📄 চার. গ্রাম্য লোক যে মসজিদে পেশাব করছিল, তার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ
আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
بينما نحن في المسجد مع رسول الله صلى الله عليه وسلم إذ جاء أعرابي، فقام يبول في المسجد، فقال أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم: مه مه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لاتزرموه دعوه ، فتركوه حتى بال، ثم إن رسول الله صلى الله عليه وسلم دعاه فقال له : [ إن هذه المساجد لا تصلح لشيء من هذا البول، ولا القذر، إنما هي لذكر الله، والصلاة وقراءة القرآن، أو كما قال رسول الله صلى الله عليه وسلم
"একদা আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে মসজিদে বসা ছিলাম। এ অবস্থায় একজন অপরিচিত লোক এসে মসজিদে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে আরম্ভ করে। তখন রাসূলের সাহাবীগণ তাকে বলল, থাম, থাম। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, তোমরা তাকে বাধা দিও না। তাকে তার আপন অবস্থায় ছেড়ে দাও। তারপর তারা তাকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দিলে সে পেশাব সম্পন্ন করে। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডাকল, এবং বলল, এ হলো, মসজিদ এখানে পেশাব পায়খানা করা চলে না। এতো শুধু আল্লাহর যিকির, সালাত আদায় ও কুরআনের তিলাওয়াতের জন্য বানানো হয়েছে। অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে বলেছেন-
বর্ণনাকারী বলেন, «فأمر رجلاً من القوم فجاء بدلو من ماء فشنه عليه»
"তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লোককে আদেশ দিলে সে একটি বালতি করে পানি নিয়ে আসে এবং তা পেশাবের ওপর ডেলে দেয়”।
وقد ثبت في البخاري وغيره أن هذا الرجل هو الذي قال: اللهم ارحمني ومحمداً ولا ترحم معنا أحداً»
সহীহ বুখারী ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত, এ লোকটিই বলে,
اللهم ارحمني ومحمداً ولا ترحم معنا أحداً
"হে আল্লাহ তুমি আমাকে ও মুহাম্মাদকে দয়া কর আমাদের সাথে কাউকে দয়া করবে না"।
অপর এক বর্ণনায় আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
قام رسول الله صلى الله عليه وسلم وقمنا معه، فقال أعرابي وهو في الصلاة: اللهم ارحمني ومحمداً، ولا ترحم معنا أحداً، فلما سلم النبي صلى الله عليه وسلم قال للأعرابي: لقد حجرت واسعاً يريد رحمة الله».
"রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ালে তার সাথে আমরাও দাঁড়াই। তখন একজন লোক সালাতে বলে, হে আল্লাহ আমাকে এ মুহাম্মাদকে দয়া কর, আমাদের সাথে আর কাউকে দয়া করবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাম ফিরান তখন তিনি গ্রাম্য লোকটিকে বলেন, তুমি আল্লাহর ব্যাপক রহমতকে সংকীর্ণ করে দিলে, অর্থাৎ আল্লাহর রহমত"।
সহীহ বুখারী ছাড়া অন্যান্য হাদীসের কিতাবসমূহে এ ধরণের বর্ণনার ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:
যেমন, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«دخل رجل أعرابي المسجد فصلى ركعتين ثم قال: اللهم ارحمني ومحمداً، ولا ترحم معنا أحداً! فالتفت إليه رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال: لقد تحجرت واسعاً، ثم لم يلبث أن بال في المسجد، فأسرع الناس إليه فقال لهم رسول الله صلى الله عليه وسلم: [ إنما بعثتم ميسرين، ولم تبعثوا معسرين، أهريقوا عليه دلواً من ماء، أو سجلاً من ما»
একজন গ্রাম্য লোক মসজিদে প্রবেশ করে দুই রাকাত সালাত আদায় করে তারপর বলে, হে আল্লাহ তুমি আমাকে এবং মুহাম্মাদকে দয়া কর, আমাদের সাথে আর কাউকে দয়া করো না। এ কথা শোনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকায় এবং বলে তুমি ব্যাপককে সংকীর্ণ করে দিলে। এ কথা বলতে না বলতে লোকটি মসজিদে পেশাব করে দিল। লোকেরা তার দিকে দৌড়ে আসলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, তোমাদের প্রেরণ করা হয়েছে, সহজ করার জন্য কঠিন করার জন্য নয়। তোমরা তার উপর এক বালতি অথবা এক মশক পানি ঢেলে দাও"।
তিনি বলেন, লোকটি ইসলাম গ্রহণ করার পর বলেন,
«فقام النبي صلى الله عليه وسلم إلي بأبي وأمي فلم يسب، ولم يؤنب، ولم يضرب».
