📄 ছয়. তোফাইল ইবন আমর আদ-দাউসির সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবহার
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোফাইল ইবন আমর আদদাউসীর সাথে হিকমত পূর্ণ আচরণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের পূর্বে মক্কায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করে। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি তার স্ব-জাতীর নিকট ফিরে যান এবং তাদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দেন। প্রথমে তিনি তার পরিবারের লোকদের দাওয়াত দিলে তার পিতা ও স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর তিনি তার গোত্রের লোকদের ইসলামের দাওয়াত দিলে তারা তার দাওয়াতে সাড়া দেয় নি এবং তাঁর দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে। তোফাইল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে অভিযোগ করল, আমর দাউস সম্প্রদায়ের লোকেরা ধ্বংস, তারা কাফির, নাফরমান ও অস্বীকারকারী। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,
جاء الطفيل بن عمرو الدوسي إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال: إن دوساً قد عصت وأبت، فادع الله عليهم، فاستقبل رسول الله القبلة ورفع يديه، فقال الناس: هلكوا. فقال: اللهم اهد دوساً وانت بهم، اللهم اهد دوساً وانت بهم».
"তোফাইল ইবন আমর আদ-দাউসি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বলে, নিশ্চয় দাউস সম্প্রদায়ের লোকেরা নাফরমান ও অস্বীকারকারী। আপনি তাদের জন্য বদ-দো'আ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবলামুখী হয়ে দু হাত তোলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থা দেখে লোকেরা মন্তব্য করল যে দাউস সম্প্রদায়ের ধ্বংস অনিবার্য। কিন্তু না, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আল্লাহ! তুমি দাউস সম্প্রদায়কে হেদায়েত দাও এবং তাদের তুমি ইসলামের নিয়ে আস। হে আল্লাহ! তুমি দাউস সম্প্রদায়কে হিদায়াত দাও এবং তাদের তুমি ইসলামের ছায়া তলে নিয়ে আস"।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ দো'আ প্রমাণ করে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করাতে কতটা সহনশীল ও ধৈর্যশীল ছিলেন। কারণ, তিনি তাদের জন্য 'আযাব চান নি এবং যারা দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করছে তাদের জন্য বদ-দো'আও করেন নি, তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য হিদায়াতের দো'আ করেন, আল্লাহ তা'আলা তা দো'আ কবুল করেন। তার ধৈর্য, সহনশীলতা ও আযাবের জন্য তাড়াহুড়া না করার সুফল তিনি পরবর্তীতে দেখতে পান। তোফাইল তার সম্প্রদায়ের লোকদের নিকট গিয়ে আবারো যখন তাদের সাথে নম্রতা প্রদর্শন করে তার হাতে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে খাইবরে দেখা করে। তখন দাউসের ঊননব্বইটি পরিবার ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় প্রবেশ করে। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মদিনায় প্রবেশ করলে রাসূল মুসলিমদের সাথে তাদের জন্য মালে গণিমতের অংশ বণ্টন করেন।
আল্লাহু আকবর! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিকমত কতনা মহান! তার কারণেই ঊননব্বইটি পরিবার ইসলাম গ্রহণ করে।
একটি কথা মনে রাখতে যারা আল্লাহর দিকের দা'ঈ তাদের কর্তব্য হলো দাওয়াতে ধৈর্যধারণ ও সহনশীল হওয়া। আর তা কেবল আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ ও দাওয়াতী ময়দানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ কি তা জানার মাধ্যমেই সম্ভব।
টিকাঃ
১০৬. সহীহ বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ২৯৩৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫২৪; আহমদ, হাদীস নং ৪৪৮।
📄 সাত. একজন যুবক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ব্যভিচার করার অনুমতি চাইলে, তার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ
