📘 আল্লাহর দিকে রাসুল সাঃ এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা > 📄 এক. ইয়ামামার অধিবাসীদের সরদার ছুমামা ইবন আসাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ

📄 এক. ইয়ামামার অধিবাসীদের সরদার ছুমামা ইবন আসাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ


সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

بعث رسول الله صلى الله عليه وسلم خيلاً قبل نجد، فجاءت برجل من بني حنيفة، يقال له ثمامة بن أثال، سيد أهل اليمامة، فربطوه بسارية من سواري المسجد، فخرج إليه رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال: [ماذا عندك يا ثمامة؟ فقال: عندي يا محمد خير، إن تقتل تقتل ذا دم ، وإن تنعم تنعم على شاكر، وإن كنت تريد المال فسل تعط منه ما شئت، فتركه رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى كان بعد الغد، فقال: ما عندك يا ثمامة؟ فقال: ما قلت لك، إن تنعم تنعم على شاكر، وإن تقتل تقتل ذا دم، وإن كنت تريد المال فسل تعط منه ما شئت، فتركه رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى كان من الغد، فقال: ماذا عندك يا ثمامة؟ فقال: عندي ما قلت لك، إن تنعم تنعم على شاكر، وإن تقتل تقتل ذا دم، وإن كنت تريد المال فسل تعط منه ما شئت، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: أطلقوا ثمامة]، فانطلق إلى نخل قريب من المسجد، فاغتسل، ثم دخل المسجد فقال: أشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أن محمداً عبده ورسوله، يا محمد! والله ما كان على الأرض وجه أبغض إلي من وجهك، فقد أصبح وجهك أحب الوجوه كلها إلي، والله ما كان من دين أبغض إلي من دينك، فأصبح دينك أحب الدين كله إلي، والله ما كان من بلد أبغض إلي من بلدك، فأصبح بلدك أحب البلاد كلها إلي، وإن خيلك أخذتني وأنا أريد العمرة فماذا ترى؟ فبشره رسول الله صلى الله عليه وسلم، وأمره أن يعتمر، فلما قدم مكة قال له قائل: أصبوت؟ فقال: [لا والله]، ولكني أسلمت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم، ولا والله لا يأتيكم من اليمامة حبة حنطة حتى يأذن فيها رسول الله صلى الله عليه وسلم».

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নজদের দিকে একটি জামাত পাঠালে তারা ইয়ামামার অধিবাসীদের সরদার ছুমামা ইবন আছাল নামে এক ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে আসে এবং মসজিদের খুঁটির সাথে বেধে রাখে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করল, হে ছুমামা তোমার কি বলার আছে?। তখন সে বলল, হে মুহাম্মাদ! আমার নিকট কল্যাণ রয়েছে। যদি তুমি হত্যা কর, তাহলে এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করবে, যে হত্যাযোগ্য। আর যদি পুরস্কৃত কর, তাহলে এমন এক ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করবে, যে তোমার পুরস্কারের প্রতিদান দেবে। আর যদি তুমি সম্পদ চাও তাহলে বল, তোমাকে তা দেওয়া হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথার কোনো প্রতি উত্তর না করে আগামী দিন পর্যন্ত তাকে সুযোগ দেন। পরের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, হে ছুমামা তোমার কি বলার আছে? তখন সে বলল, আমি তোমাকে যা বলছি! যদি তুমি হত্যা কর, তাহলে এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করবে, যে হত্যাযোগ্য। আর যদি পুরস্কৃত কর, তাহলে এমন এক ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করবে, যে তোমার পুরস্কারের প্রতিদান দেবে। আর যদি তুমি সম্পদ চাও তাহলে বল, তোমাকে তা দেওয়া হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথার কোনো প্রতি উত্তর না করে আবারো তাকে পরের দিন পর্যন্ত সুযোগ দেন। পরের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, হে ছুমামা তোমার কি বলার আছে?। সে বলল, আমি যা বলছি! যদি তুমি হত্যা কর, তাহলে এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করবে, যে হত্যাযোগ্য। আর যদি পুরস্কৃত কর, তাহলে এমন এক ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করবে, যে তোমার পুরস্কারের প্রতিদান দেবে। আর যদি তুমি সম্পদ চাও তাহলে বল, তোমাকে তা দেওয়া হবে।

তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা ছুমামাকে ছেড়ে দাও। ছুমামাকে ছেড়ে দিলে সে মসজিদের নিকটে একটি বাগানে গিয়ে গোসল করে, তারপর মসজিদে প্রবেশ করে এবং বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্যিকার ইলাহ নেই, আর আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল। হে মুহাম্মাদ! আমার নিকট তোমার চেহারার চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো চেহারা যমীনে ছিল না, আর এখন আমার নিকট তোমার চেহারা সমগ্র চেহারার চেয়ে প্রিয় চেহারায় পরিণত হয়েছে। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমার দীনের চেয়ে ঘৃণিত আর কোনো দীন ছিল না। আর এখন আমার নিকট তোমার দীন সবচেয়ে বেশি প্রিয় দীনে পরিণত হয়েছে। আল্লাহর শপথ করে বলছি! আমার নিকট তোমার শহর ছিল সবচেয়ে ঘৃণিত, আর এখন আমার তোমার এ শহর সবচেয়ে প্রিয় শহরে পরিণত হয়েছে। আর তোমার জামাত আমাকে পাকড়াও করে নিয়ে এসেছে, আমি ওমরা করতে চাই তুমি আমাকে কি পরামর্শ দাও। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সু-সংবাদ দেন এবং ওমরা করার আদেশ দেন। সে যখন মক্কায় গমন করে, একজন তাকে বলল, তুমি দীনছুট হলে? সে বলল, না আল্লাহর শপথ আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আর আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, ইয়ামামার একটি গমের বীজও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতি ছাড়া এদিক সেদিক করা হবে না"।

তারপর সে ইয়ামামার দিকে চলে যায় এবং সেখান থেকে তিনি মক্কার দিকে কোনো কিছু বহন করতে নিষেধ করেন। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট চিঠি লিখেন তুমি আমাদের আত্মীয়তা সম্পর্ক ঠিক রাখার নির্দেশ দাও, অথচ তুমি নিজে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক বিচ্ছেদ কর। তুমি আমাদের বাপ-দাদাদের তলোয়ার দ্বারা হত্যা করছ! আর আমাদের ছেলে সন্তানদের ক্ষুধা দিয়ে হত্যা করছ! এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুমামার নিকট লিখেন যে, সে যেন তাদের আপন অবস্থায় ছেড়ে দেয়।” আল্লামা ইবন হাজার রহ, উল্লেখ করেন যে, ইবন মান্দাহ স্বীয় সনদে ছুমামাহ ইবনুল আসালের ইসলাম গ্রহণ, তারপর ইয়ামামার দিকে ফিরে যাওয়া, কুরাইশদের প্রতিহত করা ইত্যাদি দীর্ঘ ঘটনা ও আল্লাহ তা'আলার বাণী

﴿وَلَقَدْ أَخَذْنَاهُم بِالْعَذَابِ فَمَا اسْتَكَانُوا لِرَبِّهِمْ وَمَا يَتَضَرَّعُونَ﴾ [المؤمنون: 76]

"আর অবশ্যই আমরা তাদেরকে আযাব দ্বারা পাকড়াও করলাম, তবুও তারা তাদের রবের কাছে নত হয় নি এবং বিনীত প্রার্থনাও করে না"। [সুরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ৭৬] নাযিল হওয়ার ঘটনা আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, আহলে ইয়ামামাহ যখন মুরতাদ হয়ে যায় তখন ছুমামা মুরতাদ হয় নি। সে ইসলামের ওপর অটল অবিচল থাকে। তিনি তার অনুসারীদের নিয়ে 'আলা ইবন হাযরামীর দলভুক্ত হন এবং তাদের সাথে একত্র হয়ে বাহরাইনের অধিবাসীদের যারা মুরতাদ হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং তাদের হত্যা করেন।

