📄 বেশি বেশি নফল ইবাদাত বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করা
আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছেন, “আল্লাহ বলেছেন, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব যে আমার প্রিয় ইবাদতগুজার বান্দার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। সবচেয়ে পছন্দনীয় যেসব কাজ করে বান্দাহ আমার কাছাকাছি আসতে পারে (অর্থাৎ প্রিয় হতে পারে) তা হলো, ফরজ ইবাদতসমূহ পালন করা। এরপর যে কাজ করে আমার কাছাকাছি আসতে পারে তা হচ্ছে, বেশি বেশি নফল ইবাদত করা। এরপর আমি তার শ্রবণেন্দ্রীয়তে পরিণত হই ফলে সে দেখতে পায়, তার দর্শনেন্দ্রীয়তে পরিণত ইহকালে সে দেখতে পায়, তার হাতের শক্তিতেও আমার অস্তিত্ব থাকে ফলে সে ধরতে পারে এবং চলার শক্তিতেও আমার অস্তিত্ব থাকে যার মাধ্যমে সে হাঁটতে পারে। আর যদি সে আমার কাছে কোনো কিছু চায় তবে আমি তাকে দান করি। যদি সে আমার কাছে নিরাপত্তা চায় আমি তাকে নিরাপত্তা দিই। আর আমি কোনো কাজ করতেই সংকোচবোধ করি না তবে একজন মুমিন বান্দাহ'র আত্মা নিয়ে নিতে (সংকোচ করি) কেননা, সে মৃত্যুকে ঘৃণা করে আর আমি তাকে হতাশ করতে ঘৃণা করি।১১৪
এভাবে আপনার স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ বা নফল ইবাদতের পরিমাণ যতটা সম্ভব বৃদ্ধি করুন। বৃদ্ধি করুন আপনার নামায, রোযা, যাকাত প্রদান, হজ্জ করা এবং প্রত্যেকটা ভালো কাজ যতখানি আপনি করতে সক্ষম ততখানি বৃদ্ধি করুন যাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আপনাকে ভালোবাসতে পারেন এবং আপনি যা চান তার জন্য কবুল করতে পারেন এবং এ সকল কিছুর প্রথমে যা আপনি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করেন তা হলো, আল্লাহ সুবহানাহু ও তায়ালার ভয়ে কাঁদতে পারার যোগ্যতা অর্জন করা (তার জন্যও যেন আল্লাহ আপনাকে কবুল করতে পারেন)।
পৃথিবীকে মূল্যহীন ও গুরুত্বহীন জ্ঞান করা এবং একে পরিত্যাগ করা অবশ্যই পৃথিবীর প্রতি ভালোবাসা হৃদয়ের কঠিনতার অন্যতম কারণ আর এটা (পার্থিব আকর্ষণ) ব্যক্তিকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করে। আর অবশ্যই পার্থিব আকর্ষণ হতে বিরত থাকুন ও পরিত্যাগ করুন অন্তরকে নরম করে এর খুশু (অনুগত ও নম্রভাব) বৃদ্ধি করে এবং কান্নায় দু'চোখ ভেজাতে সাহায্য করে।
তাই পার্থিব বিষয়াদিতে সহজেই দীর্ঘসময় কাটানো হতে সাবধান থাকুন। আপনাকে অবশ্যই পার্থিব ব্যস্ততা পরিহার করতে হবে এবং যতটা পারেন একে গুরুত্বহীন মনে করুন। আর এ পথে চলতে সাহায্য করবে এমন বই বেশি পড়ুন।
পার্থিব আকর্ষণ পরিহারকরণে রাসূল ﷺ এর পথ নির্দেশ নিয়ে গভীর চিন্তা করুন। তাঁর খাদ্য, পানীয়, পোশাক, আসবাবপত্র ইত্যাদি গ্রহণে কঠোর ও অনঢ় জীবনযাপন নিয়ে চিন্তা করুন।
আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুহাম্মদ ﷺ এর পরিবার মদীনায় হিজরতের পর কোনো একদিনও আটার রুটি খাননি তবে রাসূল ﷺ এর ওফাতের পর এক নাগারে তিনদিন তা খেয়েছেন।১১৬
আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন এবং তিনি কোনোদিন শুধু রুটি খাননি।১১৭
আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুহাম্মদ ﷺ এর পরিবার তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোনোদিন শুধু রুটি দিয়ে এক নাগারে দুই দিন আহার করেন নি।১১৮
উরওয়াহ (রা) হতে বর্ণিত, আয়েশা (রা) তাকে বলেন, “হে আমার ভাতিজা! আমরা প্রায়ই দুই মাসের মধ্যে তিনটি চাঁদ দেখতাম আর আল্লাহর রাসূল ﷺ এর ঘরে কোনো আগুন জ্বালানো হতো না।" আমি (উরওয়াহ) প্রশ্ন করলাম, তখন কী খেয়ে বেঁচে থাকতেন? তিনি (আয়েশা) উত্তরে বললেন, দুটি কালো বস্তু- এক. খেজুর, দুই. পানি। তথাপি রাসূল ﷺ এর কিছু আনসার প্রতিবেশিদের গবাদিপশু ছিল, যা দুধ দিত। আর তারা প্রায়ই আল্লাহর রাসূল ﷺ এর জন্য কিছু দুধ প্রেরণ করতেন, সেখান থেকে তিনি [রাসূল ﷺ] আমাদেরকেও দিতেন।১১৯
