত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লামের নির্দেশে তাদের সবাইকে হাত বাধা হয়। তারা সাতশজন যোদ্ধা ছিল, আল্লাহ তা'আলা যখন মুসলিমদের তাদের ওপর ক্ষমতা দেয়, তখন আব্দুল্লাহ ইবন উবাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বলে, হে মুহাম্মাদ! তুমি আমার গোলামদের ব্যাপারে দয়া কর। তার কথা শোনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ করে থাকেন। সে আবারো বলে হে মুহাম্মাদ! তুমি আমার গোলামদের ব্যাপারে দয়া কর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারপর সে তার হাতকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামার আস্তিনে প্রবেশ করে দিয়ে বলে, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি তোমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত ছাড়বো না যতক্ষণ না তুমি চারশত সশস্ত্র যোদ্ধা ও তিনশত নিরশ্র যোদ্ধাদের প্রতি দয়া না করবে। তারা আমাকে লাল চামড়া ও কালো চামড়ার লোকদের থেকে দীর্ঘদিন রক্ষা করেছে। আর তুমি তাদের এক প্রহরেই হত্যা করে ফেলবে তা হয় না। আল্লাহর কসম করে বলছি আমি এমন এক লোক যে সীমান্ত হতে আক্রমণ করাকে ভয় করছি। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ক্ষমা করে দেন। তাদের নির্দেশ দেন তারা যেন মদিনা থেকে বের হয়ে যায় এবং মদিনার আশপাশে কোথাও অবস্থান না করে। তারপর তারা সিরিয়াতে চলে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের থেকে মালামাল রেখে দেন। তারপর তাদের গণিমতকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঁচ ভাগ করেন।
টিকাঃ
১৩৩. দেখুন: যাদুল মায়াদ ১৯০, ১২৬/৩।
📄 খ. উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তার আচরণ
উহুদ যুদ্ধ ছিল মুসলিমদের জন্য একটি বাঁচা মরার লড়াই। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ যুদ্ধকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এ যুদ্ধ করার তেমন কোনো আগ্রহী ছিলেন না; কিন্তু সাহাবীদের আগ্রহের কারণে তিনি এ যুদ্ধ করতে এক রকম বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, কমবখত মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলুল এ যুদ্ধে সীমাহীন গাদ্দারী করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সে তার দলবল নিয়ে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। কিন্তু যখন সে ওহুদ ও মদিনার নিকটে পৌঁছে তখন সে এক তৃতীয়াংশ সৈন্য নিয়ে কেটে পড়ে এবং মদিনায় ফিরে আসে। আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম তাদের পিছু নেয় এবং তাদের লজ্জা দেয়, তাদের পুনরায় যুদ্ধে শরীক হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে, সে বলে, তোমরা আস! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কর অথবা শত্রুদের প্রতিহত কর। তার কথার উত্তরে আব্দুল্লাহ ইবন উবাই বলে, আমরা যদি জানতাম, তোমরা এখানে যুদ্ধ করবে, তাহলে আমরা তোমাদের সাথে এখানে আসতাম না। এ বলে সে চলে যায় এবং মুসলিমদের গালি দেয়। এত বড় অপরাধ সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কোনো শাস্তি দেন নি।
টিকাঃ
১৩৪. দেখুন: যাদুল মায়াদ ১৯৪/৩; সীরাতে ইবন হিশাম ৮/৩; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ ৫১/৪
📄 গ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াতী কাজ থেকে বিরত রাখার প্রচেষ্টা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা‘আদ ইবন উবাদাহ-এর নিকট যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলে পথে আব্দুল্লাহ ইবন উবাইর ও তার কাওমের লোকদের সাথে দেখা হয়। তাদের দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নেমে তাদের সালাম দেয়, তাদের নিকট কিছু সময় অবস্থান করে তাদেরকে কুরআনের তিলাওয়াত শোনান। তাদের আল্লাহর দিকে ডাকেন, আল্লাহর স্মরণ করিয়ে দেন, আযাব হতে সতর্ক করেন, জান্নাতের সু-সংবাদ দেন এবং জাহান্নামের ভয় দেখান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা শেষ করার পর আব্দুল্লাহ ইবন উবাই তাকে বলে, আমরা তোমার কথা পছন্দ করি না। যদি তুমি যা বলছ, তা সত্য হয়, তাহলে তুমি ঘরে বসে থাক, যে তোমার কাছে আসবে, তাকে তুমি শোনাও আর যে আসবে না তাকে তুমি শাস্তি দিতে যেও না। তুমি এমন লোকদের মজলিসে যাবে না, যারা তোমার কথাকে অপছন্দ করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কিছুই বলেননি, কোনো প্রকার শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দেন।
টিকাঃ
১৩৫. দেখুন: সীরাতে ইবন হিশাম ২১৯, ২১৮/২।
📄 ঘ. বনী নাজিরদের স্বীয় ভূমিতে বহাল থাকতে উদ্বুদ্ধকরণ
বনী নাজির যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার পরিকল্পনা করে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাকে তাদের নিকট এ নির্দেশ দিয়ে পাঠান, তারা যেন এ শহর থেকে বের হয়ে যায়। কিন্তু মুনাফিকরা বিশেষ করে তাদের সরদার আব্দুল্লাহ ইবন উবাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের বিরোধিতা করে তাদের নির্দেশ দেন যে, তারা যেন বের না হয়। তারা বলে আমরা তোমাদের ছাড়বো না, যদি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে আমরা তোমাদের হয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করব, আর যদি তোমাদের বের করে দেয়, তাহলে আমরাও তোমাদের সাথে বের হয়ে যাব। তাদের কথা শোনে ইয়াহুদীদের সাহস বেড়ে গেল, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশকে অমান্য করল। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ঘেরাও করে ফেলে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ঘেরাও করে ফেললে, আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করে দেয়। তারপর তারা আত্মসমর্পণ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দেশান্তর করে এবং খাইবরে গিয়ে তারা আশ্রয় নেয়।
এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবন উবাইকে ছেড়ে দেয় এবং তাকে কোনো প্রকার শাস্তি দেয়নি।
টিকাঃ
১৩৬. সীরাতে ইবন হিশাম ১৯২/৩; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ ৭৫/৪; যাদুল মায়াদ ১২৭/৩।