📄 চার. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিকমত ও সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশের আরেকটি নমুনা
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«كان النبي صلى الله عليه وسلم أحسن الناس، وأجود الناس، وأشجع الناس، ولقد فزع أهل المدينة ذات ليلة، فانطلق الناس قبل الصوت، فاستقبلهم النبي صلى الله عليه وسلم قد سبق الناس إلى الصوت، وهو يقول: لم تراعوا، لم تراعوا، وهو على فرس لأبي طلحة عري ما عليه سرج، في عنقه سيف، فقال: لقد وجدته بحراً، أو إنه لبحر»
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাধিক সুন্দর, দানশীল ও সাহসী পুরুষ ছিলেন। একবার রাতে মদিনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে লোকেরা ঘুম থেকে উঠে যেখানে চিৎকার শোনা যাচ্ছে সেদিকে দৌড়ে যাচ্ছিল। সেখানে গিয়ে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সবার আগে সেখানে আবু তালহার একটি ঘোড়ার ওপর আরোহণ করে গলায় একটি তলোয়ার ঝুলিয়ে উপস্থিত। ঘোড়াটির কোনো চাদর বা জ্বীনপোশ ছিল না। তিনি সেখানে লোকদের ডেকে ডেকে বলছিল তোমরা ঘাবড়াবে না, তোমরা لم تراعواء لم تراعوا ঘাবড়াবে না। অতঃপর সে বলল, আমি তাকে পেলাম সমুদ্র অথবা তিনি একটি সমুদ্র।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীতে এ ধরণের ঘটনা আরও অনেক আছে, যা এখানে আলোচনা করে শেষ করা সম্ভব নয়। তবে এ ধরণের ঘটনা দ্ধারা এ কথা স্পষ্ট হয় যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন দুনিয়ার সব মানুষের তুলনায় একজন সাহসী বীর পুরুষ। তাঁর মতো সাহসী ও বাহাদূর ব্যক্তি ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া দুর্লভ। এটি শুধু মুখের কথা নয়, বরং দুনিয়াতে আজ পর্যন্ত যত বীর বাহাদুর ও সাহসী লোক অতিবাহিত হয়েছে, তারা এ বিষয়ে সাক্ষী দিয়ে গেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন।
বারা ইবন আযেব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
«كنا والله إذا احمر البأس نتقي به، وإن الشجاع منا للذي يحاذي به، يعني النبي صلى الله عليه وسلم»
"যখন কোনো বিপদ আমাদের ঘিরে ফেলত, তখন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বারা আত্মরক্ষা করতাম। আর আমাদের মধ্যে সাহসী ব্যক্তি সেই হত, যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমপর্যায়ের হত"।
পূর্বে উল্লিখিত হাদীসে আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
كان النبي صلى الله عليه وسلم أحسن الناس، وأجود الناس، وأشجع الناس....
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাধিক সুন্দর, দানশীল ও সাহসী পুরুষ ছিলেন..."।
উপরে যেসব দৃষ্টান্ত আলোচনা করা হয়েছে, তা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনোবল-সাহসিকতার দৃষ্টান্ত। কিন্তু তার বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতা বিষয়ে অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। আমরা এখানে তার জীবনী হতে একটি মাত্র ঘটনা উল্লেখ করব। এ একটি ঘটনাই হাজারের বেশি ঘটনা আলোচনার প্রয়োজন মিটিয়ে দেবে।
হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় সুহাইল ইবন আমরের হঠকারীতা। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন بسم الله الرحمن الرحيم লিখতে চাইলেন, তখন সে বাধা দিলে তা পরিবর্তন করে بسمك اللهم লিখেন। অনুরূপভাবে محمد رسول الله এর পরিবর্তে محمد بن عبد الله লিখেন। এ ছাড়াও সুহাইল ইবন আমর মুসলিমদের বিরুদ্ধে যত ধরণের শর্তারোপ করেছিল। যেমন, মক্কা থেকে কোনো একজন লোকও যদি মদীনায় পালিয়ে আসে যদিও সে ইসলাম গ্রহণ করে তাকে অবশ্যই মক্কায় কাফিরদের নিকট ফেরৎ পাঠাতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের বিপক্ষে দেওয়া সব শর্তই কোনো প্রকার আপত্তি না তুলে মেনে নেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ অবস্থা দেখে মুসলিমরা ক্রোধে ও ক্ষোভে অগ্নিশর্মা হয়ে পড়ে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্তের বাইরে তাদের কিছু করার ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরবে সয়ে গেলেন এবং ধৈর্য ধারণ করলেন। আল্লাহর কি কুদরত! অতি নিকটেই কিছুদিন যেতে না যেতে মুসলিমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধৈর্যের ফলাফল দেখতে পেল। এ চুক্তি মেনে নেওয়াতে মুসলিমদের বিজয় নিশ্চিত হলো। আল্লাহ তা'আলা এ সন্ধিকে মুসলিমদের জন্য প্রকাশ্য বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করলেন।
উপরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহসিকতা বাহাদুরী অটল অবিচলতার ও ধৈর্যের যেসব ঘটনা উল্লেখ করা হলো, এ গুলো সবই হলো তার ঘটনা সম্বলিত জীবন সমুদ্রের কয়েকটি ফোটা মাত্র। অন্যথায় তার জীবনের সব ঘটনা উল্লেখ করতে হলে বড় বড় বই লিখে তার কোনো কিনারায় পৌছা যাবে না। আমাদের সকলকে মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই যেন আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারই অনুকরণ করি এবং তার আদর্শকে সমুন্নত রাখি। তাহলে আমাদের জন্য দুনিয়াও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত হবে। বিশেষ করে আমরা যারা আল্লাহর পথে মানুষকে আহবান করি তারা যেন তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ও তার অনুসৃত পথ হতে বিন্দু পরিমাণও এদিক সেদিক না হাটি। অন্যথায় আমাদের শত চেষ্টা ও আন্দোলন কোনো কাজে আসবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا ﴾ [الأحزاب: 21]
"তোমাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। যারা আল্লাহর ও আখিরাতের আশা করে এবং বেশি বেশি আল্লাহর স্মরণ করে"। [সুরা আল-আহযাব, আয়াত: ২১]
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে তার রাসূল এর অনুকরণ করা ও তার সুন্নাতের বাস্তবায়নে আন্তরিক হওয়ার তাওফীক দান করুন।
টিকাঃ
৮৭. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল।
৮৮. মুসনাদে আহমাদ ৮৬/১; হাকিম ১৪৩/২।
৮৯. সহীহ মুসলিম ১৪০১/৩।
৭০. দেখুন: সহীহ বুখারী, মায়াল ফাতহ ৩২৯/৫, হাদীস নং ২৭৩১, ২৭৩২; মুসনাদে আহমদ ৩৩১-৩২৮/৪; হাযাল হাবীবু ইয়া মুহিব্ব ৫৩২।