আনাস (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল ﷺ এর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কখনই জানতাম না যে তিনি রাগীফ (এক ধরনের রুটি) খেয়েছেন।১২০
সামাক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নু'মান ইবনে বশীর (রা)-কে বলতে শুনেছি, তুমি কি যত ইচ্ছা তত পান ও আহার কর না? অথচ আমি তোমাদের নবী ﷺ কে দেখেছি তিনি ক্ষুধা নিবারণে ছোট এক টুকরো খেজুরও পেতেন না।১২১ আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিছানা ছিল পশুর পশম দিয়ে তৈরি যাতে কিছু পশমও ছিল।১২২
আবু বুরদাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (রাসূল ﷺ এর মৃত্যুর পর) আয়েশা (রা) আমাদের সামনে একটি সাধারণ জামার উপরের অংশ এবং নিচের অংশ বা পায়জামা (আরবিতে ইজার) নিয়ে আসলেন এবং তিনি বললেন, এ দুটো পড়ে রাসূল ﷺ মৃত্যুবরণ করেন।১২৩ এছাড়াও এ সংক্রান্ত বহু হাদীস রয়েছে।১২৪
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার কাধে হাত রাখলেন এবং বললেন, পৃথিবীতে এমনভাবে বসবাস কর যেন তুমি একজন মুসাফির বা পথিক। আর ইবনে উমর (রা) প্রায়ই বলতেন যে, যদি তুমি সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাক তবে পরের দিন সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার ইচ্ছা পোষণ কর না। আর যদি তুমি সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাক তবে আর সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকার ইচ্ছা পোষণ কর না। অসুস্থতার জন্য তোমার স্বাস্থ্য প্রস্তুত রেখ এবং মৃত্যুর জন্য তোমার জীবনকে প্রস্তুত রেখ।১২৫
তাই আর দেরি নয় হে আমার ভাই ও বোনেরা! একজন মুসাফির বা পথিকের ন্যায় আপনার স্বভাব, আচার-আচরণ, খাদ্য, পানীয়, বাসস্থান এবং অন্যান্য যা আপনি করে থাকেন তা গড়ে তুলুন। আমাদের চোখ রাখা উচিত এবং প্রতীক্ষায় থাকা উচিত আমাদের আসল বাড়ি জান্নাতের দিকে। তাই আমাদের সন্ধ্যায় বেঁচে থাকলে (পরদিন) সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার কামনা করা উচিত নয়। এভাবে যদি আবার সকালে বেঁচে থাকি আমাদের উচিত নয় সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকার কামনা করা। তাই আমাদের উচিত নয় আত্মসমালোচনা, আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার কথা এবং আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ পালনের কথা এমনকি একটি ভালো কাজের কথাও ভুলে না যাওয়া।
আমাদের উচিত আমাদের (দৈনন্দিন) জীবনকে এমনভাবে পরিচালনা করা যেন আমরা আমাদের চোখে কেয়ামতের (ভয়াবহ) দিনটি দেখতে পাচ্ছি। আমাদের উচিত অসুস্থতার জন্য স্বাস্থ্যকে প্রস্তুত রাথা এবং স্বাস্থ্যকে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগানো, সাথে সাথে আমাদের সবাইকে এসব জানিয়ে সচেতন করা যাতে আমরা ধেয়ে আসা মৃত্যুর ও ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেতে পারি (অর্থাৎ মৃত্যু যন্ত্রণা যাতে কম হয়)।
একজন মুসাফির যে তার দেশ, পরিবার, সন্তানাদি, আত্মীয়স্বজন ছেড়ে কষ্ট করে একাকি সফর করে সে কি অন্য দেশে তার সাম্রাজ্য গড়ার জন্য এ কষ্ট করে? (অর্থাৎ অথবা একজন পথিক কি কোনো বিচ্ছিন্ন পথে প্রান্তরে বাস করে?!) (অর্থাৎ আমরা আমাদের আসল বাড়ির কথা ভুলে এ পৃথিবীতেই যেন আবাস গেড়ে বসে না যাই)।
আর আপনি, আল্লাহ আপনার উপর রহমত বর্ষণ করুন- এ পৃথিবীতে একজন মুসাফির, জান্নাতের বাড়ি থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন, সেখানকার স্ত্রী ও সন্তানদের নিকট থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন। আর এটা তখনই ঘটবে যখন আপনি জান্নাতবাসী হবেন। কিন্তু যদি এমন হয় যে আপনি জাহান্নামের অধিবাসীদের মতো সকল কাজ করে যাচ্ছেন আর জান্নাতে আপনার কোনো বাড়ি নেই, নেই কোনো সন্তান, নেই পরিবার শুধু আছে শাস্তি; এক অকল্পনীয় খারাবি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে কেমন হবে তখন?!