আবি উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
إن فتى شاباً أتى النبي صلى الله عليه وسلم فقال: يا رسول الله، ائذن لي بالزنا، فأقبل القوم عليه فزجروه، وقالوا له مه مه فقال له: ادنه، فدنا منه قريباً، قال: أتحبه لأمك؟ قال: لا والله، جعلني الله فداءك، قال: [ولا الناس يحبونه لأمهاتهم. قال: [أفتحبه لا بنتك؟ قال: لا والله يا رسول الله، جعلني الله فداءك. قال: [ولا الناس يحبونه لبناتهم]. قال: [أفتحبه لأختك؟]. قال: لا والله جعلني الله فداءك। قال: [ولا الناس يحبونه لأخواتهم]। قال: [أفتحبه لعمتك؟]. قال: لا والله، جعلني الله فداءك। قال: ولا الناس يحبونه لعماتهم। قال: [أفتحبه لخالتك؟]. قال: لا والله جعلني الله فداءك। قال: ولا الناس يحبونه لخالاتهم। قال: فوضع يده عليه، وقال: [اللهم اغفر ذنبه، وطهر قلبه، وحصن فرجه، فلم يكن بعد ذلك الفتى يلتفت إلى شيء»
"একজন যুবক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তুমি আমাকে যিনা করার অনুমতি দাও। তার কথা শুনে সবাই তাকে ধমক দিতে শুরু করে এবং তাকে থাম থাম! বলতে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলল, তুমি কাছে আস! যখন কাছে আসল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলল, তুমি তোমার মায়ের সাথে জিনা করতে পছন্দ কর? সে বলল, না আল্লাহর শপথ করে বলছি। আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমার জন্য কুরবান করুক। কোনো মানুষই তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করতে পছন্দ করে না। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলল, তুমি তোমার মেয়ের সাথে জিনা করতে পছন্দ কর? সে বলল, না আল্লাহর শপথ করে বলছি। আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমার জন্য কুরবান করুক। কোনো মানুষই তার মেয়ের সাথে ব্যভিচার করতে পছন্দ করে না। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলল, তুমি তোমার ফুফুর সাথে জিনা করতে পছন্দ কর? সে বলল, না আল্লাহর শপথ করে বলছি। আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমার জন্য কুরবান করুক! কোনো মানুষই তার ফুফুর সাথে ব্যভিচার করতে পছন্দ করে না। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম তাকে বলল, তুমি তোমার খালার সাথে জিনা করতে পছন্দ কর? সে বলল, না আল্লাহর শপথ করে বলছি। আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমার জন্য কুরবান করুক। কোনো মানুষই তার খালার সাথে ব্যভিচার করতে পছন্দ করে না। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত তার ওপর রাখে এবং বলে, হে আল্লাহ! তুমি তার গুণাহ মাপ কর, তার অন্তর পরিষ্কার কর এবং লজ্জা স্থানের হিফাযত কর। তারপর থেকে যুবকটি কখনোই এদিক সেদিক তাকায় নি"।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, যারা আল্লাহর দিকে মানুষদের দাওয়াত দেয় তাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ আদর্শে রয়েছে উত্তম চরিত্র। তাদের উচিত তারা যেন মানুষের সাথে বিনম্র আচরণ করে তাদের প্রতি দয়ার্দ্র থাকে। বিশেষ করে ইসলামে প্রবেশের জন্য যাদের অনুকূলতার প্রয়োজন হয় অথবা যাদের ঈমানের মজবুতি ও ইসলামের ওপর অবিচলতা একান্ত কাম্য হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে মানুষের সাথে বাস্তবিক উত্তম নম্র ও ভদ্র ব্যবহার করতেন অনুরূপভাবে তিনি আমাদেরকে সব সময় উত্তম নম্র ও ভদ্র ব্যবহারের জন্য আদেশ দেন। এ বিষয়ে কয়েকটি হাদীস নিম্নে উল্লেখ করা হলো;
এক. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«دخل رهط من اليهود على رسول الله صلى الله عليه وسلم فقالوا: السام عليكم. قالت عائشة: فهمتها فقلت: وعليكم السام واللعنة. قالت: فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: [مهلاً يا عائشة إن الله يحب الرفق في الأمر كله] فقلت: يا رسول الله أولم تسمع ما قالوا؟ قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: [قد قلت: وعليكم».
