📘 আল্লাহর দিকে রাসুল সাঃ এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা > 📄 এক. মসজিদ নির্মাণ করার কাজে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা

📄 এক. মসজিদ নির্মাণ করার কাজে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা


প্রথমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কাজটি আরম্ভ করেন, তা হলো, মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজ। তিনি সবাইকে এ কাজে অংশ গ্রহণ করার সুযোগ দেন, যার ফলে সমস্ত মুসলিমরা এ কাজে অংশ গ্রহণ করেন। তাদের নেতৃত্বে থাকেন তাদের ইমাম মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। এটি ছিল পরস্পর সহযোগিতামূলক ও সম্মিলিতভাবে সম্পাদিত ইসলামের সর্ব প্রথম কাজ। এ কাজের মাধ্যমে সবার মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব তৈরি হয় এবং মুসলিমদের কাজের জন্য সাধারণ লক্ষ্য নির্ধারণ হয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমনের পূর্বে মদিনার প্রতিটি গোত্রের জন্য একটি নির্ধারিত স্থান ছিল, তাতে তারা একত্র হয়ে গান-বাজনা, কিচ্ছ-কাহিনী, কবিতা পাঠ ইত্যাদির অনুষ্ঠান করত। তাদের এক গোত্র অপর গোত্রের লোকদের নিকট গিয়ে বসত না এবং তাদের অনুষ্ঠানে যোগ দিত না। এতে স্পষ্ট হয় যে, তাদের মধ্যে মত পার্থক্য ও দ্বন্ধ কতই না তীব্র ছিল।

কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মসজিদ বানালেন, তা সমগ্র মুসলিমদের জন্য একটি মিলন কেন্দ্রে পরিণত হলো। তারা সবাই সব ধরণের মত পার্থক্য ভুলে গিয়ে একই সময়ে এক সাথে মসজিদে একত্র হত। এ মসজিদেই তারা কোনো কিছু জানার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জিজ্ঞাসা করত, তাদের যাবতীয় সমস্যার সমাধান এখান থেকেই সমাধান করতে চেষ্টা করত। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সবাইকে মসজিদে একত্র করে ইসলাম ও ঈমানের তা'লীম দিতেন, সঠিক পথ দেখাতেন এবং সময় উপযোগি দিক নির্দেশনা দিয়ে তাদের ধন্য করতেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ধীরে ধীরে মদিনাবাসী একটি ফ্লাট ফর্মে আসতে আরম্ভ করে, তাদের মধ্যে মিল, মহব্বত ও ভালোবাসার সু-বাতাস বইতে শুরু করে এবং তারা ঐক্যের বন্ধনে একত্র হতে থাকে। বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা তাদের মধ্যে সুদীর্ঘ কালের জট বাধা ভেদাভেদ ও শত্রুতা ভুলতে থাকে, তৈরি হয় তাদের মধ্যে মিল-মহব্বত ও মৈত্রী। আর তারা অতীতকে ভুলে চলে আসে একে অপরের কাছাকাছি। তাদের শত্রুতা পরিণত হয় বন্ধুত্বে, তাদের অনৈক্য ও বিবাদ রূপ নেয় ঐক্য ও মমতায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মদিনায় কোনো প্রকার বিভক্তি ও দলাদলি আর অবশিষ্ট থাকল না। জাহিলিয়্যাতের সব অন্ধকার আলোর সন্ধান পেতে আরম্ভ করল। বরং তারা সবাই অতীতকে পিছনে রেখে এখন ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হলো। তারা আর কোনো উপদলে বিভক্ত না থেকে একজনের নেতৃত্বে একত্রিত হলো।

আর তিনি হলেন, মানবতার অগ্রদূত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যিনি তার প্রভুর পক্ষ থেকে আদেশ নিষেধ গ্রহণ করে উম্মতদের শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব লাভ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তা'লীম-তরবিয়ত ও শিক্ষা-দীক্ষা দ্বারা মুসলিমগণ এখন একই কাতারে অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে এখন আর কোনো দলাদলি ও রেশারেশি নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তা'লীমের বদৌলতে তাদের অন্তরে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি হয়। তাদের মধ্যে কোনো প্রকার হিংসা-বিদ্বেষে ও পরশ্রিকাতরতা অবশিষ্ট রইল না, তাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় হলো, ঐক্য মজবুত হলো এবং তারা একে অপরের সহযোগী ও হিতাকাংক্ষি হিসেবে পরিণত হলো।

মসজিদ শুধু মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের স্থান ছিল না, বরং মসজিদ হলো, মুসলিম উম্মাহর যাবতীয় সমস্যা সমাধানের মূল কেন্দ্র। শিক্ষা, দীক্ষাসহ সবকিছুই এখান থেকেই পরিচালিত হত। সবাই এখানে এসে একত্র হত, যাতে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুরনো যত ধরণের বিভেদ ছিল, তা আর না থাকে, এখানে এসে তারা তাদের অতীতের সব কিছু ভুলে যায় এবং দীর্ঘকাল থেকে লালিত জাহিলি যুগে তাদের সব ধরণের বিরোধ এখানে আসলে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। মসজিদই হলো, সমস্ত কার্যক্রম চালানোর প্রশাসনিক ভবন এবং সব ধরণের ফরমান জারির একমাত্র প্রাণ কেন্দ্র। এখানেই সব ধরণের বুদ্ধি পরামর্শ করা হত, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হত এবং এখান থেকেই তা প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করা হত।

এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানেই অবস্থান করতেন, তার প্রথম কাজ ছিল মসজিদ নির্মাণ করা, যাতে মুমিনরা এক জায়গায় একত্র হতে পারে। হিজরতের প্রাক্কালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে প্রথম অবস্থান করেন, সেখানেও একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যে মসজিদটি বর্তমানে মসজিদে কুবা নামে পরিচিত। তারপর কুবা ও মদিনার মাঝামাঝি বনী সালেম ইবন আওফে তিনি অবস্থান করেন। সেখানে তিনি জুমার সালাত আদায় করে মসজিদের সূচনা করেন। মদিনায় পৌঁছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো প্রকার কালক্ষেপন না করে অতি তাড়াতাড়ি সর্ব প্রথম মসজিদ নির্মাণের কাজে হাত দেন।

টিকাঃ
৪১. দেখুন: সহীহ বুখারী, কিতাবু মানাকিবিল আনসার পরিচ্ছেদ: রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের হিজরত, হাদীস নং ৩৯০৬, ২৪০, ২৩৯/৭।
৪২. দেখুন: মাহমুদ শাকেরের তারিখুল ইসলাম ১৬২/২; রাহীকুল মাখতুম, ১৭৯।
৪৩. দেখুন: সীরাতে নববীয়াহ শিক্ষা ও উপদেশ পৃ. ৭৪; ফিকহুসসীরাহ ১৮৯; হাযাল হাবীবু ইয়া মুহিব্ব: ১৮০।

📘 আল্লাহর দিকে রাসুল সাঃ এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা > 📄 দুই. ইয়াহূদীদের জ্ঞানগর্ভ কথা ও হিকমতের মাধ্যমে ইসলামের দিকে দাওয়াত

📄 দুই. ইয়াহূদীদের জ্ঞানগর্ভ কথা ও হিকমতের মাধ্যমে ইসলামের দিকে দাওয়াত


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় প্রবেশের পর একটি উন্নত জাতি গঠন ও তাদের সংশোধনের লক্ষে আব্দুল্লাহ ইবন সালামের মাধ্যমে ইয়াহুদীদের সাথে যোগাযোগ কায়েম করেন এবং তাদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দিতে আরম্ভ করেন। এ কারণে ইসলামের ইতিহাসে আব্দুল্লাহ ইবন সালামের ইসলাম গ্রহণ ইসলামের অগ্রযাত্রা ও মুসলিমদের উন্নতির একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিক। তার ইসলামের মাধ্যমে ইয়াহূদীদের মধ্যে ইসলামের প্রতি দূর্বলতা তৈরি হয় এবং মদীনার অন্যান্য লোকদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয়। কারণ, আব্দুল্লাহ ইবন সালাম ছিল ইয়াহুদীদের মধ্যে বড় আলেম। আগেকার আসমানী কিতাবসমুহে আখেরী নবী সম্পর্কে যে সব ভবিষ্যৎ বাণী ছিল তা সবই তার জানা ছিল। তাই তার মত এমন একজন লোকের ইসলাম গ্রহণ নিঃসন্দেহে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করবে এটাই ছিল স্বাভাবিক। আব্দুল্লাহ ইবন সালামের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা নিম্নরূপ।

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

بلغ عبد الله بن سلام مقدم النبي صلى الله عليه وسلم إلى المدينة، فأتاه، فقال: إني سائلك عن ثلاث لا يعلمهن إلا نبي، قال: ما أول أشراط الساعة؟ وما أول طعام يأكله أهل الجنة، وما بال الولد ينزع إلى أبيه أو إلى أمه؟ فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: [خبرني بهن آنفاً جبريل قال ابن سلام: ذاك عدو اليهود من الملائكة، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: [أما أول أشراط الساعة فنار تحشر الناس من المشرق إلى المغرب، وأما أول طعام يأكله أهل الجنة فزيادة كبد حوت، وأما الشبه في الولد فإن الرجل إذا غشي المرأة فسبقها ماؤه كان الشبه له، وإذا سبق ماؤها كان الشبه لها قال: أشهد أن لا إله إلا الله، وأنك رسول الله]، قال: يا رسول الله، إن اليهود قوم بهت، إن علموا بإسلامي قبل أن تسألهم بهتوني عندك، فأرسل نبي الله صلى الله عليه وسلم فأقبلوا فدخلوا عليه، فقال لهم رسول الله صلى الله عليه وسلم : [ يا معشر اليهود، ويلكم اتقوا الله فوالله الذي لا إله إلا هو إنكم لتعلمون أني رسول الله حقاً، وأني جئتكم بحق، فأسلموا، قالوا: ما نعلمه، قالوا للنبي صلى الله عليه وسلم - قالها ثلاث مرات - فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: فأي رجل فيكم عبد الله بن سلام؟ قالوا: سيدنا وابن سيدنا، وأعلمنا وابن أعلمنا، قال: أفرأيتم إن أسلم ؟ قالوا : حاشا لله ما كان ليسلم، قال: أفرأيتم إن أسلم؟ قالوا: حاشا لله ما كان ليسلم، قال: [أفرأيتم إن أسلم؟ قالوا: حاشا لله ما كان ليسلم، قال: يا ابن سلام اخرج عليهم]، فخرج فقال: يا معشر اليهود، اتقوا الله فوالله الذي لا إله إلا هو إنكم لتعلمون أنه رسول الله، وأنه جاء بحق، فقالوا : كذبت، [شرنا وابن شرنا]، ووقعوا فيه

"রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদিনায় আগমনের খবর আব্দুল্লাহ ইবন সালামের নিকট পৌছলে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বলে আমি তোমাকে তিনটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করব যে তিনটি বিষয়ের উত্তর একমাত্র নবী ছাড়া আর কেউ দিতে পারবে না। এক- কিয়ামতের প্রথম আলামত কী? দুই- জান্নাতীদের প্রথম খাবার কী হবে, যা তারা জান্নাতে খাবে? তিন- সন্তান কখনো মায়ের মতো আবার কখনো পিতার মতো হয় -এর কারণ কী? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, জিবরিল 'আলাইহিস সালাম একটু আগে আমাকে তোমারা প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে জানালেন, এ কথা শোনে আব্দুল্লাহ ইবন সালাম বলল, জিবরিল হলো, ফিরিশতাদের মধ্য হতে ইয়াহুদীদের বড় শত্রু। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর হলো, প্রথম কিয়ামতের আলামত আগুন যা পশ্চিম থেকে পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত সমগ্র মানুষকে এক জায়গায় একত্র করবে। আর জান্নাতিদের প্রথম খাবার হবে মাছের কলিজা। আর বাচ্চাদের মাতা পিতার সাদৃশ্য হওয়ার বিষয়টি নারী পরুষের মিলনের সময় যদি পুরুষের বীর্য নারীদের বীর্যের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে, তখন বাচ্চা পুরুষের মতো হয়, অন্যথায় নারীদের মত হয়। রাসূল সা,, উত্তর শোনার পর আব্দুল্লাহ ইবন সালাম বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, অবশ্যই আপনি আল্লাহর রাসূল। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল ইয়াহুদীরা হলো, অকৃতজ্ঞ জাতি। আপনি তাদের আমার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করার পূর্বে তারা যদি আমার ইসলাম বিষয়ে জানে, তবে তারা আমাকে হেয় করবে। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সংবাদ দিয়ে একত্র করলেন এবং তাদের বললেন, হে ইয়াহূদী সম্প্রদায়!

সাবধান তোমরা আল্লাহকে ভয় কর! আমি ঐ আল্লাহর শপথ করে বলছি, যিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, তোমরা অবশ্যই জান আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসূল। আমি তোমাদের নিকট সত্যের পয়গাম নিয়ে এসেছি। তোমরা আমার আনুগত্য কর এবং ইসলাম গ্রহণ কর। তারা সবাই বলল, আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানি না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের তিনবার জিজ্ঞাসা করেন এবং তারাও তিনবার একই উত্তর দেন। তারপর রাসূল তাদের জিজ্ঞাসা করেন, আবদুল্লাহ ইবন সালাম তোমাদের মধ্যে কেমন লোক? তারা সবাই এক বাক্যে বলল, তিনি আমাদের সরদার এবং সরদারের ছেলে সরদার। আর তিনি আমাদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী লোক এবং সর্বাধিক জ্ঞানী লোকের ছেলে। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে যদি ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তোমরা তাকে কীভাবে দেখবে? তারা বলল, আল্লাহ তাকে হেফাযত করুক! সে কখনই ইসলাম গ্রহণ করার নয়! তিনি বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবন সালাম তুমি ইয়াহুদীদের নিকট বের হয়ে আস! তারপর তিনি বের হয়ে বললেন, হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর! যে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্যিকার ইলাহ নেই, আমি তার শপথ করে বলছি, তোমরা ভালো করেই জান অবশ্যই তিনি আল্লাহর রাসূল। তিনি আমাদের নিকট সত্যের পয়গাম নিয়ে আসছেন। তার কথা শোনে তারা সবাই বলল, তুমি মিথ্যা বলছ, তুমি আমাদের মধ্যে সর্বাধিক নিকৃষ্ট ব্যক্তি এবং সর্বাধিক নিকৃষ্ট ব্যক্তির ছেলে। তারা তার সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের অপবাদ দেওয়া আরম্ভ করে।

মদীনায় প্রবেশের পর এ ঘটনা ছিল ইয়াহূদীদের সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম অভিজ্ঞতা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল হলো, তিনি প্রথমে আব্দুল্লাহ ইবন সালামকে লুকিয়ে থাকতে বলেন, যাতে তার সম্পর্কে সংবাদ দেওয়ার পূর্বেই তাদের থেকে তার মান মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে স্বীকারোক্তি আদায় করেন। তারপর যখন তারা প্রশংসা করল, তার মান-মর্যাদা তুলে ধরল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বের হয়ে আসতে বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে সে ভিতর থেকে বের হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রিসালাতের সাক্ষ্য দিল এবং ইয়াহুদীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের সত্যতা সম্পর্কে যা গোপন করত, তা প্রকাশ করে দেন।