তাই আরাম-আয়েশের জীবন থেকে সাবধান হোন। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আরাম-আয়েশের জীবন থেকে সাবধান হও। কারণ, নিশ্চয়ই আল্লাহর (প্রকৃত) বান্দা তারা নয় যারা আরাম-আয়েশের জীবনযাপন করে।১২৬
অতএব আপনার জন্য প্রয়োজন 'আল বাদাদাহ' যেমন নবী ﷺ বলেন, 'ঈমান হলো আল বাদাদাহ।'১২৭ আর 'আল বাদাদাহ' অর্থ হলো সাধারণ ও ধার্মিক জীবনযাপন করা।
টিকাঃ
১১৩. আমার (মূল লেখক) 'মিম মাওয়াকিফ আস সাহীহা' গ্রন্থের 'নম্বর ৮ : আবদুল্লাহ ইবনে উমর ও জান্নাতী একজন” থেকে উদ্ধৃত।
১১৪. ইমাম বুখারী ও অন্যান্য কর্তৃক বর্ণিত।
১১৬. বুখারী ও মুসলিম হতে বর্ণিত।
১১৭. ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত।
১১৮. ইমাম মুসলিম হতে বর্ণিত।
১২১. ইমাম মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত।
১২২. বুখারী ও মুসলিম হতে বর্ণিত।
১২৩. বুখারী ও মুসলিম হতে বর্ণিত।
১২৪. আরো তথ্যের জন্য সহীহ বুখারী শরীফের 'খাদ্য' অধ্যায়ের 'রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবীগণ কী খেতেন' অনুচ্ছেদ এবং 'হৃদয় বিগলিতকরণ' অধ্যায়ের কিভাবে নবী ﷺ ও তার সাহাবীগণ জীবনধারণ করতেন অনুচ্ছেদে। সহীহ মুসলিম শরীফের 'ত্যাগ ও অন্তর বিগলিতকরণ' অধ্যায় এবং 'রিয়াদুস সালেহীন' গ্রন্থের অধ্যায়-৫৬।
১২৫. ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত।
১২৬. ইমাম আহমদ ও আবু নূআইম কর্তৃক 'হিলায়াহ' গ্রন্থে বর্ণিত শায়েখ আল বানী 'মিশকাত' গ্রন্থে বলেন, এর সনদ সহীহ।
১২৭. ইবনে মাজাহ কর্তৃক বর্ণিত। আস সাহীহা গ্রন্থে একে সহীহ হাদীস বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
📄 ইয়াতীমের ওপর দয়া
আবু দারদা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক লোক আল্লাহর রাসূল ﷺ এর কাছে এলে তার অন্তরের কাঠিন্য সম্পর্কে অভিযোগ করলো। তিনি ﷺ বললেন, তুমি কি তোমার অন্তরকে কোমল করতে চাও? তোমার (জান্নাতে প্রবেশের) কামনা পূরণ করতে চাও? তবে ইয়াতীমের ওপর দয়া কর, তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দাও এবং তোমার খাদ্য থেকে তাদেরকে খাওয়াও। ফলে তুমি তোমার অন্তরকে নরম করতে পারবে এবং তোমার কামনা পূরণ করতে পারবে।১২৮
টিকাঃ
১২৮. ইমাম তাবারানী কর্তৃক 'আল কাবীর' গ্রন্থে বর্ণিত। শায়খ আলবানীর একই রকম বর্ণনা থাকায় একে বিশুদ্ধ বলে মত দিয়েছেন দেখুন 'আস সাহীহা' গ্রন্থ।
আবু দারদা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক লোক আল্লাহর রাসূল ﷺ এর কাছে এলে তার অন্তরের কাঠিন্য সম্পর্কে অভিযোগ করলো। তিনি ﷺ বললেন, তুমি কি তোমার অন্তরকে কোমল করতে চাও? তোমার (জান্নাতে প্রবেশের) কামনা পূরণ করতে চাও? তবে ইয়াতীমের ওপর দয়া কর, তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দাও এবং তোমার খাদ্য থেকে তাদেরকে খাওয়াও। ফলে তুমি তোমার অন্তরকে নরম করতে পারবে এবং তোমার কামনা পূরণ করতে পারবে।১২৮
টিকাঃ
১২৮. ইমাম তাবারানী কর্তৃক 'আল কাবীর' গ্রন্থে বর্ণিত। শায়খ আলবানীর একই রকম বর্ণনা থাকায় একে বিশুদ্ধ বলে মত দিয়েছেন দেখুন 'আস সাহীহা' গ্রন্থ।
📄 হাসি কমানো
আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "অত্যাধিক হেসো না। কেননা অত্যাধিক হাসি অন্তরকে মেরে ফেলে।"১২৯
টিকাঃ
১২৯. ইবনে মাজাহ এবং অন্যান্য কর্তৃক বর্ণিত। এটি সহীহ হাদীস যা আস সাহীহা গ্রন্থে আলবানী উল্লেখ করেছেন।
আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "অত্যাধিক হেসো না। কেননা অত্যাধিক হাসি অন্তরকে মেরে ফেলে।"১২৯
টিকাঃ
১২৯. ইবনে মাজাহ এবং অন্যান্য কর্তৃক বর্ণিত। এটি সহীহ হাদীস যা আস সাহীহা গ্রন্থে আলবানী উল্লেখ করেছেন।
📄 এ ভয় করা যে আমার আমল নাও কবুল হতে পারে
আয়েশা (রা) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল ﷺ কে নিম্নোক্ত আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম-
وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ
আর যারা যা দান করবার তা ভীত, কম্পিত হৃদয়ে দান করে।১৩০
“এরা (দানকারীরা) কি সেই লোক যারা অবৈধ যৌন সম্পর্ক রাখে, চুরি করে এবং এ্যালকোহল বা মাদক গ্রহণ করে?” আল্লাহর রাসূল ﷺ উত্তরে বললেন, “না হে আবু বকরের কন্যা (অথবা হে আস সিদ্দীকের কন্যা), তারা হলো সেই লোক যারা রোযা রাখে, দান-সদকা করে এবং নামায আদায় করে এ ভয়ে যে তাদের আমল কবুল নাও হতে পারে।১৩১
যন্ত্রণার আক্রমণের ভীতি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে দণ্ডায়মান হবার ভয় যেখানে আমি জানি না আমি কি জাহান্নামে যাব নাকি জান্নাতে।" হযরত সুফিয়ান সাওরী (রা) হতে বর্ণিত, যে আবু যর গিফারী (রা) কা'ব (রা)-এর সাথে ছিলেন তখন তিনি বলেন, “হে মানুষ! আমি জুনদুব আল গিফারী, দ্রুত এ সহকর্মী ভ্রাতার নিকট আস তিনি তোমাদের গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিবেন।” লোকেরা তার চারপাশে একত্রিত হলো এবং তিনি বললেন, তোমরা কি জান না যে, যদি কেউ সফরে যাওয়ার নিয়ত করে তবে সে সাথে করে কিছু সহায় সম্বল নেয়ার চেষ্টা করে যাতে সফর সহজ ও আরামদায়ক হয় ও তার গন্তব্যে পৌঁছাতে কার্যকরী হয়? তারা উত্তর করল, অবশ্যই (আমরা জানি)! এরপর তিনি বললেন, পুনরুত্থান দিবসের সফর তোমাদের নিয়তের (যে কোন সফরের) চেয়ে দীর্ঘ সফর।
আল্লাহর ভয়ে কাঁদা এবং পরকালের দুঃখ-কষ্ট ও স্মরণ সংক্রান্ত কিছু ঘটনা ও বর্ণনা১৩২ জাফর ইবনে বুরকান হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জেনেছি যে, সালমান ফারসী (রা) প্রায়ই বলতেন, তিনটি জিনিস আমাকে কাঁদায় এবং তিনটি জিনিস আমাকে হাসায়। আমি সেই লোককে দেখে হাসি যে দুনিয়ার জীবনের প্রতি আশাবাদী যদিও মৃত্যু তাকে পিছু ডাকছে। এরপর সে লোককে দেখে হাসি যে (তার প্রভুর প্রতি) অকৃতজ্ঞ যদিও সে (তার প্রভু কর্তৃক) অবহেলিত নয়। এরপর সে লোককে দেখে (হাসি আসে) যে ব্যক্তি উচ্চস্বরে হাসাহাসি করে অথচ সে জানে না সে কি তার প্রভুকে (তার কর্মকাণ্ড দ্বারা) সন্তুষ্ট করছে নাকি অসন্তুষ্ট করছে। যে তিনটি বিষয়ে আমাকে কাঁদায় তা হলো : এক. আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ ও তাঁর সাহাবায়ে আজমায়ীনের সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। দুই. হঠাৎ মৃত্যু যন্ত্রণায় আক্রমণের ভীতি। তিন. আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে দণ্ডায়মান হবার ভয় যেখানে আমি জানি না আমি কি জাহান্নামে যাব নাকি জান্নাতে।
সুফিয়ান সাওরী (রা) হতে বর্ণিত যে, আবু যর গিফারী (রা) কা'ব (রা)-এর সাথে ছিলেন তখন তিনি বলেন। “হে মানুষ! আমি জুনদুব আল গিফারী, দ্রুত এ সহমর্মী ভ্রাতার নিকট আস তিনি তোমাদের গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিবেন। লোকেরা তার চর্তুপাশে জামায়েত হলো এবং তিনি বললেন, তোমরা কি জান না যে যদি কেউ সফরে যাওয়ার নিয়ত করে তবে সে সাথে করে কিছু সহায় সম্বল নেয়ার চেষ্টা করে যাতে সফর সহজ ও আরামদায়ক হয় ও তার গন্তব্যে পৌঁছাতে কার্যকরী হয়? তারা উত্তর করল। অবশ্যই (আমরা জানি)! এরপর তিনি বললেন, পুনরুত্থান দিবসের সফর তোমাদের নিয়তের (যে কোন সফরের) চেয়ে দীর্ঘ সফর। তাই (সহায় সম্বল) গ্রহণ কর যা তোমার এ দীর্ঘ সফরকে তোমার জন্য সহজ ও আরামদায়ক করবে। তারা বলল, “সে জিনিস কী যা আমাদের সফরকে সহজ ও আরামদায়ক করবে?” তিনি উত্তরে বললেন, যে ভয়ানক বিষয় (কেয়ামত) আসছে তার জন্য হজ্জ আদায় কর। কেয়ামতের দিনের দীর্ঘতা চিন্তা করে প্রচণ্ড গরমের দিনেও রোযা রাখ। কবরে শান্ত ও নিরব অবস্থার চেয়ে আল্লাহর কাছে রাতের আধারে দু'রাকাত নামায পড়। মহান বিচার দিবসে (দীর্ঘ সময়) দাঁড়িয়ে থাকার কথা চিন্তা করে একটি ভালো কথা বল নতুবা বাজে কথা বলা থেকে বিরত থাক। আর তোমাদের সম্পদ থেকে এ নিয়তে দান কর যে, এ জাতীয় অন্যান্য (দুর্যোগ ও দুর্ভোগ) থেকে রক্ষা পাবে।
পৃথিবীতে দু'ধরনের কাজে ব্যস্ত থেকো। এক. পরকালীন মুক্তির অনুসন্ধানে দুই. হালাল রুজি অনুসন্ধানে। তৃতীয় কোনো ব্যস্ততা তোমাকে কষ্ট দিবে বৈ উপকারে আসবে না। তাই এটা কামনা কর না।"