"ইয়াহুদীদের একটি জামা'আত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রবেশ করে বলে, আসসারামু আলাইকুম, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি তাদের কথা বুঝতে পেরে বলি এবং তোমাদের ওপর সাম ও অভিশাপ। তিনি বলেন, তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে আয়েশা তুমি থাম! আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি ক্ষেত্রে নম্রতাকে পছন্দ করে। আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! তারা কি বলছে আপনি শোনে নি? তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি-তো ওয়াআলাইকুম বলছ"।
তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
يا عائشة إن الله رفيق يحب الرفق، ويعطي على الرفق ما لا يعطي على العنف، وما لا يعطي على ما سواه
“হে আয়েশা! আল্লাহ তা'আলা রফীক, তিনি প্রতিটি কাজে নম্রতাকে পছন্দ করেন। নমনীয়তার ওপর তিনি যা দেন কঠোরতার ওপর তিনি তা দেন না এবং তা ছাড়া অন্য কিছুর ওপর তিনি তা দেন না”।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
إن الرفق لا يكون في شيء إلا زانه، ولا ينزع من شيء إلا شانه.
"যে কোনো জিনিসের মধ্যে নমনীয়তা তার সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করে আর যে কোনো কাজে নমনীয়তা থাকবে না, তা তাকে ত্রুটিযুক্ত করবে"।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেন,
أن من حرم الرفق فقد حرم الخير
যে ব্যক্তি নম্রতা হতে বঞ্চিত, সে যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
من يحرم الرفق يحرم الخير
যে ব্যক্তি নম্রতা হতে বঞ্চিত, সে অবশ্যই যাবতীয় কল্যাণ হতে বঞ্চিত।
আবু দারদা থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
من أعطي حظه من الرفق فقد أعطي حظه من الخير، ومن حرم حظه من الرفق فقد حرم حظه من الخير
যাকে নম্রতা হতে কিছু অংশ দেওয়া হয়েছে, তাকে কল্যাণ হতে একটি অংশ দেওয়া হয়েছে। আর যাকে নম্রতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তাকে যাবতীয় কল্যাণের থেকে আংশিক বঞ্চিত করা হয়েছে।
তার থেকে আরও বর্ণিত তিনি বলেন,
«من أعطي حظه من الرفق أعطي حظه من الخير، وليس شيء أثقل في الميزان من الخلق الحسن»
“যাকে নম্রতা হতে কিছু অংশ দেওয়া হয়েছে, তাকে কল্যাণ থেকে একটি অংশ দেওয়া হয়েছে। উত্তম চরিত্র থেকে আর কোনো কিছুই কিয়ামতের দিন পাল্লায় ত্রো বেশি ভারি হবে না”।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إنه من أعطي حظه من الرفق فقد أعطي حظه من خير الدنيا والآخرة، وصلة الرحم، وحسن الخلق، وحسن الجوار يعمران الديار ويزيدان في الأعمار»
“যাকে রিফক থেকে কিছু অংশ দেওয়া হয়ে থাকে, তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় কল্যাণ থেকে একটি অংশ দেওয়া হয়ে থাকে। আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক, উত্তম চরিত্র, প্রতিবেশীদের সাথে সু-ব্যবহার ইহকালকে সুন্দর করে এবং বয়সকে বাড়িয়ে দেয়”।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাবতীয় সমস্ত কাজে নম্রতাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা, কাজ ও বর্ণনার দ্বারা এর গুরুত্ব পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরেন, যাতে তার উম্মতগণ তাদের যাবতীয় কাজে নমনীয়তা প্রদর্শন করেন।
বিশেষ করে যারা আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করেন, তাদের জন্য মানুষের সাথে দাওয়াতী ময়দানে, যাবতীয় লেনদেন ও কর্মে নমনীয়তা প্রদর্শন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উল্লিখিত হাদীসগুলো নম্রতার ফযীলত বর্ণনা করে এবং নম্রতার গুণে গুণান্বিত হওয়ার প্রতি উৎসাহ দেয়। এ ছাড়াও হাদীসে উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হওয়ার প্রতি বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হয়। কঠোরতা ও যারা কঠোরতা করে তাদের দুর্নাম করা হয়ে এবং খারাপ চরিত্র হতে দূরে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