টিকাঃ
৪৪. সহীহ বুখারী, কিতাব নবীদের বর্ণনা হাদীস নং ৩৯১১ এবং মানাকিবুল আনসার হাদীস নং ৩৯১১; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২১০/৩।
৪৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২১৪/৩; সীরাতে ইবন হিশাম: ১১৪/২; যাদুল মায়াদ ১৫৩/২; রাহীকুল মাখতুম ১৭৫; হাযাল হাবীবু ইয়া মুহিব্ব: ১৭৫; মাহমুদ শাকেরের তারিখে ইসলামী ১৭৩/২; ইমাম গাজালির ফিকহুস-সীরাহ পৃ. ১৯৮।

📘 আল্লাহর দিকে রাসুল সাঃ এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা > 📄 তিন. মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব

📄 তিন. মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব


মদিনায় হিজরতের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে মসজিদ নির্মাণ ও ইয়াহুদীদের ইসলামের দিকে ডাকতে আরম্ভ করেন, অনুরূপভাবে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে সুসম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছিল সঠিক সমাধান, নবুওয়াতের পরিপূর্ণতা, সুক্ষ্ম কৌশল এবং মুহাম্মাদী হিকমত।

মদিনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনাস ইবন মালিকের গৃহে আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব কায়েম করেন। নব্বই জন সাহাবী তার ঘরে একত্রিত হয়; অর্ধেক আনসার আর বাকী অর্ধেক মুহাজির। তাদের সম্পর্ক বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এতই নিবিড় ছিল, একজন মারা গেল তার সম্পত্তিতে অপরজন অংশ পেত। অথচ তার সাথে রক্তের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তারপর যখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করেন, তখন উত্তরাধিকার শুধু মাত্র রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

﴿ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا مِن بَعْدُ وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا مَعَكُمْ فَأُوْلَبِكَ مِنكُمْ وَأُولُوا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَىٰ بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ﴾ [الأنفال: 75]

“আর যারা পরে ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং তোমাদের সাথে জিহাদ করেছে, তারা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত, আর আত্মীয়-স্বজনরা একে অপরের তুলনায় অগ্রগণ্য, আল্লাহর কিতাবে। নিশ্চয় আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ে মহাজ্ঞানী”। [সুরা আল-আনফাল, আয়াত: ৭৫]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের মধ্যে যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেন, তা শুধু কাগজের লেখা বা মুখের কথা ছিল না, বরং তাদের মধ্যে যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেছিল তা ছিল তাদের অন্তরের গাথা একটি চিরন্তণ বন্ধন, তা ছিল তাদের জান মালের সাথে একাকার ও অভিন্ন। তাদের কথা ও কাজে ছিল একটি চিরন্তন ও স্থায়ী সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। বিপদে-আপদে তারা ছিলেন একে অপরের হিতাকাংখি ও সহযোগী। সহীহ বুখারীতে এ বিষয়ে একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়:

«آخى رسول الله صلى الله عليه وسلم بين عبد الرحمن بن عوف، وسعد بن الربيع، فقال سعد: قد علمت الأنصار أني من أكثرها مالاً، فأقسم مالي بيني وبينك نصفين، ولي امرأتان، فانظر أعجبهما إليك فسمها لي أطلقها، فإذا انقضت عدتها فتزوجها، فقال عبد الرحمن: بارك الله لك في أهلك ومالك، أين سوقكم؟ فدلوه على سوق بني قينقاع فما انقلب إلا ومعه فضل من أقط وسمن، ثم تابع الغدوة ثم جاء يوماً وبه أثر صفرة، فقال النبي صلى الله عليه وسلم: [مَهيم؟]، قال: تزوجت امرأة من الأنصار، فقال: ما سقت فيها؟ قال: وزن نواة من ذهب، أو نواة من ذهب، فقال: [أولم ولو بشاة»

"আব্দুর রহমান ইবন আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহু ও সায়াদ ইবন রবি রাদিয়াল্লাহু আনহু উভয়ের মাঝে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুসম্পর্ক কায়েম ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেন। তখন সায়াদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তার সাথীকে বলল, আনসারীরা জানে আমি সম্পদের দিক দিয়ে তাদের চেয়ে অধিক সম্পদের অধিকারি। সুতরাং তুমি আমার যাবতীয় সম্পদকে তোমার মধ্যে ও আমার মধ্যে দুই ভাগ করে নাও; অর্ধেক তোমার আর বাকী অর্ধেক আমার। আর আমার দু'টি স্ত্রী আছে তাদের মধ্যে তোমার নিকট যাকে পছন্দ হয়, তার নাম নিয়ে বল, আমি তাকে তালাক দিয়ে দিব তারপর যখন তার ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে, তখন তুমি তাকে বিবাহ করবে। এ সব কথা শোনে আব্দুর রহমান তার সাথীকে বলল, আল্লাহ তা'আলা তোমার পরিবার ও জান-মালের মধ্যে বরকত দান করুন। তোমাদের বাজার কোথায়? তারা বনী কায়নুকা নামক বাজারের সন্ধান দিলে, সেখান থেকে সে সামান্য পণীর ও ঘি নিয়ে ফিরে আসে। তারপর তারা দুপুরের খাওয়া খায়। এরপর সে একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসে তার দেহে লাল রং এর আলামত পরিলক্ষিত দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলল, তোমার কি অবস্থা? উত্তরে সে বলল, আমি একজন আনসারী নারীকে বিবাহ করেছি। তখন রাসূল তাকে বলল, এ বিষয়ে তুমি কি খরচ করেছ? সে বলল, একটি খেজুরের আটি পরিমাণ স্বর্ণ। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি ওলিমা খাওয়াও! যদি না পার তাহলে কমপক্ষে একটি ছাগল হলেও খাওয়াও"।