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে অগ্রসর হলো, তার ওপর আমার মাতা পিতা কুরবান হোক, সে আমাকে একটু ঘালি দেয় নি, কোনো প্রকার ধমক দেয় নি এবং আমাকে একটুও মারে নি”।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার সর্বাধিক জ্ঞানী মাখলুক। তার যাবতীয় কার্যক্রম আচার ব্যবহার হিকমত পূর্ণ ও উন্নত। যে ব্যক্তি তার আখলাক, চরিত্র, দয়া, অনুগ্রহ, ধৈর্য, সহনশীলতা ইত্যাদি সম্পর্কে জানবে তার প্রতি তার ঈমান এ বিশ্বাস আরও বৃদ্ধি পাবে।
গ্রাম্য লোকটি এমন কাজই করল, যা শান্তি যোগ্য ও উপস্থিত লোকদের তোপের মুখে পড়ার মতো অপরাধ। কাজটি যে কোনো মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলে। এ কারণেই রাসূলের সাহাবীরা দাড়িয়ে গেল, কাজটিকে অপছন্দ করল এবং তাকে ধমক দিল। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পেশাবে বাধা দিতে না করলেন।
এটি ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নম্রতা, সহনশীলতা ও দয়াদ্রতার সবোর্চচ বহিঃপ্রকাশ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত হিকমতের সাথে গ্রাম্য লোকটির কাজকে পরিবর্তন করে দেন। যখন সে বলে “আল্লাহুম্মার হামনি মুহাম্মাদান, ওয়ালা তারহাম মায়ানা আহাদা হে আল্লাহ আমাকে ও মুহাম্মাদকে দয়া কর আমাদের সাথে আর কাউকে দয়া করো না, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, লাকাদ হাজজারতা ওয়াসিয়া’ তুমি ব্যাপক রহমতকে সংকীর্ণ করে দিলে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য এ কথা দ্বারা আল্লাহর রহমত। কারণ, আল্লাহর রহমত সব কিছুকে সামিল করে নেয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ﴾
“আর আমার রহমত সব বস্তুকে পরিব্যাপ্ত করেছে”। [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬]
আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় আল্লাহর রহমত ব্যাপক তা সবকিছুকেই সামিল করে নেয়। অথচ লোকটি আল্লাহ তা'আলার মাখলুকের ওপর তার রহমতকে সংকীর্ণ করে দেন। এ কারণে আল্লাহ তা'আলা যে ব্যক্তি এর বিপরীত অর্থাৎ ব্যাপক রহমত কামনা করছে, কুরআনে কারীমে তার প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَالَّذِينَ جَاءُو مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ﴾ [الأعراف: ১৫৬]
"যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে: হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন: এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না; হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু"। [সুরা আল-হাশর, আয়াত: ১০]
আয়াতে যে ব্যাপক রহমত কামনা করছে তার প্রসংশা করছে। অপর দিকে এ গ্রাম্য লোকটি আয়াতের খেলাপ দো'আ করে। এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিকমতের সাথে তাকে বুঝিয়ে দেন।
আর যখন লোকটি মসজিদে পেশাব করা আরম্ভ করে দেয়, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেন। যারা তাকে পেশাব করতে বাধা দিতে সামনে অগ্রসর হচ্ছিল তাদের তিনি বারণ করেন। কারণ, সে তো একটি ফ্যাসাদ আরম্ভ করে দিয়েছে, এখান যদি তাকে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে তার ক্ষতি আরও বেড়ে যাবে। মসজিদের কিছু অংশ নাপাক হলোই, এখন যদি তাকে আরও বাধা দেওয়া হয়, আরও দু'টি ক্ষতি হতে পারে।
এক. পেশাব আরম্ভ করার পর তার পেশাব করা বন্ধ করে দেওয়া হলে, তার ক্ষতি হতে পারে। কারণ, পেশাব বের হওয়ার পর বন্ধ করা স্বাস্থ্য সম্মত নয়।
দুই. অথবা যদি তাকে বাধা দেওয়া হয়, তাতে তার শরীরের অন্যান্য অংশ, পরিধেয় কাপড় ও মসজিদ ইত্যাদিতে নাপাক ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ কল্যাণের দিক বিবেচনা করে, তাকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দেন এবং তার থেকে বিরত থাকেন। আর বিশেষ কল্যাণ হলো, বড় দু'টি খারাবী অথবা ক্ষতিকে প্রতিহত করতে তুলনামূলক কম ক্ষতিকে মেনে নেন।