মনে রাখতে হবে, নম্রতা যাবতীয় কল্যাণ লাভের কারণ। নম্রতা দ্বারা মানুষ তার অভীষ্ট লক্ষে পৌছতে পারে এবং তার উদ্দেশ্য হাসিল করা সম্ভব হয়। আল্লাহ তা'আলা নম্রতার ওপর এত বেশি সাওয়াব দান করেন, যা অন্য কোনো নেক আমল বা নম্রতার বিপরীত কঠোরতা দ্বারা লাভ করা সম্ভব হয় না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতের ওপর কঠোরতা করতে নিষেধ করেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার ঘরে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন,
«اللهم من ولي من أمر أمتي شيئاً فشق عليهم، فاشقق عليه، ومن ولي من أمر أمتي شيئاً فرفق بهم فارفق به»
“হে আল্লাহ যদি কোনো ব্যক্তি আমার উম্মতের দায়িত্বশীল হয়, তারপর তাদের ওপর কঠোরতা করে, তুমিও তার ওপর কঠোরতা করবে। আর যে ব্যক্তি আমার উম্মতের ওপর দায়িত্বশীল হওয়ার পর তাদের নম্রতা দেখায়। হে আল্লাহ তাদের সাথে তুমি নমনীয় আচরণ কর”।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো সাহাবীকে কোনো কাজে বাহিরে পাঠান, তাদের তিনি সহজ করতে নির্দেশ দেন এবং তাদের তিনি কঠোরতা করতে না করেন।
আবু মুসা আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«كان رسول الله صلى الله عليه وسلم: إذا بعث أحداً من أصحابه في بعض أموره قال: «بشروا ولا تنفروا، ويسروا ولا تعسروا»
"রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো ব্যক্তিকে কোনো বিষয়ে কোথাও পাঠাতেন তখন তাদের তিনি বলতেন, তোমরা তাদের সু-সংবাদ দাও, তাদের তোমরা দূরে সরাবে না। তোমরা তাদের জন্য সহজ করে দাও তাদের ওপর কঠোরতা করো না"।
وَقَالَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لأَبِي مُوسَى الأَشْعَرِي وَمُعَاذِ حِينَمَا بَعَثَهُمَا إِلَى الْيَمَن: «يَسِّرَا وَلَا تُعَسِّرَا، وَبَشِّرَا وَلَا تُنَفِّرَا، وَتَطَاوَعَا وَلَا تَخْتَلِفَا
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু মুসা আশয়ারী রাদিয়াল্লাহু আনহু ও মুয়ায ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন ইয়ামনের দিকে পাঠান তখন তিনি বলেন, তোমরা উভয় সহজ কর কঠিন কর, তোমরা সু-সংবাদ দাও দূরে সরাবে না। তোমরা একমত থাকবে মতবিরোধ করবে না"।
আনাস ইবন মালেক থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
وَعَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا
“তোমরা সহজ কর কঠিন করো না তোমরা তাদের সুসংবাদ দাও তাদের দূরে সরাবে না"।
উল্লিখিত হাদীসসমূহে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা উম্মতদের সহজ করতে নির্দেশ এবং এমন কোনো নির্দেশ দিতে না করেন, যা তাদেরকে তোমাদের থেকে দূরে সরাবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লিখিত হাদীসগুলোতে দু'টি বিষয় নরম তার বিপরীতে গরম উভয়টি একত্র করে আলোচনা করেন। কারণ একজন মানুষ এক সময় নরম দেখাবে আবার অন্য সময় গরম দেখাবে। কখনো সময় সুসংবাদ দেবে আর কখনো সময় ভয় দেখাবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয় দিকটিকে একত্র করেন। কারণ, তিনি যদি শুধু তোমরা কঠোরতা করো না এ কথা বলতেন অথবা তোমরা সুসংবাদ দাও শুধু এ কথা বলতেন তাহলে মানুষ তার বিপরীত কাজ করা হতে একদম বিরত থাকত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সব হাদীসে আল্লাহ তা'আলার অশেষ রহমত, মহান সাওয়াব, তার নি'আমত ও ব্যাপক রহমতের প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন। অপর দিকে তিনি ভয় দেখানোর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার আযাব হতে মানুষকে সতর্ক করেন। এখানে যারা নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা হয়ে থাকে। কারণ, তাদের প্রতি কোনো প্রকার কঠোরতা করা হয় নি। এতে এ কথা স্পষ্ট হয় আরও যে সব বাচ্চারা নিকটে বালেগ হয়েছে বা কোনো গুনাহগার নতুন তাওবা করেছে তাদের সাথে নমনীয় দেখানো ভালো। তাদের সাথে কোনো প্রকার কঠোরতা দেখানো উচিৎ নয়। ইসলামের কোনো বিধানই এ সাথে নাযিল হয়ে যায়নি বরং সব বিধানই আস্তে আস্তে নাযিল হয়েছে যাতে উম্মতের ওপর কঠিন না হয়, বরং উম্মতের জন্য সহজ হয়।
