📘 আল্লাহর দিকে রাসুল সাঃ এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা > 📄 দুই. উহুদ যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ত্যাগ ও বীরত্ব

📄 দুই. উহুদ যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ত্যাগ ও বীরত্ব


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ যুদ্ধেও অত্যন্ত সাহসিকতা ও ধৈর্যের পরিচয় দেন। এ যুদ্ধে তার স্বজাতি লোকেরা তাকে যে কষ্ট দেয় তার ওপর তিনি ধৈর্য ধারণ করেন এবং তিনি কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠিন যুদ্ধ করেন। এ যুদ্ধে প্রথমে বিজয় মুসলিমদের হাতে ছিল, মুশরিকরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এমনকি তারা পালাতে পালাতে তাদের নারীদের নিকট পৌছে যায়। এ দিকে মুসলিম তীরান্দাজরা যখন তাদের পরাজয় দেখতে পেল তারা (মুসলিমরা) মনে করছিল, কাফিররা আর ফেরত আসবে না। তাই তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে স্থানের হেফাজত করার নির্দেশ দিয়েছিন তা রক্ষার করার চিন্তা বাদ দিয়ে স্থান ত্যাগ করে। তারা মনে করছিল মুশরিকরা আর ফিরে আসবে না। তাই তারা গণিমতের মালামাল একত্র করার জন্য যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং পাহাড়ের পাহারা ছেড়ে দেয়।

মুশরিকরা যখন দেখতে পেল, মুসলিমদের নিরাপত্তা বেষ্টনী এখন আর নেই এবং তীরান্দাজ যোদ্ধারা পাহাড় থেকে গিয়ে গণিমতের মালামাল একত্র করতে ময়দানে নেমে গেছে। তাই তারা কোনো প্রকার কাল ক্ষেপণ না করে, ফিরে এসে মুসলিমদের ঘেরাও করে ফেলল এবং তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। ফলে এ যুদ্ধে আল্লাহ তা'আলা মুসলিমদের সত্তর জন সাহাবীকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করলেন। মুশরিকরা আক্রমণ করতে করতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে গেল, তারা তার চেহারাকে আঘাত করল, তার চারটি দাঁত ভেঙ্গে ফেলল, তার মাথার ওপর আঘাত হানল। কতক সাহাবী জীবনবাজি রেখে তার থেকে দুশমনের আঘাত প্রতিহত করল।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশপাশে কুরাইশের দুই এবং আনসারের সাতজন লোক ছিল। যখন মুশরিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তীর মারতে ছিল এবং নিকটে পৌঁছে গেল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

من يردهم عنا وله الجنة، أو هو رفيقي في الجنة، فتقدم رجل من الأنصار فقاتل حتى قتل، ثم رهقوه أيضاً فقال: من يردهم عنا وله الجنة، فتقدم رجل من الأنصار فقاتل حتى قتل، فلم يزل كذلك حتى قتل السبعة، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم لصاحبيه: [ما أنصفنا أصحابنا»

"যে আমার থেকে তাদের প্রতিহত করবে তার জন্য অবশ্যই জান্নাত অথবা জান্নাতে সে আমার সাথী হয়ে থাকবে। এ কথা শোনে একজন আনছারী সাহাবী সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হন। তারপর তারা আবারো তীর নিক্ষেপ করতে থাকলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে আমার থেকে তাদের প্রতিহত করবে তার জন্য অবশ্যই জান্নাত অথবা জান্নাতে সে আমার সাথী হবে। এ কথা শোনে অপর একজন আনসারী সাহাবী সামনে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করতে থাকে অবশেষে সেও শহীদ হয়। তারপর তারা আবারো তীর নিক্ষেপ করতে থাকলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে আমার থেকে তাদের প্রতিহত করবে তার জন্য অবশ্যই জান্নাত অথবা জান্নাতে সে আমার সাথী হবে।” এ কথা শোনে একজন আনসারী সামনে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করতে করতে সেও শহীদ হয়। তারপর তারা আবারো তীর নিক্ষেপ করতে থাকলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে আমার থেকে তাদের প্রতিহত করবে সে অবশ্যই জান্নাতী অথবা জান্নাতে সে আমার সাথী হবে। এভাবে চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সাতজন সাহাবী শহীদ হয়। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুই সাথীকে বলল, আমাদের সাথীরা আমাদের সাথে যে কাজটি করেছে তা মোটেই ঠিক করে নি।

