📄 অনুবাদকের কথা
যাবতীয় প্রশংসা মহান আল্লাহ তা'আলার জন্য, যিনি আমাদের মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতরূপে দুনিয়াতে নির্বাচন করেছেন এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দীন নিয়ে এসেছেন, আমাদেরকে তার আনিত দীনের অনুসারী হওয়ার তাওফীক দিয়েছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে যে দীন নিয়ে এসেছেন, তা মানুষের মধ্যে পৌঁছানোর জন্য তিনি যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন, দুনিয়াতে এ পরিশ্রমের চেয়ে অধিক মূল্যবান পরিশ্রম আর কিছুই হতে পারে না। এ রাহে তিনি যে ত্যাগ ও কুরবানি পেশ করেন এর চেয়ে মূল্যবান ত্যাগ ও কুরবানি আর কোনো কিছুই হতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা এ পরিশ্রম, ত্যাগ ও কুরবানির যে মূল্য ও পুরস্কার নির্ধারণ করেছেন, আর কোনো কিছুতেই তিনি এত বেশি মূল্য ও পুরস্কার নির্ধারণ করেন নি। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ ﴾ [فصلت: ৩৩]
“ঐ ব্যক্তির কথার চেয়ে কার কথা অধিক উত্তম হবে? যে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে এবং সৎ কাজ করে আর বলে, নিশ্চয় আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।” [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৩]
সুতরাং এ কথা স্পষ্ট যে, দুনিয়াতে আল্লাহর দীনের দাওয়াতই হলো একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে উত্তম কাজ ও তার জীবনের সর্বোত্তম মিশন। দুনিয়াতে নবীদের অনুপস্থিতি এবং নবুওয়াতের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে দীনের এ দাওয়াতের দায়িত্ব এখন উম্মতের ওপরই বর্তায় এবং এ উম্মতকেই দীনের প্রতি দাওয়াত দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ ভোলা মানুষকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করাতে হবে। অন্ধকার থেকে মানুষকে বের করে আলোর দিকে টেনে আনতে হবে। কিয়ামত অবধি নবীদের শূন্যতা এ উম্মতকেই পূরণ করতে হবে।
আর মনে রাখতে হবে, আল্লাহর দীনের প্রতি দাওয়াতের জন্য একমাত্র আদর্শ ও ইমাম হলো, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহ তা'আলা তাকে যখন দুনিয়াতে প্রেরণ করেন, তখন জাহেলিয়্যাত ও বর্বরতায় সমগ্র দুনিয়া ছিল বিভোর। পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে খারাপ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ কখনোই অতিক্রম করে নি এবং ভবিষ্যতেও এ ধরণের যুগের আগমন ঘটবে না। তা সত্ত্বেও তিনি তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, অক্লান্ত পরিশ্রম ও বিরামহীন সংগ্রামের মাধ্যমে জাহিলিয়্যাতের এ যুগকে পরিবর্তন করে একটি সোনালি যুগে পরিণত করেন। তিনি যেভাবে মানুষকে দাওয়াত দেন, তার অনুসরণই হলো দাওয়াতী ময়দানে সফলতার চাবিকাঠি। তিনি মানুষকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন, আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দীন কায়েমের লক্ষ্যে যেসব হিকমত, কৌশল, বুদ্ধি ও পদ্ধতি অবলম্বন করেন, তা-ই হলো এ উম্মতের দা'ঈ, আলিম ও জ্ঞানীদের জন্য একমাত্র আদর্শ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতী ময়দানে আদর্শ কী ছিল? তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ বিশিষ্ট আলেমে দীন সাঈদ ইবন আলী বিন ওহাফ আল-কাহতানী তার স্বীয় রিসালা مواقف النبي صلى الله عليه وسلم في الدعوة إلى الله تعالى তে তুলে ধরেন। আর ইসলাম সম্পর্কে বিখ্যাত ওয়েবসাইট www.islamhouse.com এ রিসালাটি আরবী ভাষায় আরবী বিভাগে প্রকাশ করে। তিনি রিসালাটি আরবী ভাষায় অত্যন্ত সাবলীল ও সহজ ভাষায় উম্মতের দা'ঈদের জন্য পেশ করেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী থেকে বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করে প্রতিটি ঘটনার পর উম্মতের দা'ঈদের তাঁর আদর্শ, হিকমত ও কৌশলের অনুকরণ করার জন্য বিশেষ মিনতি জানান।
তিনি বারবার সতর্ক করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদর্শের অনুকরণ ছাড়া কোনো ক্রমেই দাওয়াতী ময়দানে সফলতা সম্ভব নয়। কুরআন ও হাদীসের আলোকে রচিত ও বিভিন্ন সীরাতের কিতাবসমূহের তথ্য সম্বলিত এ ধরণের রিসালা বাংলা ভাষায় আমার চোখে আর কখনো পড়ে নি। তাই আমি রিসালাটি পাঠ করে বাংলাভাষী দা'ঈদের জন্য এর অনুবাদ পেশ করার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করি।
আমি রিসালাটি অনুবাদ করে বাংলা ভাষায় www.islamhouse.com-এর বাংলা বিভাগে প্রকাশ করার অনুমতি গ্রহণ করি। আমার বিশ্বাস যারা আল্লাহর দিকে মানুষকে দাওয়াত দেয়, তাদের জন্য রিসালাটি তাদের দাওয়াতী ময়দানের জন্য পাথেয় হবে। রিসালাটি পাঠে সে বুঝতে পারবে দাওয়াতী ময়দানে দাওয়াতের কাজ করতে গিয়ে তাকে কী কী ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় এবং সেগুলোর সুষ্ঠু সমাধান কী হতে পারে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী থেকে এর সমাধান বের করার চেয়ে তৃপ্তিকর কাজ দাওয়াতের ক্ষেত্রে আর কিছুই হতে পারে না।