তোমার সম্পদ দুই দিরহামের (অর্থাৎ সীমিত সম্পদের) মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখ। যার এক দিরহাম (অর্থাৎ অর্ধাংশ) তোমার পরিবারের জন্য ব্যয় কর আর এক দিরহাম পরকালীন জীবনের (ব্যয় করে) সঞ্চয় কর। তৃতীয় ধরনের কোনো দিরহাম তোমাকে কষ্ট দিবে বৈ উপকারে আসবে না; তাই তা কামনা কর না।
সালান ইবনে আবী মৃতী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একটি পানির পাত্র হাসান (রা)-এর সামনে আনা হলো তার রোযা ভাঙ্গাতে। কিন্তু যখন তিনি এটি তার মুখের কাছে নিলেন তখন কাঁদতে শুরু করলেন এবং বললেন, আমার স্মরণে আসছে জাহান্নামীদের আকুতি, তারা বলবে, আমাদের উপর কিছু পানি ঢাল।১৩৩
এবং এরপর তাদের প্রতি যে উত্তর দেয়া হবে তাও আমার স্মরণ হচ্ছে।
“নিশ্চয়ই আল্লাহ উভয় বস্তু (জান্নাতের পানি ও আহার) অবিশ্বাসীদের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন।১৩৪
আল হাসান বলেন, নিশ্চিতভাবেই তোমার সময় অপর্যাপ্ত তোমার কাজ-কর্ম পরীক্ষিত, মৃত্যু তোমাকে খুঁজে ফিরছে এবং জাহান্নাম তোমার সম্মুখে। আর আল্লাহর কসম যা কিছুই তুমি দেখ (এ পৃথিবীতে) তাই (একদিন) চলে যাচ্ছে। তাই প্রত্যেক দিন রাতে আল্লাহর সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা কর আর লোকদেরকে নিজেদের কর্ম খতিয়ে দেখতে বল যে তারা সামনের দিনের (পরকালের) জন্য রাখছে।
তিনি আরো বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি তো কতগুলো দিনের সমষ্টি মাত্র। যখনই একটি দিন চলে যায় তোমার একটি অংশ যেন চলে যায়।”
তিনি আরো বলেন, এটা (এ উপদেশ) তার জন্যই মানানসই যে মনে করে মৃত্যু তার যাত্রাপথে দাঁড়িয়ে; সময় তার নির্দিষ্টক্ষণের অপেক্ষায় এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সমাবেশ স্থলে (কিয়ামতের মাঠে) দণ্ডায়মান হওয়া অবধারিত। আর এ ভাবনাগুলো যার মনে দীর্ঘ রেখাপাত করে (তার জন্য এ উপদেশ)।
সাবিত আল বানানী বলেন, আমরা একটি লাশ দাফন করতে যাচ্ছিলাম আর তখন শুধু দেখলাম যে লোকেরা মুখ ঢেকে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। অথবা মুখ ঢেকে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করছে।
আ'মাশ বলেন, আমরা একটি দাফন-যাত্রা দেখছিলাম কিন্তু মানুষের কান্না দেখে বুঝতে পারছিলাম না যে কে আসলে আমাদের সহমর্মীতা প্রত্যাশা করছে। (অর্থাৎ, এ কান্না এত তীব্র ও বিস্তৃত ছিল যে তারা বুঝতে পারেনি কারা মৃতের নিকটাত্মীয়)
সুফিয়ান ইবনে উআইনাহ বলেন যে; ইবরাহীম আত তাইমী বলেন, আমি নিজেকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে লোহার শিকলে বাধা কল্পনা করতাম যেখানে লেলিহান শিখা দাউ দাউ করে জ্বলছে আর এর অধিবাসীরা যাক্কুম১৩৫ নামক বৃক্ষে ফল খাচ্ছে (বাধ্য হয়ে) এবং জামহারীর (একটি তিক্ত ঠাণ্ডা পানীয়) থেকে পান করছে। তাই আমি বললাম, “হে আমার আত্মা! তুমি আর কী চাও? উত্তর আসে, “পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাই পুণ্য কাজ করার জন্য যদ্বারা আমি জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা পাব।”
আবার আমি নিজেকে জান্নাতের হুরদের১৩৬ সাথে (জান্নাতের) স্বর্ণালী কারুকাজের রেশমী পোশাক পরা অবস্থায় কল্পনা করলাম। আমি বললাম, হে আমার আত্মা! তুমি আর কী চাও? উত্তর আসল, পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাই পুণ্য কাজ করার জন্য যদ্বারা এ নেয়ামত আরো বৃদ্ধি পাবে।”
অতঃপর নিজেকে বললাম, “তুমি এখন পৃথিবীতেই আছ আর তোমার ইচ্ছাগুলোও (তোমাকে ঘিরে) আছে।”
বুকায়ের অথবা আবু বুকায়ের হতে বর্ণিত, তিনি বলেন ইবরাহীম আততীহমী বলেন, “যে ব্যক্তি দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেনি সে যেন জাহান্নামের অধিবাসী হওয়া থেকে ভয় করে। কারণ জান্নাতবাসীগণ বলবেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিয়েছেন।১৩৭