এ ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান হিকমত ও উন্নত বুদ্ধিমত্তা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খারাবীর বিপরীতে কল্যাণকর দিক গুলো বিবেচনায় রাখেন। এ ঘটনার মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মত ও দা'ঈদের জন্য জাহেলদের কোনো প্রকার ধমক, গালি, কষ্ট ও দুর্ব্যবহার ছাড়া কিভাবে দয়া করবে ও তা'লীম দেবে তা নির্ধারণ করে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যবহার- তার প্রতি দয়া করা, বিনম্র আচরণ-এ গ্রাম্য লোকটির জীবনে বিশাল প্রভাব ফেলে। লোকটি ইসলাম গ্রহণ করার পর বলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিক অগ্রসর হন। আমার মাতা-পিতা তার ওপর কুরবান হোক তিনি আমাকে কোনো প্রকার ঘালি দেন নি, আমাকে ধমক দেন নি এবং প্রহার করেন নি। লোকটির জীবনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ চরিত্র বিশাল প্রভাব ফেলে।
টিকাঃ
৯৯. সহীহ মুসলিম, কিতাবুত তাহারাহ ২৮৫; সহীহ বুখারী, কিতাবুল অযু ২১৯।
১০০. সহীহ বুখারী, কিতাবুল আদব, হাদীস নং ৬০১০; তিরমিযী, কিতাবুত তাহারাত, হাদীস নং ১৪৭; আহমদ ২৪৪/২; আবু দাউদ ৩৯/২।
১০১. তিরমিযী, হাদীস নং ১৪৭; আহমদ, হাদীস নং ১০৫৪০।
১০২. ফাতহুল বারী ৪৩৯/১০।
১০৩. ফাতহুল বারী ৩২৫/১।
১০৪. ফাতহুল বারী ৩২৫/১।
📄 পাঁচ. মুয়াবিয়া ইবন হাকামের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ
মুয়াবিয়া ইবন হাকাম আস-সুলামী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
بينما أنا أصلي مع رسول الله صلى الله عليه وسلم إذ عطس رجل من القوم، فقلت: يرحمك الله! فرماني القوم بأبصارهم، فقلت: واثكل أمياه ما شأنكم تنظرون إلي؟ فجعلوا يضربون بأيديهم على أفخاذهم فلما رأيتهم يصمتونني، لكني سكت، فلما صلى رسول الله صلى الله عليه وسلم فبأبي هو وأمي ما رأيت معلماً قبله ولا بعده أحسن تعليماً منه، فوالله ما كهرني ولا ضربني ولا شتمني، قال: [إن هذه الصلاة لا يصلح فيها شيء من كلام الناس، إنما هو التسبيح والتكبير وقراءة القرآن، أو كما قال رسول الله صلى الله عليه وسلم»
“একদিন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সালাত আদায় করতে ছিলাম, তখন এক লোক সালাতে হাঁসি দিলে আমি বললাম আল্লাহ তোমাকে রহম করুক। এ কথা বলার পর লোকেরা আমাকে তাদের চোখ দ্বারা ইশারা করে চুপ করাতে থাকে। আমি তাদের বললাম, তোমাদের মাতা সন্তান হারা হোক! তোমরা আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছ কেন? তারপর তারা তাদের হাত দ্বারা রানের ওপর আঘাত করে আমাকে চুপ করানোর চেষ্টা করে। আমি যখন বুঝতে পারলাম, তারা আমাকে চুপ করাচ্ছে, আমি চুপ হয়ে গেলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর আমার মাতা-পিতা কুরবান হোক ইতিপূর্বে ও পরে কখনোই তার চেয়ে উত্তম কোনো শিক্ষক যিনি এত সুন্দর তা'লীম দিতে পারে, আমি দেখিনি। আল্লাহর শপথ করে বলছি, তিনি আমাকে একটু ধমক দেন নি, আমাকে প্রহার করে নি এবং কোনো প্রকার গাল মন্দ করেন নি। সালাত শেষ করার পর, আমাকে বললেন, সালাতে কোনো প্রকার কথা বলার অবকাশ নেই। সালাত হলো, তাসবীহ, আল্লাহর যিকির ও কুরআনের তিলাওয়াত।
قلت: يا رسول الله إني حديث عهد بجاهلية، وقد جاء الله بالإسلام، وإن منا رجالاً يأتون الكهان، قال: [فلا تأتهم.] قال: ومنا رجال يتطيرون، قال: [ذاك شيء يجدونه في صدورهم فلا يصدنهم ، قال ابن الصلاح: فلا يصدنكم)، قال: قلت: ومنا رجال يخطون. قال: كان نبي من الأنبياء يخط، فما وافق خطه فذاك».
"আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! আমি নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহ তা'আলা আমাদের ইসলামের মতো নি'আমত দান করেছেন। আমাদের কতক লোক আছে যারা গণকদের কাছে আসে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাদের নিকট তুমি আসবে না। তিনি আরো বলেন, আমাদের কিছু লোক এমন আছে, যারা পাখি উড়িয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করে! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন, এটি একটি কুসংস্কার যা তাদের অন্তরে তারা লালন করে, এ সব যেন তোমাকে কোনো কাজ থেকে বিরত না রাখে। বললেন, ইবনুস সালাহ তোমাকে যেন এ সব থেকে বিরত না রাখে। বলেন, আমি বললাম আমাদের মধ্যে কতক লোক আছে তারা দাগ টানে! তিনি বলেন, একজন নবী ছিল তিনি দাগ টানতেন, যার দাগ তার দাগের সাতে মিলে সে ভাগ্যবান। তারপর সে বলে,
وكانت لي جارية ترعى غنماً لي قبل أحد والجوانية فاطلعت ذات يوم فإذا الذئب قد ذهب بشاة من غنمها، وأنا رجل من بني آدم، آسف كما يأسفون، لكني صككتها صكة، فأتيت رسول الله صلى الله عليه وسلم فعظم ذلك على، قلت: يا رسول الله! أفلا أعتقها، قال: ائتني بها ، فأتيته بها، فقال لها: [أين الله؟] قالت: في السماء، قال: من أنا؟ قالت: أنت رسول الله. قال: [أعتقها فإنها مؤمنة».
"আমারা একটি বাঁদি ছিল, সে উহুদ-এ জাওয়ানিয়ার দিকে আমার ছাগল চরাত। সে একদিন এসে আমাকে বলল, একটি ছাগল নেকড়ে বাঘ এসে নিয়ে গেছে। আমি একজন আদম সন্তান হিসেবে অন্যান্যদের মত ব্যথিত হই। তারপর আমি তাকে একটি থাপ্পড় দিই। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আসলে বিষয়টি আমার নিকট পীড়াদায়ক মনে হলে আমি বলি হে আল্লাহর রাসূল! তাকে আজাদ করে দিব কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে তুমি আমার নিকট নিয়ে আস। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করে বলে, আল্লাহ কোথায়? সে বলে আল্লাহ আসমানে। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করে, আমি কে? সে বলে, তুমি আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে আজাদ করে দাও! কারণ সে ঈমানদার। (হাদীসে একটি কথা স্পষ্ট হয় যে আল্লাহ তা'আলা আসমানে। অনেকেই মনে করে আল্লাহ তা'আলা সর্বত্র বিরাজমান। তাদের এ ধারণা যে ভ্রান্ত্র তা এ হাদীস ও অন্যান্য আরো কুরআনের আয়াত ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ আচরণ উন্নত হিকমত ও মহান চরিত্রেরই বহি:প্রকাশ, যা কেবল তাকেই আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। এ কারনেই তিনি একজন মহা মানব। মুয়াবিয়ার জীবনে এর একটি প্রভাব পড়ছে। কারণ মানুষ যে তার প্রতি এহসান করে তার দিকে আকৃষ্ট হয়। এ কারণেই মুয়াবিয়া বলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর আমার মাতা-পিতা কুরবান ইতোপূর্বে ও পরে কখনোই তার চেয়ে উত্তম কোনো শিক্ষক যিনি এত সুন্দর তা'লীম দিতে পারে আমি দেখিনি। আল্লাহর শপথ করে বলছি, তিনি আমাকে একটু ধমক দেন নি, আমাকে প্রহার করে নি এবং কোনো প্রকার গাল মন্দ করেন নি।
টিকাঃ
১০৫. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল মাসাজিদ, হাদীস নং ৫৩৭।
📄 ছয়. তোফাইল ইবন আমর আদ-দাউসির সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবহার
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোফাইল ইবন আমর আদদাউসীর সাথে হিকমত পূর্ণ আচরণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের পূর্বে মক্কায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করে। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি তার স্ব-জাতীর নিকট ফিরে যান এবং তাদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দেন। প্রথমে তিনি তার পরিবারের লোকদের দাওয়াত দিলে তার পিতা ও স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর তিনি তার গোত্রের লোকদের ইসলামের দাওয়াত দিলে তারা তার দাওয়াতে সাড়া দেয় নি এবং তাঁর দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে। তোফাইল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে অভিযোগ করল, আমর দাউস সম্প্রদায়ের লোকেরা ধ্বংস, তারা কাফির, নাফরমান ও অস্বীকারকারী। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,
جاء الطفيل بن عمرو الدوسي إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال: إن دوساً قد عصت وأبت، فادع الله عليهم، فاستقبل رسول الله القبلة ورفع يديه، فقال الناس: هلكوا. فقال: اللهم اهد دوساً وانت بهم، اللهم اهد دوساً وانت بهم».