আল্লাহু আকবর! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিকমত কতই না মহান ছিল! এবং তিনি কতই না মহত্বের অধিকারী ছিলেন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যবহার ও আখলাক দ্বারা মানুষের অন্তরকে আকৃষ্ট করত। যাদের থেকে ইসলামের আশা করত, তাদের সাথে বিনম্র ব্যবহার করত। বিশেষ করে যারা কোনো গোত্রের সরদার, যাদের আওতায় অনেক লোক রয়েছে, তাদের ইসলাম গ্রহণ করার দ্বারা আরও অনেক লোক ইসলাম কবুল করবে, তাদের সাথে তিনি অত্যন্ত সর্তকতার সাথে কাজ চালিয়ে যেতেন।

একজন দা'ঈর জন্য উচিৎ হলো, সে অপরাধীর ক্ষমা করার বিষয়টি প্রতিশোধ নেওয়া হতে বড় করে দেখবে। কারণ, এখানে আমরা দেখতে পাই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তার দিকে দয়া ও ক্ষমার হাত প্রসার করল, মুহূর্তের মধ্যে ছুমামা যে জিনিষটিকে ঘৃণা করত, তা তার নিকট সর্বাধিক প্রিয় বস্তুতে পরিণত হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষমা ছুমামার জীবনে অসাধারণ পরিবর্তন আনল। তিনি শুধু ইসলামই গ্রহণ করেন নি, তবে তিনি নিজে ইসলামের ওপর আমরণ অটল অবিচল রইলেন এবং ইসলামের একজন দা'ঈতে পরিণত হলেন।

টিকাঃ
৯১. সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, হাদীস নং ৪৩৭২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭৬৪।
৯২. সীরাতে ইবন হিশাম ৩১৭/৪; ফাতহুল বারী ৮৮/৮।
৯৩. দেখুন: আল-ইসাবাহ ২০৩/১।
৯৪. ফাতহুল বারী ৮৮/৮; শরহে নববী লিল মুসলিম, ৮৯/১২।

📘 আল্লাহর দিকে রাসুল সাঃ এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা > 📄 দুই. যে বেদুঈন লোকটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে চাইছিল, তার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ

📄 দুই. যে বেদুঈন লোকটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে চাইছিল, তার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ


জাবের ইবন আব্দুল্লাহ থেকে ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. বর্ণনা করেন,

«غزونا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم قبل نجد، فأدركنا رسول الله صلى الله عليه وسلم في واد كثير العضاء، فنزل رسول الله صلى الله عليه وسلم تحت شجرة، فعلق سيفه بغصن من أغصانها، قال: وتفرق الناس في الوادي يستظلون بالشجر، قال: فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: [إن رجلاً أتاني وأنا نائم، فأخذ السيف فاستيقظت وهو قائم على رأسي، فلم أشعر إلا والسيف صلتاً في يده، فقال لي، من يمنعك مني؟ قال: قلت: الله، ثم قال في الثانية: من يمنعك مني؟ قال: قلت: الله، قال: فشام السيف، فهاهو ذا جالس]، ثم لم يعرض له رسول الله صلى الله عليه وسلم»

"আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজদের দিকে যুদ্ধ করতে গেলে, রাসূল আমাদের বাগান বিশিষ্ট একটি উপত্যকার সন্ধান করে দেন। সেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি গাছের নিচে অবতরণ করেন এবং তার তলোয়ারটি গাছের একটি ডালের সাথে ঝুলিয়ে রাখেন। সবাই বিভিন্ন গাছের তলে ছায়া নিতে গিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল বর্ণনা দেন যে, এক লোক আমাকে ঘুমের মধ্যে আমার নিকট এসে আমার তলোয়ারটি হাতে নেয়। আমি সাথে সাথে ঘুম থেকে জেগে দেখি লোকটি আমার মাথার উপর দাঁড়ানো। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না! শুধু দেখতে পেলাম যে, আমার তলোয়ারটি তার হাতে ঝুলছে। তারপর সে আমাকে বলে, তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে? তিনি বলেন, আমি বললাম, আমাকে আল্লাহ বাঁচাবে। লোকটি দ্বিতীয়বার বলল, তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? তিনি বলেন, আমি বললাম আল্লাহ!। তারপর তলোয়ারটি তার হাত থেকে পড়ে গেল। আর লোকটি বসা অবস্থায় রয়ে গেল। (লোকটির হাত থেকে তলোয়ারটি পড়ে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইচ্ছা করলে তলোয়ারটি তুলে নিয়ে তাকে হত্যা করতে পারত। কিন্তু তিনি করেন নি) তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কিছুই বললেন না"।