প্রিয় পাঠক! রিসালাটি অনুবাদ করতে গিয়ে আমি চেষ্টা করছি অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় ঘটনার বিষয়বস্তুটি পাঠকের নিকট তুলে ধরতে, যাতে একজন পাঠক রিসালাটি পাঠ করে তার করণীয় বিষয়টি অনুধাবন করে তা তার দা'ওয়াতি ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারে এবং তা তার উপকারে আসে। শুধু বলার জন্য নয় বরং বাস্তবতা হলো, আন্তরিকভাবে শত চেষ্টা করা সত্ত্বেও রিসালাটি লেখক যেভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন, আমি আমার যোগ্যতার সীমাবদ্ধতা, সময়ের স্বল্পতা ও ব্যক্তিগত অদক্ষতার কারণে সেভাবে ফুটিয়ে তুলে ধরতে পারিনি। ফলে রিসালাটির অনুবাদে ভুল-ত্রুটি থাকা নিতান্তই স্বাভাবিক।
তাই যদি কোনো পাঠকের চোখে কোনো ধরণের ভুল-ত্রুটি ধরা পড়ে, তা ধরিয়ে দিয়ে শোধরানোর জন্য চেষ্টা করলে, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে আমাদের আন্তরিকতার অভাব থাকবে না। সবশেষে আল্লাহ তা'আলার দরবারে আমার বিনীত প্রার্থনা এই যে, আল্লাহ যেন এ রিসালাটিকে মুসলিম উম্মাহর উপকারের জন্য কবুল করেন এবং তিনি যেন আমার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে আখেরাতে আমার নাজাতের জন্য কারণ হিসেবে নির্ধারণ করেন! আমীন।
জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের
টিকাঃ
📄 ভূমিকা
আল্লাহ তা'আলা প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন, মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান ও তার প্রতি দাওয়াত দেওয়ার জন্য। নবী হিসেবে তিনিই হলেন, সর্বশেষ নবী; তারপর আর কোনো নবী দুনিয়াতে আসবে না। কিন্তু আল্লাহর দিকে আহ্বান করার জন্য একদল দা'ঈ বা নবীদের উত্তরসূরি কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়াতে অবশিষ্ট থাকবে, যারা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকবে এবং নবী-রাসূলদের শূন্যতা পূরণ করবে। একজন দা'ঈর জন্য তার দাওয়াতী ময়দানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শকে আঁকড়ে ধরা এবং সর্ব ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শকে সমুন্নত রাখার কোনো বিকল্প নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে দাওয়াত দিতে গিয়ে যখন যেভাবে যে হিকমত ও কৌশল অবলম্বন করেন একজন দা'ঈর জন্য তার দাওয়াতের ময়দানে তাই হলো গুরুত্বপূর্ণ পাথেয় ও অনুকরণীয় আদর্শ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের হিকমত, কৌশল ও বুদ্ধি গ্রহণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াতের ক্ষেত্রে যে সব হিকমত ও কৌশল অবলম্বন করেন এ যে উন্নত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন, তা যদি একজন দা'ঈ তার কর্মক্ষেত্রে ও দাওয়াতী ময়দানে অবলম্বন করে, তাহলে সে অবশ্যই সফল হবে। এছাড়া যদি সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদর্শ সমূহে গভীরভাবে চিন্তা করে, তাহলে দাওয়াতের ক্ষেত্রে তার সফলতা অর্জন নিশ্চিত। হিকমত ও বুদ্ধিমত্তার সাথে দাওয়াতী কাজকে সম্পন্ন করতে তার থেকে আর কোনো ত্রুটি হবে না। দাওয়াতী ময়দানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী থেকে সংগৃহীত হিকমত, বুদ্ধি ও কৌশলগুলো সে কাজে লাগাতে পারবে।
সুতরাং একটি কথা মনে রাখতে হবে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই হলো, একজন মুসলিমের জন্য পরিপূর্ণ আদর্শ। তার আদর্শের অনুকরণই হলো, একজন প্রকৃত দা'ঈর মৌলিক কাজ। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন,
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَن كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا ﴾ [الأحزاب: 21]
"অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ, তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে”। [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ২১]
আমি আমার এ পুস্তিকাটিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে যে সব হিকমত, বুদ্ধি ও কৌশল অবলম্বন করেন, তার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে চেষ্টা করব। একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জীবনে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে অসংখ্য ও অগণিত হিকমত ও কৌশল অবলম্বন করেছেন, যাতে মানুষ ঈমানের ওপর উঠে আসে। এ গুলো সবকে একত্র করা কারো দ্বারাই সম্ভব না, তবে আমি এ পুস্তিকাটিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী থেকে দৃষ্টান্তস্বরূপ কিছু আলোচনা করার প্রয়াস চালাব, যাতে একজন দা'ঈ কিছুটা হলে অনুমান করতে পারে। আমি আমার এ রিসালাটিকে দু'টি অধ্যায়ে ভাগ করছি।
প্রথম অধ্যায়: হিজরতের পূর্বে দাওয়াতী ময়দানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থান।
দ্বিতীয় অধ্যায়: হিজরতের পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থান।
টিকাঃ