যারা (আল্লাহর শাস্তির) ভয় করে না তাদের জন্য এটা অত্যাবশ্যক যে জান্নাতের অধিবাসী হওয়া থেকে সতর্ক থাকে। কারণ তারা বলবে, ইতিপূর্বে আমরা আমাদের বাসগৃহে (আল্লাহর শাস্তির ভয়ে) ভীত ও কম্পিত ছিলাম।”১৩৮
যাকারিয়া আল আব্দী ইবরাহীম আন নাখয়ী সম্পর্কে বলেন যে, তিনি তার অসুস্থতার সময়ে কাঁদতেন, আর লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করতেন, হে ইমরানের পিতা! আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি উত্তরে বলতেন, কেন আমি কাঁদবো না যখন আমি আমার প্রভুর পক্ষ থেকে একজন বার্তাবাহকের (ফেরেশতার) অপেক্ষায় আছি যে আমাকে জানাবে হয় এটা না হয় ওটা (অর্থাৎ, হয় জান্নাত না হয় জাহান্নাম)।
হিশাম ইবনে হাসান বলেন, যখন মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসিকে বলা হলো, হে আবু আবদুল্লাহ! আপনি কোন অবস্থায় জেগে উঠেন? তিনি উত্তরে বললেন, একজন মানুষের একটি চিন্তাই থাকতে পারে যে, সে প্রতিদিনই পরকালের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।
টিকাঃ
১৩০. সূরা আল মু'মীনূন (২৩) : ৬০
১৩১. ইমাম তিরমিযী, ইবনে মাজাহ এবং অন্যান্য কর্তৃক বর্ণিত। এটি একটি হাসান হাদীস যা শায়েখ আলবানী আস সাহীহা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
১৩২. এসব বর্ণনা 'হিলায়াতুল আবীলিয়্যাহ' গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। আমি (মূল লেখক) বাদ আস শাহিদীন গ্রন্থ থেকেও উপকৃত হয়েছি যেটি এর মূলকথা।
১৩৩. সূরা আল আরাফ (৭) : আয়াত-৫০।
১৩৪. সূরা আল আরাফ (৭) : আয়াত-৫০।
১৩৫. অনুবাদকের নোট: জাহান্নামের মাত্রাতিরিক্ত তিক্ত একটি ফল।
১৩৬. অপরূপ সুন্দর ডাগর চোখ বিশিষ্ট জান্নাতের (পুরুষের) নারী সঙ্গী যাদেরকে কোন পুরুষ বা জ্বিন স্পর্শ করেনি।
১৩৭. সূরা আল ফাতির (৩৫): ৩৪
১৩৮. সূরা আত তূর (৫২): ২৬
আয়েশা (রা) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল ﷺ কে নিম্নোক্ত আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম-
وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ
আর যারা যা দান করবার তা ভীত, কম্পিত হৃদয়ে দান করে।১৩০
“এরা (দানকারীরা) কি সেই লোক যারা অবৈধ যৌন সম্পর্ক রাখে, চুরি করে এবং এ্যালকোহল বা মাদক গ্রহণ করে?” আল্লাহর রাসূল ﷺ উত্তরে বললেন, “না হে আবু বকরের কন্যা (অথবা হে আস সিদ্দীকের কন্যা), তারা হলো সেই লোক যারা রোযা রাখে, দান-সদকা করে এবং নামায আদায় করে এ ভয়ে যে তাদের আমল কবুল নাও হতে পারে।১৩১
যন্ত্রণার আক্রমণের ভীতি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে দণ্ডায়মান হবার ভয় যেখানে আমি জানি না আমি কি জাহান্নামে যাব নাকি জান্নাতে।" হযরত সুফিয়ান সাওরী (রা) হতে বর্ণিত, যে আবু যর গিফারী (রা) কা'ব (রা)-এর সাথে ছিলেন তখন তিনি বলেন, “হে মানুষ! আমি জুনদুব আল গিফারী, দ্রুত এ সহকর্মী ভ্রাতার নিকট আস তিনি তোমাদের গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিবেন।” লোকেরা তার চারপাশে একত্রিত হলো এবং তিনি বললেন, তোমরা কি জান না যে, যদি কেউ সফরে যাওয়ার নিয়ত করে তবে সে সাথে করে কিছু সহায় সম্বল নেয়ার চেষ্টা করে যাতে সফর সহজ ও আরামদায়ক হয় ও তার গন্তব্যে পৌঁছাতে কার্যকরী হয়? তারা উত্তর করল, অবশ্যই (আমরা জানি)! এরপর তিনি বললেন, পুনরুত্থান দিবসের সফর তোমাদের নিয়তের (যে কোন সফরের) চেয়ে দীর্ঘ সফর।