"তোফাইল ইবন আমর আদ-দাউসি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বলে, নিশ্চয় দাউস সম্প্রদায়ের লোকেরা নাফরমান ও অস্বীকারকারী। আপনি তাদের জন্য বদ-দো'আ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবলামুখী হয়ে দু হাত তোলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থা দেখে লোকেরা মন্তব্য করল যে দাউস সম্প্রদায়ের ধ্বংস অনিবার্য। কিন্তু না, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আল্লাহ! তুমি দাউস সম্প্রদায়কে হেদায়েত দাও এবং তাদের তুমি ইসলামের নিয়ে আস। হে আল্লাহ! তুমি দাউস সম্প্রদায়কে হিদায়াত দাও এবং তাদের তুমি ইসলামের ছায়া তলে নিয়ে আস"।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ দো'আ প্রমাণ করে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করাতে কতটা সহনশীল ও ধৈর্যশীল ছিলেন। কারণ, তিনি তাদের জন্য 'আযাব চান নি এবং যারা দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করছে তাদের জন্য বদ-দো'আও করেন নি, তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য হিদায়াতের দো'আ করেন, আল্লাহ তা'আলা তা দো'আ কবুল করেন। তার ধৈর্য, সহনশীলতা ও আযাবের জন্য তাড়াহুড়া না করার সুফল তিনি পরবর্তীতে দেখতে পান। তোফাইল তার সম্প্রদায়ের লোকদের নিকট গিয়ে আবারো যখন তাদের সাথে নম্রতা প্রদর্শন করে তার হাতে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে খাইবরে দেখা করে। তখন দাউসের ঊননব্বইটি পরিবার ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় প্রবেশ করে। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মদিনায় প্রবেশ করলে রাসূল মুসলিমদের সাথে তাদের জন্য মালে গণিমতের অংশ বণ্টন করেন।
আল্লাহু আকবর! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিকমত কতনা মহান! তার কারণেই ঊননব্বইটি পরিবার ইসলাম গ্রহণ করে।
একটি কথা মনে রাখতে যারা আল্লাহর দিকের দা'ঈ তাদের কর্তব্য হলো দাওয়াতে ধৈর্যধারণ ও সহনশীল হওয়া। আর তা কেবল আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ ও দাওয়াতী ময়দানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ কি তা জানার মাধ্যমেই সম্ভব।
টিকাঃ
১০৬. সহীহ বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ২৯৩৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫২৪; আহমদ, হাদীস নং ৪৪৮।
📄 সাত. একজন যুবক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ব্যভিচার করার অনুমতি চাইলে, তার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ
আবি উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
إن فتى شاباً أتى النبي صلى الله عليه وسلم فقال: يا رسول الله، ائذن لي بالزنا، فأقبل القوم عليه فزجروه، وقالوا له مه مه فقال له: ادنه، فدنا منه قريباً، قال: أتحبه لأمك؟ قال: لا والله، جعلني الله فداءك، قال: [ولا الناس يحبونه لأمهاتهم. قال: [أفتحبه لا بنتك؟ قال: لا والله يا رسول الله، جعلني الله فداءك. قال: [ولا الناس يحبونه لبناتهم]. قال: [أفتحبه لأختك؟]. قال: لا والله جعلني الله فداءك। قال: [ولا الناس يحبونه لأخواتهم]। قال: [أفتحبه لعمتك؟]. قال: لا والله، جعلني الله فداءك। قال: ولا الناس يحبونه لعماتهم। قال: [أفتحبه لخالتك؟]. قال: لا والله جعلني الله فداءك। قال: ولا الناس يحبونه لخالاتهم। قال: فوضع يده عليه، وقال: [اللهم اغفر ذنبه، وطهر قلبه، وحصن فرجه، فلم يكن بعد ذلك الفتى يلتفت إلى شيء»