আল্লাহু আকবর! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আখলাক কতই না মহান ও উন্নত। তার অন্তর কত বড় ও প্রশস্থ। একজন লোক তাকে হত্যা করতে চেষ্টা করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে তার হাত থেকে রক্ষা করার পর, যখন উল্টো আবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে ক্ষমতা দেন; ইচ্ছা করলে তিনি তাকে হত্যা করতে পারেন। কিন্তু না, তিনি তাকে হত্যা না করে তাকে ক্ষমা করে দেন! একেই বলা হয়, খুলুকে আযীম বা মহান চরিত্র। আল্লাহ তা'আলা এ বিষয়ে কুরআনে করীমে বলেন,

وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ ﴾ [القلم: 4]

“আর নিশ্চয় তুমি মহান চরিত্রের অধিকারী”। [সূরা আল-ক্বলম, আয়াত: ৪]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ চরিত্রের প্রভাব লোকটির জীবনে বিপ্লবী পরিবর্তন আনে। লোকটি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে ইসলামের একজন দা'ঈ হয়ে যায় এবং তার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ হিদায়াতপ্রাপ্ত হয় এবং ইসলামের সুশীতল ছায়া তলে আশ্রয় নেয়।

টিকাঃ
৯৫. সহীহ বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হদীস নং ২৯১০; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল, হদীস নং ৮৪৩; আহমদ ৩১১/৩; আহমদ ৩৬৪/৩, ৩১১/৩।
৯৬. দেখুন: ফাতহুল বারী ৪২৮/৭ শরহে নববী ৪৪/১৫ এখানে ইমাম নববী ও আল্লামা ইবন হাজার রহ. উল্লেখ করেন যে, লোকটির না গাওরাস ইবনুল হারেস। এমনকি ইমাম বুখারী তার সহীহ'তে লোকটির একই নাম উল্লেখ করেন। হাদীস নং ৪১৩৬।
৯৭. দেখুন: হাযাল হাবীবু ইয়া মুহিব্ব ৫২৮; হিদায়াতুল মুরশিদীন ৩৮৪।

📘 আল্লাহর দিকে রাসুল সাঃ এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা > 📄 তিন. ইয়াহূদীদের একজন বড় জ্ঞানী যায়েদ ইবন সায়ানার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ

📄 তিন. ইয়াহূদীদের একজন বড় জ্ঞানী যায়েদ ইবন সায়ানার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাব হলো, প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকলে তিনি প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করে দিতেন, ক্রোধের সময় তিনি ধৈর্যশীল ও সহনশীল থাকতেন। কেউ অপরাধ করলে তার প্রতি ভালো ব্যবহার করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতে সাড়া দেওয়া, তার রিসালাতে প্রতি ঈমান আনা এবং তার নেতৃত্বে একত্র হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান ও উন্নত চরিত্র। ইয়াহুদীদের বড় আলেম এবং একজন বিশিষ্ট পাদ্রী যায়েদ ইবন সায়ানার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণের একটি ঘটনা:

"জা'আ যাইদ বিন সা'নাহ ইলা রসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইয়াতলুবুহু দায়নান লাহু, ফাআখাজা বিজামিয়ি কামীসিহি ওয়ারিদায়িহি ওয়াজাযাবাহু ওয়া আগলাজা লাহুল ক্বাওলা ওয়া নাযারা ইলাইন নাবিয়্যা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা বিওয়াজহিন গালীযিন ওয়া ক্বালা ইয়া মুহাম্মাদু আলা তাকদিনি হাক্কি, ইন্নাকুম ইয়া বানী আবদিল মুত্তালিব ক্বাওমুন মুমতালিন ওয়া সাদ্দাদা লাহু ফিল ক্বাওলি ফানাযারা ইলাইহি উমারু ওয়া আইনাইহি তাদুরনা ফী রা'সিহি কালফালাকি আল মুস্তাদিরি, ছুম্মা ক্বালা ইয়া আদুওয়াল্লাহি আতাক্বুলু লিরাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা মা আসমাউ ওয়া তাফ'আলু মা আরা, ফাওয়াল্লাযি বায়াসাহু বিল হাক্কি লাওলা মা আহাযিরু লাওমাহু লাদারাবতু বিসাইফী রা'সাক, ওয়া রসূলুল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইয়ানজুরু ইলা উমারা ফী সুকুনিন ওয়া তুওদাতিন ওয়া তাবাসসুমিন ছুম্মা ক্বালা: আনা ওয়া হুয়া ইয়া উমারু কুন্না আহওয়াজু ইলা গাইরি হাজা মিনকা ইয়া উমারু আন তা'মুরানি বিহুসনিল আদা, ওয়া তা'মুরাহু বিতাহসুনিল মুক্বাদ্বী ইযহাব বিহী ইয়া উমারু ফাক্বদিহি হাক্কাহু ওয়া জিদহু ইসরিনা সা'আন মিন তিমরিন ফাকান হাজা সাআবান লিইসলামিহি ফাক্বালা আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রসূলুহু."

“যায়েদ ইবন সায়ানা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ঋণ বাবদ তার পাওনা চাইতে আসে। সে এসেই তার জামার কলার ও চাদরের একত্রস্থান টেনে ধরে এবং অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলে। তারপর সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে বলে, হে মুহাম্মাদ! তুমি কি আমার পাওনা আদায় করবে না? তোমরা বনী মুত্তালিবরা অবশ্যই টাল-বাহানাকারী সম্প্রদায়! সে এ ছাড়াও আরও কঠিন কথা বলে। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তার দিক তাকিয়ে দেখল, তার দুই চোখ মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। তারপর সে বলল, হে আল্লাহর দুশমন! তুমি আমার চোখের সামনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এসব কথা বলছ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এ ধরণের ব্যবহার করছ! আমি ঐ আল্লাহর শপথ করে বলছি! যিনি তাকে সত্যের পয়গাম নিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, যদি আমি তার ভৎসনাকে ভয় না করতাম, তবে আমি আমার তলোয়ার দিয়ে তোমার মাথাকে উড়িয়ে দিতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরবে ও মুচকি হেসে ওমরের কথার দিকে লক্ষ্য করেন। তারপর তিনি বলেন, হে উমার বিষয়টি আমার ও তার ব্যাপার।

আমরা তোমার চেয়ে অন্য কিছু আশা করছিলাম। (এ ধরণের আচরণ তোমার থেকে আমরা আশা করি নি) তুমি আমাকে আদেশ করতে পারতে তার পাওনা পরিশোধ করতে, আর তাকে নির্দেশ দিতে পারতে নম্র-ভাবে তার পাওনা আমার নিকট চাইতে। হে উমার! তুমি তাকে নিয়ে যাও, এবং তার পাওনা তাকে দিয়ে দাও। আর (যেহেতু তুমি তার সাথে ভালো ব্যবহার কর নি তার বিনিময়) তাকে তুমি বিশ সা' বেশি দাও। এ ঘটনাটিই ছিল লোকটির ইসলাম গ্রহণের কারণ।

তারপর সে বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।

এ ঘটনার পূর্বে যায়েদ বলত, আমি শেষ নবীর সব আলামতই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারায় দেখতে পাই। কিন্তু দু'টি বিষয় আমার অজানা ছিল, যেগুলো আমাকে জানানো হয় নি। এক. তার ধৈর্য তার জাহালাতের ওপর প্রাধান্য পায়। দুই, অজ্ঞতা যত বাড়তে থাকে তার ধৈর্যও তত বেশি বাড়তে থাকে।