আল্লাহর ভয়ে কাঁদা এবং পরকালের দুঃখ-কষ্ট ও স্মরণ সংক্রান্ত কিছু ঘটনা ও বর্ণনা১৩২ জাফর ইবনে বুরকান হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জেনেছি যে, সালমান ফারসী (রা) প্রায়ই বলতেন, তিনটি জিনিস আমাকে কাঁদায় এবং তিনটি জিনিস আমাকে হাসায়। আমি সেই লোককে দেখে হাসি যে দুনিয়ার জীবনের প্রতি আশাবাদী যদিও মৃত্যু তাকে পিছু ডাকছে। এরপর সে লোককে দেখে হাসি যে (তার প্রভুর প্রতি) অকৃতজ্ঞ যদিও সে (তার প্রভু কর্তৃক) অবহেলিত নয়। এরপর সে লোককে দেখে (হাসি আসে) যে ব্যক্তি উচ্চস্বরে হাসাহাসি করে অথচ সে জানে না সে কি তার প্রভুকে (তার কর্মকাণ্ড দ্বারা) সন্তুষ্ট করছে নাকি অসন্তুষ্ট করছে। যে তিনটি বিষয়ে আমাকে কাঁদায় তা হলো : এক. আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ ও তাঁর সাহাবায়ে আজমায়ীনের সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। দুই. হঠাৎ মৃত্যু যন্ত্রণায় আক্রমণের ভীতি। তিন. আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে দণ্ডায়মান হবার ভয় যেখানে আমি জানি না আমি কি জাহান্নামে যাব নাকি জান্নাতে।
সুফিয়ান সাওরী (রা) হতে বর্ণিত যে, আবু যর গিফারী (রা) কা'ব (রা)-এর সাথে ছিলেন তখন তিনি বলেন। “হে মানুষ! আমি জুনদুব আল গিফারী, দ্রুত এ সহমর্মী ভ্রাতার নিকট আস তিনি তোমাদের গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিবেন। লোকেরা তার চর্তুপাশে জামায়েত হলো এবং তিনি বললেন, তোমরা কি জান না যে যদি কেউ সফরে যাওয়ার নিয়ত করে তবে সে সাথে করে কিছু সহায় সম্বল নেয়ার চেষ্টা করে যাতে সফর সহজ ও আরামদায়ক হয় ও তার গন্তব্যে পৌঁছাতে কার্যকরী হয়? তারা উত্তর করল। অবশ্যই (আমরা জানি)! এরপর তিনি বললেন, পুনরুত্থান দিবসের সফর তোমাদের নিয়তের (যে কোন সফরের) চেয়ে দীর্ঘ সফর। তাই (সহায় সম্বল) গ্রহণ কর যা তোমার এ দীর্ঘ সফরকে তোমার জন্য সহজ ও আরামদায়ক করবে। তারা বলল, “সে জিনিস কী যা আমাদের সফরকে সহজ ও আরামদায়ক করবে?” তিনি উত্তরে বললেন, যে ভয়ানক বিষয় (কেয়ামত) আসছে তার জন্য হজ্জ আদায় কর। কেয়ামতের দিনের দীর্ঘতা চিন্তা করে প্রচণ্ড গরমের দিনেও রোযা রাখ। কবরে শান্ত ও নিরব অবস্থার চেয়ে আল্লাহর কাছে রাতের আধারে দু'রাকাত নামায পড়। মহান বিচার দিবসে (দীর্ঘ সময়) দাঁড়িয়ে থাকার কথা চিন্তা করে একটি ভালো কথা বল নতুবা বাজে কথা বলা থেকে বিরত থাক। আর তোমাদের সম্পদ থেকে এ নিয়তে দান কর যে, এ জাতীয় অন্যান্য (দুর্যোগ ও দুর্ভোগ) থেকে রক্ষা পাবে।
পৃথিবীতে দু'ধরনের কাজে ব্যস্ত থেকো। এক. পরকালীন মুক্তির অনুসন্ধানে দুই. হালাল রুজি অনুসন্ধানে। তৃতীয় কোনো ব্যস্ততা তোমাকে কষ্ট দিবে বৈ উপকারে আসবে না। তাই এটা কামনা কর না।"
তোমার সম্পদ দুই দিরহামের (অর্থাৎ সীমিত সম্পদের) মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখ। যার এক দিরহাম (অর্থাৎ অর্ধাংশ) তোমার পরিবারের জন্য ব্যয় কর আর এক দিরহাম পরকালীন জীবনের (ব্যয় করে) সঞ্চয় কর। তৃতীয় ধরনের কোনো দিরহাম তোমাকে কষ্ট দিবে বৈ উপকারে আসবে না; তাই তা কামনা কর না।
সালান ইবনে আবী মৃতী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একটি পানির পাত্র হাসান (রা)-এর সামনে আনা হলো তার রোযা ভাঙ্গাতে। কিন্তু যখন তিনি এটি তার মুখের কাছে নিলেন তখন কাঁদতে শুরু করলেন এবং বললেন, আমার স্মরণে আসছে জাহান্নামীদের আকুতি, তারা বলবে, আমাদের উপর কিছু পানি ঢাল।১৩৩
এবং এরপর তাদের প্রতি যে উত্তর দেয়া হবে তাও আমার স্মরণ হচ্ছে।
“নিশ্চয়ই আল্লাহ উভয় বস্তু (জান্নাতের পানি ও আহার) অবিশ্বাসীদের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন।১৩৪
আল হাসান বলেন, নিশ্চিতভাবেই তোমার সময় অপর্যাপ্ত তোমার কাজ-কর্ম পরীক্ষিত, মৃত্যু তোমাকে খুঁজে ফিরছে এবং জাহান্নাম তোমার সম্মুখে। আর আল্লাহর কসম যা কিছুই তুমি দেখ (এ পৃথিবীতে) তাই (একদিন) চলে যাচ্ছে। তাই প্রত্যেক দিন রাতে আল্লাহর সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা কর আর লোকদেরকে নিজেদের কর্ম খতিয়ে দেখতে বল যে তারা সামনের দিনের (পরকালের) জন্য রাখছে।
তিনি আরো বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি তো কতগুলো দিনের সমষ্টি মাত্র। যখনই একটি দিন চলে যায় তোমার একটি অংশ যেন চলে যায়।”
তিনি আরো বলেন, এটা (এ উপদেশ) তার জন্যই মানানসই যে মনে করে মৃত্যু তার যাত্রাপথে দাঁড়িয়ে; সময় তার নির্দিষ্টক্ষণের অপেক্ষায় এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সমাবেশ স্থলে (কিয়ামতের মাঠে) দণ্ডায়মান হওয়া অবধারিত। আর এ ভাবনাগুলো যার মনে দীর্ঘ রেখাপাত করে (তার জন্য এ উপদেশ)।