"একজন যুবক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তুমি আমাকে যিনা করার অনুমতি দাও। তার কথা শুনে সবাই তাকে ধমক দিতে শুরু করে এবং তাকে থাম থাম! বলতে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলল, তুমি কাছে আস! যখন কাছে আসল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলল, তুমি তোমার মায়ের সাথে জিনা করতে পছন্দ কর? সে বলল, না আল্লাহর শপথ করে বলছি। আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমার জন্য কুরবান করুক। কোনো মানুষই তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করতে পছন্দ করে না। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলল, তুমি তোমার মেয়ের সাথে জিনা করতে পছন্দ কর? সে বলল, না আল্লাহর শপথ করে বলছি। আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমার জন্য কুরবান করুক। কোনো মানুষই তার মেয়ের সাথে ব্যভিচার করতে পছন্দ করে না। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলল, তুমি তোমার ফুফুর সাথে জিনা করতে পছন্দ কর? সে বলল, না আল্লাহর শপথ করে বলছি। আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমার জন্য কুরবান করুক! কোনো মানুষই তার ফুফুর সাথে ব্যভিচার করতে পছন্দ করে না। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম তাকে বলল, তুমি তোমার খালার সাথে জিনা করতে পছন্দ কর? সে বলল, না আল্লাহর শপথ করে বলছি। আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমার জন্য কুরবান করুক। কোনো মানুষই তার খালার সাথে ব্যভিচার করতে পছন্দ করে না। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত তার ওপর রাখে এবং বলে, হে আল্লাহ! তুমি তার গুণাহ মাপ কর, তার অন্তর পরিষ্কার কর এবং লজ্জা স্থানের হিফাযত কর। তারপর থেকে যুবকটি কখনোই এদিক সেদিক তাকায় নি"।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, যারা আল্লাহর দিকে মানুষদের দাওয়াত দেয় তাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ আদর্শে রয়েছে উত্তম চরিত্র। তাদের উচিত তারা যেন মানুষের সাথে বিনম্র আচরণ করে তাদের প্রতি দয়ার্দ্র থাকে। বিশেষ করে ইসলামে প্রবেশের জন্য যাদের অনুকূলতার প্রয়োজন হয় অথবা যাদের ঈমানের মজবুতি ও ইসলামের ওপর অবিচলতা একান্ত কাম্য হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে মানুষের সাথে বাস্তবিক উত্তম নম্র ও ভদ্র ব্যবহার করতেন অনুরূপভাবে তিনি আমাদেরকে সব সময় উত্তম নম্র ও ভদ্র ব্যবহারের জন্য আদেশ দেন। এ বিষয়ে কয়েকটি হাদীস নিম্নে উল্লেখ করা হলো;
এক. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«دخل رهط من اليهود على رسول الله صلى الله عليه وسلم فقالوا: السام عليكم. قالت عائشة: فهمتها فقلت: وعليكم السام واللعنة. قالت: فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: [مهلاً يا عائشة إن الله يحب الرفق في الأمر كله] فقلت: يا رسول الله أولم تسمع ما قالوا؟ قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: [قد قلت: وعليكم».
"ইয়াহুদীদের একটি জামা'আত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রবেশ করে বলে, আসসারামু আলাইকুম, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি তাদের কথা বুঝতে পেরে বলি এবং তোমাদের ওপর সাম ও অভিশাপ। তিনি বলেন, তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে আয়েশা তুমি থাম! আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি ক্ষেত্রে নম্রতাকে পছন্দ করে। আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! তারা কি বলছে আপনি শোনে নি? তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি-তো ওয়াআলাইকুম বলছ"।
তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
يا عائشة إن الله رفيق يحب الرفق، ويعطي على الرفق ما لا يعطي على العنف، وما لا يعطي على ما سواه
“হে আয়েশা! আল্লাহ তা'আলা রফীক, তিনি প্রতিটি কাজে নম্রতাকে পছন্দ করেন। নমনীয়তার ওপর তিনি যা দেন কঠোরতার ওপর তিনি তা দেন না এবং তা ছাড়া অন্য কিছুর ওপর তিনি তা দেন না”।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
إن الرفق لا يكون في شيء إلا زانه، ولا ينزع من شيء إلا شانه.