আর যখন মুসলিমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘিরে একটি দুর্গে একত্র হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই ইবন খলফ তার একটি ঘোড়ার আরোহণ অবস্থায় পাহাড়ের প্রান্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে পেয়ে বলল, মুহাম্মাদ কোথায়? সে যদি নাজাত পায়, তা হলে আমার কোনো নাজাত নেই। তার কথা শোনে লোকেরা বলল, আমাদের কেউ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না তাকে তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দাও। তারপর যখন সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আক্রমণের জন্য সামনের দিক অগ্রসর হচ্ছিল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারেস ইবন সাম্মাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি লাঠি নিয়ে তার দিকে ছুড়ে মারল। এতেই উবাই ইবন খালফের অবস্থা খারাব হয়ে গেল। সে যখন তার স্বজাতির নিকট ফিরে যায় তখন সে বলে আল্লাহর শপথ! আমাকে মুহাম্মাদ হত্যা করে ফেলছে। তখন তারা তাকে বলল, তুমি খামাখা ভয় পাচ্ছ! আমরা তোমার মধ্যে কোনো আঘাতই দেখতে পাচ্ছি না। তখন সে বলে, মুহাম্মাদ মক্কা থাকা অবস্থায় একদিন আমাকে হত্যা করবে বলছিল, আল্লাহর কসম করে বলছি, সে যদি আমার দিকে একটু থু থু ও নিক্ষেপ করে আমার মৃত্যুর জন্য তাই যথেষ্ট হবে। তারপর আল্লাহ এ শত্রুটি মক্কা থেকে ফেরার পথে সারাফ নামক স্থানে মারা যায়।

সাহাল ইবন সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আঘাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে সে বলে,

«جُرِحَ وَجْهُ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكُسِرَتْ رُبَاعِيَّتُهُ، وَهُشِّمَتِ البَيْضَةُ عَلَى رَأْسِهِ، فَكَانَتْ فَاطِمَةُ - عَلَيْهَا السَّلاَمُ - تَغْسِلُ الدَّمَ، وَعَلِيٌّ يُمْسِكُ، فَلَمَّا رَأَتْ أَنَّ الدَّمَ لاَ يَرْتَدُّ إِلاَّ كَثْرَةً أَخَذَتْ حَصِيرًا فَأَحْرَقَتْهُ حَتَّى صَارَ رَمَادًا، ثُمَّ أَلْزَقَتْهُ فَاسْتَمْسَكَ الدَّمُ.»

"উহুদ যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মোবারক জখম হয়, তার রুবায়ী দাঁত ভেঙে যায় এবং তার মাথায় তীর আঘাত হানে। ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা তার মাথা থেকে প্রবহমান রক্ত ধুইতেছিল, আর আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু রক্ত বন্ধ করতে চেষ্টা করছিল; তিনি যখন দেখতে পেলেন কোনোভাবেই রক্ত বন্ধ করা যাচ্ছে না তখন সে একটি চাটাই নিয়ে তাতে আগুন জ্বালিয়ে ছাই বানায় এবং সেগুলোকে ক্ষত স্থানে মালিশ করার পর তার রক্ত বন্ধ হয়।"

এভাবেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দীনের জন্য কাফির মুশরিকদের পক্ষ থেকে কষ্ট, নির্যাতন ও যুলুম সইতে হয়। তারপরও তিনি তার স্বজাতির বিরুদ্ধে কোনো দিন বদ-দোয়া করেন নি বরং তাদের জন্য তিনি আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কারণ, তারাতো জানে না।

আব্দুল্লাহ ইবন মাসুদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

كأني أنظر إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم يحكي نبياً من الأنبياء ضربه قومه وهو يمسح الدم عن وجهه، ويقول: اللهم اغفر لقومي فإنهم لا يعلمون».

"আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে তাকিয়ে থাকলে তাকে দেখি তিনি আগেকার আমলের একজন নবীর বর্ণনা দেন যে, তার গোত্রের লোকেরা তাকে মেরে রক্তাক্ত করছে, আর সে তার চেহারা হতে রক্ত মুছছে। (এত নির্যাতন সত্বেও সে তার জাতির বিপক্ষে কোনো বদ-দো'আ করে নি।) সে বলছে, হে আল্লাহ আপনি আমার কাওমের লোকদের ক্ষমা করে দেন! কারণ, তারা বুঝে না"।

নবীরা তাদের উম্মতদের দাওয়াত দিতে গিয়ে তাদের থেকে যেসব যুলুম নির্যাতনের শিকার হন তার ওপর ধৈর্য ধারণ করা এবং সহনশীলতার পরিচয় দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কোনো দৃষ্টান্ত খুজে পাওয়া যাবে না। বিশেষ করে সমগ্র নবীদের সরদার মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি যে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তারা শুধু ধৈর্য ধারনই করেন নি, বরং তারা তাদের ক্ষমা করে দিতেন তাদের জন্য হিদায়েত ও মাগফিরাতের দো'আ করতেন। তাদের অপরাধকে এ বলে ক্ষমা করে দিতেন যে তারা জানে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলেন,

اشتد غضب الله على قوم فعلوا هذا برسول الله صلى الله عليه وسلم، وهو حينئذ يشير إلى رباعيته، اشتد غضب الله على رجل يقتله رسول الله صلى الله عليه وسلم في سبيل الله تعالى »

"রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রুবায়ী দাতের দিকে ইশারা করে বলেন, যে জাতি তাদের নবীর সাথে এ ধরণের আচরণ করে, তাদের ওপর আল্লাহর 'আযাব অবধারিত। আর যাকে আল্লাহর রাহে কোনো নবী বা রাসূল হত্যা করে তার ওপর আল্লাহর আযাব অবধারিত"।

উহুদ যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আঘাত পেয়েছেন এবং যুলুম নির্যাতনের ওপর যেভাবে ধৈর্য ধারণ করেছেন, আল্লাহর পথের দা'ঈদের জন্য তা আজীবন আদর্শ হয়ে থাকবে। যারা আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতে গিয়ে জেল-যুলুম, দৈহিক নির্যাতন, দেশান্তর হওয়া এবং সর্বশেষ তাদের জীবন কেড়ে নেওয়া ইত্যাদির স্বীকার হয়ে থাকে তাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলো উত্তম আদর্শ। কারণ, তাকে অনুরুপ অনেক কষ্টই দেওয়া হয়েছে। আর তিনি তাতে ধৈর্য ধরেছেন।

টিকাঃ
৭৬. দেখুন: যাদুল মা'য়াদ ১৯৬/৩; রাহীকুল মাখতুম ২৫৫।
৭৭. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৭৮৯।
৭৮. বিদায়া নেহায়া: ৩২/৪; যাদুল মায়াদ ১৯৯/৩; রাহীকুল মাখতুম ২৬৩; তাবারী ৬৭/২ ফিকহুস সীরাহ ২২৬।
৭৯. সহীহ বুখারী, কিতাবুল জিহাদ ২৯১১; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৭৯০।
৮০. সহীহ বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, হাদীস নং ৩৪৭৭; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ; হাদীস নং ১৭৯২।
৮১. সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, হাদীস নং ৪০৭৩; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৭৩৯।

📘 আল্লাহর দিকে রাসুল সাঃ এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা > 📄 তিন. হুনাইন যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিকমত ও সাহসিকতা

📄 তিন. হুনাইন যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিকমত ও সাহসিকতা


হুনাইনের যুদ্ধ ছিল মুসলিমদের জন্য একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধ। এ যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বীরত্ব ও সাহসিকতা ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর বীরত্ব ও সাহসিকতার বদৌলতে এ যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয় নিশ্চিত হয়। অন্যথায় মুসলিমরা এ যুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ফিরে আসতে হত।

হুনাইনের যুদ্ধে মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হলে মুসলিমরা প্রথম অবস্থায় পিছু হটে পড়ে এবং দুর্বল ও কতক নতুন ইসলাম গ্রহণকারী কিছু নও মুসলিম পলায়ন করতে শুরু করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ মুহূর্তে কোনো প্রকার ভয় না করে তিনি তার গাধাটিকে নিয়ে কাফিরদের মোকাবেলায় সামনের দিক অগ্রসর হতে থাকে। তারপর তিনি তার চাচা আব্বাসকে বলেন,

«أي عباس، ناد أصحاب السمرة [ فقال عباس: - وكان رجلاً صيتاً - فقلت بأعلى صوتي: أين أصحاب السمرة؟ قال: فوالله لكأن عطفتهم حين سمعوا صوتي عطفة البقر على أولادها، فقالوا: يا لبيك يا لبيك، قال: فاقتتلوا والكفار... فنظر رسول الله صلى الله عليه وسلم وهو على بغلته كالمتطاول عليها إلى قتالهم، فقال صلى الله عليه وسلم: [الآن حمي الوطيس» (82).