তিনি এ ঘটনার মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরীক্ষা করেন, তারপর সে যেভাবে বর্ণনা করেন সেভাবেই তাকে পান। ফলে ঈমান আনেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং তাবুকের যুদ্ধে শত্রুর মোকাবেলা করতে করতে যখন সামনের দিকে অগ্রসর হন, তখন তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীতে এ ধরণের আরও অসংখ্য প্রমাণাদি রয়েছে, যেগুলো প্রমাণ করে তার নবুওয়াতের সত্যতা ও যথার্থতা ওপর। আর তিনি আল্লাহর দীনের যে দাওয়াত নিয়ে এসেছেন তা হলো, পরম সত্য তার মধ্যে মিথ্যার কোনো অবকাশ নেই。

টিকাঃ
৯৮. আল ইসাবাহ ফি তামীযিয সাহাবাহ ৫৬৬/১।

📘 আল্লাহর দিকে রাসুল সাঃ এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা > 📄 চার. গ্রাম্য লোক যে মসজিদে পেশাব করছিল, তার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ

📄 চার. গ্রাম্য লোক যে মসজিদে পেশাব করছিল, তার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ


আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

بينما نحن في المسجد مع رسول الله صلى الله عليه وسلم إذ جاء أعرابي، فقام يبول في المسجد، فقال أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم: مه مه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لاتزرموه دعوه ، فتركوه حتى بال، ثم إن رسول الله صلى الله عليه وسلم دعاه فقال له : [ إن هذه المساجد لا تصلح لشيء من هذا البول، ولا القذر، إنما هي لذكر الله، والصلاة وقراءة القرآن، أو كما قال رسول الله صلى الله عليه وسلم

"একদা আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে মসজিদে বসা ছিলাম। এ অবস্থায় একজন অপরিচিত লোক এসে মসজিদে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে আরম্ভ করে। তখন রাসূলের সাহাবীগণ তাকে বলল, থাম, থাম। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, তোমরা তাকে বাধা দিও না। তাকে তার আপন অবস্থায় ছেড়ে দাও। তারপর তারা তাকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দিলে সে পেশাব সম্পন্ন করে। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডাকল, এবং বলল, এ হলো, মসজিদ এখানে পেশাব পায়খানা করা চলে না। এতো শুধু আল্লাহর যিকির, সালাত আদায় ও কুরআনের তিলাওয়াতের জন্য বানানো হয়েছে। অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে বলেছেন-

বর্ণনাকারী বলেন, «فأمر رجلاً من القوم فجاء بدلو من ماء فشنه عليه»

"তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লোককে আদেশ দিলে সে একটি বালতি করে পানি নিয়ে আসে এবং তা পেশাবের ওপর ডেলে দেয়”।

وقد ثبت في البخاري وغيره أن هذا الرجل هو الذي قال: اللهم ارحمني ومحمداً ولا ترحم معنا أحداً»

সহীহ বুখারী ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত, এ লোকটিই বলে,

اللهم ارحمني ومحمداً ولا ترحم معنا أحداً

"হে আল্লাহ তুমি আমাকে ও মুহাম্মাদকে দয়া কর আমাদের সাথে কাউকে দয়া করবে না"।

অপর এক বর্ণনায় আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

قام رسول الله صلى الله عليه وسلم وقمنا معه، فقال أعرابي وهو في الصلاة: اللهم ارحمني ومحمداً، ولا ترحم معنا أحداً، فلما سلم النبي صلى الله عليه وسلم قال للأعرابي: لقد حجرت واسعاً يريد رحمة الله».

"রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ালে তার সাথে আমরাও দাঁড়াই। তখন একজন লোক সালাতে বলে, হে আল্লাহ আমাকে এ মুহাম্মাদকে দয়া কর, আমাদের সাথে আর কাউকে দয়া করবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাম ফিরান তখন তিনি গ্রাম্য লোকটিকে বলেন, তুমি আল্লাহর ব্যাপক রহমতকে সংকীর্ণ করে দিলে, অর্থাৎ আল্লাহর রহমত"।

সহীহ বুখারী ছাড়া অন্যান্য হাদীসের কিতাবসমূহে এ ধরণের বর্ণনার ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:

যেমন, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«دخل رجل أعرابي المسجد فصلى ركعتين ثم قال: اللهم ارحمني ومحمداً، ولا ترحم معنا أحداً! فالتفت إليه رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال: لقد تحجرت واسعاً، ثم لم يلبث أن بال في المسجد، فأسرع الناس إليه فقال لهم رسول الله صلى الله عليه وسلم: [ إنما بعثتم ميسرين، ولم تبعثوا معسرين، أهريقوا عليه دلواً من ماء، أو سجلاً من ما»

একজন গ্রাম্য লোক মসজিদে প্রবেশ করে দুই রাকাত সালাত আদায় করে তারপর বলে, হে আল্লাহ তুমি আমাকে এবং মুহাম্মাদকে দয়া কর, আমাদের সাথে আর কাউকে দয়া করো না। এ কথা শোনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকায় এবং বলে তুমি ব্যাপককে সংকীর্ণ করে দিলে। এ কথা বলতে না বলতে লোকটি মসজিদে পেশাব করে দিল। লোকেরা তার দিকে দৌড়ে আসলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, তোমাদের প্রেরণ করা হয়েছে, সহজ করার জন্য কঠিন করার জন্য নয়। তোমরা তার উপর এক বালতি অথবা এক মশক পানি ঢেলে দাও"।

তিনি বলেন, লোকটি ইসলাম গ্রহণ করার পর বলেন,

«فقام النبي صلى الله عليه وسلم إلي بأبي وأمي فلم يسب، ولم يؤنب، ولم يضرب».

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে অগ্রসর হলো, তার ওপর আমার মাতা পিতা কুরবান হোক, সে আমাকে একটু ঘালি দেয় নি, কোনো প্রকার ধমক দেয় নি এবং আমাকে একটুও মারে নি”।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার সর্বাধিক জ্ঞানী মাখলুক। তার যাবতীয় কার্যক্রম আচার ব্যবহার হিকমত পূর্ণ ও উন্নত। যে ব্যক্তি তার আখলাক, চরিত্র, দয়া, অনুগ্রহ, ধৈর্য, সহনশীলতা ইত্যাদি সম্পর্কে জানবে তার প্রতি তার ঈমান এ বিশ্বাস আরও বৃদ্ধি পাবে।

গ্রাম্য লোকটি এমন কাজই করল, যা শান্তি যোগ্য ও উপস্থিত লোকদের তোপের মুখে পড়ার মতো অপরাধ। কাজটি যে কোনো মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলে। এ কারণেই রাসূলের সাহাবীরা দাড়িয়ে গেল, কাজটিকে অপছন্দ করল এবং তাকে ধমক দিল। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পেশাবে বাধা দিতে না করলেন।

এটি ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নম্রতা, সহনশীলতা ও দয়াদ্রতার সবোর্চচ বহিঃপ্রকাশ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত হিকমতের সাথে গ্রাম্য লোকটির কাজকে পরিবর্তন করে দেন। যখন সে বলে “আল্লাহুম্মার হামনি মুহাম্মাদান, ওয়ালা তারহাম মায়ানা আহাদা হে আল্লাহ আমাকে ও মুহাম্মাদকে দয়া কর আমাদের সাথে আর কাউকে দয়া করো না, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, লাকাদ হাজজারতা ওয়াসিয়া’ তুমি ব্যাপক রহমতকে সংকীর্ণ করে দিলে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য এ কথা দ্বারা আল্লাহর রহমত। কারণ, আল্লাহর রহমত সব কিছুকে সামিল করে নেয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ﴾

“আর আমার রহমত সব বস্তুকে পরিব্যাপ্ত করেছে”। [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬]

আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় আল্লাহর রহমত ব্যাপক তা সবকিছুকেই সামিল করে নেয়। অথচ লোকটি আল্লাহ তা'আলার মাখলুকের ওপর তার রহমতকে সংকীর্ণ করে দেন। এ কারণে আল্লাহ তা'আলা যে ব্যক্তি এর বিপরীত অর্থাৎ ব্যাপক রহমত কামনা করছে, কুরআনে কারীমে তার প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَالَّذِينَ جَاءُو مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ﴾ [الأعراف: ১৫৬]

"যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে: হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন: এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না; হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু"। [সুরা আল-হাশর, আয়াত: ১০]

আয়াতে যে ব্যাপক রহমত কামনা করছে তার প্রসংশা করছে। অপর দিকে এ গ্রাম্য লোকটি আয়াতের খেলাপ দো'আ করে। এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিকমতের সাথে তাকে বুঝিয়ে দেন।

আর যখন লোকটি মসজিদে পেশাব করা আরম্ভ করে দেয়, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেন। যারা তাকে পেশাব করতে বাধা দিতে সামনে অগ্রসর হচ্ছিল তাদের তিনি বারণ করেন। কারণ, সে তো একটি ফ্যাসাদ আরম্ভ করে দিয়েছে, এখান যদি তাকে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে তার ক্ষতি আরও বেড়ে যাবে। মসজিদের কিছু অংশ নাপাক হলোই, এখন যদি তাকে আরও বাধা দেওয়া হয়, আরও দু'টি ক্ষতি হতে পারে।

এক. পেশাব আরম্ভ করার পর তার পেশাব করা বন্ধ করে দেওয়া হলে, তার ক্ষতি হতে পারে। কারণ, পেশাব বের হওয়ার পর বন্ধ করা স্বাস্থ্য সম্মত নয়।

দুই. অথবা যদি তাকে বাধা দেওয়া হয়, তাতে তার শরীরের অন্যান্য অংশ, পরিধেয় কাপড় ও মসজিদ ইত্যাদিতে নাপাক ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ কল্যাণের দিক বিবেচনা করে, তাকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দেন এবং তার থেকে বিরত থাকেন। আর বিশেষ কল্যাণ হলো, বড় দু'টি খারাবী অথবা ক্ষতিকে প্রতিহত করতে তুলনামূলক কম ক্ষতিকে মেনে নেন।

এ ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান হিকমত ও উন্নত বুদ্ধিমত্তা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খারাবীর বিপরীতে কল্যাণকর দিক গুলো বিবেচনায় রাখেন। এ ঘটনার মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মত ও দা'ঈদের জন্য জাহেলদের কোনো প্রকার ধমক, গালি, কষ্ট ও দুর্ব্যবহার ছাড়া কিভাবে দয়া করবে ও তা'লীম দেবে তা নির্ধারণ করে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যবহার- তার প্রতি দয়া করা, বিনম্র আচরণ-এ গ্রাম্য লোকটির জীবনে বিশাল প্রভাব ফেলে। লোকটি ইসলাম গ্রহণ করার পর বলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিক অগ্রসর হন। আমার মাতা-পিতা তার ওপর কুরবান হোক তিনি আমাকে কোনো প্রকার ঘালি দেন নি, আমাকে ধমক দেন নি এবং প্রহার করেন নি। লোকটির জীবনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ চরিত্র বিশাল প্রভাব ফেলে।

টিকাঃ
৯৯. সহীহ মুসলিম, কিতাবুত তাহারাহ ২৮৫; সহীহ বুখারী, কিতাবুল অযু ২১৯।
১০০. সহীহ বুখারী, কিতাবুল আদব, হাদীস নং ৬০১০; তিরমিযী, কিতাবুত তাহারাত, হাদীস নং ১৪৭; আহমদ ২৪৪/২; আবু দাউদ ৩৯/২।
১০১. তিরমিযী, হাদীস নং ১৪৭; আহমদ, হাদীস নং ১০৫৪০।
১০২. ফাতহুল বারী ৪৩৯/১০।
১০৩. ফাতহুল বারী ৩২৫/১।
১০৪. ফাতহুল বারী ৩২৫/১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00