কারণ, একজন ব্যক্তি যখন দেখতে পাবে ইসলাম পালন করা সহজ, তখন সে ইসলামে প্রবেশে আগ্রহী হবে। আর যখন দেখতে পাবে ইসলাম পালন করা এতটা সহজ নয় তখন সে ইসলামে প্রবেশ হতে দূরে থাকবে। সুতরাং মনে রাখতে হবে যে কোনো তা'লীম তরবিয়ত ধীরে ধীরে হওয়া চাই। এক সাথে সব কিছু তালিম দেওয়া যায় না। এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের তা'লীমের ব্যাপারে মাঝে মাঝে বিরতি দিতেন যাতে তারা বিরক্ত না হয়ে যায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে সব ভালো কাজের দিকে পথ দেখান আর তাদেরকে সব ধরণের মন্দ ও খারাব কাজ থেকে ভয় দেখান ও সতর্ক করেন। আর যারা তার উম্মতের ওপর কঠোরতা করে তাদের জন্য তিনি অভিশাপ করেন। আর যারা তার উম্মতের জন্য সহজ করেন এবং নম্রতা প্রদর্শন করেন তাদের জন্য তিনি দো'আ করেন। যেমনটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার হাদীসে অতিবাহিত হয়েছে। এ ছিল যারা উম্মতের ওপর কঠোরতা আরোপ করে তাদের জন্য কঠিন হুমকি আর যারা উম্মতের জন্য সহজ করে তাদের জন্য চূড়ান্ত উৎসাহ।
টিকাঃ
১০৭. আহমদ তার মুসনাদে ২৫৭/২।
১০৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬০২৪।
১০৯. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৯৩।
১১০. পূর্বের রেফারেন্স ২৫৯৪।
১১১. পূর্বের রেফারেন্স ২৫৯২।
১১২. তিরমিযী, হাদীস নং ২০১৩।
১১৩. মুসানাদে আহমদ ৪৫১/৬।
১১৪. মুসনাদে আহমদ ১৫৯/৬।
১১৫. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৮২৮।
১১৬. সহীহ মুসলিম কিতাবুল জিহাদ ১৩৫৮/৩, ১৭৩২।
১১৭. সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, হাদীস নং ৪৩৫৪, ৭৪৩৪৪; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৭৩৩।
১১৮. সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইলম, হাদীস নং ৬৯; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৭৩২।
১১৯. দেখুন: ফতহুল বারী ১৬৩, ১৬২/১।
১২০. দেখুন: শরহে নববী ২১৩/২।
📄 আট. হদ কায়েম করার বিষয়ে সুপারিশকারীর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাবতীয় কাজে ও বিধানের ক্ষেত্রে সমগ্র মানুষের চেয়ে বড় ইনসাফকারী ছিলেন। এ বিষয়ে যে ঘটনাটি কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামের ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, তা হলো, মাখজুমি গোত্রের মহিলা যে চুরি করার পর তার বিষয়ে উসামা রাদিয়াল্লাহু আনহু সুপারিশ করা সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত কেটে দেন। আল্লাহ তা'আলার বিধান বাস্তবায়নে তিনি কারো কোনো সুপারিশ কবুল করেন নি।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত,
" أَن قُرَيْشاً أَهَمَّهُمْ شَأْنُ الْمَرْأَةِ الْمَخْزُومِيَّةِ الَّتِي سَرَقَتْ فِي عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي غَزْوَةِ الْفَتْحِ ، فَقَالُوا : مَنْ يُكَلِّمُ فِيهَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ؟ فَقَالُوا : وَمَنْ يَجْتَرِئُ عَلَيْهِ إِلاَّ أُسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ ، حِبُّ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأُتِيَ بِهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَلَّمَهُ فِيهَا أُسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ ، فَتَلَوَّنَ وَجْهُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ : " أَتَشْفَعُ فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ؟ فَقَالَ لَهُ أُسَامَةُ: اسْتَغْفِرْ لِي يَا رَسُولَ اللَّهِ! فَلَمَّا كَانَ الْعَشِيُّ قَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاخْتَطَبَ فَأَثْنَى عَلَى اللَّهِ بِمَا هُوَ أَهْلُهُ ، فَقَالَ : [ أَمَّا بَعْدُ ، أَيُّهَا النَّاسُ : إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمْ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ ، وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمْ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ، وَإِنِّي وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا]. ثُمَّ أَمَرَ بِتِلْكَ الْمَرْأَةِ الَّتِي سَرَقَتْ فَقُطِعَتْ يَدُهَا ".