“হে আব্বাস! তুমি সামুরাবাসীদের উচ্চ স্বরে ডাক দাও! আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু ঐ যুগে সবচেয়ে অধিক কণ্ঠস্বরী ছিলেন। আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ মোতাবেক উচ্চ আওয়াজে বললাম, হে আসহাবে সামুরা! তোমরা কোথায়? আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমার আওয়াজ শোনার পর গরুর বাছুর যেমন দড়ি ছেড়ে দিলে তার মায়ের নিকট দৌড়ে আসে ঠিক অনুরূপ ،يا لبيك يا لبيك বলে সমগ্র সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিকে দৌড়ে আসে। তারপর তারা কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বীয় গাধায় আরোহণ অবস্থায় একজন বীর পুরুষের মত তাদের যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, الآن حمي الوطيس হুনাইনের যুদ্ধের নাজুক পরিস্থিতিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত বিরল। আজ পর্যন্ত এ ধরণের বীরত্ব ও সাহসিকতা কোনো সেনাপতি, নেতা ও বীর বাহাদুর দেখাতে পারে নি।

বারা ইবন আযেব রাদিয়াল্লাহু আনহু কে এক লোক জিজ্ঞাসা করে বলল, হে আবু উমারা তুমি হুনাইনের যুদ্ধের দিন পলায়ন করেছিলে? উত্তরে তিনি বলেন, না, আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন পিছু হটেননি এবং কোনো মুসলিম সেদিন পলায়ন করেন নি। তবে যুবক ও তাড়াহুড়াকারী কিছু মুসলিম তাদের নিকট কোনো অস্ত্র না থাকাতে বা অস্ত্রের পরিমাণ কম হওয়াতে তারা কিছুটা পিছু হটে। তারপর তারা একটি তীরন্দাজ সম্প্রদায়ের লোকদের সাথে মোকাবেলা করে, তারা তাদের তীর নিক্ষেপ করতে থাকলে অবস্থা এমন দাঁড়ালো তাদের তীর যেন নিশানা ভুল করছিল না। পরে তাদের নিকট অবস্থা প্রকাশ পেলে, সবাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে জড়ো হয়ে থাকে। তখন আবু সুফিয়ান ইবনুল হারেস রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গাধার রশি টেনে ধরে থাকে, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে থাকেন,

أنا النبي لا كذب أنا ابن عبد المطلب اللهم نزل نصرك

"আমি সত্যিকার নবী তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। আমি আব্দুল মুত্তালিবের উত্তরসূরী। হে আল্লাহ! তুমি তোমার সাহায্য নাযিল কর"।

সহীহ মুসলিমে সালমা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,

مررت على رسول الله صلى الله عليه وسلم منهزماً، وهو على بغلته الشهباء، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لقد رأى ابن الأكوع فزعاً. فلما غشوا رسول الله صلى الله عليه وسلم نزل عن البغلة، ثم قبض قبضة من تراب من الأرض، ثم استقبل به وجوههم، فقال: [شاهت الوجوه، فما خلق الله منهم إنساناً إلا ملأ عينيه تراباً بتلك القبضة، فولوا مدبرين، فهزمهم الله ، وقسم رسول الله صلى الله عليه وسلم غنائمهم بين المسلمين

"আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পরাভূত অবস্থায় অতিক্রম করি। তখন তিনি তার 'শাহবাহ' গাধাটির উপর ছিল। আমাকে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলল, আজ ইবনুল আকওয়া ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছে। তারপর যখন সাহাবীগণ তাকে ঘেরাও করে ফেলল, তখন তিনি তার গাধা থেকে নেমে যমীন থেকে এক মুষ্টি মাটি নিলো। তারপর তা কাফিরদের দিকে নিক্ষেপ করে বলে, তোমাদের চেহারা আক্রান্ত হোক। তারপর আল্লাহ এমন কোনো চেহারা সৃষ্টি করেন নি যার চেহারা মাটির কারণে আক্রান্ত হয় নি। তারপর কাফিররা গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পরাজিত হয়ে পলায়ন করল। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের মধ্যে গণিমতের মালামাল বণ্টন করেন"।