"যে কোনো জিনিসের মধ্যে নমনীয়তা তার সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করে আর যে কোনো কাজে নমনীয়তা থাকবে না, তা তাকে ত্রুটিযুক্ত করবে"।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেন,
أن من حرم الرفق فقد حرم الخير
যে ব্যক্তি নম্রতা হতে বঞ্চিত, সে যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
من يحرم الرفق يحرم الخير
যে ব্যক্তি নম্রতা হতে বঞ্চিত, সে অবশ্যই যাবতীয় কল্যাণ হতে বঞ্চিত।
আবু দারদা থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
من أعطي حظه من الرفق فقد أعطي حظه من الخير، ومن حرم حظه من الرفق فقد حرم حظه من الخير
যাকে নম্রতা হতে কিছু অংশ দেওয়া হয়েছে, তাকে কল্যাণ হতে একটি অংশ দেওয়া হয়েছে। আর যাকে নম্রতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তাকে যাবতীয় কল্যাণের থেকে আংশিক বঞ্চিত করা হয়েছে।
তার থেকে আরও বর্ণিত তিনি বলেন,
«من أعطي حظه من الرفق أعطي حظه من الخير، وليس شيء أثقل في الميزان من الخلق الحسن»
“যাকে নম্রতা হতে কিছু অংশ দেওয়া হয়েছে, তাকে কল্যাণ থেকে একটি অংশ দেওয়া হয়েছে। উত্তম চরিত্র থেকে আর কোনো কিছুই কিয়ামতের দিন পাল্লায় ত্রো বেশি ভারি হবে না”।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إنه من أعطي حظه من الرفق فقد أعطي حظه من خير الدنيا والآخرة، وصلة الرحم، وحسن الخلق، وحسن الجوار يعمران الديار ويزيدان في الأعمار»
“যাকে রিফক থেকে কিছু অংশ দেওয়া হয়ে থাকে, তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় কল্যাণ থেকে একটি অংশ দেওয়া হয়ে থাকে। আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক, উত্তম চরিত্র, প্রতিবেশীদের সাথে সু-ব্যবহার ইহকালকে সুন্দর করে এবং বয়সকে বাড়িয়ে দেয়”।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাবতীয় সমস্ত কাজে নম্রতাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা, কাজ ও বর্ণনার দ্বারা এর গুরুত্ব পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরেন, যাতে তার উম্মতগণ তাদের যাবতীয় কাজে নমনীয়তা প্রদর্শন করেন।
বিশেষ করে যারা আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করেন, তাদের জন্য মানুষের সাথে দাওয়াতী ময়দানে, যাবতীয় লেনদেন ও কর্মে নমনীয়তা প্রদর্শন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উল্লিখিত হাদীসগুলো নম্রতার ফযীলত বর্ণনা করে এবং নম্রতার গুণে গুণান্বিত হওয়ার প্রতি উৎসাহ দেয়। এ ছাড়াও হাদীসে উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হওয়ার প্রতি বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হয়। কঠোরতা ও যারা কঠোরতা করে তাদের দুর্নাম করা হয়ে এবং খারাপ চরিত্র হতে দূরে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
মনে রাখতে হবে, নম্রতা যাবতীয় কল্যাণ লাভের কারণ। নম্রতা দ্বারা মানুষ তার অভীষ্ট লক্ষে পৌছতে পারে এবং তার উদ্দেশ্য হাসিল করা সম্ভব হয়। আল্লাহ তা'আলা নম্রতার ওপর এত বেশি সাওয়াব দান করেন, যা অন্য কোনো নেক আমল বা নম্রতার বিপরীত কঠোরতা দ্বারা লাভ করা সম্ভব হয় না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতের ওপর কঠোরতা করতে নিষেধ করেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার ঘরে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন,
«اللهم من ولي من أمر أمتي شيئاً فشق عليهم، فاشقق عليه، ومن ولي من أمر أمتي شيئاً فرفق بهم فارفق به»
“হে আল্লাহ যদি কোনো ব্যক্তি আমার উম্মতের দায়িত্বশীল হয়, তারপর তাদের ওপর কঠোরতা করে, তুমিও তার ওপর কঠোরতা করবে। আর যে ব্যক্তি আমার উম্মতের ওপর দায়িত্বশীল হওয়ার পর তাদের নম্রতা দেখায়। হে আল্লাহ তাদের সাথে তুমি নমনীয় আচরণ কর”।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো সাহাবীকে কোনো কাজে বাহিরে পাঠান, তাদের তিনি সহজ করতে নির্দেশ দেন এবং তাদের তিনি কঠোরতা করতে না করেন।
আবু মুসা আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«كان رسول الله صلى الله عليه وسلم: إذا بعث أحداً من أصحابه في بعض أموره قال: «بشروا ولا تنفروا، ويسروا ولا تعسروا»
"রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো ব্যক্তিকে কোনো বিষয়ে কোথাও পাঠাতেন তখন তাদের তিনি বলতেন, তোমরা তাদের সু-সংবাদ দাও, তাদের তোমরা দূরে সরাবে না। তোমরা তাদের জন্য সহজ করে দাও তাদের ওপর কঠোরতা করো না"।
وَقَالَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لأَبِي مُوسَى الأَشْعَرِي وَمُعَاذِ حِينَمَا بَعَثَهُمَا إِلَى الْيَمَن: «يَسِّرَا وَلَا تُعَسِّرَا، وَبَشِّرَا وَلَا تُنَفِّرَا، وَتَطَاوَعَا وَلَا تَخْتَلِفَا
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু মুসা আশয়ারী রাদিয়াল্লাহু আনহু ও মুয়ায ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন ইয়ামনের দিকে পাঠান তখন তিনি বলেন, তোমরা উভয় সহজ কর কঠিন কর, তোমরা সু-সংবাদ দাও দূরে সরাবে না। তোমরা একমত থাকবে মতবিরোধ করবে না"।
আনাস ইবন মালেক থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
وَعَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا
“তোমরা সহজ কর কঠিন করো না তোমরা তাদের সুসংবাদ দাও তাদের দূরে সরাবে না"।
উল্লিখিত হাদীসসমূহে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা উম্মতদের সহজ করতে নির্দেশ এবং এমন কোনো নির্দেশ দিতে না করেন, যা তাদেরকে তোমাদের থেকে দূরে সরাবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লিখিত হাদীসগুলোতে দু'টি বিষয় নরম তার বিপরীতে গরম উভয়টি একত্র করে আলোচনা করেন। কারণ একজন মানুষ এক সময় নরম দেখাবে আবার অন্য সময় গরম দেখাবে। কখনো সময় সুসংবাদ দেবে আর কখনো সময় ভয় দেখাবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয় দিকটিকে একত্র করেন। কারণ, তিনি যদি শুধু তোমরা কঠোরতা করো না এ কথা বলতেন অথবা তোমরা সুসংবাদ দাও শুধু এ কথা বলতেন তাহলে মানুষ তার বিপরীত কাজ করা হতে একদম বিরত থাকত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সব হাদীসে আল্লাহ তা'আলার অশেষ রহমত, মহান সাওয়াব, তার নি'আমত ও ব্যাপক রহমতের প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন। অপর দিকে তিনি ভয় দেখানোর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার আযাব হতে মানুষকে সতর্ক করেন। এখানে যারা নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা হয়ে থাকে। কারণ, তাদের প্রতি কোনো প্রকার কঠোরতা করা হয় নি। এতে এ কথা স্পষ্ট হয় আরও যে সব বাচ্চারা নিকটে বালেগ হয়েছে বা কোনো গুনাহগার নতুন তাওবা করেছে তাদের সাথে নমনীয় দেখানো ভালো। তাদের সাথে কোনো প্রকার কঠোরতা দেখানো উচিৎ নয়। ইসলামের কোনো বিধানই এ সাথে নাযিল হয়ে যায়নি বরং সব বিধানই আস্তে আস্তে নাযিল হয়েছে যাতে উম্মতের ওপর কঠিন না হয়, বরং উম্মতের জন্য সহজ হয়।
কারণ, একজন ব্যক্তি যখন দেখতে পাবে ইসলাম পালন করা সহজ, তখন সে ইসলামে প্রবেশে আগ্রহী হবে। আর যখন দেখতে পাবে ইসলাম পালন করা এতটা সহজ নয় তখন সে ইসলামে প্রবেশ হতে দূরে থাকবে। সুতরাং মনে রাখতে হবে যে কোনো তা'লীম তরবিয়ত ধীরে ধীরে হওয়া চাই। এক সাথে সব কিছু তালিম দেওয়া যায় না। এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের তা'লীমের ব্যাপারে মাঝে মাঝে বিরতি দিতেন যাতে তারা বিরক্ত না হয়ে যায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে সব ভালো কাজের দিকে পথ দেখান আর তাদেরকে সব ধরণের মন্দ ও খারাব কাজ থেকে ভয় দেখান ও সতর্ক করেন। আর যারা তার উম্মতের ওপর কঠোরতা করে তাদের জন্য তিনি অভিশাপ করেন। আর যারা তার উম্মতের জন্য সহজ করেন এবং নম্রতা প্রদর্শন করেন তাদের জন্য তিনি দো'আ করেন। যেমনটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার হাদীসে অতিবাহিত হয়েছে। এ ছিল যারা উম্মতের ওপর কঠোরতা আরোপ করে তাদের জন্য কঠিন হুমকি আর যারা উম্মতের জন্য সহজ করে তাদের জন্য চূড়ান্ত উৎসাহ।
টিকাঃ
১০৭. আহমদ তার মুসনাদে ২৫৭/২।
১০৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬০২৪।
১০৯. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৯৩।
১১০. পূর্বের রেফারেন্স ২৫৯৪।
১১১. পূর্বের রেফারেন্স ২৫৯২।
১১২. তিরমিযী, হাদীস নং ২০১৩।
১১৩. মুসানাদে আহমদ ৪৫১/৬।
১১৪. মুসনাদে আহমদ ১৫৯/৬।
১১৫. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৮২৮।
১১৬. সহীহ মুসলিম কিতাবুল জিহাদ ১৩৫৮/৩, ১৭৩২।
১১৭. সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, হাদীস নং ৪৩৫৪, ৭৪৩৪৪; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৭৩৩।
১১৮. সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইলম, হাদীস নং ৬৯; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৭৩২।
১১৯. দেখুন: ফতহুল বারী ১৬৩, ১৬২/১।
১২০. দেখুন: শরহে নববী ২১৩/২।