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মক্কা বিজয়ের বছর মাখজুমি গোত্রের একজন মহিলা চুরি করে ধরা পড়লে, তা কুরাইশদের চিন্তার কারণ হয়ে পড়ে। তারা বলাবলি করতে লাগলো যে, তার বিষয়ে কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে সুপারিশ করবে? তখন তারা ঠিক করল, এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বাধিক প্রিয় লোক উসামা ইবন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া আর কেউ সাহস করবে না। তারপর উসামা রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে তার বিষয়ে কথা বলে এবং সুপারিশ করে। তার কথা শোনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা লাল হয়ে গেল এবং তিনি বললেন, তুমি আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের বিষয়ে আমার নিকট সুপারিশ করছ! এ কথা শোনে উসামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলল, হে আল্লাহর রাসুল আপনি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তারপর যখন সন্ধ্যা হলো, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদের মিম্বারে খুতবা দিতে দাঁড়ালো। প্রথমে তিনি আল্লাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এমন কথা দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করল। তারপর তিনি বললেন, তোমরা মনে রাখ! তোমাদের পূর্বের উম্মতদের ধ্বংসের কারণ হলো, তাদের মধ্যে যদি কোনো সম্ভান্ত লোক চুরি করত, তখন তাকে তারা শাস্তি দিত না, তাকে ক্ষমা করে দিত। আর যখন তাদের মধ্যে কোনো দুর্বল লোক চুরি করত, তার ওপর তারা আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করত। আর আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতেমাও চুরি করে, আমি তার হাত কেটে দেব। তারপর তিনি মহিলাটির হাত কাটার নির্দেশ দিলে তার হাত কেটে দেওয়া হয়।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তারপর সে তাওবা করে এবং বিবাহ করে। সে মাঝে মাঝে বিভিন্ন প্রয়োজনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলে, আমি তার বিষয়টি রাসূল-এর নিকট উঠাতাম"।
ইনসাফ হলো, যুলুমের পরিপন্থী। আল্লাহ তা'আলা যাবতীয় কর্মে ইনসাফ করার নির্দেশ দেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا ذَلِكُمْ وَصَّيْكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ﴾ [الأنعام: 152]
"আর যখন তোমরা কথা বলবে, তখন ইনসাফ কর, যদিও সে আত্মীয় হয় এবং আল্লাহর ওয়াদা পূর্ণ কর। এ গুলো তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর”। [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৫২]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا ﴾ [النساء: 58]
"আর যখন মানুষের মধ্যে ফয়সালা করবে তখন ন্যায়ভিত্তিক ফয়সালা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে কতইনা সুন্দর উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৮]
নিঃসন্দেহে একটি কথা বলা যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইনসাফ কায়েমের ক্ষেত্রে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন একজন দা'ঈ বা যারা আল্লাহর দীনকে দুনিয়াতে বাস্তবায়ন করার সংগ্রাম করে তাদের কর্তব্য হলো, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আদর্শের অনুকরণ করবে।
টিকাঃ
১২১. কিতাবুল হুদুদ: হাদীস নং ৬৭৮৭; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল হুদুদ, হাদীস নং ১৬৮৮।
১২২. আবু দাউদ ২৪২/২; নাসাঈ ৬৪/৭; সহীহ বুখারী, ২৯২/৩; সহীহ মুসলিম, ৪৫৮/৩; হাযাল হাবীবু ইয়া মুহিব্ব ৫৩৫।