উলামাগণ বলেন, যুদ্ধের ময়দানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গাধার উপর আরোহণ করা ছিল তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এ ছাড়াও তিনি ঐ সময় মানুষের জন্য আশ্রয়স্থল ছিলেন। যার কারণে সবাই দৌড়ে তার দিকেই ছুটে আসে। তার সাহসিকতা ও বীরত্বের আরও প্রমাণ হলো, তিনি এ নাজুক পরিস্থিতিতে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। অথচ তখন লোকেরা তাকে ছেড়ে পলায়ন করতেছিল। আর যখন তারা তাকে বেষ্টন করে ফেলল, তখন তিনি তার আরোহণ থেকে নেমে আসা তার অধিক সাহসিকতারই দৃষ্টান্ত। কেউ কেউ বলেন, তিনি তখন যমীনে নেমে আসে যে মুসলিম যমীনে ছিল তাদের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করার জন্য ছিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি ক্ষেত্রে যে সাহসিকতা ও বীরত্বের প্রমাণ রেখেছেন; ইতিহাসে এর আর কোনো দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর সাহাবীরা তার বীরত্বের বিভিন্ন বর্ণনা তুলে ধরেন।

টিকাঃ
৮২. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৭৭৫।
৮৩. দেখুন: আর রাহিকুল মাখতুম ৪০১; হাযাল হাবীবু ইয়া মুহিব্ব ৪০৮।
৮৪. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৭৭৬; সহীহ বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ২৯৩০।
৮৫. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৭৭৭।
৮৬. দেখুন: নববীর শরহে মুসলিম ১১৪/১২।

📘 আল্লাহর দিকে রাসুল সাঃ এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা > 📄 চার. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিকমত ও সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশের আরেকটি নমুনা

📄 চার. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিকমত ও সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশের আরেকটি নমুনা


সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كان النبي صلى الله عليه وسلم أحسن الناس، وأجود الناس، وأشجع الناس، ولقد فزع أهل المدينة ذات ليلة، فانطلق الناس قبل الصوت، فاستقبلهم النبي صلى الله عليه وسلم قد سبق الناس إلى الصوت، وهو يقول: لم تراعوا، لم تراعوا، وهو على فرس لأبي طلحة عري ما عليه سرج، في عنقه سيف، فقال: لقد وجدته بحراً، أو إنه لبحر»

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাধিক সুন্দর, দানশীল ও সাহসী পুরুষ ছিলেন। একবার রাতে মদিনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে লোকেরা ঘুম থেকে উঠে যেখানে চিৎকার শোনা যাচ্ছে সেদিকে দৌড়ে যাচ্ছিল। সেখানে গিয়ে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সবার আগে সেখানে আবু তালহার একটি ঘোড়ার ওপর আরোহণ করে গলায় একটি তলোয়ার ঝুলিয়ে উপস্থিত। ঘোড়াটির কোনো চাদর বা জ্বীনপোশ ছিল না। তিনি সেখানে লোকদের ডেকে ডেকে বলছিল তোমরা ঘাবড়াবে না, তোমরা لم تراعواء لم تراعوا ঘাবড়াবে না। অতঃপর সে বলল, আমি তাকে পেলাম সমুদ্র অথবা তিনি একটি সমুদ্র।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীতে এ ধরণের ঘটনা আরও অনেক আছে, যা এখানে আলোচনা করে শেষ করা সম্ভব নয়। তবে এ ধরণের ঘটনা দ্ধারা এ কথা স্পষ্ট হয় যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন দুনিয়ার সব মানুষের তুলনায় একজন সাহসী বীর পুরুষ। তাঁর মতো সাহসী ও বাহাদূর ব্যক্তি ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া দুর্লভ। এটি শুধু মুখের কথা নয়, বরং দুনিয়াতে আজ পর্যন্ত যত বীর বাহাদুর ও সাহসী লোক অতিবাহিত হয়েছে, তারা এ বিষয়ে সাক্ষী দিয়ে গেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন।

বারা ইবন আযেব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

«كنا والله إذا احمر البأس نتقي به، وإن الشجاع منا للذي يحاذي به، يعني النبي صلى الله عليه وسلم»

"যখন কোনো বিপদ আমাদের ঘিরে ফেলত, তখন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বারা আত্মরক্ষা করতাম। আর আমাদের মধ্যে সাহসী ব্যক্তি সেই হত, যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমপর্যায়ের হত"।

পূর্বে উল্লিখিত হাদীসে আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

كان النبي صلى الله عليه وسلم أحسن الناس، وأجود الناس، وأشجع الناس....