টিকাঃ
৪৬. দেখুন: আবু বকর আল-জাযায়েরির হাযাল হাবীব ইয়া মুহিব্ব পৃ. ১৭৮।
৪৭. সহীহ বুখারী, কিতাবু মানাকিবিল আনসার পরিচ্ছেদ: মুহাজির ও আনসারিদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন বিষয়, হাদীস নং ৩৭৮০, ৩৭৮১।

📘 আল্লাহর দিকে রাসুল সাঃ এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা > 📄 চার. হিকমতপূর্ণ তা’লীম

📄 চার. হিকমতপূর্ণ তা’লীম


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় মুসলিমদের তা'লীম, তরবিয়াত, আত্মার পরিশুদ্ধি ও উত্তম আখলাক শেখানোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি অত্যন্ত মহব্বত ও ভালোবাসার সাথে তাদের ইসলামী শিষ্টাচার ও ইবাদত বন্দেগীর তা'লীম দিতেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ: أَفْشُوا السَّلَامَ، وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصَلُّوا بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ، تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلَامٍ
"হে মানুষ! তোমরা সালামের প্রসার কর, মেহমানের মেহমানদারী কর, মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন তোমরা সালাত আদায় কর, আর নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ কর"।

তিনি আরও বলেন,

﴿لا يدخل الجنة من لا يأمن جاره بوائقه﴾

“যার অত্যাচার থেকে প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজন নিরাপদ থাকতে পারে না, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না”।

﴿المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده﴾

"সত্যিকার মুসলিম সে ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদে থাকে"। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

﴿لا يؤمن أحدكم حتى يحب لأخيه ما يحب لنفسه﴾

“যে ব্যক্তি নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তা তার অপর ভাইয়ের জন্য পছন্দ না করা পর্যন্ত সে প্রকৃত ঈমানদার হতে পারবে না”।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

"المؤمن للمؤمن كالبنيان يشد بعضه بعضا، وشبك بين أصابعه"

"একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য প্রাচীরের ন্যায়, তার একটি অংশ অপর অংশকে শক্তি যোগায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলে আঙ্গুল গুলোকে জড়ো করে দেখান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

لا تحاسدوا، ولا تناجشوا، ولا تباغضوا، ولا تدابروا، ولا يبع بعضكم على بيع بعض، وكونوا عباد الله إخواناً، المسلم أخو المسلم، لا يظلمه، ولا يخذله، ولا يحقره، التقوى هاهنا ويشير إلى صدره ثلاث مرات بحسب امرئ من الشر أن يحقر أخاه المسلم، كل المسلم على المسلم حرام: دمه، وماله وعرضه

"তোমরা পরস্পর বিদ্বেষ করো না ধোঁকা দেবে না, হিংসা করবে না এবং দুর্নাম করবে না। আর কারো বেচা-কেনার ওপর হস্তক্ষেপ করবে না। আর তোমরা আল্লাহর বান্দা ও ভাইয়ে পরিণত হও। একজন মুসলমি অপর মুসলিমের ভাই। সে কাউকে অপমান করে না। কাউকে ঠকায় না এবং কারো ওপর অত্যাচার করে না। আর তাকওয়া এখানে। এ বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় বক্ষের দিকে তিনবার ইশারা করে। একজন মানুষ নিকৃষ্ট হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার একজন ভাইকে অপমান করা। প্রতিটি মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের রক্তপাত, ধন-সম্পদ আত্মসাৎ ও ইজ্জত সম্মানহানী করা হারাম করা হয়েছে।

وقال لا يحل لمسلم أن يهجر أخاه فوق ثلاث ليال يلتقيان فيعرض هذا، ويعرض هذا، وخيرهما الذي يبدأ بالسلام

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, একজন মুসলিম তার অপর ভাইকে তিন রাতের বেশি ছেড়ে রাখতে পারে না। তারা একে অপরের সাথে মিলিত হলে একজন এদিক আরেকজন অন্যদিক ফিরে থাকে। তাদের উভয়ের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে আগে সালাম দেয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

تفتح أبواب الجنة يوم الإثنين، ويوم الخميس، فيغفر لكل عبد لا يشرك بالله شيئاً إلا رجلاً كانت بينه وبين أخيه شحناء، فيقال: انظروا هذين حتى يصطلحا، انظروا هذين حتى يصطلحا، انظروا هذين حتى يصطلحا