📄 নয়. দান খয়রাত করার ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ
আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
مَا سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْإِسْلَامِ شَيْئاً إِلَّا أَعْطَاهُ قَالَ: فَجَاءَهُ رَجُلٌ فَأَعْطَاهُ غَنَمَاً بَيْنَ جَبَلَيْنِ فَرَجَعَ إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ: يَا قَوْمِ، أَسْلِمُوا؛ فَإِنَّ مُحَمَّدَاً يُعْطِي عَطَاءً لَا يَخْشَى الْفَاقَةَ
"রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কোনো কিছু চাওয়া তিনি তাকে কিছু না দিয়ে কোনোদিন ফেরত পাঠায় নি। একদিন তার নিকট একজন লোক এসে কিছু চাইলে তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মাঝ থেকে একটি ছাগল দেন। ছাগলটি নিয়ে সে তার সম্প্রদায়ে লোকদের নিকট গিয়ে বলে, হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। কারণ, মুহাম্মাদ এত বেশি দান করে সে তার নিজের অভাবকে ভয় করে না"।
লোকটির কথা স্পষ্ট প্রমাণ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত যে দানশীল ছিলেন এবং তার হাত কতটা প্রসস্থ ছিল।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই আল্লাহর রাহে দান-খয়রাত করেন। আবার কখনো সময় ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য লোকদের তিনি দান খয়রাত করেন। প্রথমে দেখা যায়, একজন লোক পার্থিব উদ্দেশ্যে ইসলাম গ্রহণ করে কিন্তু যখন সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে থাকতে থাকে তখন কিছু দিন যেতে না যেতে আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরে ইসলামের মোহাব্বত ও ঈমানের হাকীকত খুলে দেয়। তখন তার নিকট ঈমান ও ইসলাম দুনিয়া ও দুনিয়াতে যা কিছু আছে সব কিছুর চেয়ে বেশি প্রিয় হয়ে যায়।
এ ধরণের দৃষ্টান্ত হাদীসে অনেক আছে। যেমন, ইমাম মুসলিম তার সহীহ'তে বর্ণনা করেন,
أن النبي صلى الله عليه وسلم غزا غزوة الفتح - فتح مكة - ثم خرج صلى الله عليه وسلم بمن معه من المسلمين فاقتتلوا بحنين، فنصر الله دينه والمسلمين، وأعطى رسول الله صلى الله عليه وسلم صفوان بن أمية مائة من الغنم، ثم مائة، ثم مائة. قال صفوان: والله لقد أعطاني رسول الله صلى الله عليه وسلم ما أعطاني وإنه لأبغض الناس إلي، فما برح يعطيني حتى إنه لأحب الناس إلي».
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের তার সাথে যে সব মুসলিম ছিল তাদের নিয়ে হুনাইনের দিকে রওয়ানা করেন। সেখানে যুদ্ধ করার পর আল্লাহ তা'আলা ইসলাম ও মুসলিমদের বিজয় দান করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফওয়ান ইবন উমাইয়াকে একশটি উট দেন। তারপর আরও একশ তারপর আরও একশ। সাফওয়ান ইবন উমাইয়া বলে, আল্লাহর শপথ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে যা দেওয়ার দিয়েছেন। তিনি আমার নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন দিতে থাকেন এখন সে আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হন”।
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
إن كان الرجل ليسلم ما يريد إلا الدنيا، فما يسلم حتى يكون الإسلام أحب إليه من الدنيا وما عليها
“এমন মানুষ ছিল যারা একমাত্র পার্থিব কোনো উদ্দেশ্য নিয়েই ইসলাম গ্রহণ করত। কিন্তু যখন সে ইসলাম গ্রহণ করত তখন ইসলাম তার নিকট দুনিয়া ও দুনিয়াতে যা কিছু আছে তা হতে সর্বাধিক প্রিয় বস্তুতে পরিণত হত"।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো দুর্বল ঈমানদার লোক দেখতেন তখন তাকে পার্থিব মালামাল বেশি দান করতেন এবং তিনি বলতেন,
«إني لأعطي الرجل وغيره أحب إلي منه خشية أن يُكب في النار على وجهه».