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাধিক সুন্দর, দানশীল ও সাহসী পুরুষ ছিলেন..."।

উপরে যেসব দৃষ্টান্ত আলোচনা করা হয়েছে, তা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনোবল-সাহসিকতার দৃষ্টান্ত। কিন্তু তার বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতা বিষয়ে অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। আমরা এখানে তার জীবনী হতে একটি মাত্র ঘটনা উল্লেখ করব। এ একটি ঘটনাই হাজারের বেশি ঘটনা আলোচনার প্রয়োজন মিটিয়ে দেবে।

হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় সুহাইল ইবন আমরের হঠকারীতা। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন بسم الله الرحمن الرحيم লিখতে চাইলেন, তখন সে বাধা দিলে তা পরিবর্তন করে بسمك اللهم লিখেন। অনুরূপভাবে محمد رسول الله এর পরিবর্তে محمد بن عبد الله লিখেন। এ ছাড়াও সুহাইল ইবন আমর মুসলিমদের বিরুদ্ধে যত ধরণের শর্তারোপ করেছিল। যেমন, মক্কা থেকে কোনো একজন লোকও যদি মদীনায় পালিয়ে আসে যদিও সে ইসলাম গ্রহণ করে তাকে অবশ্যই মক্কায় কাফিরদের নিকট ফেরৎ পাঠাতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের বিপক্ষে দেওয়া সব শর্তই কোনো প্রকার আপত্তি না তুলে মেনে নেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ অবস্থা দেখে মুসলিমরা ক্রোধে ও ক্ষোভে অগ্নিশর্মা হয়ে পড়ে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্তের বাইরে তাদের কিছু করার ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরবে সয়ে গেলেন এবং ধৈর্য ধারণ করলেন। আল্লাহর কি কুদরত! অতি নিকটেই কিছুদিন যেতে না যেতে মুসলিমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধৈর্যের ফলাফল দেখতে পেল। এ চুক্তি মেনে নেওয়াতে মুসলিমদের বিজয় নিশ্চিত হলো। আল্লাহ তা'আলা এ সন্ধিকে মুসলিমদের জন্য প্রকাশ্য বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করলেন।

উপরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহসিকতা বাহাদুরী অটল অবিচলতার ও ধৈর্যের যেসব ঘটনা উল্লেখ করা হলো, এ গুলো সবই হলো তার ঘটনা সম্বলিত জীবন সমুদ্রের কয়েকটি ফোটা মাত্র। অন্যথায় তার জীবনের সব ঘটনা উল্লেখ করতে হলে বড় বড় বই লিখে তার কোনো কিনারায় পৌছা যাবে না। আমাদের সকলকে মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই যেন আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারই অনুকরণ করি এবং তার আদর্শকে সমুন্নত রাখি। তাহলে আমাদের জন্য দুনিয়াও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত হবে। বিশেষ করে আমরা যারা আল্লাহর পথে মানুষকে আহবান করি তারা যেন তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ও তার অনুসৃত পথ হতে বিন্দু পরিমাণও এদিক সেদিক না হাটি। অন্যথায় আমাদের শত চেষ্টা ও আন্দোলন কোনো কাজে আসবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا ﴾ [الأحزاب: 21]

"তোমাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। যারা আল্লাহর ও আখিরাতের আশা করে এবং বেশি বেশি আল্লাহর স্মরণ করে"। [সুরা আল-আহযাব, আয়াত: ২১]

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে তার রাসূল এর অনুকরণ করা ও তার সুন্নাতের বাস্তবায়নে আন্তরিক হওয়ার তাওফীক দান করুন।

টিকাঃ
৮৭. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল।
৮৮. মুসনাদে আহমাদ ৮৬/১; হাকিম ১৪৩/২।
৮৯. সহীহ মুসলিম ১৪০১/৩।
৭০. দেখুন: সহীহ বুখারী, মায়াল ফাতহ ৩২৯/৫, হাদীস নং ২৭৩১, ২৭৩২; মুসনাদে আহমদ ৩৩১-৩২৮/৪; হাযাল হাবীবু ইয়া মুহিব্ব ৫৩২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00