“সোমবার ও বৃহস্পতিবারে জান্নাতের দরজাসমূহ খোলা হয়ে থাকে। তখন আল্লাহ তা'আলা যেসব বান্দাগণ আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করে না তাদের ক্ষমা করে দেন। তবে কোনো ব্যক্তি যদি এমন হয়, তার মধ্যে ও তার ভাইয়ের মধ্যে শত্রুতা থাকে, তবে আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করেন না। আল্লাহ তার ফিরিশতাদের বলেন, তোমরা এ দু'জনকে সুযোগ দাও, যাতে তারা আপোষ করে ফেলে। তোমরা এ দুজনকে সুযোগ দাও যাতে তারা আপোষ করে ফেলে। তোমরা এ দু'জনকে সুযোগ দাও যাতে তারা আপোষ করে ফেলে”।

«وقال: تعرض الأعمال في كل يوم خميس وإثنين فيغفر الله في ذلك اليوم لكل امرئ لا يشرك بالله شيئاً إلا امراً كانت بينه وبين أخيه شحناء، فيقال: اركوا هذين حتى يصطلحا، اركوا هذين حتى يصطلحا»

"রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন আল্লাহ তা'আলার নিকট সোমবার ও বৃহস্পতিবারে বান্দার আমলসমূহ পেশ করা হয়ে থাকে, তখন আল্লাহ তা'আলা যারা আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করে তাদের ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। তবে কোনো ব্যক্তি যদি এমন হয়, তার মধ্যে ও তার ভাইয়ের মধ্যে দুশমনি থাকে, তবে আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করেন না। তার বিষয়ে বলা হয়, তাকে তোমরা সুযোগ দাও! যাতে তারা আপোষ করে নেয়"।

وقال صلى الله عليه وسلم: انصر أخاك ظالماً أو مظلوماً قيل: يا رسول الله، هذا نصرته مظلوماً، فكيف أنصره إذا كان ظالماً؟ قال: تحجزه أو تمنعه من الظلم فذلك نصره

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা তোমার যালিম অথবা মাযলুম ভাই উভয়কে সহযোগিতা কর। একজন জিজ্ঞাসা করে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল মযলুমের সাহায্য করা আমরা বুঝতে পারলাম, কিন্তু যদি যালিম হয়, তাকে কীভাবে সাহায্য করব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে তোমরা বিরত রাখবে অথবা তাকে যুলুম করতে বাধা দিবে"।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

حق المسلم على المسلم ست، قيل: ما هن يا رسول الله؟ قال: [إذا لقيته فسلم عليه، وإذا دعاك فأجبه، وإذا استنصحك فانصح له، وإذا عطس فحمد الله فشمته، وإذا مرض فعده، وإذا مات فاتبعه

“একজন মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের ওপর ছয়টি দায়িত্ব রয়েছে। জিজ্ঞাসা করা হলো, সে গুলো কি হে আল্লাহর রাসূল!? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দেন, যখন তুমি তার সাথে সাক্ষাত করবে তাকে সালাম দেবে। যখন তোমাকে দাওয়াত দিবে, তখন তুমি তার দাওয়াতে সাড়া দেবে। যখন তোমার নিকট কোনো উপদেশ চাইবে তখন তুমি তাকে উপদেশ দেবে। আর হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে, তুমি তার উত্তর দিবে। আর যখন অসুস্থ হবে, তুমি তাকে দেখতে যাবে। আর যখন মারা যাবে, তার জানাজায় শরীক হবে"।

বারা ইবন আযেব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ونهانا عن سبع: [أمرنا بعيادة المريض، واتباع الجنازة، وتشميت العاطس، وإجابة الداعي، وإفشاء السلام، ونصر المظلوم، وإبرار المقسم، ونهانا عن خواتيم الذهب، وعن الشرب في الفضة أو قال: في آنية الفضة وعن المياثر، والقسي، وعن لبس الحرير، والديباج، والإستبرق».

"রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সাতটি আদেশ দেন এবং সাতটি বিষয়ে নিষেধ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের রুগীদের দেখতে যাওয়া, জানাজায় শরীক হওয়া, হাঁচির উত্তর দেওয়া, সালামের প্রসার করা, মযলুমের সাহায্য করা, দাওয়াতে সাড়া দেওয়া এবং শপথকারীকে দায়মুক্ত করার নির্দেশ দেন। আর তিনি আমাদের স্বর্ণের আংটি পরা, রুপার পাত্রে পান করা, রেশমের পোশাক পরিধান করা, রেশমের নির্মিত বিছানা, রেশমের দ্বারা খচিত কাপড়, দিবাজ ও ইসতাবরাক পরিধান করা হতে নিষেধ করেন"।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

لا تدخلون الجنة حتى تؤمنوا، ولا تؤمنوا حتى تحابوا، أولا أدلكم على شيء إذا فعلتموه تحاببتم، أفشوا السلام بينكم

"তোমারা পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়া ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না, তোমরা একে অপরকে মহব্বত করবে। আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয়ের সন্ধান দেব, যা পালন করলে তোমরা একে অপরকে মুহব্বত করবে? তোমরা তোমাদের নিজেদের মধ্যে সালামের ব্যাপকতা বৃদ্ধি কর"!