"আমি যদি কোনো লোককে কোনো কিছু দিয়ে থাকি তা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয় তাকে জাহান্নামে উপর করে নিক্ষেপ করার ছেয়ে। এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশের অনেক লোককে একশ উট দান করে দিতেন"। যেমনটি হাদীসে বর্ণিত,
«يعطي رجالاً من قريش مائة من الإبل»
"রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশের অনেক লোককে একশ উট দান করে দিতেন"।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিকমতপূর্ণ আচরণের আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো, দুই মশক বিশিষ্ট মুশরিক মহিলার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম...... মশক দু'টি আগের চেয়ে আরও বেশি পরিপূর্ণ রূপে ফিরে আসে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথীদের বলেন, তোমরা তার জন্য একত্র কর। তখন তারা তার শুকনা খেজুর আটা ও ছাতু ইত্যাদি যোগাড় করে। অনেক গুলো খানা একত্র করে একটি কাপড়ে রাখে এবং তার উটের ওপর তুলে দেয়। তারপর কাপড়টি তার সামনে রেখে তাকে বলেন, তুমি যাও তোমার পরিবার পরিজনকে তোমরা এসব খাওয়াও। আল্লাহর শপথ অচিরেই তুমি জানতে পারবে আমরা তোমার পানি হতে একটুও কমাই নেই। তবে আল্লাহ তা'আলা আমাদের পান করিয়েছে।
এখানে আরও বর্ণিত যে মহিলাটি তার কওমের দিকে ফিরে এসে বলে, আমি বড় একজন যাদুকরের সাথে সাক্ষাত করছি। তারা বিশ্বাস করে সে একজন নবী। আল্লাহ তা'আলা এ মহিলার মাধ্যমে কয়েকটি পরিবারকে দীনের দিকে হিদায়াত দেন। সে নিজে ইসলাম গ্রহণ করে এবং তার মাধ্যমে আরও অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করে।
মহিলাটির ইসলাম গ্রহণের কারণ দু'টি বিষয়:
এক. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীরা তার মশক নিয়ে যেতে সে দেখ। কিন্তু এ কারণে তার পানি একটুও কমে নি। এটি ছিল নিশ্চিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মু'জিজা যা তার রিসালাতের সত্যতার ওপর বিশেষ প্রমাণ।
দুই. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদারতা ও দানশীলতা। কারণ, তিনি তার সাহাবীদের আদেশ দেন যাতে তারা তার জন্য অনেক খাদ্য একত্র করে। তারপর তারা যখন খাদ্য একত্র করে তা তাকে মুগ্ধ করে। আর তার কওমের লোকেরা তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করে। কারণ মুসলিমরা তার কওমের লোকদের অবস্থার প্রতিও বিশেষ গুরুত্বারোপ করে, যাতে তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এটাই শেষ পর্যন্ত তাদের ইসলাম কবুল করার কারণ হয়ে দাড়ায়।
উপরে যে সব দৃষ্টান্ত আলোচনা করা হলো, তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দানশীলতা ও বদান্যতার অথৈই সমুদ্রের একটি ফোটা মাত্র। অন্যথায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দানশীলতা ও বদান্যতার বর্ণনা দিয়ে শেষ করা আমাদের কারো পক্ষে সম্ভব নয়। দা'ঈদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুকরণ, তার আদর্শ ও আখলাক হতে এসব আচরণ গুলো চয়ন করে, তা তারা তাদের যাবতীয় কর্মক্ষেত্রে ও দাওয়াতী ময়দানে কাজে লাগাতে পারে। আল্লাহই আমাদের সাহায্যকারী।
টিকাঃ
১২৩. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল ১৮০৬/৪।
১২৪. সহীহ বুখারী, কিতাবুল আদব, হাদীস নং ৬০৩৩; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল, হাদীস নং ১৮০৬, ১৮০৫।
১২৫. দেখুন: শরহে নববী ৭২/১৫।
১২৬. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল: ১৮০৬/৪, হাদীস নং ২৩১৩।
১২৭. পূর্বের রেফারেন্স ১৮০৬, ৫৮/২৩১২।
১২৮. সহীহ বুখারী, কিতাবুয যাকাত, হাদীস নং ১৪৭৮, সহীহ মুসলিম, কিতাবুয যাকাত, হাদীস নং ১০৫৯।
১২৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩১৪৭।
১৩০. সহীহ বুখারী, কিতাবুল মানাকেব, হাদীস নং ৩৫৭১; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল মাসাজিদ, হাদীস নং ৬৮২।
১৩১. দেখুন: ফাতহুল বারী ৪৫৬/১।