সাবিত আল বানানী বলেন, আমরা একটি লাশ দাফন করতে যাচ্ছিলাম আর তখন শুধু দেখলাম যে লোকেরা মুখ ঢেকে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। অথবা মুখ ঢেকে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করছে।
আ'মাশ বলেন, আমরা একটি দাফন-যাত্রা দেখছিলাম কিন্তু মানুষের কান্না দেখে বুঝতে পারছিলাম না যে কে আসলে আমাদের সহমর্মীতা প্রত্যাশা করছে। (অর্থাৎ, এ কান্না এত তীব্র ও বিস্তৃত ছিল যে তারা বুঝতে পারেনি কারা মৃতের নিকটাত্মীয়)
সুফিয়ান ইবনে উআইনাহ বলেন যে; ইবরাহীম আত তাইমী বলেন, আমি নিজেকে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে লোহার শিকলে বাধা কল্পনা করতাম যেখানে লেলিহান শিখা দাউ দাউ করে জ্বলছে আর এর অধিবাসীরা যাক্কুম১৩৫ নামক বৃক্ষে ফল খাচ্ছে (বাধ্য হয়ে) এবং জামহারীর (একটি তিক্ত ঠাণ্ডা পানীয়) থেকে পান করছে। তাই আমি বললাম, “হে আমার আত্মা! তুমি আর কী চাও? উত্তর আসে, “পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাই পুণ্য কাজ করার জন্য যদ্বারা আমি জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা পাব।”
আবার আমি নিজেকে জান্নাতের হুরদের১৩৬ সাথে (জান্নাতের) স্বর্ণালী কারুকাজের রেশমী পোশাক পরা অবস্থায় কল্পনা করলাম। আমি বললাম, হে আমার আত্মা! তুমি আর কী চাও? উত্তর আসল, পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাই পুণ্য কাজ করার জন্য যদ্বারা এ নেয়ামত আরো বৃদ্ধি পাবে।”
অতঃপর নিজেকে বললাম, “তুমি এখন পৃথিবীতেই আছ আর তোমার ইচ্ছাগুলোও (তোমাকে ঘিরে) আছে।”
বুকায়ের অথবা আবু বুকায়ের হতে বর্ণিত, তিনি বলেন ইবরাহীম আততীহমী বলেন, “যে ব্যক্তি দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেনি সে যেন জাহান্নামের অধিবাসী হওয়া থেকে ভয় করে। কারণ জান্নাতবাসীগণ বলবেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিয়েছেন।১৩৭
যারা (আল্লাহর শাস্তির) ভয় করে না তাদের জন্য এটা অত্যাবশ্যক যে জান্নাতের অধিবাসী হওয়া থেকে সতর্ক থাকে। কারণ তারা বলবে, ইতিপূর্বে আমরা আমাদের বাসগৃহে (আল্লাহর শাস্তির ভয়ে) ভীত ও কম্পিত ছিলাম।”১৩৮
যাকারিয়া আল আব্দী ইবরাহীম আন নাখয়ী সম্পর্কে বলেন যে, তিনি তার অসুস্থতার সময়ে কাঁদতেন, আর লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করতেন, হে ইমরানের পিতা! আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি উত্তরে বলতেন, কেন আমি কাঁদবো না যখন আমি আমার প্রভুর পক্ষ থেকে একজন বার্তাবাহকের (ফেরেশতার) অপেক্ষায় আছি যে আমাকে জানাবে হয় এটা না হয় ওটা (অর্থাৎ, হয় জান্নাত না হয় জাহান্নাম)।
হিশাম ইবনে হাসান বলেন, যখন মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসিকে বলা হলো, হে আবু আবদুল্লাহ! আপনি কোন অবস্থায় জেগে উঠেন? তিনি উত্তরে বললেন, একজন মানুষের একটি চিন্তাই থাকতে পারে যে, সে প্রতিদিনই পরকালের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।
টিকাঃ
১৩০. সূরা আল মু'মীনূন (২৩) : ৬০
১৩১. ইমাম তিরমিযী, ইবনে মাজাহ এবং অন্যান্য কর্তৃক বর্ণিত। এটি একটি হাসান হাদীস যা শায়েখ আলবানী আস সাহীহা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
১৩২. এসব বর্ণনা 'হিলায়াতুল আবীলিয়্যাহ' গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। আমি (মূল লেখক) বাদ আস শাহিদীন গ্রন্থ থেকেও উপকৃত হয়েছি যেটি এর মূলকথা।
১৩৩. সূরা আল আরাফ (৭) : আয়াত-৫০।
১৩৪. সূরা আল আরাফ (৭) : আয়াত-৫০।
১৩৫. অনুবাদকের নোট: জাহান্নামের মাত্রাতিরিক্ত তিক্ত একটি ফল।
১৩৬. অপরূপ সুন্দর ডাগর চোখ বিশিষ্ট জান্নাতের (পুরুষের) নারী সঙ্গী যাদেরকে কোন পুরুষ বা জ্বিন স্পর্শ করেনি।
১৩৭. সূরা আল ফাতির (৩৫): ৩৪
১৩৮. সূরা আত তূর (৫২): ২৬