وسئل صلى الله عليه وسلم : أي الإسلام خير؟ فقال: تطعم الطعام، وتقرأ السلام على من عرفت ومن لم تعرف

"রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ইসলামে সর্বোত্তম আমল কোনটি? তখন রাসূল উত্তর দেন, মেহমানের মেহমানদারী করা, তুমি যাকে চিন বা যাকে চিন না সবাইকে সালাম দেওয়া”।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مثل المؤمنين في توادهم وتراحمهم وتعاطفهم، كمثل الجسد إذا اشتكى منه عضو تداعى له سائر الجسد بالسهر والحمى»

"মুমিনদের দৃষ্টান্ত পরস্পরের প্রতি দয়া, নম্রতা ও আন্তরিকতার দিক দিয়ে একটি দেহের মতো। তাদের দেহের একটি অংশ আক্রান্ত হলে, তার সমগ্র অঙ্গ ব্যথা, যন্ত্রণা ও অনিদ্রায় আক্রান্ত হয়"।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«من لا يرحم لا يرحم»

"যে ব্যক্তি রহম করে না তাকে রহম করা হবে না"।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

﴿من لا يرحم الناس لا يرحمه الله تعالى﴾

"যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করে না, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি দয়া করবে না"।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«سباب المسلم فسوق، وقتاله كفر»

"মুসলিমদের গালি দেওয়া ফাসেকী, আর কোনো মুসলিমকে হত্যা করা হলো, কুফুরী"।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উল্লিখিত বাণীসমূহ আনসারীদের নিকট রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে সরাসরি পৌঁছুক বা তারা মুহাজিরদের মাধ্যমে পৌঁছুক, যারা হিজরতের পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছে, সবই হলো, তাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে বিশেষ তা'লীম ও শিক্ষা। এ ছাড়া কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত উম্মতের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিরন্তন বাণীসমূহ বিশেষ তা'লীম যা তারা তাদের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারে।

এ ছাড়াও আরও অনেক হাদীস ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী রয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি তার সাহাবীদের তা'লীম দিতেন, তাদের দান খয়রাত করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন এবং দান করার ফযীলত বর্ণনা করতেন, যাতে তাদের অন্তর বিগলিত ও উৎসাহী হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ভিক্ষা করা হতে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করেন। তাদের জন্য ধৈর্য ধারণ ও কানায়াত করার গুরুত্ব আলোচনা করতেন। যেসব ইবাদতে অধিক সাওয়াব ও বিনিময় রয়েছে, তার প্রতি তাদের যত্নবান হওয়ার তা'লীম দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসমান থেকে অবতীর্ণ ওহীর সাথে সম্পৃক্ত করতেন। তিনি নিজে তাদের পড়ে শোনাতেন এবং তাদের থেকে তিনি শুনতেন। যাতে এ শিক্ষার মাধ্যমে তাদের ওপর দাওয়াতের যে দায়িত্ব রয়েছে, তার অনুভূতি জাগ্রত হয়।

আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবেই ধীরে ধীরে তাদের চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধন করেন এবং তাদের একটি মান-সম্পন্ন জাতিতে পরিণত করেন। যার ফলে তারা কিয়ামত অবধি মানবতার জন্য একটি আদর্শে পরিণত হন। এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে ইতিহাসে একটি আদর্শবান ও উন্নত মানের মুসলিম সমাজ বিনির্মাণ করতে তিনি সক্ষম হন। সাথে সাথে জাহিলি সমাজের যাবতীয় সমস্যার বিজ্ঞান সম্মত সমাধান তিনি জাতির সামনে পেশ করেন এবং তা বাস্তবায়ন করে দেখান। ফলে অন্ধকারাচ্ছন্ন জাহিলি সমাজ ব্যবস্থা মানবতার জন্য একটি উন্নত আদর্শের দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী পরিণত হয়। এগুলো সবই হলো, আল্লাহ তা'আলার অপার অনুগ্রহ তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আন্তরিক প্রচেষ্টার সুফল। যারা আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করবে তাদের উচিত হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের অনুসরণ করা এবং তার অনুসৃত পথে চলা।

টিকাঃ
৪৮. আর রাহীকুল মাখতুম ১৭৯, ২০৮, ১৮১; মাহমুদ শাকের-এর তারিখে ইসলামী ১৬৫/২।
৪৯. তিরমিযী, কিতাব কিয়ামতের বর্ণনা, হাদীস নং ২৪৮৫। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেন। আর ইবন মাযা কিতাবুল আতয়েমাহ পরিচ্ছেদ: হাদীস নং ১০৮৩/২, ৩২৫১; দারামী ১৫৬/১ এবং আহমদ ১৬৫/১।
৫০. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান পরিচ্ছেদ: প্রতিবেশীদের কষ্ট দেওয়া বিষয়ে, হাদীস নং ৪৬।
৫১. সহীহ বুখারী, কিতাবুল ঈমান পরিচ্ছেদ: কোন ইসলাম উত্তম? ৫৪/১; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান পরিচ্ছেদ : بيان تفاضل الإسلام وأي الأمور أفضل হাদীস নং ৪১।
৫২. সহীহ বুখারী, কিতাবুল ঈমান পরিচ্ছেদ: নিজের জন্য যা ভালো বাসে অপরের জন্য তা ভালো বাসা বিষয়ে, হাদীস নং ১৩, ৫৬/১; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ایمان: ২৯/৫ باب الدليل على أن من خصال الإيمان أن يحب لأخيه ما يحب لنفسه ،
৫৩. সহীহ বুখারী, কিতাবুস সালাত: পরিচ্ছেদ মসজিদে আঙ্গুল ফুটানো বিষয়ে, হাদীস নং ৪৮১; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল বির ওয়াস সিলাহ, পরিচ্ছেদ: মুমিনদের পরস্পর ভালোবাসা, সহযোগিতা করা ও দয়া করা, হাদীস নং ২৫৮৫।
৫৪. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল বির ওয়াস সিলাহ পরিচ্ছেদ: কোনো মুসলিমের ওপর যুলুম করা, তাকে অপমান করা, তাকে ছোট করে দেখা এবং কোকোন মুসলিমের জান মাল ও ইজ্জত সম্মান হনন করা হারাম হওয়া বিষয়ে, হাদীস নং ২৫৬৪।
৫৫. সহীহ বুখারী, কিতাবুল আদব, পরিচ্ছেদ: ছেড়ে দেওয়া ও রাসূল সাল্লাল্লাহু عليه وعلى آله وسلم لا يحل لرجل أن يهجر أخاه فوق ثلاث بلا عذر شرعي অর্থাৎ শর'ঈ কোনো ওযর ব্যতীত কোনো লোকের সাথে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক না রাখা হারাম হওয়া প্রসঙ্গে, হাদীস নং ২৫৬০।
৫৬. সহীহ বুখারী: ৫৬/১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৬৫, ১৯৮৭/৪।
৫৭. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল বির ওয়াস সিলাহ পরিচ্ছেদ: হিংস বিদ্বেষ ও সম্পর্কচ্ছেদ করা নিষেধ হওয়া প্রসংঙ্গে, ১৯৮৭/৪, ৩৬/২৫৬৫।
৫৮. সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাযালিম পরিচ্ছেদ: তোমার ভাই যালিম ও মাযলুমকে সাহায্য কর। হাদীস নং ২৪৪৪, ২৪৪১; কিতাবুল ইকরাহ হাদীস ৬৯৫২; সহীহ মুসলিম তোমার ভাই যালিম ও মযলুমকে সাহায্য কর, হাদীস নং ২৫৮৫।
৫৯. সহীহ বুখারী, কিতাবুল জানায়েয, পরিচ্ছেদ: জানাযায় অংশগ্রহণ করার নির্দেশ প্রসঙ্গে, হাদীস নং ১২৪০; সহীহ মুসলিম, কিতাবুস সালাম, পরিচ্ছেদ: এক মুসলিমের ওপর অপর মুসলিমের হক হলো, সালামের উত্তর দেওয়া বিষয় ১৭০৫/৪।
৬০. সহীহ বুখারী, কিতাবুল জানায়েয, পরিচ্ছেদ: জানাযায় অংশগ্রহণ করার নির্দেশ প্রসঙ্গে, হাদীস নং ১২৩৯, ১১২/৩, ৯৯/৫।
৬১. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান পরিচ্ছেদ: জান্নাতে শুধু মুমিনরাই প্রবেশ করবে বিষয়ে, ৭৪/১, হাদীস নং ৫৪
৬২. সহীহ বুখারী, কিতাবুল ঈমান পরিচ্ছেদ খানা খাওয়ানো ইসলাম হওয়া বিষয়ে ৫৫/১,১২; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীস নং ৩৯।
৬৩. সহীহ বুখারী: কিতাবুল আদব পরিচ্ছেদ: মানুষ ও চতুষ্পদ জন্তুর ওপর দয়া করা বিষয়ে, ৪৩৮/১০, ৬০১১ ৫৫/১, ১২; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল বির ওয়াসসিলাহ, পরিচ্ছেদ: মুমিনদের প্রতি দয়া ও নমনীয়তা বিষয়ে, ২০০০/৪, ২৫৮৬।
৬৪. সহীহ বুখারী, কিতাবুল আদব পরিচ্ছেদ: মানুষের প্রতি দয়া ও নমনীয়তা বিষয়ে ৪৩৮/১০, ৬০১৩; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল باب رحمته الصبيان والعيال ،وتواضعه وفضل ذلك, হাদীস নং ২৩১৯।
৬৫. সহীহ মুসলিম, ১৮০৯/৪, ২৩১৯।
৬৬. সহীহ বুখারী, কিতাবুল ঈমান পরিচ্ছেদ: خوف المؤمن من أن يحبط عمله وهو لا يشعر, হাদীস নং ৪৮; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান পরিচ্ছেদ: রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী سباب المسلم فسوق وقتاله كفر হাদীস ৬৪।
৬৭. দেখুন: রাহীকুল মাখতুম ১৮৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00